Home সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ২৫

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ২৫

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ২৫
jannatul firdaus mithila

“ আমার আবার ঘুম! সে-তো উড়ে গিয়েছে রোদ। জানিনা মরবার আগে আর কোনোদিন একটুখানি শান্তিতে চোখদুটো বুঁজতে পারবো কি-না।”
হতভম্ব রৌদ্র। কোন কথার পিঠে কী উত্তর পেল সে? সেজো চাচীর কথাটা আদৌও তার মাথায় ঢুকলো কি-না কে জানে! সে কেমন গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ মানে?”
ধ্যান ভাঙলো মাইমুনা বেগমের। গতকালকের কথাগুলো মনে করতে করতে আচমকাই ঘোরে ডুব দিয়েছিলেন মানুষটা। তাইতো আনমনে বলে বসেছিলেন ওমন কথা। তবে রৌদ্রের কন্ঠে সম্বিত ফিরতেই মধ্যবয়সী রমণী কেমন হকচকিয়ে উঠলেন। কিয়তক্ষন আমতা আমতা করে, ঠোঁটের কোণে ব্যাথাতুর হাসি ঝুলিয়ে নিচু স্বরে বললেন,

“ নাহ তেমন কিছু না। আসলে গতকাল রাতে খুব একটা ঘুম হয়নি তো, তাই বোধহয় মাথাব্যথাটা বেড়েছে এতো। আশা করি লম্বা একটা ঘুম দিতে পারলে মাথাব্যথাটা কেটে যাবে তারাতাড়ি।”
রৌদ্র গভীর চোখে পরোখ করছে মাইমুনা বেগমের মুখাবয়ব। মানুষটা আজ মোটেও চোখজোড়া দিয়ে কথা বলছেনা তার সঙ্গে। বারবার নিজের দৃষ্টি লুকচ্ছে নানান কায়দায়। এতে যেন সন্দেহের মাত্রা বাড়ছে রৌদ্রের। মাথায় জেঁকে বসেছে নানান প্রশ্ন। কাল থেকেই বাড়ির বাদবাকি সদস্যদের হাবভাবে তার বেশ মনে হচ্ছে সবাই হয়তো কিছু একটা লুকচ্ছে তার কাছ থেকে। তবে সেটা ঠিক কি..তা তো ঠাওর করতে পারছেনা ডাক্তার সাহেব। রৌদ্র চুপচাপ কিছুক্ষণ বসে থেকে উঠে দাঁড়ায়। পরনের ট্রাউজারের পকেটে দু’হাত গুঁজে গম্ভীর কন্ঠে বলে,

“ টেক রেস্ট সেজো মা। আমি স্ফিগমোম্যানোমিটার নিয়ে আসছি।এমুহূর্তে তোমার ব্লাড প্রেসার মাপাটা জরুরী।”
রৌদ্র পা বাড়ালো ঘরের বাইরে। ছেলেটা চক্ষু আড়াল হতেই জুবাইদা বেগম তৎক্ষনাৎ এগিয়ে এসে দাড়াঁলেন জা’য়ের মাথার কাছে। একহাতে আলতো করে মাইমুনা বেগমের মাথাভর্তি উষ্কখুষ্ক চুলগুলোকে খানিকটা গুছিয়ে দিয়ে নরম গলায় বলতে লাগলেন,
“ এভাবে ভেঙে পড়লে কিভাবে হবে বলতো মাইমুনা? এমুহূর্তে আমাদের উচিত কিভাবে এসমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায় সে চিন্তা করা। অথচ তুই কিনা….”
“ আর কি’বা করবো বড়বু? মা হয়ে বোবার মতো দেখে যাচ্ছি নিজের মেয়ের আসন্ন সর্বনাশ গুলো। না পারছি আটকাতে, আর না পারছি সইতে।”
জুবাইদা বেগমের কথার মাঝেই কেঁদে কেঁদে কথাগুলো বলে ওঠেন মাইমুনা বেগম। এদিকে তার ওমন কান্না দেখে বুক ভার হয়ে এসেছে বাড়ির সকলের। তায়েফ সাহেব অপরাধীর ন্যায় মুখ লুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন অদূরে। সাব্বির সাহেব ভাইয়ের কাঁধে হাত রেখে আশ্বস্ত করে যাচ্ছেন তবে এতেও তেমন লাভের লাভ হচ্ছে না। তায়েফ সাহেবের বুক হতে অপরাধীত্বের বোঝা কিছুতেই সরছেনা।

মাইমুনা বেগমকে ঘুমের ঔষধ দেওয়া হয়েছে। মানুষটা এখন বেঘোরে ঘুমোচ্ছে। তখন রৌদ্র এসে প্রেসার মেপেছে সেজো চাচীর। সমসাময়িকের তুলনায় মাইমুনা বেগমের প্রেশার বেড়েছে বহুগুণ। তা দেখে রৌদ্র আর দেরি করলোনা। মাইমুনা বেগমের শত অনীহা থাকা স্বত্বেও তাকে একপ্রকার জোরজবরদস্তি করে সামান্য কিছু ফ্রুটস খাইয়ে দিয়ে ঔষধ দিয়েছে। মাইমুনা বেগম শত চেয়েও পারলেননা রৌদ্রকে থামাতে। ছেলেটা কি আর ওতো বারণ শোনে? ঠিকই নিজের কথাগুলো মানিয়ে ছেড়েছে তাকে দিয়ে। যার দরুন, এখন কিছুটা ঘুম ধরা দিয়েছে মানুষটার চোখের পাতায়।

