Home হৃৎস্পন্দন হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৯

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৯

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৯
সাঞ্জেনা শাজ

শক্ত হয়ে বসে আছে শুভ্রতা। দৃষ্টি দূর অজানায়। পুরো রোফটপে আলোর ঝলকানি হলেও সমগ্র আকাশ অন্ধকারেই ডুবা। তারউপর ঝিরিঝিরি বৈরি হাওয়া বইছে, যেন বৃষ্টির পূর্বাভাস। সামনে মন মাতানো খাবারের সুগন্ধি ভেসে আসছে। কিন্তু শুভ্রতার সে দিকে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। তার মন মস্তিষ্ক জুড়ে বিচরণ শুধু এক জনের। যে এই মূহুর্তে প্রফেশনাল ভঙ্গিতে, তার পাশের টেবিলে বিজনেস পার্টনারের সাথে আলোচনা করছে।
আজ দু’জন পার্টনার আছে মেহরাদের সাথে। মিস আয়রা চৌধুরি আর মিস্টার শাহজাদ খানজাদা। এই লোককে শুভ্রতা কখনো দেখেনি। অবশ্য, দেখার কথাও না। চেহারায় অনেকটা বিদেশি ভাব।
মিস আয়রা ব্যাতিত অন্য আরেকজন পার্টনার থাকায় শুভ্রতাকে অন্য টেবিলে খাবার অর্ডার দিয়ে বসিয়েছে মেহরাদ। আর সে ওনাদের সাথে প্রজেক্ট নিয়ে কথা বলছে। তাদের তিন কোম্পানি মিলে একজন বিদেশি ক্লায়েন্টের সাথে ডিল করবে আগামীকাল। অনেক বড় প্রজেক্ট। সেটারি পূর্ব পরিকল্পনা চলছে এখন।

নাকের নিচে আঙুল ঘষলো শুভ্রতা৷ তার এতো অল্পতে কান্না পায়! কেন পায়? এই মেয়েকে দেখেই তার শিরা উপশিরা জ্বলে উঠছে। কিভাবে হেসে হেসে ঢং করে কথা বলছে! সব তো তার কানে আসছেই! এই যে মাত্র বললো,
“মিস্টার মেহরাদ, ইউ নো? আমি আপনাদের কোম্পানির সাথে শেষ অব্দি কাজ করতে চায়। সেই সাথে আপনার সাথেও৷”
এই কথার মানে কি? একজন মেয়ে হয়ে আরেকজন নেয়ের হাবভাব বুঝবে না? তার ঘুরাটাই মাটি করে দিলো একদম! এই কারণেই বুঝি সেদিন বলেছিলো, সেখানে গিয়ে বিরক্ত করতে পাড়বি না? এর-ই ওয়ার্নিং আগে দিয়ে এসেছিলো! সে কি বোকা! কিছুই বুঝেনি। মাথাতেই আনে নি। এর থেকে তো না আসাই ভালো ছিলো! নাহ! না আসলে আবার কিভাবে হতো? তাহলে তো এসব কিছুই জানতে পাড়তো না।
নিজের মনের দু’টানার ভাবনায় শুভ্রতার মন খারাপ হুরহুর করে বাড়তে থাকলো। আবার পাশে তাকালো, মেহরাদ ব্যাস্ত কথা বলায়। অপর পাশের লোকটার সাথে চোখাচোখি হলো। অদ্ভুত! এভাবে তাকিয়ে আছে কেন! রাসেল সাহেবও একপাশে বসে।
মেহরাদ খেয়াল করলো শাহজাদের তাকানো। প্রচুর বিরক্ত হলো।ফাউল ছেলে পেলে। সে শুভ্রতার দিকে তাকিয়ে কিছুটা রুঢ় হয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“এখনো খাস নি কেন? অন্য কিছু অর্ডার দিবো?”
শুভ্রতা মাথা নাড়িয়ে ‘না’ বুঝালো। দূরত্ব যেহেতু বেশি দূর নয়। তাই কথা বলাতে কোন অসুবিধে হলো না। এর মাঝখানে আয়রা বললো,
“হাই, কিউটি! নাইস টু মিট ইউ।”
“হাই, গার্ল। ” আপর পাশ থেকে মিস্টার খানজাদাও হাত নাড়িয়ে বলে উঠলো। তবে আস্তে করে।
শুভ্রতা চেয়ে রইলো এক দৃষ্টিতে। এতক্ষনে তাকে দেখেছে! অবশ্য আরেকজন থেকে চোখ সড়লে তো দেখবে! ঢংঙ্গি মহিলা। সে কিছুক্ষণ চুপ থাকাতে আয়রা ওকওয়ার্ড ফিল করলো। মেয়েটা এভাবে তাকিয়ে আছে কেন তা ভাবলো। একটু পর শুভ্রতা আস্তে করে বললো,
“আসসালামু আলাইকুম আপু।”

