Home তুই আমার ৭ মিনিট তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৩৬

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৩৬

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৩৬
ঐশী আফরিন

“শুয়োরের বাচ্চারা একটা স্পর্শ যদি ওর গায়ে লাগে তো একেকটাকে জ্যান্ত কবর দেবো”
বলতে বলতে লোকগুলো মাধবীর উপর ঝাপিয়ে পরার আগেই আরিয়ান ঝড়ের বেগে ছুটে আসে। ভাগ্যিস ঠিক সময়ে পৌছেছিল। মাধবীর হাত থেকে তলোয়ার নিয়ে একজনের ঘারে কোঁপ বসিয়ে দেয়। ধাঁড়ালো তলোয়ারের ভারে সঙ্গে সঙ্গেই ঘার থেকে মস্তক ছিন্ন হয়ে দূড়ে ছিটকে পরে। মুহুর্তেই সকলের গাঁ রক্তে একাকার হয়। অপূর্বও বাকিদের উপর ঝাপিয়ে পরে কিল ঘুষি যা পারে দিতে থাকে। সেকেন্ডেই তীব্র ধস্তাধস্তিতে কেঁপে উঠে রাজবাড়ির জমিন। মাধবী একবার সেদিকে তাকিয়ে বিশাল বইটা কোনমতে শাড়ির ভাজে লুকিয়ে আকস্মিক দিক বেদিক ভুলে ছুট লাগায়। ধরা পরে যাওয়ার ভয়ে কন্ঠনালি শুকিয়ে আসে। সে ঘূর্ণাক্ষরেও ভাবেনি আরিয়ান এভাবে চলে আসবে। কী জবাব দেবে সে আরিয়ান কে? কেন এসেছে সে এই পরিত্যক্ত ধ্বংস স্তুপে? জিজ্ঞেস করলে কী বলবে? আরিয়ান আসাতে যে এতবড় একটা বিপদ থেকে উদ্ধার হলো সেটা তোয়াক্কা না করে সে জবাবের ভয়ে দৌড়ে পালাচ্ছে। ব্যাপার টা মাধবীর কাছেই হাস্যকর মনে হচ্ছে। কিন্ত তবুও ছুট থামায় না। এদিকে আরিয়ান মাধবীর ভাবভঙ্গী প্রথমেই বুঝে দৌড়ানোর প্রস্তুতি নিয়েছিল। মাধবীকে দৌড়াতে দেখে শান্ত কন্ঠেই অপূর্ব কে বলে “অপুর্ব তুই এদের দেখ। আমি বেয়াদ্দপটাকে ধরে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি। জায়গাটা একদম পরিষ্কার করে ফেলবি কিন্ত। যেন কিচ্ছু বোঝা না যায়। পাগলের বাচ্চাকে আজ…”

বলতে বলতে আরিয়ানও ছুট লাগায়। অপূর্ব শুরুতে এসব দৌড়াদৌড়ি দেখে আহাম্ম বনে গেলেও পরমুহুর্তে নিজের হাতের কাজ শেষ করে। সবগুলো ছেলের প্রাণপাখি ইতিমধ্যেই উঁড়ে গেছে। সে একবার সেদিকে তাকিয়ে গহীন বনে ছুটতে থাকা শুভ্র কপত কপতিদের দিকে তাকায়। তার কাছে মনে হয় এরা শুভ্র দম্পতি। একবার ইচ্ছের কাছে শুনেছিল আরিয়ান যেমন সবসময় সাদা পাঞ্জাবিতে মোড়া থাকে তেমনই মাধবীও নাকি অধিকাংশ সময়েই সাদা শাড়িতে মোড়ানো থাকে। তাই এদের একসাথে শুভ্র দম্পতি বললে খুব মানাবে। এইযে আজও তো মাধবী সাদা শাড়ি আর আরিয়ান তো সর্বদা সাদাই। একজনের পেছনে আরেকজন ছুটছে। কী মোহনীয় দৃশ্য! এত সুন্দর কেন লাগছে! পেছন থেকে শুধু মাধবীর শাড়ির আচঁল দৃশ্যমান। একসময় লম্বা চুলগুলোও খুলে গেল। বাতাসের সাথে দৌড়ানোর তোরে দৃশ্য টা অপরূপ ঠেকছে। কিন্ত সে তো ভূবনমহিনীর চেহারা দেখতে পেল না আজ। সেই যে জঙ্গলে প্রথম দেখা হয়েছিল, ওটাই প্রথম এবং শেষ দেখা। এরপর আর সে একান্তে কখনো এই রূপসীর মুখোমুখিও হয়নি। কখনও আর ঐ সৌন্দর্য দেখতে পারবে কীনা তাও অজানা। তৃষ্ণার্ত চোখজারা কী আর কখনও তৃপ্ত হবে? নাকি ব্যাকুল তৃষ্ণা নিয়েই রবের দরবারে পারি দিতে হবে? কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই শুভ্র দম্পতিরা দৃষ্টির বাহিরে চলে যায়। তবুও অপূর্ব সেদিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে লাশ গুমের ব্যবস্থা করে।

মাধবী আরিয়ানকে মারামারি করছে ভেবে দৌড়ানোর গতি কমিয়ে দেয়। মাধবীকে থামতে দেখেই আরিয়ান একটা গাছের পেছনে লুকিয়ে পরে। মাধবী পেছন ফিরে আশেপাশে কাউকে না দেখে স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলে। ভাবলো সত্যিই আরিয়ান তার পিছু নেয়নি। তাই আর না দৌড়ে হেঁটে বাড়ির রাস্তা ধরে। মাধবীকে না দৌঁড়ে হাটঁতে দেখে আরিয়ানও স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলে। মেয়েটার দম আছে বলতে হবে। কী জোরে দৌড়ায় বালের মাইয়া! ভেবে স্বভাবত কিছু গালি ছুরে দিয়ে ধীরে ধীরে মাধবীর পেছনে পা বারায়। মাধবী একমনে এগিয়ে যাচ্ছিল কিন্ত আচমকাই পেছন থেকে কেউ মুখ চেপে ধরায় তার গা হিম হয়ে যায়। শুষ্ক ঢোক গিলে শক্ত হাতের বন্ধনে মোচঁরা মুচরি করে। এক নিমিশে বুঝে যায় এটা কে। এত জলদি কোথা থেকে উঁড়াল দিয়ে চলে এলো? লোকটা জ্বীন টিন নাকি? আরিয়ান মাধবীর মুখ ছেড়ে দিয়ে লম্বা চুলগুলো হাতে পেঁচাতে পেঁচাতে স্বাভাবিক স্বরে বলে “পালাচ্ছিস কেন?”
মাধবী স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বলে “কোথায় পালাচ্ছি?”

