Home ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮৭

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮৭

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮৭
প্রিয়স্মিতা তেহজীব রাই

দীর্ঘ চার ঘণ্টা পর মিটিং শেষ পর্যায়ে রেখেই বেরিয়ে এলো প্রণয়।
সাদমান সিকদার যেতে বারণ করছিলেন, বারবার চোখ রাঙানি দিচ্ছিলেন। তবু ও বাবার দৃষ্টিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে বেরিয়ে যায় প্রণয়। তার আর কিছুতেই ধৈর্যে কুলাচ্ছিল না। মনটা তো পড়ে আছে কেবিনে। সে তড়িঘড়ি ছুটে গেলো নিজের কেবিনের দিকে।
এতক্ষণ ওখানে কিভাবে নিজের মন বসিয়েছে, সেটা কেবল সেই জানে।
এমনিতেই অজানা কারণে অশান্ত হয়ে আছে মস্তিষ্ক। প্রচন্ড তৃষ্ণায় তপ্ত দুপুরের ন্যায় খা খা করছে বুকটা। এক্ষুনি মেয়েটাকে বুকের চেপে ধরে অস্থির হৃদয়কে একটু স্বস্তি দেওয়া প্রয়োজন। না ধরা অন্ত প্রাণে শান্তি মিলবে না।
প্রণয় অধৈর্য হয়ে কেবিনে প্রবেশ করতেই অবাক হয়ে গেল। তৃষ্ণার্ত চোখ দুটো চাতকের ন্যায় খুঁজলো সেই সুখপাখিকে, যাকে সে রেখে গেছিলো।

কিন্তু প্রণয়ের বুকের ন্যায় সেই রুমটাও খা খা করছে। সেই নিষ্ঠুর মানবী কোথাও নেই। প্রণয়ের চোখ দুটো তবুও খুঁজলো তাকে। টেবিলের ওপর চারদিকে চিপস, চকোলেটের প্যাকেট ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। কিন্তু সেই খরগোশের বাচ্চাটা কোথায়?
প্রণয় অধৈর্যচিত্তে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে হাঁক ছাড়ল। অতি আদুরে কন্ঠে ডাকলো—
“জান, রক্তবা, পাখি আমার আহ্লাদী বউ, তুমি কোথায়?”
কিন্তু কোনো সাড়া এলো না। প্রণয়ের উন্মত্ত সমগ্র সত্তা উত্তাল হয়ে উঠল প্রিয়তমার সান্নিধ্য লাভের তৃষ্ণায়।
হাঁসফাঁস করলো প্রণয়। ওয়াশরুমে দেখল, কিন্তু সেখানেও কেউ নেই। কোথাও যখন খুঁজে পেলো না, তখন রাগ হলো প্রণয়ের। অভিমানে বুক ভারি হলো। বেয়াদব মেয়েটা তাকে না বলেই চলে গেছে? বুকের ভেতর জ্বলতে থাকা এতক্ষণের চাপা উত্তেজনা ধপ করেই নিভে গেল। শরীর ভেঙে পড়ল ক্লান্তিতে।
প্রণয় এগিয়ে এসে গা এলিয়ে দিল চেয়ারে। চোখ বুজতেই মনে পড়ে গেল তখনকার কথা। অজান্তেই ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। মুহূর্তেই অভিমানের কালো মেঘ দূর হয়ে গেল মন থেকে।

প্রণয় চোখ মেলে সোজা হয়ে বসল। ভীষণ রকম তাড়না অনুভব করল প্রেয়সীর আহ্লাদী কণ্ঠটা শোনার। ক্রেভিং সামলাতে পারলো না প্রণয়। পকেট হাতড়ে সাইলেন্ট মোডে থাকা ফোনটা বের করল।
ফোন দেওয়ার উদ্দেশ্যে পাওয়ার বাটনে প্রেস করতেই মুখের উজ্জ্বলতা গায়েব হয়ে গেল এক নিমিষে। দুই ভ্রুয়ের সন্ধিক্ষণে আড়াআড়ি ভাবে পড়লো অনেকগুলো ভাঁজ। স্ক্রিনের ওপর জ্বলজ্বল করছে ৫৩৫টা ফোন আর নাইন হান্ড্রেড নাইন্টিনাইন প্লাস মেসেজ।
কল-মেসেজ প্রেরণকারী নম্বরটা দেখে অজানা আশঙ্কায় বুক কাঁপলো প্রণয়ের। হৃৎপিণ্ডের রক্ত চলাচল থমকে গেল যেন কিছুক্ষণের জন্য।
তার সেই সিক্রেট ইনফর্মারের কল-মেসেজ। যাকে সে রেখেছে ২৪ আওয়ার্স তার প্রিয়তার ওপর নজরদারি করার জন্য। লোকটা প্রতিনিয়ত ২৪ ঘন্টাই প্রিয়তাকে স্টক করে। প্রণয় থাকুক না থাকুক, প্রিয়তা যখনই বাড়ির বাহিরে বের হয়, এই লোকটাই হয় তার ছায়া সঙ্গী।

সেই লোকটা প্রিয়তাকে প্রণয়ের স্ত্রী হিসেবেই জানে। প্রণয় লোকটাকে নিজের পরিচয় দিয়েছে বিজনেসম্যান আবরার শিকদার প্রণয় বলে। কারণ সে প্রিয়তার সাথে অন্ধকার জগতের কেউ একজনকেও জড়াতে চায় না। সে চায় না ওই দুনিয়ার কেউ জানুক যে প্রিয়তা তার জন্য কি…
প্রণয় ভাবনার মধ্যেই আবারও হোমস্ক্রিন জ্বলে উঠল। হাতের আঙুলে হালকা কাঁপন ধরল প্রণয়ের। তবে সময় নষ্ট না করে ঝটপট ফোনটা রিসিভ করল।
সাথেই সাথেই ওপাশ থেকে শোনা গেল লোকটার উদ্ভিগ্ন কণ্ঠস্বর। লোকটা কাঁপতে কাঁপতে ভীষণ উত্তেজিত হয়ে বললো—

“সসস্যার, আআপনি এতক্ষণ ফোন ধরলেন না কেন? সর্বনাশ হয়ে গেছে!”
লোকটার কণ্ঠের অস্বাভাবিক অস্থিরতা দেখে গলা শুকিয়ে এলো প্রণয়ের। অন্তরে কাঁপন ধরল। সে সোজা প্রশ্ন করল—
“কী হয়েছে? এভাবে কাঁপছ কেন? কথা না পেঁচিয়ে সোজা বলো?”
তবুও উত্তেজনা দমন করতে পারলো নাহ্ লোকটা। ফের একইভাবে কাঁপতে কাঁপতে বলল—
“স্যার, স্যার! আপনার স্ত্রীকে তিন চার ঘণ্টা আগে উদয় সরণির নিচ থেকে কারা যেন তুলে নিয়ে গেছে! আমার তো এক পা নেই, আমি কিছুই করতে পারিনি, স্যার। আমি লোকগুলোকে চিনতেও পারিনি।”
লোকটার কথা কানে পৌঁছাতেই হাত থেকে ফোনটা ছিটকে পড়লো প্রণয়ের। হাত-পা কেঁপে উঠলো ভূমিকম্পের ন্যায়। মনে হলো ধারালো নখ দ্বারা তার নরম কলিজাটা চিপে ধরেছে কেউ।
লোকটা ওপাশ থেকে “হ্যালো, হ্যালো” করছে।
হাত-পা সহ সমগ্র শরীর কাঁপতে শুরু করেছে প্রণয়ের। নিজের নার্ভের ওপর থেকে নিজেরই নিয়ন্ত্রণ উঠে যাচ্ছে তার। চোখের সামনে সব কিছু ঘোলা হয়ে আসছে।
প্রাণীকুল যেমন অক্সিজেনের অভাবে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ে, নিঃশ্বাস নেওয়ার তাড়নায় ছটফট করতে থাকে— প্রণয়েরও ঠিক তেমন হচ্ছে। মনে হচ্ছে তার প্রাণশক্তি শুষে নিচ্ছে কেউ ধীরে ধীরে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে প্রণয়ের। অক্সিজেনের অভাবে শ্বাসকষ্ট উঠে যায়।
অস্বাভাবিক রকম ছটফট করতে করতে একসময় সেন্স হারিয়ে ফেলে প্রণয়।

