স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৪০
সানজিদা আক্তার মুন্নী
ঘরের এক অন্ধকার কোণে দেওয়ালের সাথে প্রায় মিশে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তৃষ্ণা। তার সর্বাঙ্গ বেতসের মতো থরথর করে কাঁপছে, কপালে বিন্দু বিন্দু জমছে ঠান্ডা ঘাম। অবশ্য এই তীব্র আতঙ্কের কারণ নেহাত অমূলক নয়, বরং সেই ভয়াবহ কারণটি তার চোখের সামনেই জ্বলজ্বল করছে। ঘরের ঠিক মাঝখানে রাখা চামড়ার সোফায় চরম আয়েশে গা এলিয়ে বসে আছে ওয়াসেম। তার সামনের কাঁচের টি-টেবিলের ওপর রাখা দুটো জগ। একটিতে কড়া গন্ধযুক্ত মদ, আর অন্যটিতে টকটকে লাল, গাঢ় টাটকা রক্ত! রক্তটা কোনো হতভাগ্য মানুষের নাকি কোনো বন্য পশুর, তা ভেবেই তৃষ্ণার শিরদাঁড়া বেয়ে এক শীতল স্রোত নেমে যায়। চরম নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ওয়াসেম মদ আর রক্ত একসাথে মেশাচ্ছে। তারপর এক অদ্ভুত পৈশাচিক তৃপ্তিতে গ্লাসের পর গ্লাস সেই গাঢ় তরল গলার নিচে চালান করে দিচ্ছে। সেদিন তৃষ্ণার জ্ঞান হারানোর পর ভোরের দিকে যখন তার চোখ খোলে, বিছানায় সে নিজেকে একাই আবিষ্কার করে। ওয়াসেম তখন কোথায় উধাও হয়ে গিয়েছিল।
আর আজ, এই নিশুতি রাত দুটোর দিকে বাড়ি ফিরেই সে মেতে উঠেছে এই বীভৎস উল্লাসে! কই যায় কি করে? তৃষ্ণা বুঝে পায় না ওয়াসেমের জীবনের উদ্দেশ্য টা কী? কি জন্য সে এসব করে? মানুষের জীবনের তো একটা উদ্দেশ্য থাকে। ওয়াসেমের জীবনটা কেমন জানি কোনো কিছুরি ঠিক নেই। সব এলোমেলো বন্য পশুর মতো একটা জীবন পার করছে। নিজের পৈশাচিক তৃষ্ণা মেটানোর পর ধীরেসুস্থে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় ওয়াসেম। ভারী পদশব্দ তুলে সে একটু একটু করে এগিয়ে আসে তৃষ্ণার দিকে। তার চোখেমুখে এক আদিম বন্যতা। তৃষ্ণার ঠিক সামনে এসে সে দাঁড়ায়, ঠোঁটের কোণে ঝুলছে এক চিলতে শীতল, বাঁকা হাসি হিমশীতল গলায় ওয়াসেম তৃষ্ণা কে বলে ওঠে, “কী রে, এত ভয় পাচ্ছিস কেন? আমার বউ হয়ে থাকার খুব শখ, তাই না? এবার বল, আমি যে একজন রক্তখেকো, এই সত্যিটা জানার পরও কি তুই আমার সাথে থাকবি?”
ভয়ে তৃষ্ণার কণ্ঠনালী শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছে। দৃষ্টি মেঝের দিকে নিবদ্ধ রেখে, নিজের অস্তিত্বকে আরও গুটিয়ে নিয়ে সে মিনমিন করে বলে, “থাকব আপনি ছাড়া এই পৃথিবীতে আমাকে আশ্রয় দেওয়ার মতো যে আর কেউ নেই।”
এটা বলতেই ওয়াসেমের তীক্ষ্ণ পাল্টা প্রশ্ন ধেয়ে আসে ঠিক তীরের মতো, “আর যদি কেউ থাকত তাহলে?”
এই একটি প্রশ্নে তৃষ্ণার বুকের ভেতরটা শূন্যে আছড়ে পড়ে। আতঙ্কে তার হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন থমকে যাওয়ার উপক্রম হয়। এখন সে কী উত্তর দেবে? প্রশ্নটা বড্ড জটিল, এক মারাত্মক মনস্তাত্ত্বিক গোলকধাঁধা। মাথা নিচু রেখেই কাঁপা কাঁপা গলায়, ঢোক গিলে তৃষ্ণা বলে, “য.. য.. যদি থাকত… তাহলে বিষয়টা অন্য রকম হতো।”
কথাটি শুনেই ওয়াসেম হাত বাড়িয়ে শক্ত করে তৃষ্ণার কোমর খাবলে ধরে। হ্যাঁচকা টানে তাকে একেবারে নিজের পাঁজরের সাথে মিশিয়ে নেয়। এতে তৃষ্ণার মনে হয় তার শ্বাস ক্রমশ বন্ধ হয়ে আসছে। ইদানীং ওয়াসেমের এই অযাচিত স্পর্শগুলো তৃষ্ণাকে ভীষণ রকম অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। আগে তো ওয়াসেম ভুলেও তার দিকে ফিরে তাকাত না! আর এখন? হঠাৎ করেই তার আচরণের অদ্ভুত পরিবর্তন হয়ে গেছে। এই যে মাঝেমধ্যেই তৃষ্ণাকে নিজের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নেওয়া, তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা, কিংবা বিতৃষ্ণায় ভরা কণ্ঠে হলেও দুটো কথা বলা সবকিছুই তৃষ্ণার কাছে ভীষণ অচেনা ঠেকে।
ওয়াসেম এবার তৃষ্ণার কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে অত্যন্ত ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে, “কথা এড়াচ্ছিস? কথা কিন্তু এড়াতে পারবি না। বল, কী করতি?”
তৃষ্ণা একদম নিশ্চুপ। তার মুখ দিয়ে কোনো কথা সরে না। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা পাগলা ঘোড়ার মতো ধুকপুক করছে। শরীরটা থরথর করে কাঁপতে শুরু করেছে তার। ওয়াসেমের উষ্ণ নিঃশ্বাসগুলো তৃষ্ণার অবয়বে আছড়ে পড়ে তাকে ভেতর থেকে ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে। অনেক কষ্টে নিজের শরীরের ভারসাম্য বজায় রেখে দাঁড়িয়ে থাকে সে।তৃষ্ণাকে এভাবে নীরব থাকতে দেখে ওয়াসেম হঠাৎ করেই তৃষ্ণার কামিজের পেটের দিকটা টেনে ধরে বলে ওঠে, “দেখি, পেটে কোনো দাগ পড়ল কি না!”
ওয়াসেমের এমন অপ্রত্যাশিত আচরণে তৃষ্ণা ভয়ে ভীষণভাবে হকচকিয়ে ওঠে। ঘাবড়ে গিয়ে চট করে ওয়াসেমের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলে, “না, না! কিছু হয়নি।”
তৃষ্ণার এমন বাধাদানে ওয়াসেমের চোখের দৃষ্টি মুহূর্তে বদলে যায়। দপ করে জ্বলে ওঠে তার রাগের আগুন দাঁত চেপে সে বলে, “তুই কি আমাকে তোর পেট দেখতে দিবি না? বাধা দিচ্ছিস কেন? আমার তোর সবকিছু দেখার অধিকার আছে!”
