Home খান সাহেব খান সাহেব পর্ব ১৪

খান সাহেব পর্ব ১৪

খান সাহেব পর্ব ১৪
সুমাইয়া জাহান

কথায় আছে, মারে আল্লাহ রাখে কে? তেমনি রাখে আল্লাহ মারে কে? ঘড়ির কাঁটায় সময় দুপুর দুইটা। মাথার ওপর সূর্যের তেজটা রোজকারের থেকে আজকে একটু বেশি। চারপাশ নীরব হয়ে গেছে। সকলে চাতক পাখির মতো নিরবে সামনে তাকিয়ে আছে। শেরাজ সুমুকে পাঁজকোলে তুলে নিয়ে এগিয়ে আসছে। সুমুর দু’হাত আর মাথা ঝুলে আছে। শাড়িটা ভিজে গায়ের সাথে লেপ্টে গেছে। যার ফলে শরীরের প্রতিটা ভাঁজ দৃশ‍্যমান। সুমু চেতনা হারিয়েছে। সকলে এগিয়ে গেল ওদের দিকে। শেরাজ তীরে বালুর ওপর সুমুকে শুইয়ে দিল। নিজের শরীর থেকে জ‍্যাকেট খুলে সুমুর শরীর ঢেকে দিল। চারপাশে সকলে ভিড় জমিয়েছে ওদের দুজনকে দেখতে। নাজমিন আর সামিয়া এখনো কেঁদেই যাচ্ছে। শেরাজ ওদের দুজনকে কাঁদতে দেখে কিছুই বলল না, কারণ সেও তো আপন মানুষকে হারিয়ে ফেলার ভয় কিছুক্ষণ আগেই খুব ভালো করে টের পেয়েছে।

সুমুর হাত-পা অস্বাভাবিক মাত্রায় ঠান্ডা হয়ে গেছে। ফর্সা মুখ ঠান্ডায় ফ‍্যাকাশে হয়ে গেছে। সামিয়া আর নাজমিন কাঁদছে আর সুমুর হাত-পা ডলে গরম করার চেষ্টা করছে। শেরাজের ব‍্যক্তিত্ব বলছে, “তার কথা অমান‍্য করার জন‍্য এক্ষুনি এই অচেতন অবস্থায় সুমুকে তুলে এক আছাড় মারতে।” আর প্রেমিক সত্তা বলছে, “বুকের সাথে জড়িয়ে নিয়ে আদর করে দিতে।” শেরাজের প্রেমিক সত্তা আর ব‍্যক্তিত্বর মাঝে বিদ্রোহ শুধু হয়েছে। শেরাজ মনে মনে বলল,
“যেই ব‍্যক্তিত্ব শেরাজ খানের কলিজাকে আঘাত করতে বলে। সেই ব‍্যক্তিত্ব শেরাজ খানের কোনো প্রয়োজন নেই।”
আজ শেরাজের প্রেমিক সত্তার কাছে তার ব‍্যক্তিত্ব হেরে গেল। ভাবনা থেকে বেরিয়ে শেরাজ সুমুর নিঃশ্বাস আর পালস রেট চেক করল। সুমু পানি খেয়েছে প্রচুর। শেরাজ সুমুর মাথাটা কাত করে দিয়ে বলল,
“ওর পেট থেকে পানি বের করতে হবে। নাজমিন, তুমি ওর পেটে চাপ দাও।”
শেরাজের আদেশ পেয়ে নাজমিন সুমুর পেটে চাপ দিল। গলগল করে পানি বের হলো সুমুর পেট থেকে। কিন্তু চেতনা ফিরল না। শেরাজ সুমুর মুখের দিকে তাকিয়ে আবারও বলল,

“ওকে সিপিআর দিতে হবে।”
সে সামিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো,
“সামিয়া! তুমি ওর বুকের মাঝখানে, একহাতে ওপর আরেক হাত রেখে ত্রিশবার চাপ দাও।”
সামিয়া শেরাজের আদেশ মতো কাজ করল। শেরাজ আবারও বলল,
“আর একটা কাজ করতে হবে তোমাকে। সুমুর মাউথ টু মাউথ রেসপিরেশন দিতে হবে।”
কথাটা শুনে শেরাজের বন্ধুরা ছাড়া সকলে অস্বস্তিতে পড়ে গেল। সামিয়াকে রেসপিরেশন না দিতে দেখে শেরাজ একটু ধমকে বলল,
“কি হলো? দাও।”
সামিয়া আমতা আমতা করে বলল,
“কিন্তু ভাইয়া?”
শেরাজ সামিয়ার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
“কিন্তু কি?”

