Home হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১৫

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১৫

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১৫
সাবা খান

শহরের অন্ধকার জগতের কথা উঠলেই যে নামটা সবার আগে উচ্চারিত হয়, সেটা হলো
“জেবি—জাওয়ান ব্লাডলাইন”
বাইরের মানুষের কাছে এটা একটি বিশাল মাল্টিন্যাশনাল বিজনেস কর্পোরেশন। তাদের ব্যবসা, শিপিং ও লজিস্টিকস, রিয়েল এস্টেট, আন্তর্জাতিক আমদানি রপ্তানি, পোশাক, কাগজে কলমে সবই বৈধ। কিন্তু আন্ডারওয়ার্ল্ডের মানুষ জানে জেবির আসল ব্যবসার ব্যাপারে, এটা শুধু একটা কোম্পানি নয়, এটা এক অদৃশ্য সাম্রাজ্য। এই কোম্পানির আড়ালেই চলে, আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসা, উচ্চমূল্যের ড্রাগ ট্রাফিকিং, মানি লন্ডারিং, অবৈধ হীরা ও সোনার বাজার, এবং বিভিন্ন দেশের আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্ক। এই সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে দুইজন মানুষ,
“জেবি কিং আরজে, ও সোফিয়া জাওয়ান”

ক্যামেরার সামনে আরজে একজন প্রথম সারির অভিনেতা, গায়ক, ব্যবসায়ী। কিন্তু ক্যামেরার পিছনে এই অন্ধকার সাম্রাজ্যের কিং। তার অনুমতি ছাড়া বড় কিছু নড়ে না এখানে। আজকে একটা বিশেষ দিন কেননা জেবি কোম্পানির সদর দপ্তরের গভীর নিচে আন্ডারগ্রাউন্ডে মিটিং রুমে বসতে যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। মাটির অনেক নিচে তৈরি করা এই কক্ষটা প্রায় বাঙ্কারের মতো, মোটা স্টিলের দরজা, চারদিকে সাউন্ডপ্রুফ দেয়াল, দেয়ালের গায়ে বড় বড় ডিজিটাল স্ক্রিন আর মাঝখানে বিশাল ওভাল কনফারেন্স টেবিল। টেবিলের চারপাশে বসে আছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মাফিয়া ডন, অবৈধ ব্যবসায়ী আর আন্ডারগ্রাউন্ড সিন্ডিকেটের প্রতিনিধিরা। সবাই অপেক্ষা করছে আরজের জন্য।

আজকের মিটিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আজ এখানে শুধু জেবি আর জাইফেরা গ্রুপের মধ্যে ডিল হবে না। এর সাথে যুক্ত আছে আরও অনেক শক্তিশালী সংগঠন, অস্ত্র সরবরাহকারী সিন্ডিকেট, ইউরোপের ড্রাগ কার্টেল, খনিজ পাচার চক্র এবং মধ্যপ্রাচ্যের কালোবাজারি নেটওয়ার্ক। আজ সিদ্ধান্ত হবে কোন রুট দিয়ে অস্ত্র যাবে, কোন দেশে ড্রাগ চালান ঢুকবে, কোন বন্দরে নজরদারি বাড়াতে হবে সব।
হঠাৎ মিটিং রুমের ভারী দরজাটা খুলে ভেতরে প্রবেশ করেন, দিলরুবা খানম। তার পাশে হাঁটছে তার ব্যক্তিগত সেক্রেটারি রায়ান। দিলরুবা ধীরে গিয়ে নিজের জন্য বরাদ্দকৃত আসনে বসে পড়েন। আজ তিনি এখানে এসেছেন দুটো উদ্দেশ্য নিয়ে।
প্রথমত, সোফিয়া জাওয়ানের কাছাকাছি থাকা।

এই আন্ডারওয়ার্ল্ডে সোফিয়ার প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে, তার গতিবিধি বোঝা জরুরি যদি তাকে হারাতে হয়।
দ্বিতীয়ত, জেবি কোম্পানি এই পুরো আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্কের কেন্দ্র। এখান থেকেই নিয়ন্ত্রণ করা হয় অবৈধ বাজারের অনেক অংশ। দিলরুবা খানম চান এই নেটওয়ার্কের ভেতরের তথ্য জানতে। তিনি শান্তভাবে চারপাশটা একবার ভালো ভাবে পর্যবেক্ষণ করে নিলেন। ঘরের ভেতরে এক ধরনের চাপা উত্তেজনা। সবাই অপেক্ষা করছে জেবি কিংয়ের।
কিয়ৎকাল পর ভারী দরজাটা আবার খুলে যায়। প্রথমে ভেতরে ঢুকে কয়েকজন সশস্ত্র গার্ড, কালো স্যুট, কানে কমিউনিকেশন ডিভাইস। তারা মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে ছড়িয়ে নিজ নিজ পজিশনে দাঁড়িয়ে যায়। তারপর ধীরে ভেতরে প্রবেশ করে আরজে। কক্ষে থাকা সবাই তার দিকে মাথা ঘুরিয়ে তাকায়। কিন্তু আরজে কোন দিকে না তাকিয়ে সোজা টেবিলের দিকে এগিয়ে আসে। সে প্রবেশ করা মাত্রই মিটিং টেবিলে বসে থাকা সব সদস্য একসাথে দাঁড়িয়ে যায়।
আরজে টেবিলের প্রধান চেয়ারে বসে হাত দিয়ে ইশারা করে। তার ইশারা মতে সবাই আবার বসে পড়ে। কক্ষের আলো একটু ম্লান করে দেওয়া হয়। ডিজিটাল স্ক্রিনে ভেসে ওঠে একটা মানচিত্র। আরজে গম্ভীর স্বরে বাক্য ছুঁড়ে,

