কিশোরী কন্যা শেষ পর্ব
হামিদা আক্তার ইভা
ময়ূরীর সংসারটা বড্ড গোছালো। নিজের হাতে গড়ে নেয়া সংসার তার। সবাই যেমন তাকে সম্মান করে, ঠিক করে করে বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষ তাকে ভালোও বাসে। আগামীকাল তারা ঢাকা ফিরে যাবে নিজেদের বাড়িতে। ছুটি প্রায় শেষ বললেই হয়। আজ বাড়িতে মধুদের আসার কথা দেখা করার জন্য, তাই তো ময়ূরী আজ রান্না ঘরে ব্যস্ত। বাইরে থেকে তৌহিদের কান্না শব্দ ভেসে আসছে। খাবে সে। বিরক্তিকে কপাল কুঁচকে ফেলল মেয়েটা। বয়স আড়াই বছর হলেও এখনও বাচ্চাটা বুকের দুধ ছাড়েনি। ময়ূরী যত পারে অন্য খাবার খাওয়ানোর চেষ্টা করে, তবুও বাচ্চাটা দিন শেষে মাকে চাই মানে মাকেই চাই।
তাহসিন সিঁড়ি দিয়ে হাতে ঘড়ি পরতে পরতে নিচে নামছিল। ড্রয়িংরুমের মেঝেতে তৌহিদকে শুয়ে শুয়ে কাঁদতে দেখে কপাল কুঁচকে এলো তার। তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে কোলে নিয়ে বলল,
“আব্বু, কাঁদছেন কেন? আম্মা কোথায় আপনার?”
তৌহিদ হেঁচকি টেনে টেনে বলল,
“মা দুদ দেয় না বাবা। আমার কিদা নাকচে।”
তাহসিন গলা শক্ত করে ময়ূরীকে ডেকে ওঠে,
“এই অলস মহিলা, কই তুমি? আমার ছেলেকে না খাইয়ে কোন মহৎ কাজ করছো শুনি?”
ময়ূরী কোমরে আঁচল গুঁজে বেরিয়ে এলো। দাঁত কটমট করে বলল,
“আমার কী কাজ নেই? আপনি সারাদিন বাড়ির বাইরে কী করেন শুনি? বাড়িতে যে ৪ টা বাচ্চা কাচ্চা আছে জানেন না? ওদের নিয়ে একটু বাইরে গিয়ে ঘুরে আসা যায় না?”
তৌহিদ মায়ের ঝাড়ি দেয়া দেখে মুখ একটু করে ঠোঁট উল্টে বলল,
“দুদ দেওওও। আমার কিদা নাকচে।”
তাহসিন মাথা চুলকে বলে,
“একটু খাইয়ে দাও ওকে।”
ময়ূরী বলল,
“আপনিই খাওয়ান আপনার ছেলেকে।”
“আশ্চর্য! আমি খাওয়াব কী করে?”
“আপনার ছেলের বয়স দেখেছেন? এত বড় হয়েছে তবু বুকের দুধ ছাড়তে পারেনি।”
তাহসিন ঠোঁট টিপে বলল,
“আজকে নাহয় খাইয়ে দাও তারপর থেকে ওর মুখে টেপ লাগিয়ে দিব, যাতে ও কিছু খেতে না পারে।”
তৌহিদ নাক ফুলিয়ে বাবার দিকে তাকাল। অভিমানী চোখে বাবার মুখ দেখে চিৎকার করে কেঁদে উঠল। তাহসিন হতভম্ব হয়ে বলল,
“মাফ করেন আব্বা, আমার ভুল হয়েছে।”
ময়ূরী ছোঁ মেরে ছেলেকে কোলে নিয়ে গলা ছেড়ে ডাকল শাশুড়িকে। অরুণিমা বেগম সিতারা বেগমের ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই ময়ূরী বলল,
“আম্মা, তৌহিদ খাওয়ার জন্য কাঁদছে। আপনি একটু কষ্ট করে রান্না ঘরটা সামলাবেন? আমি একটু পরেই চলে আসব।”
অরুণিমা বেগম বললেন,
“তোমাকে তো বলেছিলাম আমিই করি, তুমিই তো শুনলে না। এখন আর নিচে আসার দরকার নেই। ওকে খাইয়ে একদম গোসল সেরে নিচে নামবে।”
ময়ূরী মাথা নাড়িয়ে ছেলেকে নিয়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালে তাহসিনও পিছু নেয়। ময়ূরী কপাল কুঁচকে পিছু ফিরে তাকায়। তাহসিনকে শাড়ির আঁচল ধরে পিছু নিতে দেখে বলে,
“অফিসার, বিরক্ত করবেন না। কী চাই আপনার?”
