Home হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩
সাবা খান

পুরো লিনহুয়া ভ্যালিতে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। চারদিক নিস্তব্ধ, বাতাসে এক অদ্ভুত গুমোট চাপা টান। বাইরে থেকে জায়গাটা খুবই সাধারণ একটা ছোট, পুরোনো ক্লিনিক বলেই মনে হয়। কিন্তু দরজার ধাতব ফিনিশিং, চারপাশের সিসিটিভির লুকানো কোণ, আর অস্বাভাবিক নীরবতা সব মিলিয়ে বোঝা যায়, এটা সাধারণ কিছু না। ঈশানী একবার চারপাশে তাকিয়ে ফিসফিস করে,

-“ডাইনি, আমরা এখানে কেন এসেছি?”
-“সিনেমা দেখতে…. সামনে ঢুক”
-“ঢুকতেই হবে?”
-“না ঢুকলে আইসক্রিম পাবি না”
রমণীর মুখে এমন শর্ত শুনে এসপি আর ঈশানী তার আগেই ঢুকে পড়ে। এই ছয় বছরে প্রথম বার সানা তাদের কিছু খাওয়াবে, কোনভাবেই সেটা মিস করা যাবে না। ক্লিনিকটাকে বাইরে থেকে ছোট দেখালেও ভিতরে অনেক বড়, বোঝার উপায় নেই সেটা। ভেতরে ঢুকতেই লম্বা করিডর, সাদা দেয়াল, আর অদ্ভুত ঠান্ডা পরিবেশ যেন হাসপাতাল, আবার ঠিক তেমনও না।
মিসেস দিলরুবা খানম সব সময় এখানে থাকেন না, তিনি যে কখন কোথায় থাকেন তা কেউই জানে না। সানার যখনই দেখা করার হয় তখনই সে আগে থেকে বলে রাখতে হয়। সানারা ভিতরে প্রবেশ করতে কোথা থেকে দুজন গার্ড এসে তাদের দিকে ব*ন্দুক তাক করে ফেলে যার জন্য তারা কেউ-ই তৈরি ছিল না।
মুহূর্তে তিনজনে হকচকিয়ে ওঠে। দুই রমণী সাথে সাথে চলে যায় এসপির পিছনে। সামনে থাকা গার্ড গুলোর মধ্যে একজন বলে,

-“পাসওয়ার্ড”
এসপি আর ঈশানী দুজনেই বিস্মিত স্বরে আওড়ায়,
-“পাসওয়ার্ড! কিসের পাসওয়ার্ড?”
সানা হঠাৎ কিছু একটা ভেবে বলে,
-“আরে হ্যাঁ মনে পড়েছে, এরা পাসওয়ার্ড বলা ছাড়া না ভিতরে যেতে দেবে, আর না বাহিরে, এখানেই মে*রে কাহিনি খতম করে দিবে”
রমণীর মুখ থেকে নিঃসৃত হওয়া বাক্যটুকু শ্রবণ ইন্দ্রিয় হতেই দুই পাশের দুই ব্যক্তি চমকে ওঠে,
-“কিহ, তাহলে পাসওয়ার্ড কি সেটা বল?”
-“পাসওয়ার্ড,,,আব..প..হ্যাঁ মনে পড়েছে, আমার মনে নেই”
এসপি আর ঈশানী দুজনেই জানত এর যে মনে থাকবে না। এসপি নিজের দন্ত চেপে বলে,
-“আরে যেই মেয়ে দুই মিনিট আগের কথা এক সেকেন্ড পর ভুলে যায়, সে নাকি পাসওয়ার্ড মনে রাখবে, এটা আশা করাও বিলাসিতা”
ঈশানী কাঁদো কাঁদো সুরে নিজের নখ কামড়ে বলে,

-“পাঁচ টাকার আইসক্রিম খাওয়াবি না বললেই তো হয়, এখানে এনে মে*রে ফেলার কি খুব দরকার ছিল?”
-“আরে তুই যদি বলতিস, আমরা নিজের থেকে আড়াই টাকা আড়াই টাকা দিয়ে পাঁচ টাকার আইসক্রিম খাওয়াতাম। সাথে ডিসকাউন্টেও খাওয়াতাম, লাইফ সেভিং অফার”
সানা দুজনের দিকে বিরক্তিসূচক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে জোরে বলে,
-“আরে, পাসওয়ার্ড আমার মনে নেই”
-“তোর কি মনে থাকে, শুধু রানভীরর ছাড়া, তাই না বলুন মিসেস নাগিন…..”
ব্যাস, এটুকুই যথেষ্ট ছিল ঈশানীর বিগড়ে যাওয়া মস্তিষ্ককে আরো বেশি বিগড়ে দিতে। মানে এখনো তার বিয়ে শাদি কিছুই হলো না, কিন্তু এই ছেলে তাকে সেই প্রথম দিন থেকে মিসেস মিসেস বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছে। সে এক প্রকট চিৎকার দিয়ে ওঠে,

