Home প্রিয় প্রণয়িনী ২ প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৫১

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৫১

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৫১
জান্নাত নুসরাত

বিষন্নতায় মোড়া এক বৃষ্টিমূখর সকাল। লাল রোদ্দুর দিনের প্রথম দিকে দেখা গেলেও, সময় দশটার কাটায় এসে থামতে থামতে আলো মিলিয়ে গিয়ে আকাশে ঘটা করে মেঘ জমেছে। সাঁঝ করেছে এই এই বৃষ্টি নামবে। প্রকৃতিতে বাতাসে বইছে দিগ-বিদিক হয়ে৷ সেই ক্ষণে দেখা গেল সৈয়দ বাড়ির বাহিরে জমা হয়েছেন বাড়ির পুরুষেরা। সবাই জরুরি আলোচনা করছেন। কপালে ভাঁজ! গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে গিয়ে বারংবার চোখের আকার আকৃতির পরিবর্তন হচ্ছে। মুখে চিন্তার রেশ থাকলেও, এইসাথে ভর করেছে বিরক্তি।

বাড়ির ভেতর তখন ঠান্ডা। হঠাৎ হঠাৎ জিনিস পত্র নাড়াচাড়ার আওয়াজ আসছে, সাথে কথা বলার। বিষন্ন সকালটা আরো বিষন্ন করে দিতে কানে এসে সকলের বারি খেল চিৎকার চেচামেচি। ভেসে এলো অকথ্য ভাষায় সৌরভির গালাগালি। বাড়ির মহিলারা সবাই সবার দিকে একবার তাকিয়ে নির্বিকার চিত্তে কাজে হাত রাখলেন। মুখে রা না থাকলেও, ঠোঁটের ফাক গলে বেরিয়ে এলো লম্বা দীর্ঘ শ্বাস।
ইসরাত আর জায়িন পাশাপাশি বসে নিজেদের বিয়েতে পাওয়া সালামিগুলো হিসাব করছিল। রিসেপশনের পরেরদিনই বাহিরে যাওয়ায় উপহার আর খোলা হয়নি। হাতের টাকা গুলো গুণা শেষে জায়িন মৃদু স্বরে বলল,”মোট পনেরো লাখ হয়েছে।

ইসরাত স্মিত হাসল। মেঝের আশপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা উপহারের ভেতর চোখ পড়ল হ্যালো কিট্টির রেপিং পেপার দিয়ে প্যাকিং করে রাখা একটা উপহারের দিকে। উপরে বড় বড় অক্ষরে লিখা,’দিজ ইজ মি, নুসরাত নাছির!
হাত বাড়িয়ে উপহারটা তুলে নিল কোলের উপর। অতঃপর ধীর স্থির চিত্তে খুলতেই ঠোঁট দুদিকে প্রসারিত হয়ে গেল। মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসলো,”এ্যাহ, এসব কী..!
একই সময় জায়িনের মুখ দিয়ে এমন শব্দ বেরিয়ে আসলো। ইসরাত ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই চোখাচোখি হলো দু-জনের। হন্তদন্ত হয়ে লুকালো কোলের উপর রাখা নুসরাতের থেকে পাওয়া উপহার।
জায়িনের রক্তশূণ্য চেহারা দেখে উঁকি দিল সে দেখার আশায় কী হয়েছে, কিন্তু তার মতো করেই সম্ভ্রম বাঁচানোর ন্যায় কিছু একটা ঢাকল সে ও। নাছোড়বান্দার মতো গায়ের উপর দিয়ে ওঠে টেনে হিঁচড়ে হাত খুলতে চাইল ইসরাত, পারল না। নাক ফুলিয়ে বলল,”জায়িন, দেখান, কী লুকিয়েছেন! দেখান তো..
জায়িন ঠিকভাবে বসে ছিল না, আকস্মিক ডলফিনের মতো গায়ে ইসরাতকে উঠে আসতে দেখে ভোগান্তিতে ভুগল। পায়ের পেশিতে চাপ পড়ল, তবুও সে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরাল না তাকে। গম্ভীর মুখ করে জিনিসটা লুকিয়ে রাখল।

