হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১৮
সাবা খান
রাত তখন আরও গভীর, রাস্তার ল্যাম্পপোস্ট গুলো একটার পর একটা দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু মানুষজন নেই বললেই চলে। শহরের এই অংশটা অদ্ভুতভাবে নির্জন। জাইফেরার সিক্রেট মিটিং শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ আগে।
সারহাদ চুপচাপ নিজের কালো গাড়িতে উঠে সামনে এগিয়ে যায়। তার চোখ দুটো স্থির সামনে কিন্তু মাথার ভেতর চলছে হাজারো হিসাব। মিটিংয়ের প্রতিটা কথা, প্রতিটা প্ল্যান, প্রতিটা মুখ সবকিছু একে একে ভেসে উঠছে। গাড়ি কিছুটা দূর এগিয়ে যেতেই সারহাদের চোখ পড়ে সাইড ভিউ মিররে। সে ভ্রু কুঁচকে একটু ভালো করে তাকায়, নজরে আসে পিছনে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে সিতারা। সে একা দাঁড়িয়ে আছে। এক হাতে ফোন কানে, অন্য হাত দিয়ে বারবার চুল সরাচ্ছে, চোখে চাপা অস্থিরতা। সারহাদ কিছুক্ষণ তাকিয়ে বুঝতে পারে হয়তো তার গাড়ি খারাপ হয়ে গেছে। তারপর দৃষ্টি সরিয়ে মনে মনে বলে,
–“ওর টিম আসবে, আমার দরকার নেই”
গাড়ি আরও একটু সামনে এগোতেই পর মুহূর্তেই সে চোখ বন্ধ করে এক সেকেন্ড ভাবে। এত রাতে ফাঁকা রাস্তায় একটা মেয়ে একা দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক হবে না যতই সিআইডি হোক। সে হালকা নিঃশ্বাস ফেলে সামনে থাকা এজাজ কে বলে,
–“এজাজ, স্টপ দ্য কার”
গাড়ি থামিয়ে এজাজ অবাক হয়ে রিয়ার ভিউতে তাকায়, কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করার আগে সারহাদ নিজেই বলে,
–“ব্যাক করো”
গাড়ি ধীরে ধীরে রিভার্স নিয়ে আবার সেই জায়গায় আসে। হেডলাইটের আলো গিয়ে পড়ে সিতারার উপর। সে চোখ কুঁচকে তাকায় তারপর হঠাৎ স্থির হয়ে যায়। গাড়ির কাঁচ নামিয়ে সারহাদ ভেতর থেকে তার দিকে তাকায়। সিতারা এক মুহূর্তের জন্য যেন কিছুই বুঝতে পারে না। বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে। সে একটা ফাঁকা ঢোক গিলে ধীরে এগিয়ে আসে। সারহাদ শান্ত গলায় বলে,
–“মিস আদিল… এনি প্রবলেম?”
সিতারা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকে। তার গলাটা কেমন শুকিয়ে আসছে। তারপর বলে,
–“একচুয়ালি, আমার গাড়িটা নষ্ট হয়ে গেছে। আমি আমার টিমকে কল করেছি। ওরা আসবে, একটু টাইম লাগবে”
সারহাদ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে খুব স্বাভাবিকভাবে বলে,
–“আপনি চাইলে… আমার গাড়িতে আসতে পারেন। আমি আপনাকে মেইন রোডে নামিয়ে দিতে পারি”
বিপরীতে রমণীর থেকে কোন প্রতুত্ত্যর এলো না। সিতারার বুক ধুকপুক করছে। সে বুঝতে পারছে না এই অফারটা গ্রহণ করা উচিত কিনা। মাথার ভেতর সতর্কতার সিগন্যাল বাজছে, সে যথা সম্ভব চেষ্টা করছে এই মানুষটার থেকে দূরে থাকার। কিন্তু চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা, যে কয়েক ঘণ্টা আগেই ঠাণ্ডা মাথায় পুরো একটা মিটিং কন্ট্রোল করেছে। তার ভেতরে একটা অদ্ভুত বিশ্বাসও কাজ করছে। সে ধীরে বলে,
–“ইটস… ওকে
সারহাদ হালকা মাথা নাড়িয়ে আর কিছু বলে না। সিতারা কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে তারপর ধীরে ধীরে গাড়ির অন্য পাশ দিয়ে ঘুরে এসে দরজা খুলে বসে পড়ে। গাড়ির দরজাটা বন্ধ হতেই ভেতর আবার নীরবতা নেমে আসে। এসি’র ঠাণ্ডা বাতাসের মধ্যেও সিতারার কপালে ঘাম জমে গেছে। তার বুক এত জোরে ধকধক করছে যে মনে হচ্ছে পাশের সিটে বসা মানুষটা শুনে ফেলবে। সে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকার চেষ্টা করে। কিন্তু বারবার চোখ সরে যাচ্ছে পাশে বসা মানবের দিকে।
কিন্তু বিপরীতে সারহাদ একদম চুপ। তার দৃষ্টি সামনে স্থির। মুখের এক পাশ আলোয়, অন্য পাশ ছায়ায় ঢাকা। কিছুক্ষণ পর সে বলে,
–“আপনার টিম কতক্ষণে আসবে?”
