খান সাহেব পর্ব ৬
সুমাইয়া জাহান
ভোরে মাইশার ডাকে চোখ মেলে তাকাল সুমু। বিছানা ছেড়ে চলে গেল ফ্রেশ হতে। দশ মিনিটের মাথায় ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে ব্রেকফাস্ট করার জন্য রুম ছাড়ল।
ড্রয়িংরুমে আসার আগে ভালো করে চেক করে নিল, কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিটি আশেপাশে আছে কিনা। ড্রয়িংরুমে কাউকে দেখতে না পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল সে।
“যাক, ব্রেকফাস্টটা অন্তত কাঁপাকাঁপি ছাড়াই করা যাবে।”
কথাটা মনে মনে বলে টেবিলে এসে বসল। হাসি বেগম এসে খাবার দিলে তাকে। কৌতূহলবশতো হাসি বেগমকে জিঙ্গাসা করল,
“আম্মু সবার ব্রেকফাস্ট করা শেষ?”
হাসি বেগম মেয়ের মুখের দিকে একপলক তাকিয়ে বললেন,
“হ্যাঁ! প্রায় সকলের শেষ। শুধু রাহিন আর ওর ফ্রেন্ডরা এখনো করেনি।”
মাত্রই মুখে খাবার তুলছিল সুমু। কথাটা শুনেই মায়ের দিকে ভ্রু উঁচু করে তাকাল সে। মনে- মনে বলল,
“এতো আস্তে-আস্তে খেলে চলবে না। ওনারা কেউ এখনো ব্রেকফাস্ট করেনি। যেকোনো সময় নিচে নামতে পারে। আমাকে তাড়াতাড়ি খেয়ে পালাতে হবে।”
কথাটা মনে মনে বলে গপগপ করে তাড়াতাড়ি খেতে শুরু করল সুমু।
“ইশ! খিচুড়িটা কি ইয়াম্মি হয়েছে। কিন্তু এখন এই স্বাদ অনুভব করতে করতে খাওয়ার টাইম নেই হাতে।”
সুমুর এমন বেপরোয়া ভাবে খাওয়া দেখে হাসি বেগম বললেন,
“কি করছিস, কি? আস্তে-আস্তে খা। খাবারতো কোথাও পালিয়ে যাচ্ছে না।”
“আমার অনেক খিদে পেয়েছে আম্মু। তাই এইভাবে তাড়াতাড়ি খাচ্ছি।”
মেয়ের কথায় মুচকি হাসলেন হাসি বেগম। রান্না ঘরের দিকে পা বাড়াতে গিয়ে দেখল সিঁড়ি দিয়ে রাহিন তার ফ্রেন্ডরা নামছে। মায়ের দিকে তাকিয়ে সালাদ চাইতে গিয়ে দেখল তিনি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সিঁড়ির দিকে।
মায়ের দৃষ্টি লক্ষ্য করে সুমুও তাকাল সিঁড়ির দিকে। তখনই গলায় খাবার আটকে গেল সুমুর। ঝটপট হাসি বেগম পানির গ্লাস এগিয়ে দিলেন মেয়ের দিকে। পানিটা খেয়ে দম ছাড়ল সুমু। ততক্ষণে শেরাজের সব বন্ধুরা চেয়ারে বসে পড়েছে। শুধু সুমুর বা সাইডের একটা চেয়ার ফাঁকা আছে। কোনো দ্বিধা ছাড়াই চেয়ারটা টেনে বসল শেরাজ। শেরাজকে বসতে দেখে সুমু নিজের দু’পা মেঝের সাথে চেপে ধরে রাখল। টেবিল থেকে বা’হাতটা নামিয়ে নিজের কোলের ওপর রাখল সে। মনে মনে বলল,
“যাক, এবার আর কেউ আমার কাঁপাকাঁপি কেউ দেখতে পারবেনা।”
হঠাৎ আর ডান পাশ থেকে আইয়ুব বলল,
“গুড মনিং, কিউটি।”
“গুড মনিং, ভাইয়া।”
হাসি বেগম সকলকে খাবার সার্ভ করল। সবার সামনে খিচুড়ি দিয়ে ডিম ভাজা দিল। আর শেরাজকে স্যান্ডউইচের সাথে ফ্রুট জুস দিল। আনোয়ার সাহেব কালরাতেই সকলকে জিঙ্গাসা করে রেখেছিল কে কেমন খাবার খায়— সেই অনুযায়ী আজ সব ব্যবস্থা করেছে বাড়ির গিন্নিরা।
সুমুর কাঁপাকাঁপি খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে শেরাজ। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলছে না। সে চুপচাপ খাচ্ছে।
শেরাজের উদ্দেশ্যে আইয়ুব বলল,
“খিচুড়িটা অনেক টেস্টি হয়েছে দোস্ত। একটু খেয়ে দেখবি নাকি।”
আইয়ুবের কথায় কোনো ভাবান্তর হলো না শেরাজের। সে তার মতো চুপচাপ খেয়েই যাচ্ছে।
আইয়ুব আর কোনো কিছু বলল না শেরাজকে। কারণ সে খুব ভালো করেই জানে, শেরাজ সকালে হেবি খাবার খায়না। আইয়ুব হাসি বেগমের উদ্দেশ্যে বলল,
“আন্টি, খিচুড়িটা অনেক টেস্টি হয়েছে। কে রান্না করেছে আন্টি?”
