খান সাহেব পর্ব ৩৭ (২)
সুমাইয়া জাহান
সকলে তাকাল সদর দরজার দিকে। শেরাজ ডান হাত দিয়ে কোট কাঁধের ওপর ঝুলিয়ে বা’হাত পকেটে গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে। চোখেমুখে রাগ স্পষ্ট। ফিরোজা “ভাইয়া” বলে দৌড়ে গিয়ে শেরাজের সামনে দাঁড়াল। শেরাজ কোলে তুলে নিল ফিরোজাকে। ফিরোজা অভিমানীসূরে বলল,
“ভাইয়া! আমাল নিউ ফ্রেন্ডের হাতে কততো ব্যতা, তবুও ফুফুমনি আমাল নিউ ফ্রেন্ডকে বতছে। তুমি এততু বতে দাও তো ফুফুমনিকে।”
ফিরোজার কথাশুনে আরিয়ান রাগি চোখে রোজার দিকে তাকাল। শেরাজ ছোট্ট করে ফিরোজার গালে ঠোঁট ছোঁয়াল। ফিরোজাকে কোলে নিয়ে ড্রয়িংরুমের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। রিয়াজকে ডাক দিয়ে ফিরোজাকে রিয়াজের কাছে দিয়ে বলল,
“ওকে নিয়ে রুমে যা।”
ফিরোজা যেতে নারাজ। সে তার নিউ ফ্রেন্ডকে ছাড়া যাবেনা, তাই সে ডানে বামে মাথা ঘুরিয়ে না করল। শেরাজ আলতো হেসে আবারও ফিরোজার গালে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
“তুমি যাও, লাভ। তোমার নিউ ফ্রেন্ড দশমিনিট পরে যাবে।”
শেরাজ অনেক বুঝিয়ে ফিরোজাকে রিয়াজের কোলে দিলো। রিয়াজ ফিরোজাকে নিয়ে ওপরে চলে গেল।
শেরাজ এসে দাঁড়াল সুমুর পাশে। সুমুর হাত ধরে ওপরে তুলল। ভালো করে সুমুর হাতটা চেক করে কিছুটা উচ্চস্বরে বলল,
“শাহরুখ! তোর ভাবিজির জন্য ফাস্ট এইডের বক্স নিয়ে আয়, কুইক। আর ডাক্তারকে কল করে বাসায় আসতে বল। আমার বউয়ের হাতে ইনফেকশন হয়ে যাবার আগে ট্রিটমেন্ট করতে হবে।”
শাহরুখ দৌড়ে গেল ফাস্ট এইডের বক্স আনতে। শেরাজের শান্ত মেজাজ দেখে সারবাজ ভয়ে আরবাজের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। অনন্যা খাতুন ভ্রু কুঁচকে তাকাল শেরাজের দিকে। রাগিসুরে বললেন,
“এইসব কি ড্রামা হচ্ছে? তোমার বউয়ের হাতের সামান্য কিছু ক্ষতর জন্য তুমি ফাস্ট ট্রিটমেন্ট প্লাস ডাক্তার পযর্ন্ত ডাকছ বাড়িতে। আর এইদিকে রোজার গলায় যে কতখানি অংশ কেটে গেছে, সেইটা তোমার চোখে পড়ছেনা?”
শেরাজ পাত্তা দিলোনা তার মায়ের কথায়। সে সুমুর হাত আলতো করে ধরে নিচুস্বরে বলল,
“সোফার পযর্ন্ত পায়ে হেঁটে যেতে পারবে? নাকি কোলে তুলে নিব?”
সুমু চোখ রাঙিয়ে শেরাজের দিকে তাকাল। সে সকলের অগোচরে শেরাজের বুকে কনুই দিয়ে গুঁতো মেরে চাপাস্বরে বলল,
“সিরিয়াস সময়েও আপনার অসভ্যমার্কা কথা যায়না, তাইনা?”
“রোমান্স কি আর দিন, তারিখ, সময়, সিচুয়েশন দেখে আসে বলো? যার বউ হট, সুন্দরী, তার রোমান্স অলওয়েজ রক্তে আর বডির প্রতিটি পার্টসে লেগে থাকে। তুমি সামনে থাকলেই আমার বডির প্রতিটি পার্টসে লেগে থাকা রোমান্সগুলো সুড়সুড়ি দিয়ে আমাকে জাগিয়ে তোলে, বউ। আর রোমান্স লেগে থাকা রক্তগুলো চলাচল করতে শুরু করে।”
“চুপ করুন!”