প্রণয়ের কন্ঠে ধ্বনিত বিকট চিৎকারে কাঁপছে পুরো শিকদার বাড়ি।
তার একেকটা হুংকার ভীতি জাগিয়ে তুলছে বাড়ির সদস্য থেকে শুরু করে চাকর-নোকর সকলের মনে। তার ক্রোধানল যেন ভস্ম করে দিচ্ছে সব কিছু।
রাগে কাঁপতে কাঁপতে ড্রয়িংরুমের টি-টেবিলটা মাথার ওপর থেকে তুলে আছড়ে ফেলল প্রণয়। কাঁচের আসবাবটা ছিটকে পড়ল অনুশ্রী বেগমের পায়ের কাছে। সাথে সাথেই বিকট শব্দ তুলে ঝনঝন আওয়াজে ভেঙে গুঁড়িয়ে গেলো। কাঁচের কয়েকটা টুকরো ছিটকে এসে গেঁথে গেল অনুশ্রী বেগমের পায়ে। ব্যথায় মৃদু আর্তনাদ করে উঠলেন তিনি।
কিন্তু এতে কোনো হুঁশ নেই প্রণয়ের। সে ক্ষেপাটে সিংহের ন্যায় পুরো বাড়ি লন্ডভন্ড করে দিচ্ছে।
তার চোখ-মুখের অবস্থা বীভৎস, ভয়ংকর!
দেখেই থরথর করে কাঁপছে সবাই, শরীরের পশম দাড়িয়ে যাচ্ছে প্রাণ ভয়ে। এগিয়ে স্পর্শ করার সাহস করতে পারছে না কেউ।

পুরো ড্রয়িংরুম মুহূর্তের মধ্যেই লন্ডভন্ড করে দিল প্রণয়। প্রত্যেকটা ছোট বড়ো আসবাবপত্র ভেঙে গুঁড়িয়ে দিল।
মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য কাছের টুকরো। ভাঙচুর করার তীব্রতায় হাত কেটে টপটপ করে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে প্রণয়ের পায়ে, ঢুকে যাচ্ছে কাঁচ। কিন্তু তার থামার কোন নাম নেই। সময় সাথে সাথে পাগলামির সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে থরথর করে। পরিস্থিতি এমন যে সে আপন সজন কাউকেই চিনতে পারছে নাহ্। যখন তখন মেরে ফেলবে যে কাউকে।
প্রচন্ড ক্রোধের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে তার চোখ-মুখের রক্তিম আভা। ফর্সা মুখটা একদম লাল হয়ে গেছে হিংস্রতায়। দেখে মনে হচ্ছে তার মানবিকতার শেষ অস্তি টুকুও ধসে পড়েছে।
ছেলের এমন রূপ দেখে মুখ চেপে কেঁদে উঠলেন অনুশ্রী বেগম। কাঁদতে কাঁদতে ছেলেকে অনুনয় করে বললেন,
“বাবা বাবা… আমার আব্বা, তুই একটু শান্ত হ বাপ, মায়ের কথা শোন, এমন পাগলামি করিস না বাবা!”
প্রণয় শুনল না। কোন কথাই তার কান দিয়ে যাচ্ছে না। সে সামনে থাকা সিঙ্গেল সোফায় লাথি দিল সজোরে। গর্জে উঠে বলল,

“আমার প্রাণের গায়ে এতটুকুও আঁচ লাগলে আমি কাউকে বাঁচতে দেব না, কাউকে নাহ্। আমি তো মরবই, তার আগে দুনিয়া জ্বালিয়ে দেব, শ্মশান বানিয়ে দেবো সব কিছু!”
“তোদের মধ্যে কে আমার দুর্বলতায় হাত দিয়েছিস? আমি জানি তোদের মধ্যে কেউ কি করেছে। প্রাণের মায়া থাকলে ভালোয় ভালোয় এখুনি বলে ফেল। কথা দিচ্ছি মারব না, আমার জানকে পেয়ে গেলে মাফ করে দেব।”
“দাদান, একটু শান্ত হ…”
সাথে সাথেই ঘাড় ঘুরিয়ে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকাল প্রণয়। চোখ দেখে বাকিটুকু গলায় আটকে গেল রাজের। বুকের উষ্ণ রক্ত ছলাত করে উঠলো ভয়ে।

অনুশ্রী বেগম শব্দ করে কেঁদে উঠলেন। যে ছেলেকে তিনি সবসময় ভুলিয়ে-ভালিয়ে শান্ত রাখতে চান, ছেলের ভেতরের জানোয়ারটাকে লুকিয়ে রাখতে চান—সেই ছেলেটাকে এভাবে পাগল বানিয়ে দিল! আমার ছেলেটার সুখ কেড়ে নিল, এখন তো আবার মৃত্যুর খেলা শুরু হবে। যদি আবার ছেলের কিছু হয়ে যায়! আর কল্পনা করতে পারেন না অনুশ্রী বেগম। বুকটা হুহু করে উঠে ব্যাথায়। নাড়ি ছেঁড়া ধন— সন্তান যতই খারাপ হোক, মা কি কখনো খারাপ বলতে পারে? ছেলেটা তো সুখেই ছিল, কত হাসিখুশি ছিল। কার নজর লাগলো?

এই ধ্বংসলীলায় বাড়ির ছোট-বড় প্রত্যেকে গুটিয়ে আছে। করো চোখ তুলে তাকানোর সাহস নেই। অনন্যা বেগম মেয়ের চিন্তায় কাঁদতে কাঁদতে মূর্ছা যাচ্ছেন বারবার। প্রীতম দেশের বাইরে, সাজিদ শিকদার সিলেট, সাদমান শিকদার এখনো বাড়ি ফেরেননি। প্রণয়ের এমন পাগলামিতে বাড়ির অন্যরা প্রিয়তার জন্য দুশ্চিন্তা করার সুযোগটাও পাচ্ছে না। আগে নিজেদের জন্য চিন্তা হচ্ছে। প্রত্যেক মুহূর্তে মনে হচ্ছে, প্রণয় বুঝি এখুনি তাদের মেরে ফেলবে।
সদর দরজা খোলা পেয়ে বেল না বাজিয়েই ভেতরে ঢুকে গেল প্রিয়স্মিতা। সাথে সাথেই একটা উড়ন্ত ফুলদানি এসে আঁচড়ে পড়ল পায়ের কাছে। পরিবেশ দেখে বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল প্রিয়স্মিতা। কী হচ্ছে—পুরো ব্যাপারটাই তার মাথার ওপর দিয়ে গেল। সে অবাক নেত্রে চাইল আগ্রাসী প্রণয়ের পানে। এতদিন যার এত ঠান্ডা ব্যবহার দেখে অভ্যস্ত প্রিয়স্মিতা, তার এমন রূপ হজম হচ্ছে না। যদিও জানে যে এর অসলরুপ এমনি, তবুও নিজের চোখে দেখে ভয় লাগছে। অজান্তেই ঢোক গিলল প্রিয়স্মিতা। চোখ বড় হয়ে এল আপনাআপনি। সে যতটা ভয়ংকর হবে ভেবেছিল, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি ভয়ংকর প্রণয়।

