ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ২০
নওরিন কবির তিশা
-‘সে কি আর্য তুই এখনো তৃষাকে আপনি করে কেন বলিস?
ডাইনিং টেবিলের সমস্ত কোলাহল যেন এক মুহূর্তে স্তিমিত হয়ে এলো। মায়ের এহেন প্রশ্নের কিছুটা বিভ্রান্তের ন্যায় তাকালো আর্য। উত্তর খোঁজার ব্যর্থ প্রচেষ্টায় শেষমেষ মস্তিষ্ক শুন্য হিসাবে অনুমান হলো। তবে জাহানারা বেগম থামলেন না ফের প্রশ্নের তোড়ে বিদ্ধ করলেন ছেলেকে,,
-‘কি হল কথা বলছিস না কেন? প্রথমত তৃষা তোর বিয়ে করা বউ সেটা তুই নিজেই স্বীকার করছিস, দ্বিতীয়ত ওতো বয়সে তোর থেকে বড় নয় আপনি বলিস কেন?
তৃষাও কিছুটা বোকা দৃষ্টি মেলে চেয়ে আছে জাহানারা বেগমের দিকে। আড়চোখে একবার আর্যর দিকে তাকালো সে। সত্যি বলতে আর্যর এমন আপনি সম্বোধন টা বড্ড অদ্ভুত লাগে তার কাছে। তবুও লজ্জার খাতিরে কখনো কিছু বলতে পারিনি সে। তবে এখন জাহানারা বেগমের প্রত্যুত্তরে আর্য কি বলবে? আর্য নিজেও নিশ্চুপ দৃষ্টিতে মস্তক অবনত করে সামনে থাকা থালার দিকে চেয়ে আছে।
জাহানারা বেগম ছেলেকে বোঝানোর ছলে ফের বললেন,,
-‘শোন বাবা আমরা জানি এখন পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাব আমাদের সংস্কৃতিতে বড্ড বেশি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তুই তোর বিয়ে করা বউকে আপনি বলে সম্বোধন করবে। অন্তত আমার ভীষণ শ্রুতি কটু লেগেছে বিষয়টা। আশা করি বোঝাতে পেরেছি।
আফজাল সাহেব এতক্ষণ নিজের রসনা তৃপ্তিতে নিমগ্ন ছিলেন, কিন্তু গিন্নির এমন মোক্ষম প্রশ্ন আর ছেলের অসহায় মুখচ্ছবি দেখে তিনি আর না হেসে পারলেন না। তিনি এক গ্লাস পানি খেয়ে নিজের গলায় দানা বেঁধে আসা হাসির রেশটুকু সামলে নিয়ে বললেন,
-‘আরে জাহানারা! তুমি কি এজলাসের অভ্যাসটা এই ডাইনিং টেবিলে না আনলে শান্তি পাও না? দেখছো না ছেলেটা খাবার গলায় আটকে ফেলার জোগাড় করেছে! তুমি তো দেখছি এখানেও জেরা আর উকিলাতি শুরু করে দিলে।
জাহানারা বেগম ভ্রু কুঁচকে আফজাল সাহেবের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় স্বরে বললেন,
-‘উকিলাতি নয়, আমি স্রেফ ন্যায়ের কথা বলছি। এই বাড়িতে সম্পর্কের একটা মাধুর্য আছে। স্বামী-স্ত্রীর মাঝে আপনি-আজ্ঞে থাকলে সেটা কেমন জানি যান্ত্রিক লাগে। তৃষা তো আর ওর অফিসের জুনিয়র অফিসার নয়!