-“মিস, মিস নাগিন”
রমণীর এমন চিৎকারে তাদের সামনে থাকা গার্ডগুলো দু-কদম পিছিয়ে গেল। তারা দুজনই একে অন্যের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছে। তারা এখানে অনেক মানুষকে আসতে দেখেছে, কিন্তু এদের মতো কাউকে দেখেনি। এদিকে এসপি নিজের বুকের বাম পাশে হাত রেখে মনে মনে ভাবছে, তার সব মনে থাকে, কিন্তু কেন যে একে ‘মিস’ বলতে হবে, সেটাই মনে থাকে না। সবই কটকটির দোষ, তার হাওয়া লেগেছে। আর কেউ কিছু বলার আগেই সানা দুজনের মাঝে দাঁড়িয়ে হাত উঁচিয়ে দিল,
-“ব্যাস, দুজনেই খামুশ, পাসওয়ার্ডটা আমার মনে নেই”
-“সেটা তো আমরাও জানি, তোর মনে নেই। তাই তো আমি ডিসাইড করছি কার হাতে গুলি খেয়ে মরবো, লেফটে নাকি রাইটে”

-“আব্বে ইয়ার, পাসওয়ার্ডটাই তো হলো ‘আমার মনে নেই’। আমার মনে থাকে না, সেজন্য রেখেছি ‘আমার মনে নেই’, যাতে আমার মনে থাকে। কিন্তু তোরা মনে হয় বুঝতে পারছিস না”
রমণী এক নিঃশ্বাসে বাক্যখানা উগরে দিয়ে দুদিকে তাকিয়ে দেখে দুজনেই কেমন তেরছা চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। ঈশানী এবার বুঝল, এই ডাইনির পাসওয়ার্ড শুনে তার হাত পা ছড়িয়ে কাঁদতে ইচ্ছা করছে। কিছু সেকেন্ডের নীরবতা, তারপর দুজনে একসাথে ফিক করে হেসে দিল। ঈশানী তার কাঁধে হাত রেখে শুধালো,
-“ডাইনি, এগুলো তোর দ্বারাই সম্ভব, কে দেয় এমন পাসওয়ার্ড”
-“ঠিক বলেছেন, মিসে……”
এসপির কণ্ঠস্বর থেকে বাকিটা বের হওয়ার আগেই ঈশানীর র*ক্তচক্ষু দেখে সে থেমে গেল। এদিকে সানা দুজনকে পাত্তা না দিয়ে ভিতরে চলে গেল। শুধুমাত্র তাকেই মিসেস খানমের সাথে দেখা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, আর কাউকে না।

-“মিসেস খানম, সাইমার সাথে আপনার কোন যোগাযোগ হয়েছে?”
সামনের ভদ্রমহিলা নিজের চশমাটা খুলে একপাশে রেখে প্রত্যুত্তর করে,
-“না”
আবারও সানা হতাশ হলো ভীষণ। রমণী সন্দেহজনিত সুরে শুধালো,
-“গত ছয় বছরেও উনার কোন যোগাযোগ নেই? আবার কিছু হয়নি তো উনার”
-“রিল্যাক্স, সানা। আমাদের এখানে দশ বছরের যোগাযোগহীনতাও থাকে। আমরা একদম কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজে কদাচিৎ যোগাযোগ করি। কেননা শত্রুদের দৃষ্টি সব সময় আমাদের পদক্ষেপে থাকে। আমাদের একটা ভুল, আর তাদের অস্ত্র”
তিনি কিছু একটা ভেবে ফের বলেন,

-“আর হ্যাঁ, তুমি বা তোমরা কোনভাবেই কারো সাথে কমিউনিকেশন করার ভুল করবে না। বা সোশাল মিডিয়ায় কানেক্ট করার। না হলে মার্কানের লোকগুলো মুহূর্তে এখানে চলে আসবে। ওদের লক্ষ্য তুমি বা তোমার ছেলে নও, ওদের লক্ষ্য জাওয়ানদের উত্তরসূরির দিকে। আমি কিন্তু তোমার সম্পূর্ণ ডাটা মুছে দিয়েছি”
-“আচ্ছা, এই মার্কানটা কে?”
-“এটা একমাত্র সাইয়েদা-ই জানে। এখানে অনেকগুলো রুলস আছে। আমরা আমাদের পাওয়া তথ্যগুলোও কাউকে বলি না”
-“ওনি কি একজন ডক্টর নন?”
-“হ্যাঁ, পৃথিবীর জন্য ডক্টর, কিন্তু সাথে ও একজন এজেন্ট। আর ওকে জায়ফেরা থেকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে মার্কানকে বের করার জন্য। সাইয়েদার থেকে কোন ইনফরমেশন না আসা পর্যন্ত তুমি কোন ভাবেই এখন কারো সাথে যোগাযোগ করবে না”
সানা মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বুঝায়, তারপর একটা শুকনো ঢোক গিলে মিনমিন করে বলে,