সামিয়া মাথা নিচু করে বসে রইল। শেরাজ একে একে সবার দিকে তাকাল। সবারই একি অবস্থা। কথাটা শুনে মনে হচ্ছে সকলে খুব লজ্জা পেয়েছে, শুরু তার ফ্রেন্ডগুলো ছাড়া। শেরাজের খুব রাগ হলো। সে রেগে ধমকের স্বরে বলল,
“গেট আউট অব মাই সাইট।” (আমার সামনে থেকে চলে যাও)
সকলে ধমকে কেঁপে উঠল। কিন্তু কেউ সরে গেল না। শেরাজ আবারও গর্জে উঠে বলল,
“কি হলো! কথা কানে যায়নি কারো? আমি বলেছি, আমার চোখের সামনে থেকে সকলে দূর হও।”
এবার সকলে ভয়ে কিছুটা পিছিয়ে গিয়ে দাঁড়াল। শেরাজ সকলের উদ্দেশ্যে বলল,
“একজন মানুষের জীবন বাঁচাতে গিয়ে যাদের লজ্জার কথা ভাবতে হয়। অস্বস্তিতে পড়তে হয়। বারবার এটা ভাবতে হয় যে, কাজটা আমি করব কিনা? সেসব মানুষদের শেরাজ খান নিজের চোখের সামনে দেখতে চায়না।”
শেরাজের কথা শুনে সকলে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। শেরাজ সুমুর দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,
“সরি সুইটহার্ট! এইভাবে আমি তোমাকে ছুঁতে চাইনি। আমি চেয়েছিলাম তোমাকে পুরোপুরি আমার নামে লিখে নিয়ে তারপর স্পর্শ করব। চেতনা ফেরার পর তুমি সবটা জানতে পারলে হয়তো অস্বস্তিতে পড়বে। আমি তোমাকে অস্বস্তিতে ফেলতে চাইনি। কিন্তু এখন আমার কাছে তোমার জীবনের চাইতে মূলবান আর কিছুই না। আই এম সরি সুইটহার্ট।”

কথাগুলো মনে মনে বলে সে ঝুঁকে সুমু ওষ্ঠের সাথে তার ওষ্ঠ আলতে করে ছুঁয়ে রেসপিরেশন দিল। উপস্থিত সকলে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল, শুধু শেরাজের বন্ধুগুলো নরমালি নিল ব‍্যাপারটা। ইফতিয়া, রাইশা, লামিয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। রাগে ওদের শরীর জ্বলছে। শেরাজ সুমুর ওষ্ঠে ওষ্ঠ মেলাবে এমনটা কেউ কল্পনা করেনি। তিনবার রেসপিরেশন দিয়ে সরে এল শেরাজ। তারপর বিড়বিড়িয়ে বলল,
“এগেইন সরি সুইটহার্ট।”
কথাটা সুমু শুনল কিনা, কে জানে। সে পিটপিট করে চোখ মেলে তাকাল। সুমুর সাথে শেরাজের জীবনটাও হয়তো এতোক্ষণে নতুন করে ফিরে এলো। ভারি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল শেরাজ। আকাশের দিকে তাকিয়ে সৃষ্টিকর্তাকে হাজার কোটি শুকরিয়া জানালো সে। তারপর সুমুর দিকে তাকাল। সুমুর ঘাড়ের নিচে হাত দিয়ে সুমুকে উঠিয়ে বসাল।
সুমুকে তাকাতে দেখে সকলে ছুট্টে এলো সুমুর কাছে। শেরাজ এখন আর বাধা দিল না। সামিয়া আর নাজমিন সুমুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিল। মাইশা সুমুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। শেরাজ সকলের উদ্দেশ্যে বলল,

“ও এখন ঠিক আছে। মরা কান্না না কেঁদে, সরো। ওকে রিসোর্টে নিয়ে যেতে হবে। রাহিন, তুই এখানের ডাক্তারের নাম্বার ম‍্যানেজ করে ফোন দিয়ে রিসোর্টে আসতে বল।”
কথাগুলো বলে সে সুমুকে পাঁজাকোলে তুলে নিল। সুমু চোখ বন্ধ করে আছে। অনেক দুর্বল সে। সুমুকে কোলে নিয়ে শেরাজ আবারও একবার সমুদ্রের পানির দিকে তাকাল। নিজের সবথেকে পছন্দের জিনিস সমুদ্র। আজ সেই সমুদ্রকে মনে মনে তার সুমুর জন‍্য অভিশপ্ত ঘোষণা করল। সমুদ্র থেকে চোখ সরিয়ে সে আবারও আইয়ুবদের বলল,
“সবাইকে নিয়ে রিসোর্ট পৌঁছা। আমি সুমুকে নিয়ে যাচ্ছি।”
আইয়ুবরা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। শেরাজ ধীরে ধীরে সুমুকে নিয়ে চলে গেল।

