হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫
সাবা খান
রাতটা তখন ধীরে ধীরে গভীরতার দিকে ঝুঁকছে। চায়নার সেই আধা আধুনিক ছোট শহরের লোকাল এলাকায় আলো ঝলমল করছে এক পুরনো কিন্তু বেশ জনপ্রিয় রেস্টুরেন্ট
“জিনহুয়া লণ্ঠন হাউস”
বাইরে ঝুলে থাকা লাল লণ্ঠনগুলো হালকা বাতাসে দুলছে। কাঠের দরজা, কাঁচের জানালা, আর ভেতর থেকে ভেসে আসা গরম স্যুপ আর মসলার ঘ্রাণ পুরো পরিবেশটাকে আরও জীবন্ত করে তুলেছে।
এই রেস্টুরেন্টের ভিতরে ভিড়ের মধ্যেই এক কোণের টেবিলে বসেছে সানা, এসপি, ঈশানী আর অফিসের বাকি সবাই। আজ যেন সবার মুখেই আলাদা এক উচ্ছ্বাস। এসপি চামচ হাতে নিয়ে ফিসফিস করে বলে,
-“কটকটি, মিশন কত প্লেট?”
সানা তাকে কিয়ৎকাল তেড়চা চোখে দেখল, তার ইচ্ছা করছে দুপাশের দুটোকে থাবাং মার্কা দুটো থাপ্পড় লাগাতে। কখন থেকে শুধু তাকে খোঁচাখোঁচি করেই চলছে। অফিসের স্টাফরা না থাকলে অবশ্যই লাগিয়ে দিত। তাই নিজের নাক কুঁচকে বলে,
-“এমন মনে হচ্ছে, আমি একাই খাব আর তোরা বসে থাকবি, আর কানের কাছে আরেক বার প্যাচপ্যাচ করলে কানের নিচে এমন বাজান বাজাবো”
ঈশানী মাত্র নিজের মুখ খুলছিল কিছু বলার জন্য কিন্তু তার আগেই সানার মুখে এমন হুমকি শুনে আবারও নিজের মুখ বন্ধ করে নিল, এই ডাইনির সাথে তার বিশ্বাস নেই দেখা গেল সত্যি সত্যি সবার সামনে থাপ্পড় মেরে বসে থাকল। খাওয়া চলতে থাকে, হাসি-ঠাট্টা, গল্প সব মিলিয়ে একটা হালকা, স্বাভাবিক, শান্ত মুহূর্ত।
খাওয়া প্রায় শেষের দিকে, এসপি হঠাৎ উঠে দাঁড়ায়,
-“আমি একটু ওয়াশরুম থেকে আসছি”
সানা হাত নাড়িয়ে হ্যাঁ বুঝায়। এসপি চলে যায়।
সে কিয়ৎকাল পর ফিরে আসে কিন্তু টেবিলের কাছে এসে থেমে যায়। তার চোখ একবার টেবিলের দিকে, তারপর চারদিকে লক্ষ্য করল, চেয়ারগুলো ফাঁকা। কেউ নেই, না অফিসের কেউ, আর না সানা ঈশানী। সে তড়িঘড়ি করে গলা ফাটিয়ে ডেকে ওঠে,
-“সানা?”
-“মিসেস সরি মিস ঈশানী?”
বিপরীতে কোনো সাড়া নেই, শুধুই নিস্তব্ধতা। তার ভ্রু কুঁচকে যায়। হ্যাঁ তার ওয়াশরুমে একটু লেট হয়েছে কিন্তু এরা তো তাকে ফেলে যাবে না,
-“এইতো ছিল…, কোথায় গেল এরা?”
সে চারদিকে তাকায়, কিন্তু কোথাও দেখা যায় না তাদের, অফিসের অন্যরাও নেই। এক মুহূর্তেই তার ভেতরে অদ্ভুত একটা অস্বস্তি কাজ করতে শুরু করে। হাসির জায়গায় একটা চাপা ভয় এসে বসে। রাত হয়েছে বেশ, তারউপর এটা শহরের সাইড না হওয়াতে রাতের বেলা অপরাধ প্রবণতা বেশি। সে নিচু স্বরে বলে,
-“এরা গেল কোথায়?”
তার বুকের ভেতরটা ধকধক করতে শুরু করে। সে দ্রুত রেস্টুরেন্টের ভেতরটা স্ক্যান করে, প্রতিটা টেবিল, প্রতিটা কোণা, কোথাও নেই। এসপি তাড়াতাড়ি দরজার দিকে এগিয়ে যায়। দরজা ঠেলে বাইরে বের হতেই নজরে আসে বাইরের রাস্তা তুলনামূলক ফাঁকা। দূরে কয়েকটা দোকানের আলো জ্বলছে, আর হালকা বাতাসে লণ্ঠনগুলো দুলছে। এসপি চারদিকে তাকায়। তার কণ্ঠে এবার স্পষ্ট উৎকণ্ঠা,
-“সানা…..পেস্ট্রি….
-“ঈশানী…..”
বিপক্ষে কোনো উত্তর নেই। তার চোখে দুশ্চিন্তা আরও ঘন হয়ে ওঠে,
-“এই রাতে… কোথায় গেল ওরা?”
