ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৩৫
ছায়া
রাত ১ টা লিয়ানের রুমের দরজা আধখোলা। ভেতরে কাঁচ ভাঙার টুকরো পড়ে যাওয়ার টুংটাং শব্দ রাতের নীরবতাকে ভেঙে দিচ্ছিল। লিয়ানের মা মিসেস চৌধুরী ভয় পেয়ে তাড়াতাড়ি দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন এবং সেই মুহূর্তে তাঁর বুক কেঁপে উঠলো।
ঘরের দামি সব শো-পিস, মিউজিক অ্যালবাম, গিটার স্ট্যান্ড সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে ভাঙা অবস্থায় মেঝেতে কাঁচের টুকরো। আর সেই কাঁচের উপরে বসে আছে লিয়ান দুই হাত থেকে রক্ত ঝরছে চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। লিয়ানের মা দৌড়ে এসে লিয়ানের হাত দুটো নিজের কোলে তুলে নিলেন।
মিসেস চৌধুরীঃ- বাবা এ কি অবস্থায় করেছিস নিজের কি হয়েছে বল?
লিয়ানঃ- মা… আমি… আমি আমার সিজুকাকে আবার হারিয়ে ফেললাম।
মিসেস চৌধুরীঃ- হারিয়ে ফেললি মানে কে এই সিজুকা কি বলছিস তুই?
লিয়ান মাথা নিচু করে কাঁদতে কাঁদতে বলল
লিয়ানঃ- মা… আমি ওকে কতদিন ধরে খুঁজছি এক সাথে গেম খেলেছি গেমে পরিচয়। ও ছিল আমার বন্ধু না… ও ছিল আমার শান্তি। যখনই ও ওর কিউট ভয়েজ দিয়ে ‘ভাইয়া’ বলত মনে হত আমার ভিতরের অন্ধকারটা একটু আলোর মতো হয়ে যায়। মা তুমি জানো না ওর হাসি শুনলে আমি কেমন হয়ে যাই।
মিসেস চৌধুরীঃ- তুই আগে বলিস নি কেনো? নাম বল বাসা কোথায় এড্রেস দে।
লিয়ানঃ- নাম ইলা তালুকদার কিন্তু এড্রেস নিয়ে কি করবে মা আজ ও নিজে বলল ওর বিয়ে হয়ে গেছে।
এই কথা বলেই লিয়ান আবার ভেঙে পড়ল লিয়ানের মা লিয়ান কে ভেঙে পড়তে দেখে খুব কষ্ট পাচ্ছে। লিয়ান আজ নিজের মুখে বলেছে ও কাউকে খুজেছে। যে ছেলে কোনো দিন কোনো মেয়ের দিকে তাকায়নি পর্যন্ত। আজ একটা মেয়েকে ভালো লেগেছে কিন্তু তার বিয়ে হয়ে গেলো।
লিয়ানঃ- মা…আমিতো ওকে স্বপ্নের মতো পেয়েছিলাম ভাবছিলাম হয়তো প্রথমবারের মতো কাউকে ভালোবাসতে শিখছি।কিন্তু দেখো মা আমি আবার একা হয়ে গেলাম। ও বলল আমাকে ভুলে যেতে আমি পারবো কি মা?আমার বুকের ভেতরটা যেন কেউ ছিঁড়ে ফেলছে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।
লিয়ান দুই হাতে মুখ ঢেকে কাঁদছে হাত থেকে রক্ত ঝরছে কিন্তু সে তাও খেয়াল করছে না। তার মা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে লিয়ান কে। কি বলে শান্তনা দিবে ভেবে পাচ্ছে না। লিয়ান তার বাবা মার এক মাত্র সন্তান। কখনো কোনো কিছুর অভাবে পায় নি কিন্তু লিয়ান কখন তার বাবা মার কাছে কিছু চায় নি। কিন্তু আজ এমন একজনকে চায় যে এখন অন্য কারো। লিয়ানের মা তাকে জরিয়ে ধরে বলল