প্রায় দশমিনিটের মধ্যে রিসোর্টে পৌঁছে গেল সবাই। শেরাজ সুমুকে নিয়ে সুমুদের রুমে শুইয়ে দিল। মাইশারা সকলে উপস্থিত হয়েছে রুমে।
শেরাজ মাইশাকে বলল,
তুমি কি ওকে শাড়িটা চেঞ্জ করে দিতে পারবে? নাকি তাতেও তোমাদের অস্বস্তি হবে?”
মাইশা অপরাধীদের ন‍্যায় তাকাল শেরাজের দিকে। মনে মনে খুব অনুতপ্ত সে। সামিয়া আর নাজমিন অনুতপ্ত হয়ে মাথা নিচু করে রাখল। মাইশা ধীরে বলল,
“আমি এক্ষুনি চেঞ্জ করে দিচ্ছি ভাইয়া।”
“ঠিক আছে! ওকে চেঞ্জ করিয়ে দিয়ে, তোমারাও চেঞ্জ করে নাও।”
মাইশা সম্মতির সাথে মাথা নাড়িয়ে বলল,
“আচ্ছা ভাইয়া।”
শেরাজ রুম থেকে বেরিয়ে চলে গেল। মাইশাকে সামিয়া আর নাজমিন মিলে হেল্প করল।
শেরাজ রাহিনদের কাছে গেল। দুইহাত পকেটে গুজে দাঁড়িয়ে রাহিনকে বলল,

“ডাক্তার কতোদূর?”
“এইতো চলেই এসেছে। তুই এই ভিজে অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকিস না। চেঞ্জ করে নে। ডাক্তার আসতে আসতে সকলের চেঞ্জ করে নেওয়া উচিত।”
শেরাজ কথাগুলো শুনলো, তবে কিছু বলল না। সে সারবাজকে বলল,
“তোর ক‍্যামেরা কই?”
শেরাজের কোনো বন্ধুই বুঝল না এমন সিচুয়েশনে শেরাজ ক‍্যামেরা কেনো খুঁজছে। আইয়ুব বলল,
“সুমুর এই অবস্থা, আর তুই শ‍ুট করার কথা ভাবছিস?”
নিহাল আইয়ুবের কাঁধে চাপর মেরে বলল,
“সৃষ্টিকর্তা তোর মাথাটা ঠিক কোন কাজের জন‍্য দিয়েছে বল তো? কবে কাজে লাগবে তোর এই গবেট মাথাটা?”
শেরাজ ওদের দুজনের দিকে চোখ গরম করে তাকাল। দুজনেই মুখে আঙুল দিল। অমিত বললো,
“ওদের কথা ছাড়তো। তুই আগে চেঞ্জ করে নে। ক‍্যামেরা সারবাজের কাছেই আছে।”
শেরাজ গম্ভীরগলায় বলল,

“আজ সমুদ্রের প্রতিটা ফুটেজ আমার চাই, সারবাজ। আমি ফুটেজ চেক করার আগে ক‍্যামেরার কোনো ফুটেজে হাত লাগাবি না।
কথাগুলো বলে হনহনিয়ে চলে গেল সে। সকলে অবাক হয়ে তাকিয়ে শেরাজের চলে যাওয়ার দিকে। কারো মাথায় ঢুকল না ক‍্যামেরার ব‍্যাপারটা।
আরবাজ সকলের ভাবুক মুখের দিকে একবার তাকিয়ে বলল,
“এতো ভেবোনা তোমরা। ব্রো! যখন বলেছে, তখন নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। সকলে চলো চেঞ্জ করে নেই।”
সকলে আরবাজের কথায় ভাবনা থেকে বেরিয়ে চেঞ্জ করতে চলে গেল।

ডাক্তার এসেছে দশ মিনিট হলো। তিনি সুমুর চেকআপ করে বললেন,
“অল্পের জন‍্য বেঁচে গেছে। আপাতত ভয় নেই। তবে, রাতে জ্বর আসতে পারে। আমি কিছু মেডিসিন লিখে দিচ্ছি, সেগুলো এনে রাখবেন। জ্বর আসলে খাইয়ে দেবেন।
সে শেরাজের উদ্দেশ্যে বলল,
“মিস্টার খান! জ্বরের ট্রেমপারেচার অতিরিক্ত বেশি হলে কি করণীয় আপনি তো জানেন?”
“ইয়েস ডক্টর!”
“তাহলে সেই প্রদ্ধতি ট্রাই করবেন। আর, মিস্টার খান! এখানে আসতে আসতে আমি সবটা শুনেছি। আপনার জন‍্য আজ মেয়েটা বেঁচে গেল। আমিতো জাস্ট হালকা একটু চেকআপ করে গেলাম। মূল কাজগুলো আপনি করেছে। আমাদের সমাজ…”
কথাটা শেষ করতে পারল না ডাক্তার। তার আগেই শেরাজ বলল,
“একটা মানুষের জীবনে বাঁচাতে গিয়ে যদি আমাকে সমাজের কথা ভাবতে হয়, তাহলে আই হেট দিস ফাকিং সোসাইটি।”
সে থেমে মনে মনে বলল,

“ওর জন‍্য জান কুরবান ডক্টর। ও যে আমার কি তা আপনি বুঝবেন না।”
ডাক্তার মুচকি হেসে প্রেসক্রিপশন বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“এই মেডিসিনগুলো নিয়ে আসুন। ওনাকে কিছু খাইয়ে মেডিসিনগুলো খাইয়ে দিবেন। আজ আমি উঠি। বেশি বাড়াবাড়ি হলে আমাকে জানাবেন।”
কথাগুলো বলে উঠে দাঁড়াল ডাক্তার। প্রেসক্রিপশনটা রাহিন হাতে নিয়ে বলল,
“চলুন! আপনাকে আমি ছেড়ে দিয়ে আসি।”
সে শেরাজের উদ্দেশ্যে বলল,
“এস.কে! আমি মেডেসিনগুলো নিয়ে আসছি।”
কথাটাগুলো বলে রাহিন, অমিত আর ডাক্তার চলে গেল।
শেহেরাজ মাইশাদের উদ্দেশ্যে বলল,
“ওর খেয়াল রেখো।”

