Home প্রেয়সীর অনুরাগ প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২১ (৩)

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২১ (৩)

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২১ (৩)
Sadiya Jahan Simi

সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে রাফসা নামাজ আদায় করে নেয়।আজ আর পড়তে বসেনি।নিচে গিয়ে গিয়ে নিজের জন্য এক কাপ গরম গরম কফি বানিয়ে নিল। কফির কাপ নিয়ে সোজা ছাদে চলে যায়। চারিদিকে লাল আভা ফেলছে। পাখির কিচির মিচির।কফির কাপে চুমুক দিয়ে আবেশে চোখ বন্ধ করে ফেলল রাফসা।মাথা ব্যথা বোধহয় এক নিমিষেই হাওয়া।কফি খাওয়ার মাঝেই হাতে থাকা ফোনটা বেজে উঠলো শব্দ করে।রাফসা ফোন চোখের সামনে ধরে দেখল সায়মা ফোন দিয়েছে।এতো সকালে সায়মার ফোন দেখে ভ্রু কুঁচকে যায় রাফসার। ফোন রিসিভ করে লাউড স্পিকারে দিল। রেলিংয়ের ওপর রাখতেই ওপাশ থেকে সায়মার কন্ঠ ভেসে আসে,
“এ্যাই শালি কোথায় তুই? কোনো খবর নেই। কোচিংয়ে আসিসনি কেন?”
রাফসার বিরক্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললো,

“তোর জামাইয়ের কোলে আছি শালি।তুই উঠবি?”
সায়মা ওপাশ থেকে হায়হুতাশ করে উঠলো,
“আল্লাহ আমার জামাইয়ের কোলে কি করিস? তুই থাকবি তোর উদ্যান ভাইয়ের কোলে। আমার এতো বড় সর্বনাশ করিস না বোন। আল্লাহর গজব পড়বে। তাড়াতাড়ি নেমে‌ যা কোল থেকে।”
রাফসা সায়মার কথা শুনে চোখ মুখ কুঁচকে বলে,
“ইয়াক থুউ,ওই খচ্চরের কোলে জীবনেও উঠব না।আমার এতো সুন্দর মুডের উপর গজব ঢাললি কেন?”
“কি করেছি আমি আবার?”
“এই সাতসকালে ঊষা আপুর ভাইয়ার কথা তুললি কেন?কেনোওও !”
সায়মা মুখ বাঁকায় ওপাশ থেকে।
“ঊষা আপুর ভাইয়ার জন্য যে কলিজা কোরবানি দিয়েছো সোনামনি তা কে বলবে শুনি! এখন আর ভালো লাগে না তোমার ঊষা আপুর ভাইকে?”

বিরক্তিতে চিবুক শক্ত হয়ে গেল রাফসার।এতো সুন্দর স্নিগ্ধ শোভন পরিবেশে মেজাজ বিগড়ে দিল সায়মাটা।
“চুপ করবি তুই? আজ সারাদিন কেমন কাটে আল্লাহ জানে। সাতসকালে ঊষা আপুর ভাইয়ার কথা তুললি আমার কানের কাছে। চোখের সামনে দেখলে আরো রাগ উঠে।”
“ওয়েট চোখের সামনে দেখলে আরো রাগ উঠে মানে কি! কাকে চোখের সামনে দেখিস?”
রাফসা কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলে উঠলো,
“যার কথা বলে আমার মুডের তেরোটা বাজিয়ে দিচ্ছিস।”
সায়মা অবাক হয়ে বলে উঠলো,
“মানে উদ্যান ভাইয়া দেশে !”
রাফসা সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল, “হুঁ।”
রাফসার কথায় যেন অবাকের রেশ বাড়ে সায়মার।ওরা এখনো জানে না উদ্যানের দেশে ফেরার কথা।রাফসা বলেইনি।

“কবে এসেছে ভাইয়া?”
“নয় দিন আগে।”
নয়দিন আগে মানে? সায়মা যেন সাতসকালে শকড্ খাচ্ছে।নয়দিন হলো এসেছে রাফসা একটা বার কাউকে বলল না।
“এতোদিন হয়েছে বলিসনি কেন? তোর কোন জিনিসে ভাগ বসাতাম শুনি?”
রাফসা নির্বিঘ্নে বলে উঠলো,
“আমার জিনিস কখনো ভাগ করিনা।যেটা আমার সেটা আমারই।আর তা যদি হয় প্রিয় জিনিস।”
“ছাতার মাথার কথা বুঝি না। আচ্ছা যাই হোক কাজের কথায় আসি।তো উদ্যান ভাইয়ের বিয়ে কবে?”
রাফসা ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো।
“ওনার কপালে বিয়ে নেই।ওনি সিঙ্গেলই মরবে সারাজীবন।”
ততক্ষণাৎ একটা ভারী কন্ঠ ভেসে আসে পেছন থেকে,
“আপনাকে কে বলেছে আমি সিঙ্গেল মরব!”

