হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২০ (৪)
সাবা খান
রাতের আঁধারে জাওয়ান ম্যানশনটা দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন এক অদ্ভুত অন্ধকারে ঢেকে আছে। আজ কৃত্রিম আলোয় আলোকিত করতে পারছে না চারপাশ। আজ সে আলোয় মিশে আছে শুধু আতঙ্কের ছায়া। বিশাল গেটের বাইরে এখনো মানুষের ঢল। কেউ বাড়ি ফেরেনি। চিৎকার, স্লোগান, ক্ষোভ সব মিলিয়ে চারপাশ যেন দাউ দাউ করে জ্বলছে। মানুষের গলার স্বর যেন রাতের নীরবতাকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে বারবার।
এদিকে ম্যানশনের ভেতরে সোফিয়া জাওয়ান একদম স্থির থাকতে পারছে না। নিজের অস্বস্তি কে আটকে রাখতে পায়চারি করছে কখন থেকে। তার মুখে প্রথমবারের মতো স্পষ্ট আতঙ্ক, চোখ দুটো লাল, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। তার বুক ধকধক করছে। মনে মনে ভাবছে,
এভাবে… এভাবে তো হওয়ার কথা ছিল না…
সে ভেবেছিল আগের মতোই সামলে নেবে। মিডিয়া, ক্ষমতা, টাকা সব তো তার হাতের মুঠোয় ছিল। কিন্তু এবার মনে হচ্ছে সবকিছু হাতের বাইরে চলে গেছে। সে চিৎকার করে ডাকে,
–‘জিহাদ”
জিহাদ ও আব্বাস তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে শুধায়,
–“লেডি”
–“রনোর সাথে কানেক্ট করাা গেছে?”
–“না লেডি… এখনো না। লোকেশনও ট্রেস করা যাচ্ছে না”
বাক্যটুকু শ্রবণ হতেই সোফিয়া দাঁতে দাঁত চেপে ওঠে,
–“ড্যাম ইট”
সে আর এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে না থেকে নিজের ভয়, অস্থিরতা সবকিছু জোর করে চেপে রেখে চলে যায় বেজমেন্টের দিকে। তার সাথে জিহাদ, আব্বাস আর তার ‘আলফা টিম’। এই আলফা টিম তার সবচেয়ে ট্রেইন্ড, সবচেয়ে বিশ্বস্ত বাহিনী। যদিও সেদিন আরজের ব্ল্যাক ম্যানশনে হামলার সময় এই বাহিনীর প্রায় অর্ধেকই মারা গেছে। বাকি অর্ধেক নিয়ে আজ সে নেমে যাচ্ছে নিজের শেষ আশ্রয়ে।
ম্যানশনের ভেতরের এক গোপন পথ দিয়ে তারা বেজমেন্টেের নিচে নামে। নাহ, এটা শুধু একটা বেজমেন্ট না, অপাত দৃষ্টিতে তাকালে বুঝা যায় এটা একটা গোপন দুর্গ। বেজমেন্টের এই অংশের ব্যাপারে কেউ জানে না, আরজেও না। সোফিয়া বহু বছর ধরে গোপনে এটাকে তৈরি করেছে, আরো গভীর, আরো বিশাল, আরো সুরক্ষিত করে। লোহার দরজা, বায়োমেট্রিক লক, সিসিটিভি, আন্ডারগ্রাউন্ড টানেল, সবকিছু এমনভাবে তৈরি যেন কেউ এখানে ঢুকতে না পারে। আর ঢুকলেও সে গোলকধাঁধায় ফেঁসে যাবে। এখান থেকে বেরুনোর পথ শুধু সোফিয়া জানে। সোফিয়া এটাকে বানিয়েছে কেননা তার মনে সবসময় একটা ভয় ছিল, যদি কোনোদিন তার পরিণতি লরেন্সের মতো হয় তাহলে সে এখানে লুকাবে। এখানে, যেখানে কেউ পৌঁছাতে পারবে না।
সোফিয়া ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকে পড়ে। দরজাগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যায়। তার দরজা বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে উপরে “ধাম” করে জাওয়ান ম্যানশনের প্রধান গেট ভেঙে ফেলে বিক্ষোভে ফেটে পড়া জনতা। তারা ভেতরে ঢুকে কেউ চিৎকার করছে, দৌড়াচ্ছে,
কেউ কেউ ভাঙচুর শুরু করতে যাচ্ছে। কিন্তু সকল বিক্ষুব্ধ জনতা থেমে যায় পিছন থেকে আসা কয়েকটা ভারিক্কি কণ্ঠস্বরে,
–“স্টপ, নো ওয়ান মুভ”
সকলে একসাথে পিছনে ফিরে তাকায় নজরে আসে, ম্যানশনের গেট দিয়ে একের পর এক ঢুকে পড়ে সিআইডির কালো গাড়ি। হেডলাইটের আলোতে পুরো প্রাঙ্গণ আলোকিত হয়ে ওঠে। প্রথম গাড়ির দরজা খুলে নামে এসিসি সিতারা আদিল। তার পরনে বুলেটপ্রুফ ভেস্ট, হাতে বন্দুক। তার পিছনে নামতে থাকে একের পর এক ইউনিট। শুধু সিআইডি না, ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন ইউনিট। তাদের দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে তারা এদেশের নয়। তাদের সাথে আরও আছে চাইনিজ ট্যাকটিক্যাল ইউনিট এছাড়াও ইন্টারপোল সংযুক্ত অপারেটিভ টিমও এসেছে।
জনতা বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। সিতারা সামনে এগিয়ে এসে শক্ত কণ্ঠে বলে,
–“এই জায়গা এখন অফিসিয়ালি সিল করা হলো। কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবেন না”
পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা এক বিদেশি অফিসার ইংরেজিতে বলে,
–“We proceed as planned”
আবু ও দিহান আবারও বলে কিন্তু জনতা এক পায়ে খাঁড়া, তারা সোফিয়া জাওয়ানের বিচার চায়। সিতারা তাদের ন্যায় বিচারের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর যে যার বাড়ি ফিরে যায়। সিতারা সহ বাকি অফিসার রা চলে যায় জাওয়ান ম্যানশনের ভিতরে।
আজকের এই পুরো অপারেশন টা ছিল আগে থেকেই প্ল্যান করা। এর পেছন থেকে গুটি সাজিয়েছেন মিসেস দিলরুবা খানম ও সারহাদ। তিনি জানতেন দেশের সিস্টেম সোফিয়ার হাতের মুঠোয়। তাই তারা সরাসরি লড়াই না করে নীরবে, গোপনে সব প্রমাণ সংগ্রহ করে তারপর সবকিছু জমা দিয়েছেন ইন্টারন্যাশনাল হাইকোর্টে, সোফিয়া জাওয়ানের অপরাধ, পাচার, খুন সবকিছু এবং তার সাথে থাকা জড়িত নাম গুলোও।