কথ বলার সাথেই হাতের বইটা লুকোনোর চেষ্টা করে। এত মোটা বই রাখার জায়গা তার এটুকু গায়ে নেই। কী অশান্তি! সে কোনমতে পেটের কাছটায় শাড়ির নিচে রেখে দেয়। আর তার এই বৃথা লুকোনোর চেষ্টাটা আরিয়ান শান্ত দৃষ্টিতে দেখে। কিছুটা হাসেও। কী হতে পারে এই হাসির রহস্য? সে এমন ভাবেই থাকে যেন কিছু দেখেনি। মৃদু কন্ঠে বলে “আমাকে দেখে দৌঁড়ালি যে?”
মাধবী ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলে বলে “ইচ্ছে হলো তাই দৌঁড় দিয়েছি। ছাড়ুন এবার”
আরিয়ান ছাড়ে না। হাতের বাঁধন ঢিলে করে বলে “এত রাতে এখানে কেন এসেছিস?”
“ইচ্ছে হলো”
মাধবীর জেদি উত্তরে আরিয়ান কিছুক্ষন নিশ্চুপ থেকে বলে “বাড়ি চল। কথা আছে। আর এত ভারি বইটা একা নিতে পারবি না। আমায় দে। বাড়ি গিয়ে দিয়ে দেব”

আরিয়ানের এত স্বাভাবিক কন্ঠে বইটা চাওয়ার কথা শুনে মাধবী বিষ্ফরিত নয়নে ঘুরে তাকায়। ততক্ষনে আরিয়ান চুল ছেড়ে দিয়েছে। মাধবী বেশ অবাক হলো? লোকটা কী জানে না এটা কীসের বই? জানলে একবারও জিজ্ঞেস করলো না কেন যে, সে এটা কোথায় পেয়েছে? নাকি সত্যিই বইটা সম্বন্ধে ধারনা নেই? ধারনা থাকলে তো এত স্বাভাবিক থাকতো না। মাধবী ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকতে দেখে আরিয়ান মৃদু ধমকে উঠে “তাকিয়ে আছিস কেন এভাবে? মানুষ মারতে চাস? আমাকে মারতে চাইলে আগে তোকে মরতে হবে। আর তোর বই নিয়ে আমি পালিয়ে যাবো না”
বলে মাধবীর শাড়ির ভাজ থেকে বইটা কেড়ে নেয়। মাধবী রুক্ষ ঠান্ডা হাতের স্পর্শ পেটে লাগতেই কেঁপে উঠে সামান্য। আরিয়ান তা দেখে। ঠোঁট কামরে বলে “এত কাঁপা কাঁপি করে লাভ নাই গৃহিনী সাহেবাআআআ। এখন আমার আপনার সাথে কথা আছে। নিয়ন্ত্রণ হাড়ালে কথার জায়গা কাজ হয়ে যাবে। যা এখন আমি কোনোমতেই চাচ্ছি না। কাল যদি গ্রামের একের পর এক খুনের ব্যাপারে প্রজাদের কোন সমাধান না দেওয়া যায় তাহলে এমনিতেও পর দিন থেকে ঘুম হারাম হয়ে যাবে। তাই আজ ঘুমানোর সময় দিলাম। এখন চলেন”

বলে মাধবীর হাতের ফাক গলিয়ে নিজের রুক্ষ ঠান্ডা হাত রেখে সামনে পা বারায়। তাদের পেছনে রাজবাড়ির বড় প্রাসাদ অনদরমহলের সুউচ্চ দালান জঙ্গলের ফাক গলিয়ে চোখে পরছে। আকাশেও থালার মত বিশল চাঁদটা তাদের আলো দিচ্ছে। মাধবী এই কিছুদিনে আরিয়ানের এসব উদ্ভট কথাবার্তা শুনে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কেননা এর আগের বেশ কিছুদিন আরিয়ান এসব আজগুবি উদ্ভট কথাবার্তা একটু বেশি বেশি বলেছে। এই ভালো থাকে তো আবার কী সব কথাবার্তা বলে। এমনিতে নাকি লোকটা মেপে কথা বলে তাহলে তার কাছে আসলেই কী হয়? এমন উদ্ভট কথাবার্তা কোত্থেকে পায়? এমনিতে বাহিরে মুখের ধাঁচ এমন গম্ভীর রাখবে যেন মনে হয় লোকটা জীবনে কোনদিন হাসেনি। কী ধারালো চোয়াল মাইরি! কী তেজি চাহনি! যেন সামনের লোকটাকে কাঁচা চিবিয়ে খাবে! এমন স্টাইলের চলাফেরা করে যেন মনে হয় কোন রাজপুত্তুর! আবার মাঝে মাঝে যখন দুহাত পেছনে রেখে শিরদারা সোজা করে দাঁড়ায় তখন এক নিমিষেই কোন মেয়ের আকর্ষণ ছিনিয়ে নিতে সক্ষম। চেয়ারে বসে যখন রাজকীয় ভঙ্গীমায় পায়ের উপর পা তুলে কপালে বিস্তর ভাজ ফেলে গম্ভীর ভঙ্গীমায় ধুতনিতে হাত দিয়ে রাখে, কি আকর্ষণীয়ই না লাগে তখন! ঠিক যেদিন ইচ্ছেকে জ্বীন ভর করেছিল সেদিনের বসার ভঙ্গীমা দেখে মাধবীর চোখে তাঁক লেগেছিল!