‘“আপনি ও তো কিছু লুকিয়েছেন আমি কিছু জিজ্ঞেস করেছি?
ইসরাত চোখ তুলে একবার তাকাল। তখনো জিনিসটা দেখার প্রয়াস চোখ মুখে। বলল,”আপনি দেখতে চাইছেন না বলে কী আমি দেখতে চাইব না?
ইসরাতের প্রশ্নে দমে না গিয়ে জায়িন বলল,”তবুও, সবার নিজস্ব একটা প্রাইভেসি আছে, আপনি আমার প্রাইভেসি ব্রেক করতে পারেন না।
চোখ মুখ লাল প্রায় তখন জায়িনের। লজ্জায় না রাগে ঠিক ঠাহর করা গেল না৷ ইসরাত একটু সরে আসলো জায়িনের গায়ের উপর থেকে। নির্দিষ্টি দূরত্ব বাড়িয়ে আসন পেতে বসতেই, লহু স্বরের জায়িনের প্রশ্ন ভেসে এলো,”আপনি কী লুকিয়েছেন? দেখি? আমাকে দেখান।
কথাটা যতক্ষণে মস্তিষ্ক ধরতে পারল ততক্ষণে দেরি, জায়িন হাত বাড়িয়েছে দেখার জন্য৷ লজ্জা, অস্বতি, ভুলে গিয়ে এতক্ষণ জায়িনের উপর তোপ জমানো ইসরাত এক মুহুর্তে মোড়ছা গেল। ঝট করে নিজের পেছনে নিয়ে লুকিয়ে ফেলল উপহারটা। জায়িন সন্দেহি চোখে দেখল ইসরাতকে। জিজ্ঞেস করল,”এমন ব্যবহার করছেন কেন? কী আছে ওতে?
কথা শেষে উঁকি মারল। আর এতেই খেপে গিয়ে ঝাঁঝাল স্বরে আমতা আমতা করে ইসরাত বলল,”ক কী থাকবে ওতে, কিছুই নাই।

“তো কিছু নাই যেহেতু, তোতলাচ্ছ কেন?
ইসরাত আবারো তোতলাল,” কই, কই তোতলাচ্ছি?
আঙুল দিয়ে ঠোঁটের দিকে ইশারা করে বলল,”মাত্র তোতলালে।
“আপনি আমাকে জানেন আমার থেকে বেশি? আমি তোতলাইনি!
বিরক্তি ভরা কন্ঠে কথাখানা শেষ করল ইসরাত। তখনই জায়িনের ক্রুর হাসির শব্দ ভেসে এলো,”আপনি যখন মিথ্যা বলেন, তখন এককথা দু-বার রিপিট করেন। আর কিছু?
‘“তাই বলে তো আর আপনি সবকিছু জানবেন না আমার বিষয়ে?

“আমার থেকে ভালো আপনাকে আর কেউ চিনেও না, জানেও না। এবার বলুন কী লুকাচ্ছিলেন?
ইসরাত কতক্ষণ বিরস মুখে তাকিয়ে দেখল জায়িনকে।বলল,”আগে আপনি কী লুকাচ্ছিলেন তা দেখান!
জায়িন ঠোঁট টিপল। সময় নিয়ে কিছু একটা ভাবল। অতঃপর বলল,”একসাথে দু-জন দেখাব, ওকে?
জায়িন প্রশ্নাত্মক চাহনি ছুঁড়ে দিতেই মাথা দোলাল অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে ইসরাত। অতঃপর দু-জন যখন দু-জনের উপহার চোখের সামনে তুলে ধরল হাজারো অস্বস্তি, হতাশা, আর লজ্জা নিয়ে, তখন উপহার দেখে দু-জনেরই চোয়াল ঝুলে পড়ল। ইসরাত হাতের সেটটা একদম জায়িনের মুখের সামনে তুলে ধরে রেখেছে। বিস্মিয় চোখে বিকিনি সেটের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে জায়িনের গলা বেয়ে বেরিয়ে আসলো,,”কীহ..বিকিনি সেট, আস্তাগফিরুল্লাহ..!
আবারো দীর্ঘ শ্বাস ফেলে মাথা দু-পাশে নাড়াল। বিড়বিড়াল,”দুটোই একই জাতের, আস্তো হাড়-বজ্জাত।
ইসরাত তা শুনল না। সে জায়িনের হাতের ক্যালভিন ক্লাইনের বক্সারের দিকে হা করে তাকিয়ে তখনো, চোখ দুটো রসগোল্লার মতো করে মিনমিনিয়ে বলল,”এ্যাহ বক্সার, এসব কোনো উপহার হলো..!