তাহসিন শাড়ির আঁচল টেনে মিনমিন গলায় বলল,
“বাচ্চার মাকে চাই।”
“সরুন দেখি! কাজ আছে আমার, একদম বিরক্ত করবেন না।”
তবু বেহায়া অফিসার বউয়ের পিছু ছাড়ল না। আঁচল ধরে ঠিক ঘরে চলে এলো। ময়ূরী ছেলেকে আগে গোসল করিয়ে তারপর খাইয়ে ঘুম পাড়াল। তাহসিন বিছানায় পাশেই বসে বসে বউ-বাচ্চাকে দেখতে ব্যস্ত। ময়ূরী ভেবে পায় না এই লোকটা এত বউ পাগল হলো কেন? বিয়ের দিন থেকে শুরু করে এখন অব্দি লোকটার পাগলামো সেই আগের মতোই অটল। চারপাশে কত খবর রটায় স্বামী পরকীয়া করছে ঘরে স্ত্রী-সন্তান রেখে। অথচ তাহসিন তার মতো এক সাধারণ নারীর আঁচলে আবদ্ধ। হঠাৎ করেই মুচকি হাসল মেয়েটা। তাহসিন মুখ ভার করে বলল,
“হাসছো কেন তুমি?”
ময়ূরী মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“আপনাকে বলব কেন?”
তাহসিন ময়ূরীর হাতের বাঁধন আলগা করে টেনে নিজের কাছে নিয়ে এলো। তৌহিদ বিছানার একপাশে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তার শান্ত নিশ্বাসের শব্দ ঘরে এক অদ্ভুত মায়া ছড়িয়ে দিয়েছে। তাহসিন ময়ূরীর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“বলবে না কেন? নিজের বিবাহিত স্বামীর কাছে হাসির কারণ গোপন করা কী আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ নয়, ড.ময়ূরী তাহসিন?”
ময়ূরী কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু তাহসিনের মজবুত হাতের বেষ্টনী তাকে সেই সুযোগ দিল না। ময়ূরী নিচু স্বরে বাধা দিয়ে বলল,
“আহ ছাড়ুন তো! কী শুরু করলেন? বাচ্চাটা পাশে ঘুমাচ্ছে, এখনই উঠে যাবে তো! একটু তো লজ্জা পান!”
