কিশোরী কন্যা পর্ব ৩০
হামিদা আক্তার ইভা
পূর্ণিমা চাঁদ দেখা যাচ্ছে আকাশে।আকাশটা বড্ড উজ্জ্বল।এই ঝলমলে চাঁদের আলোয় গ্রামের মধ্যে সওদাগর বাড়িটা আজ বেশিই জ্বলজ্বল করছে।আনন্দে-উল্লাসে মুখরিত পুরো বাড়ি।সবার জানা মতে সওদাগর বাড়ির মতো পবিত্র আর কোনো স্থান নেই।আদৌ কি তাই?সত্যিই কি সওদাগর বাড়ি এতটাই পবিত্র?হয়তো!আবার নাও হতে পারে।
বাইরে থেকে দেখে ভেতরটা বিচার করা বড্ড কঠিন।আমরা চোখে যেটা দেখি,সেটা সব সময় সত্যি হয় না।কিংবা হয়েও বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না।ষোড়শী কন্যার ভাবনা খানাও ঠিক এমন।সওদাগর বাড়ির নতুন নববধূর মনে হাজারও প্রশ্ন।সে যেন এক ধাঁধার মধ্যে আঁটকে গেছে সংসার জীবনে পা রেখে।সংসার জীবনটা কেমন অদ্ভুত ভাবে তার গলা চে’পে ধরেছে।কোথাও যেন একটু শান্তি নেই।
চাঁদের আলো গলিয়ে পড়ছে সওদাগর বাড়ির বাগানে।মাঝখানের বড় কৃষ্ণচূড়া গাছটার ছাঁয়া মাটিতে পড়ে অদ্ভুত সব অবয়ব তৈরি করছে।লোকজনের হাসি, উল্লাস, কথার শব্দে বাড়িটা যেন জীবন্ত।এত আনন্দ-হইহুল্লোড়ের মধ্যে একা নীরবে বসে আছে “ষোড়শী নববধূ।”
সবার চোখে সে ভাগ্যবতী।এত বড় বাড়ির বউ হওয়া কি আর সবার কপালে জোটে?কিন্তু কেউ জানে না, এই আলোকোজ্জ্বল বাড়িটার ভেতরে ঢুকেই তার বুকের ভেতরটা কী ভয়ংকর অন্ধকারে ভরে গেছে।
ঘরের একপাশে বসে থাকা ষোড়শী কন্যার চোখ দু’টো বারবার ভিজে উঠছে।চোখের কোণে জমে থাকা জল সে চুপিচুপি আঁচল দিয়ে মুছে নিচ্ছে, যাতে কেউ বুঝতে না পারে।এই বাড়িতে চোখের জল দেখানো যে নিষেধ।
সে মনে মনে প্রশ্ন করে,এই কি তবে সংসার?এই কি তবে সুখ?যেখানে হাসিটুকু পর্যন্ত ধার করা, আর নিঃশ্বাস নেয়াটাও যেন অনুমতির উপর নির্ভরশীল?
হঠাৎ পাশের ঘর থেকে পুরুষালী কণ্ঠ ভেসে আসে।কণ্ঠটা শান্ত, কিন্তু সেই শান্ততার ভেতরেও একটা অদৃশ্য কঠোরতা লুকিয়ে আছে।মেয়েটার বুকটা ধক করে উঠে।অজান্তেই সে সোজা হয়ে বসে পড়ে।এই বাড়িতে সে এখন আর শুধু কারও মেয়ে নয়,সে একজন বউ।এই পরিচয়টাই যেন তার সব পরিচয় মুছে দিয়েছে।
পূর্ণিমার আলোয় সওদাগর বাড়ি যতটা পবিত্র দেখায়, তার দেয়ালের ভেতরে জমে থাকা অজানা রহস্যগুলো ঠিক ততটাই ভয়ংকর।আর সেই রহস্যের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক কিশোরী কন্যা।যার শৈশব শেষ হয়েছে আগেই, কিন্তু নারীত্বের ভার বহন করার মতো প্রস্তুতি তার কখনোই ছিল না।
বিছানায় ফাহাদ আর পুতুল ঘুমিয়েছিল।হুট করেই ফাহাদের ঘুম ভেঙে গেল।সে পিটপিট করে চোখ খুলে ঘরে চোখ বুলাল।দেখল,ময়ূরী ঘরের মধ্যে জানালার পাশে কাঠের চেয়ারে হ্যালান দিয়ে বসে বাইরে তাকিয়ে আছে।
বাচ্চাটা বিছানাটার চাদর খামছে নিচে নেমে হেলে দুলে বোনের নিকটে এগিয়ে গেল।সে বোনের শাড়ির আঁচল টেনে ঘুমঘুম গলায় বলল,
“আপা,কুলে নেও।”
ময়ূরী তাকায় ভাইয়ের দিকে।ছোট্ট বাচ্চাটা আদর আদর দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছে তার দিকে।সে ভাইকে কোলে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে।ভাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে গলা ভে’ঙে আসে খানিক।
“আপা তো সব সময় তোর সাথে থাকবে না সোনা।”
ফাহাদ ময়ূরীর গলায় মুখ রেখে চোখ বন্ধ করে আধো স্বরে বলে,
“তুমারে আমি খুব বালুবাসি।”
ফাহাদের কথায় ময়ূরীর চোখের পাতা কেঁপে উঠল।ছোট্ট মাথাটার উপর হাত বুলিয়ে দিতে দিতে খুব আস্তে, প্রায় ফিসফিস করে গুনগুনিয়ে উঠল,
“ঘুম আসে যায়,চোখের পাতায়
আমার সোনা ঘুমুবে..!