বেলা কাঁটায় কাঁটায় ১২টার ঘরে…
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত নিজ কেবিনে বসে আছে রৌদ্র। হসপিটাল এসেছে এইতো মিনিট দশেক হবে হয়তো। এরইমধ্যে ডাক্তার সাহেবের কেবিনের দরজায় এসে হাজির ওয়ার্ড বয় — সৈকত। কেবিনের দরজাটা হালকা ফাঁক করে মাথা ঢুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটা। নম্র স্বরে খানিক মুচকি হেসে অনুমতি চেয়ে বলল,
“ স্যার আসবো?”
ডেস্কের ওপর সারি সারি পেশেন্ট ফাইল। একটার পর একটা খতিয়ে দেখছে রৌদ্র। ঠিক তখনি দরজার কাছ থেকে ভেসে আসা সৈকতের কন্ঠে তার দিকে না তাকিয়েই রৌদ্র বলে ওঠে,
“ এসো।”
অনুমতি পাওয়া মাত্রই কেবিনে ঢুকে সৈকত। গুটি গুটি পায়ে ডেস্কের সামনে এগিয়ে এসে দাঁড়ায়। তারপর হাত বাড়িয়ে পকেট থেকে একখানা খাম বের করে এনে এগিয়ে দেয় রৌদ্রের দিকে। রৌদ্র ফাইল ঘাটার একপর্যায়ে আড়চোখে দেখলো খামটা। পরক্ষণে গম্ভীর মুখে সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করে ওঠে,

“ কি এটা?”
সৈকত ঠোঁট উল্টায়। পরপর নির্লিপ্ত কণ্ঠে জবাব দেয়,
“ জানিনা স্যার! তবে আপনার বন্ধু এসে দিয়ে গেল এটা। বলল — আপনি এলেই যেন আপনাকে দিয়ে দেই।”
ভ্রু গোটায় রৌদ্র। তৎক্ষনাৎ সৈকতের বাড়িয়ে রাখা খামটা ছো মেরে নিয়ে নিলো নিজ হাতে। তড়িঘড়ি করে ব্যস্ত হাতে খামটা খুলতে খুলতে বলল,
“ তুমি এখন যেতে পারো।”

হুকুম তামিল করল সৈকত। নিরবে প্রস্থান ঘটালো কেবিন থেকে। এদিকে রৌদ্র ততক্ষণে খাম খুলে সেখান থেকে দু’পাতার একখানা চিঠি বের করে এনেছে। যা দেখতেই কপালের চামড়ায় ভাঁজ পড়ল ছেলেটার। খামের উপরাংশে লেখা ছিল রেহানের নাম। তবে একটা বিষয় কিছুতেই মাথায় ঢুকছেনা রৌদ্রের। রেহান তাকে হুট করে চিঠি লিখতে গেল কেন? ও তো চাইলেই তাকে কল করতে পারে। এহেন চিন্তায় মগ্ন থেকেই রৌদ্র চিঠির ভাঁজ খুলল। চোখে আটাঁ চিকন ফ্রেমের চশমাটা খানিক ঠেলেঠুলে দৃষ্টি ফেলল সফেদ রঙা কাগজের মসৃণ পৃষ্ঠে।
❝ রোদ! তুই হয়তো ভাবছিস, তোকে আমি এভাবে চিঠি লিখলাম কেনো? আসলে এখন এ নিয়ে কথা বলার সময় নয় ভাই। তোকে কিছু জরুরী কথা এখনি জানানো প্রয়োজন নাহলে হয়তো খুব বেশি দেরি হয়ে যাবে। তাই আমি এখন যেগুলো লিখছি সবটা মনোযোগ দিয়ে পড়বি।

আমার কাজিন যার মির্জা সায়ান মুগ্ধ, ও কোনো সাধারণ মানুষ নয়। ও হচ্ছে দি মোস্ট ওয়ান্টেড রাশিয়ান আন্ডারওয়ার্ল্ড কিং। রাশিয়া, কোরিয়া এবং আর-ও কিছু শক্তিশালী রাষ্ট্রে অবৈধ অস্ত্রপাচার, ড্রাগস লেনদেন, সে*ক্স পেডোফাইলসহ আরও নানান ধরনের অন্ধকার কাজের মূল হোতা সে। ওর জগতটা বড্ড অন্ধকার রোদ। ও সাধারণের মাঝে মুখোশ পড়ে থাকা ব্যাক্তি। আন্ডারওয়ার্ল্ডে যার নাম — দি শ্যাডো মনস্টার। যতদূর জানি, ওকে আজ অব্ধি কালো জগতের কেউ দেখেনি, তবে ভুলক্রমেও তাকে কেউ দেখে ফেললে অথবা তার আসল পরিচয় জেনে গেলে সে তাকে আর একমুহূর্ত জীবিত রাখেনা। তুই হয়তো জানিস আমি আমার মাস্টার্স প্রোগ্রাম সাউথ কোরিয়া থেকে কমপ্লিট করতে গিয়েছিলাম। কোরিয়ায় আমার তেমন কোনো পরিচিত না থাকায় আমি মুগ্ধদের ওখানেই থাকা শুরু করি। প্রথম প্রথম জানতাম না ওর বিষয়ে তেমন কিছু। তবে একদিন হঠাৎ ওর বাবা ড্রাঙ্ক অবস্থায় আমার কাছে সবটা বলে দেয়। বিশ্বাস কর ভাই, আমি তখনও বিশ্বাস করিনি কথাগুলো।

