Home চিত্রাঙ্গনা চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৯০

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৯০

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৯০
ইশরাত জাহান জেরিন

বাইরে তখন টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। আকাশে জমাট মেঘ, মাঝেমধ্যে দূরে কোথাও বিদ্যুতের ক্ষীণ ঝলক দেখা যায়। ভেজা মাটির গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে আছে, দূরের ব্যাঙের ডাক।
বাড়ির অন্দরমহলে দরজার পাশে চুপচাপ বসে নদী। কাঁধে তার একটা শাল জড়ানো। অনেকক্ষণ ধরে সে অপেক্ষা করছে। মাঝে মাঝে উঠে দরজার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকাচ্ছে। আবার এসে বসে পড়ছে। চোখে ঘুম নেই, মুখে উদ্বেগের ছাপ। মনে মনে সে আস্তে বলল,
“আজও কি একই অবস্থায় ফিরবে মানুষটা…?”
বৃষ্টি একটু বাড়তেই সে উঠে গিয়ে দরজার কপাটে হাত রাখল। ঠিক তখনই উঠোনে কারো পায়ের শব্দ শোনা গেল। নদীর বুক ধক করে উঠল। সে দ্রুত দরজা খুলে দিল। দরজা খুলতেই দেখা গেল রাজন দাঁড়িয়ে আছে। ভিজে চুল কপালে লেপ্টে আছে। জামা-কাপড় এলোমেলো, চোখ দুটো লালচে আর আধবোজা। শরীর থেকে তীব্র মদের গন্ধ বের হচ্ছে। দাঁড়িয়ে থাকতেও কষ্ট হচ্ছে তার। নদী এক মুহূর্ত স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল।
তার চোখে ধরা পড়ল রাজনের অবস্থা। ঝিমিয়ে পড়া চোখ, টলমল শরীর, মুখে ক্লান্তির ছাপ। নদীর গলা একটু কেঁপে উঠল।

“এভাবে আবার…?”
রাজন দেয়ালের দিকে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। সে ঘরে ঢুকতেই প্রায় হোঁচট খেল। নদী তাড়াতাড়ি হাত বাড়িয়ে ধরতে গেল। “ধরবি না… আমি পারি,” রাজন ঝাঁকিয়ে হাত সরিয়ে দিল।
নদী থমকে গেল। তবুও আস্তে বলল, “এই অবস্থায় কেন আসেন রোজ? শরীরটা তো নষ্ট হয়ে যাবে…”
রাজন চোখ কুঁচকে তার দিকে তাকাল। মদের ঘোরে চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। “চুপ কর তো!” সে রুক্ষ গলায় বলল। “তুই আবার শুরু করছিস নাকি?”
নদী একটু কেঁপে উঠল। তবুও নিজেকে সামলে বলল,
“আমি তো শুধু আপনার ভালোর কথাই বলি…”
রাজন তাচ্ছিল্যের হাসি দিল।
“ভালোর কথা! তুই আমার ভালো বুঝবি? হ্যাঁ?”
সে টলতে টলতে খাটের দিকে গেল, আবার হঠাৎ ফিরে দাঁড়াল। “আমার জীবন নিয়ে উপদেশ দিবি না। বুঝছিস?”
নদীর চোখ ভিজে উঠল। তবুও সে শান্ত গলায় বলল,

“আমি বসে থাকি আপনার জন্যই… অপেক্ষা করি।”
রাজন বিরক্ত হয়ে হাত নেড়ে বলল,
“এই নাটক আমার সামনে করবি না। তোর এসব কান্নাকাটি দেখার টাইম নাই আমার।”
নদী চুপ করে গেল। তার চোখ থেকে নীরবে জল গড়িয়ে পড়ছে। সে আস্তে বলল,
“দিন কবে বদলাবে ।”
রাজন বিরক্ত হয়ে মাথা ঝাঁকাল। “থামবি? না কি বের হয়ে যাই আবার?” নদী আর কিছু বলল না।
রাজন টলতে টলতে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই ভেজা কাপড় থেকে টুপটুপ করে পানি মেঝেতে পড়তে লাগল। বাতাসে মদের তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে আছে। নদী একটু দূর থেকে তাকিয়ে ছিল। তারপর ধীরে ধীরে তার পেছনে ঘরে ঢুকল। রাজন খাটের ধারে বসতেই প্রায় হেলে পড়ল। নদী তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে তাকে সামলে দিল।