-“আর র…রান..রানভীর….”
রমণীর এমন সংকোচ দেখে তিনি হেসে দিলেন,
-“আরজে ঠিক আছে। তুমি কি ওর কাছে ফিরে যেতে চাও?”
ভদ্রমহিলার প্রশ্নের বিপরীতে মানবীর তরফ থেকে কোনরকম প্রতুত্তর এলো না। বরং সে নিচের দিকে তাকিয়ে টেবিলে আঙুল দিয়ে আঁকিবুঁকি করতে লাগলো। মৌনতা যে সম্মতির লক্ষণ, তিনি সেটা বুঝে ফের বলেন,
-“আমি একশ বার বলবো, তুমি স্ত্রী হিসেবে ওর সাথে অন্যায় করেছ। কিন্তু মা হিসেবে তুমি একদম ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছো। কোন মা চাইবে না তার সন্তান র*ক্তের খেলায় মেতে উঠুক, একটা দা*নবে পরিণত হোক”
বিপরীতে রমণীর ঠোঁটের কোণে এক টুকরো হাসি ফুটে ওঠে, বঝা গেল না সেটা কিসের। নিজের ধরা গলায় আওড়ায়,

-“আমি স্ত্রী হলে কখনো ওকে ছেড়ে আসতাম না। হয়তো ওর সাথে নিজেই অন্ধকারে ডুবে যেতাম। কিন্তু মা বলেই সবটা ছেড়ে আসতে হলো। যেখানে প্রতিটা সেকেন্ড কেউ না কেউ আমার সন্তানকে মারতে চাইবে, সেখানে আমি সবটা জেনে কিভাবে থাকবো। আর মিসেস সোফিয়া তো ডিরেক্ট আমাকে বলে দিয়েছে, বাচ্চাটা জন্ম হলে আমার হবে না ওনার হবে”
কথাগুলো বলতে গিয়ে অজান্তে রমণীর চোখ দিয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে। সে সেটাকে তড়িঘড়ি করে মুছে কথা পাল্টানোর জন্য বলে,
-“আচ্চা, আপনার হাজব্যান্ড কোথায়? ওনাকে কখনো……”
-“ভালোবাসার মানুষগুলো সবসময় হয় ছেড়ে চলে যায়, নয়তো তোমার মতো ছেড়ে আসতে বাধ্য হয়”
থমকে গেল সানা, সে এমন কোন বাক্য আশা করেনি। সামনের ভদ্রমহিলা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন,
-“আজ পর্যন্ত আমি কাউকে নিজের সত্যিটা বলিনি। কিন্তু আজ কেন জানি তোমাকে বলতে ইচ্ছে করছে। আমি কিন্তু হিন্দুস্তানী, আমার হাজব্যান্ড ছিলেন একজন ইন্ডিয়ান আর্মি অফিসার। আমাদের বিয়ের এক সপ্তাহের মাথায় আমার হাজব্যান্ডের কফিন আনা হয় আমার সামনে। একটা টেরোরিস্ট হামলায় সে মারা যায়, তারপর থেকে তার এই সিক্রেট এজেন্সি আমি সামলাই, যার লক্ষ্য আন্ডারগ্রাউন্ডে কাজ করে টেরোরিস্টদের উৎখাত করা”
পুরো কক্ষে নিস্তব্ধতা নেমে এলো। কারো মুখ থেকে আর কোন শব্দ বের হলো না। সানা ধীরে উঠে বাইরে চলে গেল।

নিশুতি নিস্তব্ধ রাত, চারদিক যেন স্তব্ধ হয়ে আছে কোনো অদৃশ্য নির্দেশে। দূরের ঝোপঝাড়গুলো হালকা বাতাসে কাঁপছে, কিন্তু সেই শব্দও যেন এই গভীর নীরবতাকে ভাঙতে সাহস পাচ্ছে না। আকাশটা অদ্ভুত ভাবে পরিষ্কার, অসংখ্য তারা জ্বলছে, যেন প্রত্যেকটা এক একটা নীরব সাক্ষী, এই নিঃসঙ্গ পৃথিবীর।
আশ্রমের পুরোনো ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে রাজস্থানী রমণী। সাদা দেয়ালের ছায়া তার গায়ের উপর পড়ে তাকে আরও ফ্যাকাশে করে তুলেছে। তার চোখ আকাশের দিকে, কিন্তু দৃষ্টি যেন তারার ওপারে, কোথাও অনেক দূরে, যেখানে হয়তো তার হারিয়ে যাওয়া জীবনটা এখনো পড়ে আছে।
ছয় বছর, পুরো ছয়টা বছর কেটে গেছে এখানে। এই দেয়ালের ভেতরে, এই বন্দি নীরবতার মধ্যে। জ্যাক তাকে এখানে রেখে গিয়েছিল কোনো প্রতিশ্রুতি ছাড়া, কোনো ব্যাখ্যা ছাড়া, শুধু রেখে গিয়েছিল। আর তারপর মাঝে মাঝে এসেছে, খুব কম। হাতেগোনা কয়েকবার। যখন তার প্রয়োজন হয়েছে, শুধু তখনই। ইবেলিনার ঠোঁটে এক চিলতে নিষ্প্রাণ হাসি ফুটে ওঠে,