তার শ্বাস একটু দ্রুত হয়ে আসে, মনের কোণে অসম্ভব ভাবনারা উঁকি দিচ্ছে,
কিছু একটা ঠিক নেই। একটা অজানা অস্বস্তি তাকে আঁকড়ে ধরে। সে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে সামনে এগিয়ে যায়, ওদের খুঁজতে।
এসপি একটু দ্রুত পা চালিয়ে সামনে এগিয়ে যায়। রেস্টুরেন্টের আলো পেছনে ফেলে একটু অন্ধকার দিকে যেতেই হঠাৎ তার চোখ পড়ে রাস্তার এক পাশে। সে থমকে দাঁড়ায়, নজরে আসে,
সানা আর ঈশানী দুজনেই একটা ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে, না, ঠিক দাঁড়িয়ে না হেলে দুলে আছে। এসপি চোখ কুঁচকে তাকায়। আর একটু কাছে যেতেই তার মাথায় যেন বাজ পড়ে। সে ফিসফিস করে বলে,
-“আব্বে ইয়ার, এরা তো মাতাল,
এদের দুজনকে কে খাইয়েছে ওসব? এরা তো এগুলো নিজের ইচ্ছেতে খাওয়ার মেয়ে না, তাহলে!”
এদিকে সানা দুই হাত ছড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলছে,
-“এই আকাশটা… এই আকাশটা দেখছিস… কত্তো সুন্দর… পুরোটা… কিন্তু আমার, আকাশটা আমার”
পাশে ঈশানী দাঁড়াতে পারছে না তারপরও সানার আঙ্গুলের দিক অনুযায়ী উপরে তাকিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানায়,
-“না, না, নাহ, আকাশের ঐ দিক টা আমার…”
ঈশানী বলতে দেরি সানা একটা ‘ধাম’ করে লাগাতে দেরি হয়নি। ঈশানী নিজের ব্যথা পাওয়া জায়গায় হাত দিয়ে বাচ্চাদের মতো ঠোঁট উল্টে কেঁদে দিল,
-“আমাকে মারলি কেন?”
-“যে আমার আকাশের দিকে চোখ দিবে আমার আরভি তার আকাশে হিসু করে দিবে”
-“আমি আরজে কে বলব, তুই আমায় মেরে…..”
সে আর বাকিটা বলার আগে আরেকটা পড়ল তার পিঠে। সানা ঢুলতে ঢুলতে বলে,
-“চুপ, একদম চুপ, কিসের আরজে? বল দুলাভাই”
ঈশানীর তার কথায় কান নেই, সে একমনে কেঁদেই চলছে। সানা এগিয়ে গিয়ে তার মুখটা দুই হাতের অঞ্জলিতে ভরে ভালো করে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলে,
-“তুই কাঁদছিস, কিন্তু তোর দশটা চোখের একটাতেও পানি নেই কেন? দাঁড়া আমি দেখছি”
এই বলে সানা তার গাল ধরে টানাটানি শুরু করে দিল। একটু পর আবারও কিছু একটা নিয়ে দুজনে তর্ক লেগে গেল। অদূরে এসপি মাথায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে,
-“এই দুজন কে নিয়ে আমি যে কি করি”
সে এগিয়ে গিয়ে দুজনকে ধরে,
-“চুপ, চুপ কর, চল গাড়ির দিকে”
সানা জোর করে নিজের আঁখি জোড়া টেনে খুলে এসপির দিকে তাকায়,
-“এই তুই কে রে?”
এসপি বিস্মিত কণ্ঠে শুধালো,
-“আমি কে মানে? মাল খেয়েছিস ভালো কথা, তাই বলে কি মেমোরি লস্ট হয়ে গেল নাকি? আমি তো ভুলেই গিয়েছি, তোর মাল খাওয়া ছাড়াই মেমোরি লস্ট হয়ে যায়”
পাশ থেকে ঈশানী হেসে বলে,
-“এইটা… এইটা আমাদের ড্রাইভার, এই ড্রাইভার গাড়ি চালা বোম…….ট্রিট টিটিট, সবাই সাইডে যান…”
এসপি বিরক্ত হয়ে এক হাতে সানা, আরেক হাতে ঈশানীকে টেনে নিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু দুইজনের হাঁটার অবস্থা এমন, একজন সামনে গেলে আরেকজন পেছনে পড়ে। ঈশানী হঠাৎ দাঁড়িয়ে বলে,
-“আমি হাঁটবো না, আমার পা ধর্মঘটে আছে”
সানা বসে পড়ে,
-“আমিও না… আমি এখানেই থাকবো…”
এসপি দাঁতে দাঁত চেপে চিৎকার করে ওঠে,
-“উঠ, দুইজনেই উঠ”
কষ্ট করে টেনে, ধাক্কা দিয়ে, অবশেষে এসপি তাদের গাড়ির কাছে নিয়ে আসে। প্রথমে ঈশানীকে কোনো মতে গাড়ির ভিতরে তোলে। ঈশানী ঢুকেই বলে,
-“আমি গাড়ি দিয়ে যাব না, আমার বিমান লাগবে”
-“হ্যাঁ, আপনি তো প্রেসিডেন্ট, চুপচাপ বসে থাকেন”
এবার সানাকে তুলতে যাবে, কিন্তু সানা হঠাৎ হাত ছাড়িয়ে দৌড়ে রাস্তার মাঝখানে গিয়ে বসে পড়ে। এসপি চোখ বড় বড় করে চিৎকার দিয়ে ওঠে,
-“এই, এই কি করছিস?”
সানা মাটিতে শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে,
-“আমি… আমি আর কোথাও যাবো না… আমি রানভীরের কাছে যাব, আমি এখানেই থাকবো…”
এসপি দ্রুত কদমে দৌড়ে গিয়ে সানাকে টেনে তোলে,
-“ওঠ, গাড়ির নিচে চাপা পড়বি এখন”
-“না, আমি এখানেই থাকবো, রানভীরের কাছে যাব”
এসপি দন্ত পাটি পিষে খেঁকিয়ে উঠে,
-“তুই জাওরার কাছে না, উপরঅলার কাছে যাচ্ছিস। রাস্তা থেকে উঠে আয় আমার মা। তোর কিছু হলে ঐ জাওরা আমাকে ছাড়বে না”
কিন্তু রমণী তা মানতে নারাজ, সে ঠাই বসে থাকল। অবশেষে এসপি অনেক কষ্টে তাকে টেনে এনে গাড়িতে তোলে দেখে ঈশানী নেই। সে তাড়াতাড়ি গাড়ির ভিতর চেক করে বিস্মিত কণ্ঠে বলে,
-“কিরে, এবার আরেকটা গেল কই?”