“এই অবস্থায় বসবেন না… পড়ে যাবেন,” নদী আস্তে বলল।
রাজন চোখ কুঁচকে তাকাল, কিন্তু কিছু বলল না। শুধু ক্লান্তভাবে মাথা নিচু করে বসে রইল। নদী আলমারি খুলে একটা শুকনো পাঞ্জাবি আর লুঙ্গি বের করল। তারপর সাবধানে বলল, “এই ভেজা জামাটা খুলে ফেলেন… ঠান্ডা লাগবে।”
রাজন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বিরক্ত গলায় বলল, “তুই আবার ডাক্তার হইছিস নাকি?”
তবুও সে হাত তুলতেই নদী আস্তে করে তার ভেজা শার্ট খুলে দিল। জামাটা পুরো ভিজে গেছে। নদী সেটা নিয়ে পাশে রেখে দিল, তারপর শুকনো কাপড়টা এগিয়ে দিল। রাজনের শরীর দুলছে। নদী সাবধানে তার কাঁধে পাঞ্জাবিটা পরিয়ে দিল। এই সময় পাশের খাটে ছোট্ট মেয়েটা ঘুমিয়ে আছে। মৃদু নিশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে।
নদী একবার মেয়ের দিকে তাকাল, তারপর আবার রাজনের দিকে। তার গলা কেঁপে উঠল।
“আপনি একটু ভালো হয়ে যান… ওর দিকে তাকিয়ে হলেও।”

রাজন হেসে উঠল। “ওর দিকে তাকাইয়া?” সে অস্পষ্ট গলায় বলল, “তুই আমাকে শেখাবি কেমনে চলতে হয়?”
নদী ধীরে বলল, “আমি শেখাতে চাই না… শুধু চাই আপনি বদলান।”
রাজন এবার চোখ তুলে তার দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে ক্লান্তি আছে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি আছে বিরক্তি।
“তুই খুব কথা বলতে শিখছিস দেখতেছি।”
নদী মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
“আমি তো শুধু” কথাটা শেষ করার আগেই রাজন থামিয়ে দিল।
“শোন, এত উপদেশ দিতে হইব না।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে হঠাৎ কঠিন স্বরে বলল, “তোর ভিতরে এমন কী আছে যে তোরে আমি ভালোবাসমু?”
নদী স্তব্ধ হয়ে গেল। রাজন যেন নিজের রাগেই কথা বাড়িয়ে দিল। “না আছে রূপ, না আছে চেহারা। এই বাড়ির কামের বেটিও তোর চেয়ে সুন্দর।”
নদীর হাত কেঁপে উঠল। তবুও সে কিছু বলল না।
রাজন আবার বলল,

“তুই তো অনেক কস, আমার ভাই ফারাজ তার বউরে এত ভালোবাসে কেন! ভালোবাসব না কেন? দেখছোস তার বউটা কেমন সুন্দর? ওমন বউ থাকলে মানুষ না খাইয়াও থাকতে পারে।”
নদীর চোখে তখন নিঃশব্দে জল জমছে।
রাজন ধীরে ধীরে বলল, “কিন্তু তুই… তুই আমার জীবনে কোনোদিন জায়গা পাবি না।”
ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে গেল। “কারণ তুই কখনোই রাবসার জায়গায় আসতে পারবি না। কোনোদিনও না।”
নদী মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখের জল মেঝেতে পড়ে যাচ্ছে নিঃশব্দে।
“আমি ওকেই ভালোবাসি। আর মরার আগ পর্যন্ত ওকেই ভালোবাসমু। তুই এই কথা মাথায় ঢুকাইয়া রাখ।”