ঘুম আসে যায়,চোখের পাতায়
আমার সোনা ঘুমুবে..!
স্বপ্ন পুরীর চাঁদের বুড়ি রুপোর কাঠি ছোঁয়াবে।
স্বপ্ন পুরীর চাঁদের বুড়ি রুপোর কাঠি ছোঁয়াবে।”
গলার স্বরটা একসময় কেঁপে উঠল।গান থামিয়ে সে একবার ঢোঁক গিলে নিল।আবার নিজেকে সামলে নিয়ে পরের লাইনটুকু ধরল,
“মেঘের আয়েশে চুপ করে কপালে
এঁকে দেবে নরম আদর!
মেঘের আয়েশে চুপ করে কপালে
এঁকে দেবে নরম আদর!”
ফাহাদের ছোট্ট হাতটা শক্ত করে বোনের শাড়ির আঁচল ধরে আছে।নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে নিয়মিত হয়ে এলো।ময়ূরী বুঝে গেল ভাইটা আবার ঘুমের দেশে পাড়ি দিয়েছে।গান থামল।ঘরটা নিঃশব্দ।শুধু পূর্ণিমার আলো জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে ময়ূরীর মুখে পড়ছে।সে ভাইয়ের কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে খুব আস্তে ফিসফিস করে বলল,
“বোনও তোকে খুব ভালোবাসে।”
সে ফাহাদকে পুতুলের পাশে শুইয়ে দিল।দুইটা বাচ্চা কী শান্তিতেই না ঘুমাচ্ছে।একটা সময় এই শান্তির ঘুম ধীরে ধীরে অশান্তিতে পরিণত হয়।কেন সেই শৈশবের মতো চিন্তা মুক্ত থাকা যায় না?মেয়েটা লম্বা একটা নিঃশ্বাস ফেলল।বিছানা থেকে নেমে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।মাথার কাপড় ফেলে দিয়ে খোঁপা করা চুল গুলো ছেড়ে দিল।অনেক হলো চুলের যত্ন নেয়া হয় না।
আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে ময়ূরী একটু থমকে দাঁড়াল।এই মুখটাই তো তার,তবু কেমন যেন অচেনা।চোখের নিচে হালকা কালচে ছাঁয়া, ঠোঁট দু’টো শুকনো।শৈশবের সেই নির্ভার হাসিটা কোথায় হারিয়ে গেছে।সে নিজেও জানে না।
চুলের ফাঁকে জমে থাকা অগোছালো ভাবটা যেন তার জীবনেরই প্রতিচ্ছবি।একসময় মা মাথায় তেল দিতেন, খোঁপা বেঁধে দিতেন আদর করে।এখন সেই হাত নেই, সেই সময়ও নেই।সবকিছু যেন তাড়াহুড়োর,দায়িত্বের, নিয়মের, নিষেধের।
বাইরে কোথাও থালা-বাসনের শব্দ, হাসির রেশ সব মিলিয়ে আবারও মনে করিয়ে দিল, এই বাড়িতে সে একা নয়, কিন্তু তবু একা।ময়ূরী খুব নিচু স্বরে বলল,
“আর কতটা বদলাতে হবে?কতটা বদলালে বুঝব আমাকে দিয়েও সংসার করা সম্ভব?”