তাই আমি সেদিনই চলে গিয়েছিলাম মুগ্ধকে সরাসরি কথাটা জিজ্ঞেস করতে। কিন্তু আমি কি করে জানতাম, আমার সেদিনের ঐ উদ্যোগটাই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। আমি যখন মুগ্ধের ম্যানশনে গিয়েছিলাম সেদিন আমি সামনাসামনি পরোখ করেছিলাম এক জীবন্ত রাক্ষসের নৃশংসতা। ও একের পর এক মানুষকে নিজ হাতে জবাই করছিল রোদ। ওর বাড়ির সম্পূর্ণ লিভিং রুম জুড়ে সেদিন আমি দেখেছিলাম র*ক্তের বন্যা। অথচ মুগ্ধের চোখেমুখে ছিল একরাশ শান্তি, স্বস্তি। সে ঐ র*ক্তগঙ্গার মাঝে হাত-পা ছড়িয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে ছিল। ওমন ভয়ানক দৃশ্য দেখে আমি কয়েক মুহুর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। একমাত্র আমি-ই জানি সেদিন আমি কিভাবে নিজেকে বাঁচিয়ে এনেছিলাম ঐ নরক থেকে। তারপর… তারপর আমি আর কোরিয়ায় থাকিনি। মাস্টার্স প্রোগ্রাম অসমাপ্ত রেখেই ব্যাক করেছি বিডিতে।

সে-ই ঘটনার পর কেঁটে গেছে বহুবছর। আমিও ভুলে গিয়েছিলাম ঐ নৃশংস ঘটনার কথা। তবে ভাগ্য খারাপ হলে যা হয় আরকি! একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে হুট করেই আম্মুর কাছ থেকে শুনলাম — আমার কাজিন নাকি দেশে ফিরেছে। আমি তখনও জানতাম না আম্মু কার কথা বলছে। কিন্তু এরই মাঝে এক রাতের ঠিক সাড়ে তিনটায় আমাদের সিকদার বাড়িতে আগমন ঘটে মুগ্ধ এবং তার পরিবারের। তারা না-কি বাংলাদেশ এসেছে কার বিয়ের দাওয়াত খেতে। আমি সেদিন মুগ্ধকে দেখে এতোটাই ভয় পেয়েছিলাম যে সারারাত ঘর ছেড়ে বেরোইনি। পরদিন সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে আম্মুর মুখে শুনলাম — মুগ্ধ না-কি সাউথ কোরিয়ায় সফটওয়্যার কোম্পানিতে ইন্জিনিয়ার হিসেবে যোগদান করেছে। আমি কতোটা বোকা হলে ঐ কথাটা বিশ্বাস করে বসেছিলাম! ভেবেছিলাম মুগ্ধ হয়তো সবকিছু ছেড়ে ছুঁড়ে ভালো পথে এসেছে। তবে কথায় আছে না? কয়লা ধুলে ময়লা যায় না। ওর দশা হচ্ছে ওমন। ধীরে ধীরে জানলাম — মুগ্ধ ছাড়েনি ওর অন্ধকার জগত। উল্টো আর-ও গভীরভাবে জেঁকে বসেছে সবকিছু। ভাই তুই শুনলে শকড হবি যে মুগ্ধই আমার এক্সিডেন্টটা করিয়েছিল। ওর কাছে সম্পর্কের কোনো মূল্য নেই। ওর স্রেফ একটাই নীতি — মারো, কাটোঁ।

আমি এক’দিনে একটা জিনিস বেশ ভালোমতো বুঝতে পেরেছি আর সেটা হলো বাংলাদেশে সে কোনো সাধারণ কাজে আসেনি। এর পেছনে নিশ্চয়ই খুব জটিল কোনো কারণ আছে। তুই হয়তো জানিস না, মুগ্ধ আসার পর থেকেই এহসান পরিবারের সাথে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে বিভিন্ন ঝামেলা করেছে। এর সবচেয়ে বড় সাক্ষী হচ্ছে তায়েফ আঙ্কেল। উনি নিশ্চয়ই কিছু না কিছু জানে মুগ্ধের আসার ব্যাপারে। তবে কারো সাথে খোলাসা করেনি ব্যাপারটা। হয়তো তিনি জানতেন না যেই ছেলেকে তিনি সাধারণ পাতি-গুন্ডা ভেবেছে সে-ই ছেলে আসলে কে! আমি আরেকটা কথা ক্লিয়ারলি বলছি শোন ভাই — এট এনি কস্ট মুগ্ধ নিজের কাজ হাসিল করে ছাড়বেই। সেটা এহসান পরিবারকে ধ্বংস করে হলেও। কেননা যে-ই ছেলে তার কাজিনকে মেরে ফেলার চেষ্টা করতে দুবার ভাবেনি, সে কি আর অন্য কাউকে সহজে ছাড় দিবে?