প্রিয়স্মিতার উপস্থিতি টের পেতেই ঘাড় কাত করে তাকাল প্রণয়। সাথেই উগ্র মেজাজে পেট্রোল পড়ার মতো অনুভূত হল। ধক করে আগুন ধরে গেল যেনো। প্রণয় ঝড়ের বেগে পৌঁছে গেল প্রিয়স্মিতার সামনে। হালকা ভয় পেল প্রিয়স্মিতা। সকলে ভয়ে আরেকটু সিটিয়ে গেলেন। এখানে কী হয়েছে জানে না প্রিয়স্মিতা, কিন্তু আজ কেন জানি প্রণয়ের চোখে তাকানোর সাহস পেল না।
প্রণয় তাকে কিছু ভাবার বা বলার সময় দিল না। তড়িৎ বেগে গলা চেপে ধরল, কপালে রিভলবার ঠেকিয়ে বীভৎস কন্ঠে হুংকার দিয়ে বলল,

“আমার রক্তজবা কোথায়? আনসার মি বিচ!”
আঁতকে উঠে নিজের মুখ চেপে ধরলেন সকলে। গলা চেপে ধরার তীব্রতায় সেকেন্ডের মাথায় কাশি উঠে গেল প্রিয়স্মিতার। দম উঠে এল নাকের কাছে। প্রণয়ের হাত থেকে গলা ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল,
“আআআমি জানি না, ছাড়ুন আমায়।”
জবাব শুনে আগুনের হলকার ন্যায় ক্রোধের আগুন যেন আরো বেড়ে গেল। প্রিয়স্মিতার গলায় পাঁচ আঙুলের ছাপ বসিয়ে দিয়েছে প্রণয়। চোখ উল্টে আসছে প্রিয়স্মিতার। পশুর থেকেও জঘন্য আচরণ করছে প্রণয়। রিভলবারের নল ঠেসে ধরে ফেসফেসে কন্ঠে বলল,
“জাস্ট থ্রি কাউন্ট-এর মধ্যে যদি না বলছিস, আমার ভালোবাসার কসম তোকে এভাবেই জিন্দা দাফন দিয়ে দেব।”
“বিশ্বাস করুন আমি কিছু করিনি!”
“জাস্ট শাট আপ, ফাক ইউর ট্রাস্ট!

তোর লড়াই তো আমার সাথে ছিল তাইনা? তুই তো আমাকে খুন করতে এসেছিলি। আমি কি তোরে কিছু বলেছি নাকি বাধা দিয়েছি? তাহলে আমার নিষ্পাপ ফুলটার দিকে কেন হাত বাড়ালি? কেনো আমার কলিজায় হাত দিলি বল? এটা করতে তোর বুক কাঁপল না একবারও?
একবারও ভাবলি না ওকে আমি কত ভালোবাসি? আমার প্রাণ ও। তোর তো আমার শরীরের মধ্যে থাকা প্রাণটা প্রয়োজন ছিলো, ওটা নিয়ে নিতি। মেরে দিতিস আমাকে। তোকে তো বাঁধা দেইনি।
আনসার মি বাস্টার্ড!”
প্রণয়ের বাক্য গুলো শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলেন সকলে। কিন্তু প্রিয়স্মিতা বারবার বলার চেষ্টা করছে যে সে এখানে কিছু করেনি। কিন্তু কিছুই শুনতে চাচ্ছে না প্রণয়।

প্রিয়স্মিতা নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে দেখে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো চারপাশে। আর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না কেউ। প্রাণের মায়ায় ভুলে ঝাঁপিয়ে পড়ল রাজ, প্রেম, অরণ্য, সমুদ্র, সোহেব শিকদার। প্রণয়কে ছাড়ানোর চেষ্টায় মরিয়া হলেন তারা। তারা ৫ জন শক্ত সামর্থ্যবান জোয়ান মিলেও প্রণয় কে টেনে সরাতে ব্যার্থ হচ্ছে। যেন এক পুরুষের শরীরে ১ হাজার হাতির জোর! প্রণয় মশা-মাছি তাড়ানোর মতো সবাইকে ঝাড়া মেরে গা থেকে ফেলে দিচ্ছে।
এরকম বার বার হওয়াতে তাদের উপরই চড়াও হয়ে গেল প্রণয়।
প্রিয়স্মিতাকে ছেড়ে ভাইদের দিকে তেড়ে এল। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে মারতে শুরু করলো প্রেম, রাজ, অরণ্য, সমুদ্রদের। তারা মার খাচ্ছে, তবু ও ঠেকাতে পারছে না।
আচমকা পেছন থেকে জাপটে ধরল শুদ্ধ। সে মাত্রই ফিরেছে, কিন্তু পরিস্থিতি এমন দুরবস্থা দেখে নিজেও ঘাবড়ে গেছে কিছুটা। শুদ্ধ চেঁচিয়ে বলল,

“তুই কী পাগল হয়ে গেছিস? কী হয়েছে? নিজের ভাইদের এভাবে মারছিস কেন? হুঁসে আয়।”
প্রণয় রাগে ফুষতে ফুসতে আবার তেড়ে গেলো প্রেমের গায়। ব্যাঘ্র থাবা বসে বলল,
“আমি সবাইকে মেরে ফেলব! আমি কাউকে বাঁচতে দেবো নাহ্। আমার জান, আমার ভালোবাসার গায়ে যদি এতটুকুও আঁচ লাগে! রক্তগঙ্গা বসিয়ে দেবো! আমার ভালবাসা এনেদে শুদ্ধ, আমার প্রাণটা আমার বুকে এনেদে। এরা আমায় দুটো দিন শান্তিতে বাঁচতে দিলো না রে ভাই।”
প্রণয়ের কথা শুনে বুকের ভেতর মুচড়ে উঠল শুদ্ধর। সেও উন্মাদ হয়ে গেলো মুহূর্তেই। প্রণয়কে ঝাঁকিয়ে বলল,
“প্রিয়তা কোথায়? কী হয়েছে? এই এই কথা বলছিস না কেনো?”
প্রণয় আর কিছু বলতে পারল না। আচমকাই তার বিশাল শরীর কাঁপতে লাগল। সহসাই বুক চেপে ধরলো প্রণয়। চারপাশের পৃথিবী মুহূর্তেই অন্ধকারে ডুবে গেল। আবারো নিঃশ্বাস আটকে এল তার। অক্সিজেনের অভাবে ছটফট করতে করতে লুটিয়ে পড়ল মেঝেতে। মুখ দিয়ে সাদা সাদা ফেনা জাতীয় কিছু উঠে এল।
“ওহ মাই গড! মাইনর অ্যাটাক!”