মাইশা সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়াল। সামিয়া আর নাজমিন সুমুর মাথার কাছে বসে রইল। রাইশা, ইফতিয়া, লামিয়া, নয়ন পাশের সোফায় বসে আছে। তিশা আর রাইফ সুমুর পায়ের কাছে বসে আছে। সুমু ঘুমাচ্ছে। অনের ক্লান্ত সে। শেরাজ সুমুর দিকে একপলক দেখে বেরিয়ে গেল রুম থেকে। তার পিঁছু পিঁছু তার ফ্রেন্ডরাও গেল।
বাহিরের বারান্দায় এসে দাঁড়াল শেরাজ। আইয়ুব শেরাজের কাঁধে হাত রাখল। শেরাজ আনমনেই বলল,
“আজ সুমুর এই অবস্থার জন‍্য যে দ্বায়ী, তাকে আমি ছাড়ব না। আমার সুমু যতোটা কষ্ট পেয়েছে তার চেয়ে বেশি দশগুণ বেশি কষ্ট আমি তাকে দিব।”
শেরাজের কথায় ওর বন্ধুরা খুব অবাক হলো। আইয়ুব কিছু বলতে যাবে, তখনই অমিত আর রাহিন এসে পৌঁছাল। শেরাজ সকলের উদ্দেশ্যে বলল,
“এখন আর কোনো প্রশ্ন নয়। রাতে ব‍্যাপারটা নিয়ে কথা বলব।”
সকলে আবারও একসাথে রুমে ঢুকল। সুমুর জন‍‍্য খাবার আনা হলো। মাইশা ওকে খাইয়ে ঔষধ খাইয়ে দিল। খাওয়া শেষ হতেই আবারও শুয়ে পড়ল সুমু। সামিয়া আর নাজমিনের খাবারটাও রুমে এনে দেওয়া হলো। ওরা দুজনও খেয়ে নিল। ওদের দুজনকে বসিয়ে রেখে সকলে দুপুরের খাবার খেতে চলে গেল। সকলের উদ্দেশ্য এখন খেয়ে, সকলে একটু রেস্ট নিবে।

ঘড়ির কাঁটায় সময় রাত আটটা। সকলে সুমুর রুমে উপস্থিত। সন্ধ্যা থেকে সুমুর প্রচন্ড জ্বর এসেছে। এর মধ্যে শেরাজ দুবার ডাক্তারকে ডেকে ফেলেছে। ডাক্তার ঔষধ দিয়েছে। জ্বর কমার বদলে আরো বেড়ে গেছে। শেরাজ বুঝতে পারছেনা কি করা উচিত তার। কারোই ভালো লাগছে না। সুমুকে খাইয়ে ঔষধ খাওয়ানো হয়েছে। খেতে চাইছিল না সে, শেরাজ ধমকে ধামকে অল্প কিছু খাইয়েছে। তারপর আবারও ঘুমিয়ে পড়েছে সুমু। মাইশা জলপট্টি দিচ্ছে, তাও জ্বর কমছেনা। লামিয়া, রাইশা, ইফতিয়া রাগে ফুঁসছে। সুমুকে নিয়ে শেরাজের এতো বাড়াবাড়ি সহ‍্য হচ্ছেনা তাদের।
ইফতিয়ার মতে,

“সামান্য জ্বর নিয়ে এতো বাড়াবাড়ির কি আছে? মরে তো আর যাচ্ছেনা। ঔষধ দিয়েছে আস্তে আস্তে ঠিক হবে।”
লামিয়া ইফতিয়ার কথাশুনে বিড়বিড়িয়ে বলল,
“কই মাছের জান। সমুদ্রের পানিতেও মরল না। সামান‍্য জ্বরে কি আর মরবে।
ইফতিয়া, রাইশা, লামিয়া, তিশা একসাথে এক রুমে থাকবে। তারা চারজন এখন রুমেই আছে। ডিনারও করে ফেলেছে। শেরাজ সন্ধ্যায় বারণ করেছিল আগে থেকে ব‍্যাপারটা বাড়িতে না জানাতে। কিন্তু কিছুক্ষণ আগে ইফতিয়া খুশি বেগমকে সবকিছু বলেছে। খুশি বেগম বাড়ি মাথায় করে নিয়েছেন। হাসি বেগম মেয়ের টেনশনে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। শামীম সাহেব স্ত্রীকে সামলাচ্ছেন। আনোয়ার সাহেব, রাহিন আর মাইশাকে কল করে অনেক বকেছেন। “তারা থাকতে কিভাবে সুমুর এমন অবস্থা হলো। তারা কি করছিল” আরও নানান কথা। শেষমেষ শেরাজ ফোন নিয়ে বলেছে, “কাল তারা ফিরে যাচ্ছে। আর যতোক্ষণ এখানে আছে সুমুর সব দায়িত্ব তার। শুধু শুধু রাহিনদের বকে কোনো লাভ নেই। ওদের কোনো দোষ নেই।” আনোয়ার সাহেব শেরাজের কথাশুনে একটু শান্ত হয়েছেন।