আর সেই রিপোর্টের ভিত্তিতেই দেশের বাইরে থেকে এই ইউনিটগুলো পাঠানো হয়েছে। বিশেষ করে, চায়না থেকে আসা অপারেটিভরা। যারা সরাসরি দিলরুবা খানমের আন্ডারে কাজ করছে তিনি কৌশলে তাদের পাঠিয়েছেন ল। সবকিছু এখন আইনগতভাবে বৈধ, সবকিছু এখন প্রকাশ্যে আসার পথে।
জাওয়ান ম্যানশনের বেজমেন্টে নামার পথটা যেন সরাসরি অন্ধকারের গহ্বরে ঢুকে যাওয়ার মতো। লোহার ভারী দরজা খুলতেই ভেতর থেকে ঠান্ডা বাতাসের সাথে এক অদ্ভুত গন্ধ বেরিয়ে আসে, পুরোনো র*ক্ত, আর কিছু ক্যামিকেল সাথে মিশে যা শব্দে বোঝানোর মতো না। সামনে লম্বা করিডর আর দেয়ালজুড়ে স্টিলের দরজা, প্রতিটাতে ডিজিটাল প্যানেল। সিতারা আদিল থেমে একবার চারপাশটা ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে নেয়। তারপর প্রথম দরজার সামনে গিয়ে পাসওয়ার্ড টাইপ করে। সঠিক পাসওয়ার্ড দিতেই দরজা খুলে যায়। এখানকার সকল দরজায় পাসওয়ার্ড দেওয়া আর প্রতিটা দরজার কোড সারহাদের কাছি ছিল যেগুলো ঐদিন মিটিংয়ে সারহাদ তাকে দিয়েছে। সিতারা জানে না, সারহাদ এগুলো কীভাবে জেনেছে বা তার কাছে এই পুরো বেজমেন্টের নকশা আসলো কোথা থেকে। সারহাদ তাকে এটাও বলেছে, প্রতিটা দরজার পাসওয়ার্ড একবার ভুল হলে আগামী বায়াত্তর ঘন্টার জন্য আর কেউ দরজা খুলতে পারবে না, দ্বিতীয় বার ভুল হলে দশদিন আর তৃতীয় বার ভুল হলে সেই সংখ্যা টা দাঁড়ায় একবছর। এভাবে যতবার ভুল পাসওয়ার্ড চাপবে সময় তত বাড়তে থাকবে। তাই সিতারা ভালো করে খুব সতর্ক ভাবে প্রতিটা কোড টাইপ করছে।
একটার পর একটা দরজা খুলতে থাকে। প্রতিটা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সোফিয়ার গার্ডরা বাধা দেওয়ার আগেই ইন্টারপোল অফিসারদের নিখুঁত শটে তারা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। প্রায় শ’য়ের মতো ইন্টারপোল অফিসার ছড়িয়ে পড়েছে পুরো বেজমেন্টে। এদিকে দিহানও থেমে নেই। তার চোখ লাল হয়ে আছে, প্রতিটা গুলির সাথে যেন জমে থাকা ছয় বছরের রাগ বেরিয়ে আসছে। ছয় বছর ধরে সেও খুঁজেছে তালহা আদিলকে। তালহা তার জন্য আইডল, সে সবসময় তালহার মতো হতে চেয়েছে। আর আজ সে তার জন্য লড়ছে।
এদিকে সিতারার কোন দিকে খেয়াল নেই তার চোখে শুধু একটাই লক্ষ্য “তালহা”। সে দ্রুত কদমে এগিয়ে চলছে একটার পর একটা দরজা পেড়িয়ে। তার সাথে আবু আর দিহান। সিতারা নকশার দিকে তাকিয়ে করিডর বদলাচ্ছে, বাঁক নিচ্ছে। সারহাদ তাকে তালহার কক্ষেরও নকশা দিয়েছে। হঠাৎ রমণী থেমে যায়। কেননা সামনের দরজার ওপর বড় অক্ষরে লেখা,
“সাইলেন্ট স্ক্রিম মিউজিয়াম”
শব্দগুলোই কেমন গা ছমছম করে তোলে। মুহূর্তেই সিতারার বুক ধক করে ওঠে। এইটা, এইটাই সেই কক্ষ যেখানে তালহাকে রাখা হয়েছে। সিতারা দ্রুত প্যানেলের সামনে গিয়ে পাসওয়ার্ড টাইপ করতেই লাল আলো জ্বলে ওঠে। আবু ফিসফিস করে বলে,
–“রং…”
সিতারা একটা ফাঁকা ঢুক গিলে আবার টাইপ করতে যাবে ঠিক তখনই তাদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে কতগুলো সোফিয়ার গার্ড। সবাই বন্দুক তাক করে আছে। এই মুহূর্তে এখানে সিতারা, আবু, দিহান একা এখানে ইন্টারপোলের অন্য ইউনিটরা অনেক দূরে ছড়িয়ে গেছে। দিহান দাঁত চেপে বন্দুক তোলে ট্রি*গারে চাপ দিতে যাবে ঠিক তখনই পেছন থেকে আসে গুলির শব্দ। একসাথে কয়েকজন গার্ড মাটিতে পড়ে যায়। সবাই চমকে পিছনে তাকায়। কালো স্যুট পরা আরেকদল গার্ড ঝড়ের মতো ঢুকে পড়ে।। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সোফিয়ার গার্ডরা একে একে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে সেই কালো স্যুটধারীদের মাঝখান থেকে এগিয়ে আসে সারহাদ চৌধুরী। সিতারা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সে এখনো নিজের বিস্মিত নয়ন জোড়াকে বিশ্বাস করাতে পারছে না সারহাদ সত্যিই এখানে এসেছে।
সারহাদ তার দিকে না তাকিয়ে সরাসরি এগিয়ে যায় দরজার সামনে। প্যানেলে হাত রেখে নির্ভুলভাবে পাসওয়ার্ড টাইপ করে।এইবার দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে যায়। ভেতর থেকে ঠান্ডা, অন্ধকার একটা শ্বাস বেরিয়ে আসে। সারহাদ প্রথমেই দরজার ভেতরে ঢুকে পড়ে।
তারপর একে একে সবাই প্রবেশ করে। ভিতরে পা রাখার সাথে সাথে সবাই থমকে যায়। যেন এই একটা ঘরের ভেতরেই বছরের পর বছর ধরে আটকে রাখা হয়েছে মানুষের আর্তনাদ, যন্ত্রণা আর মৃত্যু। দেয়ালের চারপাশে শোকেসে মানব দেহের অঙ্গ পতঙ্গ সাজিয়ে রাখা হয়েছে। আবু আর দিহান এক মুহূর্তের জন্য কথা বলার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলে। তাদের চোখে স্পষ্ট আতঙ্ক, ঘৃণা আর অবিশ্বাস। এমন কিছু তারা কল্পনাও করেনি।
কিন্তু সিতারার দুচোখ সেগুলো সবকিছুকে ছাড়িয়ে হঠাৎ থেমে যায় ঘরের এক কোণে একটা ভাঙা, জং ধরা চেয়ার। সেই চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে এক মানব, মাথা কাত হয়ে আছে, শরীর নিস্তেজ, যেন বহুদিনের ক্লান্তিতে ভেঙে পড়েছে। সিতারার তাকে চিনতে একফোঁটাও কষ্ট হয়নি। মুহূর্তে সিতারার বুকটা হঠাৎ করে কেঁপে ওঠে, শ্বাস যেন আটকে যায়। ছয়টা লম্বা বছর পরেও নিজের ভাইকে চিনতে এক মুহূর্তও লাগে না। কিন্তু এ কী অবস্থা তার ভাইয়ের?