মিসেস চৌধুরীঃ- বাবা ভালোবাসা কখনো জোর করে পাওয়া যায় না। তুই নিজেকে এইভাবে ভাঙিস না যে মেয়ে তোর জীবনে থাকার কথা,সে নিজেই এসে দাঁড়াবে।
লিয়ান ভাঙা গলায় ফিসফিস করে বলল
লিয়ানঃ- ইলা যদি সত্যিই আমার কাছে এসে দাঁড়ায়
আমি ওকে আর কখনো হারাতে দেবো না।
রাতটা নিস্তব্ধ হয়ে গেলো শুধু লিয়ানের কান্নার হাহাকার আর ভাঙা কাঁচের গায়ে পড়ে থাকা রক্ত
একটা হারানো ভালোবাসার নীরব সাক্ষী হয়ে রইল যেটা ইলা বুঝলো না।
Time Skip……
পরের দিন ক্যাম্পাস প্রোগ্রামে স্টুডেন্টদের ভিড় লাইট ওভার সাউন্ড উত্তেজনার গরম হাওয়া। মঞ্চের সামনে মানুষের ভিড় জমে গেছে।একে একে সবাই পারফর্ম করছে কেউ গান,কেউ নাচ,কেউ আবার ড্রামস। চার পাশে উৎসবের রঙ ছাত্র-ছাত্রীদের চিৎকার, হাসি, তালি সব মিলিয়ে পুরো পরিবেশটা বৈদ্যুতিক হয়ে আছে।
এর মধ্যেই ইলা আর হালিমা এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে এর পরের পারফরম্যান্সের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ইলার বুক ধুকধুক করছে সে গাউন ঠিক করতে করতে বারবার নিজের হাত ঘষছে। এই প্রথম এভাবে ডান্স করবে আবার এত লোকের সামনে তাই নার্ভাস।
হালিমাঃ- কিরে হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেছে নাকি?
ইলাঃ- হ্যাঁ রে একটু নার্ভাস লাগছে।
ঠিক সেই সময়ই ইলার চোখ সামনের দিকে পড়ল সেই মুহূর্তে যেন সময় থেমে গেল। সামনের স্টুডেন্ট এর ভিড়ের আড়ালে দাঁড়িয়ে কেউ তাকে দেখছে।কালো লেদার জ্যাকেট ঢেউ খেলানো চুল, গলায় ঝুলছে একটা ছোট হেডফোন, আর কাঁধে ঝোলানো গিটার “লিয়ান” আজকে তাকে অন্যরকম লাগছে চুল একটু উঁচু করে সেট করা, ঠোঁটে হালকা হাসি, চোখে এক অদ্ভুত শান্ত গম্ভীরতা।
ডান পাশে গলার সেই বাটারফ্লাই ট্যাটু আজ আরও স্পষ্ট আরও আকর্ষণীয়। পুরো ক্যাম্পাসের মেয়েরা যেখানে তাকে দেখে হাঁ করে তাকিয়ে আছে আর সেখানে আজ লিয়ানের চোখ কেবল একজনের দিকেই আটকে রেখেছে সেটা “ইলা”
ইলা তাকাতেই লিয়ান ধীরে ধীরে এগিয়ে এল, কিন্তু চোখে-চোখে স্পষ্ট লিয়ান ভেতর থেকে ঝড় সামলে শান্ত দেখানোর চেষ্টা
লিয়ানঃ- হাই সিজুকা… প্রস্তুতি কেমন?
ইলা গলায় শব্দ আটকে গিয়ে বলল,
ইলাঃ- ভ… ভয় লাগছে একটু।
লিয়ানঃ- টেনশন নেওয়ার কিছু নেই তুমি পারবে ইলা।তুমি স্টেজে উঠলে পুরো জায়গাটা আলোকিত হয়ে যাবে। তাই ‘অল দ্য বেস্ট’ তুমি দারুণ করবে।
লুয়ানের কথায় ইলার বুকের দুরুদুরু আরও বেড়ে গেল। সে কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু গলায় যেন আওয়াজ আটকে গেল হালিমা তাড়া দিয়ে বলল,
হালিমাঃ- চল চল আমাদের পালা।
স্টেজের দিকে হাঁটার সময় ইলার কানে লিয়ানের শেষ কথাটা আবার বাজল। ঘোষক মাইকে ঘোষণা দেয়
“Next performance… Ila & Halima!”
