Home তুই আমার ৭ মিনিট তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৩৮

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৩৮

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৩৮
ঐশী আফরিন

শ্যাওলা পরা ছাদের কার্নিশ ঘেষে বসে আছে অভি। মাথাটা পেছনে হেলে দেওয়া। হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটায় একের পর এক টান বসাচ্ছে। তার অভিমুখে শাড়ির আচঁল মাথায় এঁটে বসে আছে রুহি। দৃষ্টি তার অভির কুচকুচে কালো চোখের মনিতে। অভির দৃষ্টিতেও নরচর নেই। সে রুহিকে এখানে বসিয়েছে এটা দেখতে যে, আদতেও মুসলিম মেয়েদের মাথায় ঘোমটা থাকলে কেমন দেখায়। তার কাছে বেশ আকর্ষণীয়ই লাগছে ব্যাপারটা। তার মনে হয় এমন বাঙালি মেয়েরাই সুন্দর। কী সুন্দর গাঢ় কাজল টানা চোখ দিয়েই তারা সামনের কাউকে ঘায়েল করতে পারে। সে বেশ কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকেই বললো “কেমন আছো?”
রুহি টলমলে দৃষ্টিতে তাকায়। সে কীভাবে বোঝাবে কেমন আছে! লোকটা কী বুঝতে পারছে না সে কেমন থাকতে পারে! সে তাচ্ছিল্য হেসে বললো “যেমন থাকার তেমনই”
অভি হাসলো “অভিমান জমেছে?”

রুহি ঠোঁট ভেঙে তাকিয়ে বললো “যার কাছে অভিমানের মূল্য নেই তার কাছে অভিমান করে আর কিই হবে!”
বাহ! মেয়েটা বেশ কঠিন কথা বলতে শিখেছে। কয়েকদিনের জানাশোনায় কখনো মেয়েটাকে এমন কথা বলতে শোনেনি। মেয়েটাকে মানাচ্ছে না এমন। সে হেসে দিলো। রুহির তা দেখে অভিমানের সাথে রাগও হলো। চেঁতে উঠে বললো “কথায় কথায় এমন হাসবেন না। মিথ্যা হাসি সবাইকে মানায় না”
অভি আবারও হাসে “আচ্ছা? তো তোমাকে মানায়?”
“আমি মিথ্যা হাসি না। কেন ডেকেছিলেন সেটা বলুন”
অভি কিছুক্ষনের নিরবতার পর বলে “আমাকে কতটুকু চাও?”
রুহি আকাশের অভিমুখে চেয়ে বলে “যতটুকু চাইলে কাউকে তীব্র ভাবে নিজের করে পেতে ইচ্ছে করে”
“যদি না পাও?”
“দেখুন ‘উপেক্ষা আর অপেক্ষা’। দুটো শব্দের মাঝে কিছু না থেকেও কিছু আছে। এখন আপনি কী এতদিন আমাকে উপেক্ষা করলেন নাকি অপেক্ষা করালেন?”
অভি ঠোঁট কামরে বলে “বেশ ভালো কথা শিখেছো তো”

“মজা করবেন না। ভালো লাগছে না”
“আচ্ছা বাদ দেও। যেটা জিজ্ঞেস করেছি সেটার উত্তর দেও”
“আগে আমি যেটা প্রশ্ন করেছি সেটার উত্তর দিন”
“আগে আমি প্রশ্ন করেছি”
“আমার প্রশ্নের উত্তর না দিলে আমি আপনার প্রশ্নের উত্তর দিবো কীভাবে?”
অভি কপাল কুঁচকে নিলো। মেয়েটা যে এত ঘারত্যাড়া এতদিন তো বোঝেনি। ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছেড়ে বললো “কোনটা শুনতে চাও উপেক্ষা না অপেক্ষা?”
“আপনি যেটা বলতে চান”
অভির মেজাজে চির ধরছে। এমনিতেই তার এই বদমেজাজের জন্য সে নিজেই বিরক্ত। এখন এই মেয়ের সাথে মেজাজ দেখালে মেজাজকেই পিশে ফেলতে ইচ্ছে করবে। সে মেজাজটা কোনমতে দমিয়ে বললো “কোনটাই না”
“তবে কোথায় ছিলেন এতদিন?”
“কাজ ছিলো”
রুহি তাচ্ছিল্য হাসলো “ভালো”

অভি রুহির সামনে আসন পেতে বসলো। তার রুক্ষ্ম হাত দুটি মসৃণ হাতের ভাজে নিয়ে শান্ত স্বরে বললো “রুহি? আমি রাস্তা পরিষ্কার করতে গিয়েছিলাম। এখানে আমাদের কেউ মেনে নেবে না। যদি সম্পর্কের পূর্ণতা আনতে চাও- তবে এই অধমের হাত ধরে পরিবার শূণ্য হতে হবে। তোমার উপর ভরসা করছে পূর্ণ অপূর্ণতা। আমি তোমাকে হাড়াতে চাই না। আর আমি পালিয়ে যাওয়ার মত কাপুরুষও নই। পরিবারের সবার সামনে থেকে তোমাকে তুলে আনতে পারবো। তবে সবাই এখন বিপদের মুখে আছে। ওদের এখন আমাদেরকে সমর্থন দেয়ার মত পরিস্থিতি নেই। তুমি তো জানোই ওরা একেকজন কেমন পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে। তাই ওদের ভরসায় না থেকে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেও। যাবে এই অধমের হাত ধরে পালিয়ে?”