বাড়ির গেট হয়ে কিছুটা দূরে গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আরশ। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর দেখা মিলল নুসরাতের। গায়ে হাই নেক ট্যাঙ্ক টপ’স জড়িয়েছে, উপরে সাদা রঙের শার্ট, বোতাম সবগুলো খুলে রাখা। হাত গুটিয়ে আছে কব্জার কাছে। গেজ এর সিলভার রঙের একটা ওয়াচ কব্জায় এঁটে রাখা। চুলগুলো সবসময়কার মতো মেসি ভান করে, মুখে বাচ্চাদের জনশন তেল দিয়েছে। । বিশেষ কোনো সাজগোছ করেনি। পায়ে জারার ফ্ল্যাট একজোড়া স্যান্ডেল কালো কালারের, আর নাকে নাকফুল। চোখ দুটোতে অস্বাভাবিক ক্ষোভ ফুটে আছে আরশের জন্য। বাড়ি থেকে বেরিয়ে হিংস্র জন্তুর ন্যায় আশপাশ খুঁজল আরশকে। নুসরাতকে বের হতে দেখে দূর থেকে গাড়ি এনে সামনে পার্ক করল আরশ। গাড়ি সামনে এসে দাঁড়িয়েছে তা দেখেও গাড়িতে উঠে বসল না সে,মুখ ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আরশ কপাল কুঞ্চিত করল। ভ্রু উচিয়ে বলল,”উঠে আয়..!

তবুও মাথা উচিয়ে দাঁড়িয়ে রইল মেয়েটা। অহংকারী ভঙ্গিমায় বলল,“দরজা খুলে দিন!
আরশ গম্ভীর মুখে দেখল নুসরাতকে। গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে আসতে আসতে শুধাল,”প্রিন্সেস ট্রিটমেন্ট চাচ্ছিস নাকি আমার কাছ থেকে?
“যা মনে করেন আপনি।
আরশ কথা বলতে বলতে দরজা খুলে দিল। ইশারায় দেখাল ভেতরে গিয়ে বসার জন্য। নুসরাত কোনোরুপ বাক্য ব্যয় না করেই ভেতর ঢুকে বসল। অতঃপর গাড়ি চলতে শুরু করল নিজ গতিতে, গন্তব্যের দিকে।
গাড়ি একটা ডাবার সামনে থেমেছে। সেখানে মানুষের সমাগম ভালোই। বসার জন্য চারপাই খাটিয়া রাখা। চারপাশ মোটামুটি পরিস্কার পরিচ্ছন্ন বলাই যায়, অনান্যা ডাবার তুলনায়। নুসরাত একবার ডাবা দেখল একবার আরশকে। এমন ভাবে বিকৃত করল মুখ যেন সে বিশ্বাস করতেই পারছে না আরশ এখানে খেতে আসছে! বিস্ময় নিয়ে জানতে চাইল,”আপনি সকালের নাস্তা করতে এসেছেন এখানে?
সিট বেল্ট খুলতে থাকা আরশের হাত গুলো থামল সেকেন্ড দুয়েকের জন্য। অতঃপর বলল,”হ্যাঁ, তো কোনো সমস্যা তোর?
নুসরাত আকাশ থেকে টুপ করে যেন মাটিতে পতিত হলো। নিজের কানের ভুল মনে করে আবারো জিজ্ঞেস করল,”আপনি ডাবায় খাবেন?
কপালে ভাঁজ ফেলে আরশ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,“কেন, আমি কী ডাবায় খেতে পারি না?