সিতারা গলা পরিষ্কার করে বলে,
–“ম্যাক্সিমাম… পনেরো মিনিট”
–“হুম”
আর কোন শব্দ হলো না গাড়িতে, আবার নীরবতা। গাড়ি ধীরে ধীরে চলতে শুরু করে। সিতারা হাত মুঠো করে বসে আছে, আঙুলগুলো শক্ত হয়ে আছে। সিতারা একটু ইতস্তত করে বলে,
–“থ্যাঙ্ক ইউ…”
সারহাদ না তাকিয়ে বলে,
–“নাইটে একা দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক না”
এই এক লাইন আবেগহীন বাক্য তার কণ্ঠে থেকে নিঃসৃত হয় কিন্তু তবুও সিতারার বুকটা কেমন যেন হালকা হয়ে যায়।
গাড়ির ভেতরে তখনও সেই ভারী নীরবতা। বাইরে শহরের রাস্তা ফাঁকা, স্ট্রিটলাইটগুলো একটার পর একটা পেছনে পড়ে যাচ্ছে। ভেতরে শুধু ইঞ্জিনের মৃদু শব্দ আর দুজন মানুষের নিঃশ্বাসের ওঠানামার মৃদু শব্দ। সিতারা জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে, কিন্তু তার মন ঠিক বাইরে নেই। বারবার অনুভব করছে পাশে বসে থাকা মানুষটার উপস্থিতি। হঠাৎ নীরবতা কাটিয়ে তীব্র শব্দে সারহাদের মুঠোফোনটা বেজে ওঠে। সারহাদ ভ্রু কুঁচকে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকায়। স্ক্রিনে ভেসে উঠছে,
“মাই লিটল ব্রাদার”
সে এক মুহূর্ত দেরি না করে কলটা রিসিভ করে,
–“হ্যাঁ,বল”
ওপাশ থেকে এসপির বিচলিত কণ্ঠ ভেসে আসে,
–“ব্রো… সানি হসপিটালে”
সারহাদের চোখ সরু হয়ে আসে। সে তাৎক্ষণিক বুঝতে পেরে বলে,
–“আমি আসছি”
এই বলে সারহাদ কল কেটে তারপর ধীরে মাথা ঘুরিয়ে সিতারার দিকে তাকায়। সিতার তার দৃষ্টি বুঝে মাথা নাড়িয়ে বলে,
–“সমস্যা নেই…আমিও হসপিটালের দিকেই যাব। আপনি ওখানেই চলে যান”
সারহাদ সাথে সাথে এজাজ কে বলে,
–“এজাজ, টার্ন দ্য কার”
–“ওকে বস”
গাড়ি ঘুরে যায় হসপিটালের দিকে। ভিতরে সারহাদ এজাজ কে তাড়া দিতে থাকে স্পিড বাড়িয়ে দ্রুত হসপিটাল যাওয়ার জন্য।
এই গভীর রাতেও শহরের কিছু জায়গা আছে, যেখানে রাত-দিন বলে কিছু নেই। তার মধ্যে অন্যতম ঢাকা সিটি হসপিটাল। বিশাল আধুনিক, কাঁচে ঘেরা বিশাল বিল্ডিংটা দূর থেকেই আলাদা করে চোখে পড়ে। সাদা নীল আলোয় ঝলমল করছে পুরো কমপ্লেক্স।গেটের সামনে একটার পর একটা অ্যাম্বুলেন্স, ভেতরে ঢুকছে আর বের হচ্ছে রোগী, ডাক্তার, নার্স সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত ব্যস্ততা।
কিন্তু এই ব্যস্ততার মধ্যে হাসপাতালের ভিআইপি এরিয়াটা একদম পুরোপুরি ঘিরে রাখা হয়েছে। চারদিকে সশস্ত্র গার্ড, প্রতিটা করিডোর, প্রতিটা প্রবেশপথে কড়া নজরদারি। এই পুরো সিকিউরিটি পরিচালনা করছে, জ্যাক। কালো পোশাকে চোয়াল শক্ত করে দুহাত পকেটে ঢুকিয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে করিডোরের একপাশে। তার ধূসর চোখজোড়া একবার ডানদিকে, একবার বামদিকে ঘুরছে একটা পিঁপড়েও যেন তার নজর এড়িয়ে যেতে না পারে।
ঠিক সেই ভিআইপি জোনের একদম মাঝখানে ইমার্জেন্সি রুমের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এসপি। নাহ, সে দাঁড়িয়ে নেই অস্থির ভাবে পায়চারি করছে গত দুই ঘন্টা ধরে। তার পা এক সেকেন্ডের জন্যও থামছে না। চোখ লাল, মাথার চুল এলোমেলো, শার্টের বোতাম দুটো খোলা, চেহারায় স্পষ্ট আতঙ্ক। সানিতার প্রেগন্যান্সির শুরুতেই অনেক প্রবলেম ছিল। যার কারণে সে নিজেকে চাইতেও শান্ত রাখতে পারছে না। ভিতরে সানিতার ডেলিভারি চলছে। এসপি বহুবার ডক্টর কে রিকোয়েস্ট করেছে, সে ও ভিতরে যাবে। কিন্তু প্রতিবারই ডাক্তার তাকে না করে দিয়েছে। এখন সে শুধু হাঁটছে আর নিজের চুলে হাত দিচ্ছে। কণ্ঠ থেকে ফিসফিস করে বের হয়,
–“ড্যাম ইট….”