রুহি তাকালো অভির বারিয়ে দেওয়া হাতের দিকে। চোখের পাতায় ভেসে উঠল চির পরিচিত মানুষগুলোর কান্নারত মুখগুলো। তার মনে হলো, যেই মেয়েরা পালিয়ে যায় ঐ মেয়েরা দুনিয়ার সব চেয়ে পাষান মানুষ। নয়তো ওরা ভালোবাসা নয়তো পরিবার, দুটোর একটা কীভাবে বেছে নেয়? সে শক্ত একটা ঢোক গেলে। অন্যদের কথা বাদ। তার মা বাবা, আপন ভাই এরাই তো তাকে তাকিয়ে দেখেনা। সে কার ভরসায় সামনের বিশ্বস্ত মানুষ টাকে উপেক্ষা করবে! এমন কেউ তো নেই যে সে চলে গেলে তার জন্য মরিয়া হবে। তবে আর মনকে মানিয়ে কী হবে? কেউ তো আর সাধে পালিয়ে যায় না। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে “আপনি কেমন তা আমি জানি না। এমন নয় যে আমাদের দীর্ঘ দিনের প্রেম ছিলো। ব্যাস ভাইদের বন্ধু হওয়ার সুবাদে আপনাকে ছোট থেকে দেখতে দেখতেই কখন যে মন দিয়ে ফেলেছি নিজেও জানি না। আপনিও বোধহয় একই। তবে এতটুকু নিশ্চিত যে কেউই জেনে বুঝে এই বিভিষিকায় বন্দি হইনি। এমনকি এখনও পর্যন্ত কেউ কাউকে ‘ভালোবাসি’ কিংবা ‘পছন্দ করি’ এমন কথাও বলিনি। অবশ্য এই সম্পর্কে ‘পছন্দ করি’ শব্দ টা বেমানান লাগতো। কেননা ধর্মের মত একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাঝে রেখে কঠোর মনের জোর ছাড়া আগানো সম্ভব না। যেহেতু আগাতে চাইলামই তাহলে আপনার মনের কথাও তো জানতে হবে। নয়তো ধর্ম নিয়ে তো আর ছিনিমিনি খেলতো পারবো না। আমি মুসলিম। আর আপনি হিন্দু। আপনি চাইলেই ধর্ম ত্যাগ করতে পারবেন। কিন্ত আমি সেটা চাওয়ার মত দুঃসাহসীই দেখাতে পারবো না। জমিনের বুকে সইবে না। তো মূল কথার উত্তর দিন। ভালোবাসেন আমায়?”

অভি ততক্ষণাত বাধ সাধে “অসম্ভব। ভালোবাসি টালোবাসি এসব আমার মুখ থেকে বের করতে পারবে না। শুধু জেনে রাখো আমি তোমাকে চাই। এক জীবন পারি দিতে তোমাকে আমার লাগবেই। আর আমিতো বললামই আমি মুসলিম ধর্ম গ্রহন করবো। তুমি শুধু ভরসা রাখো আর বাকিটা আমার উপর ছেড়ে দেও”
“ওসব তো সব ছেলেরাই বলে”
অভি ভ্রু কুঞ্চিত করে “তুমি কি সবার সাথে আমাকে তুলনা করছো?”
“কেন সবাই ছেলে আর আপনি কি হি*জ*রা?”
অভি নাখ মুখ কুচকে বলে “ছ্যিহ হবু বউ। এসব বাজে কথা। আমি একেবারে খাঁটি ব্যাটা মানুষ। বিয়ের পর চেক করে নিয়ো”
রুহি ঠোঁট চেপে বলে “এমন অসভ্য হলেন কবে থেকে?”

“যবে থেকে বুঝেছি অসভ্যতামি করার মেয়েটাও আমাকে অসভ্য বানাতে চায়”
রুহি আর কথা বারালো না। চিন্তা হচ্ছে ভীষন। বাড়ির কারো মন ভালো নেই। আরশিটা যে কোথায় গেল! বেশি পাকনা এই মেয়ে। অসহ্য। আরিয়ানদের গ্রামের অবস্থাও খারাপ। ইচ্ছেদের তো সবসময়ই একই অবস্থা। বাড়ির সবগুলো মানুষ কে এমন অশান্তিতে রেখে সে পালিয়ে যাবে? অভি বোধহয় বুঝলো রুহির মনের কথা। মাথায় হাত বুলিয়ে বললো “এখন যেতে হবে না। যখন বিয়ের জন্য চাপ দেবে তখন সুযোগ বুঝে যেকোন সময় চলে যাবো। শুধু বলো যে আমার সাথে যাবে”
রুহি বিষাদ বদনে হাসার চেষ্টা করে। অভির হাতটা এখনও বারানো। সে কাঁপা কাঁপা হাতটা সেই হাতে রেখে বলে

“যাবোহ। আপনি যখন বলবেন তখনই যাবো। কিন্ত…”
“কী?”
“আপনি এমন লাপাত্তা হয়ে যান কেন?”
অভি হেসে উত্তর দেয় “আর হবো না। বললাম তো তখন কাজ ছিলো। এখন শেষ। আর এরমধ্যে আমি যখনই খবর পাঠাবো দেখা করতে আসবে আমার সাথে। ঠিক আছে?”
রুহি হেসে ফেলে। হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলে “আসবো। এখন চলে যেতে হবে। আসি?”
অভি ঢোক গিলে বলে “হুম”
রুহি উঠে পা বারিয়েও আবার দাঁড়িয়ে যায় “আপনি যাবেন না?”
অভি ঠোঁট কামরে হেসে বলে “একসাথে নামতে চাও?”
রুহি মুখ বাকায় “কিছুক্ষন পর চলে আসবেন কিন্ত ”