তাহসিন ভ্রু নাচিয়ে আরও কাছে সরে এলো। ওর তপ্ত নিঃশ্বাস এখন ময়ূরীর গালের খুব কাছে। সে খুব নিচু স্বরে বলল,
“যেখানে হৃদয়ের টান সেখানে লজ্জার কী আছে? আর তৌহিদ তো আমারই বীর পুত্র, বাবার রোমান্সে সে বাধা দেবে না।”
ময়ূরী শাসনের স্বরে আবার বাধা দিয়ে বলল, “অফিসার, আপনি দিন দিন বড্ড বেশি বেহায়া হয়ে যাচ্ছেন। তৌহিদ উঠলে কিন্তু সামলাতে পারবেন না। নিচে মেহমান আসবে, আমাকে যেতে হবে।”
“বেহায়া না হলে তোমার মতো এমন মায়াবতীকে জয় করা সম্ভব ছিল? শোনো বেগম সাহেবা, ঢাকার সেই যান্ত্রিক জীবনে যাওয়ার আগে আমি শুধু তোমার ঐ মায়াভরা চোখের গভীরতায় একটু ডুব দিতে চাই। তুমি কী জানো, এই পৃথিবীর সব ফাইলপত্রের চেয়ে তোমার ঐ মুচকি হাসিটা আমার কাছে অনেক বেশি দামী? বাচ্চার দোহাই দিয়ে আজ আমায় দূরে ঠেলো না।”
ময়ূরী এবার সত্যিই হার মানল। তাহসিনের এই অদম্য ভালোবাসা আর রোমান্টিক উক্তির সামনে তার সব শাসন যেন মোমের মতো গলে গেল।
“আপনি না পারেনও বটে!”
তাহসিন ময়ূরীর চিবুক ছুঁয়ে তাকে নিজের কাছাকাছি টেনে নিল, তাদের দুজনের মাঝে তখন কেবল ভালোবাসার নিবিড় নৈশব্দ্য। এক উন্মাদ পুরুষের ভালোবাসার কাছে ময়ূরীর সব বাহানাই যেন তুচ্ছ।
দুপুরের খানিক আগ দিয়ে বাড়ির বাইরে থেকে গাড়ির শব্দ এলো। তাহসিন সাদা শার্টের হাতা গুটিয়ে পা বাড়াল সেদিকে। বাড়ির সামনেই মধু আর ওয়াহিদ দাঁড়িয়ে আছে। হাতে কত কিছু নিয়ে এসেছে তারা। তাহসিনকে দেখেই ওয়াহিদ জড়িয়ে ধরে সালাম করল। তাহসিন সালামের উত্তর নিয়ে বলল,
“বেয়াদব অফিসারের চরিত্র এখনও ভালো হয়নি দেখছি। বলি বউ রেখে শালীর জামাইকে ভালো লাগল কেন?”
ওয়াহিদ হতভম্ব হয়ে ছিঁটকে সরে এলো দূরে। নাক কুঁচকে বলল,
“আমাকে দেখে কী আপনার গে মনে হয় অফিসার?”
“তা নয়তো কী? আপনি এভাবে আমায় জড়িয়ে ধরেছিলেন কেন? অমন শক্ত করে আমার বউ ছাড়া আমায় কেউ জড়িয়ে ধরে না।”
ওয়াহিদ আকাশ থেকে পড়ল। সে বড় বড় চোখ করে তাকাল মধুর দিকে, যেন বিচার চাইছে। মধু খিলখিল করে হেসে উঠল।ওয়াহিদ নিজের পাঞ্জাবি ঝাড়তে ঝাড়তে বিড়বিড় করল,
“শালী-দুলাভাইয়ের এই প্রেমের গল্পের মাঝখানে পড়ে আমার তো মান-সম্মান সব গেল!”
তাহসিন ভ্রু নাচিয়ে ওয়াহিদের হাত থেকে বিশাল এক মিষ্টির প্যাকেট কেড়ে নিয়ে বলল,
“এই যে মিস্টার গে-প্রেমিক, এত মিষ্টি কার জন্য? আমার বউয়ের জন্য এনেছেন নাকি নিজের দুঃখ ভোলার জন্য?”
ওয়াহিদ এবার পাল্টা আক্রমণ করে বলল, “আপনার বউয়ের জন্যই এনেছি অফিসার। কারণ আপনার মতো হাড়কিপ্টে জামাইয়ের পাল্লায় পড়ে বেচারি নিশ্চয়ই মিষ্টির চেহারা ভুলে গেছে। আমার আদুরে শালী কই? তাকে ডাকুন, আমি নিজ হাতে তাকে মিষ্টি খাওয়াব।”
একথা শুনে তাহসিনের চোয়াল শক্ত হলো। দাঁত চেপে বলল,
“আমার বউয়ের দিকে নজর দিলে আপনার খবর আছে।”
মধু ঠোঁট টিপে হেসে বলল,
“আচ্ছা, হয়েছে আপনাদের ঝগড়া?”