“আচ্ছা, করলাম। পরে আর বলব না, তখন ডিরেক্ট রোমান্স করব। এখন চলো, বসবে।”
শেরাজ সুমুর হাত ধরে নিয়ে গিয়ে সোফায় বসাল। শাহরুখ ফাস্ট এইড নিয়ে এলো। শেরাজ ফাস্ট এইডের বক্সটা হাতে নিয়ে বলল,
“ডাক্তার কতদূর?”
“দশমিনিটে চলে আসবে, ভাইয়া।”
সুমু অস্বস্তিবোধ করল। নিচুস্বরে বলল,
“এই সামান্য একটা ব্যপারের জন্য ডাক্তার কেনো, খান সাহেব?
“এইটা সামান্য না বউ। রাক্ষসীর নখ থেকে এমন হয়েছে তোমার। তুমি জানো রাক্ষসীদের নখে কত বিষ থাকে? আল্লাহ না করুক, যদি সেই বিষ তোমার সর্বাঅঙ্গে ছড়িয়ে তোমার বড় কোনো ক্ষতি হয়ে যায়। আমি তোমাকে নিয়ে কোনো রিস্ক নিতে পারব না।”
সুমু চুপ করে রইল। শেরাজ আলতো হেসে আবারও বলল,
“আমার বউয়ের শরীরে আমার করা আদরের স্পট ছাড়া আর কোনো স্পট সহ্য হবেনা আমার।”
সুমু আর কোনো কথা বলল না। কারণ, এসব অসভ্যমার্কা কথা কারো কানে গেলে তাকেই লজ্জায় পড়তে হবে, তাই সে চুপ করে রইল। শেরাজ যত্নসহকারে সুমুর হাতে ঔষধ লাগিয়ে দিতে দিতে বলল,
“এই যে শশুরের মেয়ে, বলেছিলাম না কেউ কিছু বললে চুপ করে না থাকতে। এতক্ষণ ধরে আমার মা জননী আপনাকে ওয়াজ শোনাচ্ছে, আর আপনি নিরব শ্রোতার মতো শুনেই চলেছেন?”
সুমু তবুও চুপ করে রইল। শেরাজ ঠান্ডা কন্ঠে আবারও বলল,
“এমন কেউ করে ম্যাডাম? কাউকে মৃত্যুর সামনে দাঁড় করিয়ে সেখান থেকে ফিরিয়ে আনতে আছে বলেন? ছুরিটা ধরেছিলেন যখন চালিয়ে দিতেন। শেরাজ খানের বউ দুই এইটা মার্ডার করলে বেমানান লাগত না। আজ আপনাকে আমি একটা নিউ প্রমিস করি। এখন থেকে আমার অনুপস্থিতে কেউ আপনার দিকে হাত বাড়ালে বা চোখ তুলে তাকিয়ে বাজে কথা বললে, আপনি তাকে সোজা কবরের পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন। আমার অনুপস্থিতিতে নিজের সেফটির জন্য মার্ডার করার দায়িত্ব আপনার। আর সেগুলোকে নিখুঁত সুন্দরভাবে ভামাচাপা দেওয়ার দায়িত্ব আমার।”
সুমু বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে তার খান সাহেবের দিকে। উপস্থিত সকলে শেরাজের কথা শুনে অবাকের শেষ সিমানায়। আরিয়ান স্বাভাবিকভাবেই বসে আছে, যেন শেরাজের বলা কথাগুলো তার কাছে স্বাভাবিক। রোজা ভয়ে অনন্যা খাতুনের পেছনে লুকাল। অনন্যা খাতুন তেঁতে উঠে বললেন,
“এমনতেই আমার মনে হচ্ছে এই মেয়ে…”
শেরাজ ঠান্ডা চোখে তাকাল তার মায়ের দিকে। অনন্যা খাতুন নিজের ভুল সংশোধন করে বললেন,
“তোমার বউ! এমনিতেই তোমার বউ একজন লেডি মাফিয়া। রোজাকে খুন করতে গিয়েছিল। আর এখন তুমি ওকে শাসন না করে, আশকারা দিচ্ছো? খুন করতে শেখাচ্ছ? তুমি কি মাফিয়া শেরাজ, যে তোমার বউকেও এইসব শেখাচ্ছ?