‘অধিকার’ শব্দটা শুনতেই তৃষ্ণার বুকের ভেতরটা যেন দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে। যে মানুষটা কোনোদিন তাকে স্ত্রী হিসেবে সামান্যতম সম্মানটুকুও দেয়নি, সে আজ এসেছে অধিকার ফলাতে! একজন নারীর কাছে তার আত্মসম্মান আর সম্ভ্রমের চেয়ে বড় আর কী বা হতে পারে? এতদিন ওয়াসেম নিজের খেয়ালখুশিমতো যা ইচ্ছে তাই বলেছে, যা মনে চেয়েছে করেছে তৃষ্ণা মুখ বুজে সব সয়ে নিয়েছে, একটি কথাও ফেরায়নি। কিন্তু আজ ওয়াসেম তার সম্মান নিয়ে টানাটানি করছে। অধিকারের বুলি আওড়াচ্ছে, অথচ কোনোদিন স্ত্রীর মর্যাদা দেয়নি।
আজ আর তৃষ্ণা নিজেকে আটকে রাখতে পারে না। সোজা চোখ তুলে ওয়াসেমের চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের সমস্ত সাহস সঞ্চয় করে সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, “আপনি ঠিক কিসের অধিকারের কথা বলছেন?”
তৃষ্ণার এই অতর্কিত আর ধারালো প্রশ্নে ওয়াসেম আক্ষরিক অর্থেই তব্দা খেয়ে যায়। সত্যিই তো! কিসের অধিকারের কথা বলছিল সে? কার অধিকার? কীসের জন্য এই অধিকার? ওয়াসেমের কাছে এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। সে একপ্রকার থতমত খেয়ে যায়। তবে নিজের এই অপ্রস্তুত অবস্থাকে ঢাকতে আর প্রশ্নের দায় থেকে বাঁচতে সে হঠাৎ করেই তৃষ্ণাকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে নিজের কাছ থেকে দূরে ঠেলে দিয়ে চরম অবজ্ঞার সুরে বলে ওঠে, “আমার কাছ থেকে সর তুই! আর একদম আমার সামনে আসবি না। তুই একটা কুকুর!”
তৃষ্ণা খুব ভালো করেই জানত, ওয়াসেম এভাবেই উত্তর না দিয়ে পাশ কাটিয়ে যাবে। ধাক্কা খেয়েও নিজেকে দ্রুত সামলে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায় তৃষ্ণা তারপর কঠিন স্বরে উত্তর দেয়, “আমি যে কুকুর, তা তো আপনি ভালো করেই জানেন। তাহলে এই কুকুরের কাছ থেকে আপনি কিছু আশা করতে আসেন কেন?”
তৃষ্ণার কথাটা তপ্ত সীসার মতো ওয়াসেমের গায়ে ছ্যাঁত করে লাগে। তৃষ্ণার দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দাঁত কামড়ে ওয়াসেম উচ্চারণ করে, “তোর কাছ থেকে আমি কিছুই আশা করি না! ঐদিন রাগের মাথায় বেশি জোরে আঘাত করে দাগ বসিয়ে দিয়েছিলাম, তাই শুধু দেখতে চেয়েছিলাম। বুঝলি, জানোয়ারের বাচ্চা? আর কিছু না!”
কথাগুলো শুনে তৃষ্ণার ভেতরখানা অবর্ণনীয় এক যন্ত্রণায় গুমরে যায়। মন চাইছে ডুকরে কেঁদে উঠতে। কিন্তু মানুষের মন তো অনেক কিছুই চায়, বাস্তবে কি তার সবকিছু পূরণ হয়? হয় না। তাই তৃষ্ণা মাথা নিচু করেই পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। সে জানে, ওয়াসেমের কথার বেশি উত্তর দিলে বা প্রতিবাদ করলে ওয়াসেম হয়তো গায়ে হাত তুলবে। সেই মার খাওয়ার ভয়ে তৃষ্ণা বুক ফাটা আর্তনাদগুলো গলার কাছেই চেপে রাখে, আরও অনেক কিছু বলতে চেয়েও একটি শব্দও উচ্চারণ করে না।
তৃষ্ণাকে এভাবে নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ওয়াসেম আর কোনো কথা খুঁজে পায় না। হয়তো তার মন চাইছে আরও কিছু বলতে, কিন্তু কথা বাড়ানোর তো কোনো বাহানা বা প্রসঙ্গ দরকার, যা এই মুহূর্তে ওয়াসেমের কাছে নেই। তাই সে রাগে গজগজ করতে করতে হনহন করে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। তৃষ্ণা তার যাওয়ার পথের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। বুক চিরে বেরিয়ে আসে একটি দীর্ঘশ্বাস, আর সে মনে মনে নিজেকে বুঝাতে নিজেকে শান্ত করতে বলে ওঠে, “ আমার মতো এতিম আর অসহায় মানুষদের নিজস্ব কোনো আকাশ থাকে না, যেখানে মন খুলে একটু কাঁদা যায়। আমাদের অধিকার নেই দুঃখবিলাস করার, অধিকার নেই লোকচক্ষুর সামনে চোখের জল ফেলার। হাজারো কথার আঘাতেও টুঁ শব্দটুকু করতে নেই, বুক ফেটে গেলেও কাউকে বলা বারণ। বুকের ভেতরের দগদগে ক্ষতগুলো সযত্নে লুকিয়ে রেখে, সবার সাথে সবটা মানিয়ে নিয়ে শুধু নিঃশব্দে, নিভৃতে এক ছায়ার মতো আমাদের বেঁচে থাকতে হয়।”
আজ নির্বাচনের শেষ প্রচারণার দিন। দিনভর তুমুল ব্যস্ততা আর উত্তেজনার পর এখন উল্লাসের পালা। প্রচারণার সমস্ত ক্লান্তি ভুলে তৌসির আর তার বন্ধুরা হইহুল্লোড় করতে করতে বাড়ি ফেরে। বাড়ি ফিরেই শুরু হয় জমজমাট আড্ডা। আড্ডার মধ্যমণি হয়ে ওঠে বোতলের পর বোতল ‘লাল পানি’। একেকজন গলাধঃকরণ করছে গ্লাসের পর গ্লাস, আর নাযেম ও মিনহাজ তো মাত্রা ছাড়িয়ে একেবারে বেসামাল।
আজ তৌসিরকেও কেউ ছাড় দিচ্ছে না। সে বারবার মাথা নেড়ে “না, না, না” করে আপত্তি জানায়, কিন্তু কে শোনে কার কথা! সবাই মিলে জোর করে ধরে কয়েক ঢোঁক গিলিয়ে দেয় তাকে। আর ওই কয়েক ঢোঁক পেটে পড়তেই তৌসিরের ভেতরের সব জড়তা কেটে যায়, আগ্রহ জাদুর মতো বেড়ে যায়। যে তৌসির একটু আগে আপত্তি করছিল, সে-ই এখন এক জায়গায় বসে আস্ত তিন বোতল গিলে নেয়! এখন সবার নেশা একেবারে তুঙ্গে। নেশার ঘোরে কারও আর সোজা হয়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতা নেই, পা টলছে সবার। এর মাঝেই রুদ্র হঠাৎ সব ভুলে পাগলের মতো নাচতে শুরু করে দেয়।
