ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ২২
নওরিন কবির তিশা
রজনীর তিমির বিদায় নিয়ে পূর্বাকাশে যখন কাঁচা সোনারোদ অলস মেঘের কোল ঘেঁষে উঁকি দিল, এহসান ভিলার প্রাঙ্গণে তখন এক ব্যস্তমধুর প্রভাতের সূচনা হলো। শিউলি তলার সিক্ত ঘাসে ভোরের বৃষ্টিবিন্দুরা মুক্তোর মতো ঝিকমিক করছে, আর কামিনী ফুলের উগ্র সুবাস স্নিগ্ধ পবনে মিশে এক অপার্থিব আবেশ ছড়িয়ে দিচ্ছে। পাখিদের কলকাকলিতে মুখরিত সেই মায়াবী ভোরে জাফলং অভিমুখে যাত্রার আয়োজন সম্পন্ন হলো।
তৃষার পরনে আজ গাঢ় নীল রঙা সিল্কের শাড়ি, যা ওর ফর্সা অঙ্গে এক স্নিগ্ধ আভিজাত্য লেপে দিয়েছে। গলায় ঝিলিক দিচ্ছে সেই নীলকান্তমণির লকেটটি।আর আর্যর পরনে আসমানি রঙের সাটিন শার্ট আর কালচে জিন্স; ওর রাশভারী ব্যক্তিত্বে আজ যেন এক প্রশান্ত অরণ্যের নিস্তব্ধতা বিরাজমান। টুইংকেল লাল ফ্রক পরে প্রজাপতির মতো এদিক-ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছে, পরক্ষণেই তৃষার কাছে এসে থামছে।
টুইংকেল এবার দৌড়ে এসে ওর ছোট্ট হাত দুটো দিয়ে তৃষার শাড়ির আঁচলটা খামচে ধরে গোল গোল চোখে তাকিয়ে রইল। তৃষার কাজল কালো চোখ আর গলার সেই নীল লকেটটা দেখে ও যেন বিস্ময়ে থমকে গেছে। ও হুট করে তৃষার গালে একটা পুচকু আঙুল দিয়ে টোকা দিয়ে আদুরে গলায় বলল,
-‘ ওএমজি বানি! ইউ্য লুক লাইক আ রিয়েল এলসা! এই ব্লু ড্রেস আর গলার এই শাইনি স্টোনটা… তুমি কি আজ ম্যাজিক করে জাফলংয়ের সব পাহাড় বরফ বানিয়ে দেবে?
তৃষা খিলখিল করে হেসে উঠে টুইংকেলকে কোলে তুলে নিল। ওর নাকে নাক ঘষে দিয়ে বলল,,
-‘ নোট মাই লিটল সিন্ডারেলা! ম্যাজিক তো তুমি করো। আর শোনো, পাহাড়ে গিয়ে কিন্তু একদম দুষ্টুমি করা যাবে না, ওকে?
টুইংকেল দুই হাত দিয়ে তৃষার গলা জড়িয়ে ধরে ঘাড় বাঁকিয়ে বলল,,
-‘ প্রমিজ বানি! আমি একদম গুড গার্ল হয়ে থাকব। বাট পাপা যদি আবার তোমাকে বকে, তখন কিন্তু আমি ফাইট করব। ডোন্ট ওয়ারি, আই অ্যাম ইওর বডিগার্ড!
তৃষা ওর কপালে একটা শব্দ করে চুমু খেলো।ওরা যখন এমন খুনসুটিতে মত্ত ঠিক তক্ষুনি ভেসে আসলো আর্যর গম্ভীর কণ্ঠস্বর,
-‘ আই থিঙ্ক বেলা বাড়ছে কমছে না।
তৃষা দৃষ্টি কুঁচকে তাকায় ওর দিকে। বিড়বিড় করে বলে,-‘ আল্লাহর ওয়াস্তে এই করোলা যদি কখনো একটু সুন্দর করে কথা বলতে পারে।
-‘ কি বলছেন?
-‘ ক-কই কিছু নাতো।
-‘ দ্রুত গাড়িতে উঠুন। মা মামিরা অন্য গাড়িতে যাবে। আই থিঙ্ক আপনার আমার সাথে যাওয়াটাই বেটার।
-‘ কি-কিন্তু।
-‘ আমি কোনো এক্সকিউজ শুনতে চাচ্ছি না। দ্রুত উঠুন।হারি আপ।
কি আর করার, তৃষা কাঁচুমাচু ভঙ্গিমায় আর্যর গাড়িতে গিয়ে বসলো। ওর ইচ্ছা ছিল জাহানারা বেগমদের সাথে যাওয়ার কিন্তু আর্য সেই মনোবাসনা পূর্ণ হতে দিল কই?