“জান বাঁচানো ফরজ মম। নিজের জান বাঁচানোর জন্য মানুষরূপী পশুদের মার্ডার করাই যায়। আমি চাই আমার বউ সেল্ফ ডিপেন্ডন্ট হোক। আত্মরক্ষা করতে জানুক।”
“তাই বলে তুমি নিজের ঘরের লোকদে…”
ডাক্তার বাড়ির ভেতরে ঢুকে এলো। অনন্যা খাতুন চুপ করে গেলেন। খান ম্যানশন থেকে কিছুটা সামনে গেলেই হসপিটাল। ডাক্তার আসতেই শেরাজ উঠে দাঁড়িয়ে কুশল বিনিময় করল। ডাক্তার সুমুর থেকে কিছুটা ডিসটেন্স মেইনটেইন করে দূরে বসল। সুমুর হাত নিয়ে চেক করে শেরাজের উদ্দেশ্যে বলল,
“ভালোই ডিপ ক্ষত। আপনি তো ফাস্ট ট্রিটমেন্ট করে দিয়েছেন। এখন আর তেমন কোনো সমস্যা হবেনা। তবুও আমি একটা মেডিসিন লিখে দিচ্ছি, যাতে এই ক্ষতগুলো ঘাঁ টাইপ না হয়ে যায়।”
“শুধু মেডিসিন না। এমন মেডিসিন দিন যাতে এগুলোর জন্য আমার ওয়াইফের হাতে কোনো স্পট না পরে।”
শেরাজ তাকাল রোজার দিকে। বিড়বিড়িয়ে বলল,
“আপনার মেডিসিনের ওপর অনেকের অনেক কিছু নির্ভর করছে।”
ডাক্তার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“কোনো চিন্তা করবেন না। আমি একটা স্পর্টক্লীন ক্রীমের নাম লিখে দিয়ে যাচ্ছি। এই ক্ষতগুলো শুকিয়ে গেলে ম্যাডামের হাতে এই ক্রীমটা রোজ রাতে শোবার আগে ইউজ করবেন। কোনো স্পর্ট পড়বে না। আর পড়লেও থাকবে না।”
মেডিসিন লিখে দিয়ে ডাক্তার উঠে দাঁড়াল। শেরাজের সাথে আবারও কুশল বিনিময় করে চলে গেলেন। আরবাজ সাথে গেল এগিয়ে দিয়ে আসতে। শেরাজ আবারও শাহরুখকে ডাক দিল। শাহরুখ আসতেই সে বলল,
“ফ্রিজ থেক রেড বুল ক্যানের বোতল নিয়ে আয়। আর বাসায় পপকর্ন থাকলে নিয়ে আয়।”
উপস্থিত কেউ বুঝল না শেরাজের কথার মানে। শাহরুখ চলে গেলে তার দায়িত্ব পালন করতে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে ফিরে এলো সবকিছু নিয়ে। শেরাজ পপকর্ন সুমুর হাতে দিল। ক্যানের বোতল খুলে টেবিলের ওপর রেখে বলল,
“পপকর্ন ছাড়া সিনেমা দেখে মজা নেই, সুইটহার্ট। এখন আমি সিনেমা দেখাব। এগুলো খেতে খেতে সিনেমা দেখো।”
শেরাজ উঠে দাঁড়াল। শাহরুখকে কিছু একটা বলে দিল। শাহরুখ শরাজের ফোন নিয়ে গেল। টিভির কাছে গিয়ে কিছু একটা করে রিমোট এনে শেরাজের হাতে দিল। শেরাজ রিমোট হাতে নিয়ে সকলের উদ্দেশ্যে বলল,
“তো এভরিওয়ান, লেটস জাস্ট ওয়াচ এ মুভি।”
কথাটা বলে শেরাজ টিভি অন করে একটা ভিডিও প্লে করল। ভিডিওটা শেরাজের বেডরুমের। ভিডিওর মধ্যে সুমু আর রোজাকে দেখা যাচ্ছে। সকলে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে টিভির দিকে। অনন্যা খাতুন ভিডিও ফুটেজ দেখে চুপসে গেলেন। রোজা ভয়ে অনন্যা খাতুনকে জোরে চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আরিয়ান রোজার দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে। তার বিশ্বাস হচ্ছেনা তার বোন এতোবড় বোকামি করতে পারে।
ভিডিও শেষ হতেই শেরাজ টিভি অফ করে দিল। সাহাবাজ সাহেব হুংকার ছেড়ে অনন্যা খাতুনের উদ্দেশ্যে বললেন,
“এখন কি বলবে তুমি? আমার বাড়ির বউয়ের গায়ে হাত তোলার সাহস কি করে পায় তোমার ভাইয়ের মেয়ে? সুমু মামনি তো কোনো অন্যায় করেনি। সবকিছুতো আগে তোমার ভাইয়ের মেয়ে শুরু করেছে, তাই সুমু প্রতিবাদ করেছে।”
অনন্যা খাতুন মাথা নিচু করে রাখলেন। সাহাবাজ সাহেব সুমুর দিকে তাকিয়ে বললেন,
“সাব্বাস মামানি! আমার ছেলের যোগ্য বউ তুমি। তুমি কোনো অন্যায় করোনি।”
শেহেজাদ সাহেব বললেন,
“ভাবিজি! আপনি সবটা না জেনে শুনে এতক্ষণ যাবত এই বাড়ির বউকে এত অপমান করলেন। আপনি তো মা, আপনার আগে সব সত্যিটা জেনে নেওয়া উচিত ছিল।”
অনন্যা খাতুন উচ্চস্বরে বললেন,
“তাতে কি হয়েছে? সুমু কি ছেড়ে দিয়েছে রোজাকে। সেও তো একই কাজ করেছে। তোমরা শুধু রোজার ভুলটাই দেখছ। সুমুর…”
“এনাফ ইজ এনাফ মম!”