এসপি সামনে গিয়ে দেখে ঈশানী নিচে বসে গাড়ি চালানোর মতো করে হাত গুলোকে নাড়িয়ে বলে,
-“সবাই সরেন, কালনাগিনী গাড়ি নিয়ে আসছে”
এসপি একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে তাকে আবারও টেনে গাড়িতে তুলে। দুজনকে ব্যাক সিটে বসিয়ে দুই মিনিট দাঁড়িয়ে থাকে, তারপর ফ্রন্ট সিটে গিয়ে বসে। এসপি ড্রাইভিং সিটে বসে ইঞ্জিন স্টার্ট দিতেই পিছন থেকে ঈশানী তার কাঁধ ধরে ঝাঁকাতে থাকে,
-“এই ড্রাইভার, গান দাও, আমি নাচবো, উলালা গান লাগাতে হবে”
সানা সামনে ঝুঁকে এসে তার গেঞ্জি ধরে টানে,
-“তুই এখনি রানভীরের কাছে নিয়ে যাবি”
ঈশানী এবার তার চুল ধরে টেনে বলে,
-“এইটা কি আসল চুল নাকি নকল?”
এদিকে সানা এত জোরে টান দিয়েছে তার টিশার্টের উপরে থাকা শার্টের একাংশ ছিঁড়ে গিয়েছে। এবার আর সহ্য হলো না তার। সে স্টিয়ারিং সামলাতে সামলাতে চিৎকার করে বলে,
-“আরে থাম আমার মা, থাম তোরা, নিজেরা মরবি, আমাকেও মারবি”
গাড়ি একবার বামে, একবার ডানে দুলতে থাকে। এসপি ঘেমে যায় পুরো,
-“উপরঅলা, কোন পাপের শাস্তি দিচ্ছ সেটাতো বলে দাও”
পিছনে ঈশানী আবারও বলে,
-“এই ড্রাইভার… আমি গান গাইবো…”
-“না, আমি গাইবো…”
-“না, আমি..”
এই নিয়ে দুজন আবার ঝগড়া শুরু করে দিল। অনেক কষ্টে, অনেক ধাক্কা সামলে শেষমেশ এসপি গাড়িটা ভীর নিবাসের সামনে এনে থামায়। সে স্টিয়ারিংয়ে মাথা ঠেকিয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকে। এসপির মনে হচ্ছে সে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ একাই জয় করে এসেছে। ভ্যালির দিকটা রাতে বেলা ভালোই ঠান্ডা পড়ে, কিন্তু এই ঠান্ডার মধ্যেও এসপির কপালে চিকন ঘামের রেখা। তারপর ধীরে বলে,
-“বেঁচে ফিরেছি… এটাই অনেক”
সে দরজা খোলার আগেই দুই রমণী ধাক্কিয়ে দরজা খুলে ফেলেছে। এসপি কোনমতে দরজা খুলে দেখে ঈশানীর সামনে গিয়ে চোখ মুখ উল্টে বমি করে দিচ্ছে। এসপি দৌড়ে গেল সেদিকে। এদিকে সানা, সে সালার হোসেনের মেইন ফটোকের সামনে গিয়ে থাপড়াতে শুরু করে আর গলা ফাটিয়ে বলে,
-“ওই সালার বস্তা, কিপটামার্কা, কিপটার বস্তা। আমি চুরি করেছি তোর আপেল, কি করবি তুই? কর শা*লা, বাইরে বেরও সালার বস্তা। আমরা কালকেও চুরি করব”
এটা দেখা মাত্রই এসপির চোয়াল ঝুলে পড়ার উপক্রম। সে ঈশানীকে ফেলে কোনমতে গিয়ে তাকে টেনে নিয়ে আসে। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার তা হয়ে গিয়েছে। ভদ্রলোক ভিতর থেকে চিৎকার শুরু করে দিয়েছেন,
-“এই লাফাঙ্গা ছেলে, আমি জানি এটা তুমি, দাঁড়াও, এখনই আমি পুলিশকে কল দিব। রাত-বিরাতে চুরি করতে এসেছ আবার”
ভদ্রলোকের পদধ্বনি শুনে এসপি কোন মতে এদেরকে টেনেটুনে গেটের ভিতরে ঢুকিয়ে দরজার লাগিয়ে দিয়ে বুকের বাম পাশে হাত রেখে হাপাতে শুরু করে। কিছুক্ষণ পর চারদিকে তাকিয়ে দেখে দুজনের একজনও নেই। এসপি নিজের কপাল চাপড়ে একটু এগিয়ে এগিয়ে দেখে দুই রমণী বাগানের বড় গাছটা ধরে টানছে আর বলছে,
-“আজকে আমরা চাঁদকে বাড়ি নিয়ে যাব”
-“মনে হচ্ছে চাঁদ যেতে চাইছে না”
ঈশানী বলতে দেরি, সানা ধাম করে একটা লাগাতে দেরি হয়নি। ঈশানী পিঠে হাত রেখে বাচ্চাদের মতো কাঁদতে কাঁদতে বলে,
-“তুই আমাকে আবার মারলি কেন?”