হৈচৈ করে ওঠে সবাই ইলা ও হালিমা স্টেজে ওঠে।
ইলা আজ পরেছে কালো ফ্লোর্ড-লম্বা গাউন পেছনটা ওপেন-স্টাইল, হালকা সিলভার স্টোনে সাজানো।
হালিমা লাল গাউনে আগুনের মতো জ্বলছে। বিট পড়তেই মিউজিক শুরু।
গানঃ
“মনে রং লেগেছে, বসন্ত এসেছে
খুশিতে মেতেছে জীবন…”
ইলা প্রথম স্টেপ হালিমা সঙ্গে সঙ্গে স্লাইড করে আসেদুইজনের মুভমেন্ট এতটাই পারফেক্ট যে পুরো অডিটোরিয়াম তালে তালে বাজতে লাগলো। ইলার গাউন দুলে উঠছে চুল বাতাসে নাচছে তার চোখে একটা আত্মবিশ্বাসের ঝিলিক।যেটা লিয়ান ঠিক কাছে দাঁড়িয়ে গভীরভাবে দেখে যাচ্ছে পরের বিটে
“ধিন তানা ধিন তানা তা না না না
আজ বাজেরে নাচেরে মন শোনে না মানা”
স্টেজের নিচে ছেলেরা হইচই শুরু করল অনেকে দাঁড়িয়ে নাচতে শুরু করে দিলো।পাশে কেউ চিৎকার করলো “ইলা ইলা ওয়াওওও” “হালিমা ফায়ার” পুরো স্টেজ যেন আগুনে জ্বলছে দুইজনের নাচে। মিউজিক থামতেই সবাই চিৎকার করে হাততালি দেয়া হল ভরে ওঠে করতালিতে। ইলা একটু শ্বাস নিতে নিচে তাকালো ঠিক ওই মুহূর্তে তার চোখ ঠেকলো দূরে একদম পেছনের কোলামে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি চোখের দিকে চোখ দুটো ইলাকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে।
সেই চোখ দুটো শান্ত নয় সেগুলো ঝড় একটা দহন একটা অধিকার।এটা আর কেউ নয় “আরিয়ান” সেই রুক্ষ গম্ভীর মুখটা চোখে সানগ্লাস তোলা মাথায়, সানগ্লাস টা খুলে হাতে নিলো আরিয়ান।
চোখ দুটো ধারালো, দৃষ্টিতে জ্বালা তাৎক্ষণিক রাগ আর টান একসাথে। ইলার বুক কেঁপে উঠলো হঠাৎ যেন অক্সিজেন কমে গেল তার হাত কাঁপতে শুরু করল হালিমা চিৎকার করল
হালিমাঃ- ইলা নাম…..নাম”
ইলা যেন নিজেই বুঝে উঠতে পারছিল না কী হবে সে তাড়াতাড়ি স্টেজ থেকে নামার সাথে সাথেই ইলার হাঁটু কাঁপা শুরু করেছিল।তার বুকের ভেতর দুরুদুরু শব্দ হচ্ছিল। মাথার পিছন দিকটা যেন গরম হয়ে উঠছে লজ্জা,ভয় অস্বস্তি সব একসাথে হালিমা তার হাত টানছিল,
হাকিমাঃ- কোথায় যাচ্ছিস এদিকে চল।
কিন্তু ইলা কিছু শুনছিল না ওর চোখ দুটো এক জায়গায় আটকে ছিল।দূরে অডিটোরিয়ামের ছায়া থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে একটা মানুষ। ইলা যত সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ততই সেই মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
ইলা এসে পাশে দাঁড়াল আরিয়ান সানগ্লাস হাতে ধরে দুই হাত বুকে ভাঁজ করে তাকিয়ে আছে ইলার দিকেযেন একজন ক্যাডেট অপরাধ করে শিক্ষকের সামনে দাঁড়িয়েছে। ইলা দাঁড়িয়েই শুকনো ঠোক গিলল।পায়ের আঙুল কুঁচকে গেল ভয় আর অস্বস্তিতে।
আরিয়ানঃ- কেমন আছেন?