ছোট্ট ইশান বাড়ির বৈঠক খানায় আপাতত অরিন্দর তর্জন গর্জন ছাড়া কিচ্ছু শোনা যাচ্ছে না। রাশেদা এবং নমিতা ইশান গরম পানির ছ্যাক লাগাচ্ছে আর আরিন্দ আতঁকে উঠছে। তবে মনে মনে আরিয়ানকে বকতে ভুলে না। কত হাড়ে বজ্জাত ছেলে হলে কাউকে পরে যেতে দেখলে এই শোকের সময়েও হেসে দেয়! এখন আবার বউ নিয়ে বদ্ধ ঘরে ঢোকা হচ্ছে! দাঁড়া ব্যাটা! কথাগুলো মনে মনে আওড়িয়ে অরিন্দ দাঁড়াতে উদ্যত হয়। হাতের কবজিতে ব্যাথা পাওয়ায় নাড়াতে খানিক কষ্ট হচ্ছে। এছাড়া মাথার চোট কিছুক্ষন ঝিমঝিম করার পর চলে গেছে। তাকে দাঁড়াতে দেখে রাশেদা বকে উঠে “মাত্র ব্যাথাটা পেল আর এখনই ধৈ ধৈ শুরু হয়ে যাচ্ছে। বলি তোমাদের বাচ্চামো স্বভাব কবে যাবে হ্যা?”

অরিন্দ ফোকলা হেসে ঘার চুলকায়। তখনই অভি দরজায় ঢুকতে ঢুকতে বলে “এ আর অপূর্ব আজীবনই বাচ্চা থাকবে”
অভির কথায় অরিন্দ সঙ্গে সঙ্গেই মুখ ভেংচায় “এহহ। তোমাদের জননেতা আরিয়ান এখন কোঁচি খুকিকেও ছাড়িয়ে গেছে”
অতঃপর মুখটা মলিন করে অভিযোগ দেওয়ার মত করে বলে “জানিস ভাই। দুঃখের কথা কী আর বলবো। এই আরিয়ানের বদমাইশি আর যাবে না। তার সামনে একটা মানুষ চ্যাংদোলা হয়ে পরে গিয়ে ব্যাথায় কাতরাচ্ছে অথচ তোদের গুনধর শাঙ্কির পোলা হো হো করে হেসেছে। হেসেছিস ভালো কথা। অন্তত তুলতে তো আসবি! তা-না বউ নিয়ে দরজা দিয়েছে। অসভ্য অভদ্র লম্পট”
অভি আয়াজের পাশে বসতে বসতে হেসে বলে “যদি তোর দেওয়া এই আখ্যাগুলো শুনতে পারে তাহলে এগুলো যাদের দেওয়া হয় তাদের বিবরণ বুঝিয়ে দেবে”
অরিন্দের মুখটা শুকিয়ে যায়। এদের সাথে খুব বেশি বয়সের তফাত না থাকায় কখনো তুই আবার কখনো তুমি বলে ডাকে। আর একদিন মাধবীর মুখ থেকে আরিয়ানকে শাঙ্কির পোলা ডাকতে শুনেছিল। সেই থেকে খোঁচাখুঁচিতে বিন্দু পরিমাণ পিছ পা হয়নি।

অভিকে নিজের পাশে বসতে দেখে আয়াজ ততখানৎ উঠে প্রস্থান করতে গেলে অভি তার শার্টের কোণ টেনে ধরে। আয়াজ রক্তিম চোখে ফিরে তাকিয়ে তিরীক্ষ কন্ঠে বলে “শার্ট ছাঁড়”
অভি ছাড়ে না। উঠে আয়াজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চুপ করে থাকে। আয়াজ ফিরে তাকায় না। সে জানে অভি কীভাবে তাকিয়ে আছে। আর সেই চাহনির দিকে তাকালে তার হাসি পাবে নিশ্চিত। কিন্ত এত সহজে হেসে দেবে! হ্যা তার প্রিয় মানুষগুলোর মধ্যে অভি অন্যতম। কিন্ত সেটা বন্ধু হিসেবে বোন জামাই হিসেবে না। আর যাই হোক মাঝে ধর্মের মত একটা ব্যবধান। আর আদরের বোনের করা সেদিনের ব্যবহার সে কীভাবে ভূলে যাবে! সেদিন তো অভি চাইলে বন্ধুকে অসম্মান হওয়া থেকে ফেরাতে পারতো। রুহিকে শাসন করতে পারতো। কিন্ত করেনি। আরিয়ানও করেনি। বরং আরো সমর্থন দিয়েছে। এ নিয়ে কি তার একটু রাগ করা সাজে না! সাজে। সে কথা বলবে না। প্রয়োজন নেই এমন স্বার্থপর বন্ধুর। অভি তাকিয়ে রইল আয়াজের মুখপানে। হয়তো বোঝার চেষ্টা করছে ভেতরকার তোলপাড়। এর পর আশেপাশের সবার দিকে দৃষ্টি দেয়। বেশ বুঝতে পারছে এখানের কিছু মানুষ তার জন্য বিরক্ত। হওয়ারই কথা। তার জন্য গোটা পরিবারটা ছিন্ন হয়েছে। রুহি নিজের দরজার সামনে থেকে দেখতে পারছে রাশেদার জ্বলন্ত চেহারাটা। এই তিনি কিছু বললেন বলে। অতঃপর রুহির ভাবনাকে সত্য করে দিয়ে তিনি খেঁকিয়ে উঠেন “হয়েছে হয়েছে। আর আমার ছেলেমেয়ে গুলোর মাথা খেতে হবে না। মেয়েটাকে মনে হয় কালো যাদু করেছে। হিন্দু বলে কথা”