রোদ! মুগ্ধ এবার টোপ বসিয়েছে মাহির ওপর। ও মাহিকে শিকার বানিয়ে নিজের কাজ হাসিল করতে চাইছে। তুই যেভাবেই হোক, মাহিকে প্রোটেক্ট কর। মুগ্ধের আড়াল কর মেয়েটাকে। শুনে রাখ ভাই, এদেশের আইন ওকে আটকাতে পারবেনা কেননা তারা অলরেডি বিক্রি এসবের ধারে। তাই বলছি মাহিকে যেভাবেই হোক বাঁচা। মেয়েটা বড্ড নাজুক ভাই। বড্ড নাজুক।

[ তোকে কথাগুলো ফোনে অথবা মেইলে বলতে পারতাম তবে আমার ফোন, ল্যাপটপসহ বাড়ির সবার স্মার্ট ডিভাইস গুলো অলরেডি হ্যাকড। এন্ড আই থিংক ইউ গেটা নো এসব কে করতে পারে। শোন ভাই, মুগ্ধ আমাকে একারণেই মারতে চেয়েছিল যেন আমি এহসানদের ওর ব্যাপারে না বলি। ওর রাস্তায় বাঁধা না হই। তাই আমি ইচ্ছে করেই তোদের কাছ থেকে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করার নাটক করে যাচ্ছি এক’দিন। আমায় মাফ করে দিস ভাই। তোরা সবাই আমার আপন। আমার জন্য তোদের কোনো ক্ষতি হোক সেটা আমি কক্ষনো চাইব না। কখনো না। গত সপ্তাহে মুগ্ধ আমায় হুমকি দিয়ে বলেছে আমি যদি আমার শ্যামবতী এবং রাহিলকে বাঁচাতে চাই তাহলে যেন অতি শীঘ্রই এদেশ ছেড়ে চলে যাই। আমার মাথাটা এখন টোটালি হ্যাং রোদ। আমি কি করব কিচ্ছু বুঝতে পারছিনা। আমি বোকার মতো ফ্লাইটের টিকেট বুক করে ফেলেছি। জীবনের এই একটা পর্যায়ে এসে আমি বড্ড স্বার্থপরের মতো কাজ করেছি ভাই। এক্ষেত্রে তুই আমার স্বার্থপর বললেও পারিস। আমি শুধুমাত্র নিজের বউ-বাচ্চার কথা ভেবেছি। কাল আমার ফ্লাইট রোদ। আমি আমার রাহিল আর শ্যামবতীকে নিয়ে আগামীকালকেই পাড়ি জমাচ্ছি ইংল্যান্ডে। পারলে আমায় মাফ করে দে ভাই। আব্বা-আম্মার সঙ্গে চোখ জোড়া দেবার মতো মুখ নেই আমার। তাদেরকে বলিস আমায় যেন পারলে ক্ষমা করে দেয়। রোদ! তোকে আমি সারাজীবন নিজের ভাই ভেবে এসেছি। তাই বলছি দয়া করে মাথা গরম করবিনা। মুগ্ধ ভালো মানুষ নয়, আর নয় সাধারণ কেউ। তাই আগ বাড়িয়ে ওর সাথে দ্বন্দে যাস না কিন্তু। কেননা ওর কোনো দূর্বলতা না থাকলেও তোর, আমার আমাদের সবার আছে। আর ও আমাদের এই দূর্বলতাগুলোকেই কাজে লাগাবে। তাই নিজের প্রিয় মানুষদের সর্বোচ্চ খেয়াল রাখ ভাই।❞

পুরোটা পড়ার পর মাথা ফাঁকা হয়ে গেল রৌদ্রের। আনমনে হাত থেকে চিঠিটা খসে পড়ল ডেস্কের ওপর। হঠাৎ করেই তার মস্তিষ্ক বেজে উঠল রেহানের স্রেফ একটা কথাই — ওর কোনো দূর্বলতা না থাকলেও আমাদের আছে! রৌদ্রের টনক নড়ে এবার। চোখের সামনে তৎক্ষনাৎ ভেসে ওঠে প্রিয় মানুষদের মুখগুলো। কার সঙ্গে লড়বে সে? একটা পাথুরে মানুষের সাথে? সে নাহয় লড়াই করবে। ভাগ্যক্রমে নিজের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে হারাবে মুগ্ধকে তবে পরবর্তীতে মুগ্ধ যে তার পরিবারকে কিছু করবে না তার গ্যারান্টি কী? রৌদ্র পড়ল দ্বিধা দ্বন্দ্বে। গম্ভীর মুখে পিঠ এলিয়ে বসলো চেয়ারে। একহাতের কনুই ঠেকালো চেয়ারের হাতলে। পরক্ষণে ভাবতে লাগল গতকালের কথা। ছেলেটাকে যেভাবে মেরে এসেছে, এতে সে নিশ্চয়ই হসপিটালাইজড। আপাতত কয়েকদিন হসপিটালেই থাকবে সে। এই সুযোগটাই কাজে লাগাতে হবে রৌদ্রের। রৌদ্র ভাবনা শেষে তৎক্ষনাৎ উঠে দাঁড়ায়। একহাতের বাহুতে এপ্রন, গলায় স্টেথোস্কোপ ঝুলিয়ে জোরালো পায়ে বেরিয়ে যায় কেবিন থেকে। ওদিকে তাকে ওমন ছুটতে দেখে পেছন থেকে সৈকত বলে ওঠে,