হাসি বেগম ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বললেন,
“আমি রান্না করেছি বাবা। তোমাকে আরো একটু দেয়।”
“অবশ্যই!”
হাসি বেগম আইয়ুবের প্লেটে আরও খিচুড়ি দিল। আইয়ুবের দেখাদেখি বাকিরাও নিল। সকলে তৃপ্তি করে খেতে লাগল। শুধু খাচ্ছে না সুমু। হাসি বেগম মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“কিরে? কি হয়েছে তোর? খাচ্ছিস না কেন?”
সুমু আড়চোখে একবার শেরাজের দিকে তাকাল। দেখল, লোকটা কি দারুন স্টাইলে খাচ্ছে। কালো গুচ্চি ব্রান্ডের টি-শার্ট, কালো জিন্স, বা হাতে কালো রোলিক্স ঘড়ি, ডান হাতে ব্রেসলেট, বা হাতের আঙুলে দুইটা রিং পরা। চুলগুলো জেল ছাড়াই সেট করে রাখা— হয়তো শাওয়ার নিয়েছে। কি হট দেখতে লাগছে। সকাল সকাল এমন হার্টফেল করা লুক নিয়ে ঘুরলেতো যে কোনো মেয়ে ক্রাশ খেতে-খেতে হার্টফেল করবে।
নিজের ভাবনাকে মাথা থেকে ঝেড়ে, চোখ বন্ধ করে ঢোক গিললো সুমু। তারপর হাসি বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমার আর খেতে ইচ্ছা করছেনা আম্মু। পেট ভরে গেছে।”
“তুই’না এইমাত্র বললি, তোর অনেক খিদে পেয়েছে। এই তোর অনেক খিদের নমুনা।”
“তখন পেয়েছিল আম্মু। কিন্তু এখন আর খিদে নেই।”
কথাটা বলে উঠে যাচ্ছিল সুমু। সিঁড়ির কাছে আসতেই পিছন থেকে কিছু কথা ভেসে আসলো তার কানে।
শেরাজ বলল,
“আন্টি আমার হয়ে গেছে। আমি উঠছি। আর আপনি কিছু মনে না করলে, একটা জিনিস চাইব।”
হাসি বেগম শেরাজের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
“এইভাবে বলছ কেন বাবা? আমিতো তোমার মায়ের মতো। বলো কি লাগবে?”
