Home মির্জা সায়ান মুগ্ধ মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ১

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ১

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ১
jannatul firdaus mithila

আলিশান রেডিসন ব্লু-য়ের পাঁচ তলার সরু করিডর দিয়ে প্রাণপনে ছুটছে সপ্তদশী তরুণী! তার পিছুপিছু দৌড়ে আসছে বেশক’জন কালো পোশাকধারী গার্ডস। এই বুঝি তারা সপ্তদশীকে পেয়ে গেল হাতের নাগালে! সপ্তদশী থামছেনা। পায়ের গতি বাড়িয়েছে তীব্র থেকে তীব্র। আর একটু সামনেই খোলা এলিভেটর। যেভাবেই হোক সপ্তদশীর সেখানে ঢুকতেই হবে। বাঁচতে হবে পেছন থেকে ধেয়ে আসা খারাপ লোকগুলোর হাত থেকে। মিনিট খানেক পেরুলো, সপ্তদশী দৌড়ে এসে ঢুকলো এলিভেটরে। কাঁপা কাঁপা হাতে ব্যগ্রতার সাথে এলিভেটরের সবগুলো বোতাম চাপলো একইসাথে। তবে দরজা এখনো বন্ধ হচ্ছে না এলিভেটরের। ওদিকে লোকগুলো ছুটে আসছে এদিকে! সপ্তদশী এবার ভয়ে জড়সড়! বুকটা তার ধড়ফড় করছে বেশ। ছোট্ট চিকনচাকন দেহটা কেমন কাঁপছে রীতিমতো। ফাঁকা মস্তিষ্ক তার হঠাৎ বলে উঠল,

“ এবারেও কী তারা আমায় ধরে ফেলবে? আবারও তুলে নিয়ে যাবে ঐ রাক্ষসের কাছে?”
মস্তিষ্কে একই কথা হাতুড়ি পেটা করছে। মনের মধ্যে একরাশ ভয়। সপ্তদশীর ভয়ার্ত চোখদুটোর অসহায় চাহনি সম্মুখেই নিবদ্ধ। যেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে লোকগুলো ছুটে আসছে তার দিকে। এরইমধ্যে ভাগ্য বুঝি তার সহায় হলো কিছুটা। ধীরে ধীরে এলিভেটরের দরজাখানা বন্ধ হবার তাড়া দিয়ে উঠল। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যাবধানে লোকগুলো তাকে ধরতে পারেনি এর আগেই বন্ধ হয়েছে দরজা। এটুকুতেই যেন বিরাট স্বস্তি পেল সপ্তদশী। ধড়ফড়াতে থাকা বুকটার ওপর দু’হাত চেপে, ধপ করে বসে পড়ল মেঝেতে। বুকভাঙা আর্তনাদে কাতর মেয়েটা, কান্নার তোড়ে হেচঁকি তুলতে তুলতে বাচ্চাদের ন্যায় ডাকতে থাকে,

“ আব্বু…. ভাইয়া! বাঁচাও আমায়। আমি…আমি মরে যাচ্ছি!”
কে শুনবে সপ্তদশীর কন্ঠ? কে বাঁচাবে তাকে? একটু আগেই তো তার চোখের সামনে তার বাবাকে নির্মমভাবে হেনস্তা করেছে ঐ লোক! শক্তপোক্ত বাবাটাকে তার ভেঙে দিয়েছে মানসিকভাবে। আর ভাই? তারও তো তেমন খোঁজ পায়নি সপ্তদশী। শুধু একবার দেখেছিল তাকে বাঁচাতে গিয়ে গুলি লেগেছে তার ভাইয়ের হাতে। ব্যস!এটুকুই। কথাগুলো মনে পড়তেই ফের হাউমাউ করে কেঁদে উঠে মাহি। দু’হাতে নিজের সুন্দর সিল্কি চুলগুলো মুঠোয় চেপে ধরে শক্ত করে। এলিভেটরের চারপাশের দেয়ালে জুড়ে থাকা স্বচ্ছ কাঁচের আয়নায় ক্রন্দনরত সপ্তদশীর মাসুম মুখখানা স্পষ্ট প্রতিবিম্বিত। ফর্সা টুকটুকে মুখখানার সে-কি বেহাল দশা কাঁদতে কাঁদতে! চশমার আড়ালে লুকিয়ে থাকা অদ্ভুত সুন্দর ভাসা ভাসা চোখদুটো লাল হয়ে গিয়েছে ইতোমধ্যে। এক নজর দেখলে মনে হবে — এ যেন সাক্ষাৎ পদ্মরাগমণি! তীরের ফলার ন্যায় খাঁড়া নাকের ডগাটা কেমন লাল হয়েছে! মনে হচ্ছে এই বুঝি কেউ ইচ্ছেমতো মেয়েটার নাক-গাল বরাবর একমুঠো লাল রং ঘষে দিয়েছে। গালদুটোয় মাংসের উপস্থিতি কম বিধায় বামপাশে টোল পড়েছে সামান্য। গোলাপের পাপড়ির ন্যায় নিখুঁত আর্টের ঠোঁটদুটো বেশ নজরকাঁড়া ঠেকছে এমুহূর্তে!