“ স্যার! ওয়ার্ড নম্বর..”
বাকিটা বলার আর সুযোগ হলোনা সৈকতের। তার আগেই রৌদ্র কেমন ভরাট কন্ঠে বলে ওঠে,
“ ডিউটি অন্য কাউকে শিফট করাও। আই হেভ টু গো।”
অগত্যা এমন কথায় চুপসে গেল সৈকত। গলা অব্দি এসে আঁটকে যাওয়া কথাগুলো পানি ছাড়াই গিলে নিল কোনরকমে। পরক্ষণে মুখ ভেংচি কেটে বিরবিরিয়ে বলল,
“ নবাবজাদা এলো বারোটায়,আবার চলেও গেল হনহনিয়ে। একটু চারপাশে নাম হয়ে গেলেই ডাক্তারদের ভাব বেড়ে যায় কত! হুহ্।”

“ হ্যালো? হ্যালো? স্যার আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন?”
ঘুম ঘুম চোখে হাত ডলছে তৌকির মির্জা। দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামবার যোগাড় অথচ মহাশয় কি-না এখনো নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। তার ওতো সাধের ঘুমটায় হঠাৎ বুড়ো আঙুল ঢুকালো হসপিটালের রিসিপশনিস্ট। বাজখাঁই শব্দে বাজতে থাকা ফোনটা কুড়িয়ে এনে কানে ঠেকাতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো যুবতী নারীর কন্ঠ! যা কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই ঘুম হালকা হলো তৌকির মির্জার। লম্বা একটা হামি টেনে বললেন,
“ শুনছি! আগে বাড়ুন।”
ওপাশের ব্যাক্তি খানিক ঢোক গিললো মনে হচ্ছে! কন্ঠে একরাশ বিচলিত ভাব ঢেলে ব্যস্ত গলায় না থেমে বলতে লাগলেন,

“ কাল আপনি যেই পেশেন্টকে এডমিট করে গিয়েছিলেন সে-তো হসপিটাল থেকে চলে গিয়েছে। আমরা তাকে বেশ কয়েকবার আটকানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি। আপনি প্লিজ তারাতাড়ি আসুন এখানে।”
ভড়কায় তৌকির মির্জা। এতক্ষণের ঘুমু ঘুমু ভাবটা তার কেটে গেল মুহুর্তেই। তিনি তৎক্ষনাৎ ফোন কাটলেন ব্যস্ত হাতে। এক লাফে বিছানা থেকে নেমে ছুটে গেলেন ওয়াশরুমে। মুগ্ধ আবার এসময় কোথায় গেল কে জানে! এ ছেলেকে নিয়ে তার হয়েছে যত জ্বালা!

ধুপধাপ পা ফেলে বাড়ির ড্রয়িং রুমে উপস্থিত রৌদ্র। গম্ভীর মুখাবয়বের শক্ত চাহনি নিক্ষেপ করছে এদিক-ওদিক। পরক্ষণেই গলা উঁচিয়ে ডেকে ওঠে সবাইকে,
“ আব্বু! আম্মু! মেজো মা, মেজো আব্বু। কোথায় তোমরা? এক্ষুণি বাইরে এসো।”
এহেন কন্ঠ পেয়ে মিনিটের ব্যাবধানেই হন্তদন্ত পায়ে ছুটে এলেন সকলে। জুবাইদা বেগম সে-কি উদ্বিগ্ন ছেলের ওমন হাঁক ডাকে। এগিয়ে এসে চিন্তিত গলায় শুধালেন,
“ কি হয়েছে আব্বা? এভাবে সবাইকে একসাথে ডাকলে যে?”