রুদ্রকে দেখে তৌসিরও আর বসে থাকতে পারে না। সেও টলতে টলতে উঠে দাঁড়িয়ে নাচে যোগ দেয়। গ্লাসে থাকা মদটুকু এক ঢোঁকে গিলে নিয়ে তৌসির দাঁড়িয়ে গিয়ে হঠাৎ গলা ছেড়ে গাইতে শুরু করে,
> “ধীরে ধীরে চালাও গাড়ি,
> মাথা ঠান্ডা করে।
> ৮০-এর বেশি তুললে গতি,
> পড়বে গিয়ে খাদে।
> ধীরে ধীরে চালাও গাড়ি,
> ইঞ্জিন ভালো রবে।
> ৮০-এর বেশি তুললে বেশি,
> এক্সিডেন্ট হবে।
> ১০০ কিলো যাওয়ার পরে,
> ১০০ কিলো,
> ১০০ কিলো যাওয়ার পরে,
> রং চা খেয়ে আবার স্টার্ট দিবে…
> যত গুঁতাও কাজ হবে না, বন্ধ হয়ে যাবে,
> যত গুঁতাও কাজ হবে না, বন্ধ হয়ে যাবে।
> বিরতিহীনভাবে গাড়ি চালাইলে পরে,
> গাড়ি যাবে গরম হয়ে, মবিল বেশি খাবে।
> বিরতিহীনভাবে গাড়ি চালাইলে পরে,
> গাড়ি যাবে বন্ধ হয়ে, তৈল বেশি খাবে।”
গান গাইতে গাইতে আর পাগলাটে নাচতে নাচতে একসময় শরীরের সব শক্তি ফুরিয়ে আসে তৌসিরের। নেশা আর ক্লান্তিতে শরীর আর সোজা থাকে না। বাগান থেকে কোনোমতে হামাগুড়ি দিয়ে, মাটিতে শুয়ে-বসে, টলতে টলতে সে শেষমেশ ঘরের ভেতরে বসে।
ওদিকে ঘরের ভেতর নাজহা আলমারির সব কাপড় বের করে গোছাতে ব্যস্ত। গত দু’দিন জ্বরে ভুগে বিছানাতেই পড়ে ছিল। জ্বর পুরোপুরি না কমলেও, এখন বেশ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। ঠিক তখনই টলতে টলতে ঘরে প্রবেশ করে তৌসির। শব্দ পেয়ে নাজহা পিছনে ঘুরে তাকায়। বিয়ের পর এই প্রথম তৌসিরকে এমন বেসামাল অবস্থায় দেখছে সে। এক হাতে মদের বোতল, চোখ দুটো হালকা লালচে হয়ে আছে। পরনের সাদা লুঙ্গিটা কোমরে গোঁজা, গায়ের কালো শার্টটা একেবারেই এলোমেলো, আর চুলগুলো উষ্কখুষ্ক। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই চরম মাতাল অবস্থাতেও এই পুরুষটাকে নাজহার কাছে বড্ড মারাত্মক, এক ভয়াবহ রকমের আকর্ষণীয় বলে মনে হচ্ছে।মোহাবিষ্টের মতো কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকার পরই নাজহার ঘোর কাটে। সে বুঝতে পারে, তৌসির আকণ্ঠ নেশা করে ফিরেছে। রাগে দাঁত কিড়মিড় করে হাতের কাপড়টা বিছানায় ছুঁড়ে মারে নাজহা। তারপর সোজা এগিয়ে যায় তৌসিরের দিকে। ক্ষিপ্ত বাঘিনীর মতো খপ করে তৌসিরের শার্টের কলার চেপে ধরে সে, দাঁত চেপে হিসহিস করে ওঠে, “আপনি নেশা করেছেন কোন সাহসে?”
তৌসির বিরক্ত হয়ে নাজহার হাতটা নিজের গা থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে। নেশার ঘোরে সামনে দাঁড়ানো নাজহা কে চিনতে পারে না মনে করে কুঠিরের কোনো মেয়ে তাই বিরক্ত হয়ে জড়ানো কণ্ঠে বলে ওঠে, “এই ধুর মাগি, ছাড়! আমার বউ কই? আমার বউকে বল আইতে। আমার কৈতরি কই?”
নেশার তালে তৌসির অন্য কোনো মেয়ে ভাবছে তাকে! এ কথা বুঝতে পেরে নাজহার রাগ সপ্তমে চড়ে বসে। কলারটা আরও শক্ত করে ধরে সজোরে এক ঝাঁকুনি দেয় নাজহা চিৎকার করে বলে , “আমিই তোর বউ! কয় বোতল খাইছিস শালা, যে নিজের বউ চিনতে পারছিস না?”
গালিটা নাজহা দিতে চায়নি, রাগের মাথায় মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে। কিন্তু কথাটা শুনে তৌসির হাতের মদের বোতলটা এক পাশে নামিয়ে রাখে। তারপর আচমকাই দুই হাতে নাজহার কোমর শক্ত করে চেপে ধরে বলে, “তুই আমার বউ? কিন্তু আমার বউ তো আমার সাথে এত ভালো আচরণ করত না! তুই আমার এত কাছে কেমনে আইলি? নেশা-টেশা করলি নাকি?”
নিজে মদ গিলে এসে উল্টো নাজহাকে নেশার কথা জিজ্ঞেস করছে! অপমানে আর রাগে নাজহা ‘ঠাস’ করে এক চড় বসিয়ে দেয় তৌসিরের গালে আর রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলে, “বেহায়া! নির্লজ্জ! যখনি দেখেছি মেনে নিয়েছি, তখনি আসল রূপে চলে এসেছেন? থাকব না আমি আপনার সাথে!”
কিন্তু চড় খেয়েও তৌসিরের কোনো ভাবান্তর হয় না। বরং সে নাজহার কোমর আরও শক্ত করে নিজের দিকে টেনে নেয়। জোর করে নাজহার গালে, ঠোঁটে চুমু খেতে শুরু করে। মদের তীব্র বিশ্রী গন্ধে নাজহার ভেতরটা গুলিয়ে আসছে কি বিশ্রী গন্ধ। নাজহা চোখ মুখ কুঁচকে নেয়। চুমু খাওয়ার ফাঁকেই তৌসির মাতাল গলায় বলে ওঠে, “আমার সাথে থাকবি না তো কি তোর দাদার সাথে থাকবি? সাউয়ার সাউয়ার কথা কস কিতার লাগি? ছিনালগিরি কমায়া কর। তুই আমার বউ, আমার সাথেই থাকবি তুই।”
নাজহা নিজের সর্বশক্তি দিয়ে তৌসিরের কাঁধে, বুকে কিল-ঘুষি মারতে থাকে। তাকে নিজের থেকে সরিয়ে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলে, “সরুন আমার কাছ থেকে! সরুন! আপনাকে মেনে নেওয়াটাই আমার চরম ভুল ছিল। আপনি এক নাম্বারের একটা জঘন্য লোক! মদ-গাঁজা খান! সরুন বলছি আমার কাছ থেকে!”