তার গলা শুকিয়ে আসছে, বারবার শুকনো ঢোক গিলে গলা ভিজানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। খুশদিল ফারুকী ও লিপি ফারুকী কে কল করে বলেছে সানা। এসপির তো কোন দিকেই খেয়াল নেই সানিতার টেনশনে। মিসেস লিপি কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে। তবে তাদের আসতে সময় লাগবে কেননা ব্যবসার কাজে খুশদিল ফারুকী শহরের বাইরে গিয়েছেন। এবার নিজের স্ত্রী কেও সাথে করে নিয়ে গেছেন। তাই তাদের আসতে সময় লাগছে।
সামনে বসে আছে সানা আর ঈশানী। সানা চুপচাপ দুই হাত শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বসে আছে। তার মুখে কোনো কথা নেই, কিন্তু চোখে মুখে চিন্তার চাপ স্পষ্ট। ঈশানী মাঝে মাঝে তার দিকে তাকাচ্ছে, আবার এসপির দিকে। কাউকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো অবস্থায় সে নিজেও নেই। ঈশানীর পাশের চেয়ারে বসে আছে রওনাক। সে চুপচাপ বসে আছে, মাঝে মাঝে নিচের দিকে তাকাচ্ছে, আবার ঈশানীর দিকে, আবার মাথা তুলে পরিস্থিতি বুঝার চেষ্টা করছে।
আর ঠিক সানার পাশে দাঁড়িয়ে আছে আরজে। তার কোলে ছোট্ট আরভি, বাচ্চাটা গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে। মাথা বাবার কাঁধে হেলে আছে, ছোট্ট হাতটা আরজের শার্ট আঁকড়ে ধরা। সানা আসার সময় ওকে রেখে আসতে চায়নি, কখন আবার কী হয়ে যায়। মূলত সে এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না, সোফিয়া এত সহজে আরভির পিছু ছেড়ে দিয়েছে। ডক্টর সাইয়েদা তাকে বলেছে,
“সোফিয়া এমন এক সাইকো যে, তার মাথায় কিছু একটা আসলে সে সেটা বাস্তবে রূপ দেওয়ার আগ পর্যন্ত থামে না। সেটা যেভাবেই হোক সে করেই ছাড়ে।
রমণী আরজে কে বলেছে বাড়িতে থাকতে। কিন্তু নাহ, আরজে নাকি সানাকে একা কিছুতেই ছাড়বে না। তাই ঘুমের মধ্যেই তুলে এনেছে আরভি কে। আরজে এক হাতে আরভিকে ধরে, অন্য হাতে আলতো করে তার পিঠে চাপড় দিচ্ছে, যেন ঘুমটা না ভাঙে। তার চোখ স্থির সানার দিকে। আর সানা কিছুক্ষণ পর পর তার দিকে কটমট দৃষ্টি নিক্ষেপ করছে। এই লোকের জন্য সে এসপিকে গিয়ে সান্ত্বনাও দিতে পারছে না। আরজে তাকে তার কাছে যেতেই দিচ্ছে না।
এক কোণার চেয়ারে বসে আছে সিয়া। তার চোখ টলমল করছে, যেন পলক ফেললেই অশ্রু গড়িয়ে পড়বে। সে বারবার হাত দিয়ে চোখ মুছছে, কিন্তু কান্না থামাতে পারছে না, তার বুকটা কাঁপছে। এই মুহূর্তে অপারেশন রুমের ভেতরে কি চলছে, সেটা কল্পনা করতেই গা শিউরে উঠছে। অতিরিক্ত সুন্দর হওয়ার দরুন তার সারা আদল লাল আভা হয়ে ওঠেছে। সিয়ার একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে কাইলিন। সে একবার সিয়ার দিকে তাকায়। তারপর নাক-মুখ কুঁচকে মনে মনে বলে,
–“বাচ্চা হবে অন্য কারো, এই পিচ্চিটা এখানে বসে কাঁদছে কেন?”‘
তার চোখে বিরক্তি, কিন্তু ভেতরে কোথাও একটা অস্বস্তিও কাজ করছে, যেটা সে নিজেও স্বীকার করতে চায় না।
ইমার্জেন্সি করিডোরের টানটান নীরবতার মাঝেই হঠাৎ করেই বাইরে থেকে ভেসে আসে দ্রুত পায়ের শব্দ। সবাই একসাথে মুখ তুলে তাকায় নজরে আসে কাঁচের দরজা ঠেলে ভিতর প্রবেশ করে সারহাদ, আর তার ঠিক পাশেই সিতারা। এসপি তার ভাই কে দেখে সে প্রায় দৌড়ে গিয়ে সারহাদের সামনে দাঁড়ায়। এসপির চোখ লাল, গলা কাঁপছে,
–“ব্রো, ভেতরে… সানি… ওর অবস্থা… ডাক্তার কিছুই ঠিক করে বলছে না। আমি কিছু বুঝতে পারছি না”
এসপির চিন্তায় কথাগুলো কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। সারহাদ এক মুহূর্তও দেরি না করে এগিয়ে এসে নিজের ভাইকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে,
–“এই… রিল্যাক্স মাই ব্রাদার, কিছু হবে না ওর”
এক হাত দিয়ে এসপির পিঠে চাপড় দেয়।কিন্তু এসপি থামছে না। সে একটু দূরে সরে গিয়ে আবার হাঁটা শুরু করে। হাত বারবার মুষ্টিবদ্ধ করছে… আবার খুলছে,
–“ব্রো, যদি কিছু হয়ে যায়… আমি’
শব্দ গুলো তার গলায় আটকে যায়। মনে হচ্ছে বুকের ভেতরটা ফেটে যাবে। সে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে। যেন ভেতরের দেয়াল ভেদ করে দেখতে পারবে কি হচ্ছে।
ওইদিকে আরজের সারহাদকে দেখার সাথে সাথেই তার মুখের রঙ বদলে যায়। চোখের ভেতর নেমে আসে অন্ধকারের ঘনঘটা। একটাও শব্দ না করে সে সোজা গিয়ে সানার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে। সানা প্রথমে বুঝতে পারেনি। সে বিরক্ত হয়ে মাথা তুলে তাকায়,
–“এই আপনি এভাবে সামনে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?”