শেরাজ কোনো অস্বস্তি ছাড়াই বলল,
“আমি রুমে বসে অফিসের কিছু কাজ করব আন্টি। তো এককাপ ব্লাক কফি হলে ভালো হতো।”
হাসি বেগম মৃদু হেসে বললেন,
“তুমি রুমে যাও, বাবা। আমি কফি পাঠাচ্ছি।”
শেরাজ টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর সুমুর পাশ দিয়ে হনহনিয়ে রুমে চলে গেল।
সুমু এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে তার যাওয়ার পানে। হাসি বেগমের ডাকে সম্মতি ফিরে তার।
“সুমু! এদিকে আয়’তো মা।”
“আসছি আম্মু।”
রান্নাঘরে ডুকতেই হাসি বেগম আদেশের সুরে বললেন,
“আমি কফি করে দিচ্ছি। ছেলেটাকে গিয়ে দিয়ে আয়’তো মা।”
মায়ের কথা শুনে ভয় পেয়ে গেল সুমু। এখন তাকে ওই মানুষটার সামনে যেতে হবে। যাকে দেখলেই হাত-পা কাঁপে সুমুর। নিঃশ্বাস আটকে আসে। হার্টবিট অস্বাভাবিক মাত্রায় বেড়ে যায়। আর কাল রাতে তো, না,না, আর ভাবতে চায়না সুমু। কিন্তু এখন মাকে কিভাবে বলবে যে— সে ওই রুমে যেতে চায়না। মা’তো তাকে প্রশ্ন করবে। তখন সুমু কি উত্তর দিবে।
কথা গুলো মনে- মনে বলে, কফি নিয়ে চলল কাঙ্ক্ষিত রুমটির উদ্দেশ্যে। ওই মানুষটার সামনে গেলে নিজের হাত-পা, হার্টবিট, চোখ সবকিছুই কেমন অবাধ্য হয়ে যায়। নিজেদের মর্জি মতো চলতে শুরু করে।
শরীরের ওই অঙ্গ-প্রতঙ্গগুলোকে বকতে-বকতে চলে আসলো কাঙ্ক্ষিত রুমটার সামনে। ঠিক তখনি শুরু হলো হাত-পা কাঁপা। বুকের মধ্যে হার্টবিটের বেড়ে যাওয়ার শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। সবকিছুকে উপেক্ষা করে, দরজার ফাঁকা দিয়ে ভেতরটা দেখার চেষ্টা করল সে। কিছু দেখতে না পেয়ে হাত উঠাচ্ছিল নক করার জন্য। ঠিক তখনই ভেতর থেকে মৃদু সুরে ভেসে আসলো,
রুমের ডোর খোলায় আছে। ভেতরে আসতে পারো।
কথাটাশুনেই হতভম্ব হয়ে গেল সুমু। মনে-মনে বলল,
“উনি বুঝলো কি করে, আমি দরজার বাহিরে দাঁড়িয়ে আছি? সবদিকে নজর থাকে মানুষটার”
নিজেকে কোনোমতে সামলে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলো সুমু। তবে সামনে এগোনোর সাহস পেল না। হাতে কফির ট্রে নিয়েই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল সে।
শেরাজ ব্যাপারটা বুঝতে পেরে হালকা মুচকি হাসল। মেয়েটা এতো ভয় পায় তাকে। আর মেয়েটাকে আরও বেশী ভয় দিতে শেরাজের ভালোই লাগে। হাসিটা গিলে গম্ভীর সুরে বলল,
“কফিটা ঠান্ডা হয়ে গেলে, এইবার কিন্তু তোমাকেই করে আনতে হবে।”
কথাটা শুনে সুমু মাথা তুলে তাকাল। একপলক তার খান সাহেবকে দেখে নিল সে। যে এখন ল্যাপটপের সামনে বসে কিছু একটা করছে। নিজের অবাধ্য চোখ দুটোকে টেনে নামিয়ে নিয়ে, কফির কাপটা নিয়ে টেবিলের ওপর রাখল। শেরাজ কফিটা হাতে তুলে নিল। একটা চুমুক বসাল।
শেরাজকে কফিতে চুমুক বসাতে দেখে চলে আসছিল সুমু। কিন্তু আবারও ফিরে এলো। শেরাজ ল্যাপটপে দৃষ্টি রেখেই মুখে বলল,
“কিছু বলবে?”
সুমু নরম সুরে উত্তর দিল,
“হুম!”
শেরাজ আর কিছুই বলল না। সুমুর কথা শোনার অপেক্ষায় রইল।
হালকা ঢোক গিলে সুমু বলল,
“আমার ডায়েরিটা আমি ফেলে গিয়েছিলাম। ওইটা কোথায়?”
ল্যাপটপে চোখ রেখেই শেরাজ উত্তর দিল,
“তোমার ডায়েরি কোথায় আমি কিভাবে বলব?”
মাথা তুলে তাকাল সুমু। মুখ ফুটে বলল,
“না আসলে কাল রাতে…”
কথাটা শেষ করতে পারল না সুমু। তার আগেই শেরাজ বলল,
“কাল রাতে কি?”
লজ্জায় গাল লাল হয়ে গেল সুমুর। দৌড়ে বাহিরে চলে যাবার জন্য পা বাড়াচ্ছিল সে। ঠিক তখনই শেরাজ বলল,
“খান সাহেবের প্রতিতো তুমি ভীষণ রকমের অবসেসড। তাহলে এতো ভয় পাও কেন তাকে?”