আফজাল সাহেব হো হো করে হেসে উঠে আর্যর পিঠ চাপড়ে বললেন,
-‘শোন বাবা আর্য, তোর মা তো ল’ কলেজের গোল্ড মেডেলিস্ট। ওর লজিকের সামনে তো বড় বড় ব্যারিস্টাররা কুপোকাত। তবে ও ঠিকই বলেছে। তুই বরং নিজেকে একটু ডিকোড কর। সারাক্ষণ ওই জাহাজের ডেক আর ইউনিফর্মের কথা ভাবলে তো হবে না। বাড়ির ভেতরে ক্যাপ্টেনগিরি ছেড়ে একটু সহজ হতে শেখ।
আর্য এবার থতমত খেয়ে প্লেটের একপাশে থাকা মাছের কাঁটা সরাতে সরাতে মৃদু স্বরে বলল,,
-‘আমি…চেষ্টা করব। অভ্যাস হয়ে গেছে তো, তাই আর কি…।
তৃষা আর্যর এই অপ্রস্তুত ভঙ্গি দেখে মনে মনে বড্ড মজা পাচ্ছিল। সে আড়চোখে আর্যর দিকে তাকিয়ে দেখল, সেই গম্ভীর ক্যাপ্টেন সাহেবের কান দুটো লজ্জায় কেমন লালচে হয়ে উঠেছে। আফজাল সাহেব এবার তৃষার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে বললেন,,
-‘মা তৃষা, তুমি চিন্তা করো না। তোমার এই শাশুড়ি মা একবার যখন জেরা শুরু করেছেন, তখন আর্যকে ওঁর কথা শুনতেই হবে। নাহলে এই ডাইনিং টেবিলেই কিন্তু কোর্ট বসে যাবে!
জাহানারা বেগম প্রথমে স্বামীর দিকে কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে পরবর্তীতেই তৃষার দিকে তাকিয়ে স্নেহমাখা কণ্ঠে বললেন,
-‘কী রে মা, আমি কি ভুল কিছু বলেছি? তোমার কি শুনতে ভালো লাগে এই আপনি সম্বোধন? একদম যেন বাইরের মানুষের মতো লাগে!
তৃষা লজ্জায় মাথা নিচু করে শুধু মৃদু হাসল। ওদিকে টুইংকেল এতক্ষণ একমনে মুরগির রানটা চিবুচ্ছিল, বড়দের সিরিয়াস কথা শুনে সে হঠাৎ খাওয়া থামিয়ে আধো-আধো গলায় ফোড়ন কাটল,
-‘দাদিয়া! পাপা তো বানিকে পচা পচা কথা বলে। কখনো স্টুপিড বলে, কখনো ইডিয়েট বলে।
টুইংকেলের এই আকস্মিক বিস্ফোরক তথ্যে আফজাল সাহেব হাসতে হাসতে প্রায় বিষম খেলেন। আর্য এবার সত্যিই অসহায় বোধ করছে। সে কাঁপা গলায় বলল,,
-‘টুইংকেল! তুমি কিন্তু বেশি বলছো মা। খেয়ে নাও তো জলদি।
আফজাল সাহেব হাসি থামিয়ে বললেন,
-‘শোনো আর্য, তোমার সব সিক্রেট কিন্তু এই খুদে গোয়েন্দা ফাঁস করে দিচ্ছে। সাবধান!
এহসান ভিলার ডাইনিং টেবিলটি তখন প্রাণোচ্ছল হাসির লহরীতে জীবন্ত হয়ে উঠেছে । সেগুন কাঠের ভারি টেবিলের ওপর ধোঁয়া ওঠা ভাতের গন্ধ, ইলিশের দোপিয়াজা আর মুগ ডালের ঘ্রাণে চারপাশ ম ম করছে। দীর্ঘদিন পর এই অন্দরমহলে কাঁচ আর পোর্সেলিনের বাসনের টুংটাং শব্দের সাথে হৃদয়ের জমানো হাসির ধ্বনিগুলো একাকার হয়ে মিশে যাচ্ছিল।
টুইংকেল তার দাদুন আফজাল সাহেবের থালা থেকে এক টুকরো মাছ তুলে নিয়ে বিজ্ঞের মতো বলল,
-‘পাপা, তুমি যদি বানিকে তুমি বলো, তবে আমি তোমাকে আমার নতুন স্টিকারটা দেব। ডিল?
আর্য এবার মাথা নেড়ে হেসে ফেলল,-‘ওকে মাম্মাম ডিল ডান
তৃষা এক ঝলক আর যে দিকে তাকাল ওর মতিগতি বোঝার উদ্দেশ্যে। তবে বরাবরের ন্যায় বেকুব তৃষা এবারও আর্যর মনোভাব বুঝতে ব্যর্থ হল।
-‘চোরের মতো উঁকিঝুঁকি দিচ্ছেন কেন? কোনো কুকর্ম করার ফন্দি আছে না কি?মিস্টার সার্জেন্ট?