আরজে একটুও টললো না। রমণীর বিরক্তিকর দৃষ্টি আরজের পাশ দিয়ে গিয়ে থামে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সারহাদের ওপর। মুহূর্তে সে নাক সিটকিয়ে আরজের দিকে তাকায়। এবার সে বুঝতে পারছে। এদিকে আরজে দন্ত চেপে দুই ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। না মানে সে বুঝতে পারছে না, এক ভাই কি কম ছিল যে আরেক জন এসে হাজির হলো। ঠিক তখনই, আরভি একটু নড়েচড়ে ওঠে আরজের কোলে। আরজে তৎক্ষণাৎ কোলের দিকে তাকায়। তার মুখের কঠিন ভাবটা নরম হয়ে আসে। সে আলতো করে আরভিকে জড়িয়ে ধরে সানাকে সেখানে রেখে একটু দূরে সরে যায়। সানা আবার মাথা নিচু করে দোয়া দুরুদ পড়তে থাকে সানিতার জন্য।
অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা সারহাদ ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকায় সানার দিকে। পর মুহূর্তে সে চোখ নামিয়ে হেঁটে গিয়ে ইমার্জেন্সি রুমের একটু দূরে এক কোণায় বসে পড়ে। কিন্তু সেখান থেকেও তার দৃষ্টি বারবার গিয়ে থামে একই জায়গায়, সানার ওপর। যেন বহুদিনের হারানো কিছু সামনে পেয়েছে। যেন এই এক ঝলক দেখাটুকুই তার জন্য যথেষ্ট না, সে তাকিয়েই থাকে ভ্রুক্ষেপহীন ভাবে।
বিষয় টা সবার অগোচরে হলেও একজন ঠিকই লক্ষ্য করে সে আর কেউ না সিতারা। প্রথমে সে বুঝতে না পেরে আবার তাকায়। এবার সে স্পষ্ট দেখে সারহাদ, একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সানার দিকে। একবারও চোখের পলক ফেলছে না। সিতারার গলা শুকিয়ে আসছে। তার যথেষ্ট বয়স হয়েছে কারো দৃষ্টি বোঝার। সে একটা ফাঁকা ঢোক গিলে নিচের দিকে তাকায়। তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি তৈরি হচ্ছে, অস্বস্তি, অজানা ভয়, আর সাথে সাথে একটা হালকা জ্বালা। সিতারার হাত ধীরে ধীরে মুষ্টিবদ্ধ হয়ে যায়। তার ভেতরে নিঃশব্দে কিছু একটা জ্বলছে। প্রতিহিংসা, না কি ঈর্ষা, সে নিজেও বুঝতে পারছে না। কিন্তু একটা জিনিস সে পরিষ্কার বুঝছে, এটা তার ভালো লাগছে না। রমণী চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে নিঃশব্দে। আর ওইদিকে সারহাদ এখনো তাকিয়ে আছে।এমনভাবে, যেন বহু বছরের তৃষ্ণা নিয়ে এক ঝলক পানির সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
সময় যেন থমকে আছে করিডোরে। প্রায় আরও আধঘণ্টা পর ইমার্জেন্সি রুমের দরজা খুলে বেরিয়ে আসে ডক্টর, আর তার কোলে একটা ছোট্ট নড়বড়ে শরীর। পরক্ষণেই ভেসে ওঠে কাঁদতে থাকা এক নবজাতকের কান্না। একটা ছোট্ট মেয়ে। তার ছোট্ট বুক ওঠানামা করছে দ্রুত, চোখ বন্ধ, কণ্ঠে ভাঙা ভাঙা কান্না। এই পৃথিবীতে তার প্রথম আওয়াজ।ডক্টর মৃদু হাসি নিয়ে এগিয়ে আসে এসপির দিকে,
–“কনগ্র্যাচুলেশন মিস্টার চৌধুরী। ইউ বিকাম দ্য ফাদার”
শব্দগুলো শুনেও যেন এসপি ঠিকমতো ধরতে পারছে না। সে এখনো স্থির দাঁড়িয়ে আছে চোখ বড় বড় করে। হঠাৎ যেন তার শ্বাস আটকে আসছে। তার কণ্ঠ থেকে ফিসফিস করে বের হয়,
–“আমার… মেয়ে?”
এই মানুষটার সাথে সে প্রতিদিন সানিতার পেটের কাছে মাথা রেখে ফিসফিস করে বলত,
–“অ্যাঞ্জেল, পাপা এখানে আছে। তুমি তাড়াতাড়ি আসো”
আজ সেই কণ্ঠের উত্তর, তার সামনে জীবন্ত। সে কাঁপা কাঁপা হাত গুলো বাড়িয়ে দেয় বাচ্চাটার দিকে। যেন এই ছোট্ট প্রাণটাকে ছুঁলেই ভেঙে যাবে। সারহাদ এসে তার কাঁধে হাত রেখে হাসি মুখে বলে,
–“কনগ্র্যাচুলেশন, কোলে নেয় ওকে”
এসপি কাঁপা কাঁপা হাতে বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নেয়। আর সেই মুহূর্তেই তার ভেতরে কিছু একটা যেন বদলে যায়। তার মনে হচ্ছে পুরো পৃথিবী থেমে গেছে। আর তার চোখ নিচের দিকে ছোট্ট গোলগাল মুখ, মোলায়েম গাল, একদম সানিতার মতো তার আরেকটা পৃথিবী শুয়ে আছে। আর সেই ছোট্ট ছোট্ট হাত, একটা আঙুল হালকা করে নড়ে ওঠে। এসপির বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে। তার গলা শুকিয়ে আসে। চোখ ঝাপসা হয়ে যায় খুশির অশ্রুজলে। সে আবারও বলে,
–“এই ছোট্ট মানুষ টা সত্যিই আমার”
সারহাদ হালকা হেসে বলে,
–“হুম”
এসপির মনে হচ্ছে এই ছোট্ট প্রাণটা যেন তার বুকের ভেতর ঢুকে গেছে। সে ধীরে ধীরে বসে পড়ে সামনের চেয়ারে। কোলের দিকে তাকিয়ে থাকে অবাক হয়ে। তারপর ঝুঁকে তার কানের কাছে সর্ব প্রথম আযান দেয়। তারপর মুখ উঠিয়ে বাচ্চা টার দিকে তাকিয়ে বলে,
–“এতটুকু তুমি, অথচ মনে হচ্ছে আমার পুরো পৃথিবীটা আমার কোলে এসে শুয়ে আছে”
এসপির খুশিতে কথা বেরুচ্ছে না। তবুও আবার বলে,
–“হেই অ্যাঞ্জেল,
জানো আমি প্রতিদিন তোমার সাথে কথা বলতাম, তুমি শুনতে পেতে না, তাই না? তবুও বলতাম শুধু এই দিনের জন্য। আমি আমি তোমার পাপা”
সে সাবধানে হাতটা একটু নাড়িয়ে বলে,
–“এই দেখো একটু তাকাও তো আমার দিকে, চিনতে পারছো?