-“প্রয়োজন…”
শব্দটা মনে মনে উচ্চারণ করে সে। তার জীবনটা কি তবে শুধু কারও প্রয়োজনের মধ্যে আটকে আছে? তার চোখ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে আসে। মনে পড়ে সেই রাত, সেই গাড়ি, সেই অন্ধকার পথ আর তারপর এই আশ্রম। তারমধ্যে তিন বছর আগে যন্ত্রমানব তাকে সারা জীবনের জন্য এখানে আটকে দিয়েছে। প্রথমদিকে সে কেঁদেছিল, লড়েছিল, পালাতে চেয়েছিল। তারপর ধীরে ধীরে সব থেমে গেছে। মানুষ সবকিছুতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, এমনকি বন্দিত্বেও।
ঠিক তখনই হঠাৎ পিছন থেকে দুটো শক্ত পুরুষালি হাত এসে তার কোমর জড়িয়ে ধরে।ইবেলিনার শরীর এক ঝটকায় কেঁপে ওঠে। কোনো সতর্কতা নেই, কোনো শব্দ নেই শুধু হঠাৎ করে তার ঘাড়ের কাছে উষ্ণ নিঃশ্বাসের স্পর্শ। তারপর একের পর এক অগণিত চুম্বন। অস্থির, অধৈর্য, যেন দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পাওয়া কোনো অধিকার।
ইবেলিনার চোখ বন্ধ হয়ে আসে। তার বুক দ্রুত ওঠানামা করছে। শরীরের প্রতিটা স্নায়ু যেন সেই অবাধ্য স্পর্শে জেগে উঠছে, কাঁপছে, সাড়া দিচ্ছে, অথচ ভিতরে কোথাও একটা শীতলতা রয়ে গেছে।রমণীর পিঠ ঠেকে যায় মানবের বুকে, যেখান থেকে সে স্পষ্ট হৃদস্পন্দন শুনতে পাচ্ছে। বিপরীত পাশের মানবের শ্বাস ভারী। যেন সে দৌড়ে এসেছে বহু দূর থেকে, বহুদিনের জমে থাকা তাড়না নিয়ে। তার আঙুলগুলো শক্ত করে চেপে ধরে আছে। ইবেলিনা প্রথমেই বুঝতে পেরেছে এটা কে? তাই সে কিছু বলে না, না বাধা দেয়, না সাড়া দেয়। শুধু দাঁড়িয়ে আছে একটা নিঃশব্দ স্বীকারোক্তির মতো। হঠাৎ সেই স্পর্শ থামে না, বরং আরও কাছে টেনে নেয় তাকে। তারপর মানব ধীরে ধীরে তার কানের কাছে ঝুঁকে এসে পুরুষালী হাস্কিস্বরে আওড়ায়,

-“মোরনি.. জান..”
শব্দটা যেন ইবেলিনার বুকের ভেতর কোথাও গিয়ে আঘাত করে। ছয় বছর পরেও একই সম্বোধন, একই অধিকার। ইবেলিনা ধীরে ধীরে চোখ খোলে বলে, ,
-“ছয় বছর পরও কিছুই বদলায়নি, তাই না?”
জ্যাকের হাত এখনও তার কোমরে। হাতের বাঁধন আরও শক্ত হয়ে আসে। সে একটু হেসে ঠান্ডা স্বরে আওড়ায়,
-“সবকিছু বদলেছে, লিনা….”
শুধু তুমি… আর আমার তোমাকে চাওয়াটা বদলায়নি”
ইবেলিনা ধীরে ধীরে তার হাতের বাঁধন থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে। মানবের উপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
-“চাওয়াটা? এটাকে চাওয়া বলে না, এটাকে বন্দিত্ব বলে”
এক মুহূর্তের জন্য নীরবতা নেমে আসে। দূরে কোথাও একটা পাখি ডেকে ওঠে আবার থেমে যায়। জ্যাক তার দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চোখে সেই আগের আ*গুন নেই আছে আরও গভীর কিছু, অভ্যাস, অধিকার আর এক অদ্ভুত আসক্তি। তারপর ধীরে বলে,

-“হয়তো”
এই বলে তার অনুমতির তোয়াক্কা না করে তাকে একটানে কোলে নিয়ে ভেতরের দিকে চলে গেল। ইবেলিনা টু শব্দটিও করল না। কিভাবে করবে এখন যে যন্ত্রমানব তার স্বামী। আরো তিন বছর আগে তার বাবার মারা যাওয়ার দিনেই জ্যাক তাকে বিয়ে করেছে আশ্রমের সবার সামনে। কিন্তু আজ পর্যন্ত সে স্ত্রী হয়েও জ্যাককে এক ফোঁটাও বুঝতে পারল না। কিভাবে বুঝবে
“যন্ত্রমানব যে মরীচিকার মতো”
সে এখন পর্যন্ত না তাকে ঘৃণা করতে পারছে, আর না ঠিকভাবে ভালোবাসতে পারছে। কোথাও না কোথাও গিয়ে তার মনটা সায় দেয় না, আবার তাকে ভুলতেও দিচ্ছে না। আর যন্ত্রমানব সে তো কোনদিনও তার মনের খবরই রাখেনি। ধীরে মাথাটা এলিয়ে দিল স্বামীর বক্ষস্থলে।