“আমি সেটা বলছি না।৷ আপনার পেট খারাপ করবে না?
“ আমার পেট খারাপ নিয়ে ডেস্পারেট হতে হবে না তোকে..!
“কিন্তু….
পুরো কথা শেষ হওয়ার আগেই আরশ, নুসরাতের সিট বেল্ট খুলে দিল। বাকি কথা না শুনেই গাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। পেছন পেছন নুসরাত ও বের হলো। কপালে চিন্তার বলিরেখা,“এই এইই, শুনুন না, একমিনিট দাঁড়ান না…এসব খেলে পেট খারাপ করবে আপনার। ডায়রিয়া হয়ে হসপিটালে ভর্তি হয়ে যাবেন, ইনজেকশন দিবে, আপনি কেন বুঝতে চাচ্ছেন না? এই এইইইই
আরশের চলন্ত পা থামল নুসরাতের চিৎকারে। চোখ,মুখে বিস্ময় ভাব! শরীর ঘুরিয়ে নুসরাতের মুখোমুখি হলো! অগাধ বিস্মায় নিয়ে শুধাল,”কী বললি, আবার বল!
“বলছি এসব খেলে পেট খারাপ করবে। ডাক্তার ইনজেকশন লাগাবে, ইনজেকশন..!
“ তোর কী মনে হয় আমি ইনজেকশন ভয় পাই?
কথা শেষ করে উত্তরের অপেক্ষা করল না, বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে গেল সম্মুখে, তা দেখে দৌড়ে গিয়ে চেপে ধরল আরশের কাঁধের কাছের কাপড় নুসরাত। চোখ পাঁকিয়ে বলল,”দাঁড়ান, কথা শুনুন!
আরশ দাঁড়াল। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ইশারা করল বলার জন্য কথা। নুসরাত বলল,”দেখুন, আরশ ভাই…

“দেখা…
নুসরাত ক্ষোভ নিয়ে তাকাল। দাঁতে দাঁত পিষে বলল,”তুই ব্যাটা শুনবি আমার কথা, মাথা গরম করাবি না একদম।
“তুই তোকারি করবি না..!
“ আচ্ছা করছি না, শুনুন আমার কথা।
“শুনতে ইচ্ছুক নই!
“আরে শুনুন না, ভীষণ দরকারী! পরে পেট খারাপ হলে বলবেন না, আমি বলিনি আপনাকে।
আরশ ব্যগি জিন্সের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দাঁড়াল। নুসরাতের দিকে তাকিয়ে বলল,”আচ্চা, বল..!
কপালে গাঢ় ভাঁজ ফেলে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল,”শুনুন আরশ ভাই, আপনারা যেখানে বাড়ির পানি খাচ্ছে না, বাজার থেকে পানি কিনে এনে খাচ্ছেন, সেখানে এখানকার পানি খাবেন কীভাবে?
নুসরাতের চিন্তিত স্বরের বিপরীতে আরশ তাকে ঠাট্টা মিশ্রিত কন্ঠে বলল “মুখ দিয়ে!

এক মুহুর্তে চিন্তা ধূলিসাৎ হয়ে গেল নুসরাতের। ধুপ করে কিল বসাল আরশের পিঠে৷ নাক ফুলিয়ে বলল,”কুত্তা, তোর পেট খারাপ হবে দেখে নিস, আয় গিল এসে, গিল! গু খাবে বলে পাগল হয়ে গেছে৷ যদি পেট খারাপ হয়ে হসপিটালে ভর্তি হোন, তাহলে আপনাকে আমি মাথায় তুলে আছাড় মারব। বাড়ির পানি খান না, আবার আসেন রাস্তার পাশের পচা পানি খেতে। ডায়রিয়া হলে দেখে নিব আপনাকে..! কত করে বলছি, বাহিরের খাবার খাবেন না, আপনার সাথে স্যুট করবে না, তারপরও খেতে চাচ্ছেন, দেখে নিব পেট খারাপ হলে..!
আরশ নুসরাতের তিরিক্ষি মেজাজের হম্বিতম্বির বিপরীতে তাকিয়ে রইল চুপচাপ। চোখের পাতা ফেলে শুধাল,”তুই কী চিন্তিত আমাকে নিয়ে?