সাধারণ প্রশ্ন কিন্তু তার গলা এতটাই গভীর আর কড়া ছিল যে ইলা কেঁপে উঠল। ইলা গলা ঠিক করে বলল
ইলাঃ- জ্বি… ভালো আছি।
এক মুহূর্ত নীরবতা আরিয়ান চোখ সরায় না।তার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ মেশানো রাগ বুঝা যাচ্ছে আরিয়ান খুব শান্ত গলায় বলল,
আরিয়ানঃ- পাবলিক প্লেসে এভাবে ডান্স করার কি খুব দরকার ছিলো?
ইলার বুক ধক ধক করছে মনে হচ্ছে আরিয়ানের মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে। এই বুঝি ইলার গালে আরিয়ানের হাতের ৫ টা আঙুলের ছাপ পড়বে। ইলা ভয়ে কুপোকাত ইলা মিনমিনিয়ে বলল
ইলাঃ- আমার… মানে… প্রোগ্রাম ছিলো… সবাই রিকুয়েষ্ট করছিলো।
ইলার এভাবে কথা বলতে দেখে আরিয়ান শুকনো হাসি দিল
আরিয়ানঃ- হুম সবাই রিকুয়েষ্ট করলো আর আপনি ধেই ধেই করে ডান্স করতে শুরু করে দিলেন।
ইলা আরিয়ানের এই কথা শুনে চোখ তুলে তাকালো দৃষ্টিতে কষ্ট জমে আছে, রাগ যতটা নয় তার চেয়ে বেশি একটা অদৃশ্য দাবি দেখতে পাচ্ছে ইলা যেন আরিয়ান বলছে
“তুমি আমার এভাবে অন্যের সামনে ডান্স করাটা আমার ভালো লাগে না।
ইলাঃ- আমি তো শুধু নাচছিলাম এত কিছু ভাবিনি।
আরিয়ান এক পা এগিয়ে ইলার বেশ কাছে এসে দাঁড়াল। ইলা একটু পিছিয়ে গেল কিন্তু আরিয়ান জায়গা দিল না সেটা পূরণ করে আরো কাছে এসে দাড়ালো।
আরিয়ানঃ- আপনি এত কিছু ভাবেননি ঠিক আছে।কিন্তু আপনাকে দেখে বাকিরা কী ভাবছে সেটা দেখেছেন?
আরিয়ানের এমন কথা শুনে ইলার শব্দ গলা আটকে গেল এই গরমের মধ্যে থেকেক ইলার গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেল।
আরিয়ানঃ- ওরা সবাই আপনার দিকে যেভাবে তাকাচ্ছিল…আপনি সেটা দেখেননি?
ইলাঃ- আমি… আমি সেসব দেখি নাই।
আরিয়ান এবার একটু নিচু হয়ে ইলার চোখে চোখ রাখল।
আরিয়ানঃ- কিন্তু আমি দেখেছি।
ইলা আর কথা বলতে পারছিল না মনে হচ্ছিল বুকের ভেতর কিছু আটকে আছে ইলার হাত ঠান্ডা হয়ে গেছে
হালকা কাঁপছে। আরিয়ান সেটা বুঝতে পেরে কোমল গলায় বলল,
আরিয়ানঃ- আপনি কি জানেন…আপনাকে দেখে মানুষের মাথা ঘুরে যায়?