যে মুখটা একসময় উজ্জ্বল, প্রাণবন্ত ছিল আজ সেটা ধূসর, যেন তার শুভ্ররঙ্গা মুখখানি ছাইয়ের আদলে ঢেকে গেছে। চোখের নিচে কালি, ঠোঁট ফেটে গেছে, শরীর জুড়ে অসংখ্য ক্ষতের দাগ। সিতারার হাত পা কাঁপতে শুরু করে। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়, প্রতিটা পা যেন হাজার টন ভারী হয়ে আছে।
ওদিকে তালহা সে নিজের জগতে হারিয়ে আছে। মনে মনে নিজের জীবনের হিসাব মিলাচ্ছে। সে সত্যিই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে এই বন্দী জীবনে। এখান থেকে সে মুক্তির কোন পথই দেখতে পারছে না। এজন্য তার পিছনে থাকা দেয়ালে প্রতিদিন দাগ কাটে সে। প্রতিটা দিন গুনে রাখা, প্রতিটা দাগ একটা যন্ত্রণার সাক্ষী। আজকের দাগটা কাটলেই সে নিজেকে শেষ করে দেবে, এটাই ঠিক করে রেখেছে মনে মনে। দরজা খুলার আওয়াজ তার কানে এসেছিল ঠিকই কিন্তু চোখ তুলে দেখার প্রয়োজন বোধ করে নি ভেবেছে হয়তো সোফিয়া আবার এসেছে। একটু আগে সোফিয়া এসে ইকবাল জাওয়ানের বক্সটা নিয়ে গেছে তড়িঘড়ি করে। তাই তার মাথায় আসে, হয়তো আবার সোফিয়া এসেছে।
কিন্তু তার ভাবনা ছিড়ে কানে আসে বহু প্রতীক্ষিত শব্দ,
–“ভাই…”
শব্দ টা শ্রবণ হতেই তালহা আনমনে একবার নিবুনিবু চোখ গুলো তুলে তাকায় নজরে আসে সামনে সিতারা। সে প্রথমে স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকে। তারপর মাথা নাড়িয়ে বলতে থাকে,
–“না, না এটা… এটা সত্যি না… আবার সেই স্বপ্ন”
তার চোখে ভেসে ওঠে হাজারটা স্মৃতি। এই ছয় বছরে সে কতবার তার বোনকে কল্পনা করেছে, কতবার ভেবেছে, সিতারা এসে তাকে নিয়ে যাবে। তাই এবারও সে বিশ্বাস করে না, ভাবছে এটাও তার হ্যালুসিয়েশন। কিন্তু সামনের রমণী কাঁপা হাতে এগিয়ে এনে রাখে তার গালে। সিতারা হাতের উষ্ণতা অনুভব করতেই এক ঝটকায় দাঁড়িয়ে পড়ে তালহা। তার হাত কাঁপছে সে নিজের হাত তুলে সিতারার হাতের উপর রাখে। তারপরও অবিশ্বাসের সুরে আওড়ায়,
–“তুই… তুই সত্যি এসেছিস, তারা?”
সিতারার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি ঝরছে। এতক্ষণ সে বহু কসরতে এগুলোকে আটকে রেখেছে। এখন আর বাঁধ মালনো না। রমণী আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে ঝাঁপিয়ে পড়ে ভাইয়ের বুকে। তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে,
–“ভাইয়া….”
তার গলা জড়িয়ে আসছে কান্নায়, সে আঁকড়ে ধরে তালহাকে যেন ছেড়ে দিলে আবার হারিয়ে যাবে। হেঁচকি তুলতে তুলতে বলে,
–“তুমি কোথায় ছিলে ভাইয়া। আমি তোমাকে কত খুঁজেছি প্রতিদিন, প্রতিটা রাত পাগলের মতো খুঁজেছি। কিন্তু আমার বিশ্বাস ছিল তুমি বেঁচে আছো… আমি জানতাম…তুমি আমাকে ছেড়ে যাবে না……”
সে আর বলতে পারছে না, কথাগুলো বলতে বলতে তার গলা আটকে যাচ্ছে। সে নিচে বসে পড়ে ভাইকে জড়িয়েই। তালহার চোখেও টলমল করছে। ছয় বছরে এই প্রথম সে কাঁদছে। ধীরে ধীরে সে সিতারার মাথায় হাত রেখে সান্ত্বনার সুরে বলে,
–“চুপ… চুপ কর পাগলি… আমি আছি… দেখ… আমি এখানেই আছি”
কিন্তু বিপরীত পাশের রমণী যেন তার কথা শুনছেই না। সে তার মতো বলতে থাকে,
–“তোমার… তোমার এই অবস্থা… কে করেছে এগুলো? কে তোমাকে এভাবে রেখেছে?
আর..কে…কে তোমাকে এভাবে মেরেছে, হ্যাঁ বলো?”
–“সব শেষ হয়ে গেছে, তারা। রিল্যাক্স কাম ডাউন”
–“তুমি এখানে কীভাবে ছিলে?”