গরম তাওয়ায় পানি পড়লে যেমন ছ্যাত করে উঠে তেমন করে নুসরাত ও উঠল। ধরা পড়ে চোরের মতো করল। তবুও, গলার আওয়াজ একটুও নিচে নামল না, আরো উঁচু হলো,”এ্যাহ! চিন্তিত? আমি?
নিজের দিকে আঙুল তুলে তাক করে নাক ছিটকাল,”আপনার জন্য কোন দুঃক্কে আমি চিন্তিত হবো শুধু মানবতার খাতিরে বলেছি। একজন বিলেত ফিরত পারশিয়ান মোটা বিড়ালও যদি এমন নষ্ট মাংস খেতে উতলা হতো তাহলে আমি এমনই করে তাকে থামানোর চেষ্টা করতাম। সেখানে আপনি তো আমার দূর সম্পর্কের চাচাতো ব্রো, আমার মতোই একজন মানুষ।
আরশ কানেই তুলল না নুসরাতের ভুজুংভাজুং কথা। হেসে নিয়ে বলল,”বুঝি, বুঝি, সবই বুঝি!

নাছির মঞ্জিলে আলোচনা সভা বসেছে। আলোচনার কেন্দ্র বিন্দু সৌরভি আর ইরহাম৷ দু-জনের প্রত্যেক দিনকার নিয়ম করে ঝগড়ার জন্য সকলেই হতাশ একই সাথে বিরক্ত। সেই বিরক্তিতার রেশ কপালে ভেসে আসে স্পষ্ট সকলের। দু-জনকে ডেকে এনে যখন সকলের সামনে দাঁড় করানো হলো, তখন হেলাল সাহেব তিরিক্ষি মেজাজে প্রশ্ন করলেন,”তোমাদের সমস্যা কী? প্রতিদিন পাড়ার কুটনীদের মতো ঝগড়া করো কেন? আর এত গালাগাল করোই বা কেন, বাড়ির বড়দের কী তোমাদের চোখে লাগে না?
হেলাল সাহেব কথা শেষ করতেই নাছির সাহেব গলা খাঁকারি দিয়ে কথা শুরু করলেন,”তোমাদের রোজকার এই ঝগড়া দেখে আমরা একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
ইরহাম নাছির সাহবের কথায় নড়েচড়ে দাঁড়াল। জানতে চাইল,”কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন?
সোহেদ সাহেব সময় নিলেন, বললেন,”রোজকার ক্লেশ, মারামারি করার থেকে ভালো তোমরা দু-জন সেপারেশনে চলে যাও, না হয় ডিভোর্স নিয়ে নাও।
সৌরভির কথাটা কানে যেতেই ঠোঁট হাসি ফুটে ওঠল, কিন্তু ইরহামের মাথায় যেন বজ্রপাত হলো। চোখ দুটো তীক্ষ্ণ করে এমন করে তাকিয়ে রইল যেন বুঝেনি কথাটা। তাই নিজের কানের ভুল মনে করে আবারো শুধাল,”কী বললেন, আবার বলুন?