কান্নার বিশুদ্ধতায় তারা বুঝি আজ রুপ বাড়িয়েছে নিজেদের। ফর্সা মসৃণ কন্ঠায় কালসিটে দাগ স্পষ্ট! গলাটাও ব্যাথা করছে বেশ। কন্ঠ ফুঁড়ে বেরুচ্ছেনা শব্দ। অন্তর্মুখী সপ্তদশী নরম ধাঁচের মেয়ে। প্রতিকূল মুহূর্তে নিজেকে সামলানোর কিংবা বাঁচানোর খুব একটা উপায় জানা নেই তার। তাইতো কেমন কাঁদছে নিজের ওমন অসহায়ত্বে। এদিকে এলিভেটর ততক্ষণে এসে থামল টপ ফ্লোরে। ধীরে ধীরে বন্ধ দুয়ার খুলল। সপ্তদশী ভয়ার্ত ঢোক গিলে রয়েসয়ে আলতো করে ঘাড় বের করল সামান্য। সর্তক দৃষ্টিতে সুনশান নিরবতায় আচ্ছন্ন করিডরের এদিক ওদিক নজর বুলিয়ে দেখে নেয় — চারপাশে আদৌও কেউ আছে কি-না। তবে নাহ, আশেপাশে কেউ নেই। বোধহয় লোকগুলো এখনো এসে পৌঁছায়নি এখানে। কিন্তু না এসে আর থাকবে কতক্ষণ? এলিভেটর বাদে সিঁড়ি ডিঙিয়ে এলেও তাদের আসতে হয়তো আর মিনিট খানেক লাগবে। সপ্তদশী আর সময় নষ্ট করল না।

তক্ষুনি ভীতসন্ত্রস্ত কদমে ছুটল করিডরের ঠিক বামদিকের সিঁড়ির দিকে। যার দৌড় আপাততঃ ছাঁদ অব্ধি। টলমল পায়ে মেয়েটা ছুটল ছাঁদের পানে।
সুবিশাল ছাঁদ! চারপাশের বাতাসের তীব্রতা। মাহির মতো পাতলা গায়ের গড়নের মেয়েটা বুঝি এক্ষুণি উড়ে যাবে এ বাতাসের জোরে। মাহি কদম বাড়ালো ছাঁদের দিকে। একটুখানি এগুতেই বাতাসের তীব্র ঝাপটা এসে বারি খেলো তার সম্পূর্ণ মুখমণ্ডলে। সঙ্গে সঙ্গে চুলগুলো সব উড়ে এসে আছড়ে পড়ল মুখের ওপর। মাহি তৎক্ষনাৎ হাত বাড়িয়ে চুলগুলো সব সরাতে লাগল মুখের ওপর থেকে। আনমনে ঘাড় বাঁকাতেই হঠাৎ ঝটকা খেল দুর্দান্ত! ছাঁদের একদম শেষ প্রান্তে দুপাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে তখনকার গার্ডগুলো। প্রত্যেকের চোখেমুখে অসাধারণ পেশাদারিত্ব স্পষ্ট! তাদের ঠিক মাঝখানে উল্টো দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে মানুষরূপী জা*নো*য়ারটা! তার উপস্থিতি চক্ষুগোচর হতেই মাহি ছুটলো ছাঁদের দরজার দিকে। তবে বালাইষাট! মেয়েটার পৌঁছুবার আগেই কয়েকজন গার্ড এসে পথ আটকে দাঁড়াল তার। অসহায় মাহি ফের পড়ল দারুণ অসহায়ত্বে। শেষে কি-না সে নিজে থেকে চলে এলো লোকটার কাছে? মাহি ভীত! সে-ই সাথে বড্ড চিন্তিত নিজেকে নিয়ে। এরইমধ্যে হঠাৎ করেই কর্ণকুহরে ভেসে এলো অদূরের বলিষ্ঠদেহী সুদর্শন যুবক ওরফে রাক্ষসটার ভরাট অথচ দাম্ভিক কন্ঠ!