তালহা একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বোনের গালে হাত রেখে শান্ত স্বরে বলে,
–“কিছু না এগুলো, তারা। আমি ঠিক আছি। জানিস, আমি ভেবেছিলাম আমি আর এখান থেকে বের হতে পারব না। তাই আজ… আজ আত্মাহত্যার কথাও ভেবেছিলাম। আর একটু…”
তার বাক্য সম্পন্ন করার আগেই সিতারা হঠাৎ শক্ত কণ্ঠে বলে,
–“চুপ করো এমন কথা মুখেও আনবে না।
তুমি জানো না, আমি কতটা মিস করেছি তোমাকে। ঈদের দিন, জন্মদিন, প্রতিটা দিনে প্রতিটা, রাতে আমি শুধু ভাবতাম তুমি কোথায় আছ?”
–“আমিও প্রতিটা রাতে ভাবতাম, যদি একবার তোকে দেখতে পারতাম মৃত্যুর আগে”
দুজনেই আবার শক্ত করে জড়িয়ে ধরে একে অপরকে। অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা আবু আর দিহান চোখ মুছতে মুছতে সব রেকর্ড করতে থাকে।
ওদিকে সিতারা এখনো ভাইকে ছাড়ছে না। সে এখনো বাচ্চাদের মতো করে দিক্বিদিক ভুলে বলছে,
–“আমি তোমাকে আর কোথাও যেতে দেব না।তুমি ডিরেক্ট আমার বাসায় যাবে”
তালহা চোখ বন্ধ করে মাথা ঠেকিয়ে দেয় বোনের কাঁধে। সারহাদ একপলক দুই ভাইবোন কে দেখে পর মুহূর্তে নিজের কাঙ্ক্ষিত জিনিস টা খুঁজতে শুরু করে।
সমুদ্রের বুক জুড়ে ছড়িয়ে থাকা আজকের রাতটা যেন অস্বাভাবিকভাবে নিস্তব্ধ। চারদিক গিলে খাওয়া অন্ধকার আর নিঃশ্বাস বন্ধ করা এক গভীরতা। সেই অন্ধকারের ভেতর হঠাৎ দেখা যায় কয়েকটি ছায়ামূর্তি। কালো ডুবুরির স্যুটে মোড়া, মাথা থেকে পা পর্যন্ত সম্পূর্ণ ঢাকা। তাদের শরীরের সঙ্গে লেগে থাকা বিশেষ ট্যাকটিক্যাল স্যুট, যেটা পানির চাপ সহ্য করতে পারে, অন্ধকারে শিকারি জন্তুর মতো দৃষ্টি। পিঠে অক্সিজেন ট্যাংক আর কোমরে বাঁধা ছোট ছোট অস্ত্র। কাইলিন ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে আদেশ ছুঁড়ে,
–“মুভ”
তার আদেশের সাথে সাথে ঝপাঝপ করে একে একে সবাই সাগরের কালো পানিতে লাফিয়ে পড়ে। মুহূর্তে তারা অদৃশ্য হয়ে যায় পানির নিচে। তারা পানির নিচ দিয়েই সোজা এগিয়ে যাচ্ছে ড্যাসেলের দিকে, একদম শিকারির মতো।
কাইলিন কিয়ৎকাল পর তার কানে থাকা কমিউনিকেশন ডিভাইসে সিগন্যাল দেয়। পর মুহূর্তেই আকাশে চার পাঁচটা হেলিকপ্টার অন্ধকার চিরে ভেসে ওঠে। তাদের নিচে ঝুলছে হেভি মেশিন গান, রকেট পড সব প্রস্তুত। তারা সরাসরি জাহাজটার দিকে ধেয়ে যায়। কাইলিন নিজেও স্পিডবোট নিয়ে পানির বুক চিরে তীব্র গতিতে এগিয়ে যায়।
কাইলিন জাহাজের কাছে পৌঁছানোর আগেই মার্কানের লোকেরা টের পেয়ে যায়। তারা পাল্টা আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়, কিন্তু তার আগেই আকাশ থেকে নেমে আসে ধ্বংস। হেলিকপ্টারগুলো থেকে কোনো আগাম বার্তা ছাড়াই ভারী মেশিনগানের গুলি বৃষ্টির মতো ঝরে পড়তে থাকে জাহাজের ডেকে। যারা পাহারায় ছিল, তারা এক মুহূর্তে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। কেউ প্রতিরোধ করার সুযোগই পায় না। মার্কানের হেলিকপ্টারগুলো বের হওয়ার আগেই তাদের উপরও হামলা চালানো হয়, এক এক করে আগুনে পুড়ে যায় সেগুলো। এজন্যই কাইলিন স্পিডবোটে এসেছে যাতে তাদের দৃষ্টি তার উপর থাকে।
এই বিশৃঙ্খলার মাঝেই পানির নিচে থাকা ব্ল্যাক হান্টারের গার্ডরা জাহাজের গায়ে পৌঁছে যায়। তারা গ্র্যাপলিং হুক ছুঁড়ে জাহাজে উঠে আসে। কাইলিনও স্পিডবোট থামিয়ে জাহাজে ওঠে। সে গার্ড দের একটা ইশারা করতেই সবাই পকেট থেকে বের করে ছোট ইনজেকশন, ম্যানবিস্ট’ ড্রাগস। পর মুহূর্তে নিজেরাই নিজেদের শরীরে সেটা পুশ করে দেয়। সাথে সাথেই তাদের শিরা উপশিরা সহ ফুলে উঠে, চোখ লাল হয়ে যায়, নিশ্বাস ভারী হয়ে ওঠে। এখন তারা আর মানুষের অবস্থায় নেই তারা এখন হয়ে ওঠেছে একদল হিংস্র হায়নার দল। এক সেকেন্ড না দেরি করে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে মার্কানের গার্ডদের উপর। কোন গুলি নয় বরং টেনে হিচড়ে ছিঁড়ে ফেলছে, রক্তে ভাসিয়ে দিচ্ছে পুরো ডেক। মার্কানের গার্ডরা এমন হিংস্রতা কল্পনাও করেনি। তারা প্রতিরোধ করার আগেই একে একে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।
একদল গার্ড ইতিমধ্যে জাহাজের চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। তারা পরিকল্পিতভাবে জাহাজের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বোম সেট করতে শুরু করে। আরজে জানতে পেরেছে, মার্কান আজ তার পুরো বাহিনী নিয়ে পালানোর প্ল্যান করেছিল, এই জাহাজেই তার সবকিছু। তাই আরজে চায়, আজ এখানেই সব শেষ হোক। এদিকে কাইলিন লোকেশন ট্র্যাকারে চোখ রেখে এগিয়ে যায় আরজে থাকা সেই কক্ষের দিকে।
নিস্তব্ধতা ভেঙে পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তটাকে যদি কেউ দেখত, তাহলে বুঝত, ঝড় আসার আগে প্রকৃতি যেমন অদ্ভুতভাবে চুপ হয়ে যায়, ঠিক তেমনই থমথমে হয়ে আছে সেই কক্ষটা। ঈশানী এখনো থামছে না। বারবার, বারবার থমাসের বুকে কিল ঘুষি মারছে আর বলছে,
–“আমার আরভিকে দে, এক্ষুনি দে, কুত্তা। জানোয়ার, তুই কি করেছিস ওর সাথে?”
