হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১৯
সাবা খান
রাত ধীরে ধীরে গড়িয়ে যাচ্ছে। তবুও সিটি হসপিটালে যেন সময় থেমে আছে। করিডোর জুড়ে ছুটে চলা নার্সদের পায়ের শব্দ, স্ট্রেচারের চাকা ঘষটে যাওয়ার কর্কশ আওয়াজ আর মাঝেমধ্যে ভেসে আসা যন্ত্রের বীপ বীপ শব্দ সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত অস্থিরতা ছড়িয়ে আছে চারদিকে। এরিমধ্যেই ভিআইপি ফ্লোরে একটা পরিবার ভেঙে পড়ার উপক্রম।
ইমার্জেন্সি রুমের সামনে এসপি পায়চারি করছে। তার চুল এলোমেলো, চোখ রক্তাভ হয়ে আছে, হাত নিজে থেকেই বারবার মুষ্টিবদ্ধ হচ্ছে, আবার খুলে যাচ্ছে। সে এক সেকেন্ডও থামতে পারছে না। কিয়ৎকাল পর পর নিজেই নিজের সাথে কথা বলছে,,
–“কিছু হচ্ছে না কেন… এতক্ষণ লাগছে কেন?”
সানা বাচ্চা টাকে নিয়ে চুপচাপ বসে আছে, রমণীর মুখে কোনো শব্দ নেই, কিন্তু চোখে স্পষ্ট আতঙ্ক। সারহাদ একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। তার কঠিন দৃষ্টি দেখে বুঝার উপায় নেই ভেতরে কী চলছে। হঠাৎ, ইমার্জেন্সি রুমের দরজা খুলে একজন ডাক্তার বেরিয়ে আসে। এসপি সাথে সাথে ছুটে গিয়ে ডাক্তারের সামনে দাঁড়িয়ে এলোমেলো ভাবে বলতে থাকে,
–“ডক্টর, আমি ভিতরে যাবো… আমি ওর কাছে যাবো… প্লিজ… প্লিজ আমাকে যেতে দিন”
বিপরীতে ডক্টর শান্ত গলায় শুধায়,
–“না, এখন আপনি ভিতরে যেতে পারবেন না”
ডক্টরের এমন স্বীকারোক্তিতে এসপির চিন্তিত মস্তিষ্কে হঠাৎ আগুন জ্বলে উঠে। সে তাৎক্ষণিক চিৎকার করে ওঠে,
–“কেন পারবো না? ও আমার স্ত্রী, আমি যাবোই। আপনি কে আমাকে বলার?”
এসপি ডক্টরের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সামনে এগোতে গেলে সারহাদ দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে ধরে ফেলে,
–“এসপি, রিল্যাক্স…”
–“না, আমি ওর কাছে যাবো, ও একা আছে ভিতরে। আমি থাকবো ওর পাশে”
এসপির চোখে মুখে ফুটে ওঠে একদম উন্মাদের ছাপ। সারহাদের হাতটা ঝটকা মেরে ছাড়িয়ে আবার দরজার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়তে গেলে সারহাদ এবার জোরে তাকে চেপে ধরে। এসপি তেজী গলায় গর্জে উঠে,
–“কেউ আমাকে আটকাতে পারবে না। আমি সানির কাছে যাবো”
–“স্টপ ইট, এসপি। তুই এমন করলে ওর আরো ক্ষতি হবে”
–“আই ডোন্ট ফা*কিং কেয়ার। আমার শুধু ওকে চাই। আমি আমার সানির কাছে যাবো।আমি ওকে একা থাকতে দিবো না”
সে আবার সারহাদের হাত ছুটিয়ে সামনে যাওয়ার আগেই ডাক্তার কড়া গলায় শুধালো,
–“মিস্টার চৌধুরী, আপনি যদি এখনই শান্ত না হন, তাহলে পেশেন্টের জন্য সেটা আরও বিপজ্জনক হবে”
এই একটা বাক্য শ্রবণ হতেই এসপি থেমে যায়। মুহূর্তে যেন তার সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে আসে। সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে সাথে চোখের কোণটা চিকচিক করে ওঠে। সে ভাঙ্গা ভাঙ্গা স্বরে আওড়ায়,
–“আমি… আমি কিছু করবো না। শুধু… শুধু ওকে বাঁচান ডক্টর”
ডক্টর এবার একটু নরম গলায় বলতে শুরু করে,
–“পেশেন্টের অবস্থা খুবই ক্রিটিক্যাল। ওনার প্রচুর ব্লিডিং হয়েছে। আমরা কিছুক্ষণ আগে ব্লাড ট্রান্সফিউশন দিয়েছি। বডি খুব দুর্বল হয়ে গেছে… প্রেসার বারবার ড্রপ করছে। আমরা সবরকম চেষ্টা করছি, কিন্তু”