-“লেটস গেট দিস মিটিং স্টার্টেড””
সামনে থাকা ব্যক্তিগুলোর একজন এগিয়ে এসে স্ক্রিনে শিপিং রুটের চিত্র দেখিয়ে বলে,
-“পূর্ব ইউরোপের অস্ত্র চালান প্রস্তুত, কিং”
আরজে সেদিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে প্রতুত্তর করে,
-“কোন বন্দরে ঢুকবে?”
-“ব্ল্যাক সিয়ের রুট দিয়ে”
সে নিজের রুট বুঝিয়ে নিজের আসনে চলে যায়। আরেকজন এগিয়ে এসে বলে,
-“দক্ষিণ এশিয়ায় ড্রাগ বাজার দ্রুত বাড়ছে।নতুন ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক দরকার”
আরজে চোখ সরু করে বলে,
-“রুট নিরাপদ?”

লোকটা মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বুঝায়। মিটিং রুমে একের পর এক অবৈধ ব্যবসার পরিকল্পনা আলোচনা হতে থাকে। অস্ত্র, ড্রাগ, কালোবাজার, মানি লন্ডারিং, সবকিছু। এই সবকিছুর মাঝখানে বসে আছে আরজে।
ঘরের এক কোণে বসে মিসেস দিলরুবা খানম সবকিছু লক্ষ্য করছেন। তার চোখে হালকা চিন্তার ঝিলিক কেননা তিনি যতটা ভেবেছেন বিষয় টা তার থেকেও গভীর। সাথে এটাও বুঝতে পারছেন, এই টেবিলের চারপাশে বসে থাকা মানুষগুলো শুধু ব্যবসায়ী না। এরা এমন মানুষ, যারা চাইলে পুরো একটা দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি বদলে দিতে পারে।
মিটিং অনেকটা এগিয়ে এসেছে। ডিজিটাল স্ক্রিনে শেষ কয়েকটা শিপিং রুট দেখানো হচ্ছে। অস্ত্র চালান, ড্রাগ ট্রানজিট, মানি লন্ডারিং সবকিছুর সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত।টেবিলের প্রধান চেয়ারে বসে থাকা আরজের সামনে রাখা ট্যাবলেটের স্ক্রিনে কয়েকটা ফাইল খুলে আছে। সে একবার দেখে স্ক্রিন বন্ধ করে বলে,

–“দ্যান, লেট’স এন্ড দিস রাইট হিয়ার”
কয়েকজন মেম্বার মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বুঝায়। ঠিক তখনই টেবিলের অন্য পাশে বসে থাকা দিলরুবা খানম ঠান্ডা কণ্ঠে শুধালো,
–“এত তাড়াতাড়ি শেষ?”
ঘরের কয়েকজন লোক একটু কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকায়। আরজেও নিজের নজর ঘুরিয়ে তার দিকে তাকায়। ধীরে ধীরে তার ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে। আরজে ইচ্ছা করেই দিলরুবা খানম কে নিজের বিজনেসে সামিল করেছে তার গতিবিধি নজরে রাখার জন্য। দিলরুবা খানম চেয়ারে হেলান দিয়ে বলেন,
–“জেবির ক্ষমতা নিয়ে অনেক গল্প শুনেছি। আজ কাছ থেকে দেখলাম”
আরজে ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে আওড়ায়,

–“সো… ইউ’র ডিসঅ্যাপয়েন্টেড”
-“নো, তবে অবাক হয়েছি বটে, এত বড় একটা সাম্রাজ্য, আর মালিকটা এত অল্পবয়সী”
ঘরের কয়েকজন মৃদু হাসি চাপার চেষ্টা করে।আরজে মাথা একটু কাত করে তাকায় সবার দিকে। মুহূর্তে ঘরটা আবার একদম স্তব্ধ হয়ে যায়। আরজে হালকা বিদ্রুপ মিশিয়ে বলে,
–“ক্ষমতা বয়স দেখে আসে না, মিসেস খানম”
–“ইয়াহ, ইউ’র রাইট”
মিসেস দিলরুবা খানম কিয়ৎকাল কিছু একটা ভেবে ফের আরজের দিকে তাকিয়ে বলে,
–“তুমি কি ভাবছো, আরজে?
এই ক্ষমতা, এই সাম্রাজ্য, এই সবকিছু দিয়ে তুমি তাকে এখানে রেখে তোমার মায়ের হাত থেকে বাঁচাতে পারবে?”
তার বলা বাক্যটুকু শ্রবণ হতেই আরজের চোখ ধীরে সরু হয়ে আসে। সে ঠান্ডা স্বরে প্রত্যুত্তর করে,