কোনো উত্তর আসে না।জানালার ফাঁক দিয়ে পূর্ণিমার আলো তখনও ঢুকছে।সে আলোয় দাঁড়িয়ে ময়ূরীর মনে হলো চাঁদটা যেন সাক্ষী হয়ে আছে তার নীরবতার।কথা বলতে ইচ্ছে করে, কাঁদতে ইচ্ছে করে, আবার সব গিলেও ফেলতে হয়।
হঠাৎ পেছন থেকে শরীর ছুঁয়ে যেতেই ময়ূরী চমকে উঠল।হাতের মুঠো শক্ত হয়ে গেল আঁচলের উপর।হৃদস্পন্দন এক মুহূর্তে বেড়ে গেল বহুগুণ।সে দ্রুত চোখ তুলল আয়নার দিকে।
আয়নার ভেতর স্পষ্ট দেখা গেল তাহসিনের মুখ।কখন যে ঘরে ঢুকেছে, সে টেরই পায়নি।ময়ূরীর ঠোঁট কেঁপে উঠল।কিছু বলার আগেই তাহসিন সামান্য ঝুঁকে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“আমি ভীষণ ক্লান্ত।”
কণ্ঠটা নিচু,ভারী।সেই কণ্ঠে আদেশ নেই, অভিযোগ নেই,শুধু ক্লান্তির এক দীর্ঘ ছাঁয়া।ময়ূরী স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।সে জানে,এই মুহূর্তে কী বলা উচিত কিংবা কী করা উচিত।
মেয়েটা শুকনো ঢোক গিলল।একটা স্বাভাবিক সম্পর্ককে কতদিন অস্বাভাবিক করে রাখা যায়?এমন তো নয় সে অবুঝ!বিবাহের গত দেড় মাসটা অদ্ভুত ভাবে কেটে গেছে।তাহসিন তাকে সময় দিয়েছিল একটু গুছিয়ে নেয়ার জন্য।নিজেকে প্রস্তুত করার জন্য।কোনো পুরুষ বিয়ের পর এত ধৈর্য ধরে থাকবে না,সেখানে তাহসিন তার অসুবিধা বুঝেছে।
তাহসিনের নিঃশ্বাসটা একটু ভারী হয়ে উঠল।ক্লান্তির ভেতর জমে থাকা অস্থিরতা তার চোখে-মুখে স্পষ্ট।ময়ূরী আয়নার দিকে তাকিয়েই বুঝে গেল এই নীরবতার মোড় বদলাতে চলেছে।তাহসিনের উন্মাদনা বাড়ল।
ময়ূরী হঠাৎই নিজের আঁচলটা শক্ত করে ধরে, এক কদম সামনে এগিয়ে খুব নিচু কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“থামুন!”
তাহসিন চমকে উঠল।ময়ূরী কাঁপা গলাটা শক্ত করে আবার বলল,
“ঘরে বাচ্চারা আছে।”
এই কথাটুকুই যেন বাতাসের মতো ছুটে গিয়ে ঘরটা থমকে দিল।ঘুমন্ত ফাহাদ আর পুতুলের দিকে একবার তাকাল তাহসিন।তার চোখের উন্মাদনা মুহূর্তেই বদলে গেল।সেখানে ক্লান্তির সঙ্গে লজ্জার ছাঁয়া নামল।সে এক পা পিছিয়ে গেল।কণ্ঠটা এবার অনেকটা শান্ত।
“আমি বুঝতে পারিনি।তুমি ভয় পেয়েছ?”
ময়ূরী কিছু বলল না।চোখ নামিয়ে রাখল।হাতের মুঠো তখনও শক্ত।হৃদস্পন্দন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে, কিন্তু বুকের ভেতরের কাঁপুনি থামছে না।
তাহসিন গভীর একটা নিঃশ্বাস নিল।
“ঘুমাও।” বলল সংক্ষিপ্তভাবে।
“আমি বাইরে থাকব।”
মেয়েটা চোখ তুলে তাকাল।তাহসিনের অশান্ত দৃষ্টি দেখে আঁচল মুচড়ে ধরে বলল,
“মাফ করবেন।আজ…”
কথা থামিয়ে ঠোঁট কামড়ে ফের বলল,
“আজ… মানে..”