ঠিক তখনই বারান্দা থেকে ময়ূরী উঁকি দিয়ে বলল, “বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওসব কী আজেবাজে কথা হচ্ছে? তোমরা ভেতরে এসো তো! উনার কথায় কান দিয়ো না।”
ওয়াহিদ এবার সুযোগ পেয়ে নিচ থেকে চিৎকার করে বলল,
“ওরে দিলু! তোর স্বামী তো আমাকে পুলিশি টর্চার শুরু করে দিয়েছে শুধু তোকে মিষ্টি খাওয়াতে চেয়েছি বলে!”
তাহসিন বলল,
“ভেতরে চলো খোকা, মিষ্টিটা আমিই ভেঙে তোমার মুখে গুঁজে দেব।”
তাহসিন আর ওয়াহিদ একে অপরকে ঠেলতে ঠেলতে ড্রয়িংরুমে ঢুকল। মধু তাদের পেছনে হাসতে হাসতে ভেতরে এলো। ময়ূরী তখন সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে, পরনে হালকা বেগুনি রঙের সুতি শাড়ি, চোখে-মুখে স্নিগ্ধ হাসি। তাকে দেখে ওয়াহিদ এক গাল হেসে বলল,
“কী রে দিলু? বিয়ের এত বছর পর তোর বরের তো দেখি নজর আরও বেশি কড়া হয়েছে। তোর কাছে আসার পারমিশন নিতেও মনে হয় এখন ওয়ারেন্ট লাগবে!”
তাহসিন সোফায় ধপ করে বসে ওয়াহিদের দিকে মিষ্টির প্যাকেটটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
“ওয়ারেন্ট নয়, একেবারে সশরীরে হাজিরা দিতে হবে। আর খবরদার! আমার সামনে আমার বউকে ‘দিলু’ বলে ডাকবেন না।”
মধু সোফায় বসে ময়ূরীর হাত টেনে ধরে নিচু স্বরে বলল,
“তোর জামাইয়ের পজেসিভনেস দেখে তো মনে হচ্ছে এখনো তোদের বাসর রাত চলছে। বলি, বাচ্চাটা কই? তৌহিদকে তো দেখছি না।”
ময়ূরী মধুর পাশে বসে হাসিমুখে বলল,
“ও তো কেবল ঘুমাল। সকাল থেকে যা তান্ডব চালিয়েছে, ও না ঘুমালে তোরা শান্তিতে কথাই বলতে পারতি না। আচ্ছা বুলবুল আসেনি কেন?”
“ওর দাদি ওকে নিয়ে আমার মামা শ্বশুরের বাড়ি গেছে।”
“আচ্ছা, আজ না খেয়ে যেতে দিচ্ছি না তোদের।”
ওয়াহিদ অমনি তাহসিনের দিকে তাকিয়ে টিপ্পনী কেটে বলল,
“শুনলেন অফিসার? আপনার বউ আমাকে না খাইয়ে ছাড়বে না। এটাকে আইনের কোন ধারায় ফেলবেন? অতিরিক্ত মেহমানদারি নাকি ভায়রা ভাইয়ের প্রতি বিশেষ ভালোবাসা?”