গর্জে উঠল শেরাজ। অনন্যা খাতুন চুপ করে গেলেন। শেরাজ এগিয়ে গেল রোজার কাছে। রোজা কেঁদে ফেলল। “ফুফুমনি” বলে অনন্যা খাতুনকে আরও জোরে চেপে ধরল। অনন্যা খাতুন ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তুমি কি করতে চাইছ, বেটা?”
শেরাজ অনন্যা খাতুনের কথা উপেক্ষা করে রোজার উদ্দেশ্যে বলল,
“তুই আমাকে ভালোবাসিস তাইনা?”
রোজা হয়তো এমন প্রশ্ন আশা করেনি। সে কান্না থামিয়ে শেরাজের দিকে তাকাল। সুমু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তার খান সাহেব কি করতে চাইছে বোঝার চেষ্টা করল।
“কি হলো, বল?”
“বাসি এস.কে। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। আই লাভ ইউ এস.কে। আই লাভ ইউ।”
সকলে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। সুমু পপকর্ন মুখে নিতে গিয়েও নিল না। আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে শেরাজের উদ্দেশ্য বোঝার চেষ্টা করছে।
শেরাজ বাঁকা হেসে বলল,
“তাহলে চল তোর ভালোবাসার এক্সাম নেই। আমিও দেখি তুই আমাকে কতটা ভালোবাসিস।”
চোখের পানি মুছে ভ্রু কুঁচকালো রোজা।
“এক্সাম?”
“হুম, এক্সাম। যদি তুই পাশ করিস, তাহলে তুই যা বলবি আমি তাই করব।”
“সত্যি এস.কে?”
“হুম সত্যি!”
“যদি বলি, সুমুকে ডিভোর্স দিয়ে আজ এই মুহুর্তে আমাকে বিয়ে করতে, করবে তুমি?”
“আমি তোকে কি বললাম? তুই যা বলবি তাই করব।”
“আচ্ছা! তাহলে বলো কি এক্সাম?”
শেরাজ “আলিশা” নামের একজন সার্ভেন্টকে ডাক দিল। মেয়েটি মাথা নিচু করে এগিয়ে এসে মৃদুস্বরে বলল,
“আদেশ করুন মেজোসাহেব।”
“আপনাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ দিব। যদি ঠিকমতো করতে পারেন, তাহলে আপনি যা স্যালারি পান তার দ্বিগুন বাড়িয়ে দেওয়া হবে। আর যদি না পারেন, তাহলে আপনার চাকরি যাবে। এখন বলুন পারবেন আপনি?”
“চেষ্ট করব মেজোসাহেব।”
“চেষ্টা না। কাজটা আমার হওয়া চাই।”
“ঠিক আছে মেজোসাহেব।”
“আপনার হাতে নেইল আছেনা?”
“জি মেজোসাহেব, আছে।”
“ওকে! রোজা আপনার মেজো খান সাহেবার পবিত্র হাতে তার নোংরা ছোঁয়া দিয়ে ঠিক যেই স্থানে ক্ষত করেছে, আপনিও ঠিক রোজার হাতের সেই স্থানে আপনার নেইল দিয়ে খুব ডিপলি ক্ষত করবেন। আমার ওয়াইফের ক্ষতের থেকেও বেশি ডিপ ক্ষত করবেন। এইটা আপনার কাজ।”
“কিন্তু মেজোসাহেব…”
“উহুম! কোনো কিন্তু নয়। আপনি পারবেন নাকি পারবেনা সেইটা বলুন।”
সার্ভেন্টটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“পারবো মেজোসাহেব।”
“গুড!”