ইলা লজ্জায় স্থির থাকতে পারছিল না মনে হচ্ছিল মাটি ফেটে গেলে ভালো হতো ইলা আস্তে বলল,
ইলাঃ- আমি তো শুধু পারফর্ম করছিলাম…”
আরিয়ানঃ- “হ্যাঁ” কিন্তু আপনি নিজের সৌন্দর্য বোঝেন না ইলা যারা দেখেছে… তারা সবাই বুঝেছে।
ইলাঃ- দয়া করে… এসব বলবেন না।
আরিয়ান গভীর শ্বাস নিল তার গলা নরম হলো
আরিয়ানঃ- আমি রাগ করি নাই আমি শুধু… ভয় আপনাকে বুঝাতে চেয়েছিলাম।
ইলা কিছু বলে না চুপ হয়ে আছে ইলা বুঝতে পারছে না কি বলা উচিত আরিয়ান চোখ সরাল না,খুব নিচু খুব সত্যি গলায় বলল
ইলাঃ- আপনি বুঝবেন না…আপনার দিকে সবাই যেভাবে তাকিয়েছিল মনে হচ্ছিল আপনি কোনো খাবার জিনিস সব গুলো শকুনের মত তাকিয়ে ছিলো।আমি চাই না আপনার কোনো ক্ষতি হোক।
ইলার নিশ্বাস আটকে গেল মনে হলো তার ভেতরটা গলে যাচ্ছে। ইলার শরীর হালকা কাঁপছিল ইলা মাথা নিচু করে বলল,
ইলাঃ- আপনি… এমন কথা কেন বলেন।
আরিয়ানঃ- কারণ এগুলো সত্যি আমি আপনাকে দেখে নিজেকে হারিয়ে ফেলি। আর সেখানে এই শকুন গুলো তো….
আরিয়ান আর কিছু বলতে পারলো না চুপ হয়ে গেলো ইলা আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে আছে। আরিয়ান আবার বলল
আরিয়ানঃ- এভাবে আর নাচবেন না প্লিজ ইচ্ছে করলে নাচবেন না আমি অন্য ছেলেদের দৃষ্টি আপনার প্রতি সহ্য করতে পারবো না। কারণ ইসলামের শরীয়ত মোতাবেক আপনি আমার স্ত্রী আপনাকে প্রটেক্ট করা আমার দায়িত্ব।
ইলাঃ- ঠিক আছে।
আরিয়ান চোখ নামিয়ে একটু হাসল একটু ক্লান্ত
আরিয়ানঃ- এতক্ষণ ভালো ছিলাম না এখন ভালো আছি।
ইলাঃ- আপনি আমাকে দেখতে এসেছিলেন?
আরিয়ানঃ- না আমার একটা কাজ ছিলো সেটার জন্য এসেছিলাম। ও হ্যাঁ আপনার নাম্বার আমার কাছে নেই আপনার নাম্বার টা পাওয়া যাবে।
ইলা নাম্বার দিয়ে দিলো আরিয়ান নাম্বার সেভ করে রাখলো “ইলাফুল” নাম দিয়ে। হঠাৎ ভিড় থেকে হালিমা চিৎকার করল
হালিমাঃ- ইলা তুই কোথায় আমি তোকে সার্চ দিতেছি কোথাও পাচ্ছি না।
ইলাঃ- আপনি একটু দারান আমি আসছি।
কিন্তু যাওয়ার সময় ইলা পিছনে ঘুরে আরিয়ানের দিকে তাকাল।আরিয়ান শুধু হাসল সেই গভীর টানটান সেই মায়াময় হাসি। ইলা ভয়ে ভয়ে চলে গেল হালিমার কাছে পেছনে আরিয়ান দাঁড়িয়ে রইলো কিন্তু ইলার থেকে দৃষ্টি সরাতে পারল না। ইলাকে আজ সত্যি অনেক সুন্দর লাগছে মনে মনে শুধু বলল
“ইলাফুল…তুমি যদি জানতে আমি তোমাকে কতটা…”
বাকিটা বলার আগেই পিছন থেকে কেউ একজন হঠাৎ বলে “এক্সকিউজ মি” আরিয়ান ঘুরে দাঁড়ায়।একটা লম্বা স্টাইলিশ ছেলে কাঁধে গিটার ঝুলানো হেসে দাঁড়িয়ে আছে।
“ভাই আপনাকে খুব চেনা চেনা লাগছে আগেও কোথায় যেন দেখেছি…”
আরিয়ান ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি আনে যেটা ইলা খুব কম দেখেছে আরিয়ানের মুখে।
আরিয়ানঃ- হতে পারে ভার্সিটিতে দেখেছেন। আমি প্রায়ই এখানে আসি।
” ও আচ্ছা ঠিক আছে সরি ডির্স্টাব করলাম মনে হয়। আচ্ছা অন্য সময় কথা হবে এখন আসি।
ইলা দৌড়ে যায় হালিমার কাছে ইলা হাপিয়ে গেছে ইলার এই অবস্থা দেখে হালিমা বলে
হালিমাঃ- এই কই হারায় গেছিলি আমি তো খুঁজে খুঁজে শেষ।
ইলাঃ- কিছু না… আমি…একটু বাইরে গেছিলাম।
হালিমাঃ- বাইরে কি করছিলি? আর বাকি ডান্স পারফরম্যান্স আছে আমাদের স্টেজে ডাকছে আবার।
ইলাঃ- না রে আর ডান্স করবো না মাথা ব্যথা করছে।
হালিমাঃ- মাথা ব্যথা নাকি কেউ মাথা গরম করে দিল?