“ যমের ভয়ে পালাতে শুনেছি বাট.. পালাতে গিয়েও নাচতে নাচতে ফের যমের কাছে চলে আসাটা বোধহয় ফার্স্ট টাইম দেখলাম। বাই দা হেল, তোর ছোটাছুটি শেষ হয়েছে? শেষ হলে চল — আমার তাড়া আছে।”
এই প্রথম নিজের চিরচেনা শান্ত স্বভাব থেকে বেরিয়ে আসে মাহি। তক্ষুনি যুবকের কথা শোকচ করে দিয়ে পা পেছাতে পেছাতে ঝাঁঝাল কন্ঠে বলে,

“ যাব না আমি আপনার সাথে। আপনার মতো জা*নো*য়া*রের সাথে যাওয়ার চাইতে মরে যাওয়া ঢের ভালো।”
এতক্ষণে বলিষ্ঠ যুবক পেছনে ফিরল। একহাত তার প্যান্টের পকেটে গুঁজে থাকলেও আরেকহাতের তর্জনী ও মধ্যমার ভাঁজে খেলছে ক্রুটস নিকারাগুয়ান সিগার। যুবকের বাদামী ঠোঁটজোড়ার ফাঁক গলিয়ে ধীরে ধীরে বেরুচ্ছে সিগারের দূষিত ধোঁয়া। সে ধোঁয়ায় ধূমায়িত মুখমণ্ডলের চারপাশ। যুবকের মুখ এখনো স্পষ্ট নয়। তার বাদামী চোখজোড়ার ক্রুর চাহনি এখনো দৃষ্টিগোচর হয়নি মাহির। হলে থোড়াই সাহস করতো মুগ্ধ নামক ভয়ংকর যুবকের মুখের ওপর ওভাবে কথা বলার? এদিকে মুগ্ধ কেমন বাঁকা হাসলো এবার। নিঃশব্দে সিগারের শেষ প্রান্তে লম্বা একটা টান বসিয়ে, ব্যুট জুতোর দাম্ভিক শব্দ তুলে এগুতে লাগল একটু একটু করে। তা দেখেই মাহি কেমন ভয়ে তটস্থ! কাঁপতে কাঁপতে সপ্তদশী পা পেছাচ্ছে বেশ। এতক্ষণে মুগ্ধের ক্রুর দৃষ্টি নজরে এলো মেয়েটার। মুহুর্তেই সম্পূর্ণ গা কেমন হিম ধরে গেল তার। সে ক্ষনে ক্ষনে ঢোক গিলছে। মুগ্ধ তখন এগিয়ে আসতে আসতে ঠোঁট পিষে কঠিন গলায় বলে ওঠে,
❝ জিহ্বার অতিরিক্ত চলন আর নারীদের লোক দেখানো লজ্জার ভূষণ! দু’টোতেই আমার এলার্জি আছে। দেখলেই গা চুলকায়! এই যে..এখনো শুরু হয়ে গেল চুলকানি। ❞
মাহি ভড়কায়নি। এই লোকের এহেন গা জ্বালানো কথাবার্তা আজ নতুন নয়। সে পিছু যেতে যেতে আবারও চেঁচিয়ে উঠল নতুন উদ্যোমে,