–“ওর দিকে হাত বাড়ানোর আগে, আমার সাম্রাজ্য নয়, আমার র*ক্ত পার হতে হবে”
আরজে হঠাৎ হাতের দিকে তাকায়। তার কব্জিতে থাকা স্মার্ট ঘড়ির স্ক্রিন হঠাৎ জ্বলে ওঠে। ডিজিটাল স্ক্রিনে লাল রঙে ভেসে উঠছে,
“হার্ট রেট এলার্ট”
তার সাথে একটা নাম, “সানা”
আরজের দৃষ্টি মুহূর্তে বদলে যায়। স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দন। এই ঘড়িটা সরাসরি কানেক্টেড সানার বায়োমেট্রিক ট্র্যাকার এর সাথে। মানে ওখানে কিছু একটা হয়েছে, ভয়ংকর কিছু। আরজের হাত ধীরে মুষ্টিবদ্ধ হয়ে যায়। তার মুখের সমস্ত ভাব মুহূর্তে বদলে যায়। পরের মুহূর্তে সে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ায়। কক্ষের সবাই অবাক হয়ে তাকায়। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই আরজে টেবিলের সব ফাইল এক ধাক্কায় সরিয়ে দেয়। সে আর এক ন্যানো সেকেন্ড কালবিলম্ব না করে দ্রুত পায়ে দরজার দিকে হাঁটা শুরু করে। একজন মেম্বার অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
–“কিং হোয়াট’স হ্যাপেন?”
কিন্তু বিপরীতে থাকা মানব একবারও পিছনে তাকায় না। সে প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে যায় মিটিং রুম থেকে। তার পেছনেই সাথে সাথে ছুটে যায় তার সব গার্ড।

প্রত্যুষের নিস্তব্ধতা ভেঙে ব্ল্যাক ম্যানশন এখন যেন যুদ্ধক্ষেত্র। চারদিকে ধোঁয়ার গন্ধ, মাটিতে ছড়িয়ে আছে ভাঙা কাঁচ, পোড়া গাড়ির টুকরো আর অসংখ্য বুলেট শেল। ম্যানশনের সামনে লম্বা ড্রাইভওয়ের উপর পড়ে আছে আরজের গার্ডদের নিথর দেহ। কেউ দেয়ালের গায়ে হেলে পড়ে আছে, কারো হাত থেকে এখনো বন্দুকটা পড়ে আছে মাটিতে। র*ক্ত গড়িয়ে গিয়ে কালো পাথরের মেঝেতে জমে তৈরি করেছে লাল দাগ। হেলিকপ্টারের হামলার পর চারপাশ যেন এক মুহূর্তে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এই ধ্বংসস্তূপের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সোফিয়া জাওয়ান।
তার নির্বিকার দৃষ্টি ধীরে ধীরে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করছে। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে আব্বাস আর জিহাদ। সোফিয়া ঠান্ডা কণ্ঠে আদেশ করে,

-“আলফা টিম”
সঙ্গে সঙ্গে তার বিশেষ বাহিনীর কয়েকজন সামনে এগিয়ে এল। সোফিয়া ম্যানশনের দরজার দিকে ইশারা করতেই তারা তার ইঙ্গিত বুঝে ভেতরে ঢুকে পড়ে, এটা দেখার জন্য পুরো পরিস্থিতি ঠিক আছে কি না বা ভিতরে কোন গার্ড আছে কি না?
তারা দ্রুত বন্দুক প্রস্তুত করে ম্যানশনের ভিতরে ঢুকে গেল। বাইরে আবার নীরবতা নেমে আসে। কিন্তু দশ মিনিট পার হতে চলছে কিন্তু ভিতর থেকে কেউ বাহিরে আসছে না।সময় যেন অস্বাভাবিক ধীরে চলতে লাগল।
সোফিয়া স্থির দাঁড়িয়ে আছে দরজার দিকে তাকিয়ে। আজ সে আরজে আন্ডারগ্রাউন্ডে মিটিংয়ে থাকবে জেনে আরভি কে নিতে এসেছে। কোনমতে শুধু তাকে জাওয়ান ম্যানশনের বেজমেন্টে নিয়ে যেতে পারলেই হবে তারপর আরজেও আর তাকে বের করতে পারবে না। ঐ বেজমেন্টের শুরু কোথায় আর শেষ কোথায় তা একমাত্র সোফিয়া ছাড়া আর কেউ জানে না।
তার ভ্রম ছুটিয়ে দশ মিনিট পার হতেই হঠাৎ ভিতর থেকে একজন বেরিয়ে এল, আলফা টিমের এক সদস্য। সে টলতে টলতে দরজার কাছে এসে দাঁড়ায়। তার মাথা থেকে র*ক্ত গড়িয়ে পড়ছে, চোখ জোড়া আধখোলা। সে হাত তুলে কিছু একটা ইশারা করার চেষ্টা করে তারপরই ধপ করে পড়ে গেল মাটিতে।মাথা ফেটে চারদিকে র*ক্ত ছড়িয়ে পড়ছে। সোফিয়ার ভ্রু কুচকে আসে কেননা একটা আলফা সেনার এমন অবস্থা করা সহজ কথা না। আলফা টিমের বাকি সদস্যরা সঙ্গে সঙ্গে বন্দুক তুলে সামনে এগোতে চাইলো। কিন্তু সোফিয়া হাত তুলে তাদের থামিয়ে দেয়,