বাইরের বৃষ্টি তখন অনেকটাই কমে এসেছে। টিনের চালের ওপর আর আগের মতো ঝমঝম শব্দ নেই। শুধু মাঝেমধ্যে টুপটাপ করে পানি পড়ার মৃদু আওয়াজ। দূরে কোথাও ব্যাঙ ডাকছে। রাতটা ধীরে ধীরে গভীর হয়ে উঠছে। মাটির ছোট্ট ঘরটার ভেতর হারিকেনের নরম আলো। আলোটা এত মৃদু যে চারপাশে এক ধরনের শান্ত হলুদ আভা ছড়িয়ে আছে। খাটের ওপর পাশাপাশি শুয়ে আছে ফারাজ আর চিত্রা। আজ তাদের বালিশও একটাই।
ফারাজ বালিশের ওপর মাথা রেখে শুয়ে আছে, আর তার বুকের ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে চিত্রা। চিত্রার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে ফারাজের বুকের ওপর ছড়িয়ে আছে। ফারাজ নড়তেও সাহস পাচ্ছে না। শুধু চুপচাপ তাকিয়ে আছে তার মুখের দিকে।
ঘুমের ভেরত চিত্রার নিঃশ্বাসের উষ্ণতা তার বুক ছুঁয়ে যাচ্ছে। ফারাজ আস্তে করে হাত বাড়িয়ে চিত্রার পিঠে হাত বুলিয়ে দিল। যেন ঘুম ভেঙে না যায়।
নিজের মনে ফিসফিস করে বলল,

“এতটা ভরসা নিয়ে ঘুমাও কেমন করে তুমি…”
কিছুক্ষণ পর তার মনে হলো মশারির ভেতর হয়তো একটা মশা ঢুকে গেছে। সে খুব সাবধানে হাত বাড়িয়ে পাশে রাখা ছোট্ট বাতিটা জ্বালাল। আলোটা জ্বলতেই সে চারদিকে তাকাল। মশারির ভেতর হাত দিয়ে আলতো করে নাড়ল। “মশা ঢুকছে নাকি…” সে নিজের মনেই বলল। চিত্রা একটু নড়ল।
ফারাজ সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল। তার পিঠে আবার হাত বুলিয়ে দিল। “ঘুমাও… ঘুমাও।”
চিত্রা আধো ঘুমে গা আরও একটু গুটিয়ে নিল। বুকের ওপর মাথাটা আরও গাঢ়ভাবে চেপে ধরল।
ফারাজের ঠোঁটে হাসি ফুটল। কিছুক্ষণ পর চিত্রা আবার একটু নড়েচড়ে উঠল। যেন অস্বস্তি হচ্ছে।
ফারাজ ঝুঁকে খুব নরম গলায় ডাকল,

“চিত্রা…”
চিত্রা চোখ খুলল না। শুধু অস্পষ্টভাবে বলল,
“হুম…”
ফারাজ মৃদু স্বরে বলল,
“ওয়াশরুমে যাবে?”
চিত্রা চোখ বন্ধ করেই খুব ছোট করে বলল,
“হুম…”
ফারাজ আর এক মুহূর্ত দেরি করল না।
সে খুব সাবধানে চিত্রাকে বুক থেকে সরিয়ে নিল। তারপর তাকে কোলে তুলে নিল।
চিত্রা আধো ঘুমেই তার গলায় হাত জড়িয়ে ধরল।
“ঘুমাচ্ছি তো…” সে বিড়বিড় করে বলল।
ফারাজ হেসে ফেলল। “তাই তো দেখছি। হাঁটতে দিলে পড়ে যাবে।” সে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
মাটির উঠোনে তখন ভেজা মাটির গন্ধ। বৃষ্টি প্রায় থেমে এসেছে, শুধু ছাদের ধারে ধারে পানি পড়ছে।
ওয়াশরুমের কাছে এসে ফারাজ ধীরে বলল,