না পারবে কীভাবে, আমি তো নতুন, কিন্তু তুমি… তুমি তো আমার সব। তুমি আসার আগেও তুমি আমার ছিলে, আর আজ তোমাকে কোলে নিয়ে মনে হচ্ছে
আমার পুরো পৃথিবীটা এই ছোট্ট শরীরের ভেতর ধরা আছে”
অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই তারদিকে ভেজা দৃষ্টিতে ঠোঁটে প্রশান্তির হাসি টেনে তাকিয়ে আছে। এসপি আলতো করে বাচ্চার ছোট্ট হাতটা নিজের আঙুলে ছোঁয়ায়। মুহূর্তেই বাচ্চাটা তার আঙুলটা শক্ত করে ধরে ফেলে। এসপি থমকে যায়। তার চোখে পানি টলমল করে ওঠে,
–“জানো, আমি খুব শক্ত মানুষ নই, কিন্তু আজ তোমাকে কোলে নিয়ে মনে হচ্ছে, তোমার জন্য আমি পৃথিবীর সবচেয়ে শক্ত মানুষ হয়ে যেতে পারি”
তার কণ্ঠ আরও নরম হয়ে আসে,
–“আমি প্রমিজ করছি, তোমাকে কখনো কাঁদতে দেব না, কখনো না। তোমার চোখে কখনো পানি আসতে দেব না, কেউ তোমাকে আঘাত করার আগেই আমি দাঁড়িয়ে যাবো সামনে। তুমি আমার অ্যাঞ্জেল, আমার প্রাণ, আমার সবকিছু”
সে মাথা নিচু করে বাচ্চার কপালে ঠোঁট ছোঁয়ায়। মুহূর্তে তার বুকের ভেতর গর্ব, ভালোবাসা, ভয়, দায়িত্ব সব যেন একসাথে ভিড় করে। প্রথমবার, সে বুঝতে পারছে বাবা হওয়া কাকে বলে।
এদিকে সানা ঠোঁট চেপে হাসছে। তার চোখেও খুশির ঝলক। ঈশানী তার পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে,
–“দেখ… আমাদের বিটকেল বাবা হয়ে গেছে”
–“হ্যাঁ, আর তুই এখনো মিস থেকে মিসেস হতে পারলি না”
সাথে সাথে ঈশানীর ঠোঁটের হাসি মিলিয়ে যায়। সে নাকের পাটাতন ফুলিয়ে সানার দিকে তাকায়। কিন্তু সানা তাকে খোঁচা মেরেই ঠোঁট চেপে হেসে এসপির দিকে চলে যায়। এক কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা সিয়ার চোখ লাল হয়ে আছে কান্নায়, কিন্তু এবার সেই মুখেও ফুটে ওঠে একটুকরো নরম হাসি। সারহাদ এসপির কাছে এসে হাত বাড়াতেই এসপি অন্য দিকে ঘুরে যায়। মুখে বলে,
–“ও আমার কাছেই থাকুক”
সারহাদ কিছু না বলে ঠোঁটে হাসি টেনে অন্য দিকে চলে যায়। এসপি এখনো নিজের ছোট্ট মেয়েকে বুকে আগলে বসে আছে। ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলে,
–“পাপা আছে, তুমি ভয় পেও না”
আর সেই ছোট্ট মেয়েটা বাবার আদর পেয়ে একদম তার বুকে মাথা গুঁজে ধীরে ধীরে কান্না থামিয়ে দেয়।
সানা তার পাশে বসে হালকা হেসে বলে,
–“দেখি তো, আমার পরীটাকে একবার”
এসপি এক মুহূর্ত থেমে সানার চোখের দিকে তাকায়। আর সানার চোখের ভাষা বুঝতে তার এক সেকেন্ড ও লাগলো না, মানে এখন না দিলে তোর খবর আছে। তারপর একটু অনিচ্ছা নিয়েই বাচ্চাটাকে সানার কোলে তুলে দেয়,
–“আস্তে… খুব আস্তে”
সানা বাচ্চা নেওয়ার আগেই খেঁকিয়ে উঠে,
–“শালা, আগে আমি মা হয়েছি তারপর তুই বাপ হয়েছিস। আমি খুব ভালো করেই জানি বাচ্চা কীভাবে কোলে নিতে হয়। দেয়”
এসপি চুপচাপ দিয়ে দিল। সানা বাচ্চাটাকে কোলে নিয়েই থমকে যায়। তার চোখ নরম হয়ে আসে,
–“আহ্… কী মিষ্টি…”
সে আঙুল দিয়ে বাচ্চার গালটা আলতো ছোঁয়ে বলে,
–“এই গালটা দেখ… একদম মাখনের মতো। আর এই নাকটা হুবহু সানিতার। এই ছোট্ট পরী, এত কান্না করছিলি কেন হুম? জানো না তোর পাপা কত ভয় পেয়ে গেছে?”