–“স্টপ”
তার চোখ সরু হয়ে আসে, সে নিজেই সামনে এগিয়ে গেল। ম্যানশনের বিশাল দরজাটা ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই ভেতরের দৃশ্য দেখে সে এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে যায়। তার সামনে বসে আছে যন্ত্রমানব সোফায় হেলান দিয়ে।হাতের বন্দুকটা ঘুরিয়ে খেলছে জ্যাক। পরমুহূর্তে তার সামনে থাকা আরেকটা আলফা সেনা যে হাটু গেড়ে বসে আছে তার মাস্কটা একটানে খুলে ফেলে। তারপর নিজের অনুভূতিহীন ধূসর চোখজোড়া নিক্ষেপ করে সোফিয়ার হালকা বিস্মিত বাদামি চোখে। তারপর কোনো কথা না বলে পরপর চারটা গুলি ছুটে গেল সেই আলফা সেনার কপাল বরাবর। সোফিয়ার পিছন থেকে গুলি করার আগেই জ্যাক দক্ষ হাতে কোমড়ের পিছন থেকে আরও একটা বন্দুক বের করে ট্রি*গার চাপে। সাথে সাথে সোফিয়ার পিছনে দাঁড়ানো আলফা টিমের কয়েকজন গার্ড মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
জ্যাক ধীরে পকেট থেকে একটা সাদা রুমাল বের করে মুখের কোণে জমে থাকা র*ক্ত মুছে ফেলে। তারপর দুই হাত দুদিকে ছড়িয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে,

–“ওয়েলকাম, লেডি।
ওয়েলকাম টু ব্ল্যাক ম্যানশন’
সোফিয়ার চোখের বিস্ময় কবেই কেটে গেছে, সে চোয়াল শক্ত করে পাশ ফিরে জিহাদের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়। জিহাদ নিচু স্বরে বলে,
-“আই থিঙ্ক, আরজে স্যার ওকে রেখে গেছে”
সোফিয়া এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। সে কল্পনাও করেনি, জ্যাক এখানে থাকবে। যদি জ্যাক এখানে থাকে, তাহলে তার পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে। কারণ এই মানুষটা শুধু আরজের ডান হাত না। অনেকেই বলে, ক্ষমতায়, নিষ্ঠুরতায়, বুদ্ধিতে সে আরজের থেকেও কম না। সোফিয়া তো ভেবেছিল ভিতরে কেউই থাকবে না যার কারণে সে নিজের সাথে অত্যাধিক গার্ড ও নিয়ে আসেনি। তাই এখন ভেবে চিন্তে পা ফেলতে হবে। সোফিয়া দাঁতে দাঁত চেপে নিজের রাগ গিলে ফেলল। তার চোখে শুধু আ*গুন জ্বলছে। ঠিক তখন জ্যাক আঙুল দিয়ে একটা তুরি বাজায়। পরের মুহূর্তেই চারপাশে লাল আলো ঝলসে উঠে। ডজন ডজন লাল লেজার এসে পড়ে সোফিয়া, জিহাদ আর আলফা টিমের উপর। সোফিয়া ভ্রু কুঁচকে চারপাশে তাকায়। তার চোখ এবার উপরের দিকে উঠে আর নজরে পড়ে দোতলা, তিনতলা, সিঁড়ি, প্রতিটা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে শ’য়ে শ’য়ে গার্ড। সবাই বন্দুক তাক করে আছে তাদের দিকে। এক পা এগুলেই গুলি। সোফিয়া মুহূর্তে দাঁত চেপে নিজের রাগটা গিলে ফেলল। তার মুখে ধীরে ধীরে একটা মেকি হাসি ফুটে উঠে। সে জ্যাকের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় শুধায়,