রাতের ‘ভীর নিবাস’ অদ্ভুতভাবে নীরব। সবাই সবার কক্ষে চলে গিয়েছে। বাইরে হালকা বাতাসে জানালার পর্দা দুলছে, দূরে কোথাও কুকুরের ডাক ভেসে আসছে মাঝেমধ্যে। ঘরের ভেতর শুধু টেবিল ল্যাম্পের নরম হলুদ আলো, সেই আলোতেই বসে আছে সানা।
তার সামনে পুরো বিছানা জুড়ে ছড়ানো স্কেচবুক, রঙ, পেন্সিল। হাত দ্রুত চলছে, কিন্তু মনটা যেন কোথাও অন্যত্র আটকে আছে। মাঝে মাঝে সে থেমে যাচ্ছে, একটু তাকিয়ে থাকছে ফাঁকা জায়গায়, তারপর আবার আঁকতে শুরু করছে।
ঠিক তখনই ধীরে ধীরে দরজাটা কিঞ্চিৎ শব্দ করে খুলে যায়। ছোট ছোট পায়ের শব্দের সাথে তার কানে আসে,

-“মম…”
সানা মাথা তুলে তাকায় নজরে আসে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে আরভি, হাতে একটা ছোট্ট চকলেটের র‍্যাপার, চোখে ঝিলমিল উত্তেজনা। সানার ঠোঁটে অজান্তেই হাসি ফুটে ওঠে। সে হাত বাড়িয়ে ইশারা করে,
-“এদিকে আসো, মমের কাছে…”
আরভি এক দৌড়ে এসে তার কাছে দাঁড়ায়।সানা তাকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে টপাটপ করে তার শুভ্র গালে কয়েকটা চুমু খেয়ে বসে, উৎফুল্ল চিত্তে বলে,
-“উফফ, আমার সোনাটা এত কিউট কেন, হুম?”
আরভি একটু মুখ কুঁচকে নিয়ে মুচকি হেসে বলে,

-“মম… থামো…”
সানা হেসে তার চুলগুলো এলোমেলো করে দেয়।আরভি এসে তার পাশেই বসে পড়ে, পা দুলাতে দুলাতে এক নিঃশ্বাসে বলতে শুরু করে,
-“জানো মম, আজকে বড় পাপা আমাকে এতগুলো চকলেট কিনে দিয়েছে। এই যে দেখো…”
সে সানাকে র‍্যাপারটা দেখায়,
-“আর শুধু চকলেট না, ওই যে গাড়িটা, ছোট্ট একটা সেটাও দিয়েছে। আর ঈশা আন্না আমাকে আজকে নতুন ম্যাথ শিখিয়েছে। আমি সব গুলো পেরেছি”
-“মাশাআল্লাহ”
-“আর… আর…”
ছোট আরভি থামে না, একটার পর একটা বলে যাচ্ছে। এটা তার একপ্রকার অভ্যাস, সারাদিন যা যা হবে সব মাকে বলবে। অন্য দিকে সানা কিছু বলছে না, শুধু গালে হাত দিয়ে নিজের ছেলের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার চোখ ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসে। মনে হচ্ছে, সে আরভিকে দেখছে না, সে যেন অন্য কাউকে দেখছে। ঠিক সেই একই চোখ, একই হাসি। আরভি যখন হেসে ওঠে তখন তার গালে যে ছোট্ট টোলটা পড়ে,
সানার বুকটা হালকা কেঁপে ওঠে। এই টোলটা,

এই টোলটা ঠিক তার বাবার মতো। একসময় এই টোল নিয়েই সে আরজের সাথে ঝগড়া করত,
-“আমি মেয়ে হয়েও আমার টোল পড়ে না, আর আপনার পড়ে কেন?”
আরজে তার প্রত্যুত্তর না করে শুধু নিষ্প্রভ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত। এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছে কীভাবে থাকবে। সোফিয়া পাকিস্তানি হওয়ার দরুন আরজে অনেকটা তার মতো হয়েছে, আর আরভিও। একটা হালকা নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে তার ভেতর থেকে।
হঠাৎ তার ভ্রম ছুটিয়ে কানে আসে আরভির আওয়াজ,
-“মম…”
আরভির ডাকে সে বাস্তবে ফিরে আসে,
-“হুম?”
-“আমরা ড্যাডের সাথে কবে দেখা করব?”

এক মুহূর্তে সময় থেমে যায় যেন। সানার হাত স্থির হয়ে যায়। সে এইরকম একটা প্রশ্ন মোটেও আশা করেনি। তার চোখের ভেতরের আলোটা কেমন নিভে আসে। সে কিছু বলতে গিয়েও শব্দ গুলো কেমন বের হতে চাইছে না। গলা শুকিয়ে আসে তার। সে কি বলবে?
কি বলবে এই ছোট্ট মানুষটাকে?
যে মানুষটার জন্য সে প্রতিদিন অপেক্ষা করে, সেই মানুষটা জানেই না তার অস্তিত্ব সম্পর্কে। হ্যাঁ, আরজেতো জানে না তার ছোট অংশটা বেঁচে আছে। সানা ধীরে ধীরে আরভিকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে তার বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে। এক হাত দিয়ে তার মাথায় আলতো করে হাত বুলাতে থাকে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে তারপর খুব আস্তে, প্রায় ফিসফিস করে বলে,