তিনি একটু থেমে ফের বলে,
–“সত্যি বলতে… এই মুহূর্তে ওনার অবস্থা আশঙ্কাজনক”
এসপির বুকটা হঠাৎ করে ধক করে ওঠে। তার কেমন জানি গলা শুকিয়ে আসছে। সে ধীরে মাথা তুলে তাকিয়ে বিড়বিড়ায়,
–“না… না… কিছু হবে না…”
ডাক্তার আবার বলে,
–“এটা একটা ক্রিটিক্যাল প্রেগনেন্সি কেস। আপনাদের আরও আগে হসপিটালে আনা উচিত ছিল। এখন আমরা যা করার করছি। এরপর… সব আল্লাহর হাতে।আমাদের হাতে আর কিছু নেই। আপনারা দোয়া করুন, আল্লাহকে ডাকুন”
ডক্টরের বলা বাক্যটুকু যেন সবার বুকের ভেতর গিয়ে লাগে। এসপি নিঃশব্দে বসে পড়ে, চিকচিক করা জল টুকু কার্নিশ বেয়ে পানি পড়ছে। বিড়বিড় করে বলে,
–“আল্লাহ… আমার ওকে ফিরিয়ে দেন”
হঠাৎ এসপি উঠে আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না সেখানে। সে যেন হাওয়ার বেগে দৌড়ে চলে যায় করিডোরের অন্য প্রান্তে। পিছন থেকে সানা ডেকে ওঠে,
–“এসপি”
কিন্তু বিপরীত পাশের মানব থামছে না। সবাই হতভম্ব দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার যাওয়ার দিকে। কেউ বুঝতে পারছে না, সে কোথায় যাচ্ছে? কেন যাচ্ছে?
সানার কোলে তখন ছোট্ট বাচ্চাটা কান্না করতে করতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। ওর ছোট্ট বুক ওঠানামা করছে ধীরে ধীরে। এই নিষ্পাপ প্রাণটা জানেই না, তার মায়ের সাথে কি যুদ্ধ চলছে।
এদিকে আরজে অস্থির হয়ে উঠেছে। সে কখন থেকে বারবার ফোন করছে। স্ক্রিনে একটাই নাম জ্বলজ্বল করছে,
“জ্যাক”
আরজে কলের পর কল করেই যাচ্ছে কিন্তু বিপরীতে কিন্তু কোনো রেসপন্স নেই। তার ভ্রু কুঁচকে আসে। হিসহিসিয়ে আওড়ায়,
–“ড্যামিট…পিক আপ দ্য ফোন ইডিয়ট”
সে আবার কল করে। কাইলিন তার পাশে দাঁড়িয়ে। সেও নিজের ফোন দিয়ে চেষ্টা করছে,
–“বস, কেউই ফোন ধরছে না”
আরজে এক মুহূর্ত ভেবে বলে,
–“কাই, ইউ গো”
কাইলিন মাথা নাড়িয়ে সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যুত্তর করে,
–“ইয়েস বস”
এক সেকেন্ডও দেরি না করে কাইলিন দ্রুত পায়ে বেরিয়ে যায় হাসপাতাল থেকে।
এদিকে এসপির পেছন পেছন নিঃশব্দে এগিয়ে যায় সারহাদ সে কি করছে তা দেখার জন্য। নজরে আসে হাসপাতালের এক কোণায় একটা ছোট্ট ওয়াশরুমের সামনে গিয়ে এসপি থামে। সারহাদ দূরেই দাঁড়িয়ে থেকে সবটা দেখছে।
এসপি ধীরে ধীরে কল খুলে হাত-মুখ ধুতে শুরু করে। না শুধু ধোয়া না, সে অজু করছে। তার হাত কাঁপছে। মুখে পানি ছিটাতেই তার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে অজুর পানির সাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়। তারপর অজু শেষে এসপি একটা নিরিবিলি জায়গায় গিয়ে নিজের জ্যাকেটটা মাটিতে বিছিয়ে নামাজে দাঁড়ায়। সারহাদ আর দাঁড়িয়ে না থেকে নিঃশব্দে ঘুরে চলে যায়। সে জানে এই মুহূর্তে এসপির একা থাকা দরকার।
নামাজ শেষ করে এসপি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। সে বসে পড়ে জায়নামাজ স্বরূপ নিজের জ্যাকেটের উপর বসে দুই হাত তুলে আকাশের দিকে। ভাঙ্গা ভাঙ্গা স্বরে আওড়ায়,
–“হে আরশের মানিক, আল্লাহ… প্লিজ..”