বিপরীতে রমণী দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
-“আবে চাঁদ যাবে না, চাঁদের বাপ যাবে। এই চাঁদে আমি ঘুমাবো। চল তাড়াতাড়ি ধর”
-“আচ্ছা”
মাতাল দুই রমণী গিয়ে গাছের পেছন থেকে ঠেলতে শুরু করে সম্পূর্ণ জোর লাগিয়ে। এসপি একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে সানাকে টানতে থাকে ভেতরের দিকে। উদ্দেশ্য কোন মতে দুটোকে বাড়ির ভিতরে ঢোকানো, তারপর জাহান্নামে যাক এরা। এসপি সানার হাত ধরে টানছে কিন্তু আসছে না। সে দাঁত চেপে সামনের দিকে তাকিয়ে বলে,
-“এদের মাল খেয়ে শক্তি বেড়ে গেল, নাকি আমি মাল না খেয়ে শক্তি কমে গেল বুঝতে পারছি না”
এই বলে পিছনে তাকাতেই তার মুখ কুঁচকে গেল। সানা পিছনের পিলারটা অন্য হাতে শক্ত করে ধরে আছে। সাথে বারবার বলছে, সে চাঁদ ছাড়া এক পাও নড়বে না। তার চাঁদ চাই, এখনি লাগবে।
এসপি কোনমতে তার হাত ছুটিয়ে ভিতর রেখে এসে ঈশানীকে আনতে যায়। সে ঈশানীকে বহু কসরতে ভিতর এনে দেখে সানা নেই। সে আবারও গার্ডেনে চলে গিয়েছে। এসপির ইচ্ছা করছে নিজের গালে নিজে দুইটা থাপ্পড় লাগাতে। এভাবে চার-পাঁচ বার নিয়ে আসে এদেরকে। এবার দুজনকে ঢুকিয়ে দরজা লাগিয়ে দিল এসপি। এই শীতেও তার কপাল বেয়ে অঝোর ধারায় ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। সে চারদিকে তাকিয়ে দেখে একটাও নাই। এসপি হাত নেড়ে উড়িয়ে দিল বিষয়টা,
-“ধুর, এবার যেখানেই থাক বাড়ির ভিতরেই থাকবে। আমি চললাম আমার বউয়ের কাছে”
এই বলে সে হাসিমুখে পা বাড়াতেই দেখে পা সরাতে পারছে না। নিচে তাকাতেই নজরে আসে দুই রমণী তার দুই পা ধরে বসে আছে। ব্যাস তার হাসি গায়েব। এসপি দাঁত চেপে আওড়ায়,
-“ছাড়, আমার মা, আমার পা ছাড়”
কিন্তু বিপরীত পাশের দুই রমণী পা ছাড়তে নারাজ। দুজনের একই বুলি, আমরা চাঁদ ছাড়া বাড়ি যাব না। মানে এরা তার পা কে বাগানের গাছ ভাবছে। এসপি শুধু নিষ্প্রভ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলে,
-“তোদের চাঁদ কোথায় আমি জানি না, আমি আমার বউয়ের একমাত্র চাঁদ। আমার পা ছাড়”
এর মধ্যে পেরিয়ে গেছে বিশ মিনিট। কিন্তু এই বিশ মিনিট এসপি কোমরে হাত রেখে শুধু দাঁড়িয়ে ছিল। তার শার্টের কোণ ছিড়া, চুল এলোমেলো, মুখের রঙ সহ উল্টে গেছে। তার ইচ্ছা করছে নিজের মাথা নিজে ফাটাতে। এরা না তার পা ছাড়ছে, আর না এদের বকবকানি থামাচ্ছে। কখনো গান, তো কখনো বিলাপ করছে, কখনো মারামারি করছে। সে যে কোথায় ফেঁসে গেছে তার নিজেরই বুঝে আসছে না। এদের জ্বালায় তার নিজেকে পাগল পাগল মনে হচ্ছে। সে উপরের দিকে তাকিয়ে অভিযোগের সুরে বলে,
-“যেই কু*ত্তা এদের খাইয়েছে, হে উপরওয়ালা তার বিচারটা তুমি হাশরের ময়দানে ফেরাউনের আগে করবা”
তারপর এদের দুজনের দিকে তাকিয়ে বলে,
-“আরে ভাইইই…, যে যার বউ এসে নিয়ে যা। নিজেদের বউ নিজেরা সামলা। এরা আমার হালাত জয় বাংলা করে দিয়েছে।
আমার বউ কোথায়? বাঁচাও, দুই মাতালের হাত থেকে বাঁচাআআআ….”
এসপির এত হাঁকডাকেও সানিতা নিচে এল না। সে জানে এই মেয়েটা কি রকম ভাবে ঘুমায়। একবার ঘুমালে তো পৃথিবীর আর কোন শোধবোধই থাকে না। তাই চোয়াল শক্ত করে বলে,
-“আমি নিশ্চিত ওই খুশদিলের মেয়েটা নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। এদিকে তার স্বামী যে বিপদে পড়ে আছে, ওই মেয়ের কি খবর আছে”
তারপর গালে হাত দিয়ে বসে কিয়ৎকাল সে ভাবলো, কিভাবে এদের থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। হঠাৎ তার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। সানার দিকে তাকিয়ে বলে,
-“এই সানা, তুই জানিস রানভীর কোথায়?”
মাতাল সানা আদৌ আদর চোখ খুলে তার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে,
-“কোথায়?”