প্রথমে থমাস বিষয়টা তেমন পাত্তা না দিলেও ধীরে ধীরে তার মুখের হাসি মিলিয়ে যাচ্ছে। সামনের রমণীর চোখের জল তাকে ভিতর থেকে গলিয়ে দিচ্ছে। শেষমেশ সে দুহাতে ঈশানীর কবজি চেপে ধরে, তাকে নিজের বুকের সাথে আটকে নরম স্বরে বলে,
–“রিল্যাক্স, ঈশানী…ওই তো দেখো, তোমার আরভি’
বাক্যটা শ্রবণ হতেই মুহূর্তে ঈশানীর চোখ যেন জ্বলজ্বল করে ওঠে। সে থমাসের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে তার দেখানো দিকের দিকে তাকায়, আর ঠিক তখনই তার দৃষ্টি আটকায় অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডের কোলে আরভি। নিস্তেজ মাথাটা একদিকে হেলে আছে, ছোট্ট শরীরটা যেন প্রাণহীন হয়ে ঝুলে আছে। তার ঠোঁট থেকে ফিসফিসিয়ে বের হয়,
–“আরভি…”
তারপর রমণী আর কিছু না ভেবে এক দৌড়ে ছুটে যায়। গার্ডটা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে জোরে ধাক্কা মেরে আরভিকে ছিনিয়ে নেয় তার কোল থেকে। নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে এক নিঃশ্বাসে বলতে থাকে,
–“আরভি…আরভি…কী হয়েছে বাবু?”
তার গলা দিয়ে শব্দ গুলো বের হতে চাইছে না কান্না গুলো আটকে আছে গলায়। সে আরভির মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, কপালে ঠোঁট ছোঁয়ায় বারবার,
–“তোমাকে একবারও দেখতে দেয়নি ওরা, আমি কত বলেছি ও প্রোটিন ছাড়া কিছু খায় না, খেতে দিয়েছে তোমাকে? বলো আন্নাকে?”
তার নিজেরই বোঝা নেই, সে কি বলছে। এই দুদিনে তার কণ্ঠ ভেঙে গেছে, চোখ শুকিয়ে গেছে তবুও এই মুহূর্তে যেন সব কান্না একসাথে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
ঈশানীর মনে সব সময় আরভির জন্য আলাদা একটা সফট কর্নার ছিল। সানার প্রেগনেন্সির শুরুতেই সবচেয়ে কঠিন সময়টাতে একটা মানুষই ছিল তার পাশে, ঈশানী। সেই সময়টাতে সানা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছিল ধীরে ধীরে, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়, অতীতের দগদগে স্মৃতি সবকিছু মিলিয়ে সে নিজেকেই হারিয়ে ফেলছিল। এসপি আর সানিতা তখনও আসেনি। আরভি হওয়ার দুই বছর পরে তারা আসে। আর সারহাদও মাঝেমধ্যে আসত। আর সানা আরজেকে ছেড়ে আসার পর থেকেই সে এতটাই ভেঙে পড়েছিল, যে নিজের ছেলের দিকেও ঠিকভাবে খেয়াল রাখতো না। আরভি তখন ছোট বাচ্চা মায়ের স্পর্শ চায়, মায়ের চোখ খোঁজে। কিন্তু সানা, সে তখন নিজের ভেতরের অন্ধকারেই হারিয়ে গেছে। সারাদিন উদাস হয়ে থাকত। আর সেই সময়টুকুতে সানার থেকে বেশি ঈশানী হয়ে ওঠে আরভির আশ্রয়। ধরতে গেলে ফিডিংয়ের সময় ছাড়া আরভি প্রায় সবসময়ই থাকত ঈশানীর কাছে। সে ঘুমাত তার পাশে, খেলত তার সাথে,।কাঁদলে প্রথমে খুঁজত তাকে। আরভির প্রথম হাঁটা, প্রথম শব্দ, প্রথম হাসি সবকিছুর সাক্ষী ছিল ঈশানী। ধীরে ধীরে একটা গভীর বন্ধন তৈরি হয়ে যায় দুজনের মধ্যে। ঈশানীর নিজের অসুস্থতাও ধীরে ধীরে কমতে থাকে। যেন আরভি তার জীবনের একটা নতুন কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর তাদের মধ্যে তৈরি হয় এক অদ্ভুত সম্পর্ক, রক্তের না তবুও রক্তের থেকেও গভীর।
যেখানে কোনো দাবি নেই, কিন্তু টান আছে।
কোনো নাম নেই, কিন্তু সম্পর্ক আছে।
এদিকে গার্ডরা ঈশানীর দিকে বন্দুক তুলে ধরার আগেই থমাস চিৎকার করে ওঠে,
–“ডোন্ট ইউ ডেয়ার, কেউ… ওর দিকে বন্দুক তুলবে না। কেউ না”
গার্ডরা এক পা পিছিয়ে যায় তার আদেশ মতো। আর এদিকে সানা একদৃষ্টিতে দেখছে। ধীরে ধীরে তার ঠোঁটে বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে কেননা রমণী এতক্ষণে বুঝে গেছে থমাসের দুর্বলতা ঈশানী। আর ঈশানীর কোলে আরভি থাকলে, আরভির গায়ে কেউ হাত তুলতে পারবে না। তার বুকের ভেতরটা জ্বলে উঠছে, রাগে, যন্ত্রণায়, মাতৃত্বের তীব্র আকাঙ্ক্ষায়। রমণী আর এক মুহূর্তও দেরি না করে সে ঝাঁপিয়ে পড়ে সরাসরি থমাসের ওপর। থমাস একদম প্রস্তুত ছিল না এমন আকষ্মিক আক্রমণের জন্য। সে হোঁচট খেয়ে পিছিয়ে যায়। সানা তার দিকে ঠান্ডা স্বরে হিসহিসিয়ে বলে,
–“আমার ছেলের দিকে চোখ তুলে তাকানোর আগে নিজের কবর খুঁড়ে রাখিস”
মার্কান সঙ্গে সঙ্গে গর্জে ওঠে,
–“শুট হার”
গার্ডরা সানার দিকে বন্দুক তলবে কিন্তু তার আগেই আরজে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
তার চোখ লাল, শ্বাস ভারী, মুখে রক্তের দাগ। দেখতেই মনে হচ্ছে সে আর নিজের মধ্যে নেই, সে যেন নিজের ভেতরের দানবটাকে এতক্ষণ ধরে চেপে রেখেছিল, আর এখন সেটা ছিঁড়ে বেরিয়ে এসেছে। একজন গার্ডের গলা সে এক ঝটকায় চেপে ধরে দেয়ালে আছড়ে ফেলে। সারা কক্ষে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে হাড় ভাঙার শব্দ, চিৎকার, রক্তের ছিটা সবকিছু মিশে এক বিভীষিকাময় দৃশ্য।
ওদিকে এসপি আর দাঁড়িয়ে নেই, সে একের পর এক গুলি ছুঁড়ছে। তার সাথে মিসেস দিলরুবা খানমের এজেন্টরাও চারদিক থেকে আক্রমণ চালায়। মুহূর্তে কক্ষটা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