পাশে দাঁড়িয়ে ঈশানী মুচকি হেসে বলে,
–“দেখে মনে হচ্ছে তুইই ওর মা”
সানা কিছু না বলে এসপির দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে হেসে আবারও বাচ্চার দিকে নজর দেয়। এসপি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। তার চোখ বারবার ইমার্জেন্সি রুমের দরজার দিকে চলে যাচ্ছে। এসপি সানাকে বলে,
–“আমি… আমি একবার সানির কাছে যাই”
সানা মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়। এসপি দ্রুত পায়ে এগিয়ে যায় দরজার দিকে। করিডোরে এতক্ষণ পর আরজে আসে, তার কোলে আরভি। ছোট্ট আরভি ঘুম থেকে আধো জেগে আছে, দুই হাতে চোখ কচলাচ্ছে। এতক্ষণ ধরে আরজে অনেক চেষ্টা করেছে তাকে ঘুম পাড়ানোর, কিন্তু পারেনি। আরভির চোখ সানাকে খুঁজে পেতেই এক ঝটকায় বাবার কোলে থেকে নেমে যায়,
–“মম…”
আরভি ধীরে ধীরে এসে সানার পাশে দাঁড়ায়। আরজেও তার সাথে আসে, তার চোখ গিয়ে থামে বাচ্চাটার উপর। এক মুহূর্ত সে থেমে যায়। তার চোখে অদ্ভুত এক নরম ছায়া। তারপর ধীরে ধীরে সানার কানের কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে,
–“ওয়াইফি… তাড়াতাড়ি বাড়ি চলো…”
সানা ভ্রু কুঁচকে তাকায়,
–“কেন?”
আরজে ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে বলে,
–“আমার এমন একটা প্রিন্সেস চাই এক্ষুনি”
সাথে সাথে রমণী কটমট করে তাকায় তার দিকে। তার ইচ্ছা করছে এই লোকের কানের নিচে এমন বাজান বাজাতে। আরজে ঠোঁট কামড়ে হেসে অন্য দিকে চলে যায় তার ফোনে কল আসাতে। ওদিকে আরভি ঘুমজড়ানো চোখে ঈশানীর কোলে উঠে বসে বলে,
–“আন্না… এটা কে?”
–“এটা তোমার ছোট পাপার ছোট্ট পরী”
আরভি একটু ভেবে তারপর মায়ের দিকে তাকায়,
–“মম…এটা কি আমার বোন?”
সানা তড়াক করে তার দিকে তাকায়। তৎক্ষনাৎ তাকে শুধরে বলে,
–“আসতাগফিরুল্লাহ, সোনা, বোন না। তোমার বউ পৃথিবীতে ল্যান্ডিং করেছে। বউকে বোন বলে না ভীর”
পাশ থেকে ঈশানী নাক মুখ কুঁচকে তার দিকে তাকায়। তারপর খেঁকিয়ে ওঠে,
–“কি বললি তুই? ডাইনি, তুই আবার আমার আরভিকে কি শিখাচ্ছিস”
সানা নির্বিকার চিত্তে বলে,
–“চুপ কর, ওকে এখন থেকেই সংসার শিখাচ্ছি”
–“তোর মাথা ঠিক আছে? এই পাঁচ বছরের বাচ্চাকে বউ শিখাচ্ছিস?”
সানা তড়িঘড়ি করে বলে,
–“এক সেকেন্ড, প্রথমত ওর বয়স পাঁচ বছর না, এটা পাঁচ বছর, সাত মাস, দুই দিন, পনেরো ঘন্টা, আটাশ মিনিট, এক সেকেন্ড। দ্বিতীয়ত, ওর সাংসারিক হওয়ার বয়স হয়ে গেছে। এখন থেকে সংসারে মন না দিলে বড় হতে হতে বখাটে হয়ে যাবে”
ঈশানী সন্দেহ জনিত স্বরে প্রশ্ন ছুড়ে,
–“তুই শিউর ওর বয়স এটা?”
–“পাঁচ বছর সাত মাস ঠিক আছে, বাকিটা আমি আমার থেকে বলেছি। তো কী হয়েছে?”
ঈশানী আর কী বলবে এই মেয়ে। আর সে বললেই যে শুনবে এমনও না। তার থেকে না বলাই ভালো। তাই ঈশানী আরভিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বসে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই, আরভি আবার তার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে। কিয়ৎকাল পর পাশ থেকে ঈশানী একটু ঝুঁকে নিচু গলায় বলে,
–“ডাইনি, আই থিঙ্ক আরভিকে এখন বাড়িতে নিয়ে যাওয়া দরকার”
সানা ভ্রু কুঁচকে তাকায়,
–“না, আমি কোথাও যাচ্ছি না। সানিতার জ্ঞান না ফেরা পর্যন্ত আমি এখানেই থাকবো”
–“তুই থাক, কিন্তু আরভি তো ছোট, ও ঘুমাচ্ছে, ক্লান্তও। এখানে ওর জন্য ঠিক না”
সানা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তার চোখ চলে যায় আরভির দিকে যে ঈশানীর কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে সে। তার বুকটা নরম হয়ে আসে। ধীরে বলে,
–“ঠিক আছে… তুই ওকে নিয়ে যা। কিন্তু সাবধানে”
–“আমার কাছে থাকলে ওর কিছু হবে না”
–“তুই বস, আমি রানভীর কে বলছি”
সানা বাচ্চাটাকে কোলে নিয়েই আরজের কাছে যায়। আরজে প্রথম রাজি হয়নি পরে ছেলের দিকে তাকিয়ে ‘হ্যাঁ’ বলে। এমনিতেই ছোট তার উপর এতক্ষণ হসপিটাল থাকলে অসুস্থ হয়ে পড়বে। তবে সে তার সিকিউরিটি ডাবল করে দেয়, সাথে জ্যাককে পাঠায়।কিছুক্ষণের মধ্যেই সব রেডি হয়ে যায়।
ঈশানী আরভিকে কোলে নিয়ে ধীরে ধীরে নিচে নামতে থাকে। তার সাথে জ্যাক আর রওনাক। হাসপাতালের নিচতলায় নামতেই ঈশানীর কানে আসে একটা পরিচিত কণ্ঠ,
–“ঈশা…”
ঈশানী পা থামিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই নজরে আসে,
–“রিজভী ভাই…”
তার মুখে হালকা হাসি ফুটে ওঠে। রিজভী এগিয়ে আসে। চোখে স্পষ্ট উচ্ছ্বাস নিয়ে বলে,
–“হাই ঈশা, কেমন আছো?”