কথাটাশুনেই পা’জোড়া থমকে গেল সুমুর। চোখদুটো বড় হয়ে গেলো মেয়েটার।
“তারমানে কি উনি আমার ডায়েরিটা পড়েছে। আর ভিতরের ছবিগুলোও দেখেছে।”
মনের সব ভয়কে বৃথা সরানোর চেষ্টা করে ঘুরে দাঁড়াল সুমু। কোমরে দুইহাত রেখে রাগ দেখানোর চেষ্টা করে বলল,
“আপনি আমার ডায়েরিটা পড়েছেন কেনো?”
সুমুর কোমরে হাত রাখা দেখে শেরাজের বড্ড হাসি পাচ্ছে। মনে হচ্ছে সে বউ, আর এখন সে তার বরের কাছে কোমরে হাত রেখে কৈয়ফিয়ত চাইছে। হাসিটাকে আটকে রেখে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
“দ্য হাউজ ইজ ইয়োর আঙ্কল। বাট আই লিভ ইন দিস রুম নাউ। সো নাউ ইট’স মাই রাইট টু দিস রুম। জাস্ট লাইক ইয়োর ডায়েরি। বাট সিন্স দিস ডায়েরি ইজ রিটেন আবাউট মি। সো আই হ্যাভ দ্য রাইট টু রিড দিস ডায়েরি।” (এই বাড়িটা তোমার মামার। কিন্তু এখন যেহেতু এই রুমটাতে আমি থাকি সেহেতু এই রুমটাতে এখন আমার অধিকার। তাহলে ডায়েরিটা তোমার, কিন্তু ডায়েরির ভিতরে যেহেতু আমাকে নিয়ে লেখা। সেহেতু ডায়েরিটা পরার অধিকার অবশ্যই আমার আছে। )
শেরাজের কথা শুনে হতভম্ব হয়ে গেল সুমু। এইটা কেমন লজিক দিলো উনি। সে মুখ ফুটে বলল,
“এইটা কেমন লজিক দিলেন আপনি? ডায়েরির মধ্যে আপনাকে নিয়ে লিখেছি বলে। আপনি অন্যের পার্সোনাল ডায়েরি পড়বেন?”
“অবশ্যই! আমি’তো বললাম, আমাকে নিয়ে লেখা যেহেতু, তাই আমার পড়ার অধিকার আছে। আর শুধু ডায়রি কেনো? আমার’তো মনে হচ্ছে। ডায়েরির মালিকের ওপর ও আমার অধিকার আছে।”
আশ্চর্যের সপ্তম সীমানায় চলে গেল সুমু।
“উনি কি বললেন এইটা? আমার ওপর অধিকার আছে ওনার। এইটা উনি মনে করেন। নিজের একজন সামান্য ফ্যানের প্রতি অধিকার আছে ওনার। আচ্ছা, আমাকে কি উনি বাকিসব ফ্যানদের থেকে আলাদা নজরে দেখলেন।”
নিজের মনের বিরুদ্ধে গিয়ে সুমু আবারও মনে-মনে বলল,
“না,না! ওনার এইসব কথার কোনো অন্য মানে ভাবিসনা সুমু। চাঁদ দূর থেকেই সুন্দর।”
কথাটা মনে মনে বলে, মুখে বলল,
“ডায়েরিটা’তো আপনি অল্প হলেও পড়েছেন । তাহলে এইবার আমাকে ডায়েরিটা ফিরিয়ে দিন।”
কথাগুলো বলতে-বলতে রুমের সবকিছু ভালো করে পর্যবেক্ষণ করল সুমু।
“ডায়েরিটা তোমাকে ফেরত দেব। তবে কাল বলেছিলাম না, তোমাকে শাস্তি পেতে হবে।”
চোখ নামিয়ে কাচুমাচু হয়ে দাঁড়ালো সুমু। আমতা- আমতা করে বলল,
“হ্যাঁ বলুন, কী শাস্তি দিতে চান?”