“ একদম কাছে আসবেন না আমার! আমি আপনার সাথে কোত্থাও যাব না। দরকার পরলে আমি আ/ত্ম/হ*ত্যা করব, তবুও আপনার মতো নি*কৃ*ষ্টের সাথে যাব না।”
মুগ্ধ কুটিল হাসে। পকেটে গুঁজে রাখা হাতটা বের করে এনে ঘাড় ডললো আলতো করে। পরক্ষণে মেয়েটার পানে স্থির চাহনি নিক্ষেপ করে এগিয়ে আসতে আসতে শান্ত কন্ঠে ঠেস দিয়ে বলল,
“ মরবি? তাহলে ম*রে যা! কিভাবে মরবি বল?”
একটু থামে মুগ্ধ। মুখাবয়বে কপট ভাবুক ভাব ধরে ঠোঁট কামড়ে ভাবল কিছু একটা। তারপর কেমন নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে ওঠে,

“ দড়ি এনে দিব? গ*লায় ফাঁ*/স দেওয়ার জন্য? না-কি বি*-ষ এনে দিব, খেয়ে একদম কুত্তার মতো দু-হাত লম্বা জিভ বের করে ম*র*বি? এতেও যদি নাহয় তাহলে বল কেরোসিন এনে দেই। সারা গায়ে মেখে আমার সামনে আসবি, ভীষণ আদর করে গায়ে আগুন ধরিয়ে দিব। বল কোন স্টাইলে ম*র*বি?”

হতভম্ব মাহি! হতভম্বতায় বুঝতেই পারলোনা, তার পাদু’টো সেই কখন কার্নিশ বিহীন ছাঁদের একদম কিনারায় এসে ঠেকেছে। সে নিরবে কাঁদছে দাঁড়িয়ে। ওদিকে মুগ্ধ প্রায় নিকটে। হয়তো আর দুটো কদম এগুলেই ধরে ফেলবে তাকে। কিন্তু মাহি তো তার হাতে আসতে চায়না! নিজেকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টায় মেয়েটা আরেক কদম পেছাতে গেলেই ঘটল আরেক বিপত্তি! একপা গেল ছাঁদের বাইরে। ক্ষুদ্রকায় বদনখানি পেছনের দিকে ঝুঁকে পড়তেই একখানা শক্তপোক্ত হাত এসে তক্ষুনি চেপে ধরে মাহির একহাত। ভীতু মাহি তৎক্ষনাৎ চোখদুটো কুঁচকে ফেলেছে ভয়ে। তার অর্ধেকটা দেহ দোদুল্যমান অবস্থায়, শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে উপকারীর বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা। কিন্তু মেয়ে কী আর জানে? এই উপকারীটা কে? জানলে থোড়াই ধরত তার হাত। এদিকে গম্ভীর মুগ্ধ মহাশয় এক আকাশসম বিরক্তি নিয়ে চেয়ে আছেন ঝুলতে থাকা মাহির পানে। গলায় অসম্ভব ঝাঁঝ ঢেলে দিলো এক রামধমক!
“ হাত ধরলি কেনো? যা..গিয়ে ম*র। এগিয়ে এসেছিলাম তোকে এই ২০ তলা থেকে ধা*ক্কা মেরে ফেলে দেয়ার জন্য, অথচ এখন কি-না আমার হাত ধরে ঝুলছিস? মরতে এসে এতো ভয় কিসের রে দেড় ব্যাটারী?”

মাহি এবার ঠোঁট ভেঙে কাঁদছে। বাঁচার আকুতি জানিয়ে শক্ত করে চেপে ধরেছে মুগ্ধের হাত, অথচ মুগ্ধকে দেখো! সে বিরক্তি নিয়ে নিজের হাত ছাড়াতে ব্যস্ত। মাহি কিছুতেই তার হাত ছাড়ছেনা বলে মেয়েটার হাত ধরেই মুগ্ধ দিলো একটান। সঙ্গে সঙ্গে ঝুলতে থাকা মাহি হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়ে কোনমতে বেঁচে গেল এপর্যায়ে। ধড়ফড় করতে থাকা বুক পিঞ্জরের ওপর হাত চেপে জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলতেই পেছন থেকে ধেয়ে এলো মুগ্ধের শক্ত হাতের থাবা। তা গিয়ে চট করে চেপে ধরল মাহির চুলের গোছা। মাহি আবারও চোখমুখ কুঁচকে ককিয়ে ওঠে ব্যাথায়। একে-তো গলার অসহ্য ব্যাথা তারওপর এরূপ যন্ত্রণা, সব মিলিয়ে বিধ্বস্ত মাহি। ব্যাথায় কাতরাতে থাকলেও কন্ঠ ফুঁড়ে বলতে পারলোনা কিছু। ওদিকে মুগ্ধ দাঁতে দাঁত চেপেছে। মেয়েটার চুলগুলো মুঠোয় চেপে তার মাথাটা এগিয়ে নিয়ে আসে নিজের বুকের কাছে। বলাবাহুল্য মাহি মুগ্ধের তুলনায় উচ্চতায় বেশ নিচু। মেয়েটার মাথা ঠেকে মুগ্ধের বুক বরাবর। এমনিতেই ভিনদেশী সুদর্শনদের ন্যায় শক্তপোক্ত গায়ের গড়ন মুগ্ধের, উচ্চতা যেন সিলিং ছুঁবে। তার ওমন দীর্ঘকায় দেহের সামনে সবাইকে অতি নগন্যই মনে হয়। মুগ্ধ ঘাড় নুয়ালো বেশ। মাহির কানের কাছে মুখ এনে হিসহিসিয়ে বলতে লাগলো,