হুট করে পেছন থেকে ভেসে আসা মেয়েলী কণ্ঠটায় থমকে দাঁড়ালো আদ্রিয়ান।পিছু ঘুরতেই দৃশ্যমান হলো কোমরে হাত বেঁধে চোখ দুটো সরু করে চেয়ে থাকা মেহেসানাকে।
-‘ সারাক্ষণ উল্টাপাল্টা চিন্তাভাবনা ঘুরে কেনো মাথায়?সবাইকে নিজের মতো মনে করো? স্টুপিড!
আদ্রিয়ান কথায় কথায় তাকে স্টুপিড বলেছে এমন ভাব উদয় হতেই মেহেসানা ওর দিকে এগিয়ে গিয়ে ঝগড়ুটে কণ্ঠে বলল,,
-‘ কি বললেন মিস্টার? আমি স্টুপিড? তা আপনি কি শুনি?
আদ্রিয়ান অপর পাশে ফিরে আনমনে বলল,,-‘আমার তো তাই মনে হয়!
-‘কি বললেন?
-‘নাথিং।
মেহেসানা ফুঁসতে ফুঁসতে তাকায় ওর দিকে। আদ্রিয়ান ওর পাশ কেটে যেতে যেতে বলল,,
-‘এইযে মিস ঝগড়ুটে সরুন তো।
মেহেরসানা এবার তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল তাকে ঝগড়ুটে বলা মানে। ও কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে এক প্রকার আদ্রিয়ানের কলার আটকে বলল,,
-‘এই যে মিস্টার আপনি ঝগড়ুটা কাকে বললেন?
আদ্রিয়ান নিজের কলারের ওপর মেহসানার সরু আঙুলগুলোর দখলদারিত্ব দেখে অবাক নেত্রে তাকাল। এই মেয়েটা যে এতটা দুঁহাতে শাসন করতে জানে, তা তার জানা ছিল না। সে ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে মেহসানার চোখের খুব কাছে নিজের মুখটা নিয়ে এল,,
-‘বাহ! মিস মিমি তো দেখছি একদম অ্যাকশন হিরোইন হয়ে উঠলেন। তা জনসমক্ষে একজন হ্যান্ডসাম ডক্টরকে এভাবে কলার ধরে হ্যারাস করার অপরাধে যে আপনার জেল হতে পারে, সেই হুঁশ আছে?
মেহসানা মুহূর্তেই থতমত খেয়ে হাত সরিয়ে নিল। ওর গাল দুটো রাগে আর লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছে। সে এক পা পিছিয়ে গিয়ে ওড়না ঠিক করতে করতে বলল,
-‘জেল তো আপনার হওয়া উচিত! চোরের মতো কলেজের গেটে উঁকিঝুঁকি মারছিলেন কেন? নির্ঘাত কোনো ফন্দি আছে আপনার। আচ্ছা আপনি কি আমাকে ফলো করছেন?
আদ্রিয়ান পকেটে হাত পুরে বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে দাঁড়াল। বিকেলের রোদে ওর রোদচশমাটা ঝিলিক দিয়ে উঠল। সে বেশ নির্লিপ্ত কন্ঠে বলল,
-:ফলো? আরে ভাই, নিজেকে কি খুব বড় কোনো সেলিব্রিটি ভাবেন নাকি? আমি এই পথ দিয়েই হসপিটালে যাচ্ছিলাম। ভাবলাম সুখনীড় থেকে বিদায় নেওয়ার সময় তো ওই ভাঙা হাতওয়ালা তৃষা ভাবি আর কিউটি পাইয়ের জন্য আপনার মায়া উথলে পড়ছিল, তাই একবার চেক করে দেখি যে আপনি আবার ঝগড়া করতে করতে কলেজের দেয়াল টপকে পালালেন কি না!
মেহসানা চোখ দুটো বড় বড় করে বলল,
-‘আমি মোটেও ঝগড়া করছি না! আপনিই তো গায়ে পড়ে আমাকে স্টুপিড বললেন। আর এই অসময়ে হসপিটালে যাওয়ার বাহানা তো বড্ড পুরনো। সত্যি করে বলুন তো, কেন এসেছেন?