রৌদ্র মুখ খুলেনি আপাতত। অপেক্ষা করছে বাদবাকি মানুষজনদের। বয়োজ্যেষ্ঠরা চলে এলেও আহি, মাহি এবং অরিন এখনো লাপাত্তা। ইকরা তো এখনো বাবার বাড়ি। মেয়েটার যা শরীর খারাপ! ডাক্তার দেখিয়েছে ইতোমধ্যে। খবর এসেছে মেয়েটার নাকি ফুড পয়জনিং হয়েছে। কয়েকটা দিন থাকবে বাবার বাড়ি। ওদিকে অনিক এখনো অফিসে। ছেলেটা তো পরের চাকরি করে। তার কি আর হুটহাট ছুটি মিলে? বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠ পুরুষ সদস্যরা আজ বাড়িতেই আছেন। কেন আছেন তা তারাই ভালো জানেন। প্রায় মিনিট দুয়েক পর আহি,মাহিও ছুটে এলো ড্রয়িং রুমে। তবে অরিন এখনো এসে পৌঁছায়নি। এতে বুঝি গম্ভীর পুরুষ বেজায় চটলেন। কোমরের ওপর দু’হাত ঠেকিয়ে শক্ত চাহনি নিক্ষেপ করলেন দোতলার দিকে। গলা উঁচিয়ে কাঠকাঠ কন্ঠে বলতে লাগলেন,

“ অরি!!!! তোকে নিচে নামানোর জন্য পালকি লাগবে?”
কথাটা ছুঁড়তে দেরি ওমনি দোতলার করিডর দিয়ে ছুটতে দেরি হলোনা অরিনের। মেয়েটা কেমন ঝড়ের বেগে ছুটে আসছে এদিকে। পরনের কটন থ্রি পিসের প্রায় অনেকটা জায়গায় ভেজা ভেজা অবস্থা। চুলগুলো আঁটকে রেখেছে মোটা তোয়ালেতে। মেয়ে বোধহয় মাত্রই গোসল সেরে ছুটে এসেছে। হন্তদন্ত পায়ে ড্রয়িং রুমে এসে দাঁড়ালো অরিন। হকচকিয়ে জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ জ্বি?”

শক্ত চোখে তাকিয়ে আছে রৌদ্র। দাঁত করছে কিড়মিড়। চোয়াল ফুটেছে ধারালো ব্লেডের ন্যায়। রৌদ্র কেমন একদৃষ্টিতে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থেকে এগিয়ে আসে দু-কদম। অরিন ভড়কায়। ক্ষনে ক্ষনে ঢোক গিলে পিছিয়ে যায় একটুখানি। রৌদ্র তখন খেই হারিয়ে দিলো এক ধমক!
“ সেদিন বাড়িতে কি হয়েছিল?”
চমকায় সকলে। মুখ চাওয়াচাওয়ি করে একে অপরের। জুবাইদা বেগম আগ বাড়িয়ে ছেলেকে কিছু বলতে নিলেই হাত উঁচিয়ে বাঁধ সাধলো রৌদ্র। সামান্য ঘাড় বাকিয়ে ঠোঁটের কোণে তর্জনী চেপে মা’কে হিসহিসিয়ে বলল,
“ আমার বউজানের সাথে কথা বলছি। ডু নট ইন্টারাপ্ট।”
হতভম্ব বাড়ির সবাই। জুবাইদা বেগম পলক ফেলতে ভুলে গেলেন যেন। কবির সাহেব খানিক গলা খাঁকারি দিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠেন,

“ তাহলে দু’জন ঘরে গিয়ে কথা বলো। এখানে সবার সামনে…!”
“ কেনো? ঘরে গিয়ে মিথ্যাটা গুছিয়ে বলতে পারবে তাই?”
ত্বরিত বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকায় অরিন। ভয়ার্ত ঢোক গিলে কাঁপছে রীতিমতো। মানুষটা তাহলে টের পেয়ে গিয়েছে সে মিথ্যা বলেছে তার সঙ্গে। অরিন একবার কবির সাহেবের দিকে অসহায় চোখে তাকায়। কবির সাহেব চেয়েও কিছু বলতে পারছেননা এমুহূর্তে। ওদিকে রৌদ্র মেজাজ হারাচ্ছে ধীরে ধীরে। তৎক্ষনাৎ নড়েচড়ে দাঁড়ালো ড্রয়িং রুমের মাঝখানে। আগের ন্যায় শক্ত গলায় তায়েফ সাহেবকে জিজ্ঞেস করল,
“ মুগ্ধের সাথে তোমার কিসের শত্রুতা?”
হকচকান তায়েফ সাহেব। চমকে ওঠা দৃষ্টিতে তাকালো একপলক। পরক্ষণে আড়চোখে ভাইজানের পানে দৃষ্টি ফেলতেই কবির সাহেব কি যেন একটা ইশারায় বোঝালেন তাকে। তায়েফ সাহেব বিচক্ষণতার সঙ্গে বুঝে গেলেন যা বোঝার। তিনি কেমন আমতা আমতা সুরে আওড়ালেন,
“ ক-কে মুগ্ধ?”
এবারে যেন মাথাভর্তি জ্বলতে থাকা আগুনে ঘি পড়ল রৌদ্রের। সে তৎক্ষনাৎ দাঁতে দাঁত চেপে অধিক কঠোর গলায় বলল,