-“ওই যে উপরে, উপরে”
সানা একবার উপরের দিকে তাকায়, একবার তার দিকে তাকায়। এসপি নিজেও বুঝছে না এই মেয়ে কি করতে চলছে। হঠাৎ সে চিৎকার দিয়ে ওঠে,
-“রানভীরর…”
এই বলে সে আর এক সেকেন্ডও থাকে না। এসপির পা ছেড়ে টলমল পায়ে উপরের দিকে উঠতে থাকে সিঁড়িতে। আর মুখে বারবার রানভীরের নাম নিতে থাকে। এদিকে নিচে দাঁড়িয়ে এসপি বলে,
-“যা কটকটি, যা, তোর জাওরার কাছে যা।
যাক, একটার থেকে রেহাই পেলাম। কিন্তু এটা? এটার তো কোনো জাওরাও নাই। এটাকে কিভাবে পাঠাবো?”
সে কয়েক সেকেন্ড ভেবে ঈশানীকে বলে,
-“মিসেস নাগিন”
এসপির মুখে মিসেস শুনে মাতাল অবস্থায়ও ঈশানী খেঁকিয়ে ওঠে,
-“মিস… মিস নাগিন?”
-“সরি সরি মিস নাগিন। যাই হোক, আপনি তো চাঁদ ছাড়া বাড়ি যাবেন না। চাঁদ কোথায় জানেন?”
-“কোথায়?”
-“আপনারও চাঁদ উপরে। ওই যে ওইদিকে। ওখানে আপনার নাগরাজও বসে আছে। যান, যান”
ঈশানী এক ঝটকায় তার পা ছেড়ে দিল। সেও টলমল পায়ে উপরে উঠতে উঠতে বলে,
-“নাগরাজ…., আমার চাঁদ, আমি আসছি”
এসপি যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। সে নিজের হাঁটু ধরে ঝুঁকে কিছুক্ষণ সস্থির নিঃশ্বাস ছেড়ে বলে,
-“এদের সামলানোর থেকে বিশ্বযুদ্ধ সামলানো আরো সহজ। এতক্ষণে আমি যুদ্ধ জিতে ইতিহাসে নাম লিখিয়ে নিতে পারতাম”
তারপর সে ও নিজের রুমের দিকে চলে যায়।
ভীর নিবাসের ভেতরে তখন ধীরে ধীরে নীরবতা নেমে এসেছে। অনেক কষ্টে সানা আর ঈশানীকে ঘরে তুলে দিয়ে এসপি নিজেও ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। আর সানিতা তো সেই কবেই আরভিকে ঘুম পাড়িয়ে নিজেও ঘুমের দেশে। চারদিকে নিস্তব্ধতা, শুধু দূরে কোথাও কুকুরের ডাক আর রাতের বাতাসের শব্দ।
ঠিক সেই সময় নিবাসের সামনে ধীরে এসে থামে একটি কালো গাড়ি। ইঞ্জিনের শব্দ থেমে গেলে চারপাশ আবারও নিস্তব্ধ হয়ে যায়। গাড়ির দরজা খুলে এক ব্যক্তি নেমে আসে। সে ধীরে ধীরে ভীর নিবাসের গেট পেরিয়ে ভিতরে ঢুকে যায়। গার্ডরা তাকে দেখে দূর থেকে এগিয়ে আসে। মাথা নিচু করে বলে,
-“বস, ওরা আরও এক ঘন্টা আগে বাড়ি এসেছে”
সে মাথা নাড়িয়ে ভিতরে চলে যায়। গার্ডরা নিজেদের পজিশন অনুযায়ী আবারও লুকিয়ে পড়ে। সে সোজা সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে যায় কোনো দিকে না তাকিয়। রুমে ঢুকেই সে কোনো কিছু না ভেবে সরাসরি বাথরুমের দিকে যায়। শাওয়ার ছাড়ার সাথে সাথে ঠান্ডা পানির ধারায় মুহূর্তেই তার শরীর ভিজে যায়।
কিন্তু সেই পানির সাথে মিশে বয়ে যেতে থাকে গাঢ় লাল রঙের র*ক্তের স্রোত। ধীরে ধীরে সেই র*ক্ত মিশে বাথরুমের মেঝেতে। সারহাদ দুই হাত তুলে নিজের ভেজা চুলগুলো পিছনে সরায়। তার বুক উঠানামা করছে ভারী শ্বাসে। তার হাতের আঙুল থেকে শুরু করে কনুই, কাঁধ সারা শরীরেই র*ক্তের দাগ। সে চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর ধীরে ঘাড়টা ডানদিকে মটকায়,
“টক…” আবার বামদিকে, ‘টক…’
এই মুহূর্তে তার চোখে এমন এক হিংস্রতা জ্বলছে, যা দেখলে যে কেউ শিউরে উঠবে। মনে হয় যেন তার ভেতরে জমে থাকা কোনো দানব মাত্রই শান্ত হয়েছে। কয়েক ঘণ্টা আগের দৃশ্যটা আবারও ভেসে ওঠে তার চোখের সামনে। রোজকার মতো আজও সে সানাদের পিছনে এসেছিল, কিন্তু রেস্টুরেন্টের বাইরে দাঁড়িয়ে সে লক্ষ্য করেছে সানা আর ঈশানীর অস্বাভাবিক আচরণ। আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল অফিসের দুইজন স্টাফ। তাদের চোখে যে নোংরা লালসা ছিল, সেটা সারহাদের চোখ এড়ায়নি। মুহূর্তে সে বুঝে গিয়েছে ওরা ইচ্ছা করেই ড্রিঙ্কসে কিছু মিশিয়ে দিয়েছে।
সে গাড়ি থেকে নামার আগেই এসপি এসে পড়ে। সেই জন্যই সে সামনে যায়নি। কিন্তু তার চোখ তখনও ওই দুইজন মানুষের উপর স্থির ছিল। এসপি যখন সানা আর ঈশানীকে নিয়ে চলে যায় সারহাদ তখনও গাড়িতে বসে ছিল। কিন্তু তার চোখে তখন এমন ঠান্ডা আ*গুন জ্বলছিল, যে আ*গুন নিভবে না, যতক্ষণ না তাদের নিশ্বাস কেড়ে নিতে পারে। সে চোয়াল শক্ত করে গাড়ি থেকে নেমে তাদের সামনে দাঁড়ায়। প্রথমে দুজনই তাকে পাত্তা দেয় না, তারা দুজনও মাতাল হয়ে আছে। সারহাদ ঠান্ডা স্বরে হিসহিসিয়ে শুধু একটা বাক্যই বলে,