অনন্যা খাতুন রাগিস্বরে বললেন,
“এইসব কি ধরনের অসভ্যতামি, শেরাজ? তুমি কি পাগল হয়ে গেছ? এইটা কি ধরনের ভালোবাসার এক্সাম?”
“এইটাই এক্সাম মম। দয়া করে তুমি চুপ থাকো। রোজাকে আমি এই ফাস্ট অ্যান্ড লাস্ট একটা সুযোগ দিয়েছি। তুমি বেশি কথা বললে রোজা ওর এই সুযোগটা হারাবে।”
রোজা একবার নিজের হাতের দিকে তাকাল। কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলল,
“থাক না, ফুফুমনি। তুমি আর কিছ বলোনা। আমি পারব। এস.কের জন্য এইটুকু আমি সহ্য করে নিব।”
“কিন্তু রোজা…”
“কোনো কিন্তু নয় ফুফুমনি। আমি পারব।”
শেরাজ হাসল। রোজার উদ্দেশ্যে বলল,
মনে রাখিস, কোনো রকমের চিৎকার করা যাবেনা। চোখে একবিন্দু পানি আসা যাবেনা।”
রোজা অসহায় দৃষ্টিতে শেরাজের দিকে তাকাল। শেরাজ আলিশাকে বলল কাজ শুরু করতে। আলিশা একবার ভীতু চোখে রোজার দিকে তাকাল। রোজার রাগ চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছে আলিশার দিকে। আলিশা রোজার হাত ধরল। শেরাজ ওয়ান, টু, থ্রি কাউন্ট করার সাথে সাথে রোজার হাতে নিজের নখ বসিয়ে দিল আলিশা। সহ্য করতে পারল না রোজা। জোরে চিৎকার করে উঠল। অনন্যা খাতুন দৌড়ে গিয়ে রোজাকে ধরল। আলিশা ভয়ে সরে দাঁড়াল। শেরাজ আলিশাকে চলে যেতে বলে, অনন্যা বেগমের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দু’হাত পকেটে গুঁজে বলল,
“প্রসঙ্গ যখন আমার বউয়ের বেলায়, তখন আমি কাউকে ছেড়ে কথা বলব না। আমার আসল রূপ দেখতে না চাইলে, তোমার বংশের সবাইকে বলো, আমার বউয়ের থেকে দূরে থাকতে। আমার বউকে যে কষ্ট দিবে আমি তার জীবন জাহান্নাম বানিয়ে দিব, মাইন্ড ইট।”
কথাগুলো বলে শেরাজ সুমুর কাছে গেল। সুমুর দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। সুমু মুচকি হেসে শেরাজের হাত ধরে উঠে দাঁড়াল। শেরাজ ফিসফিসিয়ে বলল,
“দেখেছ সুইটহার্ট, সামান্য নখের ব্যথা সহ্য করতে পারেনা। সে নাকি আমাকে বিয়ে করে আমার দেওয়া ক্যারেন্টের ব্যথা সহ্য করবে। ক্রেজি গার্ল।”
শেরাজ সুমুর হাত ধরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে চলে গেল। শেহেজাদ সাহেব সাহাবাজের সাহেবের কাছে গিয়ে বললেন,
“দেখেছেন ভাইজান, একদম বাবা-চাচার মতো হয়েছে আমাদের শেরাজ।”
সাহাবাজ সাহেব আলতো হেসে অনন্যা বেগমের দিকে একপলক তাকিয়ে নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালেন। একে একে সকলে যার যার রুমে চলে গেল। আরিয়ান গিয়ে রোজার হাত ধরে ছাদের উদ্দেশ্যে পা বাড়াল। অনন্যা খাতুন আরিয়ানকে আটকে বললেন,
“রোজাকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছিস তুই?”
“একটু ছাদে যাচ্ছি, ফুফুমনি। তুমি রুমে যাও। আর কোনো চিন্তা করোনা। এই ব্যাপারটা এই খান ম্যানশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।”
আরিয়ান রোজাকে নিয়ে ছাদের চলে গেল। অনন্যা খাতুন কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে রুমের উদ্দেশ্যে পা বাড়াল।
রাতে সকলে ডিনার করার জন্য নিচে নামলেও শেরাজ সুমুকে নিয়ে ডিনার করার জন্য নিচে নামেনি।
সুমু বেডের মাঝখানে বসে আছে। শেরাজ ফিরোজাকে সারবাজের রুমে দিয়ে এসে দেখল সুমু মন খারাপ করে বসে আছে। শেরাজ এসে তার পাশে বসল। সুমু দু’হাত দিয়ে শেরাজের হাত আঁকড়ে ধরে শেরাজের বাহুতে মাথা রাখল। শেরাজ সুমুর মুখের ওপর পড়ে থাকা চুলগুলো আলতো হাতে কানের পাশে গুঁজে দিয়ে বলল,
“মন খারাপ?”