“ নাটক করোনা চাচ্চু। তুমি এসব নাটকে ভীষণ কাঁচা!”
চোর ধরা পড়ে গেলে কাচুমাচু করে যেমন, তায়েফ সাহেবের হাবভাব হয়েছে তেমন। তিনি খানিকক্ষণ চুপ থেকে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললেন। বুকের মাঝে জমে থাকা কষ্টটুকু উগড়ালেন পরমুহূর্তে।
“ চারমাস আগে চট্টগ্রাম নদী বন্দরে বেশ কিছু কনটেইনার এসেছিল যার না ছিল কোনো ধরনের লিগ্যাল কাগজপত্র, আর না ছিল মালিকের সন্ধান। আমার তত্বাবধানে সেসব কনটেইনারকে জব্দ করা হয়। জব্দ করার পর থেকেই নাম না জানা বিভিন্ন সোর্স থেকে আমাকে হুমকি-ধমকি দেওয়া হতো কিন্তু আমি কোনো কিছুতেই টলিনি। আমি কনটেইনারের কাগজপত্র গুলো আদালতে পেশ করতে চেয়েছিলাম। তবে এরইমধ্যে একদিন জানতে পারি ঐসব কনটেইনারের মাঝে রয়েছে কোটি কোটি টাকার অবৈধ অস্ত্র। তাও আবার রাশিয়া থেকে এসেছে। বাংলাদেশের নদী পথ দিয়ে যাচ্ছিল কোথাও। আরেকটু তদন্ত করে জানতে পারি, একটা অচেনা কোডবিশিষ্ট ব্যাক্তি এসবের পেছনে জড়িত। এই খবর আমার কাছে যেই কাস্টম অফিসার পৌঁছিয়েছিলেন, সন্দেহাতীতভাবে তিনি হঠাৎ লাপাত্তা হয়ে গেলেন। এমনকি তার পরিবারও। এরপর একদিন দেখলাম ঐ মুগ্ধ চলে এলো। সামান্য একটা ফাইলের জন্য আইনমন্ত্রীর বাড়িটাকেই পুড়িয়ে ফেলতে চেয়েছিল। আমার চাকরিটা নাই হবার পেছনেও ও দায়ী।”
সম্পূর্ণ বিবৃতি বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনলো রৌদ্র। পরক্ষণে হঠাৎ সন্দিহান গলায় শুধালো,

“ তাহলে সেদিন আমাদের বাসায় এসে ভাংচুর চালিয়েছিল কেন?”
তায়েফ সাহেবের কন্ঠ কাঁপছে এপর্যায়ে। তিনি মুখ হা করে নিশ্বাস ফেলতে লাগলেন ক্রমাগত। সময় নিয়ে চিড়বিড়িয়ে বলল,
“ ঐ জানোয়ারের বাচ্চা এসেছিল আমার এক মেয়ের জন্য নিজের সম্বন্ধ পাকাপোক্ত করতে। ওর কতবড় সাহস ও আমার আহিকে…”
“ ঐ লোক আমার জন্য নয় আব্বু মাহির জন্য এসেছিল!”
তায়েফ সাহেবের কথার পিঠে বলে ওঠা আহির ওমন বাক্যে একপ্রকার নিরব বিস্ফোরণ ঘটে গেল এহসান বাড়ির ছাঁদের তলায়। তায়েফ সাহেব স্তব্ধ চোখে তাকিয়ে রইলেন মেয়ের পানে। মাইমুনা বেগমের চোখ শুকিয়ে গেছে। মানুষটা কেমন স্থির হয়ে গেলেন এরূপ কথায়। ওদিকে মাহি নিজেকে গুটিয়ে ফেলেছে বেশ খানিকটা। চশমাপরা ছোট্ট মুখখানায় লেপ্টে গেছে ভয়ের ছাপ। এদিকে তায়েফ সাহেব নিজেকে সামলালেন কোনমতে। রয়েসয়ে আহিকে জিজ্ঞেস করলেন,

“ তুমি এতোটা শিওর কিভাবে হলে?”
আহি নির্লিপ্ত কণ্ঠে জবাব দেয়,
“ কারণ আমি এর আগেও ঐ লোককে মাহির সাথে কথা বলতে দেখেছি। যেখানে ঐ লোক আমায় দেখেও অদেখা করেছে, সেখানে মাহির সাথে যেচে পড়ে কথা বলেছে। মাহির প্রতি তার কনফিডেন্স খুব বেশি!”
এরূপ কথায় আকাশ ভেঙে পড়ল মাইমুনা বেগমের মাথায়। মানুষটা কেমন বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকালেন মাহির পানে। থমথমে মুখে কদম বাড়িয়ে চলে এলেন মেয়ের মুখোমুখি। থমথমে কন্ঠে আওড়ালেন,
“ আহি যা বলল তা কী সত্যি? তুই আগে থেকে চিনতি ঐ ছেলেকে?”
নিরব মাহি শুকনো ঢোক গিললো বেশ কয়েকবার। শুকনো হয়ে আসা অধরজোড়া জিভ দিয়ে ভিজিয়ে নিল খানিকটা। আমতা আমতা করে যেইনা মুখ খুলবে ওমনি মাইমুনা বেগম চিৎকার দিয়ে বললেন,
“ শুধু হ্যা বা না বল!”