লোকটার এত রাজকীয় চলাফেরা যে ভূবনমহিনীর চোখেও তাঁক লাগাতে সক্ষম! উজ্জ্বল শ্যামলা। রঙটা মাধবীর সবচেয়ে পছন্দনীয় রঙ। এই রঙের মানুষ গুলোকে তার চোখে বেজায় সুন্দর দেখায়। এর উপর লোকটা সবসময়ই পরে কাবলী সেট। পাঞ্জাবিতে তো এমনিতেই যেকোন ছেলেকে সুদর্শন দেখায়। আর যদি এরকম উঁচা লম্বা চওড়া গড়নের লোকটা কাবলী পরে তখন ঠিক খাটি পুরুষ মানুষ মনে হয়। লোকটার গায়ে একদম খাঁপে খাঁপ মিলে থাকে পাঞ্জাবি। অথচ এমন একটা শ্যাম সুদর্শন গম্ভীর পুরুষ নাকি তার কাছে আসলেই নানান উদ্ভট বকবক জুড়ে দেয়! গ্রামের কিছু মহিলাদের তো সে এ-ও বলতে শুনেছে যে তাদের মনে হয় লোকটা নাকি কথাই বলতে পারে না। অথচ তারা যদি জানতো যে এই লোকটাই তার কাছে কথার ঝুড়ি নিয়ে বসে তাহলে হয়তো বেশ অবাকই হতো। এসব নানান চিন্তা করতে করতে তার মাথায় আসে গ্রামের কথা। ইদানিং তার ব্রেনে খুব বাজে ভাবে গ্রামের এই অধঃপতন আঘাত হানছে। এর মধ্যে আবার নতুন রোগের আমদানি হয়েছে। কিছুক্ষন পর পরই বুকে ব্যাথা করে। আবার চলেও যায়। আগে মাঝে মাঝে তার এই বুকে ব্যাথাটা ধরা দিত। এরপর বেশ কিছুদিন বন্ধ থাকার পর এখন নতুন করে তীব্র ভাবে বুকে জ্বালা ধরে। গ্রামের অলৌকিক ঘটনাগুলোতে আরো বেশি বুকে চিনচিন হয়। কী করবে সে এই গ্রাম নিয়ে, কিচ্ছু মাথায় ঢুকছে না। এত এত মানুষ মারা যাওয়াতে নিজেকে দোষী মনে হচ্ছে। তার বাবার রেখে যাওয়া সাজানো গোছানো গ্রামটাকে সে রক্ষা করতে পারছে না। কী হবে এর শেষ পরিণতি?

“এই যে মাথামোটা গৃহিনী চলে এসেছেন নিজের গৃহে। এবার নিজের কল্পনার পাগলা গারদ থেকে বের হতে পারেন”
আরিয়ানের উঁচু কন্ঠে মাধবীর ধ্যান ভাঙে। পৌছে গেছে তারা ছোট প্রাসাদে। সে ঢুকতে ঢুকতে বলে হাই তুলে বলে “কল্পনা কখনও পাগলা গারদ হয় না”
আরিয়ান পেছন পেছন আসতে আসতে বলে “দুনিয়ার সব চেয়ে বড় পাগলা গারদই হচ্ছে নিজ নিজ কল্পনার জগত। কেননা মানুষ কল্পনায় এমন সব উদ্ভট চিন্তা ভাবনা করে যা বাস্তবে কখনোই সম্ভব না। এসব পাগলের মত চিন্তা ধারা কল্পনাতেই মানায়। তাই কল্পনা হচ্ছে পাগলা গারদ। যার বড়সর রোগী হচ্ছিস তুই”
মাধবী নাক মুখ কুচকে বলে “আমিই কেন?”
“কারণ তুই যেই তাড়ছিড়ার মত বিশাল বিশাল উপন্যাস শেষ করিস ওসব কল্পনার পাগলা গারদ থেকেই লেখা। তাই ওসব উপন্যাসের বই যে পড়ে সেও তাড়ছিড়া পাগল আর যে লেখে সে তো আরো বড় তাড়ছিড়া মাতাল। নইলে এসব কেউ লেখে? ছ্যাহ”

মাধবী কেমন করে যেন বলে “আপনার কেন মনে হলো এরাই পাগল?”
“ঝিলিক আপুর কথা মনে আছে? ঐ যে উপন্যাস পড়ে এরপর লিখতে চেয়েছিল। পরে চার পাঁচটা লিখে ভাবতে ভাবতে পাগল হয়ে গিয়েছিল যে?”
মাধবী মনে করার চেষ্টা করলো। নাহ মনে পরছে না। কিন্ত কেউ উপন্যাস লিখে পাগল হতে পারে! আশ্চর্য! সে বিশ্বাস করলো না। নিজ কক্ষের দিকে পা বারিয়ে বললো “আপনি পাগল। এসব ভংচং না বলে কয়েকটা বই কিনে দিলেও তো পারেন”
আরিয়ান সেখানেই দাঁড়িয়ে বলে “আগে গ্রাম বাঁচা। তারপর শুধু কয়েকটা না; পুরো লাইব্রেরি কিনে দেব। যেন অল্প বয়সে পাগল হতে পারিস। এখন ছাঁদে চল। ঘরে গেলে ঘুম পাবে”
মাধবী মুখ কাচুমুচু করে বললো “আপনি এখনও জেগে আছেন কীভাবে?”
আরিয়ান সিরির দিকে পা বারিয়ে বিরবির করে বললো “অসভ্য বেয়াদব নারী জাত। কথা নেই বার্তা নেই কিছু হতেই এক গাদা ঘুমের ঔষধ খাইয়ে দেবে। আবার জিজ্ঞেস করবে ‘আপনি এখনও জেগে আছেন কীভাবে’। ন্যাকা”
শেষের বাক্যগুলো ভেংচি কাটতে কাটতে বলে। মাধবীও ভেংচি কেটে পা বারায়। ছাঁদে উঠতেই ঠান্ডা হিমেল হাওয়া বয়ে যায় গাঁ জুরে। মাধবী রেলিং এ পিঠ ঠেকিয়ে হুট করে বলে “আরিয়ান ভাই?”

“বাল”
আরিয়ানের হঠাৎ চিৎকারে মাধবী খেঁকিয়ে উঠে “আবালের শত এরকম চিৎকার করছেন কেন? বাল কী মুখে লেগে গেছে? ভালো ভাবে ডাকলাম অথচ উত্তর দিলেন ‘বাল'”
শেষের শব্দটা ভেংচি কেটে বলে সে-ও আবার বলে “বাল”
আরিয়ান চেঁতে উঠে “তোর কোন জনমের ভাই লাগি আমি যে এখনও ভাই ডাকিস?”
“কিছুদিন আগেও আপনি আমার ভাই লাগতেন। ভূলে গেছেন হয়তো”
“বাল। কোনকালেও আমি তোর ভাই ছিলাম না। তোর জন্মই হয়েছে আমার বউ রূপে। তাই আরেকবার এসব ভাই টাই ডাকলে খবর আছে”
“বাল আছে। কী জন্যে ডেকেছেন সেটা বলুন”