–“আমি এখানে যুদ্ধ করতে আসিনি, আমি আমার গ্র্যান্ডসনের সাথে দেখা করতে এসেছি। হোয়্যার ইজ মাই আরভি?”
জ্যাক ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে রইল, কোনো প্রতিক্রিয়া নেই আর না প্রত্যুত্তর। সোফিয়া আবার বলে,
–“একজন দাদী তার নাতির সাথে দেখা করতে এসেছে। এতে তো সমস্যা হওয়ার কথা না”
জ্যাক উঠে দাঁড়িয়ে ঠান্ডা স্বরে বলে,
-“বসের আদেশ ছাড়া, কেউ দেখা তো দূরের কথা, তার ত্রিসীমানার কাছেও যেতে পারবে না”
সোফিয়া এবার কঠিন গলায় বলে,

–“জ্যাক, আমার সাথে এইভাবে কথা বলার আগে ভেবে বলো। তুমি জানো আমি কে?”
জ্যাক এক মুহূর্তের জন্যও নিজের ভাব পরিবর্তন করল না বরং নির্লিপ্ত গলায় জবাব দেয়,
–“আই নো, বাট বসের অর্ডার ছাড়া এই ম্যানশনের ভেতরে কেউ এক কদমও এগোবে না। অবশ্য….যদি কেউ চেষ্টা করতে চায় করতে পারে। আমিও দেখতে চাই কতদূর যেতে পারে”
চারপাশের গার্ডরা বন্দুক শক্ত করে ধরে আছে। পরিস্থিতি এমন যেন মুহূর্তে বিস্ফোরক হতে পারে। সোফিয়ার হাত ধীরে মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেল। কিন্তু সে জানে, এখন একটা ভুল সিদ্ধান্ত মানেই র*ক্তের স্রোত। র*ক্তের স্রোতে পরোয়া সে করে না, কিন্তু সকল পরিস্থিতি ঠান্ডা মাথায় সামলাতে জানে সে। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে সে হঠাৎ ঘুরে পাশে থাকা সোফায় বসে পড়ল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে ঠান্ডা বিপজ্জনক হাসি।

এদিকে দোতলায় থাকা রমণী গোলাগুলির আওয়াজ শুনে আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে দ্রুত আরভির ছোট্ট হাতটা ধরে বলে,
–“ভীর, মায়ের সাথে চলো”
–“মম… বাইরে কি হচ্ছে?”
সানা জোর করে একটা শান্ত হাসি দিয়ে তার গালে হাত রেখে আওড়ায়,
–“কিছু না, সোনা একটু গোলমাল। আমরা শুধু অন্য রুমে যাচ্ছি”
সে দ্রুত নিজের রুমের দিকে হেঁটে যায়। রুমে ঢুকতেই নজরে আসে আগেই সেখানে এসে দাঁড়িয়ে আছে ঈশানী, সানিতা, সিয়া আর এসপি। সবাই স্পষ্টই উদ্বিগ্ন। ঈশানী সানাকে দেখেই ছুটে এসে বিচলিত কণ্ঠে প্রশ্ন করে,
–“ডাইনি, নিচে কি হচ্ছে?”
সানিতা সেখান থেকেই ভীত গলায় বলে,
–“বাইরে এত গুলি… আমি জানালা দিয়ে দেখেছি অনেক গুলো গাড়ি এসেছে, এরা কারা সানা সিস?”
এসপি দরজার দিকে তাকিয়ে বলে,
-“মনে হচ্ছে কেউ আক্রমণ করেছে”

এত গুলো প্রশ্নের বিপরীতে রমণী কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকে। সানা কিছু না বলে রুমের কোণের দিকে এগিয়ে গেল। ওখানে একটা ছোট বুকসেলফ রাখা, সাধারণ তাকের মতোই দেখতে। সানা তাকের একপাশে হাত ঢুকিয়ে একটা লুকানো বোতাম চাপে। সাথে সাথে ঘড়ঘড় শব্দ করে বুকসেলফটা ধীরে ধীরে সরে গেল। তার পেছনে দেখা যাচ্ছে একটা গোপন দরজা। ভেতরে ছোট একটা সেফ রুম। ঘরটা ছোট হলেও ভেতরে আলো, অক্সিজেন সিস্টেম আর ক্যামেরা মনিটর লাগানো। এটা সেই জায়গা যেটা আরজে এখানে আসার পর পরই তাকে দেখিয়েছে।
সানা ঘুরে সবার দিকে তাকিয়ে বলে,