“ কান খুলে শুনে রাখ বান্দীর মেয়ে, তোর মতো যাচ্ছে তা-ই আন্ডাররেটেড দেড় ব্যাটারীর প্রতি বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই আমার। তোকে নিয়ে যাচ্ছি জাস্ট তোর বাপকে শায়েস্তা করার জন্য। যতদিন তুই বেঁচে থাকবি, তোর বাপও ঠিক ততদিন বাঁচবে। যেদিন আমার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে তোর দমবন্ধ হবে সেদিনই তোর বাপের বুকের ওপর উঠে, তোর বাপের শরীরে অগণিত গু*/লি ছুড়ঁব আমি। তারপর তার দূষিত র*ক্তগুলো দিয়ে পা ভেজাবো! তাই তুই মরলেও আমার কিছু যায় আসেনা, বাঁচলেও কিছু যায় আসেনা। কজ তোর বাপের শেষটা আমার হাতেই হবে। এন্ড ইউ আর নাথিং টু মি! ডিড ইউ হিয়ার দ্যাট? ইউ আর নাথিং বাট আ ফা*কিং টয় টু মি।”
ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কান্না আটকানোর প্রয়াসে ব্যস্ত মাহি। প্রতিটা কথা যেন তার কানে নয় বরং তার বুকে গিয়ে বিঁধছে। এতো ঘৃণা? এতো ঘৃণা নিয়ে কিভাবে বাঁচবে একটা মানুষ? কিভাবে বাঁচবে সে এ লোকের অত্যাচারে? সে মরে গেলে তো তার বাবা…. না না! আর ভাবতে পারলোনা মাহি। বাবার কথা মাথায় আসতেই নিজেকে শক্ত রাখার সবরকম চেষ্টায় উপনীত হলো মেয়েটা। মনে মনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো,
“ যা-ই হয়ে যাক, আমি মরবো না।”

হেলিকপ্টারের বিকটাকার শব্দে মুখরিত চারপাশ! চারিদিকের ধূলোময়লা ছড়িয়ে বিশ তলার সুউচ্চ ছাঁদের হেলিপ্যাডে এসে নামলো হেলিকপ্টার। সুবিশাল হেলিকপ্টারের গায়ে বড় বড় অক্ষরে লেখা — Shadow Monster. মুগ্ধ ভীষণ দাম্ভিকতার সাথে ভেতরে ঢুকলো। পেছনে বেচারি মাহি পড়ল বিপাকে। এ ক্ষুদ্র জীবনে এর আগে কখনো হেলিকপ্টারে চড়েনি সে, না চড়েছে এরোপ্লেনে। মেয়েটার আবার অ্যাক্রোফোবিয়া আছে কি-না! উচ্চতা দেখলেই ভয় পায়। সে কেমন ইতস্তত করছে ভেতরে ঢুকতে। এদিকে হেলিকপ্টারে বসে থাকা মুগ্ধ আয়েশ করে ফোন ঘাঁটছে। মাহিকে এখনো ভেতরে আসতে না দেখায় সে কেমন বজ্র কন্ঠে আওড়ায়,
“ ভেতরে ঢোকার জন্য আলাদা চাকরানী লাগবে না-কি নবাবের মেয়ের? নবাবের মেয়ের হাতে অফুরন্ত সময় থাকলেও আমার হাতে নেই, সো আর এক-সেকেন্ডের মধ্যে ভেতরে না ঢুকলে এক লাথি মেরে ছাঁদ থেকে ফেলে দিব। মাইন্ড ইট!”
ভড়কায় মাহি। তৎক্ষনাৎ নিজের ভয়ডর সব ভুলে গিয়ে, হেলিকপ্টারে উঠে এলো। মুগ্ধ তার দিকে দৃষ্টিপাত না করেই পাইলটের উদ্দেশ্যে শক্ত গলায় হুকুম ছুঁড়ে বলে,