ইলাঃ- না রে প্লিজ আর স্টেজে না যাই আর ডান্স করতে ভালো লাগছে না।
হালিমা ইলাকে দ্বিতীয়বার দেখে নেয় হালিমা দেখতে পায় ইলার চোখে ভয়, লজ্জা, টেনশন, আর দ্বিধা মিশ্রিত কিছু আছে। হালিমা বুঝলেও কিছু জিজ্ঞেস করে না শুধু বলে
হালিমাঃ- ঠিক আছে চলো নাম কেটে দিয়ে পানি খাই আগে।
দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আরিয়ানের চোখ দুটো এখনো ইলাকেই দেখছে। হালিমার সাথে কি সুন্দর হেসে হেসে কথা বলছে। কিন্তু আরিয়ানের সাথে থাকলেই কেমন ভিত হয়ে থাকে ভয়ে থাকে মেয়েটা। কিন্তু ইলা হাসলে অনেক সুন্দর লাগে।
কিন্তু ইলাফুল যতই ভয়ে পালাক আরিয়ানের থেকে আরিয়ানের চোখ তাকে ছায়ার মতোই অনুসরণ করে।হালিমার সঙ্গে ভিড়ের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল ইলা। চারদিকে আলো, মিউজিক, হাসির শব্দ সবকিছু মিলিয়ে ভার্সিটির প্রোগ্রাম জমে উঠেছে। কিন্তু ইলার কান যেন কিছুই শুনছে না।তার কানে শুধু একটা কথাই বাজছে “এভাবে পাবলিক প্লেসে ডান্স করা কি খুব দরকার ছিল?”
আরিয়ানের সেই গম্ভীর আদেশমাখা কণ্ঠটা মনে পড়তেই ইলার বুক কেঁপে ওঠে। হালিমা পানি আনতে ভিতরে যায়।ইলা বাইরে দাঁড়িয়ে গভীর শ্বাস নিল জানলার ঠান্ডা হাওয়া গায়ে লাগছে কিন্তু বুকের ভেতরের উত্তাপ কমছে না ঠিক তখনই একটা শক্ত স্থির উপস্থিতি পিছন থেকে এসে থামে ইলা ধীরে ঘুরে তাকায়।
পিছনে তাকিয়ে দেখে আরিয়ান তার থেকে দুধাপ দূরে দাঁড়িয়ে আছে।চোখে সেই একই অদ্ভুত শান্ত আগুন মুখে চাপা রাগ কিন্তু শরীরের ভাষায় দারুণ নিয়ন্ত্রণ।
আরিয়ানঃ- একটু সময় দিতে পারবেন আমাকে?
ইলাঃ-আ-আরে… হালিমা আসতেছে আর সবাই দেখলে কি বলবে।
আরিয়ান ইলার সামনে এগিয়ে আসে ইলা ভয় পেয়ে যায় আরিয়ান ধিরে ধিরে বলে
আরিয়ানঃ- হালিমা আসার আগেই কথা শেষ করে নেব।
ইলা চুপচাপ মাথা নামিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে আরিয়ানের প্রশ্ন যা ইলার নিঃশ্বাস বন্ধ করে দেয়
আরিয়ানঃ- আপনাকে দেখে আমার একটা প্রশ্ন মনে হচ্ছে।
ইলাঃ- কি প্রশ্ন?
আরিয়ানঃ- আপনি কি সবকিছুতেই এভাবে ভয় পান?
ইলাঃ- আমি ভয় পাই না…!