মাহি ছলছল চোখ তুলে তাকায় মায়ের পানে। বলার মতো অনেক কথা থাকলেও আপাতত কেন যেন কথাগুলো গলা অব্ধি এসে আঁটকে গিয়েছে তার। না পারছে ঢোক গিলতে, আর না পারছে মুখ ফুটে কিছু বলতে। মেয়েটা শুধু নিরবে ওপর নিচ মাথা নাড়ায়। তা দেখতেই হিতাহিত জ্ঞান হারালেন মাইমুনা বেগম। তৎক্ষনাৎ দু’হাতে চেপে ধরলেন মেয়ের গলা। এহেন আকস্মিক কান্ডে হকচকিয়ে ওঠে সবাই। রৌদ্র কোনরূপ কালবিলম্ব ছাড়া ছুটে আসে মাইমুনা বেগমের দিকে। আপ্রাণ চেষ্টায় মাইমুনা বেগমের হাতদুটো ছাড়িয়ে নিয়ে আগলে ধরে মাহিকে। ওদিকে মাইমুনা বেগম ফনা তোলা সাপের ন্যায় ফুঁসছে রীতিমতো। জুবাইদা বেগম এবং রাফিয়া বেগম ঝাপটে ধরেও আঁটকাতে পারছেনা তাকে। তিনি সবাইকে ছাপিয়ে তেড়েফুঁড়ে আসতে চাইছেন মেয়েকে মারতে। রাগে গজগজ করতে করতে বলছে,

“ ছাড়ুন আমায়! আজকে ওকে আমি মেরেই ফেলব। ওর কতবড় সাহস, ঐরকম একটা বেজন্মার সাথে কথাবার্তা চালিয়েছে। আমি আরো বলি আমার মেয়ে ছোট! দুনিয়ার আও-ভাও বোঝেনা সে। অথচ আমি কতবড় বোকা দেখো! আমার নাকের নিচ দিয়ে ও কি-না ঐ জানোয়ারের বাচ্চার সাথে কথা বলেছে।”
মাহি কাশছে অনবরত। কাশতে কাশতে চোখ উল্টে যাচ্ছে মেয়ের। রৌদ্র তৎক্ষনাৎ ব্যস্ত হলো মাহির জন্য। দু’হাতে মাহিকে পাঁজা কোলে তুলে বড় সোফায় শুইয়ে দিল আলগোছে। তারপর মেয়েটার মাথা সামান্য উঁচুতে ধরে বলতে লাগলো,
“ নিশ্বাস নে মাহি! টেক আ ব্রিথ।”
নিরব কষ্টে চোখ বেয়ে অঝোরে অশ্রু ঝরছে মাহির। মেয়েটা নিশ্বাস নিতে পারছেনা। রৌদ্র কেমন অস্থির হচ্ছে! মেয়েটার মাথাটা আগের ন্যায় ধরে রেখে ফের বলছে,
“ টেক আ ব্রিথ মাহি।”
ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে মাহি। নিশ্বাস টানছে জোরালো ভাবে। ওদিকে ততক্ষণে মাইমুনা বেগম ছাড়া পেয়েছেন একটুখানি। আর ওমনি মানুষটা তেড়ে এলেন মেয়েকে মারতে। শক্তপোক্ত হাতের থাবা মেয়ের দিকে বাড়াতেই সে-ই হাত খপ করে চেপে ধরে রৌদ্র। তার একহাতে আগলে আছে মাহি। মেয়েটাকে নিজের বাহুতে লুকিয়ে রেখেছে সে। আরেকহাতে আঁটকেছে চাচীর হাত। রৌদ্র কেমন কটমট করতে করতে বলে ওঠে,

“ এই ভুল আর একবারও করতে এসো না কাকিয়া। কেননা আরেকবার এমনটা হলে আমি হয়তো নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলব।”
অগত্যা এমন শক্ত বাক্যে থমকে গেলেন মাইমুনা বেগম। পরক্ষণে বুক ভাসিয়ে কাঁদতে লাগলেন মানুষটা। কাঁদতে কাঁদতে হাঁটু ভেঙে বসে পড়লেন ফ্লোরে। নিজের কপালে নিজেই সপাটে থাপ্পড় বসাতে বসাতে বলতে লাগলেন,
“ কি দোষ ছিল আমার ফুলগুলোর? কেন ওদের দিকে ওমন একটা শয়তানের নজর পড়ল? কেন পড়ল আল্লাহ!”
মায়ের ওমন আহাজারিতে বুক ভার হয়ে গেছে মাহির।

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ২৪

রৌদ্রের বুকে মাথা লুকিয়ে কেঁদে যাচ্ছে মেয়েটা। ওদিকে তায়েফ সাহেব হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন মেঝেতে। হঠাৎ এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় আঁতকে ওঠেন বাড়ির লোকজন। রৌদ্রও তৎক্ষনাৎ ছুটে গেল মাহিকে ছেড়ে। মাইমুনা বেগম নিজ কান্না ভুলে স্বামীর জন্য ব্যস্ত হলেন পরমুহূর্তেই। সাব্বির সাহেব ছুটে এসে ভাইকে সোজা করতেই দেখলেন — তায়েফ সাহেবের নাক ফেঁটে র*ক্ত গড়াচ্ছে। তিনি তৎক্ষনাৎ আঁতকে ওঠে রৌদ্রকে বললেন,
“ রোদ! র*ক্ত!”

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ২৬