–“ভালো… তুমি?”
–“আলহামদুলিল্লাহ, এন্ড কংগ্রেজুলেশন। শেষ মুহূর্তে তোমার আর অপারেশন করতে হয়নি। এজন্য আমি তোমাকে আগেই বলেছিলাম, ব্রেইনে কম চাপ পড়লে তুমি মেডিসিন নিয়েই ঠিক হয়ে যাবে”
ঈশানী মাথা নাড়িয়ে আরও এটা সেটা বলে। রিজভী একটু ঝুঁকে আরভির দিকে তাকায়,
–“এটা তো, আরজের ফটোকপি?”
–“হ্যাঁ”
–“ওর ঘুম ভেঙে গেলে ওর বাবা নিশ্চয় আমাকে মেরেই ফেলবে”
রিজভীর এমন কথায় দুজনেই হেসে ওঠে। তাদের বাক্যলাপ স্বাভাবিক হলেও ঈশানীর পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা রওনাকের তা মোটেই ভালো ঠেকছে না। তার চোখ স্থির হয়ে আছে ঈশানী আর রিজভীর উপর। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে, সাথে হাত ধীরে ধীরে মুষ্টিবদ্ধ হয়ে যায়। মনের কোণে বারবার সন্দেহ রা উঁকি দিচ্ছে। সবাই যেখানে তাকে ‘ঈশানী’ বলে, কিন্তু এই লোকটা কেন ‘ঈশা’ বলছে?
আর শুধু নাম না, তার চোখের দৃষ্টিও। একজন পুরুষ আরেকজন পুরুষের দৃষ্টি খুব ভালো করেই বোঝে। আর রিজভীর দৃষ্টিতে ঈশানীর জন্য রওনাক সবসময় অতিরিক্ত কেয়ার, অতিরিক্ত আপন ভাব দেখতে পায়, যা তার সহ্য হচ্ছে না। তার বুকের ভেতর চাপা রাগ জমতে থাকে। কিন্তু মুখ ফুটে কিছুই বলছে না। কিছুক্ষণ পর ঈশানী রিজভী কে বিদায় জানিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। রিজভী এতক্ষণ ওটিতে থাকায় তার দেরি হয়ে গিয়েছে। সে সিঁড়ি বেয়ে চলে যায় আরজের কাছে।
হাসপাতালের বাইরে রাত যেন আরও গভীর। ফটকের সামনে গাড়ির সারি দাঁড়িয়ে আছে। মাঝখানে একটা কালো গাড়ির ড্রাইভিং সিটে জ্যাক। পিছনের সিটে ঈশানী কোলে ঘুমন্ত আরভিকে নিয়ে বসেছে। সামনের সিটে বসে রওনাক জ্যাকের সাথে। তার চোখ সামনে থাকলেও কিন্তু মন অন্য কোথাও। একটার পর একটা গাড়ি তাদের পেছনে লাইন ধরে দাঁড়ায়। জ্যাক ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে শেষ বারের মতো সব গার্ডদের এলার্ট করে। এদিকে তার কানে থাকা ইয়ারপিসে আরজে তাকে বারবার সতর্ক করছে। গাড়ি গুলো একে একে ছুটে চলে অন্ধকার রাস্তায়।
ইমার্জেন্সি রুমের সামনে আবারও ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশটা। একটু আগেও যেখানে নতুন জীবনের হাসি, আনন্দ, চোখের জল মিশে ছিল সেই জায়গাটাতেই এখন দম বন্ধ করা নীরবতা। এসপি থামতেই পারছে না।করিডোর জুড়ে সে পায়চারি করছে, একবার এই দিকে, একবার ওই দিকে। তার হাত বারবার মুষ্টিবদ্ধ হচ্ছে, আবার খুলে যাচ্ছে।
মনে হচ্ছে আর এক সেকেন্ডও দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না। তার মনে শুধু একটাই শব্দ বাজছে,
–‘সানি”
হঠাৎ ইমার্জেন্সি রুমের দরজাটা খুলে ডক্টর বেরিয়ে আসে। এসপি দৌড়ে গিয়ে দাঁড়ায় তার সামনে। তারপর এলোমেলো চিত্তে বলতে থাকে,
–“ডক্টর… আমার বউ… কেমন আছে? সানি ঠিক আছে তো? বলুন… কিছু বলুন…”
ডক্টর এক সেকেন্ড থেমে গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
–“পেশেন্টের অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক”
এই একটা বাক্য যেন এসপির মস্তিষ্কে বজ্রাঘাতের মতো আঘাত হানে। সে কয়েক পা পিছিয়ে যায়, সারহাদ তাকে ধরে ফেলে। কাঁপা কাঁপা স্বরে আওড়ায়,
–“ক… কি বলছেন আপনি…? না… না… এটা হতে পারে না, সানি.. ”
তার গলা শুকিয়ে আসছে, বাকি শব্দ গুলো যেন কণ্ঠস্বর থেকে বেরুতে পারছে না। চোখ ফাঁকা হয়ে যায়। একটু আগের সেই খুশি, যে খুশিতে সে নিজের মেয়েকে বুকে আগলে রেখেছিল। সেটা যেন মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। ডক্টর এবার একটু কঠোর গলায় বলে,
–“এটা একটা ক্রিটিক্যাল প্রেগনেন্সি কেস ছিল। আপনাদের পেসেন্ট কে অনেক আগেই নিয়ে আসা উচিত ছিল। লাস্ট মোমেন্টে আনার কারণে এখন পরিস্থিতি খুবই জটিল হয়ে গেছে। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি কিন্তু কিছুই এখন নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না”