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল শেরাজ। আস্তে- আস্তে এগিয়ে আসতে লাগল সুমুর দিকে।
শেরাজকে ওইভাবে এগিয়ে আসতে দেখে পিছতে লাগল সুমু। পিছতে-পিছতে দেওয়ালের সাথে পিঠ লেগে গেল তার। হাত দিয়ে দুপাশের জামা খিঁচে ধরে রাখল সে। হার্টবিট অস্বাভাবিক মাত্রায় বেড়ে গেল। শেরাজের দুই পুরুষালি হাতের মাঝে বাঁধা পড়ল মেয়েটা।
শেরাজ দুইহাত দেয়ালের ওপর রেখে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখতে লাগল মেয়েটার ভীতু মায়াবী মুখখানা। সে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে সুমুর হার্টবিটের স্পন্দন। আস্তে- আস্তে মুখ নামিয়ে নিল সুমুর কানের কাছে। ভয়ে চোখমুখ খিঁচে বন্ধ করে নিল সুমু। কি করতে চলেছে উনি, ভেবে কূল-কিনারা পেল না সুমু। ঠিক তখনই মিষ্টি আওয়াজে কেউ বলল,
“কাল থেকে সকাল, সন্ধ্যা ও রাতে আমার রুমে তুমি নিজের হাতে বানিয়ে কফি নিয়ে আসবে।”
কথাটা বলেই সরে আসলো সে। গিয়ে বসল ল্যাপটপের সামনে।
চোখ মেলে তাকাল সুমু। মনে-মনে বলল,
“এই সামান্য কথাটা বলার জন্য এইভাবে আমার কাছে এসে আমাকে ভয় দিলো উনি। আর আমি কিনা কি ভেবে ভয় পাচ্ছিলাম।”
হঠাৎ শেরাজের ডাকে ধ্যান ভাঙ্গাল তার।
“শোনো মেয়ে! আমার সব ফ্যান ফলোয়াররা জানে আমি কফি না, চা বেশি পছন্দ করি। কিন্তু কাজের সময় আমি কড়া ব্লাক কফি খাই। কাল থেকে এইগুলোর দায়িত্ব তোমার। তুমি যেহেতু আমার ফ্যান। অবশ্যই তোমার কাছে আমার সব আইডি আছে। আমার ইনস্টা আইডিতে তুমি আমাকে টেক্সট করে রাখো। আমার যখন চা কফির প্রয়োজন পড়বে, আমি তোমাকে আইডিতে জানাবো। এখন যাও।”
সুমু আর দেরি না করে চলে গেল। শেরাজ টেবিল থেকে ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে ইনস্টাগ্রামে ঢুকল। ইনবক্সে গিয়ে ফ্রেন্ডস গ্রুপে টেক্সট দিল।
পাঁচ মিনিটের মধ্যে সব ফ্রেন্ডরা এসে হাজির হলো ওর রুমে। শেরাজ রাহিনের উদ্দেশ্যে বলল,
“রাতে বাইক রাইডে বের হবো রাহিন। তুই কি বাইকের ব্যবস্থা করতে পারবি?”
রাহিন উৎসাহর সুরে বলল,
“অবশ্যই! আমি এক্ষুনি বাইকের ব্যবস্থা করছি।”
আইয়ুব বলল,
“ওমানের তুলনায় বাংলাদেশে একটু বেশি শীত। এমন ওয়েদারে বাইক রাইড জমে যাবে ভাই।”
সারবাজ বলল,
“আমি শিওর, শেরাজ কিছু ভিডিও শুট করবে। বাংলাদেশে আসার পর থেকে, ও এখনো কোনো ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়াতে পোস্ট করেনি।”
আইয়ুব বলল,
“তাহলে কয়টায় বের হচ্ছি আমরা।”
শেরাজ একটু সময় নিয়ে বলল,
“সন্ধ্যা ছয়টায় বের হবো। আর রাহিন আজ’তো মেহেন্দির অনুষ্ঠান আছে মেয়েদের। অল ডেকোরেশনের কাজ সকলে মিলে সন্ধ্যা ছয়টার আগে কম্পিলিট করে রাখবি। আমার কিছু ইম্পর্টেন্ট মিটিং আছে। সেগুলো শেষ করে আমিও আসছি তোদের হেল্প করতে। আর শোন, দশটার মধ্যে বাসায় ফিরে আসব। এই রাহিন?”
“হ্যাঁ বল!”
“মেহেন্দির অনুষ্ঠান কয়টা থেকে শুরু হবে?”
“এগারোটা!”