তাহসিন ঠোঁট কামড়ে হাসল।মাথা নেড়ে ঘরের বাইরে যেতে যেতে গলা নামিয়ে বলল,
“আমি অপেক্ষা করব।”
রাত হলেই নাকি গ্রামে শুরু হয় কালো বাজার।গ্রাম থেকে আজ অব্দি যেই মেয়ে গুলো নিখোঁজ হয়েছে,তারা কোথায়?তাদের পা’চার করা হয়েছে নাকি অন্য কাজে ব্যবহার করা হয়?এসব কেস নিয়ে আবার তদন্ত শুরু হয়েছে।এই খবর খানা পুরো গ্রামে ছড়িয়ে গেছে ইতোমধ্যে।বাদ যায়নি চেয়ারম্যান বাড়ির মানুষও।আজ নুপুরের বিয়ে।সকাল সকাল বাড়ি ভর্তি মানুষ জনের মাঝে হঠাৎ উপস্থিত হলো থানার মানুষ।তারা মাহতাব এবং চেয়ারম্যান বাড়ির পুরুষদের সাথে কথা বলতে এসেছেন।সওদাগর সাহেব বেশ রাগ করেছেন এমন একটা দিনে বাড়িতে পুলিশ উপস্থিত হওয়াতে।পুলিশ অফিসারদের নিয়ে তারা বাড়ির বাগানে বসেছেন।চারপাশে লোক জন নেই।তাদের জায়গা খালি করতে বলা হয়েছে।
বাগানের মাঝখানের গোল টেবিলটার চারপাশে বসেছেন চেয়ারম্যান সাহেব, মাহতাব,তাহসিন ও রমজান সওদাগর।পুলিশের এসআই,ওয়াহিদ আর এক কনস্টেবল সামনে চেয়ার টেনে বসেছে।চারদিকটা অস্বস্তিকর নীরবতায় ভরে আছে।দূরে বিয়ের বাড়ির কোলাহল থাকলেও, এই বাগানের ভেতরটা যেন অন্য এক জগৎ।
এসআই গম্ভীর মুখে নোটবুক খুলে বললেন,
“আমরা কিছু নিয়মিত প্রশ্ন করছি সওদাগর সাহেব।আপনাদের সহযোগিতা দরকার।”
সওদাগর সাহেব কপালে ভাঁজ ফেলে গলা শক্ত করে বললেন,
“আজ আমার নাতনির বিয়ে।এই দিনটাই পেলেন আপনাদের তদন্তের জন্য?”
এসআই শান্ত স্বরে উত্তর দিলেন,
“বুঝেছি।কিন্তু বিষয়টা সিরিয়াস।”
“কী জানতে চাইছেন?”
“আপনাদের গ্রামে স্বর্ণ পা’চার হচ্ছে,জানেন নিশ্চই?”
তাহসিন ঠোঁট চেপে বুকে হাত গুঁজে ওয়াহিদের দিকে তাকাল।ওয়াহিদ তাহসিনের দৃষ্টি রেখে হালকা মাথা চুলকে অনুমতি নিয়ে বলল,
“শুধু তাই নয়।স্বর্ণ পা’চারের সাথে সাথে নেশা জাতীয় সকল দ্রব্য সাপ্লাই হচ্ছে।নারী নিখোঁজের কথা নাহয় নাইবা বললাম।”
বোরহান সওদাগর গম্ভীর হয়ে বললেন,
“দুইদিন পর পর কী আপনারা তামাশা শুরু করেছেন?গ্রামের এমপি আমার নাতি।চেয়ারম্যান আমি নিজে,অথচ এসব খবর আমিই জানি না?”
এসআই মৃদু হেসে বললেন,
“নারী নিখোঁজের খবর জানেন বুঝি?কেসটা তো সবে কয়েকমাস আগে বন্ধ হয়েছে।”
“তো?”
“আশ্চর্য হচ্ছি চেয়ারম্যান সাহেব।গ্রামের চেয়ারম্যান হয়ে আপনি এই কেসটা এত তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করছেন?”
“দেখুন,এই মুহূর্তে আমি আমার নাতনির বিয়ে নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত।আমি আপাতত অন্য কিছু নিয়ে মাথা ঘামাতে চাচ্ছি না।”
তাহসিন মাথা নেড়ে বলল,
“আপনাদের যা তদন্ত করার করতে থাকুন,তবে এসব ২-৩দিন একটু সওদাগর বাড়ি থেকে বিরত থাকুক।এটা আমার অনুরোধ।আপনি নিশ্চই বুঝতে পারছেন আমার কথা?”