মেয়েদের দলবদ্ধ কান্না আর গোঙানোর আওয়াজে চোখ-মুখ কুঁচকে আসে প্রিয়তার। প্রতিক্রিয়া দেখা যায় চেহারায়। দীর্ঘ ৯ ঘণ্টা পর তার জ্ঞান ফিরছে ধীরে ধীরে। ক্লোরোফর্মের ভারী অভিজ্ঞতা প্রভাব এখনো যায়নি মস্তিষ্ক থেকে।
হঠাৎ জ্ঞান ফেরাতে তীব্র ব্যাথায় ঝিনঝিন করতে করতে মাথাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে ব্যথায় প্রিয়তার। সে বুঝতে পারছে না সে আছে কোথায়।
প্রিয়তা হাত-পা নাড়ানোর চেষ্টা করে, কিন্তু একি! একচুল ও নাড়াতে পারে নাহ্। বার বার আপ্রাণ চেষ্টা করে ও ব্যর্থ হয়। মাথা ফাঁকা হয়ে আসে প্রিয়তার। এটা কেমন একটা জায়গা? তার নিঃশ্বাস নিতেও কেন কষ্ট হচ্ছে?
হাত-পা কচলাতে কচলাতে ছটফটিয়ে উঠল প্রিয়তা। প্রায় মিনিট ১০ সময় নিয়ে পুরোপুরি চোখ মেলতে সক্ষম হলো। তবে সামনের সবকিছু ঘোলা ঘোলা লাগছে। হাত বাঁধা থাকার দরুন চোখ কচলাতে পারল না প্রিয়তা, তবে ধীরে ধীরে সামনের সবকিছুই পরিষ্কার হয়ে লাগলো।

ব্রেন সম্পূর্ণ সচল হতেই চারপাশের পরিবেশ দেখে পিলে চমকে উঠল প্রিয়তার। হাড়হীম করা ভীতি ছড়িয়ে পড়ল শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। এখানে সে পৌঁছালো কিভাবে বুঝে আসলো না প্রিয়তার। সে দড়ি দিয়ে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় মেঝেতে পড়ে আছে। মুখে টেপ। কেবল মায়াবী বড় চোখ দুটো বিস্ময় নিয়ে দেখছে সব কিছু।
তার সামনে, পিছে, আশেপাশে অসংখ্য অসংখ্য যুবতী মেয়ে—কেউ সজ্ঞানে তো আবার কেউ সেন্সলেস হয়ে পড়ে আছে। প্রায় অনেকের শরীরেই আঁচড়, কামড় আর যৌন নির্যাতনের স্পষ্ট চিন্হ। আবারো কেউ সম্পূর্ণ বস্ত্রহীন।
এসব সহ্য হয়না প্রিয়তা। ছোট্ট মনটা সহসা ভয়ে কুঁকড়ে যায়। চোখ খিচে ফেলে সাথে সাথেই।
বাইরের পৃথিবীর নোংরা আবর্জনা থেকে অনেক দূরে, ডিমের খোলোসের ন্যায় বুকের ভেতর ভরে রেখেছিল প্রণয়। নিজের শক্তপোক্ত আবরণে আচ্ছাদিত করে রেখেছে সর্বদা। এমন একজন মানুষের ছায়াতলে বেড়ে ওঠা প্রিয়তা পূর্বে কোনোদিন এসবের সম্মুখীন হয়নি। এই অভিজ্ঞতা তার জন্য সম্পূর্ণ নতুন।
প্রিয়তার শরীরে কাটার মতো বিধে প্রণয়ের অভাব। সে এই দৃশ্য থেকে পালিয়ে লুকিয়ে পড়তে চায় প্রণয়ের সুরক্ষিত বুকে। মৃত্যু আসলে ও যে বুকটা তাকে বাঁচিয়ে নেবে।
প্রিয়তার মন বলে এই বুঝি প্রণয় ছুটে আসবে। বুকে আগলে নিয়ে কপালে তপ্ত ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বলছে—

“ভয় নেই জান, আমি তো আছি।”
কিন্তু পরক্ষণেই ঘরটার ঠান্ডা হাওয়ায় প্রিয়তার ভ্রম ছুটে যায়।
ফট করে চোখ মেলে সে। আবারো সেই একই দৃশ্য দেখে প্রণয়ের সুরক্ষিত ছায়া তলে হাতড়ায় অসহায়ত্বে। কান্না করে মনে মনে ডাকে—
“আপনি কোথায় প্রণয় ভাই? আমার খুব ভয় করছে। আমাকে আপনার কাছে নিয়ে যান প্রণয় ভাই…”
অশান্তিতে হাহাকার করে ওঠে প্রিয়তা। দুই চোখ বেয়ে গল গল করে গড়িয়ে পড়ে পানি। নাজুক মেয়েটা আশেপাশে তাকাতে ও ভয় পায়।
একদম গুটিয়ে যায়। তখন তার জামা থেকে ভেসে আসে সেই চিরাচরিত অতি প্রিয় গন্ধটা। ঘ্রাণটা নাসারন্ধ্রে পৌঁছতেই প্রিয়তার নার্ভ সচল হয়। তড়িৎ গতিতে নিজের জামার কলারটা টেনে নেয় নাকের কাছে। তার সারা শরীর থেকে প্রণয় প্রণয় একটা তীব্র গন্ধ আসছে।
ছটফট করতে থাকা প্রিয়তার মনে শান্তি আসে। প্রণয় কোথাও নেই, তবু ও যেনো প্রণয় আছে। সে অদৃশ্য থেকে প্রিয়তার মাথায় হাত রেখে বলছে—

“ভয় পাচ্ছিস কেন জান, আমি তো আছি। তোর প্রণয় ভাই থাকতে তোর কিসের ভয়।”
প্রিয়তা একটু শান্ত হয়। সাথে তার খুব জানতে ইচ্ছে হয়—প্রণয় ভাই কি জেনে গেছে যে সে হারিয়ে গেছে? সে কী তাকে খুঁজছে? তার মানুষটা কি তাকে দেখতে না পেয়ে অস্থির হয়ে গেছে? পাগলামি করছে নিশ্চয়ই। সে ছাড়া আর যে কেউ ওই অধৈর্য মানুষটাকে শান্ত করতে পারবে না।
প্রিয়তার কুটোর ভরে উঠে পুনরায়। আহা, আর কী সেই প্রিয় মুখটা দেখতে পারবে নাহ্ প্রিয়তা? আর কী সেই প্রিয় বুকে মুখ গুজার সৌভাগ্য হবে নাহ্?
আর কি কোনোদিন ফিরতে পারবে না তার প্রণয় ভাইয়ের কাছে? এমনটা হলে তো কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মরে যাবে প্রিয়তা। এসব ভাবতে ও পারে নাহ্। বুকে ব্যাথা হয়।
আচ্ছা, সে যদিও মরে যায়, প্রণয় ভাই কি তাকে খুঁজে পাবেন?

এসব ভাবতে ভাবতে চোখের কোণা বেয়ে নোনা জলের স্রোত গড়িয়ে নামে প্রিয়তার গাল বেয়ে। সে ভয় ভয় আবার তাকায় মেয়েগুলোর দিকে। বিশাল আকৃতির একটা বদ্ধ ঘরে একই প্রক্রিয়াতে শত শত মেয়েকে বেঁধে রাখা হয়েছে।
কিন্তু এদের কেন আটকে রেখেছে? পাশের রুমগুলো থেকেও কেমন গলা ফাটানো আর্তনাদ ভেসে আসছে। আবার হঠাৎ করেই সবকিছু নিশ্চুপ হয়ে যাচ্ছে, যেনো তাদের কন্ঠ রোধ করে দিচ্ছে কেউ। ওই ঘরগুলোতে আবার কী হচ্ছে?
পারিপার্শ্বিক পরিবেশ দেখে নরম-সরম মেয়েটা ভীষণ ভয় পায়। কিন্তু সাথে এটাও বোঝে যায় যে এখানে বাঁচানোর জন্য প্রণয় ভাই নেই। তাই এখানে কেউ বুকে আগলে নিয়ে বলবে না—