“ টেক-অফ! ”
হুকুম যথার্থ তামিল করলেন বিদেশি পাইলট সাহেব। মুহুর্তেই গর্জে উঠল ইঞ্জিন। রোটর ঘুরছে দ্রুতবেগে, চারপাশে বাতাসের তীব্রতা বেড়ে গেল বহুগুণ। ক্রমশ হেলিকপ্টারে দুলুনি শুরু হলো। সে-ই সাথে বেড়ে গেল মাহির নিশ্বাসের গতি। বুকটা ধড়ফড়িয়ে উঠে বেশ। ভয়ে এইটুকুন হয়ে যাওয়া মেয়েটা ক্রমশ এগুতে লাগল মুগ্ধের দিকে। মুগ্ধ আড়চোখে দেখলো তা। বিরক্তি নিয়ে ঝাঁঝিয়ে উঠল,
“ কোলে উঠে আসবি না-কি? দেখ চাশমিস, আমার কিন্তু এমুহূর্তে এসব করার বিন্দুমাত্র মুড নেই।”
মাহি শুনলো কি-না কে জানে! সে কেমন আতঙ্কিত কন্ঠে অসহায়ের ন্যায় বলতে লাগলো,
“ আমার.. ভ-ভয় লাগছে। আমি আসলে..”

পুরোটা শোনার ধৈর্য্য হয়নি মুগ্ধের। তার আগেই সে দু-কানে গুঁজল মোটা হেডফোন। নির্বিকার ভঙ্গিতে পেছনের দিকে গা এলিয়ে চোখদুটো বুঁজল কোনমতে। মাহি চুপচাপ বসে রইলো চোখ খিঁচে। আসনের দু’পাশে অংশ খামচে ধরল কেমন। সময় পেরুচ্ছে, একটা সময় চোখবুঁজে থাকা মাহির চোখে ঘুম ধরা দিল সত্যি সত্যি। ঘুমন্ত মেয়েটা ঢুলুঢুলু অবস্থায় মুগ্ধের পায়ের ওপর মাথা ঠেকালো। মুগ্ধ টের পেলো বোধহয়! সঙ্গে সঙ্গে নিজের পাদু’টো ঝাঁকিয়ে উঠলো বেয়াদব ছেলে। মুহুর্তেই ঘুম কেটে গেল মাহির। হতবুদ্ধির ন্যায় এদিক-ওদিক মাথা নাড়িয়ে বলতে লাগলো,
“ কি হয়েছে? কি হয়েছে?”
মুগ্ধ রা করেনি, স্রেফ কটমট দৃষ্টি নিক্ষেপ করল মাহির ওপর। মাহি বেচারি চুপসে গেল তৎক্ষনাৎ। মাথাটা নুইয়ে সরে বসল বেশ কিছুটা। ভয় লাগলেও করার কিছু নেই। ঘুমন্ত অবস্থায় এই লোকের গায়ে পড়লে তখন না আবার সত্যি সত্যি হেলিকপ্টার থেকে লাথি মেরে ফেলে দেয়!