তাহসিন আড়চোখে ময়ূরীর দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলল,
“এটাকে ‘বেহায়া ভায়রা ভাইয়ের জোরপূর্বক ভোজন’ ধারায় ফেলা যায়। তবে সাবধান , বেশি খেলে কিন্তু আপনার ফিটনেস নষ্ট হয়ে যাবে, তখন মধু আবার আমার মতো স্মার্ট কাউকে খুঁজতে শুরু করবে।”
মধু এবার হোহো করে হেসে উঠে বলল,
“আরে থামুন তো আপনারা! ময়ূরী, তুই ভেতরে যা, আমি আসছি তোকে হেল্প করতে। এই দুই মারকুটে মানুষকে ড্রয়িংরুমে নিজেদের ঝগড়া মেটাতে দে।”
ময়ূরী হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়াল। যাওয়ার আগে তাহসিনের দিকে তাকিয়ে শাসনের স্বরে বলল,
“বেশি জ্বালাবেন না উনাকে, মেহমান মানুষ। আমি শরবত পাঠাচ্ছি।”
তাহসিন ময়ূরীর চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল,
“মেহমান তো নয়, আস্ত একটা আপদ এসেছে শালার ঘরে!”
ড্রয়িংরুমে তখন বাড়ির সবাই উপস্থিত হলেন। ওয়াহিদের সাথে কথা বার্তা বলায় ব্যস্ত হলেন। রান্না ঘর থেকে আফিয়া খাবার এনে ডাইনিং টেবিলে রাখছিল। মধু ওদের সাথে হাত লাগিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল,
“ভাই কইরে ময়ূরী? ওকে দেখছি কেন?”
ময়ূরী বলল,
“পুতুলের সাথে এক চোট মারামারি করেছে সকালে। রাগ করে দুজন দুই ঘরে দরজা লাগিয়েছে।”
“ওমাহ! ফাহাদ পুতুলের সাথে মারামারি করে? এত বড় হলো তবুও বুদ্ধি হলো না? শাসন করিস না কেন?”
“আহা আপা, ওদের কাজই সারাদিন ঝগড়া করা। ওর কথা ভেবো না।”
মধু আড়চোখে আফিয়াকে দেখে বলল,
“ভাবছিলাম এত গুলো বছর ভাই তো তোর কাছেই থাকল। এবার নাহয় আমি আমার কাছে রাখি ওকে?”
ময়ূরীর হাসি-খুশি মুখটা শুকিয়ে এলো। শুকনো ঢোক গিলে বোনের দিকে তাকাল। আফিয়া কিছু বলতে চেয়েও বলতে পারল না। সে বোনদের আলাদা ছেড়ে দিয়ে বাকি কাজ সারতে রান্না ঘরে গেল। ময়ূরী হাতের কাজ রেখে বলল,
“ওকে ছাড়া আমি থাকব কী করে?”
“আমারও তো দুঃখ হয়। ইচ্ছে হয় আমার কাছে ওকে রাখতে।”
ময়ূরী ঠোঁট কামড়ে ভাবল বোনের কথা। ঠিকই তো! মধুরও তো ইচ্ছে করে ভাইকে বুকে আগলে রাখতে। সেই মুহূর্তে কোনো কথা হলো না আর। দুপুরে খাওয়া দাওয়া হলো। বিকেল নাগাদ ড্রয়িংরুমে সবাই একত্রিত হয়েছেন। তৌহিদ খালার কোলে বসে কুটুর কুটুর চোখে সবাইকে পর্যবেক্ষণ করছে। ওয়াহিদ ওকে কোলে নিলে মধু ফাহাদকে বলল,
“কাছে আয় ভাই।”
ফাহাদ পুতুলের পাশ থেকে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে এলো বড় বোনের কাছে। মধু ওকে পাশে বসিয়ে বলল,
“আমার সাথে যাবি?”
ময়ূরী আঁচল চেপে বসে ছিল এতক্ষণ। খুব করে কী যেন চাচ্ছে সে! ফাহাদ বলল,
“কোথায় যাব আপা?”