“ভয় নেই, আমি তো আছি।”
এখানে প্রিয়তা কে নিজের ব্যবস্থা নিজেকেই করতে হবে।
তৎক্ষণার ধপ ধপ করে করিডোরে ভারী বুটের শব্দ আসে। প্রিয়তা নিঃশ্বাস আটকে সেই পদধ্বনি শুনে। কিছুক্ষণ পর দূরে চলে যায় শব্দটা।
প্রিয়তা নড়েচড়ে বসে আবারো সতর্ক দৃষ্টি ফেলে আশেপাশে ধারালো কিছু খোঁজে। কিন্তু বিধি বাম, কিছুই নজরে আসে না। হতাশ হয় প্রিয়তা।
তার পাশের মেয়েটা অনবরত প্রলাপ বলছে। অত্যাচার ও নির্যাতনে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছে হয়তো।
প্রিয়তা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে। একটু দূরে তাকাতেই নজরে আসে একটা মেয়ে। সব মেয়েগুলো কাঁদলেও এই মেয়েটা কাঁদছে না। কেমন স্থির, শান্ত, মৃত জড়বস্তুর ন্যায় পড়ে আছে এক পাশে। এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে সামনের ওয়ালের দিকে।

বেশ খটকা লাগলো প্রিয়তার। সে আরও দেখলো কোনো কারণবশত বোধহয় মেয়েটার হাতের বাঁধন কিছুটা ঢিলে। তবুও পালানোর বিন্দুমাত্র প্রয়াস নেই মেয়েটার মধ্যে। যেন মেনে নিয়েছে নিজের ভাগ্যকে।
মেয়েটার হাতের বাঁধন খোলা যাবে ভাবতেই প্রিয়তার চোখ দুটো চকচক করে ওঠে। সে বেশি ভাবে না। একটু একটু করে শরীর টেনে টেনে পৌঁছে যায় মেয়েটার কাছে। মুখ বাঁধা থাকার দরুন ডাকতে পারে না, কেবল মুখ দিয়ে—
“উমম উমম।”
তবুও মেয়েটার কোনো হেলদোল দেখা যায় না। প্রিয়তা ওকে ঠেলা দেয়, কিছু বলতে চায়। তবুও মেয়েটা ফিরে তাকায় না।
প্রিয়তা ভাবে—কী আশ্চর্য! মেয়েটা কি পাগল নাকি বোবা?
তবুও পুনরায় চেষ্টা করে প্রিয়তা। নিজের বাধাপ্রাপ্ত হাত দুটো তুলে মেয়েটার কাঁধে স্পর্শ করার চেষ্টা করে।
সাথে সাথেই তড়িৎ বেগে প্রিয়তার দিকে ফিরে তাকায় মেয়েটা। হঠাৎ এমন হওয়াতে ভয়ে লাফিয়ে ওঠে দূরে সরে প্রিয়তা।

“উমম উমম…”
প্রিয়তা কিছু বলার চেষ্টা করতেই আচমকা মেয়েটা কেমন করে উঠল। প্রিয়তা কিছু বুঝে ওঠার আগেই কনুই দিয়ে ঠেলে তাকে আরও দুজনের চিপায় ফেলে দিল। প্রিয়তা সোজা হওয়ার আগেই সামনে গিয়ে প্রিয়তাকে আড়াল করে বসে পড়ল।
শক্ত মেঝেতে পড়ে সামান্য ব্যথা পেল প্রিয়তা। নিজেকে সামলানোর আগেই বাহির থেকে ভেসে এলো বুট জুতোর শব্দ। ভেসে আসা আওয়াজের সাথে যেন আরও বেশি কুঁকড়ে যাচ্ছে মেয়েগুলো।
অজানা আশঙ্কায় শরীর কাঁটা দিয়ে উঠল প্রিয়তার। সে আরও সিঁটিয়ে গেল। চেপে লুকিয়ে পড়ল মেয়েটার পিছনে।
ধড়াম করে দরজা খোলার শব্দ হওয়াতে ফের কেঁপে উঠল প্রিয়তা। চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিল। ঘরের মধ্যে একে একে প্রবেশ করল সন্তোষ। সাথে স্যুট-বুট পরিহিত মার্জিত চেহারার কয়েকজন স্বদেশি ও বিদেশি লোক।
আগত লোকগুলোর মধ্যে একজন বলছে—

“টাটকা হবে তো? আমার আবার বাসি জিনিস পছন্দ নয়।”
অন্যজন পকেটে হাত গুঁজে মেয়েগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল—
“Multiple variety, I like it! By the way, পছন্দমতো বেছে নিতে পারব তো?”
সন্তোষ তাদের তালে তাল মিলিয়ে বিশ্রিভাবে হাসল। হেসে হেসে বলল—
“অবশ্যই স্যার। আপনার জন্যই তো এত খুঁজে খুঁজে সেরা সেরা মালগুলো নিয়ে আসি। দেখুন কত সুন্দর সুন্দর টসটসে। আপনারা তো জানেনই আমাদের বসের আন্ডারে বাসি জিনিস চলে না।”
লোকগুলোর ইঙ্গিতপূর্ণ কথার মর্মার্থ বুঝতে একটুও কষ্ট হলো না প্রিয়তার। লোকগুলো যে কিসের ইঙ্গিত করছে ভাবতেই কলিজার পানি শুকিয়ে এলো। সারা শরীরে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হল।
ঘৃণায় গা গুলিয়ে বমি পাচ্ছে প্রিয়তার। এদের দৃষ্টিতে পড়লে আজকেই তার শেষ দিন। আবারো মনে পড়লো প্রণয়ের কথা। তার সেই বলিষ্ঠ বাহু, যেখানে কতোটাইনা নিরাপদ ছিলো সে।
আতঙ্কে আরো সিঁটিয়ে গেল প্রিয়তা। নিজের সম্মান বাঁচানোর চেষ্টায় সে তৎপর। প্রয়োজনে প্রাণ দিয়ে দেবে, তবুও ইজ্জত দেবে না।

স্বদেশী লোকটা বললো—
“তাহলে চয়েস করি?”
বাঁকা হাসলো সন্তোষ।
“ইয়েস অফকোর্স! এখানে হাজারের ওপর মাল আছে। যেটা যেটা চাই—১টা, ২টা, ৩টা, যে কয়টা পারলে সব কয়টা। আরো মাল আনা হবে।”
লোকগুলো লোলুপ দৃষ্টিতে তাকাল মেয়েগুলোর দিকে। কী বিশ্রী তাদের হাসি! মুখ দিয়ে যেনো লালসায় লালা ঝরছে। তাদের দৃষ্টি এতটাই নোংরা যে সারা শরীর জ্বলছে প্রিয়তার।
তার সামনে বসা মেয়েটা মনে হচ্ছে প্রাণপণে ঢাকার চেষ্টা করছে প্রিয়তাকে। প্রিয়তাও ছোট্টখাট্ট খরগোশের বাচ্চার মতো, তাই সহজেই আড়াল হয়ে যাচ্ছে।
লোকগুলো তাদের পছন্দমতো মেয়ে বাছাই করতে শুরু করল। যেন বেছে বেছে বাজারের টাটকা মাছ, মাংস, সবজী তরকারি কিনছে। নতুন আনা মেয়েগুলো চিৎকার দিয়ে কাঁদছে। কেউ যেতে অসম্মতি প্রকাশ করলে তাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