রাশিয়া ; সেইন্ট পিটার্সবার্গ…
তুষারপড়া পাহাড়ে ঘেরা, হালকা কুয়াশামাখা চারপাশ! সেস্ট্রোরেটস্কোয়ে লেকের কোলঘেঁষে নির্মিত এক ব্যক্তিগত প্রাসাদের অভিমুখে বিশাল জায়গা জুড়ে তৈরী করে রাখা হেলিপোর্ট। চারপাশের ধূলো উড়িয়ে হেলিকপ্টার নামছে সেখানে। আঞ্চলিক সময় 8:00 pm হলেও এখানকার চারপাশটা এখনো কেমন মৃদু আলোয় উজ্জ্বল হয়ে আছে। সাধারণত এখানে সন্ধ্যা নামে বেশ পরে। আকাশে এখনও হালকা মেঘ জমে আছে। হয়তো একটু পরেই আকাশের বুক চিঁড়ে নেমে আসবে বারিধারা! হেলিকপ্টার ল্যান্ড হলো ভূমিতে। সময় নিয়ে সেখান থেকে সগৌরবে বেরিয়ে আসে মুগ্ধ। পরনের দামী ট্রেঞ্চ স্যুট, দামী ব্যুট! ঘাড় সমান উষ্কখুষ্ক বাদামি চুলগুলো আজও বেঁধে রাখা ঝুটিস্বরুপ। একহাতে পেটের কাছের স্যুটের বোতাম খুলতে খুলতে পা বাড়ায় মুগ্ধ! তক্ষুনি পাঁচজন এলিট বডিগার্ড ছুটে চলে এলো মুগ্ধের চারপাশে। গম্ভীর মুখো যুবকের পেছন পেছন হাঁটছে তারা। পরনে সফেদ রঙা স্যুট/ব্যুট, কানে ইয়ারপিস। হাতে আবার রাইফেল! বিশাল আয়ত্ব জুড়ে তৈরী করা এহেন ব্যাক্তিগত প্রাসাদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত কমব্যাট বডিগার্ডস। বাড়ির চারপাশে রাইফেল হাতে দাঁড়িয়ে আছে তারা। মুগ্ধ গৌরবময় কদমে হাঁটছে। তক্ষুনি তার সামনে ছুটে আসে একজন কমব্যাট বডিগার্ড! এসেই তিনি সসম্মানে মাথা নুইয়ে হাঁটু গেঁড়ে বসলো মুগ্ধের সামনে। দু’হাতে একখানা নতুন ডিজাইনের রিভলবার এগিয়ে দিলো মুগ্ধের দিকে। মুগ্ধ কিয়তক্ষন সরু চোখে পরোখ করলো বন্দুকটা। পরক্ষণে হাত বাড়িয়ে বন্দুকটা তুলে নিয়ে নাড়িয়ে চাড়িয়ে গম্ভীর মুখে বলল,

“ ইজ ইট ওয়ার্কস গুড?”
কমব্যাট মাথা নুইয়ে রেখেই ঝাঁকালেন একটুখানি। মুগ্ধ কেমন ক্রুর হাসলো তা দেখে। তক্ষুনি বন্দুকের নলটা ঠেকালো সম্মুখে হাঁটু গেঁড়ে বসে থাকা কমব্যাটের ললাট বরাবর। মুহুর্তেই বডিগার্ড বেচারা ভয়ে কেঁপে ওঠে কেমন! তবুও মাথা তুলে তাকানোর সাহস নেই তার। তাকালেই যে বিপদ! মনস্টারের চোখে চোখ পরা মানেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা! এতবড় রিস্ক কে নিতে যাবে শুনি? মুগ্ধ কিয়তক্ষন একইভাবে বন্দুকটা ধরে রাখলো বডিগার্ডের ললাট বরাবর। তারপর হুট করেই কোনরূপ বলাকওয়া ছাড়া বন্দুক উঁচিয়ে তাক করলো অদূরের ব্যাক্তিগত পন্ডের ওপর সাজিয়ে রাখা রোমানিয়ান ভাস্কর্যের দিকে। ট্রিগার চাপতেই ভাস্কর্যটা কেমন ভেঙে ছিটকে গেল চারপাশে! পন্ডে থাকা রাজহংসী গুলো ভয়ে দাপরাতে লাগল অনবরত। এদিকে বাড়ির চারপাশে থাকা সশস্ত্র বডিগার্ডেরা এতক্ষণে সজাগ হলো যেন। তারা প্রত্যেকেই নিজেদের রাইফেল আসমানের দিকে তাক করে অনবরত গুলি ছুড়ল। মুহুর্তেই চারপাশে ছড়িয়ে গেল বিকট শব্দ! মাহি বেচারি ভয়ে আর নামছেই না হেলিকপ্টার থেকে। অথচ সে থোড়াই জানে, মাফিয়া মনস্টার যখনই এখানে আসে তখনি তার স্বাগতমটা ঠিক এভাবেই হয়! কজ দিস ম্যান লাভস ভায়োলেন্স।