“আমার সাথে আমার বাড়ি যাবি। এখন থেকে আমার সাথে থাকবি।”
ফাহাদ মুখ একটুখানি করে ময়ূরীর দিকে তাকাল। মেয়েটার কাঁদো কাঁদো ভাব মুখ জুড়ে। ফাহাদ চোখ মেলে তাকাতেই গাল বেয়ে গড়াল চোখের পানি। ফাহাদ ময়ূরীর সামনে এসে ওকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“আমি তোমার কাছে থাকব আপা। আমি ওর সাথে যাব না।”
ফাহাদের কচি গলার ওই কথাগুলো যেন ড্রয়িংরুমের গুমোট আবহাওয়াটাকে এক নিমেষে ভেঙে দিল। ময়ূরী নিজেকে সামলাতে পারল না, ভাইকে জাপ্টে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। ছোটবেলা থেকে এই ভাইটাকেই তো সে আগলে রেখেছে, নিজের সন্তানের মতো। আজ তাকে আলাদা করার কথা ভাবতেই ওর বুকটা ফেটে যাচ্ছে।
মধু ছলছল চোখে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। সে বুঝতে পারছে, রক্তের টান থাকলেও ময়ূরীর সাথে ফাহাদের আত্মার টানটা অনেক বেশি গভীর। মধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফাহাদের মাথায় হাত রেখে নরম স্বরে বলল,
“পাগল ছেলে, আমি কী তোকে জোর করে নিয়ে যাচ্ছি? তুই তো আমারও ভাই। ভাবলাম, ওখানে গেলে ভালো স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিতাম, একটু ঘোরাঘুরি করতি।”
ফাহাদ ময়ূরীর আঁচলটা শক্ত করে মুঠো করে ধরে মাথা নাড়ল। ধরা গলায় বলল,
“আপাকে ছাড়া আমার ঘুম আসে না। আমি আপার কাছেই থাকব।”
এতক্ষণ তাহসিন চুপচাপ একপাশে বসে সবটা পর্যবেক্ষণ করছিল। সে জানে, এই পরিস্থিতিতে কোনো যুক্তি কাজ করে না। সে উঠে এসে ফাহাদের কাঁধে হাত রাখল। ময়ূরীর চোখের পানি মুছে দিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“কাঁদছো কেন ময়ূরী? ফাহাদ তো কোথাও যাচ্ছে না। আর মধু তো পর কেউ নয়। ওরও তো অধিকার আছে ভাইয়ের উপর। তবে ফাহাদ যখন চাইছে না, তখন জোর করার কিছু নেই।”
ওয়াহিদ পরিস্থিতি হালকা করার জন্য তৌহিদকে কোলে নিয়ে একটু দুলিয়ে বলল,
“আরে বাবা! এ তো দেখি পুরো ইমোশনাল সিনেমা শুরু হয়ে গেল। মধু, বাদ দাও তো! শালী-শালার এই মহব্বত ভাঙার সাধ্য আমাদের নেই। বরং চলো, আমরা তৌহিদকে নিয়েই পালানোর প্ল্যান করি, কী বলো তৌহিদ আব্বু?”
তৌহিদ কিছু না বুঝে খিলখিল করে হেসে উঠল। তৌহিদের হাসিতে পরিবেশটা কিছুটা হালকা হলো। ময়ূরী ফাহাদের চোখের পানি মুছে দিয়ে তাকে নিজের পাশে বসাল। মধুর দিকে তাকিয়ে অপরাধী স্বরে বলল,
“আপা, কিছু মনে করিস না। ছোট থেকে এত গুলো বছর আমার কাছে রেখেছি, কলিজা টেনে ছিঁ’ড়লেও ওকে ছাড়া থাকা অসম্ভব!”