সোহেদ সাহেব আবারো কথাটা রিপিট করলেন। সৌরভি বলল,”জ্বি, জ্বি, আমি রাজী আছি সেপারেশনে যেতে।
শোহেব সাহেব পুত্রবধূর কথা শোনে ছেলের দিকে তাকালেন। শুধালেন,”তোমার কী মত?
ইরহাম শান্ত স্বরে বলল,”আমি সৌরভিকে ডিভোর্স দিব না।
হেলাল সাহেব জিজ্ঞেস করলেন,”কেন দিবে না?
পরপর প্রশ্নে চোখ তুলে তাকাল ইরহাম বড় চাচার দিকে। মৃদু অথচ শক্ত গলায় বলল,”এত মার খেয়ে বিয়ে করেছি, আর আপনাদের মনে হয় আমি সেপারেশনে যাব, একদম না, মোটেও না!
সৌরভি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। ঠোঁটের কোণে হাসি তার৷ ইরহামের অবস্থা উল্টো। তার কপালে দীর্ঘ ভাঁজ। বাপ-চাচার কথা মনঃপুত হয়নি তার। ইরহামের এমন কথায় ভাষায় হারিয়ে ফেললেন হেলাল সাহেব।কিছু বলতে যাবেন, সোহেদ সাহেব বললেন,”তুমি সেপারেশনে যাবে, ডিভোর্স ও দিবে, এটা করতে বাধ্য তুমি।
“আমি মোটেও বাধ্য না।

সোহেদ সাহেব ধমাকালেন,” মুখে মুখে তর্ক করবে না, তুমি বেয়াদবি করছ!।
ইরহাম তবুও বলল,”অবশ্যই করব! এটা আমার আর আমার স্ত্রীর ব্যাপার, সেখানে আপনি বা আব্বু কেউই কথা বলতে পারবে না। আমি ডিভোর্স দিব না, এটাই আমার প্রথম ও শেষ কথা।
শোহেব সাহেব চোখ পাঁকিয়ে, গলা ফাটিয়ে ছেলেকে শাসাতে নাম ধরে ডাকলেন,”ইরহায়ায়ামম..!
ইরহাম থামল না বাবার ধমকে৷ নিজের জায়গায় অটল থেকে, স্পষ্ট কন্ঠে জানিয়ে দিল,”কেন আমাকে ধমকাচ্ছেন? ছোট চাচ্চু ও তো ছোট আম্মুর অমতে বিয়ে করেছিল জোর করে, তখন কেন চাচ্চুকে ধমকালেন না আপনারা?
সোহেদ সাহেব দমে গেলেন অতীত নিয়ে প্রশ্ন উঠায়। অতর্কিত হামলা তার দিকে হয়ে যাবে বুঝতে পারেননি তিনি, তাই চোপসানো মুখে জিজ্ঞেস করলেন,”তুমি জানলে কীভাবে তোমার চাচিকে আমি কীভাবে বিয়ে করেছি?
ইরহাম সৌরভির হাত চেপে ধরে সামনের দিকে এগোল। টেনে নিয়ে যেতে যেতে বলল,”নুসরাত বলেছে।
সকলকে বিমূঢ় নেত্রে বসা রেখে একপ্রকার দৌড়াল সে। নাছির সাহেব ইরহামের তড়িঘড়ি করে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড়ালেন,”এখানেও নুসরাত, এই বাচ্চাটা আমাকে শান্তি মরতেও দিবে না! হাহ্…
নাছির সাহেবের ব্যথিত হওয়া কন্ঠস্বর কারোর কানে গেল না। সকলেই তখন চুপচাপ নিজেদের অতীতের কার্যকলাপ নিয়ে ভাবতে বসেছেন।

নুসরাত হাঁসের মাংস মুখে দিয়ে এক গ্লাস পানি খেল। তরকারিতে মরিচ বেশি হওয়ায় আরেক ঢোক খেল। ঠোঁট চোখা করে শ্বাস ফেলে, সহনীয় পর্যায়ে আনতে চাইল ,হলো না। আরশ একবার নুসরাতের নাস্তানাবুদ অবস্থা দেখে হাঁসের মাংসের বাটিটা সরিয়ে নিল। বলে ওঠল,”আর খেতে হবে না।
তবুও নুসরাত খেল। হাতের মোবাইলটা দেখতে দেখতে বলল,”আরশ ভাই কয়েকটা টাকা ধার দেন।
আরশের খেতে থাকা হাত থামল। চোখ তুলে জিজ্ঞেস করল,”টাকা দিয়ে কী করবি তুই?
“যাই করি, ধার দিন।
“তুই আমার কাছে চাচ্ছিস না, আদেশ করছিস?
নুসরাত মেকি হাসি মুখে ফুটাল। ঝাল তরকারি খাওয়ায় ঠোঁটের আশপাশ লাল হয়ে আছে। তবুও হাসি মিটল না ঠোঁট থেকে৷ বলল,”আমি আপনার কাছে চাচ্ছি, আরশ ভাই।
সন্দেহি চোখে তাকিয়ে আরশ জিজ্ঞেস করল,“ফিরিয়ে দিবি টাকা?
মুখ ফসকে নুসরাত বলে ফেলল,”না মেরে দিব।