রাশেদার এমন কটাক্ষ বাক্যেও অভি প্রতিক্রিয়া দেখালো না। কেবল তাকিয়ে রইল আয়াজের উদ্বেগহীন মুখপানে। অরিন্দ উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করলো। আয়াজের শার্টের আরেক কোণ ধরে বললো “আরেহ আয়াজ ভাই। এত উত্তেজিত হয়ে লাভ নেই। আচ্ছা অভি দাঁকে বোন জামাই হিসেবে মেনে নিতে হবে না। ঐদিক থেকে তোমাদের ঝগড়া। কিন্ত বন্ধুত্বের দিক দিয়ে কিছুই হয়নি। তো তোমরা আমাদের সামনে এমনভাবে থাকতে পারবে না। দ্রুত মিলে যাও দুজোন”

আয়াজ আর পারছে না নিজেকে দমাতে। অনেকদিন পর মনে হচ্ছে তাদের বন্ধুমহল হাসছে, আগের মত সকলে মজার ছলে কথা বলছে, মজা করছে! অনেকদিন পর নিজেকেও স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। নয়তো এতদিন এক ইচ্ছে নামক মেয়েটার জন্য তার এত সুন্দর জীবনে জ্যাম লেগে ছিলো। এখন কিছুটা হালকা লাগছে। এরা তার রক্ত না হলেও রক্তের চেয়ে কম না। আরিয়ান যেমন তেমন- সে বিদেশ ছিলো। কিন্ত বাকিদের সাথে তার প্রাণের বন্ধন। আর আরিয়ানের সাথে যে ভালো সম্পর্ক নেই তেমন না। ও তো এমনিতেই রক্ত। আয়াজ বড় করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অরিন্দের দিকে তাকিয়ে বলে “ছাড় এখন। রাতে আস্তানায় আড্ডা দেবো। সবাইকে উপস্থিত থাকতে বলবি”
অরিন্দ কেবলার মত হেসে বলে “কত্ত ভালো মানুষ”
অভি হেসে শার্টের কোণ ছেড়ে দিয়ে আয়াজের সাথে বুক মেলায়। এমন অপ্রত্যাশিত কোলাকুলিতে আয়াজ কিছুটা ভ্যাবাচেকা খায়। পরক্ষণে নিজেও অভির পিঠে হাত চাপরায়। হেসে ফেলে দুজনে। অরিন্দ আর রুহিও হাসলো। এছাড়াও উপরের লম্বা বারান্দায় দাঁড়ানো আরিয়ান আর মাধবীর সাথে বৈঠকখানায় উপস্থিত সকলে না চাইতেও হেসে দিলো। হেসে ফেললো ইচ্ছেও। এই সুন্দর সময়টা যোগ হলো স্মৃতির পাতায়। যার নিরব সাক্ষী হয়ে থাকলো উঁড়ু জানালার ফাঁকে বসে থাকা বুলবুল!

মাধবী ঘরে বসে আরিয়ানের শুকনো পাঞ্জাবি গুলো ভাজ করছে। এই মাত্র ছাঁদ থেকে শুকিয়ে এনেছে। সেগুলো একে একে ভাজ করে আলনায় সাজাচ্ছে। এমন সময় মাহমুদা ইশান ঘরে প্রবেশ করে। মাধবী উনাকে দেখেও হাতের কাজ চালিয়ে যায়। ভদ্রমহিলা গোছানো বিছানায় বসে ঘরের চারপাশে চোখ বুলিয়ে বলে “পুরো ঘর তুই গুছিয়েছিস?”
মাধবী হাতের কাজ চলমান রেখেই উত্তর দেয় “হুম”
“বাহ বেশ সুন্দর হয়েছে। বাপের ঘরে পানিটা ঢেলে খেতে হতো না। আর এখন স্বামীর ঘর গুছিয়ে রাখতে হচ্ছে। মাহফুজ চৌধুরীর আদরের কন্যাকে দিয়ে এসব কাজ করালে উনি রাগ করবেন রে মা। রাখ এসব। কাজের বুয়া এসে করে দিয়ে যাবে”

মাধবী মুখ ভেংচালো “তোমার গুনধর পুত্র ঘরে অন্য কোন মেয়ে ঢুকতে কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ করেছে। তার নাকি গা চুলকায়। আর এ-ও বলেছে উনার জামা কাপড় যদি আমি বিনা অন্য কেউ গোছায়; তাহলে নাকি সব কাপড় পুরিয়ে ফেলবে। নিজের কাপড় পুরিয়ে ফেলুক চাই ফেলে দিয়ে আসুক; তাতে আমার কোন মাথাব্যাথা নেই। কিন্ত আমার নির্দোষ শাড়িগুলোর দিকে তোমার ছেলের বদনজর কেন? একটা শাড়ি কখনো কিনে তো দেবে না। কিপ্টা ব্যাটাছেলে কোথাকার। সময় থাকতে ভালো হতে বলো”