আদ্রিয়ান এবার এক কদম এগিয়ে এল। মেহসানার ললাটে এসে পড়া অবাধ্য কেশগুচ্ছ বাতাসের দোলায় নাচছে। আদ্রিয়ান খুব নিচু স্বরে, অনেকটা ফিসফিস করে বলল,
-‘সত্যি শুনতে চান? আচ্ছা, সত্যিটা হলো— আপনার ওই ঝগড়ুটে কণ্ঠস্বরটা না শুনলে আজকের সার্জারিগুলো ঠিক জমে উঠছিল না। ভাবলাম একবার মেজাজটা ঝালিয়ে নেই, তাতে ব্লাড সার্কুলেশন ভালো হয়। আর তাছাড়া, আপনার হোস্টেলের ওই ড্রাগন আপু যদি আপনাকে করিডোরে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখে, তবে রেসকিউ করার জন্য তো এই অধমকেই আসতে হবে, তাই না?
-‘আপনার ওই ফালতু জোকসগুলো নিজের কাছেই রাখুন মিস্টার সার্জেন্ট। আর হ্যাঁ, ডক্টর হয়ে অন্যের ব্লাড সার্কুলেশন নিয়ে চিন্তা না করে নিজের হার্টবিটটা চেক করবেন। বড্ড বেশি কথা বলেন আপনি
আদ্রিয়ান এবার খানিক হেসে গাড়ির চাবিটা আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে বলল,
-‘ হার্টবিট তো চেক করতেই হবে, তবে ডক্টর হিসেবে নয় স্রেফ একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে। ইদানিং বড্ড অবাধ্য হয়ে গিয়েছে এটা।
-‘ কি বললেন?
-‘নাথিং। আচ্ছা আমি যাই, আমার আবার অত ফালতু টাইম নাই।
মেহেসানা এবার কিছু বলার আগেই আদ্রিয়ান সোজা গিয়ে গাড়িতে বসলো। ধীরে ধীরে গাড়িটি মিলিয়ে গেল সহস্র যানবাহনের ভিড়ে।
বিকেলের ম্লান রোদ এহসান ভিলার বাগানে এক অপার্থিব সুষমা ছড়িয়ে দিয়েছে। স্বর্ণঝরা সেই আলোকচ্ছটা আম্রপল্লবের ফাঁক গলে তৃষার ললাটে এক মায়াবী টিপ এঁকে দিচ্ছে। জাহানারা বেগম আর তৃষা বাগানের শ্বেতপাথরের বেঞ্চিতে বসে আছেন, আর সামনে ঘাসের গালিচায় টুইংকেল প্রজাপতির পেছনে অবুঝ মত্ততায় ছুটে বেড়াচ্ছে।
বাগানের এই অংশটি বড্ড স্নিগ্ধ। প্রাচীন কামিনী গাছের তীব্র সুবাস, দোলনচাঁপার শুভ্রতা আর ডালিমের রক্তিম আভা মিলেমিশে মৃত্তিকার গাত্রে এক আধো-আলো ছায়ার আলপনা বুননে তৎপর। জাহানারা বেগম তৃষার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে দূর দিগন্তের দিকে চেয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর চোখের মণি দুটো যেন অতীতের কোনো ধূসর স্মৃতিতে অবগাহন করছিল।তিনি শান্ত অথচ গভীর স্বরে বললেন,
-‘জানো মা তৃষা, এই বাগানটা ছিল আমার একমাত্র কথা বলার সঙ্গী। আর্য যখন নিজেকে আড়াল করে নিল, তখন এই গাছগুলোই আমার হাহাকার শুনেছে। আজ তোমাকে আর এই নাতনিটাকে এখানে দেখে মনে হচ্ছে, আমার বাগানটা যেন পূর্ণিমা খুঁজে পেয়েছে।
তৃষা জাহানারা বেগমের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে পরম শ্রদ্ধায় বলল,,
-‘মা, আপনি ওসব পুরনো কথা ভাববেন না তো। এখন আপনার মেয়ে এসে গেছে না। আর কোনো কষ্ট ছুঁতে পারবেন আপনাদের ইনশাআল্লাহ।
জাহানারা বেগম ওর দিকে উজ্জ্বল দৃষ্টিতে তাকালেন। তৃষা মৃদু হেসে বলল,,
-‘আচ্ছা না আমি আপনাকে একটা অনুরোধ করি?
-‘হুম করো।
-‘আপনি আমাকে তুমি বলবেন না প্লিজ।
জাহানারা বেগম কিভাবে জানি তাকালো তৃষা ফের বলল,-মেয়েকে কি কোনদিন মা তুমি করে বলে?