“এইখানে নামালাম। সাবধানে।”
চিত্রা চোখ আধখোলা করে তাকাল।
“আপনি দাঁড়াবেন?”
ফারাজ হেসে মাথা নেড়ে বলল,
“হুম। এইখানেই আছি।”
চিত্রা ভেতরে ঢুকে দরজা লাগাল।
ফারাজ বাইরে দাঁড়িয়ে রইল চুপচাপ। দূরে ঝোপে ঝোপে ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে চিত্রা বের হলো। চোখে এখনও ঘুম লেগে আছে।
ফারাজ আবার তাকে কোলে তুলে নিল।
চিত্রা চোখ বন্ধ করে বলল,
“আমি হাঁটতে পারতাম…”
ফারাজ আস্তে বলল,
“জানি। তাও কোলে নিলাম।”
“কেন?”
ফারাজ খুব নরম গলায় বলল,
“কারণ তুমি আমার বউ।”

চিত্রা কিছু বলল না। শুধু মাথাটা তার কাঁধে রেখে দিল। আবার ঘরে ফিরে এসে ফারাজ তাকে খাটে শুইয়ে দিল। মশারিটা ঠিক করে গুঁজে দিল চারপাশে।
তারপর আবার শুয়ে পড়ল। চিত্রা ঘুমের মধ্যেই হাত বাড়িয়ে তার বুকের ওপর রাখল। ফারাজ সেই হাতটা আলতো করে নিজের হাতে ধরল। আর খুব ধীরে চিত্রার পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। চিত্রা ঘুমিয়ে গেল মুহূর্তে। ফারাজ সেই ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকল। মনে কত কথা আসছে। এই ঘরে, এইবাড়িতেই চিত্রাকে সে মারতে চেয়েছিল। ভাবতেই বুকটা কেমন করে ওঠে। রাতে খাওয়ার সময় চিত্রা ফারাজের দিকে তাকিয়ে আরেকটা গল্প বলল, সত্য গল্প। যদিও বিষয় ফারাজই তুলেছিল।

মোফাজ্জল হোসেনের সাথে চিত্রার পরিচয় কেমন করে? চিত্রা তখন বলল, “তার সাথে পরিচয় হওয়ার আরো অনেক আগে বজ্র এখানে আসে। তার সাথেই পরিচয় হয়। সেদিন যখন ফারাজ এই বাড়িতে চিত্রাকে প্রথমে আগুনে পুড়িয়ে তারপর গুলি করতে চেয়েছিল তখন মোফাজ্জলকে কিন্তু জানানো হয়। আগেই কেরাসিনের ব্যবস্থা করতে বলেছিল ফারাজ। অথচ সে তখন বুঝতে পারেনি এই মোফাজ্জল চিত্রাকে আগেই বিষয়টা জানায়। এই মেয়ে ওইদিন জানত তার মরণ তার ভালোবাসার হাতেই হতে পারত। তবুও নিজেকে বিসর্জন দিয়েছিল সে ভালোবাসার তরে। একজন মানুষ বুঝি এতটাই ভালোবাসতে জানে? মৃত্যুর বুঝি ভয় নেই? যারা ভালোবাসতে জানে তারা বুঝি মৃত্যুকে ভয় পায় না?”
সে চিত্রার কপালে চুমু দিয়ে নিয়ে মৃদু কণ্ঠে বলল, “তোমায় অনেক বেশি ভালোবাসি বিবিজান। তবুও আমার হাজারটা জীবনের ভালোবাসাও তোমার এই জনমের ভালোবাসার কাছে তুচ্ছ বেমানান।”