পশ্চিমা দেশে বড় হওয়া আয়রা বিভ্রান্ত হয়ে লজ্জিত বোধ করলো। সেই সাথে অহংকারী মনে কিছুটা চোট লাগায় শুভ্রতাকে প্রথমেই বেয়াদব ননদের খাতায় ফেলে দিলো। সে তো মেহরাদকে পছন্দ করে জানিয়েছে ফ্যামিলিতে। তার পাপা তার জন্য সব ঠিক করবে সে জানে! তাই, মেহরাদ কে দেখিয়ে হাসলো একটু। সালামের উত্তর দিলো। তারপর আবার নিজেদের মধ্যে কথা শুরু করলো। একেক টপিক টেনে এনে মেহরাদকে ব্যাস্ত রাখলো।
শুভ্রতার এসব আর ভালো লাগলো না। মোবাইল নিয়েছিলো লোকটার থেকে পিক তোলার জন্য। ভেবেছিলো দু’জনে মিলে সেলফি তুলবে। কখনো মুখের ভাষা খারাপ না হওয়ার শুভ্রতা আজ ধীর স্বরে চির বির করে মুখ দিয়ে বের করলো, ‘ভা/ল তুলবে আমার।’
সাথে সাথেই নিজের মুখে চাপড় মারলো। কি একটা অবস্থা! সে কি পাগল হয়ে যাচ্ছে এই অল্পতেই! সে উঠে দাঁড়ালো। আর সম্ভব নয় এখানে থাকা। সে মেহরাদের টেবিলের সামনে গিয়ে দাড়াতেই সকলের দৃষ্টি আবার তার দিকে পড়লো। শুভ্রতা মনের ভিতর জ্বালাযন্ত্রণাকে চেপে রেখে মিনমিন সুরে বললো,

“রুমে যাবো। এদিকে আর ভালো লাগছে না।”
মেহরাদ অপর টেবিলের দিকে তাকিয়ে দেখলো, অর্ডারকৃত খাবার এভাবেই পড়ে আছে। কিচ্ছু খায়নি। সে বুঝেছে শুভ্রতার ভালো লাগছে না। এদিকে এখনো কিছুটা আলোচনা বাকি আছে। তারউপর মিস্টার খানজাদার নজর তার একটুও ভালো লাগছে না৷ একটুও না। তাই সে বললো,
“একা থাকতে পাড়বি রুমে? আমার আরও একটু সময় লাগবে৷ হাফ এন আওয়ার হলেই চলবে।”
শুভ্রতার ভিতরের কষ্টটা যেন তড়তড় করে বেড়ে উঠলো। কান্না পেল। তাকে একা থাকতে বলছে! সে তো ভেবেছিলো, সে আসার কথা বললে মেহরাদও সব ছেড়ে তাকে নিয়ে রুমে যাবে। আশাহত হয়ে তার ভিতরের চাপা কষ্টটা কণ্ঠনালী অব্দি এসে আটকে গেলো। শক্ত ঢুক চেপে আস্তে করে বললো,
“আমি পাড়বো। ”