-‘তাহলে তুমি আমাকে নিজের মা বলছো?
-‘হ্যাঁ অবশ্যই।
-‘কিন্তু আমার তো তা মনে হয় না।
তৃষা কিঞ্চিৎ বিস্ময়াভিভূত হয়ে বলল,
-‘কেন মা আমার কোন কথায় বা কাজে আপনি কষ্ট পেয়েছেন? সত্যি বলুন না মা।
জাহানারা বেগম এবার সশব্দে হেসে উঠলেন।তৃষার চুপসে যাওয়া মুখাবয়বে চেয়ে বললেন,
-‘ অন্যায়? ততো অবশ্যই,বিস্তর অন্যায় করেছো তুমি।
-‘ কি মা?
-‘ মাকে কেউ আপনি করে বলে?
তৃষা এইবার নিশ্চিন্ত হেঁসে বলল,,-‘ আচ্ছা আমিও তুমি করে বলবো না হয়।
-‘ বলবি কি রে এক্ষুনি বল।
তৃষা প্রসারিত হেঁসে জাহানারা বেগমের কাঁধে মাথা রাখলো।মায়ের মৃ’ত্যু’র পর এই প্রথম কোনো নারীর উপস্থিতিতে মা মা গন্ধ অনুভব করল ও। আনমনে বলল,,
-‘ জানো মা আমার না মা ছিল না।অনেক ছোট বেলায় মাকে হারিয়েছি তো তাই মায়ের শরীরের গন্ধটাও ভুলে গেছিলাম।আজকে আবার তোমার উপস্থিতিতে মাকে অনুভব করলাম।
জাহানারা বেগম ওর মাথায় পরম স্নেহে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে স্নিগ্ধ হেঁসে বলল,,
-‘ আমারও একটা মেয়ের খুব শখ ছিল জানিস? তাই হয়তো আল্লাহ আজ তোকে পাঠিয়েছে।
ওরা দুজন যখন এক অদ্ভুত স্নেহের তবে আবদ্ধ হচ্ছে, ঠিক তখনই টুইংকেল এসে ওদের সামনে দাঁড়িয়ে কোমরে হাত বেঁধে বিজ্ঞের ন্যায় বলল,,
-‘ তোমরা দুজন আমায় রেখে কি প্ল্যান করছো শুনি!
তৃষা হেঁসে বলল,-‘ আমরা ভাব করছিলাম কিউটি পাই।
টুইংকেল ওর ছোট ছোট দুই ভ্রু কুঁচকে, গাল ফুলিয়ে বেশ শাসন করার ভঙ্গিতে বলল,
-‘ আমি সব বুঝেছি! তোমরা দুজন মিলে দল পাকিয়েছ যাতে আমাকে চকলেট কম দেওয়া হয়। দাদিয়া, তুমিও বানির দলে চলে গেলে? দিস ইজ ভেরি ব্যাড!
তৃষা হাসতে হাসতে টুইংকেলকে কোলে টেনে নিতে গিয়েই থমকে গেল। পেছন থেকে এক গম্ভীর আর ভারী কণ্ঠস্বরের গর্জনে পুরো বাগান যেন এক নিমেষে নিথর হয়ে পড়ল,
-‘ তৃষা! আপনাকে কি চব্বিশ ঘণ্টা সিসিটিভি ক্যামেরা দিয়ে ওয়াচ করতে হবে?
তৃষা চমকে পেছনে তাকাতেই দেখল আর্য হাতে একটা ওষুধের ফাইল আর গ্লাস নিয়ে হনহনিয়ে এগিয়ে আসছে। ওর ফর্সা কপালটা রাগে কুঁচকে একাকার। আর্য সামনে এসে দাঁড়াতেই তৃষা আমতা আমতা করে বলল,
-‘ আ-আসলে আমি…
আর্য ওকে কথা শেষ করতে না দিয়ে রাগী গলায় বলে উঠল,,
-‘ আপনি এখনো ওষুধ খাননি কেন? আমি কি এটা আপনাকে শোপিস হিসেবে সাজিয়ে রাখতে দিয়েছিলাম? ঘড়িতে কয়টা বাজে খেয়াল আছে? নিজের শরীরের প্রতি এই চূড়ান্ত অবহেলাটা কি আপনার শখ নাকি সিলেবাসের অংশ? আশ্চর্য!