কিন্তু তৌসির এক চুলও সরে না। উল্টো সে নাজহাকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের সাথে জাপটে ধরে। নাজহার গলায় মুখ গুঁজে দিয়ে ঘোরের ঘোরে বিড়বিড় করে, “একটু আদর করি না বউ… ও বউ… কৈতরি গো… ও কৈতরি… এমন করস ক্যান? আমি তো তোর জামাই, একটু চুমু দেই না।”
নাজহা রাগে আর অপমানে ফেটে পড়ে চিৎকার করে ওঠে, “না! দেবেন না চুমু! চাই না আমার এসব নোংরা আদর! আমাকে ছাড়ুন। আমি এক্ষুনি বাড়ি যাব। থাকব না আমি কোনো নেশাখোরের সাথে!”
তৌসির নাজহার কোনো কথাতেই কর্ণপাত করে না। নেশার ঘোরে আচ্ছন্ন সে, তৌসির এবার নিজের খেয়ালে নাজহার কামিজের ভেতর দিয়ে ওর উদরে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে মাতাল কণ্ঠে আধো আধো স্বরে বলে ওঠে, “একটা চুমু খাই তোমার পেটে?”
নাজহা চরম বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে সজোরে তৌসিরের হাতটা ঝেড়ে সরিয়ে দিয়ে তীক্ষ্ণ গলায় বলে, “না, লাগবে না চুমু খাওয়া! হাত আর মুখ সামলে রাখুন।”
তৌসির তাও দমে না নেশায় টলতে টলতে বলে, “খাই না একটা চুমু… ও বউ, খাই না একটা চুমু!”
“বললাম না! না মানে না।”
তৌসিরের মাতলামি আরও বেড়ে যায়। সে নিজের পায়ে ঠিকমতো দাঁড়াতেও পারছে না তারপরও টলতে টলতেই আবদারের সুরে বলে, “একটা চুমু খাইতে দে না কৈতরি… একটা চুমু খাই।”
এবার তৌসির নাজহার কোমর থেকে হাত সরিয়ে ওর দুই গাল আঁকড়ে ধরে। কোনো বাধা না মেনেই নাজহার গালে, নাকে আর ঠোঁটের কিনারায় একের পর এক গাঢ় চুমু বসাতে থাকে সাথে নেশাজড়িত ললিত কণ্ঠে বিড়বিড় করে বলে, “ও আমার ছিনাল গো, তুই এত সুন্দর ক্যান? তোরে এত মায়া লাগে ক্যান?”
কথাগুলো বলতে বলতেই নিজের খোঁচা খোঁচা দাড়িভর্তি গালটা নাজহার শুভ্র, তুষারকান্তি গালে ঘষতে থাকে সে। নাজহার পক্ষে এই নোংরামি আর সহ্য করা সম্ভব হয় না। মেনে নেওয়ার সীমা পার হয়ে যায়। সে সজোরে ধাক্কা দিয়ে তৌসিরকে নিজের কাছ থেকে ছাড়িয়ে নেয়। তারপর ক্ষিপ্র পায়ে খাটের পাশে রাখা টেবিলটার দিকে তেড়ে যায়। সেখান থেকে কাঁচের গ্লাসভর্তি পানি হাতে তুলে নিয়েই ঘুরে দাঁড়ায় তৌসিরের দিকে। কিছু না ভেবেই গ্লাসের পুরোটা পানি সজোরে ছুঁড়ে মারে তৌসিরের মুখে।
ছলাৎ করে এক পশলা ঠান্ডা পানি চোখে-মুখে লাগতেই তৌসিরের নেশার ঘোর কিছুটা কাটে। দু’হাতে নাক, মুখ আর কপালের ভেজা চুলগুলো মুছতে মুছতে চরম বিরক্তিতে চেঁচিয়ে ওঠে, “কোন মাগির পোলা পানি মারলো রে! এ কোন বাইনচু*** রে হালা!”
চোখ-মুখ মুছে সামনে তাকাতেই তৌসিরের বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে। চমকে গিয়ে দু’কদম পিছিয়ে যায় সে। বুঝতে পারে আজ কপালে অশেষ দুর্গতি আছে। সামনে সাক্ষাৎ রুদ্ররূপ ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে নাজহা। ওর তীক্ষ্ণ, রাগী দৃষ্টি তৌসিরকে ভস্ম করে দিতে চাইছে। রাগের তীব্রতায় নাজহার নাকের ডগা পর্যন্ত লালচে হয়ে আছে। নাজহার এই প্রলয়ংকরী রূপ দেখেই তৌসিরের ভেতরের সব মাতলামি উবে যেতে শুরু করে। কেন যে আজ নেশা করতে গিয়েছিল, সেই আফসোসে মনটা ভরে ওঠে। নাজহা তো আজ তাকে কাঁচা চিবিয়ে খাবে! মাতাল অবস্থায় সে কী কী উল্টোপাল্টা করেছে কে জানে! নিজেকে সামলে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে করতে তৌসির মনে মনে ডাকে, “আল্লাহ, আমি ভালো হয়ে যামু, আইজকের মতো আমারে বাঁচাইয়া দেও!”
নাজহা ধীর পায়ে তৌসিরের দিকে এগিয়ে আসে, তবে ওর একেবারে কাছে যায় না। পাশ কাটিয়ে গিয়ে ঠাস করে শব্দ করে ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দেয়। তারপর ফিরে এসে একেবারে তৌসিরের মুখোমুখি দাঁড়ায়। বুকে দু’হাত গুঁজে, ধ্বংস করে দেওয়ার মতো রাগী চোখে তৌসিরের মুখপানে তাকিয়ে থাকে সে। তৌসির আমতা-আমতা করে নিজের মাথায় হাত বোলায়। নার্ভাস ভঙ্গিতে এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে বলে, “আমার দিকে এমনে তাকাচ্ছো ক্যান? ঐ একটু চাচারা ধরে খাইয়ে দিছিলো আরকি…
এ কথা শুনে নাজহার রাগের পারদ আরও চড়ে যায়। হাত বাড়িয়ে শক্ত করে তৌসিরের পাঞ্জাবির কলার চেপে ধরে সজোরে এক ঝাঁকুনি দেয় সে। রোষকষায়িত কণ্ঠে ফেটে পড়ে, “চাচারা মরতে বলবে আর আপনি মরে যাবেন? মেনে নিয়েছি বলে একেবারে ঘাড়ে উঠে বসেছেন? যখন যা ইচ্ছে তাই করবেন? আমি থাকব না আপনার সাথে!”