রাত প্রায় দশটা। জ্বর এখনো একই অবস্থায় আছে। শেরাজ মাইশাকে বলল,
“সুমুকে আবারও গোসল দিয়ে আনতে।”
মাইশা, নাজমিন আর সামিয়া মিলে সুমুকে গোসল দিয়ে আনলো। শীতে কাঁপছে সুমু। তারা সুমুকে বেডে শুইয়ে ব্লাঙ্কেট জড়িয়ে দিল তার শরীরে। সকলে পাশে বসে রইল। রুমে উপস্থিত কেউ রাতে খায়নি। শুধু রাইশা, তিশা, ইফতিয়া, রাইফ আর লামিয়া খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।
শেরাজ মাইশা আর নয়নকে বলল,
“মাইশা! ভাইয়াকে নিয়ে খেয়ে, ঘুমিয়ে পড়ো। আমরা আছি।”
মাইশা যেতে চাইছিল না। রাহিন জোর করে ওদের দুজনকে খাইয়ে শুতে পাঠাল।
শেরাজ রাহিনকে বলল,

“তোরাও খেয়ে নে। নাজমিন আর সামিয়াকেও নিয়ে যা। আমি আছি এখানে।”
রাহিন বুঝল শেরাজ একটু প্রাইভেসি চাইছে। সেই সাথে সে খুব ভালো করে জানে শেরাজ আজ রাতে আর কিছু খাবে না। তার সে আর জোর না করে সকলকে নিয়ে চলে গেল।
সকলে যেতেই শেরাজ গিয়ে সুমুর পাশে বসল। অপলক তাকিয়ে রইল সুমুর মুখের দিকে। সে আলগোছে সুমুর হাতটা ধরলো। জ্বরে শরীর এখনো পুড়ে যাচ্ছে সুমুর। শেরাজ সুমুর হাতে তার ওষ্ঠ দিয়ে আলতো করে ছুঁয়ে দিল। ঘুমের মধ্যেই হালকা কেঁপে উঠল সুমু। কে জানে সুমু বুঝল কিনা তার খান সাহেবের আদুরে ছোঁয়া। শেরাজ সুমুর দিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল তার প্রেয়সীর মায়া ভরা মুখটা।

প্রায় রাত এগারোটার দিকে সুমুর জ্বর কমল। শেরাজ একঘণ্টা একভাবে বসে ছিল। জ্বরটা একটু কমেছে দেখে রুম থেকে বেরিয়ে এলো শেরাজ। বাহিরে এসে সে নাজমিন আর সামিয়াকে বলল,
“এখন ওর জ্বরটা একটু কম। তোমরা রুমে যাও। খেয়াল রেখো ওর। রাতে যদি কোনো সমস্যা হয় আমাকে সাথে সাথে জানাবে।”
শেরাজের কথায় সম্মতিসূচক মাথা নাড়িয়ে সামিয়ারা রুমে চলে গেল। শেরাজও চলে গেল তার রুমে। রুমের ভেতর এসে দেখল তার বন্ধুরা সবাই উপস্থিত। শেরাজ কোনো কথা না বলেই ল‍্যাপটপের সামনে গিয়ে বসল। সারবাজের থেকে ক‍্যামেরা নিল। তারপর ক‍্যামেরার সবগুলো ফুটেজ চেক করতে লাগল। হঠাৎ একটা ফুটেজ দেখে সকলের চোখ বড় হয়ে গেল। সকলে অবাক হয়ে একে অপরের মুখ দেখতে লাগল। ফুটেজটা দেখে শেরাজের মাথায় খুনের নেশা জাগলো ঠোঁটে বাঁকা হাসি দেখা গেল তার। কিছুটা সময় নিয়ে হঠাৎ উচ্চস্বরে হাসতে লাগল শেরাজ। শেরাজের হাসিতে ওর বন্ধুরা আঁতকে উঠল। তারপর হঠাৎ করেই হাসিটা গায়েব হয়ে গেল তার। এখন শেরাজ শান্ত। এই শেরাজকে খুব ভালো করেই চেনে ওর বন্ধুরা। ঝড়ের আগে যেমন চারপাশ নীরব, শান্ত হয়ে যায় ঠিক তেমনি শেরাজ এখন শান্ত।