“তাহলে তো আর দিব না।
নুসরাত অসহায় কন্ঠে ডেকে উঠল,”আরশ ভাই.. দেন না কিছু টাকা লোন, দিয়ে দিব ফিরিয়ে, আল্লাহর কসম।
“আচ্চা দিব!
নুসরাতের চোখে মুখে হাসি ফুটে ওঠল আরশের কথায়। জানতে চাইল,” কখন দিবেন?
“দিব!
নুসরাতের বিরক্তিতে ভাঁজ পড়ল কপালে। দিব মানে কী! কবে দিবে সেটা জানাবে না! অতিরিক্ত বিরক্তিতে চ্যাঁচিয়ে উঠল,”কবে দিবেন, সেটা বলুন।
আরশ মুখে পরোটার ছোট টুকরো ঢুকিয়ে বলল,”আর দিব না, চ্যাঁচালি কেন?
আরশের মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ায় নুসরাত মেকি তোষামোদ করল। বলল,”আর চ্যাঁচাব না, দিন না, কিছু টাকা দিন না লোন।

“অনুরোধ কর, তোর চাওয়ার ধরণ আমার পছন্দ হচ্ছে না।
নুসরাত গলা খাঁকারি দিল। অনুরোধ করার ভঙ্গিতে বলল,” শ্রদ্ধেয় বড় ভাই, কিছু টাকা ধার দেন আমাকে। এই গরীবকে কিছু টাকা ধার দিয়ে কৃপা করলে আল্লাহ আপনাকে তার থেকে দ্বিগুণ টাকা দিয়ে খুশি করে দিবেন। আপনি চাইলে আপনার ঠ্যাং ধরে চাইব, লোন।
নুসরাতকে অবাক করে দিয়ে আরশ বলে ওঠল,“তাহলে ঠ্যাং ধরে চা..!
নিজের কানে ভুল মনে করে খেঁকিয়ে উঠল সে,”হ্যাঁ, হ্যাঁ, কী বললেন?
“বলেছি পা ধরে চাইতে।
তপ্ত শ্বাস ফেলল মেয়েটা। আরশকে অবাক করে দিয়ে সত্যি সত্যি এগিয়ে আসলো পা ধরার জন্য,কিন্তু ধরার আগেই পা সরিয়ে নিল আরশ। বলল,”পা ধরতে হবে না৷ কতটাকা দিব বল, আগেই বলে দিচ্ছি পইপই করে আমি আমার টাকা ফিরিয়ে নিব।
নুসরাত মাথা দোলাল। বলল,”আইচ্চা ।

“কত টাকা?
নুসরাত বুঝতে পারেনি এমন ভঙ্গিতে ভ্রু উচিয়ে জিজ্ঞেস করল,” হু?
“বলছি কত টাকা দিতে হবে? দশটাকা দিলে হবে?
ভেংচি কাটল। বলল,”এ্যাহ দশটাকা। দশটাকা কোনো টাকা হলো?
“তাহলে কতটাকা?
নুসরাত হাসল। মিষ্টতা নিয়ে বলল,” বেশি না, মাত্র ষোলো লাখ টাকা দিলেই হবে।
আরশের খেতে থাকা হাত থামল। অতোটা অবাক হলো না নুসরাতের কথায়। শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,”এতটাকা দিয়ে কী করবি তুই?
কথাটার উত্তর না দিয়ে কাছ ঘেঁষে বসল। হাতের মোবাইলটা আরশের মুখের সামনে তুলে ধরে গুচ্ছির লিমিটেড এডিশন এর একটা ব্যাগ দেখাল। আরশ দেখল। তারপর নিজের খাবারের দিকে মনোযোগ দিয়ে শুধাল,”এই ব্যাগের বিশেষত্ব কী, যে তুই ষোলো লাখ দিয়ে কিনবি?
নুসরাত কথাটার উত্তর দিল ঝটপট,”বিশেষত্ব দিয়ে কী হবে, গুচ্ছির ব্যাগ তাই কিনব, এটাই বিশেষত্ব।
আরশ দীর্ঘ শ্বাস ফেলল,”আমি আমার টাকা এভাবে জলে ফেলতে দিব না। তোকে টাকাই দিব না। ক্যানসেল..!
নুসরাত অবাক কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,”কই জলে ফেলছি? টাকা দিয়ে গুচ্ছির ব্যাগ কিনব, তাও লিমিটেড এডিশনের। ইরিস্টাইলের কী বুঝেন আপনি?