নদী চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। রাজনের বলা কথাগুলো তার বুকের ভেতর ধারালো কাঁটার মতো বিঁধছে। তবু সে নিজেকে সামলে ধীরে বলল,
“মানুষ ভুলে ভালোবাসতে পারে… কিন্তু এত ঘৃণা করতে পারে কিভাবে?”
রাজন চোখ তুলে তাকাল। চোখে রাগ জমতে শুরু করেছে। “তুই আবার শুরু করছিস?”
নদীর গলা এবার একটু শক্ত হলো। “আমি শুরু করি নাই। আপনি করছেন। সারাটা জীবন আমার সাথে এসব কইরা বেড়াইছেন। সবসময় অপমান করছেন।”
রাজন খাট থেকে উঠে দাঁড়াল। মদের নেশায় শরীর টলছে, কিন্তু কণ্ঠ ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।
“তোরে আমি অপমান করছি? তুই কি খুব সম্মানের মানুষ নাকি?”
নদী এবার চোখ তুলে তাকাল। “আমি কিছুই না। কিন্তু আমি আপনার সংসারের মানুষ।”
রাজন হেসে উঠল, “সংসারের মানুষ! তুই?”
তারপর হঠাৎ সামনে এগিয়ে এল।

“শোন, তোরে আমি কোনোদিনই আমার নিজের ভাবি নাই।”
নদী কাঁপা গলায় বলল,
“তাহলে এতদিন…?” কথাটা শেষ হওয়ার আগেই রাজনের হাত উঠল। চড়ের আঘাতে নদীর মাথা ঘুরে গেল। সে ভারসাম্য রাখতে পারল না। মেঝেতে পড়ে গেল ধপ করে। তারপর হঠাৎ পাশের খাটে নড়াচড়া হলো। ছোট্ট নুড়ির ঘুম ভেঙে গেছে।
মেয়েটা আধো ঘুমে চারদিকে তাকাল। মায়ের পড়ে থাকা শরীর দেখে সে ভয় পেয়ে উঠল। আর মুহূর্তের মধ্যেই তার মুখ বিকৃত হয়ে উঠল কান্নায়।
“আম্মু…!”
নুড়ির কান্না প্রথমে ক্ষীণ ছিল, তারপর ধীরে ধীরে জোরে উঠতে লাগল। রাজন বিরক্ত হয়ে মুখ বাঁকাল।
“এই আবার শুরু করল!” সে বিরক্তির সাথে বলল,
“চুপ করাও তো একে!” নদী তখনো মেঝেতে পড়ে। কপালের পাশে চুল এলোমেলো হয়ে আছে। চোখে জল, শরীর কাঁপছে। সে উঠতে চেষ্টা করল। কিন্তু নুড়ির কান্না থামছে না। রাজনের ধৈর্য শেষ হয়ে গেল।
সে খাটের দিকে এগিয়ে গেল।

“চুপ করবি না?”
মেয়েটা ভয় পেয়ে আরও জোরে কেঁদে উঠল।
রাজন হাত তুলল। ঠিক সেই মুহূর্তে নদী উঠে দাঁড়াল।
হঠাৎ করে তার শরীর যেন অন্য এক শক্তিতে ভরে উঠেছে। সে দৌড়ে গিয়ে রাজনের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল।
“থামেন!”
রাজন বিস্ময়ে তাকাল।
“হাত ছাড়!”
“না। আমারে মারছেন—মারেন। আমি কিছু বলি নাই কোনোদিন আর বলমুও না।”
সে নিঃশ্বাস নিয়ে বলল, “কিন্তু আমার মেয়ের গায়ে হাত তুলবেন না।” নুড়ি তখনো কাঁদছে। ছোট্ট হাত দিয়ে মায়ের শাড়ি আঁকড়ে ধরেছে। রাজন দাঁড়িয়ে আছে, তার হাত নদীর মুঠোয় আটকে।
নদী ধীরে, স্পষ্ট করে বলল, “আমি অনেক কিছু সহ্য করতে পারি। অপমান, কষ্ট, মার… সব।”
তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।
“কিন্তু আমার মেয়ের জীবনে এই দুঃস্বপ্নটা আমি ঢুকতে দিব না।”
“এই জানোয়ারের বাচ্চা! মাইয়া কি তুই পেটে ধরছিস? সতিনের মাইয়া মানুষ করছোত লজ্জা করে না।”
নদী তার সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
রাজনের চোখ তখন রক্তবর্ণ। সে দাঁত চেপে বলল,