-“শীঘ্রই… বাবা…”
এই একটা শব্দ কিন্তু তার ভেতরে কতটা ভাঙা প্রতিশ্রুতি, কতটা লুকানো কান্না তা কেউ জানে না।ছোট আরভি কিছু বুঝে না, সে শুধু মায়ের গায়ের উষ্ণতায় নিজেকে গুটিয়ে নেয়,
-“প্রমিস….”
সানা চোখ বন্ধ করে আওড়ায়,
-“হুম… প্রমিস…”
রমণীর কণ্ঠ কেঁপে ওঠে সামান্য। আরভি ফের জিজ্ঞেস করে,
-“ড্যাড কি আমার মতো দেখতে?”
-“তুমি তো তার কপি…”
আরভির চোখ বড় করে বলে,
-“তাই নাকি?”
-“হুম… একদম, তোমাকে ছবি দেখিয়েছি না মম?”
-“হুম”

তারপর আরভি নিজের মতো আবারও এটা সেটা বলতে থাকে। ধীরে ধীরে তার কথাগুলো থেমে আসে। আরভির চোখ বুজে আসে। সে সানার কোলেই আধো ঘুমে ঢলে পড়ে।।সানা একটু নড়ে তাকে আস্তে করে বিছানায় শুইয়ে দেয়। তার উপর কম্ফর্টারটা টেনে দিয়ে মাথার পাশে বালিশ ঠিক করে দেয়।।তারপর কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে থাকে, চোখ সরায় না। তার ছোট্ট বুক ওঠানামা করছে শান্ত, নিশ্চিন্ত। সানার চোখ ভিজে ওঠে ধীরে ধীরে।এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে, সে হাত দিয়ে তড়িঘড়ি করে মুছে ফিসফিস করে,
-“তোমার কোনো কষ্ট হতে দিব না, কখনো না। আর না কখনো তোমার হাতে র*ক্ত লাগতে দিব”
তারপর ধীরে উঠে দাঁড়ায়। চেয়ারে গিয়ে আবারও বসে পড়ে। স্কেচবুকটা সামনে টেনে নেয়, পেন্সিল তুলে নেয় হাতে। কিন্তু হাতটা কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে থাকে। তারপর আবার আঁকা শুরু করে। কিন্তু এবার তার মনের কোণে বারবার পুরোনো স্মৃতি গুলো ফিরে আসছে।

গভীর রাতে পুরো ব্ল্যাক স্পেস যেন নিঃশ্বাস বন্ধ করে আছে। সেই নিষিদ্ধ রুমটা যেখানে কখনো কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি আজ সেখানে আলো জ্বলছে। সানা যাওয়ার পর এই রুমটা খোলাই থাকে। কেননা এখানে কেউ থাকে না, আর না কেউ আসে। একসময় যেই ব্ল্যাক স্পেস সানার হাসির ঝংকারে ভরে ওঠত, আজ সেটাকে কেউ দেখলে বলবে কোন ভুতুড়ে বাড়ি। এখানে একমাত্র একজনই আসে।

কক্ষের চারদিকে দেয়ালজুড়ে শুধু সানার ছবি, ছোটবেলা, কিশোরী, বড় হওয়া প্রতিটা মুহূর্ত যেন বন্দি হয়ে আছে ফ্রেমের ভেতর। একপাশের একটা কাচের জারে একটা চকলেট রাখা, বেশ পুরোনো। দেখে মনে হচ্ছে ভিতরের চকলেট টা কবেই নষ্ট হয়ে গিয়েছে, যেন খোসাটাকে যত্ন করে রাখা হয়েছে। হবে না কেন নষ্ট? এটা সেই ছোট সানা আরজেকে দিয়েছিল তাদের বাড়িতে যাওয়াতে। সানা প্রথমে তার বাবার আনা এক বক্স চকলেটের থেকে আরজেকে চারটা দিয়েছিল, তাও তার বাবা বলাতে। আরজে সেগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। সোফিয়া তাকে কখনো চকলেট খেতে দেয়নি, এগুলো নাকি বাচ্চাদের খাবার আর সে বাচ্চা না, সে দানব। সে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই ছোট সানা কোথা থেকে এসে খপ করে আবারও চকলেট গুলো নিয়ে নিল তার বাবা যাওয়ার পিছন দিক দিয়ে। কিন্তু দৌড় দেওয়ার আগেই একটা নিচে পড়ে যায় আর সেটাই এখানে।
রুমের মাঝখানে বড় একটা কালো সোফা। সেখানে হেলান দিয়ে বসে আছে আরজে। সামনের টিটেবিলটা যেন একটা ধ্বংসস্তূপ, কেননা তার উপরে নামিদামি ওয়াইনের বোতল, কিছু খোলা, কিছু অর্ধেক ফাঁকা, কিছু উল্টে পড়ে আছে, ড্রাগসের প্যাকেট ছড়িয়ে ছিটিয়ে, সিগারেটের অসংখ্য জ্বলা অংশ অ্যাশট্রে উপচে পড়ে টেবিল জুড়ে ছড়িয়ে গেছে। সোফায় বসা আরজের চোখ দুটো লাল, শুধু লাল না র*ক্তবর্ণ হয়ে আছে। তার চুল এলোমেলো, শার্টের বোতাম খোলা কিন্তু তার দৃষ্টি স্থির, সোজা সামনে দেয়ালে ঝোলানো একটা বড় ছবির দিকে,