শব্দ গুলো কেমন যেন গলা জড়িয়ে আসছে তার, সাথে চোখ থেকে ঝরতে থাকে অশ্রুজল। এসপি একটা ফাঁকা ঢুক গিলে ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় বলে,
–“আমি জানি, আমি অনেক ভুল করেছি। অনেক পাপ করেছি। আপনার কাছে আসিনি, আপনার কথা শুনিনি। কিন্তু আজ, আজ আমি একদম অসহায়। আমি কিছুই করতে পারছি না। আপনি ছাড়া আর কেউ আমাকে সাহায্য করতে পারবে না। আমার সানিকে বাঁচিয়ে দেন। ওকে আমার থেকে নিয়ে যাবেন না। প্লিজ… প্লিজ আল্লাহ”
বাক্যগুলো বহু কসরতে নিঃসৃত হয় তার কণ্ঠনালি থেকে। এসপি মাথা নিচু করে কাঁদতে কাঁদতে বলে,
–“ও ছাড়া আমি কিছুই না। আমি পারবো না, আমি পারবো না ওকে ছাড়া। আমি তো ওকে কথা দিয়েছি। ওর পাশে থাকবো… ওকে কখনো কাঁদতে দিবো না। আপনি কেন ওকে এই কষ্ট দিচ্ছেন। যদি শাস্তি দিতে হয়, আমাকে দেন। আমাকে মেরে ফেলেন, কিন্তু ওকে না”
সে নিজের বুক চাপড়ে বলে,
–“এই বুকটা ফাঁকা হয়ে যাবে, ও না থাকলে আমি বাঁচবো কিভাবে”
হঠাৎ এসপির চোখের পাতায় ভেসে ওঠে তার নবজাতক মেয়ের মুখ,
–“আমার মেয়েটা… আল্লাহ। ও তো মাকে চিনেই না এখনো। আপনি কি ওর থেকে মাকে কেড়ে নিবেন?
ওকে এতিম করবেন?
না আল্লাহ, না। আপনি তো রহমান, রহিম। আপনি দয়া করেন। আমার সানিকে ফিরিয়ে দেন”
সে আবার সিজদায় মাথা ঠুকে ফিসফিসায়,
–“প্লিজ আল্লাহ… প্লিজ”
তার কান্নার শব্দটা পুরো ফাঁকা করিডোরে প্রতিধ্বনিত হয়ে আবারও তার কানে ফিরে আসে, বিপরীতে কোন সাড়া শব্দ নেই।
হাসপাতালের করিডোরটা তখনো ভারী হয়ে আছে উৎকণ্ঠা আর অপেক্ষার চাপা নিঃশ্বাসে। সবাই যেন নিঃশব্দে সময় গুনছে, ডক্টর যাওয়ার পর আরও এক ঘন্টা পেরিয়ে গেছে। সিতারা অনেক আগেই বেড়িয়ে পড়েছে। সানিতার মা বাবার আরো এক ঘন্টা লাগবে আসতে। এমনিতেই মিসেস লিপি ফারুকীর অবস্থা বেহাল হয়ে গেছে মেয়ের চিন্তায়। সানা বারবার চারদিকে তাকাচ্ছে কিন্তু কোথাও আরজে কে নজরে আসছে না। সে ভ্রু কুচকে আবারও তাকায়। মনে মনে বলে,
“কিরে এখানেই তো ছিল, কোথায় গেল?”