নাজহার এই কথায় তৌসিরের মুখের রেখাগুলো বদলে যায়। সে শান্তভাবে নাজহার দুই গালে হাত রাখে। নাজহার সবুজ চোখের গভীরতায় দৃষ্টি নিবদ্ধ করে মৃদু অথচ গম্ভীর গলায় বলে, “আমি ছাড়া তোর গতি আছে? আমি ছাড়া তুই কার সাথে থাকবি? এই ছোটখাটো বিষয় নিয়া এমনে কথা কবি না বলে দিলাম, থুঁতা ফাইড়া নিমু কিন্তু! ভুল হয়ে গেছে, একটু খাইয়া নিছি… এতে ছাড়ার কথা কস ক্যান? দুইটা মাইরা নিস, ভুল হইলো দুই-চারটে মাইরা নিস, তাও এসব কইস না। কলিজা হু হু করে কেঁপে ওঠে এই কথা শুনলে।”
নাজহা সজোরে তৌসিরের হাত সরিয়ে দেয়। কলার ছেড়ে দিয়ে ওকে ধাক্কা মেরে দূরে সরিয়ে দেয়। দাঁত চেপে হিসহিস করে বলে, “আসল রূপ এখন বের হচ্ছে! আজ নেশা করে এসেছেন, কাল গাঁজা খেয়ে আসবেন! এসে মারধর করবেন, পরশু নারী নিয়ে আসবেন,,,,”
ব্যাস, নাজহা আর কিছু বলার আগেই তৌসির ওকে থামিয়ে দেয়। ওর স্বর এবার বেশ কঠোর, “এই থুঁতা সামলা! যা ইচ্ছা কইয়া নে, কিন্তু আমার লগে কোনো মাইয়ারে জুড়িস না। মাগিবাজ পুরুষ এই তৌসির শিকদার না।”
তৌসিরের কণ্ঠের এই কদর্য ভাষা আর বিস্বাদ কলুষতা নাজহার সমস্ত সত্তায় কালকূট বিষের মতো এক অসহ্য তিক্ততা ছড়িয়ে দেয়। নাজহা এই নোংরামি আর সহ্য করতে পারে না। চরম অবজ্ঞায় দু’হাতে জোর ধাক্কা দেয় তৌসিরের কাঁধে। শিরায় শিরায় বয়ে চলা শিহরণ জাগানিয়া রোষে সে বলে ওঠে, “আপনি আমার কাছ থেকে সরুন! আপনাকে আমার সহ্য হচ্ছে না। আপনি আমার সব আশায় পানি ঢেলে দিয়েছেন! আমি ভেবেছিলাম সব ভুলে একটা সুন্দর জীবন আপনার সাথে শুরু করব, আর আপনি এসব করে বেড়াচ্ছেন!”
নাজহার এমন বাঁধভাঙা রাগ দেখে তৌসির ওকে শান্ত করার জন্য শক্ত করে ওর কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের কাছে টেনে নেয়। আকুল স্বরে বলে, “নাজহা, আমি নেশাখোর না। বুঝছিস না ক্যান? ওরা আমারে জোর করে খাইয়ে দিছে। আর খামু না… কসম, আর খামু না! তোর যখন এত অসুবিধা, তাইলে আর খাইলাম না এই সাউয়ার কালা পানি।”
নাজহা তীব্র অভিমানে ফুঁসে ওঠে ধারণ করে, “না, খান! যান, আরও খান! আমি কে যে আমার কথা শুনবেন? এতদিন ধরে কিছু বলছি না বলে একেবারে মাথায় চড়ে বসেছেন! শুনে রাখুন, আমি আপনার ওপর নির্ভরশীল হওয়ার মতো মেয়ে নই। আমি তালুকদারের রক্ত, সেটা ভালো করে মনে রাইখেন। বেশি তেড়িবেড়ি করবেন, তো চলে যাব। থাকব না এক মুহূর্তও! দুই চোখ যেদিকে যায় সেদিকে চলে যাব, কিন্তু আপনার সাথে আর না!”
নাজহার এই প্রচণ্ড রাগ কোনোভাবেই তৌসির আজ সামলাতে পারছে না। অন্যদিন হলে ঠিকই সামলে নিত, কিন্তু আজ নেশার ঘোরে সে নিজেই কাবু। তবে নাজহার বারবার এই ‘ছেড়ে চলে যাওয়ার’ হুমকিতে তৌসিরেরও এবার ভীষণ রাগ হতে থাকে। একটু কিছু হলেই ‘থাকব না আপনার সাথে, চলে যাব’ এই কথাগুলো ওর সহ্য হয় না। তৌসির দু’হাতে নাজহাকে শক্ত করে ধরে এক ঝাঁকুনি দিয়ে রাগে আর জেদে বলে ওঠে, “তুই থাকবি না! থাকবি না মারাস কির লাইগা? থুঁতা ফাইড়া নিমু আর একবার এটা কইলে! বললাম তো, ভুল হয়ে গেছে আমার। আর খামু না, জীবনেও খামু না!”
তৌসিরের সাথে আর কোনো কথা বাড়াতে চায় না নাজহা। এখন কথা বললে কথা কেবল বাড়বেই, তাই একদম চুপ মেরে যায় সে। নিজের কোমর থেকে তৌসিরের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। একটা শীতল দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে শান্ত গলায় বলে, “যা ইচ্ছে করুন। আর কিছু বলব না আমি আপনাকে। আপনার জীবন, আপনি যা ইচ্ছে করুন। আপাতত আমাকে ছাড়ুন, আমি কাজ করব।”
নাজহার এমন হঠাৎ শান্ত হয়ে যাওয়া দেখে তৌসির শব্দ করে হেসে ওঠে ওর দিকে তাকিয়ে বলে, “শেষ? ঝগড়া করার এনার্জি শেষ? আরেকটু কর! এত রাগ ভেতরে পুষে রাখিস না, রাগের দাহে ফাইট্টা যাবি তো তুই তালুকদারের মাইয়া। বলবি না ক্যান? আমায় কিছু। বলবি, অবশ্যই বলবি। একশোবার একশোটা কথা কবি। আমি তোর জামাই, আমারে তুই জুতা দিয়েও যদি মারস, তাও আমি সয়ে নিমু। কিন্তু তুই তো কথার শুরুতেই ছেড়ে যাওয়ার কথা কস, এইটা তো আমি নিতে পারি না। আমারে মার, পা থাইকা জুতা খুইল্লা আমার গালে বারি মার! দোষ করছি আমি, আমারে মার তাও আমার সাথে থাক।”
কথাগুলো শুনে নাজহা ভেতরে ভেতরে কিছুটা শান্ত হয়। একদৃষ্টে, ভাবলেশহীন চোখে তাকায় তৌসিরের মুখের দিকে। তারপর ধীর হাতে তৌসিরের গালে স্পর্শ করে। একবুক অনুনয় নিয়ে বলে ওঠে, “আপনি এত খারাপ কাজ কেন করেন? একটু তো ভালো হতে পারেন!”
তৌসির কথাটি শুনে এক চিলতে মেকি হাসি হাসে। নাজহার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নিয়ে আলতো করে চুমু খায়। তারপর নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলে, “দুনিয়ায় ভালো-খারাপ বলতে কিছু হয় না ! যার সাউয়ায় তেল মাইরা চলবা তার কাছে ভালা। আর যার চলবা না, তার কাছে খারাপ। কথা এটাই।”
এমন একটা নরম মুহূর্তে তৌসিরের মুখে এমন কথা শুনে নাজহার মেজাজ আবার চড়ে যায়। একটু আগেই শান্ত হয়েছিল সে, এখন রাগটা দ্বিগুণ হয়ে জ্বলে ওঠে। রাগে তৌসিরকে ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দেয় নাজহা তীক্ষ্ণ গলায় বলে, “সরুন আমার কাছ থেকে! সরুন বলছি! একটা অসহ্য লোক আপনি। কোনো ভালো কথার যোগ্যই নন!”
কিন্তু তৌসির কি আর এত সহজে ছাড়ার পাত্র? সে হেলায় নাজহাকে কোলে তুলে নিয়ে আদুরে গলায় বলে, “আর করুম না। এবারের মতো ছাড় দিয়া দে, কৈতরী।”
নাজহা অভিমানে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে উদাসীন কণ্ঠে বলে, “আমি কাউকে ছাড়ছিও না, ধরছিও না। যার যা ইচ্ছে করতে পারেন। আমি কে? আমার কথায় কার কী-ই বা আসে যায়!”