ভোরের আলো এখানে ফোটেনি। সকলে রেডি হয়ে গেছে। বাস এসে গেছে। রাহিন শেরাজের জন‍্য ক‍্যাব বুক করে দিয়েছে। শেরাজ সুমুকে নিয়ে আলাদা যাবে। বাকি সবাই বাসেই যাবে। সুমুর জ্বরটা এখন অনেক কম। কাল সারারাত শেরাজ নিঘুমে কাটিয়েছে। সে বারবার খোঁজ নিয়েছে তার প্রেয়সীর। যার ফলে সামিয়া আর নাজমিনও সারারাত ঘুমাতে পারেনি।
সুমুকে হালকা নাস্তা আর ঔষধ খাইয়ে রেডি করিয়ে দিয়েছে মাইশা। সকলে বাসে উঠে পড়েছে। মাইশা সুমুকে ক‍্যাবে তুলে দিয়ে বাসে উঠে পড়ল। বাস ছেড়ে দিল নিজ গতিতে। বাস ছেড়ে দিতেই শেরাজও উঠে পড়ল ক‍্যাবে। সুমু সিটের সাথে মাথা হেলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে আছে। শেরাজ সুমুর দিকে একপলক তাকিয়ে ড্রাইভারকে গাড়ি ছাড়তে বলল। ড্রাইভার তার আদেশ মতো গাড়ি ছেড়ে দিল।
শেহেরাজ সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,

“বেশি খারাপ লাগছে, সুমু?”
চোখ মেলে তাকাল সুমু। কাল চেতনা ফেরার পর থেকে এখন পযর্ন্ত কারো সাথে কথা বলেনি সে। কারো কোনো প্রশ্নের উত্তরও দেয়নি। শুধু ঘুমিয়েছে। এখনও কথা বলতে ভালো লাগছে না তার। তবুও সে মুখ দিয়ে অস্পষ্ট বলল,
“না।”
শেহেরাজ ভারী নিঃশ্বাস ছাড়ল, যেন এমন একটা উত্তরই সে আশা করছিল। মেয়েটার হাজার কষ্ট হলেও মুখ ফুটে কিছু বলবেনা, এই জিনিসটা শেরাজ এই কয়দিনে খুব ভালো করেই বুঝে গেছে। নিজেকে শক্ত প্রমাণ করতে গিয়ে খুব বেশি ক্ষতি করে ফেলে মেয়েটা নিজের। শেরাজ আর কিছুই বলল না। চুপচাপ বসে ফোনে স্ক্রল করতে লাগল। সে বাড়িতে ফিরে স‍্যান্ডিকে কল করবে ভাবল। কাল এতোকিছুর মাঝে সে স‍্যান্ডির সাথে কথা বলতে পারেনি।

বাড়ি ফিরেতে ফিরতে রাত এগারোটা বাজল শেরাজদের। পুরোটা রাস্তা শেরাজ সুমুর খেয়াল রেখেছে। ডাক্তার বলেছে, “সুমুর দুর্বলতা কাটানোর জন‍্য সুমুকে ভালো সাস্থ্যকর খাবার খাওয়াতে।” তাই শেরাজ রাস্তায় সুমুকে টাইমলি ভালো রেস্টুরেন্টে নিয়ে গিয়ে সাস্থ্যকর খাবার খাইয়ে ঔষধ খাইয়েছে। সারাটা রাস্তা সে শুধু সাস্থ্যকর খাবার খাইয়েছে। খেয়ে খেয়ে বমিও করেছে অনেকবার সুমু। তারপর আবারও খাইয়েছে। সুমুর ভাষ‍্যমতে, “এটাকে যত্ন করা না, খাইয়ে খাইয়ে অত‍্যাচার করা বলে।” ঘুম পেলে তার মাথার জায়গা হয়েছে শেরাজের কাঁধে। যখনই ঘুম ভেঙেছে, চোখ খুলে সে দেখেছে তার শরীর শেরাজের শরীরের সাথে লেপ্টে আছে। সাথে সাথে সুমু সরে গিয়েছে।
সকলে ড্রয়িংরুমের উপস্থিত। রাহিনরা অনেক আগেই পৌঁছে গেছে। হাসি বেগম আর শামীম সাহেব মেয়ের কাছে বসে আছে। এখন সুমু অনেকটা ফিট। শেরাজ এসে সবাইকে সবটা বলেছে। মিনা বেগম আর খুশি বেগম সকলকে খেতে দিলেন। সকলে হালকা খেয়ে রুমে চলে গেল। পুরো বাড়ির লাইট অফ হয়ে গেল। দুর থেকে ভেসে আসছে কুকুরের ডাক। হাসি বেগম আজ সুমুর সাথে শুয়েছে। এখন বাড়ির সকলে ঘুমে বিভোর।

ওমান, বুরামি শহর
ঘড়িতে সময় রাত দশটা। স‍্যান্ডি বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে। সে পড়েছে মহাবিপদে। তার স‍্যার তাকে একঘণ্টা আগে কল করে বলেছে,
“বাংলাদেশের একজন মাফিয়াকে হায়ার করতে।” স‍্যান্ডি বুঝতে পারল না, একটা সাধারণ মেয়েকে মাত্র একটা রাতের জন‍্য বাসার সামনে থেকে তুলে নিতে মাফিয়া লাগবে কেনো?”
বাংলাদেশে এখন সময় বারোটা। স‍্যান্ডি বেশ কয়েকটা মাফিয়ার নাম্বার জোগাড় করে ফেলেছে। সে একজনের সাথে কল করে কথা বলে টাকা এডভ‍ান্স করে দিল। প্রায় একঘণ্টা পড়ে মাফিয়াটা তাকে কল করল। কলটা ধরে আবারও কথা বলে নিল। তারপর একটা মেয়ের আইডিতে টেক্সট করল স‍্যান্ডি।