মাধবী গম্ভীর কন্ঠে কথাগুলো বললেও মাহমুদা ইশান হেসে দেন। মাধবীর হাত থেকে কাপড়গুলো নিয়ে পাশে রেখে বলে “ছেলেটা তোকে চোখে হাড়ায় রে মা। ও বিদেশ থাকাকালীন আমাকে পর্যন্ত এই ঘরে ঢুকতে দিতো না। সর্ব প্রথম উদ্ভাবনই করেছিস তুই। ছেলেটা চায় না ওর কিছু তুই বিনা অন্য নারী স্পর্শ করুক। এই নষ্ট দিনে এক খাঁটি হিরে পেয়েছিস তুই। নিজের ছেলে বলে বলছি না। আমি তোর শাশুরি হওয়ার আগে মামি। কারণ বউ শাশুরির সম্পর্ক ভালো হয়না। তোর মা সম মামী হয়ে বলছি, আমি এ যাবত কক্ষনো দেখিনি ও কোন মেয়ের দিকে ভালোভাবে চোখ তুলে তাকিয়েছে। কুনজর তো দূর। তুই নিজেই তো দেখছিস যে কাপড়টা পর্যন্ত কাউকে ধরতে দিচ্ছে না। এমন চরিত্রবান স্বামী ক’জনের কপালে জোটে বলতো। ছেলেটা তোকে ভালোবেসে পাগল প্রায়। পাগলটাকে কষ্ট দিস না কখনো। আর যাই হোক তোর থেকে কোন প্রকার কষ্ট পেলে ও টিকতে পারবে না। এমন ভালোবাসা পায়ে ঠেলে দিস না কক্ষনো”

মাধবী সবগুলো কথা মনোযোগ সহকারে শোনে। মহিলার বলা সবগুলো কথা সত্য এবং সে এটাও জানে এখন মহিলা ঠিক কী বলতে পারেন। সে অপেক্ষা করলো মাহমুদা ইশান পরবর্তিতে কী বলে শুনতে। ভদ্রমহিলা মাধবীর মুখটা দুহাতের আজলায় নিয়ে মাধবীর ভাবনাকে সত্য প্রমাণিত করে বলে “মা আমর। ছেলেটা তোকে এত ভালোবাসে অথচ ওকে একবার আব্বা ডাক শোনাবি না? বয়স তো কম হলো না পাগলটার। ত্রিশের কাছাকাছি। এখনও যদি বাবা ডাক না শুনতে পারে তাহলে লোকে মন্দ বলবে। আর ওর কী বাবা ডাক শুনতে ইচ্ছে করে না? বিয়ের তো কমদিন হলো না। লোকে কানঘুষা করছে। মন্দ বলছে। তবে ওর গায়ে কিন্ত লাগছে না; লাগছে তোর গায়ে। ওকে কেউ দোষ দেবে না। এই সমাজে সব দোষ নারীর। তাই আর বসে থাকিস না। আয় একটা কবিরাজের কাছে যাই। কিছু ঔষধ দিলে তাড়াতাড়ি সুসংবাদ আসবে”
মাধবী এবারও সব কথা শুনলো। এত টুকু তো সে জানে এই মহিলার মনে তার জন্য নরম এক স্থান আছে। বেশ স্নেহ করে তাকে। কিন্ত এই সমাজের কানাঘুষার ব্যাপারটা তার পছন্দ হলো না। সে মাহমুদা ইশানের দুহাত নিজের হাতে নিয়ে বলে “উনি আমাকে বলেছে। আমি এমনিতেও তোমার সাথে যেতাম। কিন্ত আমাকে কখনো এসব সমাজের দোহাই দিয়ো না। আমি তৈরি হয়ে নিচ্ছি”

মাহমুদা ইশান ওর কপালে চুমু এঁকে বলে “আচ্ছা আর বলবো না। যাহ তৈরি হয়ে নে। যাচ্ছি যখন আরশির খোঁজটাও একবার নিয়ে আসবো। নমিতাটা কাঁদতে কাঁদতে আধমরা হয়ে যাচ্ছে। ছেলেগুলো নাওআ খাওয়া ফেলে সারাদিন দৌঁড়েছে। কিছুক্ষনের মধ্যেই বাড়ি ফেরবে। দেখি কোন খোঁজ পায় কিনা”
বলে তিনি চলে যান। মাধবী কিছুক্ষন একঘেয়ে দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে থেকে মাথাটা একবার ডানে বামে ঘোরায়। বেগুনি চোখজোরা হঠাত রক্তবর্ণ হচ্ছে। সে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ঘার কাঁত করে আরিয়ানের একাধিক শুভ্র পাঞ্জাবিগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। ঠোঁটে ফিচেল হাসি। খোলা চুলে এই বিভিষিকাময় রূপে এক অদ্ভুত সুন্দর দেখায় তাকে। দাঁতে দাঁত চেপে ভেঙে ফেলার জোগাড়। এতটাই জোরে চোয়াল পিশে রেখেছে যে মটমট শব্দ শোনা যাচ্ছে। এমনকি ঘার বাকাঁনোর শব্দও। স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় বেশ খানিকটা বেঁকে আছে ঘার। আকস্মিক মাথায় তীব্র ক্ষোভ চেপে বসে তার। বিছানার উপর ঝাপ দিয়ে উঠে বসে শুভ্র পাঞ্জাবিগুলোর বোতাম টেনে ছিড়তে থাকে। একে একে সব পাঞ্জাবি মেঝেতে ছড়িয়ে পরে। তখনই ভেসে আসে বাহির থেকে আরিয়ানের গমগমে কণ্ঠস্বর “কই রে আক্কাস আলীর মা। আমার একটা পাঞ্জাবি নিয়ে পেছনের ঘাটে আয় তো। গোসল দিতে হবে”