“তুই আগে বল কী জন্যে এরকম অসভ্য নামে আমাকে ডাকলি”
মাধবী মনে পরার মত করে বলে “ওহহ। ভূলে গিয়েছিলাম। আপনার এই খামোখা প্যাচালের জন্যই তো…
মাধবীর অর্ধেক কথা কেরে নিয়ে আরিয়ান বলে উঠে “আমি খামোখা প্যাচাল করেছি? তুই যদি জানতি রে ছ্যামরি আমার এই খামোখা প্যাচাল শুনতে কত লোক উৎসুক হয়ে থাকে তাহলে…”
মাধবীও আরিয়ানের অর্ধেক কথার মাঝেই বলে “তাহলে আপনার মত পাগল হয়ে যেতাম। এবার আমাকে আসল কথাটা বলতে দেবেন?”
আরিয়ান একটা চুরুট ধরাতে ধরাতে বলে “বল”
মাধবী কতক্ষণ চুপ থেকে বলে “আপনি জানেন যে সবসময়ই আমার গায়ে একটা ঠান্ডা হাওয়া বয়?”
আরিয়ান ধোঁয়ার কুন্ডুলি বাতাসে ছেড়ে দিয়ে বলে “জানি। তবে তোর গায়ে যেটা থাকে ওটা ভিন্ন আর গ্রামে যেটা চলে ওটাই ভিন্ন”

“আমার গায়ে যেটা থাকে ওটা কীসের বাতাস?”
আরিয়ান কিছুক্ষন চুপ থেকে মাধবীর দিকে তাকায়। তবে চোখের দিকে না। শান্ত স্বরে বলে “বইটা কেন এনেছিস?”
মাধবী বিরক্ত হয়ে বলে “আগে যেটা জিজ্ঞেস করেছি তার উত্তর দিন”
আরিয়ান আবারও বেশ কিছুক্ষন চুপ থেকে ধোঁয়া উঁড়ায়। মাধবীও সময় দেয়। তবে আরিয়ান অনেকক্ষণের নিরবতার পর গম্ভীর কন্ঠে বলে “এখনই সব খোলাসা করতে চাইছি না। এক অমোঘ সত্য আছে যা জানলে তুই কেমন প্রতিক্রিয়া দিবি তা আমি জানি না। কিন্ত এই অন্ধকার জগতে তুই নিতান্তই নবীন। অথচ তুই নিজেকে খুব শেয়ানা ভাবিস। তুই যেই অন্ধকার জগতে পা রেখেছিস সেই জগতটাই আমার তৈরি। তাই আমার থেকে নিজেকে চালাক ভাবিস না। নিরব থাক”
মাধবী হেসে দেয় “আপনি জানেন? নারীর জেদ তাকে বানায় রাণী আর নিরবতা বানায় ভুক্তভোগী। তাই আমাকে আটকাতে পারবেন না”

“বোকা রমণী। নিজেকে রাণী বানাতে গিয়ে যে ভুক্তভোগী বানিয়ে ফেলছিস তা বুঝলে এতদিনে নিরবতাকেই আকড়ে ধরতি। তুই নিজেকেও অতটা জানিস না যতটা আমি তোকে জানি”
“আচ্ছা তাই? তবে বলুন তো আমি জীবনে প্রথম খুন কাকে এবং কখন করেছিলাম?”
আরিয়ান অকপটে বলে “যখন তোর বয়স সারে ছয়; তখন তোর আপন ছোট ফুফাকে দিনের আলোতেই খুন করেছিলি। দোষ ছিলো তোর দিকে কুঁ নজরে তাকানো।
পেছন থেকে গিয়ে বড় তলোয়ারটা পা/ছা/য় গেঁথে দিয়েছিলি। বেচারার একদম ভবিষ্যত জায়গা মত লাগাতে সেখানেই কাতরে মরে গিয়েছিল। এরপর প্রথম খুন করাতে ভয়ে লাশ রেখেই পালিয়েছিলি। এরপর ভয় কোমলে আবারও গিয়েছিলি কুপিয়ে টুকরো টুকরো করতে। কিন্ত গিয়ে আর লাশটা পাস নি। সমস্ত কাহিনী ঠিক আছে তো?”
মাধবী হতভম্ব নেত্রে তাকিয়ে রইল। ঢোক গিলে বললো “আপনি কী করে জানেন!”
“ঐ যে বললাম। তোকে জন্মাতে দেখেছি। তোর প্রতিটা হাটা চলা, প্রতিটা ভঙ্গিমার উদ্দেশ্য সহ সব মুখস্থ”
“সেদিনের লাশটা কী হয়েছিলো পরে?”

“এতকিছু না জানলেও চলবে”
মাধবী কিছুক্ষন থম মেরে থেকে ভাবে, তখন তো উনি খুন করার সময় তাকে দেখতেও পারে। কিন্ত উনি বিদেশে পারি দেওয়ার পর যা করেছে তা তো জানবে না। সে শিউর হতে জিজ্ঞেস করে “আচ্ছা বলুন তো এরপর কতগুলো খুন করেছি?”
“সেই ছয় বছর বয়স থেকে উনিশ বছর পর্যন্ত চৌদ্দ বছরে মোট তেষট্টি টা খুন করেছিস। ঠিক বললাম তো?”
মাধবী হতবিহম্বিত হয়ে চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করে “আপনি কীভাবে জানেন?”

সেই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আরিয়ান বলে “খুনি,পাপীষ্ঠ, ছন্নছাড়া,বেপরোয়া, এই শব্দ গুলো পুরুষ মানুষের সাথেই মানায়। আর নমনীয়তা, কোমলতা, গোছানো, সংসারী, এই শব্দ গুলো নারীদের সাথে মানায়। ছেড়ে দে এসব মধু। তুই যাদের যাদের ধ্বংস চাইবি তাদের সবার ধ্বংস তোর পায়ে এনে ফেলবো। গ্রামের সব বিপদ আপদ আমার উপর ছেড়ে দে। সব দিক আমি সামলে নেব। তুই শুধু আমার ঘর সামলে নে। তোর কাছে জীবনে কখনো কিচ্ছু চাইবো না। শুধু তুই সব ছেড়ে আমার ঘরের দিকে মনোযোগ দে। আমাদের একজন সদস্য বাড়া। যাকে ঘিরে আমরা এই সমস্ত পাপীষ্ঠতা এক পাশে রেখে একটা ছোট্ট সংসার করতে পারবো। তোকে যেমন গৃহিনী সাহেবা বলি তেমন গৃহিনী সাহেবাই হয়ে যা। কথা দিচ্ছি সব দিক আমি একাই সামলে নেব”