-“যে হাত সানামের দিকে বাড়ে… সে হাত আর শরীরে থাকে না, আর না সেই শরীর থাকে”
তারপর আর কোনো কথা হয়নি। শুধু রাতের অন্ধকারে কয়েকটা ভাঙা আত্মাচিৎকার, আর বাঁচার একটু চেষ্টা। কিন্তু সারহাদ থামেনি তাদের নিশ্বাস বন্ধ হওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত। তার কাজ শেষে এজাজ ও ইয়ান লাশ গুলোকে সড়িয়ে পেলে।
আর এখন সেই র*ক্তই ধুয়ে যাচ্ছে শাওয়ারের পানিতে। বর্তমানে ফিরে এসে সারহাদ ধীরে ধীরে চোখ খুলে। তার বুকের ভেতর রাগ এখনো জ্বলছে, কিন্তু তার উপর এক অদ্ভুত নিয়ন্ত্রণ আছে। সে ঠান্ডা পানির নিচে আরও কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর হাত বাড়িয়ে শাওয়ার বন্ধ করে দেয়। বাথরুমে আবার নিস্তব্ধতা নেমে আসে।সে ধীরে ধীরে তোয়ালে তুলে শরীর মুছতে থাকে।তার চোখ তখন আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে। সেই চোখে এখনো একই হিং*স্র দৃঢ়তা। তার ঠোঁটের কোণে খুব হালকা একটা কঠিন রেখা ফুটে ওঠে। সে খুব ধীরে, নিচু স্বরে বলে,
-“সানামের সামনে না থাকলেও… পিছন থেকে কেউ তাকে ছুঁতে পারবে না”
তারপর সে তোয়ালে কাঁধে ফেলে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে। রাত তখন আরও গভীর হয়েছে। আর ভীর নিবাসের অন্ধকার করিডোরে তার ধীর পায়ের শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। সে আবারও গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে।
রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে সাংহাই শহর যেন অন্য এক রূপ ধারণ করে নিয়েছে। চারদিক ভরে উঠেছে কৃত্রিম আলোয়, যার কারণে বুঝে উঠার উপায় নেই দিন না রাগ। সেই আলোকোজ্জ্বল রাতের বুকেই দাঁড়িয়ে আছে বিশাল, দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা,
‘অরোরা গ্র্যান্ড পাভিলিয়ন’
এই বিল্ডিংটা যেন আধুনিক স্থাপত্য আর বিলাসিতার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। বাইরে থেকে পুরো কাঠামোটা কাঁচে মোড়ানো, যেখানে চারপাশের শহরের আলো প্রতিফলিত হয়ে তৈরি করছে এক ঝলমলে আভা। প্রবেশদ্বারের সামনে লাল কার্পেট বিছানো, দুপাশে সারি সারি সোনালি স্ট্যান্ড লাইট, বিল্ডিংয়ের মূল ফ্যাসাড জুড়ে বিশাল এলইডি স্ক্রিনে নীল আর বেগুনি আলোর মিশ্রণে ঝলমল করছে লোগোটা,
“Shanghai Fashion Week – Day 1”
পুরো বিল্ডিংটাই এই সাত দিনের জন্য বুক করা হয়েছে। ভিতরে বিল্ডিংটা কয়েকটা সেকশনে ভাগ করা। গ্রাউন্ড ফ্লোর মেইন রিসেপশন ও মিডিয়া জোনের জন্য রাখা হয়েছে। এখানেই অতিথিদের রেজিস্ট্রেশন, লাইভ কভারেজ, ইন্টারভিউ হয়। বিশাল স্ক্রিনে রানওয়ের লাইভ শো চলতে থাকে। চারপাশে বসার ব্যবস্থা তবে VIP, স্পন্সর, সেলিব্রেটিদের জন্য আলাদা সেকশন।
ডিজাইনার দের জন্য আলাদা জোন যেখানে ডিজাইনাররা নিজেদের কালেকশন প্রস্তুত করতে পারবে। শেষ মুহূর্তের পরিবর্তন, মডেল ফিটিং সবকিছু এখানেই হয়।
এই সাতদিনের জন্য আসা ডিজাইনার, আর্টিস্ট, সেলিব্রেটিদের থাকার জন্য পুরো বিল্ডিংয়ের উপরের তলাগুলো রিজার্ভ করা হয়েছে। কেউ কেউ নিজের টিমসহ এখানে থাকে। আর যারা ভিআইপি, বড় বড় সেলিব্রেটি তাদের জন্য একদম উপরের তলা মানে লাক্সারি স্যুটস রেডি করে রাখা।
প্রথম দিন সাধারণত সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে বেশি মিডিয়া কাভারেজ থাকবে। এবং এই বছর প্রথম দিনের তালিকায় যোগ হয়েছে একটা নাম, ‘আরজে’