“আজ যেগুলো হয়েছে, এগুলো ঠিক হয়নি।”
“ফরগেট ইট!”
“ভুলে যাব?”
“ইয়েস! ভুলে যাবে। কারণ আমি পাস্ট মনে রাখিনা। আমার লাইফে আমি যেটাই করি, হোক সেটা ভুল বা ঠিক। কাজটা করার পর আমি আর মনে রাখিনা। তখন যেটা হয়েছে এখন সেইটা পাস্ট। সো, ফরগেট ইট।”
সুমু চুপ করে কিছুক্ষণ বসে থেকে আবারও বলল,
“এই রুমে ক্যামেরা আছে?”
“শুধু এই রুমে নয়। এই বাড়ির প্রতিটি কোণায় কোণায় ক্যামেরা আছে।”
“রোজা আপু আজ এক্সামে জিতে গেলে আপনি কি করতেন?”
“ওকে ছোটবেলা থেকে চিনি। ও কখনোই জিততে পারত না।”
সুমু চুপ করে রইল। শেহেরাজ সুমুর মন ভালো করার জন্য বলল,
“তুমি জানো সুইটহার্ট? আমি তোমার সাথে ঠিক কীভাবে রোমান্স করতে চাই?”
সুমু মাথা তুলে তার দিকে তাকাল। শেরাজ সুমুর নাক টেনে দিয়ে আলতো হেসে বলল,
“ক্যান্ডেল লাইট ডিনার করতে চাই, লং টাইম হাগ করতে চাই, এক কাপে চা শেয়ার করে খেতে চাই, সবসময় তোমার হাতের ওপর আমার হাত রাখতে চাই, লং টাইম তোমার কপালে চুমু খেতে চাই, লেট নাইট একসাথে নেটফ্লিক্স দেখতে চাই, লেট নাইট খালি পায়ে দুজনে হাত ধরে শুনশান রাস্তা দিয়ে হাঁটতে চাই।”
সুমু শেরাজের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে । শেরাজ সুমুকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“চলো বাহির থেকে ডিনার করে আসি।”
সুমু যেতে রাজি হলো না। শেরাজ জোর করে সুমুকে রেডি হতে পাঠাল। সুমু পাশের রুম থেকে তার মিনি শপিংমল থেকে নিজের পছন্দমতো ব্ল্যাক কালারের একটা বোরকা নিয়ে এলো। তারপর বোরকা পরে রেডি হয়ে নিল। শেরাজ ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করছে। সুমু হিজাব বাঁধার জন্য ড্রেসিংটেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সুমুর হিজাব বাঁধার মধ্যে শেরাজ সুমুকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করাল। নিজ হাতে সুমুর হিজাব ঠিক করে দিতে লাগল। সুমু মুগ্ধ নয়নে তার খান সাহেবকে দেখছে। শেরাজ সুমুর হিজাব ঠিক করে দিয়ে সুমুর কপালে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াল। বেড সাইড টেবিলের ওপর থেকে ফোনটা হাতে নিল। সুমুর হাতে ফোনটা দিয়ে সে পেছন থেকে সুমুকে জড়িয়ে ধরল। দুজনে একসাথে মিরর পিক তুলে বেরিয়ে পড়ল রেস্টুরেন্টের উদ্দেশ্যে।
গাড়ি এসে থামল ওমানের “মারহাবা” রেস্টুরেন্টের সামনে। সুমু যাতে নিজের দেশের খাবার তৃপ্তি করে খেতে পারে, তাই শেরাজ সুমুকে বাংলাদেশী ফুড পাওয়া যাবে এমন রেস্টুরেন্টে নিয়ে এলো। বেশি রাত না হওয়ায় রেস্টুরেন্ট ভর্তি মানুষ। গাড়ি থেকে নামার আগে শেরাজ মুখে মাস্ক পড়ে নিল। নিজে গাড়ি থেকে নেমে সুমুর পাশের দরজা খুলে দিয়ে হাত বাড়াল। সুমু শেরাজের হাত ধরে নামল গাড়ি থেকে। দুজনে একসাথে ঢুকলো রেস্টুরেন্টের ভিতরে। শেরাজ সুমুকে নিয়ে কর্নারের একটি টেবিলে বসল। ওয়েটার আসতেই সুমুর পছন্দমতো সব খাবার অর্ডার দিল। পাঁচ মিনিটের মধ্যে ওয়েটার এসে খাবার সার্ভ করে দিয়ে গেল। দুজনেই খাবার সামনে নিয়ে বসে আছে। সুমু মুচকি হেসে বলল,
“এখানে এসে ডিনার করার প্ল্যানটা আপনার, তাহলে এখন শুরু করছেন না কেনো?”