অফিসার হঠাৎ দারুণ হাসলেন।তাহসিন অনুরোধ করল তাদের বিয়েতে থাকার জন্য।এসআই না থাকলেও ওয়াহিদ থেকে গেল।তার দাওয়াত যেহেতু আগে থেকেই ছিল তাই তৈরি হয়েই এসেছিল।তাহসিন ওকে নিয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল।আধ-ঘণ্টা পর ওয়াহিদ বলল সে বাড়ি গিয়ে মধু আর আম্মা-আব্বাকে সাথে করে নিয়ে আসবে।তাহসিন বারণ করল না।ফিরোজা বেগমের অবস্থা এমনিতেই বেশি ভালো নয়।সে ওয়াহিদের সাথে আদনানকে পাঠাল।
তাহসিন ধীর পায়ে দোতলার সিঁড়ি ভাঙল।বাড়ির নিচের তলার কোলাহল এখানে এসে ম্লান হয়ে গেছে।দোতলার করিডোরে আলো কম, বাতাসে ধূপ আর ফুলের গন্ধ মিশে আছে।
দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকতেই চোখে পড়ল ময়ূরী। নতুন শাড়িটা গায়ে জড়ানো।ভেজা চুল পিঠ বেয়ে নেমে এসেছে, চুলের ডগা থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ে মেঝেতে ছোট ছোট দাগ তৈরি করছে।মুখে হালকা ক্লান্তি, কিন্তু চোখে এক ধরনের অদ্ভুত শান্ত ভাব।
তাহসিন দরজাটা ভেতর থেকে লাগিয়ে দিল।ঘরে তখন কেউ নেই।ফাহাদ আর পুতুলকে আফিয়া নিয়ে গেছে।ময়ূরী তাহসিনকে দেখে লজ্জা পেল একটু।দৃষ্টি সরিয়ে মাথায় তোয়ালে স্পর্শ করতেই তাহসিনের নরম কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
“শাড়িটায় বেশ মানিয়েছে তোমায়।”
ময়ূরী লাজুক চোখ সরিয়ে বলল,
“আপনি এনেছিলেন?”
“হ্যা!তোমার জন্য পছন্দ হয়েছিল খুব।”
“শাড়িটা সুন্দর।শুকরিয়া।”
তাহসিন এগিয়ে আসতে চাইলে সে আতঙ্কে দু’পা পিছিয়ে গিয়ে বলল,
“এখন নয়।”
তাহসিন কপাল কুঁচকে ঠোঁট চেপে জিজ্ঞেস করল,
“কী এখন নয়?”
থমথমে খেয়ে গেল সে।শুকনো ঢোক গিলে মাথার চুল তাড়াতাড়ি মুছতে মুছতে বলল,
“অসভ্য লোক।আমাকে বিরক্ত করবেন না এখন।”
তখনও আযান দেয়নি।বাড়িতে আয়োজন চলছে।নামাজের পর বরযাত্রী আসবেন।তাহসিন ময়ূরীকে নিয়ে বের হলো ঘর থেকে।নিচে কনক কিছু একটা করছিল।সিঁড়ির দিকে নজর যেতেই দাঁত চাপল মেয়েটা।ময়ূরীর সাথে তার চোখা-চোখী হলো তৎক্ষণাৎ।সে মুখ গম্ভীর করেই তাহসিনের সাথে পা মেলাল।তাহসিন সকালেই গোসল করেছে।আযান দিলে সোজা মসজিদে যাবে।সে বলল একগ্লাস ঠান্ডা সরবত বানিয়ে দিতে।ময়ূরী মাথা নেড়ে রান্না ঘরের দিকে গেলে তাহসিন সোফায় গিয়ে বসে আত্মীয়দের সাথে।
রান্না ঘরে চম্পা ছিল।ভাব-ভঙ্গিতে বিরক্তির আভাস।ময়ূরী বিরক্ত হলো বাড়ির আনাচে কানাচে এত মানুষ দেখে।এত মানুষের মধ্যে থাকার অভ্যাস তার নেই।রান্না ঘরে এসেও যেন শান্তি নেই।
নিচে বসে সম্পর্কে দু’জন ভাবি লেবু,শসা কাটছিলেন।ময়ূরীকে দেখে একজন জিজ্ঞেস করলেন,
“ভাবি,পুতুলের জ্বর কমছে?”
ময়ূরী মাথা নাড়িয়ে বলল,
“আগে দু’টুকরো লেবু দিন ভাবি।”
সে লেবু নিয়ে আড়চোখে চম্পার দিকে তাকিয়ে বলল,
“জ্বর একটু কমেছে।”
কিশোরী কন্যা পর্ব ২৯
“মাইয়াডার খেয়াল রাইখেন।কোন বদমাইশ যে এমনে মারল আল্লাহ জানে।”
ময়ূরী দাঁত চেপে লেবু খোসা চিপে শান্ত গলায় বলে,
“একবার ধরতে পারলে হাত ভেঙে গলায় ঝুলিয়ে রাখব।শুধু হাত না,সামনে থাকলে শিকড় পর্যন্ত উপড়ে ফেলতাম।বাচ্চার গায়ে হাত ওঠায় যে,সে মানুষ না জানো’য়ার।”