প্রবেশদ্বারের সামনে লাল কার্পেট বিছানো চারপাশে সিকিউরিটি, মিডিয়া, ক্যামেরা সব মিলিয়ে একটা জমজমাট পরিবেশ। একটার পর একটা কালো, সিলভার, ডার্ক ব্লু রঙের বিলাসবহুল গাড়ি এসে থামছে সামনে। রোলস রয়েলস, বেন্টলি, ল্যাম্বরগিনি, মার্সিডিজ মেবাখ একে একে আরও গাড়ি গুলো এসে থামছে। গাড়ির দরজা খুলতেই বেরিয়ে আসছে আন্তর্জাতিক সেলিব্রেটি, বিখ্যাত মডেল, টপ ডিজাইনার, বড় বড় ব্যবসায়ী আর স্পন্সররা। কারো গায়ে ঝলমলে গাউন, কারো স্টাইলিশ টাক্সেডো।
চারপাশে অসংখ্য মিডিয়া, প্রেস আর ক্যামেরাম্যান। সবার মুখে ধব্বিত হচ্ছে একই বাক্য,
-“লুক হিয়ার”
-“স্যার, ওয়ান পিকচার প্লিজ”
-“ম্যাম, ওভার হিয়ার”
ফ্ল্যাশের আলো একের পর এক ঝলসে উঠছে, সাধারণ কিছু দর্শকও বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, তারা চিৎকার করে উঠছে প্রিয় তারকাদের দেখে। তবে নিরাপত্তা এতটাই কড়া যে, ভেন্যুর ভেতরে প্রবেশ একেবারেই নিয়ন্ত্রিত। প্রেস মিডিয়ার সংখ্যা সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি, কিন্তু ভেতরের আসল শো তে প্রবেশের অনুমতি শুধু নির্দিষ্ট আমন্ত্রিতদের।
ভেতরে প্রবেশ করতেই অন্য এক জগৎ। পুরো হল জুড়ে খোলামেলা, বিশাল স্পেস। উপরে ঝুলছে আধুনিক ক্রিস্টাল লাইট ইনস্টলেশন, যেগুলো রঙ বদলাচ্ছে সঙ্গীতের বিটের সাথে সাথে, নীল, বেগুনি, সোনালি। ডান পাশে বিশাল ওপেন বার। গ্লাস শেলফে সাজানো বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নামিদামি ওয়াইন, শাতো মারগো, পেনফোল্ডস, সাসিকাইয়া, ওপাস ওয়ান, সিসিলিয়া। বাটেন্ডাররা নিখুঁত স্টাইলে গ্লাসে ঢালছে লাল, সাদা, রোজে ওয়াইন। কেউ ধীরে ধীরে চুমুক দিচ্ছে, কেউ হালকা কথোপকথনে মগ্ন, আবার কেউ ব্যবসায়িক আলোচনায় ব্যস্ত।
ভেন্যুর বাম পাশে তৈরি করা হয়েছে ফ্যাশন শো এর মূল র্যাম্প। র্যাম্পের দুপাশে সারি সারি বসার জায়গা, সামনে ভিআইপি সিট, পেছনে অন্যান্য অতিথিদের জন্য আসন। প্রতিটা সিটের পাশে ছোট ডিজিটাল নামপ্লেট যেখানে অতিথির নাম ভেসে উঠছে। হালকা ইন্সট্রুমেন্টাল মিউজিক বাজছে চারদিকে।
এক মুহূর্ত আগেও যেখানে আলো, শব্দ, হাসি আর ক্যামেরার ঝলকানিতে পুরো পরিবেশটা জীবন্ত ছিল হঠাৎ করেই যেন সবকিছু থেমে গেল। চারদিকে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এলো যেন সবাই একসাথে শ্বাস আটকে রেখেছে। ভেন্যুর সামনে লাল কার্পেটের ঠিক প্রান্তে একের পর এক এসে থামতে শুরু করল কালো কাচে ঢাকা বিলাসবহুল গাড়িগুলো। গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে প্রথমে দরজা খুলে নামল গার্ডরা। সবাই একই ধরনের কালো স্যুটে, কানে ওয়্যারলেস, চোখে সতর্কতা। তারা মুহূর্তের মধ্যে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে একটা শক্ত নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে ফেলল। মিডিয়া আর ভিড় এক ধাপ পিছিয়ে গেল।
তারপর নামল জ্যাক ও কাইলিন। তারা একবার চারপাশ স্ক্যান করে নিল, যেন নিশ্চিত হচ্ছে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আছে কিনা? কাই ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে মাঝের গাড়িটার দরজা খুলে দিল, গাড়ি থেকে নেমে এল আরজে। মুহূর্তের মধ্যে চিৎকার, ফ্ল্যাশ, উন্মাদনা, সব একসাথে ফিরে এলো, কিন্তু আগের চেয়েও তীব্রভাবে,
-“আরজে”
-“ওভার হিয়ার”
-“ওয়ান পিকচার প্লিজ…”
আরজে রোজকার মতো আজও সম্পূর্ণ ব্ল্যাক গেটআপে এসেছে। তার গায়ে কালো, নিখুঁতভাবে ফিটিং করা স্যুট, ভেতরে ডিপ ব্ল্যাক শার্ট, কোনো টাই নেই। উপরের দুইটা বোতাম খোলা, যা তার লুকটাকে আরও রাফ আর ডমিন্যান্ট করে তুলেছে। হাতে কালো লেদারের গ্লাভস, কব্জিতে একটা মিনিমালিস্ট ব্ল্যাক ডায়াল ঘড়ি, পায়ে পালিশ করা ব্ল্যাক অক্সফোর্ড শু।