সিকদার বাড়ির থেকে একজন মানবী চাদর মুড়ি দিয়ে বাড়ির মেইন গ্রেট দিয়ে বেরিয়ে গেল। রাস্তায় তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একজন মানব। হুডি মাথায় তুলে দুইহাত পকেটে গুজে অন‍্যদিকে ফিরে দাঁড়িয়ে আছে সে। মানবীটির ঠোঁটে আনন্দের হাসি। সে দৌড়ে গিয়ে দাঁড়াল মানবীটির পেছনে। মুখে হাসি রেখেই বলল,
“আমি জানতাম তুমি আমার কাছে আসবে। আমাকে ডাকবে।”
মানবটি ঘুরে তাকালো মেয়েটির দিকে। মানবটির মুখ মাস্ক দিয়ে ঢাকা। মেয়েটি ভয়ে দু’পা পিছিয়ে গিয়ে আমতা আমতা করে বলল,

“কে…কে আপনি?”
মানবটি আর কোনো কথা বলার সুযোগ দিল না মেয়েটিকে। সে রুমাল চেপে ধরল মেয়েটির মুখে। মুহুর্তেই মেয়েটি চেতনা হারাল। মানবটি মেয়েটিকে গাড়িতে করে নিয়ে চলে গেল। মানবটি পকেট থেকে ফোন বের করে কাঙ্ক্ষিত জায়গার লোকেশন টেক্সট করে পাঠিয়ে দিল। স‍্যান্ডি ফোন হাতে নিয়েই বসে ছিল। টেক্সট আসার সাথে সাথে সে ইনবক্সে ঢুকে তার স‍্যারকে লোকেশন সেন্ড করল।
শেরাজ ফোনে স্ক্রল করছিল। হঠাৎ স‍্যান্ডির টেক্সট দেখে বাঁকা হাসল সে। বাড়ি ফেরার পর রাহিনের থেকে গ‍্যারেজ আর গাড়ির চাবি নিয়ে রেখেছিল। হঠাৎ গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে “র্ডাক সাইড” পারফিউমটা হাতে নিয়ে ব‍্যবহার করল সে। তারপর ফোনটা পকেটে রেখে চাবিটা হাতে নিয়ে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে।

শুনশান পরিত্যক্ত একটা গোডাউনের ভিতর হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছে সেই মানবীটিকে। সামনে দাঁড়িয়ে আছে মাস্ক পরা মানবটি। হঠাৎ গাড়ির শব্দ শুনে মানবটি ছুটে গোডাউনের বাহিরে গেল। কাঙ্ক্ষিত লোকটিকে গাড়ি থেকে মানতে দেখে বাঁকা হাসল সে। সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে দিল লোকটির দিকে। লোকটি সেদিকে পাত্তা না দিয়ে বলল,
“কোথায় রেখেছেন?”
মানবটি হাতটা নামিয়ে নিল। মুখের হাসিটা নেই তার। গম্ভীর গলায় বলল,
“ভেতরে বেঁধে ফেলে রেখেছি।”
লোকটি গম্ভীর গলায় বলল,
“সব ব‍্যবস্থা করে রেখেছেন?”
“হ‍্যাঁ স‍্যার!”
“কাজটা কেনো করেছে? কিছু শিকার করেছে?”
“হ‍্যাঁ স‍্যার!”
“কেনো করেছে?”
মানবটি সব খুলে বলল লোকটিকে। লোকটি আর একমিনিটও দাঁড়ালো না। হনহনিয়ে চলে গেল গ‍্যারেজের ভিতরে। তার পেছন পেছন মাস্ক পরিহিত লোকটিও এলো। ভেতরে এসে মানবটি চেয়ার এনে দিল। লোকটি চেয়ারে বসে বলল,

“ওর জ্ঞান ফেরানোর ব‍্যবস্থা করুন।”
আদেশ পাওয়ার সাথে সাথে মানবটি পানি এনে মেয়েটার মুখে মারল। ধড়ফড়িয়ে উঠল মেয়েটি। পিটপিট করে চোখ মেলে সামনে তাকিয়ে দেখল, মাস্ক পরিহিত দুজন পুরুষকে। দেখেই ভয় পেয়ে গেল মেয়েটা। সে চিৎকার করে বলল,
“কারা আপনারা? আর আমাকে এইভাবে তুলে এনেছেন কেনো?”
বসে থাকা পুরুষটি পায়ের ওপর পা তুলে বলল,
“এস,কে।”
মানবীটির চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। সে মুখ দিয়ে অস্পষ্ট বলল,
“শেরাজ।”
শেরাজ উচ্চস্বরে হেসে উঠল। কেমন গা ছমছম করা হাসি। এই হাসিতে কোনো মুগ্ধতা নেই, আছে শুধু আতঙ্ক। মেয়েটি ভয় পেয়ে গুটিয়ে গেল।
শেরাজ হাসি থামিয়ে বলল,