তৌসির কোনো জবাব না দিয়ে নাজহাকে এনে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে। নিজের গায়ের ভেজা পাঞ্জাবিটা খুলে সযত্নে নিচে রাখে। এরপর ঘরের লাইটটা অফ করে দিয়ে এসে সোজা নাজহার বুকে মাথা রাখে। নাজহা বিরক্তিতে নাক কুঁচকে অভিযোগের সুরে বলে, “নিজের বস্তার মতো শরীর নিয়ে আমার ওপর শুবেন না তো! আপনার ভার নিতে কষ্ট হয় আমার।”
এ কথা শুনে তৌসির নিজের শরীরের পুরো ভার না দিয়ে কিছুটা সরে আসে। অর্ধেক ভার নাজহার ওপর ছেড়েই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে রাখে ওর শরীরটা। নাজহাও আর বাঁধা দেয় না।অবচেতনভাবেই তৌসিরের চুলে হাত বুলিয়ে দিতে শুরু করে। নাজহা হঠাৎ শান্ত গলায় বলে, “আব্বা ফোন করেছিল।”
তৌসির চোখ বুজেই জিজ্ঞেস করে, “কী বলল?”
“বাড়ি যেতে বলল। কয়দিন থেকে আসতে বলল।”
তৌসির সাথে সাথে কড়া গলায় বলে ওঠে, “না, তোমারে বাড়ি যাইতে দেওয়া সম্ভব না।”
নাজহার ভ্রু কুঁচকে আসে। ও পালটা প্রশ্ন করে, “কেন সম্ভব না? বিয়ে করেছেন বলে একেবারে কিনে নিয়েছেন নাকি?”
কথাটা শুনে তৌসির নাজহার বুক থেকে মুখ তোলে। সরাসরি নাজহার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, “বাড়ি গেলে তোমার ওই নোবেলজয়ী গাদ্দার বাপ-চাচা তোমারে যদি আর ফেরত না দেয়? কোনো বিশ্বাস নাই তো! খা***নকির ধরা তো সবগুলা!”
নিজের বাবার নামে এমন জঘন্য কথা শুনে নাজহা আর চুপ থাকতে পারে না। সজোরে তৌসিরের মাথায় ‘ঠাস’ করে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিয়ে দাঁত চেপে রাগী গলায় বলে, “আমার বাপ-চাচার দোষের ঠ্যাং ধরে সবসময় কথা না বললে আপনার পেটের ভাত হজম হয় না, তাই না?”
থাপ্পড় খেয়েও তৌসির দমে যায় না বরং তার স্বর আরও তিক্ত হয়ে ওঠে। ও কটূক্তি করে বলে, “যদি পারতাম লো ছিনা*ল, তাইলে ইরানি কয়েকটা মিসাইল তোর ওই নোবেলপ্রাপ্ত গাদ্দার বাপ-চাচার পেছন দিয়া ভইরা দিতাম!”
এই চূড়ান্ত অশালীন কথাটিতে নাজহার রাগ যেন সপ্তমে চড়ে যায়। লোকটা যা মন চায় তাই বলে দিচ্ছে, সবসময় বেশি বেশি বলে ফেলে! প্রচণ্ড ক্ষোভে তৌসিরকে নিজের ওপর থেকে সরানোর জন্য সজোরে ধাক্কা দিতে দিতে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে, “আমার ওপর থেকে সরুন আপনি! আমার বুকেই মুখ গুঁজে আবার আমার বাপ-চাচার নামে বদনাম করেন! কত বড় সাহস আপনার!”
“সাহসের দেখছস কী? সরতাম না আমি। তোর বুকেই ঘুমামু আজ।”
নাজহা বুঝতে পারে, এই একগুঁয়ে পুরুষকে রাগ দেখিয়ে কোনো লাভ নেই। নিজের সর্বশক্তি দিয়েও তাকে এক চুল পরিমাণ সরাতে পারবে না সে। তাই একরাশ বিরক্তি নিয়ে চুপচাপ শুয়ে থাকে। এই নিয়ে সকালে না হয় ঝগড়া করা যাবে, এখন অনেক রাত হয়ে গেছে ঝগড়াটা আপাতত তোলাই থাকুক। নাজহাকে হঠাৎ এমন চুপ মেরে যেতে দেখে তৌসির অন্ধকারে ফিসফিস করে ওঠে, “কৈতরী!”
“জি।”
“একটা কথা কই, শুনবা?”
“না। আমি তো কালা, কানে শুনতে পাই না! শুনব কী করে?”
এ শুনে তৌসির স্বভাবসুলভ খিস্তি আওড়ে বলে, “তোমার সাউয়া। সুন্দর একটা কথা কইতাম, কইবার দিলি না!”
নাজহা বিরক্ত হলেও একটু নরম হয়ে বলে, “কী বলবেন, বলুন।”
তৌসির এবার আরও শক্ত করে নাজহাকে নিজের দুই হাতের বেড়াজালে আটকে নেয়। নাজহার বুকমাঝারে মাথা গুঁজে মুচকি হেসে বলে, “কৈতরী আমার সর্ব সুখ শুধু তোর মাঝেই!”
কথাটি শুনে নাজহার ঠোঁটের কোণেও এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে। যদিও কেন জানি কথাটি তার কাছে পুরোপুরি সত্যি মনে হয় না, বড্ড কৃত্রিম ঠেকে। তবু সে আলতো হাতে তৌসিরের চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে শান্ত স্বরে বলে, “ঘুমিয়ে পড়ুন। আজ রাতে কিন্তু আমি আপনাকে কিছু দিতে পারব না, একদম আশা করবেন না।”
তৌসির অন্ধকারে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নির্লিপ্ত গলায় বলে, “সমস্যা নাই।”
তৌসির ধীরে ধীরে চোখ বুজে নেয়, কিন্তু নাজহার চোখে ঘুম নেই। মনের ভেতর এমন উথালপাথাল অশান্তি থাকলে ঘুম কারই বা আসে? মন আর মস্তিষ্ক আজ বড্ড ক্লান্ত। আর নিতে পারছে না সে। নিজের ভাবনা, নিজের চাওয়া সব একাকার হয়ে গুলিয়ে যাচ্ছে তার।
এমন একটানা প্রহরখানেক পেরোনোর পর নাজহার দু’চোখ যখন সবে একটু বুজে আসে, ঠিক তখনই পুষ্পর নম্বর থেকে ফোনে একটি মেসেজ ঢোকে। স্ক্রিনে ফুটে ওঠে, “জামাইর বুকে চিৎ হইয়া শুইয়া না থাইকা তাড়াতাড়ি নিচে আয়। আইসা দেইখা যা কী হইতাছে!”
মেসেজটা পড়ে নাজহা ফোনটা আগের জায়গায় রেখে দেয়। তারপর তৌসিরকে আলতো করে পাশ ছাড়িয়ে নিতে নিতে বলে, “একটু উঠুন তো, আমি পানি খাব।”
তৌসির ঘুমে চোখই মেলতে পারছে না। আধা-জাগরিত ঘুম জড়ানো গলায় সে বলে ওঠে, “আমি আইনা দিমু গিয়া?”