হঠাৎ তার ভাবনা ছিড়েঁ ইমারজেন্সি রুমের দরজাটা খুলে সাদা কোট পরা ডাক্তার ধীরে ধীরে বাইরে বেরিয়ে আসে। মুহূর্তে সবার দৃষ্টি একসাথে গিয়ে আটকে পড়ে তার মুখে। সানার বুকটা ধক করে ওঠে আতঙ্কে, এখন না জানি আবার কী বলে?
রমণী নিজের কোলে ঘুমন্ত বাচ্চাটাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যায়। তার পেছনেই এগিয়ে আসে সারহাদ। ডাক্তার মাস্কটা খুলে ঠোঁটে হালকা হাসি টেনে বলে,
–“আল্লাহর রহমতে… পেশেন্টের অবস্থা এখন অনেকটাই স্টেবল”
ডক্টরের বলা বাক্যটুকু শ্রবণ ইন্দ্রিয় হতেই সবার ভিতর থেকে একটা স্বস্তির নিশ্বাস বেড়িয়ে আসে। সানার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে স্বস্তিতে। রমণী বাচ্চাটার কপালে চুমু খেয়ে মনে মনে বারবার বলে,
“আলহামদুলিল্লাহ”
সারহাদ মাথা নিচু করে একবার চোখ বন্ধ করে ফেলে, তার বুকের ভেতর জমে থাকা ভারটা একটু হালকা হয়। তার মুঠো করা হাত ধীরে ধীরে ঢিলে হয়ে যায়। কিন্তু তাদের স্বস্তির মধ্যেই আবারও ডক্টরের গলা ভেসে আসে,
–“কিন্তু, রিস্ক এখনো পুরোপুরি কাটেনি”
সানা আর সারহাদ দুজনেই একসাথে তাকায় তার দিকে। সারহাদ ভ্রু কুঞ্চিত করে বলে,
–“মানে?”
ডাক্তার শান্ত গলায় বলতে শুরু করে,
–“রোগীর অবস্থা এখন স্টেবল হলেও, যেহেতু এটা একটা ক্রিটিক্যাল কেস ছিল। তাই শরীর অনেকটা দুর্বল হয়ে গেছে। পরবর্তী চব্বিশ ঘণ্টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। যেকোনো সময় আবার কমপ্লিকেশন দেখা দিতে পারে”
–“কি ধরনের কমপ্লিকেশন?”
–“ব্লাড প্রেসার ফ্লাকচুয়েশন, ইনফেকশন রিস্ক, ইন্টারনাল ব্লিডিং সবকিছুর উপর নজর রাখতে হবে। আমরা অবজারভেশনে রাখছি। আপনারা চিন্তা করবেন না, আমরা আমাদের বেস্ট দিচ্ছি”
সানা নিঃশব্দে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বুঝায়। ডাক্তার যাওয়ার আগে আবার বলে,
–“আর একটা বিষয়, পেসেন্ট কে অন্তত এক মাস সম্পূর্ণ বেড রেস্টে থাকতে হবে। কোনো রকম স্ট্রেস নেওয়া যাবে না, একদমই না”
ডাক্তার যাওয়ার পিছন দিক দিয়েই সারহাদ চোখ দিয়ে এজাজকে ইশারা করে। এজাজ বুঝে সঙ্গে সঙ্গে ছুটে যায় এসপির কাছে তাকে বলতে। কিয়ৎকাল পরই তড়িঘড়ি করে হুড়মুড়িয়ে করিডোরে ঢুকে পড়ে এসপি। তার মুখে আতঙ্ক আর আশার অদ্ভুত মিশ্রণ ভেসে ওঠে। এসেই এক নিঃশ্বাসে উগড়ে দেয়,
–“কি হয়েছে? সানি… সানি ঠিক আছে তো?”