প্রিয়তার মনে হচ্ছে কলিজাটা বুঝি লাফাতে লাফাতে এক্ষুনি মুখ দিয়ে উঠে আসবে। তার বারবার মনে হচ্ছে সে বুঝি এক্ষুনি ধরা পড়ে গেল।
তার মধ্যে একটা বিদেশি লোককে এদিকে এগিয়ে আসতে দেখে প্রিয়তার সামনে বসা মেয়েটা মাথা এলিয়ে ঢাকল প্রিয়তাকে। ভয়ে চোটে দোয়া-দরুদও ভুল করছে প্রিয়তা।
লোকটা সামনে বসা মেয়েটার দিকে তাকাল। মেয়েটার জায়গায় জায়গায় আঁচড়-কামড়ের দাগ দেখে খুব ভালো মতোই বোঝা যাচ্ছে সকালে কিংবা দুপুরে ইচ্ছামতো নির্যাতন চালিয়েছে কেউ।
ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অন্য দিকে চলে গেল লোকটা।
লোকগুলো তাদের পছন্দমতো একাধিক মেয়ে বেছে নিল। সন্তোষ বাঁকা হেসে চোখ টিপ দিয়ে বলল—
“গুড নাইট।”

লোকগুলোও মনের সুখে চলে গেল তাদের রাত রঙিন বানাতে।
সন্তোষ চার পাশে দৃষ্টি বুলিয়ে খুঁজল সেই অনিন্দ্য সুন্দরীকে, যাকে বিকেলেই তুলে আনা হয়েছে। মেয়েটাকে দেখা মাত্রই তার মাথা নষ্ট হয়ে গেছে। ইসস, এতো সুন্দর কেউ হয়! দেখেই বুঝা গেছে ভীষণ নরম হবে এই শরীর। ভোগ করলে যেই তৃপ্তি আসবে তা হয়তো সন্তোষ তার ইহজ জীবনে অন্য কোন মালের মধ্যে পায়নি।
তার সাধারণত মেয়েতে তেমন একটা ঝোঁক নেই। এখানে আসা প্রত্যেকটা মেয়েকেই কেমন ঘৃণার চোখে দেখে। সবগুলোই নোংরা লাগে। তবে আজকের মেয়েটাকে দেখা মাত্রই তার সারা শরীরে কামনার আগুন ধরে গেছে।
নিয়ত করে রেখেছিল আজ রাতে এটা সে নেবেই নেবে। কিন্তু এখন চারপাশ খুঁজেও মেয়েটা যখন দেখতে পেল না, তখন ভীষণ রাগ হলো। ধরে নিল তার এখানে আসার আগেই পিউরিসান নিয়ে গেছে।
রাগে শরীর জ্বলে গেল সন্তোষের। সে তো আর বসের এসিস্ট্যান্টকে কিছু বলতে পারবে না। তাই মেয়েগুলোর দিকে তাকিয়ে দাঁত খিঁচিয়ে কটা বিশ্রি গালি দিয়ে বলল—

“আমি পাশের ঘরেই একটা মাগি। ও যদি শব্দ করেছিস, এসে সব গুলোকে জ্যান্ত জবাই দেবো। একটু পর খাবার দেবে, গিলে চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়ব। চেহ!”
বলে হনহনিয়ে চলে গেল সন্তোষ।
লোকগুলো যেতেই বাকি মেয়েরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল প্রত্যেকে। এতক্ষণের চাপা রাখা কান্নাটা আর দমিয়ে রাখতে পারল না প্রিয়তা। ঠোঁট কামড়ে ধরে কেঁদে উঠল। বিড়বিড় করে বলল—
“হায় আল্লাহ! শেষ পর্যন্ত কিনা পতিতা লয়ে এসে পড়লাম! আল্লাহ তুমি মৃত্যু দাও, তবুও এদের মতো জানোয়ারদের হাতে তুলে দিও না।”
সামনে বসা মেয়েটার কথা শুনে থেমে গেল প্রিয়তা। চোখ তুলে চাইল মেয়েটার দিকে। মেয়েটার চোখ দুটো জ্বলছে প্রতিশোধের আগুনে।
কিছুক্ষণ আগে যে মেয়েটাকে সে পাগল কিংবা বোবা ভেবেছিল, সেই মেয়েটাই আজ তার জীবন রক্ষা করেছে।
মেয়েটা বলল—

“এটা পতিতালয় নয় মেয়ে। এরা একটা চক্র, যারা দেহ ব্যবসা করে, নারী পাচার করে, নিজের আনন্দের জন্য মেয়েদের তুলে এনে ভোগ করে। এগুলো একেকটা পিশাচ। তুমি কী মরার জন্য আর কোনো জায়গা পেলে না, এখানেই আসতে হলো।”
মেয়েটার কথা শুনে আরো বেশি ঘাবড়ে গেল প্রিয়তা। আতঙ্কে জমে ঠান্ডা হয়ে গেল তার হাত-পা। অস্ফুট কণ্ঠে বলল

“চ-চক্র?”
মেয়েটা ধীরে বলল—
“হ্যাঁ, এই যে যেটা দেখছ, এটা আস্ত একটা নরক। না, না—শয়তানের গুহা! এখানে একটা ও মানুষ পাবে নাহ্। সব গুলো পিশাচ।
এখানে হয় না এমন কিছু নেই। এখানে এমন কিছু হয় যা তুমি সহ্য করতে পারবে না। এখানে আছ মানে এই ঘরটাই তোমার জন্য উপযুক্ত নিরাপদ। বাইরে পা রাখলে এমন কিছু দেখতে পাবে, যা দেখার কথা তুমি কোনোদিন স্বপ্নেও কল্পনা করোনি।”
“ক-ক-কী?”
মেয়েটা তাচ্ছিল্য করে হাসল। আলগা থাকা হাতের বাঁধনটা নিজে নিজেই খুলে বলল—
“থাক, ওসব না জানাই ভালো। জানলে সহ্য না-ও হতে পারে। তবে নিজেকে তৈরি রাখো মেয়ে। এদের পরবর্তী শিকার অবশ্যই তুমি।”

“নাহহহহ!”
“আমিও এমনই বলেছিলাম, কিন্তু আমায় ছাড় দেওয়া দেয়নি। এই যে দেখতে পাচ্ছো—শিয়াল শকুনের মতো খুবলে খুবলে খেয়েছে। এই যে দেখছো এদেরকেও ছাড় দেওয়া হয়নি। যারা নতুন তাদেরও ছাড়বে নাহ্।
মূলত এখানে যারা আসে তাদের কাউকেই ছেড়ে দেওয়া হয়না। এই জানোয়ার গুলোর আবার একটা নীতি আছে—তারা জিনিস বার বার খায় নাহ্। মানে এক মেয়েকে দ্বিতীয়বার বিছানায় নেয় না। প্রতিবার তাদের নতুন নতুন মেয়ে লাগে, নতুন নতুন শরীর লাগে, নতুন নতুন গন্ধ লাগে। আর নিজেদের খায়েশ মেটানো শেষ হলে বিদেশে পাচার করে দেয়।”
মেয়েটা বলতে বলতে লক্ষ করছে প্রিয়তা প্যানিক করছে। তার দৃষ্টিতে জমাট বাধাবনো ভয়।
মেয়েটা ফের হাসল। প্রিয়তার মাথায় হাত রেখে বলল—
“ঘাবড়ে কোনো লাভ নেই। এর থেকে ভালো নিজেকে প্রস্তুত করো। আল্লাহর কুরআনে বর্ণিত ইবলিশের অস্তিত্ব আমি দেখিনি, কিন্তু আল্লাহর তৈরি রক্ত-মাংসের ইবলিশকে নিশ্চয়ই দেখেছি। একদম মাকাল ফল—বাহির থেকে যতটা সুন্দর দেখতে, ভেতর ঠিক ততটাই কুৎসিত।”