নাজহা ওর মাথার নিচে বালিশটা ঠিক করে এগিয়ে দেয়। এরপর বিছানা থেকে নামতে নামতে বলে, “না, আপনার উঠতে হবে না। আমিই নিয়ে আসছি।”
এই বলে পানির খালি জগটা হাতে তুলে নেয় নাজহা। তারপর মাথায় ওড়নাটা ভালো করে টেনে দিয়ে পা বাড়ায় ঘরের বাইরে। ঘর থেকে বেরিয়ে করিডরে এসে দাঁড়াতেই ওর চোখ আটকে যায় নিচের দিকে। সদর দরজা দিয়ে বিবিজান সন্তর্পণে বেরিয়ে যাচ্ছেন। তার হাতে একটা বড় হাঁড়ি, যাতে রাখা কাঁচা গরুর মাংস আর পিঠে। আজ বাড়িতে বেশ ঘটা করে পিঠে তৈরি হয়েছে। নাজহাও হাত লাগিয়েছে কাজে। একেক পদের প্রায় শ’ দেড়েক করে পিঠা বানানো হয়েছে। তখন নাজহা দেখেছিল, বিবিজান অনেকগুলো পিঠে নিজ হাতে একটা হাঁড়িতে তুলে আলাদা করে রাখছেন। তখন মনে করেছিল হয়তো এমনিই রাখছেন, কিন্তু এখন তো দেখছে ভিন্ন চিত্র! এই মহিলা এত রাতে এসব নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন?
তীব্র এক কৌতূহল ভেতর থেকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে নাজহাকে। সেই কৌতূহলের বশেই আগপিছু কোনো কিছু না ভেবে দ্রুত পায়ে নিচে নেমে আসে সে। খোলা সদর দরজা গলে নিঃশব্দে সে-ও হাঁটতে শুরু করে বিবিজানের পিছু পিছু।
বিবিজান সোজা গিয়ে থামেন উঠোনের ওই কদম গাছটার নিচে। নাজহা তার থেকে কিছুটা দূরে অন্ধকারের আড়ালে দাঁড়িয়ে তার কাণ্ডকারখানা লক্ষ করে। এই মহিলা এত রাতে এসব কী করছেন? নাজহা দেখতে পায়, বিবিজান গাছের নিচে হাঁড়িটা নামিয়ে রেখে বিড়বিড় করে কী যেন পড়ছেন। কী বলছেন তিনি, তা অত দূর থেকে স্পষ্ট শোনা যায় না। তবে পরক্ষণেই যা ঘটে, তা দেখে নাজহার রক্ত হিম হয়ে আসে! সে স্পষ্ট দেখে, বিবিজানের পড়া শেষ হতেই হাঁড়িটা শূন্যে ভাসতে শুরু করে আর অদ্ভুতভাবে অদৃশ্য হয়ে যায়!
এই দৃশ্য দেখে নাজহা বিস্ময়ে-ভয়ে একদম স্থবির হয়ে পড়ে, থরথর করে কাঁপতে থাকে তার হাত-পা। এই মহিলা কাকে এসব দিচ্ছেন?
হঠাৎ বিবিজানের হয়তো মনে হয় তার পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। তিনি ধীরে ধীরে পেছন ফিরে তাকান। কিন্তু নাহ, কেউ কোথাও নেই। এদিকে নাজহা যে জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল, চোখের পলকে সেখান থেকে তাকে আরেকটা গাছের আড়ালে টেনে এনেছে পুষ্প। শক্ত করে চেপে ধরেছে নাজহার মুখ। ভয়ে আর আতঙ্কে নাজহা ঠিকমতো দম ফেলতে পারছে না। পুষ্প নাজহার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলে ওঠে, “একদম চুপ কর! তাড়াতাড়ি বাড়ির ভেতর আয়।”
পুষ্প তড়িঘড়ি করে নাজহার হাত চেপে ধরে। কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে অত্যন্ত সাবধানে, একপ্রকার টেনেহিঁচড়েই তাকে নিয়ে আসে বাড়ির ভেতরের অন্ধকার রান্নাঘরটায়।রান্নাঘরে ঢুকেই সজোরে পুষ্পের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় নাজহা। চোখেমুখে চরম বিরক্তি নিয়ে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে ওঠে, “কী সমস্যা কী তোমার? আমাকে পুরোটা দেখতে দিলে না কেন?”
নাজহার এমন নির্বিকার আচরণে পুষ্পের মাথার রক্ত টগবগ করে ফুটতে শুরু করে। রাগে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে সে খপ করে নাজহার খোঁপা চেপে ধরে। নিজের মুখটা নাজহার কানের কাছে নিয়ে গিয়ে হিসহিস করে ওঠে, “আস্তে কথা বল! কী দেখবি? যা দেখার তো দেখলি। ওরা জিন পালে, বুঝিস তুই? তুই যে জীবনটাকে নিজে থেকে বেছে নিচ্ছিস, সেখানে ধ্বংস ছাড়া আর কিচ্ছু নেই!”
খোঁপা থেকে পুষ্পের হাতটা এক ঝটকায় সরিয়ে দেয় নাজহা সরিয়ে দিয়ে চোয়াল শক্ত করে, দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “তো তাতে তোমার কী ?ওরা যেমনই হোক, তৌসির তো এমন নয়। আমি তার সাথেই থাকব।”
তৌসিরের প্রতি নাজহার এই অন্ধ টান দেখে পুষ্পের রাগ দ্বিগুণ হয়ে জ্বলে ওঠে। চোখেমুখে অবিশ্বাস আর ক্ষোভ নিয়ে সে বলে, “তুই এই বাড়িতে কী উদ্দেশ্যে এসেছিলি, সব ভুলে গেছিস? আর এখন কি না এদের সাথেই রঙ্গলীলায় ভাসছিস তুই?”
পুষ্পের কথাগুলো শুনে নাজহা কয়েক মুহূর্ত একেবারে নিশ্চুপ হয়ে একদৃষ্টে পুষ্পের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। মুহূর্তের মাঝেই নাজহার মুখের রেখাগুলো বদলাতে শুরু করে, সেখানে ভর করে এক অদ্ভুত কাঠিন্য। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে শীতল, ভয়ংকর হাসি ফুটিয়ে তোলে সে। এরপর নিজের ডান হাতের চারটে আঙুল পুষ্পের চোখের সামনে তুলে ধরে গুনতে শুরু করে,
“এক, দুই, তিন, চার ওরা আমার চারজন চাচাকে নির্মমভাবে মেরেছে। ওটা আমি কী করে ভুলব? এই জানোয়ারগুলোর জন্যই তো আমার ফুফু নিজের শরীরের চামড়া নিজে ছিঁড়ে তিল তিল করে মরেছিল! ওদের জন্যই আমার পরিবার বারবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে, মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখেছে। ওরা আমার ছোট্ট ইয়ারাকে জিন দিয়ে দিনের পর দিন ভোগ করাচ্ছে। আমি কী করে সব ভুলে যাব? আমি কি বোকা? নাকি পাগল হয়ে গেছি বলে তোমার মনে হয়? ওরা আমাদের সাথে কী না করেছে, বলো?”