“আমি কিছুই বুঝি না,তুই বুঝিস এটাই বেশ।
নুসরাত মিনতি করার জন্য আরশের হাত চেপে ধরল বলল,”দিয়ে দিন না, মাত্র তো ষোলো লাখ টাকা।
নুসরাতের কথায় খ্যাঁক করে ওঠে আরশ,”মাত্র ষোলো লাখ টাকা? সিরিয়াসলি! ষোলো লাখ টাকা তোর কাছে মাত্র মনে হচ্ছে?
নুসরাত তবুও মিনতি জারী রাখল। আরশের এক কথা সে দিবে না মানে দিবে না। অতঃপর নুসরাতের হাজারো আবুল তাবুল, ভুজুংভাজুং মিনতির পর আরশ রাজী হলো। বলল,”এক শর্তে দিব।
নুসরাতের ঠোঁটে হাসি ফুটল। কন্ঠে নমনীয়তা নিয়ে শুধাল,”কী শর্ত?
আরশ হাসল মিচকে শয়তানদের মতো। গালের বাঁ-পাশে এতেই গর্তের সৃষ্টি হলো। সময় নিয়ে জানতা চাইল,”আমার কেমন কাপড় পরা মেয়ে পছন্দ?

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৫০

নুসরাত আকস্মিক হেসে উঠল। আরশের গায়ের সাথে গা ঘেঁষে বসল। তার এমন অদ্ভুত আচরণের মানে খুঁযে পেল না আরশ। তবুও নির্লিপ্ত চেয়ে দেখল মেয়েটার কান্ড৷ নুসরাত ভীষণ ব্যক্তিগত কথা বলছে এমনভাবে আরোএকটু কাছ ঘেঁষল। গলার আওয়াজ একদম ধীমি রেখে বলে ওঠল,”বিকিনি পরা মেয়ে আপনার ভীষণ পছন্দ, তাই না..?
চোখে মুখে দুষ্টুমির আবাশ। প্রশ্ন করে আবার নিজেই প্রশ্নের উত্তর দিল। নির্লজ্জের মতো দাঁত বের করে হাসল। ফিসফিস করে আরশের কানে কাছে বলল,”আমি সব জানি, আপনার বিষয়ে, আরশ ভাই। আপনি অর্ধ উলঙ্গ মেয়েদের পছন্দ করেন…হে হে হা হা..!

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৫২

16 COMMENTS

  1. Sobaike boila rakhi rivew valo dile nabila apay bolche 2-3 din por por golpo dibe… Sobai valo rivew diben.., 🙂
    Romjan chilo tai nabila apu golpo dey nai fb te boila dichilo…..🙂 apu kotha rakhche Eid er dini golpo diche 😩🫶

  2. na apu amra pagol apner golper jonno,trust me nusrat r arosh amr life er ekta part hoye gese so apiii plsss chaliye jaann

  3. Ami der din er moddhe 51 ta part sesh korlam ekhon dekhi ar nai..❤️‍🩹… Apu khub taratari diyen part gulaaa🙏🙏🙏………ar thakte pari na… Golpo ta onk shundor. Nusrat er charecter sobche shundor💖

Comments are closed.