কিন্তু বিপরীতে কেউ উত্তর দেওয়ার আগেই সে আর এক সেকেন্ডও কালক্ষেপণ না করে, কাউকে কিছু জিজ্ঞেস না করে, কোনো অনুমতির তোয়াক্কা না করে সরাসরি সানিতার কেবিনের দিকে ছুটে যায়। সারহাদ পিছনে ডাক দেয়,
–“এসপি…”
বিপরীতে মানব কানেও তোলে না। সানা একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বাচ্চা টাকে নিয়ে অন্য দিকে চলে যায়। সে সানিতার মা বাবা আসার পর সানিতাকে একবার দেখে ম্যানশনে চলে যাবে। কখন থেকে তার মনটা আরভির জন্য খচখচ করছে। একপলক নিজের চোখে না দেখলে শান্তি লাগবে না।
এদিকে দরজাটা ধাক্কা মেরে খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ে এসপি। রুমটা অল্প আলোয় ঢাকা। মেশিনের বিপ.. বিপ.. শব্দ ছাড়া আর কিছু নেই। সাদা বিছানার উপর নিথর হয়ে শুয়ে আছে সানিতা, মুখটা ফ্যাকাশে, ঠোঁট শুকনো, হাতে স্যালাইনের সুই। এই দৃশ্যটা নজরে আসতেই এসপির বুকটা যেন ভেঙে দুটুকরো হয়ে যায়। তার পা নিজে থেকেই ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় তার দিকে। সে গিয়ে ধপ করে বসে পড়ে বিছানার পাশে। কাঁপা হাতে সানিতার হাতটা তুলে নিয়ে নিজের দুই হাতের মধ্যে চেপে ধরে, যেন একটু জোরে ধরলেই সে হারিয়ে যাবে। তার চোখ বেয়ে টুপটাপ করে পানি পড়তে শুরু করে। সে সানিতার কপালের কাছে ঝুঁকে ধীরে ধীরে একটা চুমু খায়। তারপর সরে এসে তার ভাঙা ভাঙা স্বরে আওড়ায়,
–“সানি, এইভাবে ভয় পাইয়ে দিতে হয়?
তুই জানিস, আমি কতটা ভয় পেয়েছি? আমি… আমি তো শেষ হয়ে যাচ্ছিলাম সানি”
বিপরীতে কোন সাড়া নেই। এসপি রমণীর হাতটা আরও শক্ত করে ধরে নিজের বুকের সাথে,
–“আমি বাইরে দাঁড়িয়ে কিছুই করতে পারছিলাম না, কিছুই না, শুধু শুনছিলাম। তুই ভেতরে লড়াই করছিস। আর আমি… আমি কিছুই করতে পারছিলাম না”
এসপি মাথা নিচু করে সানিতার হাতের উপর কপাল ঠেকিয়ে দিয়ে ফের বলে,
–“সানি, জানিস, আমাদের মেয়েটাকে আমি কোলে নিয়েছি”
হঠাৎ কিছু একটা ভেবে তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে,
–“ও না, একদম তোর মতো হয়েছে, ছোট্ট, গোলগাল, একদম তোর কপি”
তারপর আবারও তার ঠোঁটের হাসি টা মিলিয়ে যায়,
–“তুই না থাকলে ওকে আমি কি করে বড় করতাম, বল? ও তো মায়ের গন্ধ চিনবে, তোর কোল খুঁজবে, আমি তো পারবো না সানি, আমি পারবো না”
সে তাড়াতাড়ি মাথা নাড়িয়ে বলে,
–“না না… এইসব কিছু হবে না। তুই কোথাও যাচ্ছিস না, শুনছিস? তুইআমাকে ছেড়ে কোথাও যেতে পারবি না। আমি আল্লাহর কাছে কেঁদেছি, প্রথমবারের মতো এভাবে কেঁদেছি… শুধু তোর জন্য”
তার কণ্ঠ ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসে,
–“আমি বলেছি, আমার সবকিছু নিয়ে নাও কিন্তু ওকে ঠিক করে দাও। তুই ফিরবি, তুই আমার কাছে ফিরবিই। তুই আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলি, আমরা একসাথে থাকবো, সবকিছু পার করবো”
সে ঝুঁকে তার কানের কাছে ফিসফিস করে,
–“আমি এখনো তোর সেই প্রতিশ্রুতিটা ধরে আছি”
তারপর তার আঙুল দিয়ে সানিতার আঙুলগুলো জড়িয়ে ধরে নিঃশব্দে বসে থাকে।
প্রায় ভোর রাতের দিকে দ্রুতগতিতে একটা কালো বিলাসবহুল গাড়ি এসে থামে ব্ল্যাক ম্যানশনের সামনে। গাড়ির ভিতর আরজে নিঃশব্দে বসে আছে। তার চোখ দুটো লালচে, চোয়াল শক্ত, যেন ভেতরে আগুন জ্বলছে। সে এখনো সানাকে কিছু বলেনি আরভির ব্যাপারে। তবুও, তার নিজের মতো করে সব কিছু সে আগেই সেট করে রেখেছে। কাইলিন, পুরো টিম সবাইকে লাগিয়ে দিয়েছে। তার ভিতরে কোথাও একটা বিশ্বাস এখনো বেঁচে আছে, জ্যাক আছে। আর জ্যাক থাকলে আরভির কিছু হবে না। কারণ, জ্যাক আর তার সম্পর্ক টাই আলাদা যার উপর আরজে চোখ বন্ধ করে ভরসা করে। কিন্তু, সানা?