রাফসা পেছন ফিরে। উদ্যান কে দেখে থতমত খেয়ে যায়।এ লোক জ্বিন নাকি সব জায়গায় হাজির হয়ে যায়।উদ্যান জিম করছে।উদ্যানের পরনে আছে একটি হালকা ধূসর রঙের স্লিভলেস জিম টি-শার্ট, যা শরীরের সাথে সুন্দরভাবে লেগে আছে। টি-শার্টের হাতা না থাকায় তার বাহুর শক্ত পেশিগুলো স্পষ্ট বোঝা যায়।
নিচে সে পরেছে কালো রঙের জিম ট্র্যাক প্যান্ট, যা হাঁটু পর্যন্ত একটু ঢিলেঢালা কিন্তু নিচের দিকে ফিটিং। প্যান্টের পাশে সাদা রঙের সরু স্ট্রাইপ আছে, যা তাকে আরও স্পোর্টি লুক দিয়েছে।
হাতে একটি কালো জিম গ্লাভস আছে, যাতে ডাম্বেল বা বারবেল ধরতে সুবিধা হয়।রাফসা ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে উদ্যানের পানে। অন্যরকম ড্রেসআপে দেখল আজ।রাফসা কে কথা বলতে না দেখে উদ্যান চোখ তুলে তাকায়। ততক্ষণে সায়মা হ্যালো হ্যালো করে বিরক্ত হয়ে ফোন কেটে দিয়েছে।রাফসাকে নিজের পানে তাকিয়ে থাকতে দেখে মুচকি হেসে বলল,

“মেডাম আমাকে দেখা হলে প্রশ্নের উত্তরটা দিন।”
ঘোর কাটে রাফসার। ছ্যাহ কি জঘন্য ব্যাপার। এতোক্ষণ রাফসা তাকিয়ে ছিল এ লোকের পানে! মনে নিজেকে ধিক্কার জানায় রাফসা।
উদ্যান ফ্যার গম্ভীর কন্ঠে শুধায়,
“আমাকে দেখলে আপনার মুডের তেরোটা বেজে যায়? আপনার মুড এতো চেঞ্জ হয় কেন মেডাম! আবার পেছনে তো বলেন আমি গিরগিটির চেয়েও বেশি মুড চেঞ্জ করি।দিস ইজ নট ফেয়ার। আপনার বেলায় ষোলো আনা, আমার বেলায় এক আনাও না? ভেরি ব্যাড মেডাম।”
রাফসা তেতে উঠল। ঝাঁঝালো কন্ঠে বলে,
“সেই কখন থেকে আপনি মেডাম শুরু করেছেন? আপনাকে না বলেছি ছোট বোন বলে ডাকবেন।সাথে তুই।আমাকে কোন এঙ্গেল থেকে আপনার বয়সে বড় মনে হয়?”
রাফসার কথায় ভ্রু কুঁচকে তাকায় উদ্যান। এতোক্ষণ যাবত অন্যদিকে তাকিয়ে ছিল উদ্যান।রাফসার উপর থেকে নিচে পুরো একবার অবলোকন করে। উদ্যানের এমন দৃষ্টিতে থতমত খেয়ে যায় রাফসা। উদ্যান রাফসাকে আরেকবার পরোখ করে করতে করতে বলে,