“সানা”
সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ভ্রুক্ষেপহীন। একদম না পলক ফেলে। তার হাতে একটা ওয়াইনের বোতল। আরজে ধীরে সেটা ঠোঁটে তোলে এক ঢোকে অর্ধেক সাবাড় করে ফেলে। কিন্তু কোনো পরিবর্তন নেই, না তার চোখে, না তার মনে। সে আবার টেবিল থেকে ড্রাগস তুলে নেয়, কাঁপা হাতে। নিজেকে ভাসিয়ে দিতে চায় কিন্তু পারছে না। তার বুকের ভেতরটা জ্বলে যাচ্ছে, কিন্তু নেশা ধরছে না। হঠাৎ সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। কর্কশ গলায় আওড়ায়,
-“ওহ গ্রেট আরজে, এত কিছু নিয়েও কাজ হচ্ছে না?”
সে মাথা পেছনে হেলিয়ে চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড থাকে, তারপর আবার চোখ খুলে তাকায় সানার ছবির দিকে। ঠোঁট নাড়িয়ে বলে,
-“তুমি আমাকে কি বানিয়ে দিয়ে গেছো, হ্যাঁ?”
বিপরীতে কোনো উত্তর নেই, শুধু নিঃশব্দ দেয়াল। সে ধীরে উঠে বসে সামনে ঝুঁকে বোতলটা শক্ত করে ধরে,
-“আমি ভেবেছিলাম, তোমার জন্য সব ছাড়বো…এই নেশা, এই ড্রাগস, এই অন্ধকার, সব”
সে হেসে ওঠে আবারও,

-“আর তুমি? তুমি তো আমাকে ছেড়ে চলে গেলে”
আরজে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে তারপর হঠাৎ সে বোতলটা সজোরে ছুঁড়ে মারে ছবিটার দিকে। কাঁচ ভেঙে ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে, লাল ওয়াইন ছিটকে গিয়ে পুরো ছবিটা ভিজিয়ে দেয়। মনে হয় র*ক্ত। আরজে স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকে সেই দৃশ্যের দিকে। তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে ওঠে। সে ধীরে বলে,
-“ওয়াও…পারফেক্ট…”
সে উঠে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে ছবিটার দিকে এগিয়ে যায়,
-“তুমি এমন এক ছলনাময়ী, যে কাছে থেকেও পোড়াতে জানে, আর দূরে গিয়েও আ*গুন লাগিয়ে রাখে”
সে একটু ঝুঁকে আসে, দৃষ্টি সরাসরি সানার চোখের সাথে মিশে যায় ছবির ভেতর। চোয়াল শক্ত করে বলে,
-“কি সুন্দর অভিনয় ছিল তোমার, একটা মুহূর্তের জন্যও বুঝতে দেওনি।
আমি… আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম”
সে নিজের বুকের দিকে আঙুল ঠুকে বলে,

-“এই আমি ‘আরজে’ কারো উপর বিশ্বাস করি না। কিন্তু তোমার উপর করেছিলাম।
আর তুমি সেই বিশ্বাসটাই চূর্ণ করে দিয়েছো।
তুমি জান, আমি তোমার জন্য কি কি করেছি?
কতটা বদলেছি? কতটা নিজেকে থামিয়েছি?
আমি নিজের দানবটাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছিলাম, শুধু তোমার জন্য”
সে মাথা কাত করে ছবিটার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে,
-“আর তুমি সেই শিকলটাই খুলে দিলে,
এখন জানো কি হয়েছে? ওটা… আবার জেগে উঠেছে। আর এবার ওকে থামানোর কেউ নেই”
সে ধীরে হাত বাড়িয়ে ছবিটার উপর ছড়িয়ে থাকা লাল ওয়াইন আঙুল দিয়ে মুছতে থাকে। আঙুল লাল হয়ে যায়। সে তাকিয়ে থাকে সেই লাল আঙুলের দিকে, তারপর আবার ছবির দিকে। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে আবার সেই ভয়ংকর হাসি,

-“দেখছো, কেমন লাগছে? ফিটস ইউ।
এবার খেলাটা অন্যরকম হবে, ওয়াইফি,
এবার আমি ভালোবাসা দিয়ে না, ঘৃণা দিয়ে খুঁজবো তোমাকে। এবার কোনো দয়া থাকবে না, কোনো ছাড় থাকবে না”
শব্দ গুলো উচ্চারণ করেই সে থামে। তারপর আবারও হাত তুলে ছবিটার উপর বয়ে যাওয়া ওয়াইন মুছে দেয়, নরমভাবে একদম বিপরীত তার কথার থেকে। সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে, নিঃশব্দে।

ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আজ যেন অন্য এক রূপে জেগে উঠেছে। চারদিক উত্তাল, মানুষের ভিড়, চিৎকার, ব্যানার, মোবাইলের ক্যামেরার ফ্ল্যাশ সবকিছু মিলিয়ে এক বিশৃঙ্খল উন্মাদনা। সবার কণ্ঠে ভেসে আসছে,
-“আরজে, আরজে”
-“একবার তাকান”
-“লাভ ইউ আরজে”
গত রাতের সেই ভয়ংকর ঘটনার পরও কেউ তাকে ঘৃণা করছে না। বরং আরও বেশি পাগল হয়ে গেছে সবাই। যেন তার সেই অন্ধকার দিকটাই মানুষকে আরও টানছে। সিকিউরিটি প্রায় হিমশিম খাচ্ছে গার্ডরা ব্যারিকেড করে রেখেছে, তবুও ভিড় থামছে না।

কিন্তু এই ফ্ল্যাশ, চিৎকার, উন্মাদনা সবকিছুর দিকে আরজে? সে একবারও কারো দিকে তাকায় না। তার মুখ একদম নিরাবেগ, চোখ দুটো ঠান্ডা, শূন্য। যেন এইসব কিছুই তার কাছে অর্থহীন। গার্ডরা দ্রুত তাকে ঘিরে ফেলে একটা সরু পথ তৈরি করে। সে সেই পথ ধরে সোজা এয়ারপোর্টের ভিতরে ঢুকে পড়ে।
কয়েক মিনিট পর রানওয়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছে তার প্রাইভেট জেট। আরজে কোনো দিকে না তাকিয়ে সরাসরি উঠে যায় জেটের ভেতরে। তার পেছনে কাইলিন, জ্যাক ইন্ডিয়া থেকেই চায়নাতে যাবে। আরজের পিছনে পুরো শুটিং টিম আসে, সাথে ডিরেক্টর আকাশ বিল্লাহ। তাদের জন্য আলাদা ফ্লাইট।
ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ হওয়ার সাথে সাথেই বাইরের সব শব্দ থেমে যায়। শুধু হালকা ইঞ্জিনের শব্দ। আরজে গিয়ে সিটে বসে পড়ে মাথা হেলিয়ে দেয় পেছনে। চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড থাকে। তারপর ধীরে চোখ খোলে সামনের মানবের দিকে তাকিয়ে আদেশ ছুঁড়ে,

-“বলো”
কাইলিন সামান্য গলা পরিষ্কার করে বলে,
-“বস… আমরা অবশেষে ট্রেস করতে পেরেছি”
আরজের দৃষ্টি উঠে আসে তার দিকে। কাইলিন তার দৃষ্টি বুঝে বলে,
-“মিসেস দিলরুবা খানমের, উনি খুব বড় খেলোয়াড়। এক জায়গায় থাকেন না, নাম, পরিচয়, লোকেশন, সব বদলায়।ইন্টারন্যাশনাল লেভেলের অপারেশন চালান।
অনেক দিন ধরে আন্ডারগ্রাউন্ডে কাজ করছেন”
আরজে তাকে থামিয়ে বলে,

-“লোকেশন?”
-“বস, চায়না, লিনহুয়া ভ্যালি গ্রামে”
আরজের মনে সন্দেহ গাড়ো হয়ে ওঠে, সে ধীরে বলে,
-“কোথাও আমার পাখিটা ওখানেই নয়তো?”
কাইলিন এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে বলতে থাকে,
-“বস… সম্ভাবনা খুব বেশি। কেননা চায়না এমন একটা দেশ যেখানে সহজে কাউকে ট্রেস করা যায় না। বিশেষ করে রিমোট এরিয়া গুলো…ওই লিনহুয়া ভ্যালি মতো জায়গায় ইন্টারনেট দুর্বল, নজরদারি কম, লোকাল আইডেন্টিটি নিয়ে থাকা খুব সহজ। আর মিসেস দিলরুবা খানমের মতো কেউ যদি জড়িত থাকে তো…..”
সে একটু থেমে ফের বলে,

-“তাহলে কাউকে লুকিয়ে রাখা তার জন্য কোনো ব্যাপারই না”
আরজের আঙুল ধীরে ধীরে সিটের হাতলে টোকা দেয়। কাইলিন আবার বলে,
-“আর একটা ব্যাপার বস, ওই ভ্যালিটা বাইরে থেকে যতটা শান্ত লাগে ভেতরে ততটাই জটিল। বহুদিন ধরে কিছু আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্ক ওখানে সক্রিয়, স্মাগলিং, ফেক আইডেন্টিটি, হিউম্যান ট্রানজিট সব কিছুই সম্ভব। তাই যদি ম্যামকে কোথাও লুকিয়ে রাখা হয়…..”
হঠাৎ তার কণ্ঠস্বর নিচু হয়ে আসে,
-“ওটা পারফেক্ট জায়গা”
কিছুক্ষণ আর কোনো শব্দ হলো না। তারপর
আরজের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা রহস্যময় হাসি ফুটে ওঠে, অন্ধকারে ডুবে থাকা হাসি। সে মাথাটা সিটে এলিয়ে দিয়ে
চোখ বন্ধ করে ফেলে। কয়েক সেকেন্ড তারপর ফিসফিস করে বলে,

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২

-“লিনহুয়া ভ্যালি…
এবারের হিসাবটা খুব কঠিন হতে যাচ্ছে,
‘মাই লাভ’

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