তাকে কি বলবে?
সানা খুশদিল ফারুকী ও লিপি ফারুকী আসার পর তাদের কাছে এসপির বাচ্চা টাকে দিয়ে সানিতাকে দেখার পর পরই আরভির জন্য বেড়িয়ে পড়েছে। রমণী গাড়ি থামার সাথে সাথে আরজে কিছু বোঝার আগেই দরজা খুলে নেমে পড়ে। সানা ডাকতে ডাকতে দ্রুত কদমে ভিতরে চলে যায়,
–“ভীর…”
–“ভীর…”
আরজে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে সানার যাওয়ার দিকে। তারপর ধীরে দরজা খুলে নামতেই পেছন থেকে কাইলিন দ্রুত এগিয়ে আসে,
–“বস”
আরজে তার দিকে না তাকিয়ে বলে,
–“স্পিক”
–“বস, জ্যাক, মিস ঈশানী, রওনাক তিনজনের কারোরই ফোন অন নেই। আরভির সাথে যে গার্ড টিম ছিল, তাদের সব গাড়ি ম্যানশনে ফিরে এসেছে”
এইবার আরজে তড়াক করে তার দিকে তাকায়, চোখ দুটো ভয়ংকর ভাবে ঠান্ডা তার। রুক্ষ স্বরে শুধায়,
–“হোয়াট?”
কাইলিন একটু ইতস্তত ভাবে বলে,
–“ওদের সবাই বলছে…জ্যাকের অর্ডার ছিল, ম্যানশনে ফিরে আসতে”
কয়েক সেকেন্ড পুরো পরিবেশ জমে যায়। মুহূর্তে আরজের কপালের শিরা ফুলে ওঠে, বুক ওঠানামা করছে দ্রুত, নিচু স্বরে বলে,
–“জ্যাকের… অর্ডার?”
সাথে সাথে আরজে নিজের হাত মুষ্টিবদ্ধ করে পুরো শক্তি দিয়ে গাড়ির বডিতে বসিয়ে দিল একটা থাবা। তার চোখ দুটো এখন আগুনের মতো জ্বলছে। রুক্ষ স্বরে আদেশ ছুঁড়ে,
–“লোকেশন ট্র্যাক করো?”
কাইলিন সাথে সাথে প্রত্যুত্তর করে,
–“ট্রাই করেছি বস, সব ডিভাইস অফ”
–“স্যাটেলাইট ইউজ করো। ব্যাকআপ নেটওয়ার্ক অ্যাক্টিভেট করো, ফাস্ট। যেকোনো মূল্যে জ্যাককে খুঁজে বের করো”
–“ওকে বস, আর আরভি…..?”