আরিয়ান হালকা ঝুঁকে আসে ইলার দিকে তার কণ্ঠ গভীর যেটা ইলার বুকের ভেতর আগুন ধরিয়ে দেয়।
আরিয়ানঃ- তাহলে যখন আমাকে দেখেন আমার সামনে আসেন তখন আপনার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায় কেন?
ইলার মাথা একদম নিচু সে উত্তর দিতে পারে না কারণ উত্তরটা নেই ইলার কাছে সত্যি তো ইলা আরিয়ানকে দেখে অদ্ভুত ভাবে কাঁপতে থাকে আরিয়ান ইলার মুখের দিকে তাকিয়ে নিঃশ্বাস ফেলে।
আরিয়ানঃ- আপনাকে কি আমি এত ভয় দেখাই?
ইলা মাথা নাড়ে একসাথে ভয় আর অন্যকিছুতে বুক ধুকপুক করে।আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে থাকে আরও কিছুক্ষণ তারপর বলে
আরিয়ানঃ- যাইহোক আপনি ডান্স অনেক ভালো করেন।
ইলা অবাক এটা আরিয়ান বলছে?এই মানুষটা তো খুব কমই প্রশংসা করে ইলার মুখ লাল হয়ে যায়।
ইলাঃ- থ্যা… থ্যাঙ্কস।
ইলা একটু হাসার চেষ্টা করে আরিয়ান ইলাকে দেখে তার পরে আরিয়ান এবার একটু কড়া গলায় বলে
আরিয়ানঃ- কিন্তু আমি আবার আপনাকে ওই স্টেজে দেখলে… আমার হাত আর আপনার গাল মনে থাকবে তো।
ইলা হকচকিয়ে যায় আরিয়ানের এমন কথা শুনে একটু আগেই প্রশংসা করলো আবার এখন বলে স্টেজে যেনো না উঠি।
ইলাঃ- কেন?
আরিয়ানঃ- এই কারণটা এখন বললে আপনি আরো আরও ভয় পাবেন।
ইলার মাথা ঘুরে যায় সে আর কোনো কথা বলতে পারে না ঠিক তখন হালিমার চিৎকার,
হালিমাঃ- ইলা পানি নে তোর জন্যই এনেছি।
হালিমা বের হয়ে এসে দেখে আরিয়ান দাঁড়িয়ে আছে। হালিমা আরিয়ান কে দেখে কি বলবে বুঝতে পারছে না।
হালিমাঃ- ভাইয়া কেমন আছেন….. না না না আসালামু আলাইকুম
হালিমার এই কান্ড দেখে আরিয়ান মুচকি হেসে সালাম নেয়। ইলা হাসা শুরু করে দেয় এটা দেখে হালিমা বলে
হালিমাঃ- ধুর বাল আমি সব গুলিয়ে ফেলি সব সময়।
অন্যদিকে হালকা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে কেউ একজন সবকিছু দেখছিল সেটা “লিয়ান” তার চোখ লাল,মুখ স্থির,হাতে ব্যান্ডেজ জড়ানো ইলাকে আরিয়ানের সঙ্গে কথা বলতে দেখে তার বুকের ভেতর আবার মোচড় দেয়।
লিয়ানঃ- আমার সিজুকা কারো সাথে হাসছে এভাবে এটা কি তার জামাই তাহলে।
লিয়ান ধীরে ধীরে বেঞ্চে বসে পড়ে মাথাটা হাত দিয়ে ঢেকে ফেলে।
ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৩৪
লিয়ানঃ- প্রথমে হারিয়েছিলাম সব কিছু না জেনে এবার কি আবার হারাতে যাচ্ছি অন্য কারো কাছে?মা ঠিকই বলছিল আমি তাকে পেতে যত দেরি করছি…তাই সে দূরে চলে যাচ্ছে।
হাওয়া লিয়ানের চুল উড়ছে সে মাথা তোলে চোখ ভেজা কিন্তু ভিতরে ফায়ার জ্বলছে।
লিয়ানঃ- ইলা…আমি আর চুপ করে থাকবো না। যেটা আমার চাই সেটা আমি যেকো ভাবে নিয়ে ছাড়বো।