শেরাজ মাস্ক খুলল। স্পুনে খাবার তুলে আগে সুমুর মুখে দিল। দুজনে একসাথে অর্ধেক খাবার খেয়ে শেষ করল। আচমকাই একটা মেয়ে এসে দাঁড়াল শেরাজের পাশে। শেরাজ খাবার মুখে নিয়ে মেয়েটার দিকে তাকাল। রেস্টুরেন্টে বসে থাকা সকলের মধ্যে খুশির বন্যা বয়ে গেল। সকলে সেলফি নেওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠল। শেরাজ অনুমতির জন্য সুমুর দিকে অসহায় চোখে তাকাল। সুমু মুচকি হেসে অনুমতি দিল। শেরাজ একে একে সকলের সাথে সেলফি নিল। সেলফি তোলা শেষে সকলের মনে একটাই প্রশ্ন শেরাজের সাথে বসে থাকা মেয়েটা কে?
শেরাজকে প্রশ্ন করতেই সে সকলকে উদ্দেশ্যে বলল,
“আজ রাত একটায় লাইভে আসব আমি। তখন সকলের প্রশ্নের উত্তর দিব। এখন এখানে ডিনার করতে এসেছি। আমাদের শান্তিতে ডিনারটা করতে দিন।”
সকলে সরে গিয়ে যার যার টেবিলে গিয়ে বসল। কিছু কিছু মেয়ে সুমুর দিকে তাকিয়ে রইল। সুমু হঠাৎ অস্বস্তি অনুভব করল। স্নিকার্স প্রচন্ড টাইট করে বাঁধার ফলে পায়ে ব্যথা হচ্ছে তার। শেরাজ সুমুর মুখের অবস্থা দেখে কি হয়েছে কারণ জানতে চাইল। সুমু নিচুস্বরে বলল,
“পায়ে ব্যথা হচ্ছে। জুতো অনেক টাইট করে বেঁধে ফেলেছি।”
শেরাজ উঠে দাঁড়াল। সুমুর চেয়ার ঘুরিয়ে তার পায়ের সামনে এক হাঁটুমড়ে বসল। শেরাজের কাণ্ডে সুমু চট করে উঠে দাঁড়াল। রেস্টুরেন্টে উপস্থিত সকলে হা করে তাকিয়ে আছে। শেরাজ সুমুর হাত টেনে ধরে চেয়ারে বসিয়ে বলল,
“চুপ করে বসে থাকো। আমি বেঁধে দিচ্ছি।”
“কিন্তু আপনি…”
“চুপ!”
শেরাজ সুমুর স্নিকার্সে হাত দিল। দু’পায়ের স্নিকার্স খুলে সুন্দর করে আবারও বেঁধে দিল। রেস্টুরেন্টের সকলে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। কেউ কেউ আবারও ফটো তুলে নিল। শেরাজ উঠে দাঁড়াল। বিল পেমেন্ট করে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে এলো।
শুনশান রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলছে। একটা ফাঁকা মাঠের কাছে গাড়ি থামাল শেরাজ। সোডিয়ামের আলোয় সবকিছু স্পষ্ট। দুজনে গাড়ি থেকে নেমে মাঠের দিকে হাঁটা ধরল। মাঠের একপ্রান্তে দোলনা দেখে সুমু দৌড়ে গিয়ে দোলনার ওপর বসে পড়ল। দোলনার ওপর বসে সুমু প্রানখোলা অট্টহাসিতে মেতে উঠল। সুমুর ঠোঁটের হাসি শেরাজের ঠোঁটকে হাসতে বাধ্য করল। শেরাজ সুমুর পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। আস্তে আস্তে দোল দিতে লাগল। সুমু হাসতে হাসতে বলল,
“আপনিও বসুন, খান সাহেব।”
শেরাজ এসে সুমুর পাশের দোলনায় বসল। দুজনে একসাথে দোলনায় দোল খেতে খেতে সময়টা উপভোগ করায় ব্যস্ত হলো।
বিশ মিনিট বাদে দুজনে উঠে দাঁড়াল। সুমু জুতো খুলে হাত নিয়ে বলল,
“আমি খালি পায়ে হাঁটব।”