আরজে এক পা এগিয়ে এসে দন্ত পাটি পিষে বলে,
–“পুরো শহরে যে যেখানে আছে, সবাইকে নামাও। আন্ডারগ্রাউন্ড, পোর্ট, হাইওয়ে সব জায়গায় লোক বসাও। আমি আমার ছেলেকে চাই, যেভাবেই হোক”
কাইলিন মাথা নিচু করে বলে,
–“ওকে বস”
আর এক ন্যানো সেকেন্ডও দেরি না করে কাইলিন ছুটে যায়। আরজে একা দাঁড়িয়ে থাকে কয়েক মুহূর্ত। তার বুকের ভিতর আগুন জ্বলছে, আর চোখে অদৃশ্য ঝড়। তারপর সে ম্যানশনের ভিতরে হাঁটা শুরু করে।
এদিকে রমণী দৌড়ে ম্যানশনের ভিতরে ঢুকতেই হঠাৎ থমকে যায় তার কদম। পুরো ব্ল্যাক ম্যানশনকে অস্বাভাবিকভাবে শান্ত মনে হচ্ছে তার। সানার ভ্রু কুঁচকে আসে তার বুকের ভেতর হালকা খচখচ শুরু করে। তবো সে বিশেষ পাত্তা না দিয়ে আরভিকে ডাকতে ডাকতে ভিতরে চলে যায়। সানা আরভির রুমের দরজা ঠেলে খুলে
–“ভীর, ভীর….”
বিপরীতে কোন সাড়া নেই, শুধুই নিস্তব্ধতা, ঘর ফাঁকা, বিছানা গুছানো, খেলনা ছড়িয়ে আছে ঠিক যেমনটা যাওয়ার সময় ছিল। কিন্তু আরভি নেই। তার বুকটা ধক করে ওঠে। সে তড়িঘড়ি করে বাথরুমে থেকে শুরু করে একে একে সব জায়গা চেক করে। কিন্তু নাহ, আরভি তো দূর আরভির চিহ্ন ও নেই।
পরমুহূর্তে রমণীর মাথায় আসে ঈশানীর কথা। মনে মনে ভাবে,
–“ও হয়তো ঈশানীর রুমে”
এই ভেবে সে আবার দৌড়ে যায় ঈশানীর রুম। কিন্তু এখানেও একই অবস্থা, কেউ-ই নেই কক্ষে। এইবার তার বুকের ভেতরটা যেন মোচড় দিয়ে ওঠে। সে পাগলের মতো দৌড়াতে শুরু করে এক রুম থেকে আরেক রুমে আর ডাকতে থাকে,
–“ভীর, সোনা কোথায় তুমি?”
–“ঈশানী…”
পুরো ম্যানশন জুড়ে শুধু তার ডাক প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরছে আবারও তার কানে। কিন্তু কোথাও কেউ নেই। কিয়ৎকাল পর রমণী আবার দৌড়ে নিচে নেমে আসে। আরজে তখন নিচে দাঁড়িয়ে চুপচাপ সব দেখছে।
সানা তার কাছে এসে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে এলোমেলো চিত্তে বলতে থাকে,
–“ভীর নেই, আমি… আমি সব জায়গায় দেখেছি… কোথাও নেই
আপনি দেখুন না?”
সানা চারপাশে তাকায় আবারও ডাকতে থাকে,
–“ভীর, সোনা কোথায় তুমি?”
বিপরীতে নীরবতা বেদ করে কিছুই আসছে না। রমণী কণ্ঠে আদর মিশিয়ে ফের ডেকে ওঠে,
–“সোনা বের হও, মম রাগ করবে না, প্লিজ।
দেখো আমি এসেছি, তুমি কোথায়?
ভীর, মাকে ভয় পাইয়ে দিও না, প্লিজ…”
আরজে দূর থেকে দাঁড়িয়ে সবটাই দেখছে।তার চোখে ঝড়, কিন্তু মুখ একদম পাথরের মতো শক্ত, যেটা তার ভিতরের ঝড় টাকে বুঝতে দিতে অক্ষম। সে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে ধীরে বলে,
–“ওয়াইফি..”