-‘ এইম কি এখন?
হঠাৎ প্রশ্নে রায়াদের এদিকে ফিরে চাইলো সাবরিনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোল ঘেঁষে সদ্য গড়ে ওঠা এই ক্যাফেটেরিয়াটি যেন নাগরিক কোলাহলের মাঝে এক চিলতে স্নিগ্ধ অরণ্য। দেয়ালের কোণে ঝুলন্ত লতানো গাছ আর মৃদু নীল আলোর মায়া এক অপার্থিব নিস্তব্ধতা বুনেছে এখানে। কফির সুবাস আর হালকা ধোঁয়ার কুণ্ডলী বাতাসে মিলাচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি জরুরি দাপ্তরিক কাজে আজ ক্যাম্পাস অবধি আসতে হয়েছিল রায়াদকে। কাজ শেষে যখন ও ফিরছিল, তখনই দেখা হয়েছে সাবরিনার সাথে। সাবরিনাও আজ এসে বান্ধবী যুথিকার বাসায়। পরিচিত দুটি মুখ যখন এই চেনা রাজপথে আচমকা মুখোমুখি হলো, তখন গন্তব্যের তাড়া ভুলে দুজনেই আশ্রয় খুঁজল এই নবীন ক্যাফেটেরিয়ার নিভৃত কোণে।
-‘ আপাতত ঢাবিতে চান্স পেতে চাই।
রায়াদ আলতো করে চুমুক দিল কফিতে,
-‘ ও হ্যাঁ তোমরা তো এইচএসসি আছে সামনে। তা প্রেপারেশন কেমন?
-‘ ভালোই।
-‘ শুধু ভালো? তোমার ভাইয়াতো অনেক বড় একজন সার্জেন্ট। ফ্যামিলির দিক থেকে চাপ আসে না?
-‘ না ভাইয়া আমাকে কখনো চাপ দেয় না।
-‘ তাহলে তো গুড।
-‘ হু।
-‘ তো এদিকে কেন এসেছিলে? বললে না তো।
-‘ ঐ একটা ফ্রেন্ডের বাসায়।
-‘ ওহ।
ক্ষনিকের নীরবতা। রায়াদ আনমনে কফি খেতে ব্যস্ত। সাবরিনাও বুঝতে পারছে না কি বলবে। হুট করে সাবরিনা প্রশ্ন করে বসলো,
-‘ লাইফ আপডেট কি রায়াদ ভাই? কানাডায় সেটেল হওয়ার ইচ্ছা আছে না কি?
-‘ একদম না। এখানেই কিছু একটা করতে চাই।
-‘ ওহ।
_’ আচ্ছা তাহলে আজকে উঠি। নেক্সটাইম কথা হবে, অ্যাচুয়ালি আমি বিজি ছিলাম বাট তোমাকে দেখে একটু ভাবলাম কথা বলি। ডোন্ট মাইন্ড বাট এখন উঠতে হবে।
-‘ আচ্ছা। প্রবলেম নাই।
পিচঢালা মসৃণ রাজপথ চিরে আর্যর শ্বেতশুভ্র যানটি যখন জাফলংয়ের পানে ধাবমান, বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দে যেন এক আদিম মায়াবী মূর্ছনা বেজে উঠল। অঞ্জন মেঘের কোল ঘেঁষে আসা রোদ জানালার শার্সি চুইয়ে তৃষার লাবণ্যময়ী মুখে এক অদ্ভুত আলপনা এঁকে দিচ্ছে। অবাধ্য কেশগুচ্ছ অবিরল নৃত্যে মত্ত হয়ে ওর ললাট আর গণ্ডদেশ স্পর্শ করছে বারবার; তৃষা মগ্ন হয়ে দেখছে দুপাশে দ্রুত সরে যাওয়া শ্যামল বনানীর স্নিগ্ধ রূপ।
টুইংকেল তখন তৃষার পাশের সিটে নিজের খেলনাগুলো নিয়ে মহা ব্যস্ত। কখনও সে জানালার বাইরে হাত বাড়িয়ে মেঘ ধরার ব্যর্থ চেষ্টা করছে, আবার কখনও গুনগুন করে নার্সারি রাইমস গাইছে। আর্যর বলিষ্ঠ হাত দুটি স্টিয়ারিংয়ে স্থির থাকলেও তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বারবার আড়চোখে তৃষার দিকে নিবদ্ধ হচ্ছে। তৃষার শাড়ির নেভি ব্লু রংটা এই সকালের আলোয় যেন সমুদ্রের নীলকেও হার মানাচ্ছে।
হঠাৎ আর্যর গম্ভীর কন্ঠস্বর গাড়ির ভেতরের সেই প্রশান্তিকে মৃদুভাবে স্পর্শ করল,
-‘ জানালার কাঁচটা একটু তুলে দিন তৃষা। বাতাসের ঝাপটায় আপনার চোখ-মুখ লাল হয়ে যাচ্ছে। আর ওই চুলগুলো… সামলাতে পারছেন না যখন, তখন আটকে রাখলেই তো হতো।
তৃষা চুলের গোছাগুলো কানে গুঁজে দিয়ে বলল,
-‘ আপনার কি সব কিছুতেই প্রবলেম?