কথাগুলো বেশ নরম কন্ঠে বলে আরিয়ান মাধবীর দিকে তাকায়। মেয়েটা কেমন অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। এমন অদ্ভুত চাহনি কেন এই মেয়ের! আরিয়ানের মস্তিষ্কে আবারও একই প্রশ্ন বিদ্ধ হয় ‘আসলেই কী এটা মানুষ! না জান্নাতের হুর? নাকি জ্বীন সম্প্রদায়ের কোন পাপীষ্ঠা পরি?’। প্রশ্ন গুলো বারংবার ঘুরপাক খায় মস্তিষ্কে। সে নিজে এমন একটা মানুষ; যে কিনা মেয়েটাকে রন্ধ্রে রন্ধ্রে চিনেও এই উনিশ বছরে এখনও শিউর হতে পারলো না যে, মেয়েটা মানুষ না জ্বীন-পরি। কত সাদা চামড়ার মেয়েই তো দেখলো কিন্ত মাধবীর গায়ের রঙ একেবারেই ভিন্ন। সচ্ছ কোমল ফর্সা রঙ। গায়ের কোত্থাও কোন দাগ নেই। কেমন অদ্ভুত সুন্দর বেগুনি রঙা চোখ! হ্যা বেগুনি রঙা। যা হাতে গোনা কয়েকজন লক্ষ্য করতে পেরেছে। কারণ কেউ এর চোখে তাকিয়ে থাকতে পারে না। আশ্চর্য জনক ভাবে মাথা ব্যাথা করে। কিন্ত সে এই জিনিস টা লক্ষ্য করতে পেরেছে সূর্যের আলোয়। অদ্ভুত কালো বেগুনির মিশেলের চোখের মনি; যা দিন দিন আরো গাঢ় করে প্রকাশ পাচ্ছে।

বাঁ চোখের কোণে কুচকুচে একটা তিল আছে। হাঁটুর নিচ অবধি পরা মোটা লম্বা ঝকঝকে চুল; যা প্রায়ই হাওড়ার তালে উঁড়ে বেরায়। মোদ্দাকথা মেয়েটা আগাগোড়া পুরোটাই অদ্ভুত সৌন্দর্যে ঘেরা। যা দুনিয়ার মানুষ এই প্রথম বারই দেখেছে। ভাগ্যিস মাধবী ছোট থেকেই পর্দার আড়ালে। হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া তাকে বেশি কেউ দেখেনি। আর যারা দেখেছে তারা গ্রাম্য। কিন্ত যদি শহুরে মানুষেরা মেয়েটাকে একবার দেখতে পেত তাহলে হয়তো লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা দিয়ে হলেও মেয়েটাকে একটাবার শুধু চোখের সামনে রেখে তৃষ্ণ মেটাতে চাইতো। নয়তো কোন যাদুঘরে রেখে দিতে চাইতো। কিছুদিন হলো সে নিজের চোখও লক্ষ্য করেছে। আগের বাদামি চোখ এখন কীভাবে যেন হলুদ হয়ে যাচ্ছে। কেমন যেন চকচকা হলুদ। সূর্যের আলোয় একদম জ্বলজ্বল করে। এখনও তা ভালোভাবে কারো নজরে পরেনি। পরলে হয়তো বিষ্ময়ে হতবাক হয়ে যাবে। কেননা এরকম বেগুনি এবং হলুদ চোখের মানুষ দুনিয়ায় খুবই কম থাকে। পাওয়াই যায় না বলতে গেলে। এই দুর্বোধ্য মানুষের মধ্যে তারা দুই কপোত কপোতি কীভাবে আসলো আল্লাহ মালুম!

মাধবী যেটাকে এতদিন ভয় পাচ্ছিল তাই আজ বলে দিল আরিয়ান। বাচ্চা! বাচ্চার কথা বলছে আরিয়ান। কিন্ত এই একটা বাচ্চা নিতেই তো সে ভয় পায়। তাদের মত পাপীদের ঘরে সন্তান হবে আর সেই সন্তানও যে পাপী হবে না এর কোন নিশ্চয়তা নেই। দুনিয়াটা শুধু পাপীতেই ভরে যাবে। আর সে তো ঘর গোছাতে পারবে না। সব দিক আরিয়ান সামলে নিলেও যে খুনাখুনি তার নেশা হয়ে গেছে। সে এতসব কিছু কীভাবে ছেড়ে দেবে! অসম্ভব! সে আরিয়ানের দিকে তাকায়। ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছেড়ে বলে “আপনি পারবেন সব ছেড়ে দিতে?”
আরিয়ান নিজ ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসে। গম্ভীর কন্ঠে বলে “আমি পুরুষ মানুষ। আমার সাথে নিজেকে তুলনা করিস না”

মাধবী হাসে “জানি তো আপনি পারবেন না। তাহলে আমাকে কী করে বলছেন? সব ছেড়ে দিয়ে সংসার করতে?”
“সংসার তো তোকে একা করতে বলছি না। আমি তো পাশে থাকবো”
মাধবী কাঠ কাঠ কন্ঠে জবাব দেয় “আমি কোনোমতেই পারবো না আরিয়ান ভাই। নেশা চরে গেছে আমার। আপনার সন্তান চাই তো? হবে আমাদের একটা সন্তান। কিন্ত তার ভবিষ্যত? আপনার আমার কারোরই জীবনের নিশ্চয়তা নেই। আপনি খুব ভালো করেই জানেন; এই পথে ঢোকা সহজ কিন্ত মৃত্যু ছাড়া বের হওয়া সহজ না। আমাদের কিছু হয়ে গেলে বাচ্চাটার কী হবে ভেবেছেন?”
আরিয়ান নিশ্চুপ থেকে বলে “আমি জানি মধু। আমাদের মত মানুষের সন্তান চাওয়া ঠিক নয়। কিন্ত আমাদের কী বাবা ডাক শুনতে ইচ্ছে করে না? তা ছাড়া সমাজ বলতেও একটা কথা আছে। তুই জানিস; এত বিপদের মাঝেও গ্রামবাসী মুখিয়ে আছে একটা সুসংবাদের আশায়। আমাদের পর আর কোন উত্তরাধিকার নেই। এই এত এত ধন সম্পদের মালিক কে হবে? ঠিক এই কারণে আম্মা চাপ দিচ্ছে একটা নাতির জন্য। আম্মা তো আর আমাদের গোপন কথা জানে না। তাদের তো একটা নাতি দিয়ে চুপ করিয়ে রাখতে হবে। নাকি?”

মাধবী কিছুক্ষন ভেবে বলে “বেশ। তবে তাই হবে”
আরিয়ান উদ্ভ্রান্তের ন্যায় তাকিয়ে বলে “তবুও তুই ঘর মুখো হবি না?”
“পারবো না”
মাধবীর অকপটে জবাবে আরিয়ান কথা বারায় না। ততক্ষণে হাতের চুরুট শেষ। চুরুটের শেষাংশটা ফেলে দিয়ে বলে “না পারলে জোর করবো না। এবার বল তো বইটা কেন এনেছিস?”
“এটা কীসের বই আপনি জানেন?”
আরিয়ান ভ্রু কুচকে বলে “কী মনে হয়?”
“এত না প্যাচিয়ে সোজা উত্তর করবেন। রাতের মধ্যে আমাকে বুদ্ধি দিন কীভাবে গ্রামটাকে রক্ষা করবো। আমার আর ভালো লাগছে না। অশান্তি লাগছে। দয়া করে কিছু একটা করুন”
“এত অস্থির হচ্ছিস কেন?”

এরকম অবান্তর প্রশ্ন শুনে মাধবীর মেজাজ মুহুর্তেই তুঙ্গে উঠে “বালের জন্য হচ্ছি। বাল টা ফালাবা তুমি শালা শাঙ্কির পোলা। সবদিক সমলাবা, না কচুঁ। শুধু শুধু শাঙ্কির পোলা ডাকি না। আজাইরা জাওড়া জাওড়া প্রশ্ন করা ছাড়া আর কিচ্ছু পারে না বাল। সারাদিন শুধু পকর পকর। একটা কাজ যদি ঠিক করে পারতো শাঙ্কির পোলায়; তা-ও মনটারে মানাতাম। আবালের নাতি। আসলেও ভন্ডামি ছাড়া কি কিছু করতে পারবেন আপনি?”
এক নাগারে কিছুক্ষন বকাঝকার পর মাধবীর কথা শেষ হতেই আরিয়ান হেসে বলে উঠে “আসসালামু আলাইকুম আরেকটু বকা দেন। আরেকটু রাগেন। আপনি রাগ করছেন তাই আমার আপনাকে আরো বেশি ভালো লাগছে। এত শাসন আমাকে কেউ করে নাই। এত গালিগালাজও কেউ করে নাই। আপনার প্রতিটা গালিগালাজ আমার কাছে ফুলের মত লাগছে। আপনার মত লক্ষ্মী গৃহিনী সাহেবা আমি আর কোত্থাও পাবো না”
কিছুটা থেমে আবার বলে “এই বকাঝকার জন্য তোকে একটা কবিতা শোনাই হ্যা?”
বলে আবার নিজে নিজেই বলতে থাকে,

“আম পাতা জোরা জোরা
মারবো উম্মাহ চলবে চুম্মাহ
ওরে বউ সরে দাঁড়া
আসছে আমার পাগলা উম্মাহ
পাগলা উম্মাহ ক্ষেপেছে
চুম্মা ছুড়ে মেরেছে”
মাধবী কিংকর্তব্যবিমূঢ়! সে মোটেও এই কথাগুলো আশা করেনি। অন্তত আরিয়ানের থেকে তো না-ই। সে ভেবেছিলো এখন আরিয়ানও একদফা তাকে গালিগালাজ করবে। কিন্ত ব্যাপার টা সম্পূর্ণ উল্টো হয়ে গেল। হুট করেই আরিয়ানের এই বাক্যগুলো তার মন ছুঁয়ে গেল। আর কী ধরনের উদ্ভট কবিতা!? রাগের মধ্যেও সে না চাইতেও হেসে দিলো। সাথে সাথে তার চোখজোরাও হাসলো। এতক্ষনের জ্যাম ধরে থাকা মেজাজ ঠান্ঠা হয়ে গেল মুহুর্তেই। হবে না-ই বা কেন? এরকম ভাবে ক’জনের স্বামী বলে? এখনকার দিনে ঝগড়ায় তো কেউ কাউকে একচুলও ছাড় দেয় না। পৃথিবীর সকল স্বামীরাই যদি আরিয়ান ভাইয়ের মত ঝগড়ায় বউকে ছাড় দিতো তাহলে হয়তো কখনও তালাক হতো না। কেননা মেয়েরা তো এমন পুরুষই চায়। সে রেলিং এ হেলান দিয়ে ঠোঁট কাঁমরে হাসি আটকে বললো “এসব কোত্থেকে শিখলেন?”

আরিয়ান হাত দ্বারা ঘার ম্যাসাজ করে মুচকি হেসে বললো “বউয়ের রাগ ভাঙাতে এসব বলতে হয়”
বলে হুট করে মাধবীর ডান গালে একটা শক্ত চুমু খেয়ে ছেড়ে দেয়। মাধবীর সারা শরীরে আবারও বিদ্যুত স্পৃষ্টের ন্যায় ছলকে উঠে।
আরিয়ান চুমু শেষে একবার চোখ টিপলো। মাধবী ঠোঁট টিপে হাসে। তাদের এই এক টুকরো সুন্দর সময়টার সাক্ষী হয়ে রয় আকাশের চাঁদটা। কিছু সময় অতিবাহিত হলে মাধবী ঠোঁট উল্টে বলে “এই যে? দয়া করে কিছু করুন। নয়তো কাল সত্যি সত্যিই জনগন চেঁতে যাবে”
“বইটা আমার কাছে দে”
“কেন কেন?
“দিতে বলেছি”
“আগে বলুন এটা কীসের বই?”
“কীসের বই না জেনেই কী তোর কাছ থেকে চাইছি?”

“কিন্ত আপনি কীভাবে জানেন এই বই সম্পর্কে? এই বই পাওয়া তো দুর্লভ ব্যাপার”
“এখন এত প্রশ্ন করিস না। একদিন তোকে সব জানাবো। আপাতত আমি যা যা করবো শুধু দেখে যা”
মাধবী আর কিছু ভাবলো না। এই গ্রামের ব্যাপারে ভাবলে সত্যিই তার মাথা উলোট পালট হয়ে যায়। সে এটা আরিয়ানের হাতে ছেড়ে দেয়। আরিয়ান বইটা হাতে নিয়ে বলে “এটা কিছুদিন আমার কাছে থাকবে। কাজ শেষে তোকে ফেরত দিয়ে দেব”
মাধবী কিছু একটা ভেবে বলে “শুনুন?”
“হুম?”
“এই গ্রামের ইতিহাস টা আপনি জেনে আমাকে জানাবেন। আর কথা দিন একদিন আপনার ব্যাপারে সব কিছু আমাকে জানাবেন? আমি কিন্ত এই পর্যন্ত আপনার কোন পাপীষ্ঠ কার্যাবলি দেখি নি”
আরিয়ান এক পেশে হেসে বলে “জানাবো। সময় হোক। আমার পাপীষ্ঠতা দেখলে তোরও রক্ত ছোলকে উঠবে। হয়তো তোর মনেও আমার পাপীষ্ঠতার শিকার হওয়া জানগুলোর প্রতি দয়া হবে। আমার উপর ঘৃণাও হতে পারে। কিন্ত তবুও আমি বলবো। সেসব এখন বাদ। আরেকটা কথা”

“কী?”
“আম্মা টেলিফোন করেছিল”
“কী বললো?”
“এতদিনেও কোন সুখবর পায়নি বলে তোকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে চাইছে”
মাধবী স্বাভাবিক স্বরেই বলে “সমস্যা নেই। সন্দেহ থাকার চেয়ে ডাক্তার দেখিয়ে আনা ভালো। কাল না হয় একবার শেরপুর থেকে ঘুরে আসবো?”
“আচ্ছা। এবার গিয়ে শুয়ে পর। আর হ্যা…”
মাধবী ভ্রু কুচকে তাকাতেই আরিয়ান কিছুটা কঠোর সুরে বলে “মধুর বাচ্চা আর যদি কখনও তোকে একা একা রাজবাড়ি যেতে দেখি তো আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না। তোকে ছাড় দেই বলে এই না যে সবসময়ই দেব। নিজের বিপদ নিজে ডেকে আনিস না। রাত বিরাতে টই টই করতে করতে পা লম্বা হয়ে গেছে। আর কখনো গেলে আমাকে সাথে নিয়ে যাবি। তোর কোন কাজে বাঁধা দেব না আমি। কিন্ত আমার অগোচরে কিছু করতে গিয়ে নিজের বিপদ টেনে আনিস না। মনে রাখিস, তোর প্রতিটা কদমে কদমে বিপদ। আমি যেটাতে ভয় করি। সেটাই তুই বারবার করছিস। দরকার পরলে অনুরোধ করে বলছি, অন্তত একা কোথাও যাস না”
মাধবী ‘আচ্ছা’ বলে চলে যেতে নিয়েও আবার ফিরে এসে বললো “জিজ্ঞেস করবেন না এই বই রাজবাড়িতে কোত্থেকে আসলো?

“নাহ”
“কেন?”
“যাবি?”
“যাচ্ছি। একটা কথার উত্তর যদি বান্দার কাছ থেকে ভালোভাবে পাওয়া যায়”
বিরবির করে মাধবী চলে যায়। আরিয়ান কিছুক্ষন আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে আরেকটা চুরুট শেষ করে নেমে আসে। দুজন চলে যেতেই বুলবুল স্ববেগে ডানা ঝাপটায়। পেঁচাটা এতক্ষন সবই দেখেছে!

সকাল থেকে একের পর এক টেলিফোন আসছে শেরপুর থেকে। আরিয়ান, অপূর্ব, মাধবী তিনজনকেই জলদি ফিরতে বলেছে। এমনিতেও আরিয়ান আর মাধবী আজ যেত কিন্ত হঠাৎ এত জরুরী তলবের কারণ খুঁজে পেলো না তারা। এদিকে গ্রামেও আজ ভয়াবহ কাণ্ড ঘটেছে। বেশ কয়েকটা কবর উল্টে হাড় গোড় বেরিয়ে গেছে। পানির সাথেও নাকি ভেসে আসছে লাল রঙের সুতা। অসংখ্য সুঁই গাঁথা পুতুলের স্তুপ পাওয়া গেছে নাকি গ্রামের দক্ষিণে। একা একা কেউ হাটঁলেও নাকি মাটির নিচ থেকে কেউ পা টেনে গেরে ফেলছে। বাড়ির চালে বৃষ্টির মত পাথর বর্ষিত হচ্ছে। গ্রামের সব বড় বড় মাঠগুলোতে স্টার আকা। এর থেকেই একদম শিউর হওয়া গেল যে আসলেই গ্রামে কালো যাদু করা হয়েছে। এই নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। ঐ বৃদ্ধ ফকির বাবা বলেছে যত দ্রুত সম্ভব কোন ব্যাবস্থা না নিলে সব ধ্বংস হবে। উনার এই কথায় গ্রামের লোকজন ভয়ে জমে যাচ্ছে। একের পর এক নোটিশ জমা হচ্ছে মাধবীর কাছে। এত এত ঝামেলা রেখে এখন শেরপুরে রওনা দেওয়াটা একদমই অসম্ভব হয়ে দাঁড়াচ্ছে। মাধবী কিছুক্ষন ভাবনা চিন্তা করে আরিয়ান কে জানায়, অপূর্ব কে এখানে রেখে যেতে। তাহলে অপূর্ব আর অজয় মিলে এদিকটা সামলে নিলে ওরা শেরপুরে একবার দর্শন দিয়ে এলো। আরিয়ানও সম্মতি জানায়। সাথে আরেকটা নতুন সংবাদ দেয় “মধু আমি কিছু বড় বড় লোহার ব্যাবস্থা করেছি। কাল সারারাত ধরে ওসব কার্যকরী করেছি। আপাততর জন্য গ্রামের চারদিকে ৯৯ টা লোহা গেরে দিলেই হবে। এর পর ওখান থেকে ফিরে এসে স্থায়ী প্রতিকার দেবো”

মাধবী সম্মতি জানালে আরিয়ান অপূর্ব আর অজয়কে সব বুঝিয়ে দিয়ে রওনা দেয় শেরপুরের উদ্দেশ্যে। বেশ কিছুটা যাওয়ার পরেই আয়াজের দেখা মেলে। সে যেন অপেক্ষাতেই ছিলো কখন ওরা আসবে। তার কাছে গরুর গাড়ি ভিড়তেই সে দোঁড়ে আরিয়ানের কাছে আসে। এতদিন পর আয়াজকে দেখে আরিয়ানও লাফিয়ে নামে। আয়াজের পোশাক আশাকের অবস্থা দেখেই বোঝা যাচ্ছে বাড়ির খবর। মাধবী ছাউনির নিচেই। আয়াজ আরিয়ানের কাছে এসেই বলে “ভাই আমার বউয়ের মন থেকে তোকে মুছে দে। ওর মুখে তোর নাম ছাড়া আর কিচ্ছু নাই। তুই কি ওকে কিছু করেছিস?”
তারপর সন্দিহান কন্ঠে বলে “তুই কি ওকে জাদু টোনা…”