“পারফ্যাক্ট বড়ই তো মনে হয় মেডাম।”
রাফসা অবাক হয় উদ্যানের কথায়। নিজের দিকে একবার তাকিয়ে চোখ মুখ কুঁচকে মৃদু চেঁচিয়ে বলল,
“হোয়াট ডু ইউ মিন ব্যই পারফ্যাক্ট? অসভ্য লোক একটা।”
“এ্যাই চুউপ নোংরা মনের নোংরা মানুষ। আমি হাত পায়ের কথা বলেছি।”
রাফসা থমথমে অবস্থায় দাঁড়িয়ে গেল।মাথা কাটা গেল এই লোকের সামনে।মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে রাফসা। হঠাৎ -ই হাতে টান পড়ল।রাফসার হাতে থাকা কফির কাপ এখন উদ্যানের হাতে স্থান পেয়েছে। রাফসা বুঝতেই পারল না ব্যাপারটা। ততক্ষণে উদ্যান চুমুক বসিয়েছে।রাফসা চোখ বড়বড় করে তাকালো।উদ্যান পুরোটা কফি এক চুমুকে শেষ করে। বড় কাপ দিয়ে এক কাপ বানিয়ে এনেছিল রাফসা অর্ধেক রাফসা খেয়েছে আর বাকিটুকু উদ্যান ।রাফসার দৃষ্টি দেখে উদ্যান ভ্রু কুঁচকে বলে,

“কি হলো এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন?”
“এটা আমার কফি ছিল।”
উদ্যান কাপটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল। তারপর রাফসার দিকে তাকিয়ে বলল,
“কোথায় কফিতে তো আপনার নাম লেখা নেই মেডাম।”
রাফসা থতমত খেয়ে যায়। পরমুহূর্তেই বলে উঠলো,
“আমার মুখের কফি ছিল। আপনি তো কারো এটো খান না।”
“তোর টাও যে খাইনা তা কোন কাগজে লিখা আছে! বাই দ্যা ওয়ে ঠোঁটে কি লিপিস্টিক দিয়েছিস?”
রাফসা অবুঝ মন নিয়ে বলে,
“ভেসলিন দিয়েছি। লিপস্টিক নয়।”
“নাইস ফ্লেভার।”
রাফসা চোখ তুলে বড় বড় করে তাকালো। উদ্যান দায়সারা ভাবে বলে,
“কফির কথা বলেছি।”
রাফসা স্বাভাবিক হলো।পা ফেলে যেতেই নিবে ওমধি উদ্যান প্রশ্ন ছুঁড়ে,

“সিঙ্গেল মরব সারাজীবন কেন মনে হলো আপনার? আশে পাশে তাকিয়ে দেখুন কিছু পেলেও পেতে পারেন।”
“আপনার কপালে বিয়ে নেই তাই সিঙ্গেল মরবেন।”
উদ্যান ঠান্ডা গলায় বলে উঠলো, “গুনে গুনে ঠিক ছয়মাস পর বিয়ে করব।সময় উল্টো গুনে যান মিস।”
রাফসা নাক মুখ কুঁচকে তাকালো।এই লোক নাকি বিয়ে করবে।হাউ ফানি! রাফসা ঠোঁট কামড়ে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল, “আপনাকে মেয়ে দিবে কে? আপনার মতো গিরগিটির সাথে যে মেয়ের বিয়ে হবে,সে কখনো সুখ পাবে না।”
“কেন?” উদ্যানের সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন।
রাফসা কথার তীরে ধুম করে বলে উঠলো, “কারণ আপনার সমস্যা আছে। সেজন্যই আপনার বউ সুখ পাবে না আপনার কাছে।”

উদ্যান অদ্ভুত চোখে তাকায় রাফসার পানে। ঠোঁট বাঁকিয়ে সামান্য হাসলো।দু কদম সামনে এসে দাড়িয়ে ঝুঁকে রাফসার মুখমণ্ডলে ঠোঁট গোল করে ফুঁ দিল।রাফসা হচকাঁলো খানিক। উদ্যান গলার স্বর কিছুটা নিচু করে বলল, “তুই চেক দিয়েছিলি? কি করে বুঝলি আমার বউ সুখ পাবে না! আমার বউয়ের জন্য ভারী চিন্তা হয়। আমার মতো একজনকে কি করে সামাল দিবে!”
রাফসা স্তব্ধ বিমূঢ় চেয়ে রইল।মিন করে বলেছে ধমকাধমকির কারণে সুখ পাবে না।আর এই লোক কথা কোন লাইনে গিয়ে জোড়া দিল!
“ইয়া আল্লাহ কি নোংরা। আপনার মাইন্ড এমন কেন? ছ্যাহ ছ্যাহ ইয়াক থুউউউ।”
উদ্যান গম্ভীর চোখে তাকালো।এমন করছে কেন এই মেয়ে? কি এমন বলেছে! রাফসা উদ্যানের পাশ কাটিয়ে চলে যায়। ছাদের সিঁড়ির কাছে আসতেই পেছন থেকে একটা তীক্ষ্ণ স্বর ভেসে আসে।
“নাইস ফ্লেভার কফির জন্য ছিল না।”
রাফসা ঘাড় বাঁকিয়ে তাকালো পেছনে। কটমট করে বলে, “অসভ্য পুরুষ।”