“ওকে, তাহলে ডান। আমরা ছয়টায় বের হবো।
এখন এই রুম ফাঁকা কর। আমার কাজ আছে।”
সকলে রাতে বাইক রাইডের খুশিতে এখন আর কিছু বলল না। সোজা বেরিয়ে গেল রুম থেকে।
শেরাজ পুনরায় কাজে মন দিল। শীতের সকালের মিষ্টি রোদ চোখে ওপর এসে পড়ছে তার। অন্যসময় হলে এককাপ মালাই চায়ের সাথে এমন মিষ্টি রোদটা উপভোগ করতো সে। কিন্তু এখন কাজের জন্য এমন কড়া কফির সাথে এই রোদটাকে বড্ড বিরক্ত লাগছে তার। চোখের ওপর রোদটা বড্ড বিরক্ত করছে তাকে। সে উঠে দাঁড়াল পর্দা’টা মেলে দেওয়ার জন্য। জানালার কাছে আসতেই নিচে বাগানের দিকে নজর গেল তার। হৃদয়ে ব্যাকুলতা সৃষ্টি করা মানবীটি বাগানে হাজারো ফুলের মাঝে দাঁড়িয়ে সকলের সাথে প্রাণ খুলে হাসছে। এই মায়াবী মুখটাতে এখন ভয়ের চিহ্নটুকু নেই।
গোলাপি পাতলা ঠোঁটে একচিলেতে হাসি নিয়ে মুগ্ধ হয়ে অপলক তাকিয়ে থাকল শেরাজ। হঠাৎ ফোনে কল আসাতে ধ্যান ভাঙ্গল তার। একরাশ বিরক্তি ফুটে উঠল মুখমন্ডলে। পকেট থেকে ফোনটা বের করে পর্দাটা মেলে দিল সে। ফোনে কথা বলতে-বলতে আবারো ল্যাপটপের সামনে গিয়ে বসলো সে। ভিডিও কনফারেন্সে তাকে পাওয়া যাচ্ছিল না বলে, স্যান্ডি তাকে কল করেছে কনফারেন্সে আসার জন্য।
পুরো বাড়ি কৃত্রিম আলোয় আলোকিত। আনোয়ার সাহেব নিজের বড় মেয়ের বিয়েতে কোনো কমতি রাখবেন না বলেছেন। তাই পুরো বাড়ি আসাধারন সুন্দরভাবে ডেকোরেট করা হয়েছে। অবশ্য এই সব ডেকোরেশনের দায়িত্ব নিয়েছিল রাহিন আর তার বন্ধুরা।
তারা সবকাজ নিখুঁতভাবে পালন করে, তারপর সকলে বেরিয়েছে বাইক রাইডে। আনোয়ার সাহেব অবশ্য বারণ করেছিলেন। কিন্তু রাহিন বলেছে, কিছু ভিডিও শুট করবে আর অনুষ্ঠান শুরু হবার আগেই ফিরে আসবে। তাই তিনি আর অমত করেননি।
সকলে যার যার মতো ব্যস্ত। নাচ,গান হবে বলে বাড়ির মেয়েরা নাচ গানের রিহার্সেল করছে। পুরুষরা বাহিরে রাতের খাবারে কি কি রান্না করা হবে সেই দিকটা দেখছে। হাসি বেগম, খুশি বেগম ও মিনা বেগম রান্নাঘরে সকলের জন্য নাস্তা বানাচ্ছে।
আশাবানু লাঠি ভর দিয়ে নাতনির রুমে এলেন। গিয়ে বসলেন নাতনির পাশে। নাতনির মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। মাইশা দাদির আদুরে ছোঁয়া পেয়ে শুয়ে পড়ল দাদির কোলো। আশাবানু বললেন,
“কি হয়েছে বোন? মন খারাপ?”
মাইশার চোখ ছলছল করছে। সে কান্না জড়ানো গলায় বললো,
“আর’তো মাত্র একটা দিন দাদি। তারপর’তো আমি চলে যাবো তোমাদের সবাইকে ছেড়ে। আমি তোমাদের সবাইকে অনেক মিস করব দাদি।”
আশাবানু মুখে হাসি নিয়ে বললেন,
“এইটার প্রকৃতির নিয়ম বোন। মেয়েদের জন্মই হয় পরের বাড়ি যাবার জন্য। যখন আমাদের কথা মনে পড়বে— চলে আসবি নাতজামাইকে নিয়ে।”
“আমি তোমাকে অনেক বেশি মিস করব দাদি।”
আশাবানু আলতো হেসে বললেন,
খান সাহেব পর্ব ৫
“স্বামী পেলে এই বুড়িকে আর মনে থাকবেনা রে বোন।”
“মনে থাকবে দাদি। তোমাদের কাউকে আমি ভুলবো না।”
নাতনির কথা শুনে আলতো হাসলেন আশাবানু। নাতনির মাথায় আরও কিছুক্ষণ হাত বুলিয়ে দিয়ে চলে গেলেন তিনি।