তাকে মাঝ পথে থামিয়ে দিয়েই আরিয়ান চেঁতে উঠে। স্বভাবত গালিগালাজ শুরু হয় “তোর নানীর ডিম। তুমি চান্দু আমার ভালা মুখটাকে খারাপ মারাইবা না। এতদিন পর দেখা কইরা বালের কথা কয়”
আয়াজ জেদ ধরে বলে “তোর ভালোর গোষ্ঠীর তুষ্টি। তুই আমার বউরে ঠিক করে দে”
আরিয়ান বিরক্ত হয়ে বলে “বালের বউ তোমার। আমি ক্যান ঠিক করমু? আমার বউয়ের বাচ্চা শালি জানতে পারলে ঘরে ভাত নাই ”
আয়াজ হঠাৎই ভীষন আফসের সুরে জিজ্ঞেস করলো “তোকেই কেনো আমার বউ ভালোবাসতে গেলো?”
আরিয়ান কাঁধ উচিয়ে চেঁচিয়ে উঠে। কেন যেন এই ইচ্ছের কথা শুনলেই তার মেজাজ খারাপ হয়। মৃদু চিৎকারে বলে “আমি কী জানি। শালা সর এখান থেইক্কা। এমনিতেই তোর বউ… শালি আস্তো নটির ঝি। মুখটা খারাপ করিস না আয়াইজ্জা”
আয়াজ বিরক্ত হয়ে বলে “শালা তোর এই মুখের কথা তোর বউয়ের বাচ্চা শালি জানে?”
আরিয়ানও কন্ঠে বিরক্তি ঢেলে বলে “আহা আমার ভালা মানুষ। হেই মাইয়ার মুখের ভাষা শুনলে তোর কান আর কানের জায়গায় থাকবে না। উঁইড়া যায়া তোর বালের বউয়ের বাসর ঘরে পরবো”
“এত গালিগালাজ করে কী পাস?”

“গালিগালাজ করা একটা মহৎ গুণ। যা সবার মধ্যে থাকে না। আর যার মধ্যে থাকে সে মানুষ না সে…
“সে আপনার মত পাগল”
ছাউনির ভেতর থেকেই ভেসে আসে মাধবীর ঝাঝাঁলো কন্ঠস্বর। আরিয়ান সেদিকে তাকিয়ে মুখ বাকিয়ে বলে “তোর নানীর ডিমের মত”
ভেতর থেকে মাধবী চেঁচিয়ে বলে “আল্লাহ এই বান্দার মুখে বোম মারো”
আরিয়ানও চেঁচায় “তোর নানীর ডিমে বোম পরুক বান্দি আবুলের নাতি”
আয়াজ মাধবীর কন্ঠ শুনে সেদিকে এগিয়ে যেতে নিলে আরিয়ান বাঁধ সাধে। এক পেশে হেসে বলে “ভাই সব কথা এখানে বল। ওর মাথা এমনিতেই নষ্ট। আর নষ্ট করো না। পরে আবার সংসার করা দুষ্কর হয়ে যাবে”
আয়াজ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে “কি করবো আমি?”
“আমি কী বলবো রে আয়াজ ভাই। তোমার বউ যে জাতের ছিনাল”
“তাহলে কী আজীবন এভাবেই থাকতে হবে?”

আরিয়ান বললো “এসব রেখে চাচা চাচিকে নিয়ে বাড়ি চলে আসো। বাড়িতে কী যেন হয়েছে। জলদি যেতে বলেছে। আজ সময় দিতে পারছি না। তাড়া আছে। তুমি বাড়ি চলে এসো”
বলে আয়াজের থেকে বিদায় নিয়ে আবার যাত্রা শুরু করে। আয়াজ থমকে দাঁড়িয়ে রয়। সকলে জোর করে বিয়েটা দিয়ে এখন ফিরেও তাকাচ্ছে না। এমন না সে ইচ্ছেকে মানানোর চেষ্টা চরেনি। সে অনেক চেষ্টা করেছে কিন্ত ইচ্ছের সেই একই কথা “জীবনে প্রথম এবং শেষ বারের মত ঐ মধুমতীর পাঞ্জাবিওয়ালার প্রেমেই পরেছিলাম। আজও সেই বিরহ কাটিয়ে উঠতে পারছি না। তোমার যেই অবস্থান আমারও সমান। তুমিও একতরফা ভালোবেসে নিঃস্ব হচ্ছো আর আমি তো হলামই”

আর যাই হোক কখনও নিজের স্ত্রীর মুখে কেউ অন্য পুরুষের নাম শুনতে পারে না। সেখানে সরাসরি ইচ্ছে সর্বক্ষণ বলতে থাকে সে আরিয়ান কে ভালোবাসে। এই কথাটা শুনতে শুনতে তার কান পচেঁ যাচ্ছে। হিংসেরা দানা বাধঁছে হৃদয়ে। এই ভালোবাসাটা সে কেন পেল না? কেন ইচ্ছে তাকে ভালোবাসলো না? না পাওয়ার চেয়ে পেয়ে হাড়ানোর ব্যাথাটা তীব্র হয়। সে কী এবার তার ইচ্ছেকে পেয়েও হাড়াতে চললো? ইচ্ছে হঠাত কিছুদিন যাবতই বলছে তাকে তালাক দিয়ে দিতে। আরে মেয়েটা কী আদেও জানে যে এই ‘তালাক’ নামক ছোট্ট শব্দ টা উচ্চারণ করার চেয়ে তার কাছে মৃত্যু অধিকতর সহজ! এছাড়াও কিছুদিন যাবত এটা ওটা নিয়ে ঝগড়া বেঁধে যাচ্ছে দুজনের। যা আয়াজ কখনোই চাইতো না।

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৩৫

কিন্ত সারাদিন চুরুট খাওয়াতে মাথা ঠিক থাকে না আর তখনই ইচ্ছের মুখ থেকে শুনতে হয় আরিয়ানের নামটা। ব্যাস। সে কোনভাবেই নিজের রাগ সংবরন করতে না পেরে কথা কাটাকাটি হয়ে যায়। এভাবে দুরত্ব আরো বাড়ছে ব-ই কমছে না। আজ যদি আরিয়ানের স্থানে অন্য কেউ থাকতো তাহলে কবেই উপরে পাঠিয়ে দিত। কিন্ত নিজের ভাই বলে শেকল বন্দি হয়ে আছে। কিন্ত ভালোবাসার ক্ষেত্রে এই শেকল ক’দিন তাকে আটকে রাখতে পারবে সে জানে না। মেজাজ খারাপ হলে ইচ্ছা করে আরিয়ানকেউ খুন করে ফেলতে। আর ক’দিন নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে? সে বেশ বুঝতে পারছে আরিয়ানের সাথে তার সম্পর্ক নষ্টের পথে। যার কারণটাও সে এবং তার অবাধ্য বউ ইচ্ছে।

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৩৭