“ক-কে?”
“ওদের বস ASR। খুব সুন্দর, সুদর্শন। এতই মায়াবী যে একবার দেখলে তুই ভুলতে পারবি নাহ্। কিন্তু ওর আসল চেহারা দেখলে ঘৃণায় ওর দিকে থু ও ফেলবি নাহ্।”
ASR নামটা খুব শোনা শোনা লাগল প্রিয়তার। কোথায় যেনো শুনেছে। একটু ভাবতেই মনে পড়ল—হ্যাঁ, এই নামে তো দুদিন পর পরই সংবাদপত্রে, নিউজ চ্যানেলে রিপোর্ট হয়। বর্তমান সমাজের সব থেকে বড় হুমকি যাকে বিগত ৯-১০টা বছর বিভিন্ন দেশের সরকার হন্যে হয়ে খুঁজছে। তার ক্রীয়াকলাপ সম্মন্ধে সবাই জানে।
প্রিয়তার ভাবনার মধ্যেই মেয়েটা প্রিয়তার গালে মুখে হাত বুলাল। আক্ষেপের সুরে বলল—
“বাহ! তুই তো খুব সুন্দর। দেখেই বোঝা যাচ্ছে কারো আদরের দুলালি, যত্নে গড়া ননীর পুতুল। আহারে, এখানে কেনো এলি!”
মেয়েটার কথা শুনে আবারো প্রণয়ের কথা মনে পড়ে গেলো। সুদর্শন মুখটা চোখে ভাসতেই ছটফট করে উঠল প্রিয়তা। সে কিছুতেই এখানে শেষ হয়ে যেতে পারে না। তাকে না পেলে তার প্রণয় ভাই নিশ্চিত পাগল হয়ে যাবে। তাই যে করেই হোক এই নরক থেকে তাকে মুক্তি পেতেই হবে।

“কী ভাবছো?”
প্রিয়তা অসহায় কন্ঠে জবাব দিলো—
“আমাকে এখান থেকে পালাতে হবে আপু।”
মেয়েটা কেমন তাচ্ছিল্য করে হাসল। প্রিয়তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল—
“বোকা মেয়ে, এত সরল হলে চলে? এখান আসা একটা মশা-মাছি গলতে পারে না এদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে, আর তুই তো মানুষ! শুয়ে পড় বোন। আজকের রাতটা ঘুমিয়ে নে। কি জানি কালকের সূর্যোদয়টা তোর জন্য কিরকম হবে। কালকের পর হয়তো তোর এই সুন্দর শরীরটাকে বয়ে বেড়ানোই তোর জন্য সব থেকে বেশি চ্যালেঞ্জিং হবে।”
প্রিয়তার মনোবল গুড়িয়ে যেতে লাগল মেয়েটার কথা শুনে। সে মেয়েটার সামনে কাকুতি মিনতি করে বলতে লাগল

“প্লিজ আপু, আপনার তো হাত খোলা। আপনি দয়া করে আমার হাতটা খুলে দিন। আমাকে যেতে দিন। আপনার পায়ে পড়ি, দয়া করুন। আমার প্রণয় ভাই হয়তো অনেক কষ্ট পাচ্ছেন আমার জন্য।”
প্রিয়তার কথা শুনে ভ্রুদ্বয়ের সন্ধিক্ষণে ভাঁজ পড়ল মেয়েটার।
“প্রণয় কে?”
হাঁসফাঁস করে উঠল প্রিয়তা। কাঁপা গলায় বলল—
“আমার পৃথিবী, আমার স্বামী।”
“তুই বিবাহিত?”
প্রিয়তা ওপর-নিচ মাথা ঝাঁকাল।
মেয়েটা জহুরি চোখে পর্যবেক্ষণ করল প্রিয়তাকে।
“খুব ভালোবাসে তোকে?”
প্রিয়তা ফের ওপর-নিচ মাথা ঝাঁকাল।
পুনরায় তাচ্ছিল্য হাসল মেয়েটা। প্রিয়তার হাতের বাঁধন খুলতে খুলতে আফসোস করে বলল—
“যখন জানবে তোর সাথে কী কী হয়েছে, না জানি কত কষ্ট পাবে। কি জানি আদো জানতে পারবে কী না। কী করবি, সব নসিব।”

প্রিয়তার হাত দুটো মুক্ত করে দিল মেয়েটা। এতক্ষণ শক্ত করে বেঁধে রাখার দরুন প্রিয়তার ফর্সা হাতের নরম চামড়াগুলো ফুলে লাল হয়ে গেছে। প্রিয়তা ঝট করে বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
“কোথায় যাচ্ছিস?”
“মুক্তির সন্ধানে।”
বলেই দ্রুত যাওয়া ধরল প্রিয়তা।
মেয়েটা তাচ্ছিল্য হাসলো—
“পিপীলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে। একটা রাত তোকে বাঁচিয়ে দিলাম, পছন্দ হলো না? যা যা, শরীর বিলিয়ে দে।”
মেয়েটার কথায় বুক কাঁপল প্রিয়তার। তবুও সেখানে দাঁড়িয়ে রইল না, কারণ সে জানে সে ওখানে থাকলে আজ না হোক কাল এরা তাকে ছাড়বে নাহ্। তাই নিশ্চিত হার কোনোভাবেই মেনতে রাজি নয় প্রিয়তা। প্রয়োজনে আজকেই শেষ দিন হোক, তবুও শেষ দেখেই ছাড়বে। যদি মৃত্যু এভাবেই কপালে লেখা থাকে তবে তাই হোক।

হাসপাতালে এনে দ্রুত সিপিআর দিতেই জ্ঞান ফিরে আসে প্রণয়ের। সবটা জানার পর প্রণয়ের মতোই আরো দ্বিগুণ উন্মাদনা নিয়ে বেরিয়ে যায় শুদ্ধ। কোথায় গেছে কে জানে।
তবে জ্ঞান ফেরা মাত্রই আবারো আগের মতো হয়ে যায় প্রণয়। বলা বাহুল্য আগের থেকেও বেশি আগ্রাসী হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে সবার উপর। তার উগ্রতার মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে যায়। তাকে সামলাতে হিমশিম খেতে হয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। প্রণয়কে চারপাশ থেকে বিছানার সাথে হাত-পা চেপে ধরেছে ওয়ার্ড বয়রা।
ডাক্তার ঘুমের ইনজেকশন দিতে চান, যাতে আরো কিছুটা সময় অন্তত শান্ত থাকে। এভাবে বার বার এ্যাটাক আসলে তো কোমায় চলে যাবে। তবে তিনি কিছুতেই প্রণয়ের কাছাকাছি যেতে পারছেন নাহ্।
তার অস্বাভাবিক পেশিবলের নিকট তুচ্ছ হয়ে যাচ্ছে সকলে। সবাইকে ঝাড়া মেরে ফেলে উঠে বসে প্রণয়। তার শরীর স্থির নয়, এখনো পূর্বের ন্যায় কাঁপছে থরথর করে।
আবারো সবাই ধরতে ছুটে এলে হুংকার দিয়ে ওঠলো প্রণয়—

“আর এক পা ও এগোনোর দুঃসাহস দেখালে এখানেই লাশ ফেলে দেব সবগুলোর!
আমার পথ থেকে সরে দাঁড়া সবগুলো, যেতে দে আমায়!”
প্রণয়ের হুংকারের উচ্চধ্বনি প্রতিফলিত হচ্ছে পুরো হাসপাতাল চত্বরে। তার চিৎকারে কানে তালা পড়ে যাওয়ার উপক্রম।
হাসপাতাল করিডোরে বসে একনাগাড়ে বিলাপ করছেন অনুশ্রী বেগম। কেউ সান্ত্বনা দেওয়ার কোনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না। সত্য তো তারাও ভয় পাচ্ছে, আতঙ্কে কাঠ হয়ে আছে প্রত্যেকে। ইতিমধ্যে পুলিশ কমপ্লেন করেছে তারা, কিন্তু লাভ হবে বলে আশা নেই। কিন্তু সত্যি যদি মেয়েটাকে না পাওয়া যায়, বা মেয়েটার যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে প্রণয় কে যে আর বাঁচানো যাবে নাহ্—এই বিষয়ে করো কোনো সন্দেহ নেই। তবে তারা চিন্তিত তাদের নিজেদের কে নিয়ে। কারণ প্রণয় মরলে সবাই কে মেরে পুরো দুনিয়া লন্ডভন্ড করে তারপর মরবে।