কক্ষের অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা মার্কানের চোখে এখন স্পষ্ট আতঙ্ক। সে বিস্মিত চোখে তাকিয়ে আছে আরজের দিকে। মনে মনে ভাবছে, আরজে তো হ্যান্ডক্রাফে বাঁধা ছিল, তাহলে সে ছাড়া ফেলো কীভাবে! আর এখন সে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে তার দিকে একটা জীবন্ত দানবের মতো। আরজে কে এমতাবস্থায় দেখে মার্কানের গলা শুকিয়ে আসে। তার কণ্ঠ থেকে ফিসফিস করে বের হয়,
–“হ্যান্ডক্রাফ খুলে গেছে মানে.. না, না, এটা সম্ভব না”
তার পা অজান্তেই পিছিয়ে যেতে থাকে। এদিকে দরজা ভেঙে ঢুকে পড়েছে কাইলিন। তার সাথে ঢুকেছে আরজের সেই দানবীয় বাহিনী। তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে মার্কানের বাকি গার্ডদের ওপর।
আরজে ধীরে ধীরে হাঁটছে মার্কানের দিকে। বিপরীতে মানব বুঝতে পারছে না চোখের পলকে কীভাবে খেলা ঘুরে গেছে, সে এখনো এটাই বুঝতে পারছে না আরজে হাত কীভাবে খুলেছে। কিছু একটা ভেবে মার্কান হঠাৎ পকেট থেকে একটা ছোট রিমোট বের করে, ভয়ে তার হাত কাঁপছে। সে তড়িঘড়ি করে বলে,
–“স্টপ, আর এক পা এগোলেই তোর ছেলে এখানেই শেষ। এক সেকেন্ডে উড়িয়ে দেব”
সাথে সাথে আরজের পা থেমে যায়। এক মুহূর্তে তার চোখের সেই হিংস্রতা একটু থেমে যায় তার জায়গায় আসে সরু দৃষ্টি। সে ভ্রু কুঁচকে তাকায় তারপর ধীরে ধীরে ঘাড় কাত করে ঈশানীর কোলে থাকা আরভির দিকে তাকায়। নজরে আসে আরভির ছোট্ট শরীরটা নিস্তেজ আর তার কোমরে বাঁধা একটা ছোট মারাত্মক ডিভাইস। এক ধরনের উন্নত বোমা, যেটা টাইমার এবং রিমোট দুটো দিয়েই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। নির্দিষ্ট সিগন্যাল পেলেই বিস্ফোরণ ঘটবে, আর কাছাকাছি যা আছে সব ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে। আরজের বুকের ভেতর যেন কিছু একটা মোচড় দেয়। তার ছেড়ে দেওয়া হাত ধীরে ধীরে মুষ্টি বদ্ধ হয়ে আসে।
এদিকে থমাস শেষ পর্যন্ত সানার কাছ ধরাশায়ী হয়ে পড়ে। সানা একের পর এক আঘাত করেই চলছে। থমাসের শরীর রক্তাক্ত, নিঃশ্বাস ভারী, কিন্তু ঠোঁটে সেই পাগলাটে হাসি এখনো লেগে আছে। সানা বন্দুক তুলে ধরে তার মাথার দিকে গুলি করার জন্য কিন্তু হঠাৎই থমাস খিকখিক করে হেসে ওঠে। এসপি পিছন থেকে বলে ওঠে,
–“আরেহ ইয়ার, কি দেখছিস? গুলি মেরে দে। না হলে আমি মেরে দিচ্ছি”
কিন্তু থমাস কিছু না বলে সে শুধু চোখ তুলে সানার দিকে ইশারা করে। রমণী তার ইশারা মতো তাকাতেই নজরে আসে আরভি। সাথে সাথে সানার বুক কেঁপে ওঠে। তার চোখ হঠাৎ বড় হয়ে যায়। মনে পড়ে যায় টাইমারের কথা যেটা সে ভুলেই গিয়েছিল। তার দৃষ্টি ছুটে যায় আবার থমাসের দিকে। থমাস এবার চোখের ইশারায় দেখায়, মার্কানের হাতে থাকা রিমোট। এটা দেখে সানার গলা শুকিয়ে আসছে। একটা ফাঁকা ঢোক গিলে সে স্থির হয়ে যায়। কিছুক্ষণ আগেও তার মুখে ছিল আগুন, এখন সেখানে স্পষ্ট আতঙ্ক।
কক্ষের ভেতরের বাতাসটা যেন হঠাৎ আরও ভারী হয়ে ওঠে। প্রতিটা শ্বাস নেওয়া কঠিন কারণ এখানে শুধু বন্দুক বা রক্ত না, এখানে ঝুলে আছে একটা শিশুর জীবন। আরজে দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোয়াল এতটাই শক্ত যে শিরাগুলো ফুলে উঠেছে। চোখ দুটো রক্তলাল, সোজা তাকিয়ে আছে মার্কানের হাতে ধরা সেই রিমোটের দিকে। সে কণ্ঠে রুক্ষতা মিশিয়ে গর্জে ওঠে,
–“শোন কুত্তার বাচ্চা… তোর ভাগ্য ভালো, তুই আমার ছেলের পেছনে লুকিয়ে আছিস। না হলে এই মুহূর্তে তোর লাশটাও চিনতে পারত না কেউ”
মার্কান তার দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু চোখে স্পষ্ট আতঙ্ক। এদিকে সানা আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে থমাসকে ছেড়ে এক দৌড়ে চলে যায় ঈশানীর দিকে। তার বুক ধড়ফড় করছে, হাত কাঁপছে। ঈশানীর কোলে থাকা আরভিকে সে এক ঝটকায় নিজের বুকে টেনে নিয়ে এলোমেলো ভাবে বলছে,
–“ভীর, ভীর সোনা, চোখ খোলো… মম এসেছে”
কাঁপা কাঁপা হাতে সে ছেলের গালে হাত রাখে, আঙুলগুলো থরথর করে কাঁপছে তার। ফের ডেকে ওঠে,
–“সোনা, একটা বার দেখো, মম এসেছে প্লিজ”
তার চোখ বেয়ে অঝোরে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে সাথে তার বুকের ভেতর যেন ঝড় উঠেছে। দুই দিন, পুরো দুইটা দীর্ঘ রাত, একটাও মুহূর্ত সে শান্তিতে ছিল না। আর এখন ছেলেটা তার কোলে কিন্তু নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে। তার গলাটা যেন বন্ধ হয়ে আসছে। সে ছেলেকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে, মাথাটা তার কাঁধে রেখে ফিসফিস করে,
–“কিছু হবে না, মম আছে, আর কেউ কিছু করতে পারবে না”
এদিকে আরজের সব গার্ড বন্দুক তাক করে আছে মার্কানের দিকে। মুহূর্তটা শুধু একটা ট্রিগারের অপেক্ষা। কিন্তু আরজে চোখ দিয়ে একটা ছোট্ট ইশারা করে। ব্যাস, সবাই একসাথে বন্দুক নামিয়ে ফেলে। মার্কান এখনো অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। হাতে রিমোট থাকলেও তার মাথা যেন কাজ করছে না। এক পলকে কিভাবে খেলা ঘুরে গেল?