আর্যর দিকের চেয়েও ওর মনোভাব বুঝতে ব্যর্থ হলো তৃষা। তবে দৃৃষ্টি ঘোরানোর ঠিক পূর্বমুহূর্তেই আর্যর নির্বিকার কন্ঠ ভেসে আসলো,
-‘ প্রবলেম? অফকোর্স! আমার ড্রাইভিংয়ে কনসেনট্রেশন নষ্ট হচ্ছে। আপনার ওই অবাধ্য চুলগুলো বারবার আমার দৃষ্টি সীমানায় বিভ্রম তৈরি করছে।
তৃষা থমকে গেল। আর্যর সরাসরি এমন স্বীকারোক্তিতে ওর বুকের ভেতরটা হঠাৎ অলীক ছন্দে স্পন্দিত হতে লাগল। ও স্তব্ধ হয়ে রইল কিছুক্ষণ অতঃপর দ্রুত জানালার কাঁচটা তুলে দিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলো বাইরের দিকে। টুইংকেল পেছনের সিট থেকে মাথা বাড়িয়ে আধো-আধো গলায় বলল,,
—‘পাপা! তুমি কি আবার বানিকে বকছ? আমি কিন্তু সিগন্যাল দিচ্ছি, স্টপ ইট!
আর্য এবার বাঁকা হাসলো খানিক।
রাস্তার এক নিভৃত বাঁকে বৃষ্টির ভেজা পিচ্ছিল পথে চাকা পিছলে পড়ে থাকা এক কিশোরকে দেখে মেহসানা বড্ড বিচলিত হয়ে পড়ল।ও এদিকটা দিয়েই যাচ্ছিলো লাইব্রেরীর উদ্দেশ্যে।হঠাৎ এমন দৃশ্যে ও হচকিত হয়ে তৎক্ষণাৎ নিজের ওড়না দিয়ে র’ক্তক্ষরণ থামানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে, পাশ দিয়ে যাওয়া একটি সিএনজি থামিয়ে সোজা নিয়ে এল শহরের নামী প্রাইভেট হাসপাতালে। করিডোর দিয়ে স্ট্রেচার ঠেলতে ঠেলতে ও যখন হন্তদন্ত হয়ে ইমার্জেন্সিতে ঢুকল, ঠিক তখনই ধবধবে সাদা অ্যাপ্রোন পরে গম্ভীর মুখে বেরিয়ে আসছিলো আদ্রিয়ান।
মেহসানাকে ওই আলুথালু বেশে আর র’ক্তমাখা হাতে দেখে আদ্রিয়ানের ভ্রু কুঁচকে গেল। মেহসানা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
-‘ আপনি! প্লিজ একে দেখুন। রাস্তায় অ্যা’ক্সিডেন্ট হয়েছে, প্রচুর ব্লা’ড লস হচ্ছে।
আদ্রিয়ান এক মুহূর্ত দেরি না করে ছেলেটির পালস চেক করতে করতে অত্যন্ত পেশাদার গলায় নার্সদের নির্দেশ দিলেন। তারপর মেহসানার দিকে ফিরে এক শান্ত দৃষ্টি হেনে বললেন,
-‘ কুল ডাউন মিস। এতটা চিন্তিত হবেন না।
-‘ আ-আপনি আপনি প্লিজ ওকে একটু দেখুন।
মেহেসানার মিনতির স্বরে বলা কথাগুলো আদ্রিয়ানের বুকে কেমন করে জানি বিধলো। ও আর কোনো বাক্য ব্যয় না করে সোজা অপারেশন থিয়েটারের দিকে হাঁটা দিলেন। দীর্ঘ এক ঘণ্টা পর যখন ও বেরিয়ে এলো, মেহসানা তখন বেঞ্চে বসে ক্লান্তিতে ঝিমোচ্ছিল। আদ্রিয়ান ওর সামনে এসে একটি পানির বোতল বাড়িয়ে দিয়ে বেশ মোলায়েম স্বরে বললেন,
-‘ ছেলেটি এখন আউট অফ ডেঞ্জার। তবে মিস নেক্সট টাইম নিজের সেফটির কথাটাও একটু ভাববেন, আপনার হাতের তালুটা কেটে গেছে খেয়াল করেছেন?