প্রতিটা শব্দ যেন এসপির বুকের ভেতর ছুরির মতো বিঁধতে থাকে। সে দুই হাত মাথায় দিয়ে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে বলে,
–“না… না… কিছু হবে না… ওর কিছু হতে পারে না। ডক্টর প্লিজ, ওকে বাঁচান যেভাবেই হোক… প্লিজ”
তার কণ্ঠ ভেঙে আসছে, চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু। সে যেন নিজেকে সামলাতেই পারছে না। সারহাদ এগিয়ে এসে শক্ত হাতে এসপির কাঁধ ধরে বলে,
–“ডোন্ট ওয়ারি এসপি, শি উইল বি ফাইন”
এসপি মাথা নেড়ে বলতে থাকে,
–“ওর কিছু হয়ে গেলে আমি বাঁচবো না… আমি পারবো না। প্লিজ ব্রো”
–“কিছু হবে না ওর”
এসপি মাথা নিচু করে কাঁদতে থাকে।
এদিকে সানা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। তার চোখেও পানি টলমল করছে। কিন্তু তার কোলে থাকা বাচ্চা টা কখন থেকে কেঁদেই চলছে,হয়তো মায়ের জন্য। সানা এক জায়গায় দাঁড়াতেও পারছে না। আরজে দুই তিন বার কোলে নেওয়ার ট্রাই করেছে। কিন্তু তার কোলে গিয়ে বাচ্চা আরও জোরে কান্না করে দেয়। অন্য দিকে খুশদিল ফারুকীদের আসতে আরও দুই ঘন্টা লাগবে। সানা আবারও বাচ্চা টাকে নিয়ে অন্য দিকে যায়।
রাতের অন্ধকারের বুক ছিঁড়ে দাঁড়িয়ে আছে বিলাসবহুল এক ম্যানশন। বাইরে থেকে কৃত্রিম আলোয় জ্বলমল করছে পুরো ম্যানশন। সেই প্রাসাদ সম ম্যানশনের ভিতরের একটা কক্ষে এক ফোঁটা আলোও নেই। ঘরের ভেতর সম্পূর্ণ অন্ধকার। ঘরের মাঝখানে একটা রকিং চেয়ার ধীরে ধীরে দুলছে। সেই চেয়ারে বসে আছে, লরেন্স স্টিফেন ও এলেনা ফ্রাঞ্চেস্কার ছেলে মার্কান স্টিফেন।
তার মুখ দেখা যাচ্ছে না পুরোপুরি, শুধু হালকা ধূসর চোখ দুটো অন্ধকার ভেদ করে জ্বলছে। ঠোঁটের কোণে হালকা বাঁকা হাসি, যেন এই অন্ধকারই তার আসল চেহারা।সে ধীরে ধীরে পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে। স্ক্রিনের আলো এক মুহূর্তের জন্য তার মুখে পড়ে, আর সেই আলোতেই ফুটে ওঠে তার পৈশাচিক প্রশান্তি। স্ক্রিনে ভেসে ওঠে, “মাই সান” সে কল করে। সাথে সাথে ফোন রিসিভ হয়,
–“ইয়েস, ড্যাড”
–“হোয়ার ইজ আরভি”
ওপাশ থেকে সাথে সাথে উত্তর আসে,
–“উইথ মি”
এক মুহূর্তের নীরবতা তারপর মার্কান অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। সে হাসি থামিয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে শুধালো,
–“ওয়েল ডান… মাই সান। আই’ম প্রাউড অফ ইউ… ভেরি প্রাউড। তুমি জানো তো… এই ছেলেটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ”
বিপরীত পাশ থেকে আসে ঠান্ডা কণ্ঠ,
–“আই নো, ড্যাড। দ্যাটস হাই আই ডিডন’ট মেক এনি মিস্টেক। আমি সময় নিয়ে কাজটা করেছি”
–“গুড, মিস্টেক ইজ আ লাক্সারি, উই ডোন্ট অ্যাফোর্ড। ওকে ঠিকভাবে রাখা হয়েছে তো?”
–“ইয়েস, ড্যাড। সিকিউরড, নো ওয়ান ক্যান রিচ হিম”
মার্কান চোখ বন্ধ করে এক সেকেন্ড গভীর শ্বাস নিয়ে আওড়ায়,
–“পারফেক্ট, ইউ নো, এই বাচ্চা টা কত বড় সাম্রাজ্য ভেঙে দিতে পারে?
হি ইজ নট আ চাইল্ড, হি ইজ দ্য কি টু ব্রেক দ্য ব্ল্যাক হান্টার”
হঠাৎ মার্কানের চোখে আ*গুন জ্বলে ওঠে। সে নিজের দন্ত পাটি পিষে বলে,
–“আই ওয়ান্ট টু সি হিম ফল, স্লোলি, পেইনফুলি”
ওপাশ থেকে থমাস প্রশ্ন করে,
–“পরের পদক্ষেপ কি, ড্যাড?”
–“এখন… আমরা অপেক্ষা করব। লেট হিম প্যানিক, লেট হিম লুজ হিজ মাইন্ড। একজন বাবা, যখন সে তার সন্তানকে হারায় তখন কেমন মনে হয়। আর বাচ্চা টাকে বাঁচিয়ে রাখো”
বিপরীতে থমাস বুঝতে পারছে না তার বাবার উদ্দেশ্য। তাই ভ্রু কুচকে বলে,
হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১৭
–“ড্যাড, ওকে বাঁচিয়ে রাখার মানে কী?”
তার প্রশ্নে এক মুহূর্তে মার্কান চোখ বন্ধ করে নিজের অতীত ভাবে তারপর চোখ খুলে চোয়াল শক্ত করে বলে,
–“আমি চাই আরজে দেখুক, হারিয়ে ফেলেও বেঁচে থাকার অনুভূতি কেমন?”
–“ওকে ড্যাড”