বিপরীতে রমণী নিজের পা থামিয়ে তার দিকে তাকায়। আরজে তার চোখে চোখ রেখে বলে,
–“রিশ এখানে নেই, ওকে কিডন্যাপ করা হয়েছে”
সে এক নিঃশ্বাসে বলে সানার দিকে তাকায় রমণী কি করে তা দেখার জন্য। এক মুহূর্তের নীরবতা কাটিয়ে রমণী জোরে মাথা নাড়িয়ে বলে,
–“না না না… এটা সম্ভব না। ও… ও এখানে আছে… কোথাও আছে”
রমণী চারপাশে তাকিয়ে খুঁজতে খুঁজতে বলে,
–“আমার ভীর এদিকে কোথাও খেলছে বা হয়তো লুকিয়ে আছে। আমি খুঁজে দেখছি, আমি পেয়ে যাব”
সে আবার হাঁটতে শুরু করে। হঠাৎ সে নিজের পা থামিয়ে আরজের দিকে তর্জনী উঁচিয়ে শক্ত কণ্ঠে বলে,
–“খবরদার মিস্টার জাওয়ান,
আপনি এসব উল্টোপাল্টা কথা বলবেন না।আমি আমার ছেলের আগে কাউকেই বিশ্বাস করি না”
তার চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সাথে বারবার বিড়বিড়াচ্ছে,
–“ও… ও আমার কাছেই আছে। আমার ভীর এখানেই আছে, ভীর….সোনা”
তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আরজে স্পষ্ট বুঝতে পারছে, সানা কথাটা এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না যার কারণে সে এমন বিহেভ করছে। আরজে এগিয়ে এসে তার দুই বাহু ধরে ঝাকিয়ে উচ্চস্বরে বলে,
–“ওয়াইফি, রিল্যাক্স। আই’ল ফাইন্ড হিম, নো ম্যাটার হোয়াট ইট টেইকস। জাস্ট কাম ডাউন”
সানা থমকে কিয়ৎকাল তার দিকে মলিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তারপর হঠাৎ দুই হাত দিয়ে তার বুকে আঘাত করে বলতে থাকে,
–“আপনার মা, এই কাজ আপনার মা করেছে। ওই সাইকো মহিলা আবার আমার ছেলেকে নিয়ে গেছে”
এই মুহূর্তে রমণী কি বলছে সে নিজেই জানে না। সে শুধু এটুকুই বুঝতে পারছে তার ছেলে তার কাছে নেই। তার কণ্ঠ ফেটে শব্দ গুলো আবারও বের হয়,
–“আমি বলেছিলাম আমি আসবো না এখানে। আপনারা সবাই অভিশপ্ত। হাজার হাজার মায়ের বুক খালি করেছেন আপনারা।আপনার বাবা, আপনার মা, রিয়ানা, নাতাসা, ফিরোজ জাওয়ান আপনারা সবাই খুনি।আপনাদের সবার একটা মুখোশ আছে, আরেকটা আসল চেহারা। সাইমা আমাকে বারবার বলেছিল, এই জায়গায় থাকলে আমার ছেলে মানুষ হবে না, দানব হবে”
সে একটু থেমে ফের কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে আওড়ায়,
–“কিন্তু আমি আপনাকে বিশ্বাস করেছিলাম।তাহলে কোথায় আমার ছেলে?”
রমণীর হাতের জোর ধীরে ধীরে কমে আসে। তার শ্বাস ভারী হয়ে যায়, চোখ গুলো ঝাপসা হয়ে আসে। ধীরে ধীরে সে নিস্তেজ হয়ে ঢলে পড়ে। সামনের মানব এক ঝটকায় তাকে ধরে ফেলে। তার বলিষ্ঠ বাহুতে সানাকে বুকের সাথে চেপে ধরে শক্ত করে। আরজে সাথে সাথে চোখ বন্ধ করে ফেলে। তার বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে আছে। মনে মনে বলে,
সে এতক্ষণ কেন টু শব্দটি করেনি? কেননা সানা যা বলেছে তার একটাও মিথ্যা না। তার পরিবার, র*ক্তে ভেজা ইতিহাস, অভিশপ্ত অতীত সব সত্যি। কিন্তু সানা কী জানে রিয়ানা নিজের পাপের শাস্তি পেয়ে গেছে, নাহ জানে নাহ”
হঠাৎ আরজের বিভ্রম কেটে ভেসে আসে কাইলিনের কণ্ঠস্বর,
হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১৮
–“বস”
আরজে চোখ খোলে তার দিকে তাকায়।কাইলিন ভেতরে ঢুকে বলে,
–“সরি টু ডিস্টার্ব, কিন্তু আপনার ফোনে একটা মেসেজ এসেছে”
আরজে গম্ভীর স্বরে প্রশ্ন ছুড়ে,
–“কিসের মেসেজ?”
–“প্রাইভেট নাম্বার থেকে”