আরিয়ান এইমাত্র আরশিকে খুঁজে বাড়ি ফিরলো। মেয়েটা একেবারেই লাপাত্তা। কোথাও কোন চিহ্ন পর্যন্ত নেই। যাকে বলে একদম যাদুর মত উধাও হয়ে যাওয়া। এরপরও খোঁজ থামায়নি। আয়াজসহ বাকিরাও ফিরে এসে যে যার ঘরে ফিরে গেছে। শরীর তার ঘামে চপচপ করছে। শুভ্র পাঞ্জাবি গায়ের সাথে লেগে পেশিসহ পেটানো বুক দৃশ্যমান। সে সেটা টান দিয়ে খুলতে খুলতে ঘরে ঢোকে। দেখতে পায় মাধবী তার সমস্ত পাঞ্জাবিগুলোকে উলোট পালট করে ভাজ করে সুন্দর করে আলনায় রাখছে। মেয়েটাকে আজ যেন আরও অপ্সরা লাগছে। সে ভেজা পাঞ্জাবি চেয়ারে রেখে বিছানায় বসতে গেলে মাধবী মৃদু ধমকে উঠে “কতদিন বলেছি ঘামে ভেজা পাঞ্জাবি কলপারে ভিজিয়ে আসবেন। আমি পরে ধুয়ে দেব। যান। এখনই এটা রেখে আসুন”
আরিয়ান তার কথায় পাত্তা না দিয়ে ভেজা শরীর বিছানায় এলিয়ে দিয়ে বলে “মাঝে মধ্যে বউয়ের কথা না শোনাও সুন্নত”

“আপনার কাছে দুনিয়ার সব সুন্নত। শুয়ে পরলেন যে! গোসল করবেন না?”
“নাহ। এখণ ইচ্ছে করছে না”
আরিয়ান পাশে তাকিয়ে একটা পাঞ্জাবির কলারের পাশে কিছুটা ছিড়া দেখতে পেয়ে হাতে নেয়। অতঃপর সবগুলো উল্টে পাল্টে দেখে অবাক হয়ে বলে “কীরে পাঞ্জাবিগুলোর বোতাম ছিড়ে যাচ্ছে কেন?”
মাধবী স্বাভাবিক স্বরেই উত্তর দেয় “কাপড় শুকানোর দঁড়িটা বদলে দেবেন। ওটাতে লেগেই ছিড়ে গেছে”
আরিয়ান অবাক হয়ে বলে “তাই বলে সাতান্নটা পাঞ্জাবির সাতান্নটারই বোতাম ছিড়ে গেল! অদ্ভুত”
তারপর সেগুলোকে রেখে দিয়ে বলে “থাক এগুলো রেখে দে। ফেলিস না। কাজ আছে আমার”
মাধবী বিরবির করে “কিপ্টা”।
অতঃপর সবগুলো রেখে দিয়ে বলে “আমি মামির সাথে ডাক্তারের কাছে যাচ্ছি। ফিরে এসে বোতাম গুলো সেলাই করে দিবো”

মাধবীর কথা শেষ হতেই আরিয়ান ওকে হাতের ইশারায় কাছে ডাকে। মাধবী আর দোনামনা না করে এগিয়ে যায়। আরিয়ান মাধবীর দুটো হাত শক্ত করে ধরে চুমু খায়। তারপর কিছুক্ষন সেখানে শক্ত করে ঠোঁট দাবিয়ে রেখে বলে “মধু? আল্লাহ না করুক যদি কোন দুঃসংবাদ হয় তবে আল্লাহর ওয়াস্তে ফিরে এসে আমাকে এমন কোন কথা বলবি না যেটা শুনলে আমি কষ্ট পাবো। সব মেয়েদের মত বলিস না, আপনি আরেকটা বিয়ে করুন। আমি দুঃসংবাদ শুনতে রাজি আছি তবে এসব না। আর এমন নয় যে সমস্যা তোর একার হতে পারে। আমারও হতে পারে। তবে আমি কিন্ত তোকে ছেড়ে দিতে পারবো না। চলে যেতে চাইলে বেঁধে রেখে দেবো। কেমন? ইনশাআল্লাহ আল্লাহ ভালো কিছুই করবেন”

মাধবী হেসে নিজেও আরিয়ানের তামাটে হাতদুটোতে চুমু খেয়ে বলে “আল্লাহ ভালোই করবে”
আরিয়ান মাধবীর কপালে আর মাথায় চুমু এঁকে ছেড়ে দেয়। মাধবী বোরকা পরে একেবারে তৈরি হয়ে আরিয়ানের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে যায়। মাধবী যেতেই আরিয়ান নিজের ঘামে ভেজা পাঞ্জাবিটা ধুয়ে গোসল করে আসে। চোখ বুজে গভীর শ্বাস টেনে জায়নামাজটা পেতে নামাজের প্রস্ততী নেয়। জীবনে সে যতবার ওয়াক্ত ছাড়া নামাজ পরেছে সবগুলোরই প্রকাশিত অপ্রকাশিত কারণ মাধবী। কোনদিন মেয়েটাকে পাওয়ার তীব্র বাসনায়, কখনো মেয়েটার সুস্থতা চেয়ে আবার কখনো বা শত্রুর কাছ থেকে রক্ষা করার চেষ্টায়। আজ আবারও মাধবীকে কেন্দ্র করে নামাজে দাঁড়াল। বারো রাকাত নফল নামাজের পরে অসীম দয়াময় খোদার দরবারে পাপীষ্ঠ দুটি হাত তুলে ধরলো—
” হে পরম করুনাময় আল্লাহ। তুমিই উত্তম পরিকল্পনাকারী। আমার হৃদয়ের রাণীর জন্য তোমার কাছে আজ ভিক্ষা চাইলাম একটা সন্তান। তুমি মধুকে ফিরিয়ে দিয়ো না খোদা। ওর মলিন মুখটা যেন আমায় না দেখতে হয়। এমন কিছু যেন না হয় যেটার কারণে আমাদের বিচ্ছেদ হতে পারে। খোদা তোমার এই পাপী বান্দা হাজারটা চাবুকের আঘাত সহ্য করতে পারবে কিন্ত মধুমতীর সাথে পাঞ্জাবিওয়ালার বিচ্ছেদ সইতে পারবে না। তুমি মেহেরবান হয়ো গো খোদা আমার মধুর উপর”