শেরাজ সুমুর হাত থেকে জুতোজোড়া নিয়ে আগে আগে হাঁটা শুরু করল। সুমু দৌড়ে গিয়ে শেরাজের হাত আকঁড়ে ধরে তার বাহুতে মাথা রেখে সমান তালে এগিয়ে চলল। গাড়ির কাছে এসে দুজনে গাড়িতে উঠে পড়ল। গাড়ি ছুটল খান ম্যানশনের উদ্দেশ্যে।
বারোটা ত্রিশের দিকে শেরাজদের গাড়ি খান ম্যানশনের সামনে এসে দাঁড়াল। সুমু ঘুমিয়ে আছে। শেরাজ গাড়ি থেকে নেমে সুমুর পাশের দরজা খুলল। সুমুর কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে তাকে কোলে তুলে নিল। ছাদ থেকে সবটা দেখল আরিয়ানে। হাতের মধ্যে থাকা অ্যালকোহলের বোতলটা সর্বশক্তি দিয়ে চেপে ধরে রেখেছে সে। শেরাজ বাড়ির ভেতরে এসে সোজা নিজের রুমে গিয়ে বেডে শুইয়ে দিল সুমুকে। আলগোছে সুমুর শরীর থেকে বোরকা আর হিজাব খুলে নিল। সুমু একটু নড়েচড়ে উঠল, তবে ঘুম ভাঙাল না। শেরাজ এসি অন করে নরমাল টেম্পারেচার দিয়ে সুমুর গায়ে ব্লাঙ্কেট টেনে দিল। নিজের গায়ে পোশাক চেঞ্জ করে শর্ট-প্যান্ট আর টি-শার্ট পরে নিল। ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে সোশ্যাল মিডিয়াতে ঢুকল। নোটিফিকেশনের জন্য অতিষ্ঠ হয়ে উঠল শেরাজ। রেস্টুরেন্টে সুমুর জুতো বেঁধে দেওয়ার ছবি অনেকে আপলোড দিয়ে শেরাজকে ট্যাগ করেছে। আইয়ুবরাও এই ব্যাপারটা নিয়ে মজা করে শেরাজকে টেক্সট পাঠিয়েছে। অনেকে ইনবক্সে কান্না কাটির শুধু করেছে। শেরাজ সবকিছু ইগনোর করে লাইভে ঢুকল। লাইভ স্টার্ট করা সাথে সাথে সকলের প্রশ্নের বন্যা বয়ে গেল। শেরাজ বিয়ের বিষয়টা সকলকে জানালো। সকলে সুমুকে দেখতে চাইল। শেরাজ সুমুকে দেখতে চাওয়ার ব্যাপারটা ইগনোর করল। প্রায় একঘণ্টা লাইভ করে শেরাজ সোশ্যাল মিডিয়া থেকে বেরিয়ে এলো। প্রচন্ড টায়ার্ড সে। এখন সোশ্যাল মিডিয়াতে থাকলে সে পাগল হয়ে যাবে। ফোন রেখে বেডের কাছে গেল। নিজের বালিশটা একটু নিচে নামিয়ে ঘুমন্ত সুমুর বুকের মধ্যে মাথা রাখল। সে সুমুর কোমর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করল।
খান সাহেব পর্ব ৩৭
অন্ধকার রুমের মধ্যে বসে শেরাজ পুরো লাইভটা ফেক একাউন্ট দিয়ে দেখল সেই মানব। ঠোঁটে লেগে তার বাঁকা হাসি। শেরাজের একটি ছবি বের করে ভালো করে পরখ করে বলল,
“তোর সবকিছু ধ্বংস করে দিব এস.কে। তোর লাইফ থেকে কেড়ে নেব তোর এই ভালোবাসাকে। তোকে শূন্য করে দিব। কিছু থাকবেনা তোর। সব ধ্বংস করে দিব আমি। তোর এই সুখের মেয়াদ বেশিদিনের হবেনা।
কথাগুলো বলে মানবটি অট্টহাসিতে মেতে উঠল। সে হাতে ওয়াইনের বোতল নিয়ে একচুমুকে অর্ধেক শেষ করে সামনে থাকা আয়ানার দিকে বোতল ছুঁড়ে মারল। মুহুর্তেই আয়নাটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। ভাঙা কাচের দিকে তাকিয়ে লোকটি আবারও হেসে উঠল।