মেহসানা নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে অবাক হলো। আদ্রিয়ান কোনো অনুমতি না নিয়েই পকেট থেকে অ্যান্টিসেপটিক ওয়াইপ বের করে মেহসানার ক্ষতটা পরিষ্কার করতে লাগলেন। সেই মুহূর্তের নিস্তব্ধতায় মেহসানা অনুভব করল, এই রাগী ডক্টর সাহেবের ভেতরেও এক অদ্ভুত মায়ার সমুদ্র লুকিয়ে আছে। সে কেবল বড় বড় চোখে আদ্রিয়ানের একাগ্র মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল। আনমনে বলল,,
-‘ থ্যাঙ্ক ইউ।
আদ্রিয়ান কিঞ্চিৎ বিষ্ময়ে তড়িৎ গতিতে তাকালো ওর দিকে।
-‘ এই চিমটি কাটুন তো।
ধন্যবাদের প্রত্যুত্তরে এমন একটা কথা শুনে বিস্ময়ের সকল সীমা পেরিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকালো মেহেসানা।
-‘ কি হলো? কাটুন বলছি।
মেহেসানা পূর্বের ন্যায় স্তব্ধ ভঙ্গিমায় থেকেই চিমটি কাটলো।আদ্রিয়ান চিমটি খেয়ে কাল্পনিক ব্যথার ভান করে হাত ঝাড়তে ঝাড়তে অবিশ্বাসের সুরে বলে উঠল,
-‘ ওহ! তার মানে এটা রিয়েল ছিল? কোনো হ্যালুসিনেশন নয় তো?
মেহসানা ভ্রু কুঁচকে রেগে গিয়ে বলল,,
-‘ কীসের হ্যালুসিনেশন? আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন? আমি জাস্ট থ্যাঙ্ক ইউ বললাম, আর আপনি চিমটি কাটতে বলছেন!
আদ্রিয়ান পকেটে হাত পুরে এক গাল হেসে বলল,
-‘আরে না, মানে আপনার মতো ফায়ার সার্ভিস টাইপ পাবলিক যে আমাকে কোনোদিন থ্যাঙ্ক ইউ বলতে পারে, সেটা আমার মেডিকেল সায়েন্সের সিলেবাসের বাইরে ছিল। আমি তো ভাবলাম আজকেও বুঝি কোনো নতুন ঝগড়ার এপিসোড শুরু হবে। থ্যাঙ্ক ইউ-টা হজম করতে একটু সময় লাগছে আর কি!
মেহসানা এবার তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল। ওড়নাটা শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে কড়া গলায় বলল,,
-‘ আপনার মতো অসভ্য লোককে থ্যাঙ্ক ইউ বলাটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় মিস্টেক ছিল। আমি তো আপনার প্রফেশনকে রেসপেক্ট জানিয়ে ওটা বলেছি, আপনাকে নয়। আপনি তো সেই আগের মতোই ইডিয়ট রয়ে গেছেন!
আদ্রিয়ান এবার মেহসানার একদম সামনে এসে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে ফিসফিস করে বলল,
-‘ এই তো! এই রূপটাতেই আপনাকে আসল মিস মিমি মনে হয়। ওই থ্যাঙ্ক ইউ বলা শান্ত মেয়েটা বড্ড বোরিং ছিল। তবে শুনুন মিস ঝগড়ুটে, ইডিয়ট হলেও এই ইডিয়টটাই কিন্তু আপনার র’ক্তমাখা হাতটা পরিষ্কার করে দিয়েছে। সো, একটু তো ক্রেডিট পাওয়াই উচিত, তাই না?