আগুনের কুন্ডুলের চারপাশে গোল হয়ে বসে আছে গোটা বন্ধুমহলটা। সকলে একে একে ছোট্ট জঙ্গলটায় উপস্থিত হয়ে আগুন ধরিয়েছে। শীতল পাটিও বিছানো আছে। তার উপর টুকটাক খাবারের আয়োজন আছে। তার সাথে আছে “Domaine de la Romanée-Conti”। যা ১৯৭৯ সালে উৎপাদিত ওয়াইনের মধ্যে পৃথিবীর সবচেয়ে দামী এবং আকর্ষণীয় ছিলো যার মূল্য বাংলাদেশের ৩০০০ টাকা। এই যুগে তিন হাজার টাকা দিয়ে যে বাংলাদেশের কেউ এই মদ কিনে গলাধকল করবে সেটা একপ্রকার স্বপ্ন। শত লোকের স্বপ্নকে পাছে ফেলে আরিয়ান বিদেশ থেকে সেই ওয়াইনের বোতল এনেছিল তিন বছর আগে। আজ সকলে একসাথে হওয়ায় সাথে মাধবীও না থাকায় আলমারি থেকে বের করে নিয়ে এসেছে। যদিও মদ টদে তাঁদের মধ্যে কেউই তেমন আগ্রহ দেখায় না। কিন্ত যেই বছর যেই ওয়াইনের দাম আকাশচুম্বি এবং বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু থাকে সেই বছর সেই ওয়াই তারা কিনে আনে শুধু স্বাদ চেক করার জন্য। দাম তার যতই থাক। এই যে এখন সামনের এই ওয়াইনের বোতল তিনটের বিনিময়ে সে ১৩-১৫ ভরি গহনা কিনে তার বউকে সাজিয়ে তুলতে পারতো। কিন্ত বউ তার এমনিতেই সুন্দর। এসব সোনা গয়নার প্রয়োজন নেই। ভেবেই আরিয়ান দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। বউ তার এমন সুন্দরী না হলেও পারতো। কাছে ঘেসতেও ভয় করে। যদি ঐ রূপের আগুনে ঝলসে যায়! ঐ মসৃণ নরম ত্বকে নিজের ভালোবাসার চিহ্ন এঁকে দিতে তো আরো ভয় করে। ফর্সা ত্বকে জ্বলজ্বল করবে যে! কী এক জ্বালা! তার ভাবনায় ছেঁদ পরে আয়াজের আফসোস ভরা কন্ঠে “ভাই তোরা আমাকে একটা বুদ্ধি দে। বউকে ঠিক করবো কীভাবে? শান্তিতে ঘুমাতে পারছি না একটা রাত। অসহ্য লাগছে সব কিছু”

আরিয়ান বিরক্ত চোখে তাকায়। এরা কখনোই বউ ঠিক করতে পারবে না। আজ ইচ্ছে আসেনি। আসেনি বললে ভূল হবে সে তো আসতে সবসময়ই এক পায়ে খাড়া। কিন্ত আয়াজ দেয়নি। বেশি বারাবারি করলে বলেছে “তখন আড্ডায় সামিল হতে কেননা তোমার দায়িত্বে কেউ ছিলো না। এখন আছে। এত রাতে ওতগুলো ছেলেদের মধ্যে তোমাকে আমি কখনোই নিয়ে যাবো না”
আর একটা কথা বলার সুযোগও দেয়নি ইচ্ছেকে। এই ওয়াইন দেখে ইচ্ছে বেশ খুশি হতো। অরিন্দ বললো “তোমার আর এই জীবনে বউ বশে আনা হলো না”
আরিয়ান বিরক্ত হয়ে বলে “ও বশে আনবে কীভাবে। বউকে তো বাচ্চার মা-ই বানাতে পারছে না। এই পর্যন্ত বাসরটা করেছে কিনা সন্দেহ”
অপূর্ব বলে “আমারও মনে হয়না যে ও বাসর করতে পেরেছে। যেই তেজি বউ। খাট থেকে লাথি দিয়ে ফেলে ভবিষ্যত অন্ধকার করে ফেলবে”
আরিয়ান বলে “তোরা একটাও কোনদিক বিয়ে করতে পারবি না”
অভি ভ্রু কচকায় “কেন?”