টুইংকেল এবার বীরদর্পে আর্যর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বুক ফুলিয়ে বলল,
-‘স্টপ ইট পাপা! তুমি কেন আবার বানিকে বকছ? তুমি কি জানো না বানি এখন দাদিয়ার সাথে মা মা খেলছে? তুমি খুব পচা, তুমি আবার বানিকে বকছো! তুমি কি প্রমিজ ভুলে গিয়েছ? দাদিয়া, ওকে আজ ডিনার দিও না!
জাহানারা বেগম এবার বেশ কড়া মেজাজে বেঞ্চ ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। আর্যর ধমক আর তৃষার কাঁচুমাচু মুখচ্ছবি দেখে তাঁর মাতৃত্বের বোধ এবার বিদ্রোহ করে উঠল।
-‘ থাম আর্য! একদমে কতগুলো কথা বলে ফেললি তুই? মেয়েটা সবে একটু হাসিখুশি মনে আমার সাথে গল্প করছিল, আর তুই তোর সেই সমুদ্রের গর্জন নিয়ে হাজির হলি? আর সব থেকে বড় কথা, তুই আবার ওকে আপনি বললি কেন? আমি কি একটু আগে খাওয়ার টেবিলে তোকে ফারসি ভাষায় কিছু বুঝিয়েছিলাম?
আর্য হুট করে মায়ের এই রণচণ্ডী রূপ দেখে থতমত খেয়ে গেল। সে হাতের গ্লাসটা একটু সরিয়ে নিয়ে আমতা আমতা করে বলল,
-‘ মা, ওটা তো অভ্যাস… আসলে প্রফেশনাল লাইফে ডিসিপ্লিন মেইনটেইন করতে করতে ওটা মুখ দিয়ে বের হয়ে যায়।
-‘ ডিসিপ্লিন তোর জাহাজে রাখ আর্য! এই বাড়িতে সম্পর্কের একটা ব্যাকরণ আছে। তুই কি তোর জন্মদাত্রী মাকে কোনোদিন আপনি বলেছিস? তবে নিজের অর্ধাঙ্গিনীকে কেন এই যান্ত্রিক সম্বোধনে দূরে সরিয়ে রাখিস? শোন, আজ যদি তুই ওকে তুমি বলে ওষুধটা না খাওয়াস, তবে আজ রাতে তোর ডিনার ক্যানসেল। দরকার হলে তুই তোর জাহাজের শুকনো বিস্কুট চিবিয়ে রাত কাটাবি!’
জাহানারা বেগমের এই আল্টিমেটামে আফজাল সাহেব দূর থেকে মুচকি হাসলেন।আর্য এবার সত্যিই প্রমাদ গুনল। সে একবার তৃষার দিকে তাকাল। তৃষা তখন ওড়নার কোণ আঙুলে জড়িয়ে ঘাসের গালিচার দিকে চেয়ে আছে। আর্য একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের ইগো আর অভ্যাসের দেয়ালটা এক ঝটকায় ভেঙে ফেলল। সে ধীর পায়ে তৃষার একদম কাছে গিয়ে দাঁড়াল। গলার স্বরটা একদম খাদে নামিয়ে, বড্ড নরম আর স্নিগ্ধ করে বলল,
ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ১৯
—‘তৃষা… এই নাও তোমার ওষুধ। প্লিজ, দেরি করো না।
অতঃপর ও জাহানারা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,-‘ এবার হয়েছে?
জাহানারা বেগম মনে মনে হাসলেও মুখে কাঠিন্য বিদ্যমান রেখে গম্ভীর স্বরে বললেন,,-‘ হুম।
এদিকে আর্যর কণ্ঠের সেই তুমি সম্বোধনের পরশে তৃষার হৃদযন্ত্রে এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল। ও স্তব্ধ হয়ে রইল ক্ষণকাল। সে চমকে আর্যর চোখের দিকে তাকাল। আর্যর সেই তপ্ত চোখে এখন আর শাসন নেই, আছে এক অদ্ভুত আত্মসমর্পণ। তৃষা নিঃশব্দে গ্লাসটা হাতে নিল। আর্যর আঙুলের ছোঁয়া যখন তৃষার হাতের তালুতে লাগল, এক বিদ্যুৎ গতির শিহরণ বয়ে গেল দুজনের মাঝে।