“হাত ছাড় বলতেছি!”
নদী মাথা নাড়ল।
“না। আপনি ওর কাছে যাইবেন না।”
রাজনের চোখে তখন আর কোনো সংযম নেই।
হঠাৎ সে নদীর হাতটা ঝাঁকিয়ে সরিয়ে দিল। এমন জোরে ঠেলে দিল যে নদী আবারও দুলে উঠল। সেই ফাঁকে সে নুড়িকে প্রায় টেনে ছিনিয়ে নিল তার কাছ থেকে।
নুড়ি আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল,
“আম্মু…!”
নদীর বুক কেঁপে উঠল। “রাজন! ছাড়েন ওরে!”
কিন্তু রাজনের কানে তখন কোনো কথা ঢুকছে না।
সে নুড়ির হাত শক্ত করে চেপে ধরে বলল,
“চুপ কর! এত কান্দিস কেন?”
নুড়ি ভয় পেয়ে আরও জোরে কাঁদতে লাগল।
রাজন বিরক্ত হয়ে গালাগাল শুরু করল।
“অভিশাপ একখান! জন্মাইছিস কেন?”
তার কণ্ঠে তীব্র ঘৃণা।

“তোর মায়ের পেটে থাকতেই তোরে পিষা মারা দরকার ছিল!”
নদীর বুকের ভেতরটা যেন হঠাৎ জমে গেল।
সে কয়েক পা এগিয়ে এল।
“এই কথা কইবেন না…”
রাজন যেন আরও উন্মত্ত হয়ে উঠল।
“কেন কইব না?” নুড়ি তখন অসহায়ভাবে কাঁদছে।
রাজন হাত তুলল। ঠিক সেই মুহূর্তে নদী শক্ত হয়ে গেল। এতক্ষণ সে শুধু সহ্য করেছে। অপমান, আঘাত, অপদস্থতা সব। কিন্তু একটা ছোট্ট মেয়ের উপর সেই একই অন্ধকার নেমে আসতে দেখা এটা সে আর সহ্য করতে পারল না। তার দৃষ্টি পড়ল পাশের টেবিলের উপর রাখা কাঁচের ফুলদানিটার দিকে।
সবকিছু যেন এক মুহূর্তে ঘটে গেল। নদী দৌড়ে গিয়ে ফুলদানিটা তুলে নিল। তারপর পেছন থেকে সজোরে আঘাত করল রাজনের মাথায়। একটা তীব্র শব্দ হলো। কাঁচ ভাঙার কর্কশ আওয়াজ। রাজনের শরীর এক মুহূর্ত কেঁপে উঠল। হাত আলগা হয়ে গেল। নুড়ি তার মুঠো থেকে ছুটে মেঝেতে বসে পড়ল। তারপর রাজন ধীরে ধীরে সামনে হেলে পড়ল। ধপ করে মেঝেতে লুটিয়ে গেল। নদীর হাত থেকে ভাঙা ফুলদানির অংশটা মেঝেতে পড়ে গেল।
তার বুক ধড়ফড় করছে। হাত কাঁপছে।
নুড়ি কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে এসে মায়ের গায়ে জড়িয়ে ধরল।

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৮৯

“আম্মু… আম্মু…” নদী মেয়েকে বুকে টেনে নিল।
তার চোখে তখন জল। সেই জল শুকিয়ে যাচ্ছে। তবুও তার দৃষ্টি আঁটকে রইল মেঝের দিকে। রক্তের স্রোতের দিকে, সামনে জবাই কৃত পশুর মতো ছটফট করতে থাকা তার অতি আদরের স্বামীর দিকে।

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৯১

1 COMMENT

Comments are closed.