“কারন তোরা কখনোই বউকে বাচ্চার মা বানাতে পারবি না। সবকটা খাঁটি সতিত্ব নিয়ে বসে আছিস। হুট হাট একদিন কউকে ফুট করে তুলে নিয়ে টুশ করে খাটে চেপে ধরবে। আর ফট করে বাচ্চার বাপ হয়ে যাবে তা-না। শুধু বড় বড় কথা। নিজের সতিত্ব সপে না দিতে পারলে বাপ হওয়ার স্বপ্ন স্বপ্ন নিয়েই থাকো। রামছাগলের দল”
অপূর্ব বিরক্ত হয়ে বলে “তোর লজ্জা না থাকলেও আমাদের আছে”
আরিয়ান কিছুটা ঢং করে বলে “আহারে আমার লজ্জাশীল মুরুব্বিটা! তোদের লজ্জা নিয়ে তোরা বসে থাক। নিজের আপন বউকে গুপ্ত ধন দেখানো সুন্নত”
অপূর্ব বিষ্ফরিত নয়নে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে “কী দেখানো সুন্নত?”
“গুপ্ত ধন”
অভি সরল মনে জিজ্ঞেস করে “মানে?”
আরিয়ান বিরক্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলে “গুপ্ত যোগ ধন”
অপূর্ব ঠোঁট কামরে কিছুক্ষন পর বলে “শালা কি বোঝাতে চাইছিস?”

আরিয়ান এবার বলেই ফেলে “সম্মুন্ধি তোমার গুপ্ত পেন্টের তল দেশে যে ধন থাকেই গুপ্ত ধন বলে”
সকলে এক দফা ভ্যাবাচেকা খায়। কি সুন্দর বর্ণনা! এক কথায় গুপ্তধনের সঙগা যাকে বলে। এ ছেলে এমন কবে হলো! কথার লাগাম নেই বললেই চলে। ওদের চেনাজানা আরিয়ান তো এমন ছিলো না। সেই আরিয়ান ছিলো খুব স্বল্পভাসী আর আত্মসম্মাণবোধটা ছিলো বড্ড তীক্ষ্ণ। এই আরিয়ান তো সেই আরিয়ান নয়! কবে ফিরে পাবে তারা ঐ আরিয়ানকে! সকলে একদফা শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। অপূর্ব পাটিতে মাথা হেলিয়ে তাচ্ছিল্য হাসে। অতঃপর বলে “ওর বউ ওকে একদম অন্য রকম বানিয়ে ফেলেছে”
আরিয়ান আকাশে তাকিয়ে মন মরা হয়ে বলে “মধু কিছুই করেনি। ও তো আগের আমাকেই চায়। কিন্ত হঠাৎ কেন জানি ওর সংস্পর্শে সেই নরপিষাচ আমিটা রসিকতায় বদলে এসেছি। আমি সত্যিই জানি না কীভাবে কি হয়েছে”
আয়াজ বলে “আমাদের মাধবী কোন সাধারণ নারী নয়। ওর মধ্যে বিশেষ কিছু একটা আছে। যেটা ওকে সবার থেকে আলাদা করে তোলে”

অভিও তাল মেলায় “আমারও তেমনই মনে হয়। ভাবি কেমন যেন। অন্যরকম”
অরিন্দ এ ব্যাপারে নিশ্চুপ। সে তার ভাই অপূর্বের মনের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করেছে। সময়ের করতালে সবাই ভূলে গেলেও সে ভূলে যায়নি তার ভাইয়ের জীবনের প্রথম ভালোবাসা সেই নারীই। কেউ না জানলেও সে জানে তার ভাইয়ের প্রতিটা নিদ্রাহিন রাত্রির কথা। একবার ঐ নারীর সংস্পর্শে যাওয়ার তীব্র আশংকায় ছটফট করে প্রতিনিয়ত ধুকে মরে তার ভাই।
আরিয়ান বলে “ওর সত্বাই ওকে অন্য রকম করে তুলেছে। ওর ভিতরে দুটো সত্তা আছে। একটা প্রতিশোধে খাঁ খাঁ হয়ে গেছে অন্যটি ওর ভাই আর বাপের সহানুভূতি পেতে মরিয়া। ওর ব্যাপারে জানলে ওর ব্যাপারে তোদের ধারনা হতো”

অরিন্দ এই বার আগ্রহসহীত বলে “তাহলে আজ ভাবির ব্যাপারেই কিছু বলো। একই সমাজের বুকে বাস করা এক ভীন্ন সত্তা সম্পর্কে জানি”
আরিয়ান ওয়াইনের বোতলে স্রেফ একটা চুমুক দিয়ে বলে “শুনবি?”
সবাই আগ্রহসহীত তাকিয়ে বলে “হুমমম”
কিন্ত আয়াজ বাঁধ সাধে “ভাই এখানে আমার বউকে বশে আনার কথা হচ্ছিল”
অভি নাখ মুখ কুচকে বলে “ও তোর বউকে তুই কালা যাদু করে নে। এর চেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত ঐ ত্যাড়া মেয়ের ব্যাপারে দিতে পারবো না”

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৩৭

অরিন্দ তাঁড়া দেয় “আয়াজ ভাই তোমারটা পরে শুনছি। আরিয়ান ভাই শুরু করো তো”
আরিয়ান একবার ভালো করে আশপাশ অবলোকন করে নেয়। চারপাশে নিস্তব্ধ অন্ধকারে আগুনের রশ্মি বেশ দূর পর্যন্ত আলোকিত করছে। সে কয়েকটা কাঠ দিয়ে আগুনটা ভালোভাবে চরিয়ে একটা চুরুট ধরায়। কেউ বুঝতে পারছে না আরিয়ানের এমন প্রস্তুতী নিয়ে কথা শুরু করার কারণ। আরিয়ান চুরুটের ধোঁয়া বাতাসে ছেড়ে দিয়ে বলতে শুরু করে—

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৩৯