মধু ম্লান হেসে বলল,
“মনে করার কী আছে রে? আমি তো চেয়েছিলাম তোদের একটু ভারমুক্ত করতে। কিন্তু দেখছি, এই ভারটাই তোদের জীবনের সবচেয়ে বড় সুখ। ঠিক আছে, ফাহাদ তোর কাছেই থাকুক। তবে মাঝে মাঝে কিন্তু আমার বাড়িতে পাঠিয়ে দিবি।”
তাহসিন এবার মুচকি হেসে বলল,
“নিশ্চয়ই যাবে। তবে এখন এই কান্নাকাটি বন্ধ করে সবাই মিলে চা-নাস্তা খাওয়া যাক। ঢাকা ফেরার আগে এই শেষ বিকেলটা অন্তত হাসিমুখে কাটাই।”
এভাবেই দিন গেল, মাস গেল। সবাই সবার কাজে ব্যস্ত হলো। আফিয়া তার ছোট্ট সংসার নিয়ে বেশ আছে। অন্যদিকে ওয়াহিদ ভালোবাসার নারীকে নিয়ে গড়েছে নিজের সংসার। আদনান আর হিমিও বাদ নেই। তারাও আছে বেশ সুখে। কনক,কুসুম,রুহুল সবাই নিজেদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত এখন।
সময় তার আপন গতিতে বয়ে চলল। ময়ূরীর সেই গোছানো সংসার এখন আরও ডালপালা মেলেছে। ঢাকার ব্যস্ত যান্ত্রিকতার মাঝেও তাহসিন আর ময়ূরীর প্রেমটা যেন সেই পুরনো দিনের মতোই সতেজ রয়ে গেছে। অফিসার তাহসিন এখন আরও দায়িত্বশীল, কিন্তু বাসায় ফিরলেই সে সেই আগের মতো ‘বউ পাগল’ মানুষটা। শাড়ির আঁচল ধরা অভ্যাসটা তার আজও গেল না।
ফাহাদ এখন আর সেই ছোট্টটি নেই। সে বড় হচ্ছে, পড়াশোনায় মন দিয়েছে। ময়ূরীর ছায়ায় থেকে সে যেন এক আদর্শ কিশোর হয়ে উঠছে। মাঝে মাঝে মধু আর ওয়াহিদ আসে, তখন বাড়িটা আবার হাসিতে ভরে ওঠে। মধু এখন আর ফাহাদকে নিয়ে যাওয়ার জেদ ধরে না, কারণ সে জানে ময়ূরী আর ফাহাদের বাঁধনটা রক্তের চেয়েও বেশি অনুভূতির।
তৌহিদ এখন স্কুলে যায়। তার আধো-আধো বুলি এখন স্পষ্ট। তবে মায়ের প্রতি তার সেই টান কমেনি এক বিন্দু। স্কুল থেকে ফিরে আজও তাকে আগে মাকে খুঁজতে হয়, ‘মা’ বলে একটা চিৎকার না দিলে তার যেন পেটের ভাত হজম হয় না। ময়ূরী হেসেই খু ন হয় ছেলের কাণ্ড দেখে।
একদিন গোধূলি বেলায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল ময়ূরী। তাহসিন পেছন থেকে এসে ওর কাঁধে হাত রাখল। কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“কী দেখছো অত মন দিয়ে? আকাশের চাঁদ, নাকি নিজের সাজানো এই স্বর্গ?”
ময়ূরী মুচকি হেসে তাহসিনের বুকে মাথা রাখল। শান্ত স্বরে বলল,
“দেখছি আমার চারপাশের মানুষগুলোকে। সবাই কত সুখে আছে। আফিয়া ভাবি, আপা, আদনান ভাইয়া, হিমি আপু—সবার জীবনেই আজ বসন্ত।”
তাহসিন ময়ূরীর চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল। চোখের দিকে তাকিয়ে গাঢ় স্বরে বলল,
“আর আমাদের বসন্ত? সেটা তো চিরস্থায়ী। জানো ময়ূরী, পৃথিবীর সব অপরাধী ধরা পড়লেও, আমি তোমার এই ভালোবাসার জেলখানায় আজীবন বন্দী থাকতে চাই। এর থেকে মুক্তি আমি কোনোদিন চাইব না।”
ময়ূরী আদুরে গলায় বলল,
“আপনি না আসলেও বড্ড বেশি নাটকীয় কথা বলেন অফিসার!”