সে তো ভেবেছিল, আজ এখানেই সবাইকে শেষ করে দেবে। কিন্তু আরজের হ্যান্ডক্রাফ খুলে তার সব প্ল্যান ভেঙে গেছে। তার বুকের ভেতর হালকা একটা ভয় ঢুকে পড়ে। মনে মনে বলে,
-“না… এখানে থাকা যাবে না”
তার মাথায় শুধু একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে, পালাতে হবে এখনই। সে এগিয়ে গিয়ে থমাসকে মেঝে থেকে টেনে তোলে। থমাসের দাঁড়াতে কষ্ট পাচ্ছে, শরীর রক্তাক্ত, কিন্তু তার চোখ এখনো ঈশানীর দিকে। মার্কান তাকে তাড়া দিলেও সে একপায়ে খাঁড়া, সে ঈশানীকে ছাড়া যাবে না। ছেলে এমন জেদে মার্কানের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। তার চোখে বিরক্তি আর রাগের ছাপ। এই ছেলে টাকে এই মুহূর্তেও প্রেমিক পুরুষ হতে হবে। এই মেয়েটা যে তার ছেলের উপর কী জাদু করেছে সে বুঝতে পারছে না। তার মাথায় যেন আগুন জ্বলে ওঠে। কিন্তু সে জানে, এই ছেলেটা ছাড়া তার আর কেউ নেই, এটাই তার রক্ত। সে দাঁতে দাঁত চেপে আবার বলে,
–“ও যদি আমাদের সাথে না আসে… আমি এক্ষুনি বাটন প্রেস করবো, আর সব শেষ”
কক্ষটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে যায়। ঈশানীর বুকটা কেঁপে ওঠে। সে ধীরে মাথা তোলে, টলমল দৃষ্টিতে একবার তাকায় সানার কোলে থাকা আরভির দিকে। ছোট্ট, নিস্তেজ শরীরটা দেখে মুহূর্তে তার বুকটা যেন মোচড় দিয়ে ওঠে। সে একটা ফাঁকা ঢোক গিলে তারপর
ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। সানা সাথে সাথে তার হাত ধরে ফেলে। মাথা নাড়িয়ে না বুঝায়। বিপরীতে ঈশানীর চোখ দিয়ে গড়গড় করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সে ধীরে সানার হাতটা সরিয়ে দেয়। রমণী এগিয়ে এসে আরভির কপালে একটা চুমু খেয়ে ভাঙ্গা ভাঙ্গা স্বরে আওড়ায়,
–“ওর খেয়াল রাখবি, ও খিদে পেলে কাঁদে, ঠিকমতো খাওয়াবি…..”
তার কথা শেষ করতে পারছে না, কান্নাগুলো কণ্ঠ আটকে যাচ্ছে। সে শেষবারের মতো তাকিয়ে থাকে আরভির দিকে, যেন চোখে ভরে নিতে চায়। তারপর মার্কান ও থমাসের পিছনে হাঁটতে শুরু করে। মার্কানের চারপাশে এখন মাত্র কয়েকজন গার্ড বেঁচে আছে। সবাই ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছে। মার্কানের হাতে এখনো সেই রিমোট। এদিকে আরজে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। তার মুষ্টিবদ্ধ হাত বারবার শক্ত হচ্ছে আবার খুলছে, যেন নিজেকে ধরে রাখছে বহু কসরতে। তার চোখ একবার ছেলের দিকে যায়, তারপর আবার সেই রিমোটে। এক মুহূর্ত, শুধু একটা মুহূর্ত লাগবে সব শেষ করে দিতে। কিন্তু পর মুহূর্তে নিজেকে সংবরণ করে এক হাতে ঘাড় ঘষে কাইলিনের দিকে তাকিয়ে চোখে ইশারা করে। কাইলিন ইশারা বুঝে নিঃশব্দে মাথা নাড়িয়ে ধীরে ধীরে সরে যায় আর অন্ধকারের ভেতরে মিলিয়ে যেতে থাকে। আরজে দ্রুত কদমে এগিয়ে এসে ছেলের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। এদিকে সানার বুকের ভেতরটা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে। সে বারবার আরভির নাম ধরে ডাকছে,
–“ভীর, সোনা, চোখ খোলো দেখো”
তার কণ্ঠ কাঁপছে গলা ভারী হয়ে এসেছে কান্নায়। সানার বারবার ডাকাডাকিতে হঠাৎ রমণীর কোলের নিস্তেজ শরীরটা সামান্য নড়ে চড়ে ওঠে। আরভির দুর্বল আঁখি পল্লব ধীরে ধীরে খুলে যায়। প্রথমে সবকিছু ঝাপসা লাগে তার কাছে তারপর চোখের সামনে কাঙ্ক্ষিত মুখটা পরিষ্কার হয়, সানা এক সেকেন্ডও দেরি করে না সে নিচু স্বরে বলে,
–“মম…”
পরের মুহূর্তেই সে সানার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে ছোট্ট আরভি হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। দুই হাতে সানাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। সানাও আর নিজেকে আটকাতে না পেরে ছেলেকে এমনভাবে বুকে চেপে ধরে যেন কেউ আবার ছিনিয়ে নিতে না পারে,
–“হ্যাঁ, সোনা, দেখো মম এখানে। আর কিছু হবে না”
বিপরীতে আরভি যেন এখনো নিজেকে বিশ্বাস করাতে পারছে না, সানা সত্যিই এখানে। তাই অবিশ্বাসের সুরে বলে,
–“মম, তুমি সত্যিই এসেছো?