চিৎকার শুনে হাসপাতালের অন্যান্য ছেলে, নার্স ও ওয়ার্ড বয়রা ছুটে আসে। তারা প্রণয়ের সতর্কবাণী শুনেও দুঃসাহস দেখিয়ে ধরতে যায়। ফলশ্রুতিতে যা হওয়ার তাই হয়—আবারো ভাঙচুর শুরু করে দেয় প্রণয়। হাতের কাছে যা পায় তাই দিয়ে মারতে থাকে। ডাক্তারের মাথা ফাটিয়ে দেয়। ভয়ে পালায় অন্য সবাই।
কেবিনের সব কিছু ভেঙেচুরে শেষ করে দেয় প্রণয়। ডাক্তার পরিস্থিতির ভয়াবহতা দেখে পুলিশে কল করেন।
আর কেউ প্রণয়ের সামনে দাঁড়ানোর কিংবা আটকানোর সাহস করে না। সবাই কে উপেক্ষা করে হনহনিয়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যায় প্রণয়। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে চলে যায়, যদিও তার নিজের শরীরের উপর কোনো কন্ট্রোল নেই।

অনুশ্রী বেগম ছেলের চিন্তায় চিন্তায় প্রেসার ফল করেন, অসুস্থ হয়ে পড়েন। ভাইয়ের পিছু নিতে যাচ্ছিল প্রেম, কিন্তু মায়ের অবস্থা দেখে দাঁড়িয়ে যায়। চোখে ঝাপসা দেখছে সে। কী করবে বুঝতে পারে না। এত খারাপ দিন পূর্বে তাদের জীবনে কখনো এসেছে বলে ও মনে পড়ে না। একদম দিশেহারা হয়ে পড়েছে প্রেম। কোন দিক দেখবে? বোনটাকে খুঁজবে? ভাইটাকে সামলাবে? নাকি মা-বাবাকে সামলাবে?
ঢাকার ব্যস্ত সড়কে ২০০ কিমি পার ঘণ্টা গতিতে ড্রাইভ করতে থাকে প্রণয়। একদম দিশেহারা উন্মত্ত ক্রোধে পাগল ছেলেটা। ভয়ে, দুশ্চিন্তায়, উন্মাদনায় মস্তিষ্কের রক্তচাপ বেড়ে যায় কয়েক গুণ। বুকের ভেতরের ছোট্ট নরম যন্ত্রটা বিষের নীল যন্ত্রণায় মরতে থাকে ছটফট করে।
বুকের এই ব্যথা কিছুতেই সহ্য হয় না প্রণয়ের। নিঃশ্বাস ভারি হয়ে আসে। শরীরের কাঁপন বাড়ে। মস্তিষ্কে প্রিয়তমার আচ্ছন্নতা, বুকে প্রিয়তমার অভাব—ঠিক মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ। শরীরের তাপমাত্রা ও বাড়তে থাকে হুহু করে জ্বর আসছে কী? বোধয়।
পাগলের মতো প্রলাপ বকতে থাকে প্রণয়—

“বেঈমান, বিশ্বাসঘাতক! বলেছিলি আমায় ছেড়ে যাবি না, তাহলে এখন কীভাবে আছিস? কোথায় আছিস? একবারও কি মনে পড়ছে না আমায়? আমাকে পাগল বানিয়ে কোথায় হারিয়ে গেলি।
জান, আমি কিন্তু থাকতে পারছি না তোকে ছাড়া। মরে যাচ্ছি। এরপর কিন্তু খুঁজিস না আমায়।
জান, কোথায় গেলে আমার জানকে আবারো পাবো আল্লাহ্?”
অ্যাংজাইটিতে হাত পা অবশ হয়ে আসছে প্রণয়ের। চোখ মুখের লালচে ভাব আরও বেশি গাঢ় হচ্ছে।
কাঁপা হাতে ফোন তুলে জাভেদের নম্বরে ডায়াল করে প্রণয়। ওপাশ থেকে জাভেদের গমগমে কণ্ঠ ভেসে আসে—
“জি স্যার।”
সে সবে মাত্র রাতের খাবার খেতে বসেছে।
“জাভেদ, জাভেদ!”
“জ্বী স্যার।”
“জাভেদ, পুরো শহরের সিসিটিভি চেক করো। দুপুর ২টা-৫টার সব ফুটেজ দেখো। বিশেষ করে উদয় সরণিতে সমস্ত রোডসাইড ফুটেজগুলো দেখো। খুঁজে বের করো কোন জানোয়ারের বাচ্চারা দুঃসাহস করেছে আমার কলিজা ছিঁড়ে নেওয়ার!”

প্রণয়ের এমন এলোমেলো উৎকণ্ঠাজনিত কণ্ঠ কানে পৌঁছাতেই গলায় খাবার আটকে গেলো জাভেদের। তালু চাপড়ে কেশে উঠল সহসা। দ্রুত ঢক ঢক করে পানি খেয়ে বলল—
“ভাবিকে তুলে নিয়ে গেছে?”
“আমার জানকে ১০ মিনিটের মধ্যে খুঁজে বের করো জাভেদ। আমার প্রাণটাকে যেভাবে পারো আমার বুকে ফিরিয়ে দাও। আমার কলিজাটা কে ছাড়া আমি মরে যাব জাভেদ। প্লিজ ওকে এনে দাও।”
বলতে বলতে বাচ্চাদের মতো কান্না করে দেয় প্রণয়।
জাভেদ দ্রুত হাত ধুয়ে বেরোতে বেরোতে বলে—
“স্যার, স্যার, লিসেন। আগে আপনি শান্ত হোন। ভাবীকে আমরা ঠিক খুঁজে বের করবো।”

“পুরো শহরে, পুরো দেশে, পুরো পৃথিবীতে তন্নতন্ন করে খোঁজো জাভেদ। পুরো দেশের ট্রান্সপোর্ট বন্ধ করে দাও। দেশ থেকে যেন কেউ বেরোতে না পারে। এয়ারপোর্ট, বাস স্টেশন, রেলওয়ে স্টেশন—প্রত্যেকটা পোস্টে চেক করো। প্রয়োজন হলে মানুষের বাড়িতে, জঙ্গলে, পৃথিবীর প্রতিটা কোণায় চেক করো। যেভাবেই হোক আমার জান চাই মানে চাই, নয়তো তোমাকে আমি ছাড়ব না জাভেদ।”

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮৬

প্রতুত্তর করতে নিচ্ছিল জাভেদ, সাথে সাথেই ফোনের অপাশ থেকে বিকট একটা প্রচন্ড শব্দ কানে এসে লাগলো। তৎক্ষণাৎ সারা শরীর ঝংকার দিয়ে কেঁপে উঠল জাভেদের।
চিৎকার দিয়ে ডাকল—
“স্যার! স্যার!”
কিন্তু ওপাশ থেকে আর কোনো সাড়া এল না। টুট টুট শব্দে কলটা ডিসকানেক্ট হয়ে গেল।
“ওহ শিট!”

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮৮

9 COMMENTS

  1. ঈদ উপলক্ষে অন্তত আজকে একটা পব দেন আপু প্লিজ

Comments are closed.