নাজহার কণ্ঠে চাপা আর্তনাদ আর ভয়াবহ অতীতগুলোর কথা শুনে পুষ্প পাথর হয়ে যায়। ওর মুখ থেকে কোনো কথা সরে না আর। কিছুটা সময় নিয়ে নিজেকে সামলে পুষ্প অস্ফুট স্বরে প্রশ্ন করে, “সব যদি মনেই থাকে, তাহলে তুই ওর সাথে এত মাখামাখি কেন করছিস?”
নাজহা এবার কাঁধ ঝাঁকিয়ে নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলে, “করছি, কারণ আমার ইচ্ছে করছে তাই। তাতে তোমার কী? আমার যখন যা ইচ্ছে হবে, আমি এখন থেকে তাই করব। আমি আর কারও কথায় বা কারও পরামর্শে চলছি না। আমার যা মন চায় তা-ই করব। আমার নিজের জীবন তো বলতে গেলে একেবারে শেষ হয়েই গিয়েছে, এখন আর মৃত্যুভয়ও নেই আমার।”
নাজহার মুখে এমন বেপরোয়া কথা শুনে পুষ্প তাজ্জব বনে যায়। এই মেয়েটি আসলে কী বলছে? সে কি শত্রুর পক্ষে, নাকি নিজের পরিবারের পক্ষে পুষ্প হিসাব মেলাতে পারছে না। হঠাৎ একটি সন্দেহ উঁকি দেয় তার মনে। পুষ্প তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে সরাসরি জিজ্ঞেস করে, “নওমি আপু তো বলেছিল তোদের মধ্যে কোনো ফিজিক্যাল সম্পর্ক নেই। এখনো কি নেই?”
পুষ্পের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে, কোনো ধরনের সংকোচ বা বিকার ছাড়াই নাজহা উত্তর দেয়, “আছে। তুমি যেদিন এই বাড়িতে এসেছ, ঠিক সেদিন থেকেই হয়েছে।”
কথাটা কানে যেতেই পুষ্পের মাথার শিরা দপদপ করে ওঠে অবিশ্বাসে তার চোখ বড় বড় হয়ে আসে। পুষ্প জানতে চায়, “তুই কি নিজে থেকে অনুমতি দিয়েছিলি, নাকি ও জোর করেছিল তোর ওপর?”
সেই একই নির্লিপ্ত কণ্ঠে নাজহা আবার জবাব দেয়, “আমি নিজেই অনুমতি দিয়েছি।”
আর সহ্য করতে পারে না পুষ্প। রাগে ক্ষোভে নাজহার থুতনিটা শক্ত করে চেপে ধরে গলার স্বর খাদে নামিয়ে বলে, “এই মা***, নিজেকে যখন বাঁচাতে পারতি, তাহলে অনুমতি কেন দিলি? আর কয়েকটা দিন অন্তত দেখতে পারতি না! নিজের সবটুকু এভাবে বিলিয়ে দিয়ে নিজেকে ক্ষয় করলি কেন?”
নাজহা পুষ্পের হাত থেকে নিজের মুখটা ঝারি মেরে ছাড়িয়ে চোখের দৃষ্টিতে শূন্যতা আর অহংকার মিশিয়ে দাঁত চেপে বলে, “আমি তো আগেই বলেছি, আমার যা ইচ্ছে হবে আমি তা-ই করব। দিনের পর দিন একজন পুরুষের বুকে পড়ে থাকতে থাকতে আমার নারী মন নিজেকে সামলাতে পারেনি। তাই আমি সঁপে দিয়েছি নিজেকে ওর হাতে। আর এতে আমি যথেষ্ট স্যাটিসফায়েডও হয়েছি। এর জন্য আমার মনে বিন্দুমাত্র কোনো দুঃখ বা আফসোস নেই।”
নাজহার মুখে এতটা নির্লজ্জের মতো কথা শুনে পুষ্প দাঁতে দাঁত কিড়মিড় করে ঘৃণায় মুখ কুঁচকে বলে, “স্যাটিসফাই হয়েছিস? ওয়াও! এতটা নির্লজ্জ কী করে হয়ে গেলি তুই?”
নাজহার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই ও আগের মতোই বলে, “আমি এমনই! আর একজন পুরুষের বুকে দিনের পর দিন পড়ে আছি, আর তার প্রতি আমার কোনো আকর্ষণ কাজ করবে না, তাই হয়? আমি এখন যা ইচ্ছে তা-ই করব। আমি এই সংসারেই থাকব। তুমি তোমার ভাইদের গিয়ে পরিষ্কার বলে দিও, আমি এখানেই থাকব। কয়দিন পর আমরা একটা বেবিও নেব। ওরা তো আমাকে এই বাড়িতে পাঠিয়েছিল মরতে, তাই না? ঠিক আছে, আমি এখন মরবই। আমার লাশ বের হলে এই বাড়ি থেকেই বের হবে। কিন্তু তার আগে আমি আর কোথাও ফিরছি না!”
কথাগুলো ছুঁড়ে দিয়েই পুষ্পকে একরকম ধাক্কা সরিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসে নাজহা। ঠিক তখনই পেছন থেকে পুষ্পর তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর ভেসে আসে,
“লুসিয়ান কিন্তু বেঁচে আছে! ও মরে নি। ইকরাব আর তালহা হয়তো তোকে হারিয়েছে, কিন্তু লুসিয়ান কিছুতেই তোকে হারাবে না।”
কথাগুলো কানে পৌঁছাতেই পাথরের মতো থমকে যায় নাজহার পা। লুসিয়ান বেঁচে আছে? কিন্তু তৌসির তো ওরই চোখের সামনে ওকে জ্যান্ত কবর দিয়েছে! তাহলে সে কীভাবে ফিরে আসবে? প্রবল বিস্ময় আর অভাবনীয় ধাক্কায় বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে ওঠে নাজহার। তবে নিজের এই তীব্র স্নায়ুচাপ বিন্দু পরিমাণও প্রকাশ করে না সে। বরং খুব শান্ত ভঙ্গিতে ঘাড় ঘুরিয়ে পুষ্পের দিকে তাকায়। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি ঝুলিয়ে ওর চোখে চোখ রেখে কঠিন স্বরে বলে,
স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৩৯
“ওকে গিয়ে বলিও, ক্ষমতা থাকলে আমার একটা লোম অন্তত ছুঁয়ে দেখাতে! আমি এখন এক ভয়ংকর বাঘের ডেরায় বন্দি, তৌসির শিকদারের বুকে। বুঝতে পারছ তুমি? তৌসির শিকদার আস্ত একটা মানুষরূপী পশু। নিজের স্বার্থ আর নিজের চাওয়ার জন্য ও যেকোনো কিছু করতে পারে। যেকোনো কিছু! তাই নিজের ভালো চাইলে এখন থেকেই সাবধান হও।”

Apiiiiii onnk shundor hoiche next part ta taratari.deyar ceshta korio 🥹
Next part plz
Next part ta plz
আপু তুমি কী বেঁচে আছো। থাকলে পরের পাট একটু তাড়াতাড়ি দাও প্লিজ 🙏🙏🙏🙏😥😥
Next
পরের পাঠ চাই আপু উপন্যাসটা অনেক সুন্দর তার চেয়ে বেশি সুন্দর তৌরিরের মুখের ভাষা😷