ভয়ে তটস্থ মাহি রয়েসয়ে মাথা বের করল হেলিকপ্টার থেকে। তবে হেলিকপ্টার থেকে নামতে হলে তার মতো ছোটখাটো মানুষের নিসন্দেহে সাহায্য প্রয়োজন। মাহি মুখ গুমরো করে নামার চেষ্টায় একপা বাইরে বের করতেই হঠাৎ একখানা শক্তপোক্ত হাত এসে আলতো করে নিজেকে ছড়িয়ে দিল তার সামনে। মাহি ভ্রু কুঁচকায়। সন্দিহান চোখে তাকাতেই দেখে — একজন শ্যামপুরুষ চমৎকার হেসে তার পানেই তাকিয়ে আছে। তার বাড়ন্ত হাত এখনো অপেক্ষায় আছে মাহির। মাহি নিজেকে খানিকটা গুটিয়ে নেয় তৎক্ষনাৎ। শ্যামপুরুষ তা দেখে মুচকি হাসলো। নরম কন্ঠে আওড়ালো,
“ হাত ধরে নেমে এসো। ভয় নেই, আমি মনস্টারের মতো ভায়োলেন্স ক্রিয়েট করব না।”
ভিনদেশে এসেও বাংলা শুনছে মাহি। এ-ও কী তবে সত্যি? মাহি অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো কেমন। হতবাক কন্ঠে বলল,

“ আপনি বাঙাল?”
শ্যামপুরুষ একদফা ভাবুক থেকে ঠোঁট কামড়ে ধরল নিজের। পরক্ষণে মিষ্টি হেসে বলল,
“ নট সো। বাট তুমি নিশ্চয়ই বাঙাল তাই না?”
মাহি মাথা নাড়ায় ওপর নিচ। তখনি শ্যামপুরুষ তাকে ইশারায় বলে তার হাতটা ধরে নামতে। অগত্যা মাহি আর তেমন কোন উপায়ন্তর না পেয়ে নেমে পরলো অপরিচিতের হাত ধরে। নামতে গিয়েও বাঁধল আরেক বিপত্তি। কিছু একটার সাথে পা বেঁধে সামান্য হোঁচট খেলো মাহি। শ্যামপুরুষ তাকে আগলে ধরতে নিলেই কেউ একজন এসে আঁটকে দিলো তার হাত। ফলস্বরূপ পড়ে গেল মাহি। পেলো হাঁটু, হাতে চোট! শ্যামপুরুষ ভড়কে গিয়ে পাশে তাকায়। দেখতে পায় — একজোড়া বাদামী চোখ কেমন অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার পানে। ছেলেটা ঢোক গিললো কেমন। আমতা আমতা করে নিজের সাফাই গাইতে গেলেই শোনা গেল মুগ্ধের কঠিন কন্ঠ!
“ আমার পছন্দের কিংবা অপছন্দের যেকোনো কিছুর ওপর কারো হস্তক্ষেপ কিংবা দৃষ্টি আমি সহ্য করিনা সিড! এন্ড আই থিংক ইউ নো দেট বেটার!”

সিদ্ধার্থ মাথা নাড়ায় ওপর নিচ। তৎক্ষনাৎ মাহির সামনে থেকে সরে দাঁড়ায় দু-কদম। ওদিকে মাহি ততক্ষণে উঠে দাঁড়ায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার ডানহাতের কনুই চেপে ধরে মুগ্ধ! ইশশ্ কনুইটা বুঝি এই ছিঁড়ে পড়ল। মাহি মুখ কুঁচকে ব্যাথাটা সহ্য করে নেয় কোনরকম। মুগ্ধ এবার হাঁটা শুরু করেছে, দুর্দম্য পায়ে। সুদর্শন যুবকের হঠাৎ এতো রেগে যাওয়ার কারণটা ঠিক বোধগম্য হলোনা মাহির। এই লোক হুটহাট এমন রেগে যায় কেনো কে জানে!!

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ২