তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৩৭
ঐশী আফরিন
ভাঙা জানালার ফাঁক গলে সকালের নরম আলো দ্যুতি ছড়াচ্ছে ঘরময়। জানালার পাশের ছোট্ট ভাঙা টেবিলটায় বিষন্ন বদনে বসে আছে রুহি। হাতে এক টুকরো সাদা কাগজ। বেশ কিছুদিন যাবত নানান অযুহাতে অভির সাথে যোগাযোগ করতে চেয়েও কোনোমতেই পেরে উঠছে না। তাছাড়া লোকটারও কোন হদিস নেই। এই যে দিনের পর দিন গ্রামের ভাঙা কুঠুরিতে পরিবার নিয়ে থাকছে; কই এর পর তো লোকটা আর আসলো না। লোকটার এমন লাপাত্তা হয়ে যাওয়ার কারণও ভেবে পাচ্ছে না। বারংবার মন কুঠুরিতে এক ঘৃণ্য কথা ঘুরপাক খাচ্ছে; লোকটা কী তাকে ঠকালো! তাকে পরিবারের সামনে কলঙ্কিত করে চলে গেল!। কী বাজে ভাবেই না সে ঠকলো এক বিধর্মী ছেলেকে ভালোবেসে। রাশেদা ইশান তো বরাবরের মতই তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে বলতে থাকেন “মুখপুরি মেয়ে। সুখের পরিবারটাও নষ্ট করলি নিজের জীবন টাও নষ্ট করলি। কই এখন তোর ঐ হিন্দু নাগর। আসলো না তোরে নিতে। আসলেও পিরিত করে থাকলে তো ধর্ম ত্যাগ করে আসতো। আসে না মুখপুরি। কলঙ্কিনী মেয়ে”
সবসময় আদরে রাখা মায়ের কাছ থেকে এমন তাচ্ছিল্যের শিকার হয়ে সেদিন প্রতিক্রিয়া দেওয়ার ভাষা হাড়িয়েছিল সে। সে নাকি এখন মুখপুরি! কথাটা ভাবতেই হাসি পায় তার। পাশের ঘর থেকে শোনা যাচ্ছে আয়াজ আর ইচ্ছের বাকবিতন্ডার আওয়াজ। এ যেন প্রতিদিনের নিয়ম হয়ে গেছে। বর্তমানে রাশেদা এবং আনোয়ার ইশান দিন দুনিয়ার সমস্ত বিষয়ে প্রতিক্রিয়া বিহীন হয়ে গেছে। সুন্দর পরিবারের বন্ধন শুধুমাত্র তার জন্য ভেঙে চুরমার। কেউ মরে পরে থাকলেও কেউ যেন কারো দিকে তাকিয়ে দেখতে চায় না। সবাই গা বাচিয়ে চলতে চায়। এই তো আজ দুদিন হলো রুহির গায়ে তীব্র জ্বর। কিন্ত কেউ তাকিয়েও দেখছে না। আয়াজ ভাইয়াটা তো এমন ভাবে থাকে, যেন তার না আছে কোন বাবা-মা আর না আছে কোন বোন। অথচ একসময় তার সামান্য ঠান্ডা লাগলেও কত্ত অস্থির হতো তার ভাইটা! আর আজ! ঐ ইচ্ছে মেয়েটাকে ছাড়া কাউকে পরোয়া করে না। শত অবহেলা পেয়েও ঐ একটা মেয়ের কাছেই ছুটে যায়। এতটা আত্মসম্মাণহীন কী করে হলো তার ভাই! ভালোবাসা বুঝি মানুষ কে এতটা নির্লজ্জ করে দেয়! কী দরকার তবে এত ভালোবাসার! একটা মাত্র জীবন আমাদের।
আমরা এই এক জীবনই অন্য কাউকে ভালোবেসে উৎসর্গ করতে চাই। অথচ আমাদের উচিত ছিলো নিজেকে ভালোবাসা, নিজের যত্নে সময় ব্যায় করা। আমরা তা না করে অন্য কাউকে ভালোবেসে নিজের সবটা সত্ত্বাকে তার মাঝে বিলিয়ে দেই। এতেই তো বোঝা যায় মানুষ ঠিক কতটা বোকা প্রাণী। কথাগুলো ভেবেই দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে রুহি। হাতের কাগজটার দিকে একবার তাকিয়ে চিন্তা করে, এখন সে ঐ ডাক্তার বাবুর জন্য চিঠি লিখলেও কাকে দিয়ে পাঠাবে? সে মত পাল্টে চিন্তা করলো মাধবীকে একটা চিঠি লিখবে। কিন্ত এরমধ্যেই রাশেদা ইশান হুরুস্থুল করে ঘরে ঢোকে। মাকে দেখা মাত্রই রুহি কাগজটা ফেলে উঠে দাঁড়ায়। ঘরে ঢুকেই রাশেদা ইশান চোখ পাকিয়ে জিজ্ঞেস করে “আরশি কোথায়?”
মায়ের এহেন প্রশ্নে রুহি অবাক হয়। কপাল কুচকে বলে “আমি কী করে জানবো আপু কোথায়? আমার কী যোগাযোগ আছে নাকি তার সাথে”
রাশেদা খেঁকিয়ে উঠে “মিথ্যে কথা বলবি না। তোরা দুটো একসাথে থেকে থেকে নষ্টামি শিখেছিস। নিজে তো ধরা খেয়ে পরিবারটা ধ্বংস করলি। এখন ঐ মেয়ে রূপ দেখাচ্ছে। কাল রাত থেকে নাকি পাওয়া যাচ্ছে না। কোন প্রেমিক টেমিক ছিলো নাকি?”
রুহি চোখ বন্ধ করে দাঁত চেপে কথাগুলো সহ্য করে। মা বলে আজ চুপ থাকতে হচ্ছে। তবে কোন মা কী মেয়ের সাথে এমন আচরণ করতে পারে? এই মা তো তার ছিলো না? দলা পাকিয়ে কান্না আসলেও তা দমিয়ে রেখে সে উত্তর দেয় “আপু কারো সাথে প্রেম করেনি। হয়তো কোন বান্ধবীর বাড়ি গেছে। খোঁজ নিতে বলো। কিন্ত তোমরা কীভাবে জানলে আরশি আপুকে পাওয়া যাচ্ছে না”
“ওওও তবে তুই-ই কপাল পুরেছিস। ঐ মেয়ে তাহলে ঠিকই আছে। তৈরী হ এখন। ও বাড়ি যেতে হবে”
রুহি তর্কে জড়াতে চাইলো না। তবে একটা কথা না বলেও পারলো না “আরশি আপুর ব্যাপারে জানলে এই কথাগুলো বলতে পারতে না। আরশি আপু আরিয়ান ভাইকে পছন্দ করতো। যাদু-টোনা অবধি করতে চেয়েছিল”
রাশেদা ইশান বিষ্ফরিত নয়নে তাকায়। চোখ বড় বড় করে বলে “যাদু টোনা?”
রুহি এবার শান্ত স্বরে বলে “তোমাদের ধারনার বাহিরে ওরা সবাই কী করতে পারে। মাধবী,আরিয়ান, তৃশান, ইরিশা,আরশি,আয়াজ, ইচ্ছে, অপূর্ব ও তার ভাই অরিন্দ, অভি, মাধবী আপুর বান্ধবী অপরাজিতা এবং চাচাতো ভাই আহান,এবং আরিয়ান ভাইয়ের কর্মচারী অজয়, এই মানুষগুলোকে তোমরা যেমন দেখ ওরা আসলে তেমন নয়। আহান ভাই সেদিন মারা না গেলে আরিয়ান ভাইয়ের সাথে খুনাখুনি হয়ে যেত তার। কেননা উনিও মাধবী আপুকে পছন্দ করতো। আর তোমাদের গুনধর বউমা ইচ্ছে। সে-ও আরিয়ান ভাইকে ভালোবাসে। তাই তোমার ছেলেকে মেনে নিচ্ছে না। ইরিশা ভাবি না থাকলেও তার আদর্শগুলো আমি মাধবী আপুর মাঝে দেখেছি। ওদের সম্বন্ধে তোমাদের বিন্দু পরিমাণ ধারনা নেই। ওদের সহিংসতা দেখাতে বাধ্য করোনা। ওরা সবাই সমাজের বাহিরে থাকা মানুষ। ওরা সমাজ নয়, ভালোবাসা চেনে আর নিজ মর্জিমত চলতে জানে। পুরো দুনিয়া এক করে ফেলতে পারে ওরা ভালোবাসার জন্য। বিশ্বাস করো, যদি ওরা বেঁচে থাকতে তোমরা আমাকে অন্য কোথাও বিয়ে দিতে পারো তবে আজীবন তোমাদের গোলাম হয়ে থাকবো”
রাশেদা ইশান বিষ্ফরিত নয়নে তাকান মেয়ের দিকে। কী বলছে এই মেয়ে এতগুলো তরুণ তরুণীদের নামে? কী করে এরা? তিনি তো শুধু মাধবী আর আরিয়ানের ব্যাপারে এতটুকুই জানেন যে, এই দুটো যা ইচ্ছা তাই করে। কারো কথার পরোয়া করে না। ইচ্ছে মেয়েটা তো নিজের ইচ্ছাতেই বিয়েটা করেছিলো। তাহলে এখন এসব কী শুনছে? আর বাকিরা? ওদের তো তিনি আসলেই ভালো চোখেই দেখেন। তিনি রুহির বাহু ঝাপটে বলে “কী বলতে চাইছিস? কী করে ওরা?”
“বললামই তো ওরা সমাজের ধার ধারে না”
“আর তুই?”
রুহি হাসে “আমিই? আমি ওদেরই একজন হয়ে যাচ্ছি”
রাশেদা চোখ পাকান “এই মেয়ে কী বলছিস কী? তোরা কী দল বানিয়ে কোন নষ্টমি করিস? তুই ওদের সাথে যোগ দিলি কীভাবে?”
রুহি নিজের বাহু ছাড়িয়ে নিয়ে বলে “নিজের মন মানসিকতা ভালো করো আম্মা। এখানে কোন দল নেই। আমি শুধ এতটুকে বোঝাতে চাইলাম যে এই মানুষগুলো চাইলে সব করতে পারে। এরা আলাদা। অনন্ত তোমাদের থেকে”
রাশেদা কিছু বলতে যাবে এরমধ্যেই আনোয়ার ইশানের হাঁক শোনা যায় “কোথায় সকলে? তাড়াতাড়ি আসো। গরুর গাড়ি দার করানো”
রাশেদা আর কথা না বারিয়ে চোখ রাঙিয়ে বেরিয়ে যায়। পরে এই ব্যাপারে ঘাটাঘাটি করবে। যাদুটোনার কথাটা উনার মনে গেঁথে গেছে। রুহি সেই চোখ রাঙানো পাত্তা দেয় না। গায়ের ওড়নাটা ঠিক করে বেরিয়ে পরে।
“আরশির ব্যাপারে কিছু জানো তুমি?”
আয়াজের এহেন প্রশ্নে ইচ্ছে বিরক্ত বদনে তাকায়। এই কিছুক্ষন আগেই না কত অপমান করে দিলো। কতটা নির্লজ্জ বেহায়া লোক হলে পরে আবারও তার কাছে আসে? সে দাঁত চেপে বলে “আরশির খবর কী আমার কাছে উঁড়ে উঁড়ে আসবে? অযথা প্রশ্ন”
আয়াজ গায়ের শার্ট পরতে পরতে বলে “ভালোভাবে কথা বলতে পারো না?”
“জানোই তো। তবুও ভালো কথা কেন শুনতে চাও? বিয়ে করার আগে মনে রাখা উচিত ছিলো। নির্লজ্জ বেহয়ার মত ঠকিয়ে বিয়ে করেছো। কুত্তা”
আয়াজ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে “বারংবার বলে গেলে বিয়ে কেন করলাম অথচ একবারও জিজ্ঞেস করলে না কেন তোমাকেই বিয়ে করলাম। এই এক কথা শুনতে শুনতে কান পচে যাচ্ছে। নতুন কিছু থাকলে বলো”
“আপনার সাথে তো আমার কথাই বলতে ইচ্ছে করে না। অসহ্য লোক একটা”
আয়াজ রুঢ় হাসে। এ কেমন ধৈর্য্যের পরীক্ষা তার! বিয়ের ছয়-সাত মাসের মধ্যে এই পর্যন্ত তো কম গালিগালাজ শোনেনি। কিছু হজম করেছে আর কিছু না পেরে ঝগড়া করেছে। এসব তো নিত্যদিনের ব্যাপার। সে ওসব পাত্তা না দিয়ে বলে “শেরপুর থেকে চিঠি এসেছে। আরশিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বাহিরে গরুর গাড়ি দার করানো। তাড়াতাড়ি আসো”
কথাটা বলে পা বারাতে গিয়েও ইচ্ছের প্রশ্নে থমকে দাঁড়ায়। ইচ্ছে আকুল স্বরে জিজ্ঞেস করে “আরিয়ানও আসছে?”
আয়াজ দাঁতে দাঁত চাপে। ঐ আকুল কন্ঠ সে শুনতে চায় না। যেই কন্ঠ তার জন্য আকুল হবে না সেই কন্ঠ শুনে কী হবে? সে চোয়াল শক্ত করে। দাঁতে দাঁত চেপে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে “এখন গিয়ে যদি আরিয়ান কে বিরক্ত করিস তবে ও তোকে জ্যান্ত কবর দেবে কিন্ত। আর ওকে আমি। শেষে ওর বউ তোকে। গল্প এখানেই শেষ। তুই জানিস তুই প্রতিটা মানুষের ঝামেলার কারণ। আরিয়ান নিজের উপর মাধবী ছাড়া অন্য নারীর দৃষ্টি সহ্য করতে পারে না। এটা কোন আবেগ না। ছোট থেকেই এটা ওর রোগ। আর তোর জন্য ওর কোন ক্ষতি হলে মাধবী তোকে খুন করে ফেলবে। আর আমি তো এমনিতেও না জানি কবে তোর জন্য, শুধুমাত্র তোর জন্য আরিয়ানের খুনি হয়ে যাই। বিশ্বাস কর মেয়ে তোর এই ভুলের জন্য ভাই বোনদের মাঝে খুনোখুনি হয়ে যাবে”
বলেই গট গট পায় বেরিয়ে যায়। ইচ্ছে ভেজা চোখের পাতা মোছে। এখন সে সবার কাছে ঝামেলা হয়ে গেল? তাকে নাকি মাধবীর হাতে খুন হতে হবে? আর আরিয়ানের এই রোগের কথা তো এতদিন শোনেনি? নাকি সবাই জানতো শুধু সে ছাড়া? কিন্ত সে যে ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নয়। সে হাড়তে শেখেনি। হেড়ে যাওয়ার হলে সেই বছরখানেক আগেই আরিয়ানের তুচ্ছ তাচ্ছিল্য নিয়ে হেড়ে যেত। এতবছর যেহেতু লড়েছি আরো লড়বে। যদি প্রাণটাও দিতে হয় দেবে। ভালোবাসার মানুষটাকে পাওয়ার জন্য প্রাণটা দিয়ে দিলে কী এমন হবে? তবুও মাধবীর সাথে দেখতে পারবে না। আর না সে আয়াজের কোন হুমকিকে ভয় পায়।
শেরপুরের ছোট্ট ইশান বাড়িতে আজ শোকের ছাঁয়া। একমাত্র মেয়ে হাড়িয়ে নমিতা ইশান পাগল প্রায়। এতদিন যে যেখানেই ছিলো আজ সকলে ইশান বাড়িতে উপস্থিত। এখানে পৌছেই আয়াজ আরিয়ানেরা খুঁজতে বেরিয়ে গেছে। ওদের সাথে ইচ্ছেও গেছে। এই নিয়ে মাধবী কোন প্রতিক্রিয়া না দেখালেও আয়াজ নিয়ে যেতে চায়নি। কিন্ত মেয়েটার জেদের কাছে বশ্যতা শিকার করে সাথে নিতেই হলো। আপাতত বাড়িতে শুধু মহিলারা উপস্থিত। বাকিরা একে একে খুঁজতে বেরিয়ে গেছে। মাধবী সোফার এক কোণে বসে সবার প্রতিক্রিয়া দেখতে ব্যস্ত। রুহির চোখ কাঙ্খিত একজন মানুষকে খুঁজে যাচ্ছে। কিন্ত মানুষটার পাত্তা নেই। রাতের মধ্যে এক দফা খোঁজখবর নেওয়ার পর এতটুকু জানা গেছে যে আরশির বান্ধবী মনাকেও কাল থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। এই থেকে সবাই সন্দেহ করেছিল হয়তো দুই বান্ধবী একসাথে প্রেমিকের হাত ধরে পালিয়েছে। কিন্ত তাদের সন্দেহ কে ভূল প্রমাণিত করে মাধবী আর রুহি বলেছে, আরশির কোন প্রেমিক ছিলো না। তাহলে মেয়েটা গেল কোথায়? কোন ক্ষতি হয়ে গেল কিনা এই ভেবে নমিতা ইশানের কান্নার বেগ বারে। তিনি নিজের ঘরে বসে বিলাপ করছেন। আর তার পাশে বসে রাশেদা ইশান সান্তনা দিচ্ছেন। মাহমুদা ইশানের আবার এসবে তেমন কান নেই। তিনি সকাল থেকেই নিজের মত রান্না বান্না করে যাচ্ছেন আবার মাধবীদের এটা ওটা খেতেও বলছেন। ওনার মাঝে বিন্দু পরিমাণ চিন্তা নেই যে বাড়ির মেয়েকে পাওয়া যাচ্ছে না। রুহি আশপাশ লক্ষ্য করতে করতে দেখলো মাধবী আরশির ঘরের দিকে যাচ্ছে। সেও উঠে দাঁড়াল মাধবীর কাছে যাবে বলে। তবে যেতে আর পারলো না। পেছন থেকে প্রিয় পুরুষটার কন্ঠ পেয়ে থমকে দাঁড়াল।
“রুহি ছাঁদে আসো। কথা আছে”
বলেই অভি পা বারায়। এতদিন পর প্রিয় পুরুষের কন্ঠ শুনে ভেতরে শিহরণ বয়ে চলে রুহির। ইচ্ছা করলো ছুটে চলে যেতে। কিন্ত তার তো অভিমান করা দরকার। এতদিন কোথায় ছিলো লোকটা? এতদিন পর মনে পরলো তাকে? অভিমানের পারদ গাঢ় হলো তার। কিন্ত অভিকে থমকে দাঁড়িয়ে পরতে দেখে তড়িঘড়ি বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। অভি একবার পেছনে তাকিয়ে আবার হাটঁলো। ছাঁদের সিরি ঘরের বাহিরের দিকে এক পাশে লাগানো। রুহি আশেপাশে কাউকে না দেখে আলগোছে চলে এলো অভির পিছু পিছু।
মাধবী এই মাত্র আরশির রুমে এসেছিলো জিনিস পত্র ঘেটে দেখতে। যদি কোন সূত্র পাওয়া যায়। তাছাড়া একবার যে আরশি জাদু করতে চেয়েছিল সেই জিনিস গুলো সে চৌকির নিচে রেখেছিল। দেখতে হবে আছে কীনা। আর ঐদিনের পর আরো চেষ্টা করেছিল কিনা।কিন্ত বাহিরে অনেকগুলো পদধ্বনি শুনা যায় একসাথে। সবাই কী চলে এলো? এই ভেবে কাজ না করেই বেরিয়ে আসে। সব পুরুষেরা চলে এসেছে। এত তাড়াতাড়ি চলে এলো যে? সে মুখটা ঢেকে নিয়ে দ্রুত বের হয়। রুহি আর অভি ছাড়া বসার ঘরে সবাই উপস্থিত। আরিয়ানদের আসার খবর পেয়ে সবাই উপস্থিত হয়েছে। কিন্ত মাহমুদা ইশান নিজের মত ঘুরে ঘুরে কাজ করছেন। এই বৈঠকে তিনি বসতে নারাজ।আরিয়ানই সর্ব প্রথম কথা শুরু করে। সোফায় আয়েশি ভঙ্গীতে বসে নমিতা ইশানের উদ্দেশ্যে বলে “চাচি মাথা ঠান্ডা রেখে আগে শুনবেন পরে বলবেন। আরশির সম্বন্ধে এমন কিছু পায়নি যে কোন প্রেমিক টেমিক ছিলো। আবার ওর বান্ধবীকেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যাপার টা গড়মিলে হয়ে যাচ্ছে। আশেপাশে সব জায়গায় মাইকিং হচ্ছে। কেউ খুঁজে পেলে অবশ্যই আমাদের জানাবে। তাই অস্থির না হয়ে ধৈর্য ধরুন”
নমিতা ইশান ধ্যান ধরে আরিয়ানের কথাগুলো শুনলেন। বুক ফেটে যাচ্ছে উনার। মেয়েটাকে কী আদেও পাবে কীনা কে জানে। তিনি নিজেকে সামলাতে না পেরে ডুকরে কেঁদে উঠেন। দুপুর হতে চললো। প্রায় ১৪ ঘন্টা হতে চললো মেয়েটা নিখোঁজ। রাশেদা ইশান সান্তনা দেওয়ার ভাষা পেলেন না। কেবল জাঁয়ের পাশে বসে মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিলেন। পাশ থেকে ইচ্ছে আরিয়ান কে জিজ্ঞেস করে “পুলিশ কে জানাওনি তোমরা?”
আরিয়ান, মাধবী, আয়াজ তিনজনেই বিরক্তিতে কপাল কুচকে ফেলে। মেয়েটা তো ওদের সাথেই গেলো। তবুও হুশ নেই কী কী করা হয়েছে। নিশ্চিত সারাক্ষণ ধ্যান ধরে আরিয়ানের দিকে তাকিয়েছিল। ভেবে তিনজনেই বিরক্তির নিঃশ্বাস ফেলে। এখন আশেপাশে মুরুব্বিরা না থাকলে এতক্ষনে আরিয়ানের মুখ থেকে গালির বহর পরতো। মাধবীর তো মনে মনে একদফা গালিগালাজ করা শেষও। শুধু আয়াজ শান্ত স্বরে জবাব দেয় “পুলিশকে জানানো হয়েছে। ওরা চেষ্টা করছে”
ইচ্ছে মুখ ঘুরিয়ে বলে “তোমাকে জিজ্ঞেস করিনি”
আরিয়ান দাঁত চেপে বলে “বউ কিছু জিজ্ঞেস করলে স্বামীদেরই উত্তর দিতে হয়। আরেকজনের স্বামীর কাছ থেকে আশা না করাটাই ভালো”
ইচ্ছে কিছু বলে না। চুপ থাকে। আয়াজের এমনিতেও ভালো লাগছে না। আরশি আর রুহিকে একসাথে বড় করেছে সে। কখনো কোন কিছুর কমতি রাখেনি। সমান ভাবে বড় ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করে গেছে। এখন তার কিছুদিনের অনুপস্থিতিতে যদি একটা বোনকে হাড়িয়ে ফেলতে হয় সেটা সে কীভাবে মানবে? ভেতরে ভেতরে দগ্ধ হচ্ছে হৃদয়। মাধবীর মুখটাও বিষন্ন। সব কিছুর পরেও একটা আস্ত মানুষ এমন উধাও হয়ে যেতে পারে না। ফখরুল ইশান কোন নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না মেয়েকে খুঁজে পাওয়ার। চোখ ভার হয়ে উঠছে উনার। একসময় কপালে হাত ঠেকিয়ে তিনিও কেঁদে উঠেন। আরিয়ান একবার সবার বিষন্ন চেহারার দিকে তাকায়। এই থমথমে পরিবেশে তার একটা আজব শখ জেগেছে। এই ভর দুপুরে ভীষন প্রেম প্রেম পাচ্ছে। কী হলো তার হঠাৎ! তার কী এখন উচিত না বোনের শোকে একটু শোকাহত হওয়া! কিন্ত এখন এই প্রেম প্রেম পাচ্ছে কেন বুঝে আসছে না। সে একটা ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছেড়ে মাধবীর দিকে তাকায়। মেয়েটাও শোকাহত।
তখনই শোনা যায় বাহির থেকে কারো দৌড়ে আসার পদধ্বনি। অরিন্দ এই মাত্র ইশান বাড়ির দুঃসংবাদ পেয়ে ছুটে এসেছে। বাহির থেকে কান্নার আওয়াজ পেয়ে হুরুস্থুল করে ঢুকতে গিয়েই বাজে বিপত্তি। বাথরুমের বাইরে একগাদা সাবান পানি ছিলো। না দেখে দৌড়ে এসেই খালি পায়ে পিছলা খেয়ে তৎখনাত চিৎপটাং! ভারি কিছু পরে যাওয়ার শব্দে সবাই ফিরে তাকায়। উপুত হয়ে পরে আছে অরিন্দ। মাথার উপর বল ভর্তি ফেনা। আরিয়ান একবার সেদিকে তাকিয়ে ঠোঁট টিপে হাসি আটকায়। একি এই শোকের সময় তার হাসি উঠছে কেন! এখন হাসলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। সে কোন মতে হাসি আটকে বসে থাকে। তবে ছেলেটা কে তুলতে পর্যন্ত যায় না। ততক্ষণে সবাই ধরাধরি করে তুলতে গেছে। মাহমুদা ইশান ‘হায় হায়’ করে তুলতে গেলে অর্ধেক উঠানোর পর সাবানে পিছলা খেয়ে আবারও ধপ করে পরে। এবার আর আরিয়ান হাসি আটকাতে পারে না। ‘হো হো’ করে হেসে ফেলে। সকলে থমথমে মুখে তাকায় তার পানে। অরিন্দ বেচারা ব্যাথায় কুকড়ে যাচ্ছে। বেচারার চেহারা দেখে আরো হাসি পায় তার। তবে সকলে তার দিকে তাকিয়ে আছে বুঝতে পেরে ঠোঁট চেপে হাসি আটকানোর বৃথা চেষ্টা করে। মাহমুদা ইশান নিজের দামরা ছেলেকে ধমকে উঠেন “আরিয়ান? কী হচ্ছে? ছেলেটা পরে গেছে অথচ না তুলে হাসছিস?”
আরিয়ান ঠোঁটে আঙুল রাখে। অরিন্দ কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। ওর দৃষ্টি দেখলে আরো হাসি পাচ্ছে আরিয়ানের। নাহ এখন হাসা যাবে না। এই মুহূর্তে সবাই শোকাহত ছিলো তা সে ভূলে গিয়েছিল। সে একবার মাধবীর দিকে তাকায়। দাজ্জাল মেয়ে এক হাত কোমরে ঠেকিয়ে কটমট করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। মানুষ কতটা ভন্ড হলে এই থমথমে পরিবেশেও কাউকে পরে যেতে দেখে হাসতে পারে? এ নাকি আবার এমপি! যখন জনগনের দুঃখ শুনে যখন দাঁত কেলিয়ে হেসে দেবে তখন গনপিটুনি খেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। আরিয়ান ঠোঁট কামরে ঘরের দিকে পা বারায়। যাওয়ার আগে মাধবীর পাশ ঘেঁষে বলে যায় “গৃহিনী সাহেবা আজ না বড্ড প্রেম প্রেম পাচ্ছে। আধা মিনিটের মধ্যে ঘরে আসবেন”
বলে এক পেশে হেসে চলে যায়। মাধবী কপালে বিস্তর ভাজ ফেলে সেদিকে তাকায়। নাখ মুখ কুচকে বিরবির করে ‘শালা ভন্ডর ঘরের ভন্ড’। ততক্ষণে অরিন্দ কে ধরে সবাই সোফায় বসিয়েছে। সেদিকেই ব্যাস্ত সকলে। সে সুযোগ বুঝে ঘরে চলে আসে। আরিয়ান পাঞ্জাবি খুলে শুয়ে আছে। সে এগিয়ে গেলে আরিয়ান ঠোঁট কামরে হেসে বলে “আচ্ছা গৃহিনী বলতো, ওটার নাম লোকে বাথরুম কেন রাখলো? ভাত খাওয়ার রুমের নাম বাথরুম রাখা উচিত ছিলো আর পেট পরিষ্কার করার রুমকে ‘হাগরুম’ বলা উচিত ছিলো। ঠিক না? লোকে নামই রাখতে জানে না। কী অশিক্ষিত মানুষ। ষ্যাহ”
মাধবী কিছুক্ষন চুপ করে বসে রইল। আর কি-ই বলার আছে এই লোককে? ঐ রুমের নাম নাকি হাগরুম রাখা উচিত ছিলো! কত্ত বিশাল অসভ্য লোক। সে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছেড়ে বলে “আপমি ডাইকেন আমার পছন্দের হাগরুম নামে। কিন্ত ওখানে এটা কী করলেন? প্রত্যেকটা মানুষের মন খারাপ ছিলো। আর তার মাঝে আপনি দাঁত কেলিয়ে দিলেন?”
আরিয়ান চিত হয়ে শুয়ে সিলিং ফ্যানে চোখ রেখে পায়ের উপর পা তুলে শুয়ে আছে। কপালের উপর হাত রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে “আমার মত কঠিন জাওড়া হলে বুঝতি সিরিয়াস মুহুর্তে হাসি আটকানো ঠিক কতটা কঠিন”
মাধবী কোমরে হাত রেখে বলে “আপনি আর ভালো হলেন না?”
“হবোও না”
বলে হ্যাচকা টানে মাধবীকে নিজের কাছে নিয়ে আসে। আচমকা কাণ্ডে তাল সামলাতে না পেরে আরিয়ানের খোলা বক্ষে কপাল ঠেকে মাধবীর। তৎক্ষনাত আরিয়ান নিজের অর্ধেক শরীরের ভর মাধবীর উপর ছেড়ে দেয়। মাধবী চেঁচিয়ে উঠতে নিলে এক হাতে মুখ চেপে গলায় মুখ গুঁজে দেয়। মাধবী ছটফটিয়ে উঠে। মুখ থেকে হাত ছাড়িয়ে বলে “দরজা খোলা। কেউ চলে আসবে”
আরিয়ান গলার ভাজে মত্ত থেকেই বলে “আসুক”
“ছাড়ুন”
“উহুম”
“ইশশ”
“চুপ”
“রাগ উঠছে”
“আমারও”
“ব্যাথা পাচ্ছি”
“আমিও”
“আপনি কোথায় পাচ্ছেন?”
“মনে”
“ছাড়ুন”
এবার কিছুটা জোরেই চেঁচিয়ে উঠে মাধবী। আরিয়ানের খোঁচা খোঁচা দাড়িতে ফর্সা ত্বক লাল হয়ে গেছে এক নিমিষেই। আরিয়ান বিরক্ত হয়ে মুখ তুলে বলে “কী সমস্যা?”
“আরে ভাই দরজা খোলা”
তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৩৬
“আজ বোঝাবো তোর কোন জনমের ভাই হই আমি। দজ্জাল মেয়ে”
বলে উঠে গিয়ে দরজা বন্ধ করে আসে। মাধবী উঠতে নিলে আরিয়ান আবারও তাকে চেপে ধরে। ঘোর লাগা কন্ঠে বলে “বিনা অনুমতিতে না। অনুমতি দিয়ে দে প্লিজ। আজ ভীষণ বেপরোয়া হতে ইচ্ছে করছে”
মাধবী কী বলবে বুঝতে পারলো না। লোকটা এমন ভাবে আবদার করে যে; না করার উপায় নেই। সে ঢোক গিলে সম্মতি দেয়। আরিয়ান হেসে ঠোঁটে একটা শক্ত চুমু খেয়ে বলে “এই না হলে আমার বউ। উম্মাহ”