-“তোরা সবাই ভিতরে যা”
-“তুই?”
-“তোরা আগে ঢুক”
সানার কথা মতো ঈশানী আরভিকে কোলে তুলে নিল।ভেতরে ঢোকার আগে সে সানার হাত ধরে ফেলে,
-“আমি জানি, তুই আসবি না?”
সানা ধীরে মাথা নাড়িয়ে আওড়ায়,
–“হুম”
তার এমন জবাবে বিপরীতে থাকা রমণী হতভম্ব হয়ে যায়,
–“পাগল নাকি তুই? নিচে কারা আছে জানিস?”
–“জানি, চাচুমা এসেছে। বৌমা হিসাবে ওনার সাথে দেখা করা আমার কর্তব্য, যাই গিয়ে একটু কর্তব্য পালন করে আসি”
ঘরের সবাই স্তব্ধ হয়ে যায় সানার কথায়। ঈশানী তার বিপরীতে কিছু বলার আগেই সানা ঠান্ডা কণ্ঠে শুধায়,
–“আমি আর পালাবো না। আজ আমি নিজে দেখতে চাই, চাচুমা আসলে কি করতে পারে”
ঈশানীর চোখ ভিজে উঠে আতঙ্কে। সেও এক সময় সোফিয়ার সাথে ছিল তাই তার নৃশংসতা সম্পর্কে তার অল্প হলেও ধারণা আছে। সে অনুরোধে সুরে বলে,

–“প্লিজ…..”
সানা তার হাতটা শক্ত করে ধরে একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলে,
–“ভীরের খেয়াল রাখিস। আর সিয়া তুমি সানিতাকে দেখো”
ঈশানী কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে মাথা নাড়িয়ে আরভিকে কোলে নিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। আরভি তখনও মায়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,
–“মম… তুমি আসবে না?”
সানা জোর করে ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বলে,
–“অবশ্যই আসব সোনা, একটু পরেই আসবো”
সানা ধীরে বুকসেলফটা টেনে আবার জায়গায় লাগিয়ে দিল। গোপন দরজাটা বন্ধ হয়ে যায়। ঘরে এখন শুধু সানা আর এসপি। কয়েক সেকেন্ড কেউ কথা বলল না। তারপর এসপি ধীরে বলে,
–“এখন কি করবি?”
বিপরীতে রমণীর থেকে কোন শব্দ এলো না, সে সোজা হাঁটতে হাঁটতে গেল আরজের বড় কাবার্ডের সামনে। কাবার্ড খুলে ভেতরের ড্রয়ারটা খুলে ভেতরে রাখা আছে কয়েকটা হ্যান্ডগান, ম্যাগাজিন আর বুলেট। সানা কাঁপা কাঁপা হাতে একটা বন্দুক হাতে তুলে নিল। সে চোখ বন্ধ করে এক সেকেন্ড নিঃশ্বাস নিয়ে তারপর আবার বন্দুকটা শক্ত করে ধরে। এসপি এগিয়ে এসে আবার বলে,

–“তুই কোনো উল্টোপাল্টা করবি না তো?”
সানা বন্দুকটা চেক করতে করতে বলে,
–“উল্টোপাল্টা?
যখন কথা হয় সন্তানের, তখন মায়ের জন্য উল্টোপাল্টা বলে কিছু থাকে না”
এসপি চুপ করে গেল। সানা আরেকটা বন্দুক বের করে এগিয়ে দিল এসপির দিকে। এসপি সেটা হাতে নিয়ে তার দিকে তাকায়। মুহুর্তে দুজনের ইশারা ইঙ্গিতে কথা হয়ে গেল। তারপর দুজনে দরজা খুলে বের হয়ে যায়।
সানা আর এসপি বাইরে বের হতেই দেখে করিডোরটা অস্বাভাবিকভাবে নীরব। কিন্তু তাকে দেখামাত্রই আরজের গার্ডরা দ্রুত দু’পাশে দাঁড়িয়ে গেল। সানা একবারও তাদের দিকে না তাকিয়ে ডান হাতে শক্ত করে বন্দুক ধরে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামে। নিচে বসে আছে সোফিয়া জাওয়ান। তার চারপাশে আব্বাস, জিহাদ এবং কিছু আলফা টিমের সদস্য। জ্যাক অদূরে দাঁড়িয়ে আছে। সানা সিঁড়ির শেষ ধাপে পা রাখতেই সোফিয়া চোখ তুলে এক পলক তার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে বলে,

–“ওহ…মাই ডিয়ার ডটার ইন ল, কাম”
সানা প্রথমেই জ্যাক কে দেখে একটু অবাক হয় কেননা তার তো এখানে থাকার কথা ছিল না। তাহলে কোথা থেকে আসল। পর মুহূর্তে সোফিয়ার কথা শুনে তার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে নির্ভীক কণ্ঠে বলে,
–”হ্যালো, চাচুমা, লং টাইম নট সি”
এসপি পাশ থেকে ফিসফিস করে বলে,
–“লং টাইম নো সি”
–“হ্যাঁ, ঐ একটা হলেই হলো”