“আন তুমি কিন্তু বেশি বাড়াবাড়ি করছো।“
আন চোখ গরম করে তাকালো লোকটির পানে।এতে ভরকে যায় লোকটি।বেশ সাহস নিয়েই কথাটা বলেছে। এখন যদি মাথা গরম করে মেরে দেয়?
আন সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে বাঁকা হেসে বলল,
“কি করেছি? বাড়াবাড়ি করলাম কখন?”
“তুমি ফরাজী বাড়ির মেয়ের দিকে চোখ দিয়েছো কেন? আস্ত থাকবে সেই চোখ?”
আন হাসল।ভয় পেয়ে পিছু হটার লোক মনে করেছে।
“সে নিষিদ্ধ তোমার জন্য। বোঝার চেষ্টা কর।”
“নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি ঝোঁক বেশি।আমি আন ক্রেভিয়ান পিছু হটার লোক নই।সে নারী আমার। একান্তই আন ক্রেভিয়ান এর নারী।”
লোকটি বলল, “পাবে না তাকে। যত্নে বড় করা ফুল মালি কখনো হাতছাড়া করে?”
“ছিনিয়ে নেবো।” এককথায় উওর আনের।
“তোমার কীর্তি যা মেনে নেবে?”
আন অদ্ভুত চোখে তাকায়। ঠোঁটে ভয়ংকর হাসি।
“আপনার কীর্তির কথা বলুন। ফরাজী বাড়ির লোক হয়েও যে সে বাড়ির ধ্বংসেল পেছনে পড়ে আছেন তা জানে তো?”
“মুখ সামলে কথা বলো।ভুলে যেয়ো না আমি তোমার,,
আন মাঝ পথে থামিয়ে দিল। সতর্ক করে বলে,
“খবরদার এ শব্দ উচ্চারণ করবেন না। কেউই না আপনি আমার।”

“মায়াবী দাঁড়াও।”
অনবরত এ ডাক শুনে পেছনে ফিরে রাফসা।আভিয়ানকে কোচিংয়ের রাস্তায় দেখে অবাক হয়।আভিয়ান এসে রাফসার সামনে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে কয়েকটা শ্বাস ফেলে।
“আপনি এখানে কি করছেন?”
“এদিক দিয়েই যাচ্ছিলাম।তোমাকে হঠাৎ দেখলাম।তাই ডাক দিয়েছি।”
“ও আচ্ছা।তাহলে আসি আমি।”
আভিয়ান বাঁধ সাধলো। সব কাজকর্ম ফেলে ছুটে এসেছে মায়াবীকে দেখবে বলে আর ও যায় যায় শুরু করেছে।আভিয়ান বলে উঠলো,
“এত তাড়া কিসের! চলো আশেপাশের কোন রেস্টুরেন্টে বসি।”
“না এখন সময় নেই একটা দরকারি কাজ আছে।”
আভিয়ান সাথে সাথে বলল,
“কি কাজ আমায় বলো করে দিচ্ছি। ”
রাফসা আশেপাশে তাকালো।আভিয়ান অবাক হয় রাফসার দৃষ্টি দেখে। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,

“কি হল কোন সমস্যা? আমায় বল কি হয়েছে!”
“এতো চিন্তিত হবেন না।একটা মিশন আছে সেটা করার জন্যই একটু ব্যস্ত।”
“কি মিশন আমায় বল। আমি কমপ্লিট করে দিচ্ছি।”
রাফসা চোখ ছোট ছোট করে তাকালো। বলে কি এই লোক না জেনেই কমপ্লিট করে দিবে বলছে। শুনে যদি দৌড় মারে! না লোকটাকে ভালোই মনে হয় ।
রাফসা কিছু একটা ভাবল তারপর বলল,
“সত্যি করে দিবেন!”
আভিয়ান মাথা নাড়িয়ে বলল

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২১ (২)

“ অবশ্যই করে দিব। তুমি বলো না কি করতে হবে।”
“এখানে বলা যাবে না সামনে চলুন।“
“আচ্ছা চলো।”
রাস্তা পেছনে পেছন আরিয়ান পা ফেলে অনুসরণ করে চলতে থাকে সাথে সাবিকুন সায়মা আছে।
কেমন হয়েছে জানাবেন কিন্তু।

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২২