তাহসিন হেসে উঠল, সেই হাসিতে মিশে ছিল তৃপ্তি। নিচ থেকে তৌহিদের কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে, ফাহাদের খুনসুটি আর পুতুলের হাঁকডাক—সব মিলিয়ে এক মায়াময় আবহ।
দিন যায়, রাত আসে। বদল হয় ক্যালেন্ডারের পাতা। কিন্তু ময়ূরীর এই ছোট্ট পৃথিবীটা ভালোবাসার চাদরে ঢাকা পড়ে থাকে। যেখানে শাসনের চেয়ে সোহাগ বেশি, আর অভিযোগের চেয়ে অভিমানটাই বেশি সুন্দর। তাহসিন শক্ত করে জড়িয়ে ধরল অর্ধাঙ্গিনীকে। সেই ছোট্ট “কিশোরী কন্যা” আজ কত বড় হয়েছে। স্ত্রীর কথা ভাবলেও তার গর্বে বুক ফুলে ওঠে। এক অসাধারণ নারীকে সে জীবন সঙ্গী হিসেবে পেয়েছে। যার নেই কোনো চাহিদা, আকাঙ্ক্ষা। শুধু চায় একটুখানি ভালোবাসা।
গোধূলির শেষ আলোটুকু তখন ময়ূরীর মুখে এসে পড়েছে, যা তাকে এক অপার্থিব সৌন্দর্যে মুড়িয়ে দিয়েছে। তাহসিন গাঢ় স্বরে বলল,
“জানো ময়ূরী, মাঝেমধ্যে ভাবি—সেই ষোলো বছরের কিশোরী মেয়েটা আজ কত নিপুণ হাতে একটা আস্ত সংসার সামলাচ্ছে। অথচ আমার কাছে তুমি আজও সেই ছোট্ট অবুঝ মেয়েটিই রয়ে গেলে, যাকে আগলে না রাখলে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে।”
ময়ূরী মুচকি হেসে বলল,
“আর আপনি? আপনিও তো সেই জেদি অফিসারই রয়ে গেলেন। যে কিনা সারা দুনিয়া শাসন করে, অথচ দিনশেষে নিজের বউয়ের আঁচল ধরে ঘুরতে যার একটুও লজ্জা লাগে না।”
তাহসিন ময়ূরীর কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে এক গভীর নিঃশ্বাস নিল।
“লজ্জা কেন লাগবে? এই আঁচলটাই তো আমার শান্তির বন্দর। পৃথিবীর সব ঝক্কি সামলে যখন তোমার এই শান্ত চোখের দিকে তাকাই, তখন মনে হয় জীবনটা আসলেই সার্থক। তোমার কোনো ডিমান্ড নেই, হীরা-জহরত চাও না—শুধু একটু সময় আর ভালোবাসা চাও। একজন পুরুষের জন্য এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে?”
ময়ূরী এবার দু-হাতে তাহসিনকে জড়িয়ে ধরল। হৃদস্পন্দনের শব্দে মিশে গেল দুজনের নিঃশ্বাস। ময়ূরী শান্ত গলায় বলল,
কিশোরী কন্যা পর্ব ৫০
“ভালোবাসা তো চাওয়ার জিনিস নয় অফিসার, ওটা তো অনুভবের। আপনি আমাকে যতটুকু দিয়েছেন, তাতে আমার সাত জনম কেটে যাবে। শুধু এভাবেই পাশে থাকবেন, মাঝেমধ্যে ওই ‘অলস মহিলা’ বলে একটু রাগাবেন—নইলে তো আমার রান্নায় স্বাদ আসবে না!”
তাহসিন হোহো করে হেসে উঠল। তারপর ময়ূরীর কানে ফিসফিস করে বলল,
“ভালোবাসি বেগম সাহেবা। অফিসার তাহসিনের পুরোটা জুড়েই শুধু তুমি আর আমাদের এই মায়ার পৃথিবী।”
সমাপ্ত