সে একবার ধীরে ধীরে ডানদিকে তাকাল, তারপর বামদিকে। মিডিয়ার ফ্ল্যাশ তার চোখে পড়ছে, কিন্তু তার চোখে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই, না হাসি, না বিরক্তি, না কোনো আগ্রহ।এইসব কিছুতো তার কাছে সেই ছয় বছর আগেই হারিয়ে গেছে।৷ তারপর সে আর একবারও পিছনে তাকাল না। সোজা ভেন্যুর ভেতরের দিকে হাঁটা দিল। তার গার্ডরা সাথে সাথে তাকে ঘিরে এগিয়ে চলল। আরজের ভিতরে প্রবেশ করা মাত্রই আবারও পরিবেশ বদলে গেল। যারা একটু আগেও নিজেদের মধ্যে ব্যস্ত ছিল, তারা সবাই থেমে গেল।
এক এক করে লোকজন তার দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করে, নামিদামি ব্যবসায়ী, বড় প্রযোজক, আন্তর্জাতিক ডিজাইনার।
-“লেটস ডিসকাস আ কোলাবোরেশন”
-“বিগ ফ্যান অফ ইয়োর ওয়ার্ক”
-“মিস্টার আরজে, প্লেজার টু মিট ইউ”
আরজে হাতে গোনা কয়েকজনের দিকে তাকাল, যাদের সাথে কথা বলা দরকার, শুধুমাত্র তাদের সাথেই সংক্ষিপ্তভাবে হ্যান্ডশেক করল,
-“হুম”
-“উই’ল সি”
-“সেন্ড দ্য ডিটেইলস”
ভেন্যুর ভেতরের কোলাহল, আলো আর মানুষের আনাগোনা পেরিয়ে ধীর, নিশ্চুপ পদক্ষেপে আরজে এগিয়ে গেল ভিআইপি বারের দিকে যেটা একটা আলাদা জগৎ, যেখানে প্রবেশাধিকার সবার নেই। এই অংশটা মূল ভেন্যু থেকে কিছুটা আড়ালে ডিম লাইটিং, সোনালি আর অ্যাম্বার রঙের আলো দেয়ালের উপর নরম ছায়া ফেলছে। চারপাশে গ্লাসের শেলফে সাজানো বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নামি দামি ওয়াইন আর লিকার।
আরজে ঢুকতেই তার গার্ডরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে দরজার সামনে ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে গেল। যেই কেউ ভেতরে ঢুকতে চাইল, তাদের এক কথায় থামিয়ে দিল,
-“সরি, রেস্ট্রিক্টেড”
আরজে কোনো দিকে না তাকিয়ে ধীরে ধীরে গিয়ে একটা কর্নার সোফায় বসে পড়ল। সে হাত বাড়িয়ে সামনে রাখা টেবিল থেকে একটা রেড ওয়াইনের গ্লাস তুলে নিল। গ্লাসটা হাতে নিয়ে সে হালকা করে ঘুরিয়ে তাতে এক চুমুক দিল।
তারপর একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে চোখ ঘুরিয়ে ধীরে ধীরে চারপাশে দেখতে লাগল। নজরে আসে সবকিছু স্বাভাবিক কেউ কথা বলছে, কেউ হাসছে, কেউ ডিল করছে, কেউ শুধু দেখছে। হঠাৎ, তার ভ্রু কুঁচকে গেল সামান্য। মনে হলো সে কিছু একটা দেখেছে। সে প্রথমে পাত্তা দিল না, চোখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকাল। কয়েক সেকেন্ড পর আবার অজান্তেই তার দৃষ্টি ফিরে গেল সেই দিকটায়। এবং এইবার তার দৃষ্টি থেমে গেল, একদম স্থির হয়ে গেল। সামনে অদূরে এক রমণী দাঁড়িয়ে আছে। আলো-ছায়ার মাঝে তার অবয়বটা স্পষ্ট আবার অস্পষ্ট, তার চুল, তার ভঙ্গি, তার দাঁড়িয়ে থাকার সেই পরিচিত ভঙ্গিমা। সবকিছুই এতটাই চেনা, যে বুকের ভেতরটা হঠাৎ করে কেঁপে উঠল আরজের।
তার আঙুলের ফাঁকে ধরা গ্লাসটা থেমে গেল মাঝ পথে। সে আর নড়ছে না, শুধু তাকিয়ে আছে একদৃষ্টিতে। তার বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা যেন নিজের কানেই শুনতে পাচ্ছে সে। মস্তিষ্ক বলছে, অসম্ভব। কিন্তু চোখ বলছে, সে-ই। ঠোঁট নাড়িয়ে ফিসফিস করে আওড়ায়,
-“এটা… হ্যালুসিনেশন?”
গত ছয় বছর এই মুখটা সে ঘুমে, জাগরণে, অন্ধকারে, আলোয়, এতবার দেখেছে যে একসময় রিজভী পর্যন্ত বলেছিল, তার এই হ্যালুসিনেশন এখন রোগে পরিণত হয়েছে। মস্তিষ্ক বলছে, এটা সত্যি নাও হতে পারে তবুও
তার চোখ সরছে না, বা সরাতে পারছে না।
হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪
দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কালো গাউন পড়া রমণী একটু নড়ার সাথে সাথে আলো এসে আঁচড়ে পড়ে তার মুখে। আর সেই মুহূর্তে আরজের বুকের ভেতর যেন কিছু একটা ভেঙে পড়ল। তার দৃষ্টি আরও গভীর হয়ে গেল। চোখে অবিশ্বাস, তীব্র আকুলতা, আর উচ্ছ্বাস সব একসাথে জমাট বাঁধল। এইবার সে শিউর কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু সামনের রমণীর সেদিকে খেয়াল নেই, সে একটু আগে এসেছে আর কিছু একটা নিয়ে হাসাহাসি করছে। আরজের কণ্ঠস্বর থেকে ধীরে বের হয়,
-“ওয়াইফি…”