এই বলে রমণী হেঁটে এসে সোফিয়ার সামনের সোফায় বসে পড়ে আরাম করে পায়ের উপর পা তুলে। তার পাশের সোফায় বসে পড়ে এসপি। এই দৃশ্য দেখে সোফিয়ার চোখে যেন আ*গুন জ্বলে উঠে। তার আঙুলগুলো সোফার হাতলে এত জোরে চেপে ধরেছে যে শিরাগুলো ফুলে উঠেছে। সে চোখ বন্ধ করে নিজেকে সংবরণ করে, কেননা আরভি কে হাতে পাওয়ার আগ পর্যন্ত তাকে এই মেয়েটাকে সহ্য করতে হবে। এখন আরভি কোথায় আছে সে জানে না, মোটকথা এই ব্ল্যাক ম্যানশন সম্পর্কে তার কোন ধারণা নেই। তাই নিজের দন্ত পাটি পিষে আওড়ায়,
–“তোমার সাহস তো বেশ বেড়েছে”
সানা ঠোঁটে মেকি হাসি টেনে বলে,

–“বয়সের সাথে সাথে সাহসও বাড়ে, চাচুমা। আপনি তো জানেনই”
–“আমার গ্র্যান্ডসান কোথায়?”
–“অনেক জায়গা আছে পৃথিবীতে। আপনি কোনটা জানতে চাইছেন?”
সোফিয়ার চোখ সরু হয়ে আসে, সানার এমন খাপছাড়া জবাব তার একদম ভালো লাগছে না। তাই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
–“খেলো না, মেয়ে। আমার আরভি কোথায়?”
সানা হালকা মাথা কাত করে তাকায়,
–“ওহ…আপনি ভীরের কথা বলছেন?
সেটা আপনার না আমার ছেলে”
–“তুমি বুঝতে পারছো না তুমি কার সাথে কথা বলছো”
–“খুব ভালো করেই বুঝছি। আমি আমার চাচুমার সাথে কথা বলছি”
তারপর একটু থেমে যোগ করে,

–“যিনি নিজের ছেলের ঘর ভেঙে দিতে একটুও দ্বিধা করেননি”
সোফিয়ার চোখে মুহূর্তে তীব্র আ*গুন জ্বলে উঠে। তিনি রুক্ষ স্বরে হিসহিসিয়ে বলেন,
–“তুমি এখনো সেই একই মূর্খ মেয়ে। এই নাটক করে তুমি আমার কাছ থেকে আমার বংশধরকে দূরে রাখতে পারবে? অসম্ভব, সে আমার র*ক্ত। তাকে তো আমি নিয়ে যাবই”
হঠাৎ সানা তড়িৎ গতিতে উঠে দাঁড়ায়, তার চোখ মুহূর্তে জ্বলে উঠে। তারপর গর্জে উঠে সোফিয়ার দিকে,
–“মিসেস সোফিয়া জাওয়ান। আপনার সামনে এখন আপনার বৌমা দাঁড়িয়ে নেই। না সেই সানা দাঁড়িয়ে আছে, যাকে আপনি একসময় দুর্বল ভেবেছিলেন। আপনার সামনে এখন দাঁড়িয়ে আছে, একজন মা।
এন্ড আই সোয়ার, চাচুমা, আজ যদি আমাকে আমার সন্তানের জন্য র*ক্তে হাত ভেজাতে হয়…তাহলে আমি র*ক্তের বন্যা ভাসানোর আগে থামবো না। আপনি আপনার ছেলেকে একটা জানোয়ার বানিয়েছেন, কিন্তু আমি আমার ছেলের দিকে হাত বাড়াতেও দিব না। আর হ্যাঁ, আপনি এটাকে ফাঁকা আওয়াজ হিসেবে নিবেন না। জাস্ট রিমেম্বার চাচুমা, যেই মেয়ে নিজের সন্তানের জন্য নিজের স্বামী সংসার ছাড়তে পারে সেই মেয়ে নিজের সন্তান কে রক্ষার জন্য কয়েক টা খু*ন করতেই পারে”

ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠে। সোফিয়ার চোখে এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময় খেলে যায়। সে সানার থেকে এমন ব্যবহার বা কথা মোটেও আশা করেনি আর না ভেবেছে। হঠাৎ আব্বাস সুযোগ বুঝে কোমর থেকে বন্দুক বের করে সরাসরি তাক করে সানার দিকে।
সবকিছু ঘটে এক সেকেন্ডের ভেতর। জ্যাক আর এসপি বুঝে ওঠার আগেই সানা পরপর দুইটা গুলি ছুঁড়ে দিল। গুলির শব্দে পুরো হল কেঁপে উঠে। আব্বাসের হাতে লাগানো ইলেকট্রনিক আর্ম মুহূর্তে ছিটকে উড়ে যায়। ধাতব টুকরো মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ে। আব্বাস চিৎকার করে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। র*ক্ত আর স্পার্ক একসাথে বের হচ্ছে। তার এই হাত একবার আরজে কেটে দিয়েছিল সেজন্য এখানে রোবটিক্স হাত লাগানো। সেটাই এখন মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। জিহাদ দৌড়ে গিয়ে নিজের ভাইকে তুলে। ঘরের সবাই কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ। সানা ধীরে বন্দুকটা নিচে নামায়। ঠিক তখন চারপাশের নিস্তব্ধতা কাটিয়ে হঠাৎ সানার পাশের সোফায় বসা এসপি হাততালি দিয়ে বলে,