আমি ভেবেছিলাম তুমি আর আসবে না”
–“মম না এসে পারবে? মম যে তোমাকে ছাড়া এক মুহূর্ত ও থাকতে পারে না”
রমণীর চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে।
আরভি কাঁদতে কাঁদতে অভিযোগের সুরে বলতে থাকে,
–“জানো মা, ওরা…ওরা আমাকে খুব কষ্ট দিয়েছে”
সাথে সাথে সানার বুকের ভেতর টা মোচড় দিয়ে ওঠে। তার ছেলে এমনিতেই ব্যাথা ফেলে কাঁদে না আর বলেও না। তাহলে ঠিক কতটা কষ্ট পেয়েছে যে সে আজ সে মুখ ফুটে বলছে। সানা তার ললাটে চুমু খেয়ে বলে,
–“কে করেছে, কে আমার বাচ্চা টাকে ছুঁয়েছে, বলো মমকে?”
আরভিরর ছোট্ট হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে সানার জামা। সে ভাঙ্গা গলায় বলতে থাকে,
–“ওরা..ওরা..আমাকে খেতে দেয়নি। আমি কতবার বলেছি… আমি মাছ ছাড়া খেতে পারি না… ওরা শোনেনি। আমার খুব ক্ষুধা পেয়েছিলো, পেট ব্যাথা করছিলো। আমি কাঁদছিলাম কিন্তু ওরা হাসতো। আমি তোমাকে, ড্যাডকে আন্নাকে অনেকবার ডেকেছি”
সানার বুকটা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে। ঐ জানোয়ার গুলো একটা বাচ্চার সাথে এমনটা করেছে। সে তাকে বুকের সাথে মিশিয়ে বলে,
–“মম শুনতে পায়নি সোনা, কিন্তু আমি জানতাম আমার বাচ্চাটা কাঁদছে”
বিপরীতে আরভি সানার সান্ত্বনা বাণীতে থামছে না। সে ফের আওড়ায়,
–“মম, ওরা রাতে আমাকে ঘুমাতেও দেয়নি। আলো জ্বালিয়ে রাখত। আমি চোখ বন্ধ করলেই চিৎকার করতো। আমি তোমাকে ডাকলেই ওই ব্যাড আঙ্কেলগুলো আমাকে মারত, এখানে… এখানে.. বলত চুপ থাকতে। আমি তোমাকে খুব মিস করেছি মম”
একেকটা কথা যেন ছুরির মতো বিঁধছে সানার বুকে। সে ছেলেকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে, তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। রমণীর কণ্ঠস্বর থেকে শব্দ বেরুচ্ছে না তারপরও বহু কসরতে বের হয়,
–“মমও ভীষণ মিস করেছে ভীর কে। হুশ আর কিছু হবে না, সোনা”
আরভি কাঁদতে কাঁদতে মুখ লুকিয়ে ফেলে তার বুকে,
–“আমি আর থাকবো না এখানে মম, প্লিজ চলো'”
–“হ্যাঁ, সোনা এক্ষুনি যাব”
এদিকে আরভির মুখ থেকে নিঃসৃত হওয়া প্রতিটা শব্দ শুনছে আরজে। তার হাত ধীরে ধীরে মুষ্টিবদ্ধ হয়ে আসছে। শিরাগুলো ফুলে উঠছে, যেন তার ভেতরে আগ্নেয়গিরি জেগে উঠছে। এরা তার একমাত্র রক্তের সাথে….তার চোখ ধীরে ধীরে রক্তলাল হয়ে ওঠে। এক মুহূর্তের জন্য সে মাথা নিচু করে নিজের শ্বাস নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। তারপর চোখ তুলে সানার দিকে তাকিয়ে ইশারা করে সানা বুঝে সে আরভির মাথাটা আরও শক্ত করে নিজের বুকে চেপে ধরে যেন কিছুই না দেখে, না বোঝে। আরজে হাত বাড়ায়, তার দৃষ্টি গিয়ে আটকে আরভির কোমরে।
তারগুলো এলোমেলোভাবে পেঁচানো টাইমার ঝলসে উঠছে দেড় মিনিট। সময় খুব কম। যদি টাইমারটা বেল্টে বাঁধা থাকতো তাহলে খুলে ফেলা যেত কিন্তু এরা এটাকে শুধু তার দিয়ে পেঁচিয়ে দিয়েছে। আরজে হাত বাড়াতেই তার গার্ডরা মুহূর্তে বুঝে একজন এগিয়ে এসে নিঃশব্দে তার হাতে একটা কাঁচি ধরিয়ে দেয়। আরজে কাঁচিটা হাতে নিয়ে কিয়ৎকাল বুঝার চেষ্টা করে। সে লাইফে বহু বোম ডিফিউজ করেছে, সোফিয়া তাকে এসব বিষয়ে অনেক আগেই টেইনড্ করেছে কিন্তু আজ যেন তার হাত কাঁপছে এই প্রথম। কারণ এটা শুধু একটা বোম না, এটা তার ছেলের জীবন। সে চোখ নামিয়ে বোমটা পর্যবেক্ষণ করে বুঝে ফেলে এটা হ্যান্ডমেড। যার কারণে কোনো স্ট্যান্ডার্ড প্যাটার্ন নেই। তারগুলো এলোমেলো কিন্তু তিনটা মেইন লাইন পরিষ্কার লাল, কালো, হলুদ। এদিকে সানা বারবার তাকে তাড়া দিচ্ছে,
হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২০ (৩)
–“রানভীর, প্লিজ.. তাড়াতাড়ি”
আরজে এক মুহূর্তের জন্য তার দিকে তাকায়। সে ধীরে কাঁচিটা একটা তারের দিকে তোলে। সানা মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বুঝায় সাথে সাথে দুজনেই একসাথে চোখ বন্ধ করে ফেলে। আরজে দাঁতে দাঁত চেপে কাঁচিটা চাপ দেয় মুহূর্তে তারটা কেটে যায় আর তারপরই…..