“শুধুমাত্র আমাকে পাওয়ার জন‍্য আমার কলিজাতে হাত দিয়ে ফেললে তুমি লামিয়া? কাজটা কি তুমি ঠিক করেছো বলো? তুমি জানো, আমার কলিজাটা শুকিয়ে গিয়েছিল? আমি ভেবেছিলাম, আমি আমার সুমুকে হারিয়ে ফেলব। তুমি কি জানো, আমার সুমু কতোটা কষ্ট পেয়েছে? জানো না। জানবে কীভাবে বলো? তুমি তো আর ওর জায়গাটাতে ছিলেনা। ইশ! এখন তোমার খুব আফসোস হচ্ছে, তাইনা? আফসোস করো না লামিয়া। আমি তোমাকে এখন ফিল করাবো, আমার সুমুর কষ্টটা। আচ্ছা বলো তো, তোমার ওই অভিশপ্ত হাতদুটো আগে কাটব? নাকি আগে তোমাকে পানিতে ডুবে মরার কষ্টটা দিব?”
লামিয়া চোখে পানি নিয়ে তাকিয়ে রইল। শেরাজ আবারও বলল,

“নো! আগে তোমার হাত কাটলে, তুমি জ্ঞান হারাবে। তারপর তোমার জ্ঞান আবারও ফেরাতে হবে। আর তোমার জ্ঞান ফেরার জন‍্য আমাকে অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু এতো সময়তো আমার হাতে নেই। বাড়িতে আমার সুইটহার্ট অসুস্থ অবস্থায় পড়ে আছে। তার কাছে আমাকে আবারও ফিরে যেতে হবে। তার থেকে ভালো আমি তোমাকে পানিতে ডুবে মরার কষ্টটা দেই।”
লামিয়া ভয়ে অনবরত কাঁদছে। গলা শুকিয়ে গেছে তার। চিৎকার করে প্রাণ ভিক্কা চাইছে। শেরাজ বিরক্ত হয়ে বলল,
“ওর মুখটা বেঁধে দিন।”
লোকটি আদেশ পেয়ে লামিয়ার মুখটা বেঁধে দিলো। শেরাজ লোকটিকে আবারও বলল,

“ওকে একুয়ারিয়ামের পানির মধ্যে ফেলে দিন। পুরো পাঁচ মিনিট পর পর ওকে তুলবেন আবারও ফেলবেন। যতোক্ষণ না সেন্সলেস হচ্ছে, ওয়াটার থেরাপি চালিয়ে যাবেন।”
লোকটি আদেশ পেয়ে শেরাজের কথামতো কাজ করল। লামিয়া নিজেকে বাঁচানোর জন‍্য হাত পা ছুড়ছে। শেরাজের দিকে অনুতপ্তের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কিন্তু শেরাজ যেন দেখেও দেখল না। লোকটি লামিয়াকে একুয়ারিয়ামের পানির মধ্যে ফেলে ওপর থেকে আটকে দিল। লামিয়ার ভেতরে গ*লাকা*টা মুরগীর মতো ছটফট করতে লাগল। শেরাজ ঠোঁটে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে তাকিয়ে রইল।
লোকটির বারবার লামিয়াকে ওপরে তুলছিল, আবার পানিতে ফেলছিল। এমন করতে করতে একটা সময় লামিয়া জ্ঞান হারাল। শেরাজ লোকটিকে ইশারা করল, লামিয়াকে নামিয়ে আনার জন‍্য। লোকটি লামিয়াকে নামিয়ে আনল।
শেরাজ গম্ভীর গলায় বলল,

“ওকে আমার গাড়ির ডিকিতে রেখে আসুন। আর আপনি আপনার পেমেন্ট পেয়েছেন তো?”
লোকটি হেসে বলল,
“হ‍্যাঁ স‍্যার! আবার কখনো প্রয়োজন পড়লে ডাকবেন। এই মহেশ হাজির হয়ে যাবে।”
শেরাজ গম্ভীরস্বরে বলল,
“প্রয়োজন পড়লে অবশ্যই ডাকব। তবে আজকের পর আমি আপনাকে চিনিনা, আপনিও আমাকে চেনেন না।”
লোকটি সম্মতিসূচক মাথা নাড়িয়ে লামিয়াকে গাড়ির ডিকিতে তুলে দিয়ে চলে গেল। শেরাজ গাড়িতে উঠে গাড়ি স্টার্ট দিল।

খান সাহেব পর্ব ১৩

বাড়িতে পৌঁছে সে পকেট থেকে ফোন বের করে কোথাও একটা টেক্সট করল। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে দুজন মানবী এলো। শেরাজ ওদের ইশারা করল। মানবী দুটি লামিয়াকে ডিকি থেকে নামিয়ে খুব সাবধানে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেল। গেস্টরুমে নিয়ে গিয়ে লামিয়ার ভেজা পোশাক চেঞ্জ করে দিয়ে চলে গেল।

খান সাহেব পর্ব ১৫