–“ওয়াও, ম্যান হোয়াট আ শট। হাতটার মাঝখানে একদম পারফেক্ট। আমি তো জানতামই না তোর এই ট্যালেন্ট আছে। আমি আরও ভাবলাম তোর হাতে বন্দুক দেখেই সব পালিয়ে যাবে। আই মিন সিরিয়াসলি,
মানুষ কে লুটা ছাড়াও যে তোর আর কোন ট্যালেন্ট আছে তা এত বছর পর আজকে আমি জানতে পারলাম”
সানা ধোঁয়া ওঠা বন্দুকে ফু দিয়ে তার দিকে বিরক্তি সূচক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলে,
-“তাহলে ডিজাইনিং কি তোর কাটাপ্পা শশুর করে রে, চুরি কি তোর বউ করে”
এসপি এক মুহূর্ত ভেবে বলে,
-“চুরি করার ট্যালেন্ট!!! না মানে আজকে প্রথম শুনলাম আমি। যাইহোক কোথা থেকে শিখেছিস?”
এই বলে সে সোফিয়ার দিকে তাকিয়ে আবার বলে,
-“এক সেকেন্ড কটকটির চাচুমা পেকাটি, আপনি গোলাগুলি লাগাবেন না। আমরা একটু পার্সোনাল মিটিংয়ে আছি”
সে সোফিয়াকে আর কিছু বলতে না দিয়ে সানার দিকে তাকায় উত্তরের জন্য। সানা একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে ফিসফিস করে বলে,

–“আরে আমি প্রতি সপ্তায় মিসেস দিলরুবা খানমের কাছে যেতাম না, তাই উনি শিখিয়েছেন”
–“আর কি কি শিখেছিস?”
–“এইতো গুলি বন্দুক মেশিনগান চালানো সাথে পারমাণবিক বোমা কিভাবে বানাতে হয়। আর ওই বোমা দিয়ে কিভাবে বন্ধুকে খু*ন করতে হয়”
এসপি ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকায়।
এদিকে সোফিয়া জিহাদকে ইশারা করে, জিহাদ তার ইশারা বুঝে ফিসফিস করে বলে,
–“লেডি আরভির লোকেশন দেখা যাচ্ছে না, একটু আগে ম্যানশনে ছিল, কিন্তু……”
তার কথা কেটে সোফিয়া বলে,
–“বাকিরা কোথায়?”
–“লেডি একটু পরে এসে পড়বে”
তার জবাবে সোফিয়া খুশি হয় হয়ে যায়। ধীরে ধীরে তার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে ত্রুুর হাসি। হঠাৎ সানা আর এসপির কথোপকথনের মাঝেই আরেক দফা বাইরে থেকে ভেসে এলো হেলিকপ্টারের পাখার তীব্র শব্দ। শব্দটা এত কাছাকাছি, যেন পুরো ম্যানশনটাই কেঁপে উঠছে। সবাই একসাথে থেমে গেল। সোফিয়া ধীরে মাথা ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকায়। এরপরই পরপর বিস্ফোরণের শব্দ। বাইরে থেকে ভেসে আসছে গুলির বৃষ্টি তার সাথে মানুষের চিৎকার, আলফা টিমের সদস্যদের কণ্ঠ।

–“কভার নাও”
–“ডাউন, ডাউন”
–“আমাদের উপর অ্যাটাক….”
সে বাক্য সম্পন্ন করার আগেই শেষ। শব্দগুলো করিডোর পেরিয়ে হলরুমে ঢুকে পড়ছে। সোফিয়ার মুখের অভিব্যক্তি মুহূর্তে বদলে গেল। সে দাঁত চেপে বলে,
–“হোয়াট দ্য হেল..”
জিহাদ তাড়াতাড়ি জানালার দিকে এগিয়ে গিয়ে বাইরে তাকায়, মুহূর্তে তার চোখ বড় হয়ে গেল বাইরের দৃশ্য দেখে,
–“লেডি বাইরে….”

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১৪

কথা শেষ করার আগেই আবার এক দফা গুলির শব্দ। দুই তিনটা হেলিকপ্টার থেকে সরাসরি গুলি বর্ষণ হচ্ছে। ম্যানশনের বাইরে থাকা আলফা বাহিনী সম্পূর্ণ আক্রমণের মুখে। বাইরে থেকে ভেসে এলো একটা তীব্র আর্তচিৎকার। তারপর হঠাৎ সবকিছু যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। শুধু হেলিকপ্টারের শব্দ ঘুরছে আকাশে। ঘরের ভেতর সবাই দরজার দিকে তাকিয়ে আছে।
ধীরে ধীরে ম্যানশনের বিশাল দরজাটা ঠেলে খুলে যায়। ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে একটা লম্বা ছায়া ভেতরে প্রবেশ করে।

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১৬