মেহসানা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে গটগট করে করিডোর দিয়ে হাঁটতে লাগল। পেছন থেকে আদ্রিয়ানের দরাজ কণ্ঠস্বর ভেসে এল,,
-‘ সাবধানে যাবেন! আবার কোনো এক্সিডেন্ট ঘটিয়ে নতুন পেশেন্ট নিয়ে হাজির হবেন না যেন। আমার ডিউটি কিন্তু শেষ!
মেহসানা পেছন ফিরে তাকাল না গটগটিয়ে গেল। পিছে প্রসারিত হাসলো আদ্রিয়ান।
নিশুতি রাতের নিবিড় আঁধারে জাফলংয়ের বুক চিরে ধাবমান আর্যর গাড়িটি যখন এক আভিজাত্যমণ্ডিত সিংহদ্বারের সম্মুখে এসে থমকে দাঁড়াল, তখন চরাচর জুড়ে এক আদিম স্তব্ধতা বিরাজমান। দূর পাহাড়ের গায়ে জোনাকির আলপনা আর ঝিঁঝিঁ পোকার ঐকতানে রজনী তখন বড্ড রহস্যময়ী।
সম্মুখে দণ্ডায়মান সেই সুবিশাল প্রাচীন জমিদার বাড়িটি যেন ইতিহাসের এক ধূসর দলিল; প্রাচীন জমিদারি আমলের কারুকাজখচিত খিলান আর লোনা ধটরা ইটের পাজরে এখন আধুনিকার প্রলেপ মাখানো। সুবিস্তৃত বাড়িতে এলাকায় তালুকদার মঞ্জিল নামে খ্যাত। আর এটাই আর্যর মামা বাড়ি।
ইঞ্জিন বন্ধ করে একবার পাশের সিটের দিকে তাকাল।তৃষা তখষ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সারাদিনের ভ্রমণক্লান্তি আর নেভি ব্লু শাড়ির ভারী ভাঁজে ও যেন এক শ্রান্ত পরিশ্রান্ত মায়াবতী। ওর মাথাটা জানালার কাঁচের সাথে ঠেস দিয়ে রাখা, ঠোঁট দুটো কিঞ্চিৎ ফাঁকা হয়ে আছে গভীর প্রশান্তিতে। টুইংকেল পেছনের সিট থেকে হাই তুলে চোখ কচলাতে কচলাতে নেমে এল। ও আর্যর প্যান্টের কোণা ধরে টান দিয়ে নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল,
-‘ পাপা! ও পাপা! বানি তো ঘুমিয়ে একদম আইসক্রিম হয়ে গেছে। এখন ওকে কে জাগাবে?
আর্য টুইংকেলের মাথায় হাত রেখে ইশারায় চুপ থাকতে বলল। ও গাড়ি থেকে নেমে তৃষার পাশের দরজাটা সন্তর্পণে খুলল। পাহাড়ি ঠান্ডা বাতাস ওর নাকে লাগতেই তৃষা সামান্য নড়েচড়ে বসল, কিন্তু ওর ঘুম ভাঙল না। আর্য একবার ভাবল ওকে ডাকবে, কিন্তু তৃষার সেই নিষ্পাপ ঘুমন্ত মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে আর ওর ঘুম ভাঙাতে পারল না আর্য।
আর্য এবার নিজের বলিষ্ঠ হাত দুটি তৃষার পিঠ আর হাঁটুর নিচে গলিয়ে দিয়ে এক ঝটকায় ওকে কোলে তুলে নিল। নেভি ব্লু শাড়ির আঁচলটা মেঝের দিকে ঝুলে পড়তেই আর্য টুইংকেল ওটা সামলে নিল। টুইংকেল পাশে পাশে নাচতে নাচতে এগোচ্ছিল।
ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ২১
তালুকদার মঞ্জিলের বিশাল কাঠের দরজা দিয়ে যখন আর্য তৃষাকে কোলে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল, বাড়ির সদর মহলে তখন বাতি জ্বলছে। বড় মামা মোজাম্মেল হক আর বাড়ির অন্য মেহমানরা অবাক বিস্ময়ে এই দৃশ্য অবলোকন করলেন।আর্যর মতো এক রাশভারী, কঠোর ডিসিপ্লিনড মানুষ যে এভাবে পরম মমতায় নিজের স্ত্রীকে আগলে নিয়ে আসতে পারে, তা যেন সবার কাছে এক নতুন গল্প।
গুজুর-ফুসুর হলেও খানিক উপস্থিতিদের মাঝে। তবে সেটিকে তোয়াক্কা না করেই আর্য তৃষা কে নিয়ে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমালো।