“সো মাচ্ ওয়েল বিহেভড গার্ল। আই লাইকড হার, মিস্টার মেহরাদ। ভাইয়ার জন্য সম্বন্ধ পাঠিয়ে দেই? কি বলেন?” দুষ্টমির সুরে বললো আয়রা।
মেহরাদের মোটেও পছন্দ হলো না কথাটা। ঠোঁটের বাকে কিঞ্চিৎ বাকা হাসি ঝুলিয়ে বললো,
“বেড লাক, মিস চৌধুরী। শি ইজ অলরেডি ম্যারেড। ”
“ওহ শিট!” বলে উঠলো শাহজাদ খানজাদা। সে খুব আশ্চর্য হয়েছে প্লাস অবাক। এতটুকু মেয়ে ম্যারেড? হাও? এই বাংলাদেশি পিপল গুলো এতো তাড়াতাড়ি মেয়ে গুলোকে বিয়ে দিয়ে দেয়। সু মাচ্ আনকালচার্ড! ড্যাম-ইট!
আয়রা আশ্চর্য হলেও মনে মনে খুশি হলো। মেহরাদের সাথে মেয়েটাকে দেখে তার একটুও ভালো লাগে না, যতই কাজিন হোক। এখন মেয়েটা ম্যারেড শুনে স্বস্থি পাচ্ছে। মেহরাদ আবারও জিজ্ঞেস করলো,
“থাকতে পাড়বি রুমে? একা লাগবে না? এদিকেই বোস না-হয়? আর অল্প কিছুক্ষণ হলেই হয়ে যাবে। ”
শুভ্রতার একটুও ভালো লাগলো না। নিজে সাথে না চলে তাকে থাকতে বলছে! সে থাকবে না। মুটেও না। তাই বললো,

“কোন একা টেকা কিচ্ছু লাগবে না। বরং একদিকেই আরও একা, আরও বোরিং লাগছে। আপনি থাকুন। আমি যাই।” বলেই শুভ্রতা হাঁটা ধড়লো।
মেহরাদ সাথে সাথেই ওঁকে থামতে বললো। কিন্তু মেয়েটা কথা শুনলো না। তা দেখে মেহরাদ রাসেল সাহেবকে বললো, ওর পিছু পিছু গিয়ে স্যুট পর্যন্ত দিয়ে আসতে। সে কিছুক্ষনের মধ্যেই আসছে।
“সু রুড বিহেভ করলো মেয়েটা।” আয়রা আশ্চর্য হয়ে বললো।
শুভ্রতা যেতে শুনলো কথাটা। তবুও পিছু ঘুরলো না। নাক টেনে চোখের জল আটকালো।
মেহরাদ বললো,
“রুড নয়। জাস্ট চাইল্ডিশ।” তারপর নিজে নিজেই মনে মনে ওঁকে নিয়ে চিন্তিত হলো। তবুও ইচ্ছে করেই ততটা জোর দিয়ে আটকায়নি। মিস্টার খানজাদা আছে তাই। এর চাহনি তার ভালো লাগে না। রুমে গিয়ে মানাতে হবে। সেটা মনে মনে চিন্তা করে রাখলো। সেই সাথে ওয়েটারকে ডেকে খাবা গুলো প্যাক করে দিতে বললো। জেদ করে কিছু খায়ও নি। পাগলী একটা!

শুভ্রতাকে রুম পর্যন্ত দিয়ে চলে গেলো রাসেল সাহেব। দরজা লক করে ক্ষিপ্ত কদমে মেহরাদের রুমের দিকেই গেলো মেয়েটা। রাগ তার চুঙ্গে। নিজে আসেনি। এসিস্ট্যান্ট পাঠিয়েছে এই নাটক করতে কি বলেছে! কথা বলুক বেশি করে। হি হি, হা হা করে আরও কথা বলুক!
“আহহহ্! ” বলে চেচিয়ে উঠলো শুভ্রতা। তার এতো কান্না পাচ্ছে! রাগ নিয়েও চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। তার এতো সখ নিয়ে আসা সব মাটি করে দিলো। হাতে এখনো মেহরাদের মোবাইল খানা। কোন কিছু না ভেবেই সবার আগে এটা ছুড়ে মারলো দেয়ালে। আরও কিছু ছুড়তে ইচ্ছে করছে। বিকেলে আনা লাগিজ গুলোতে লাথি মা/রলো। নিজেই পায়ে ব্যাথা পেয়ে ‘উফফফ্’ বলে বসে পড়লো ফ্লোরে।
রাগ নিভে আসতে আসতে, হাটু মুড়ে কান্না জুড়লো। মিনিট দশেক এভাবে কাটার পর মেহরাদের ফোনটা বেজে উঠলো। প্রথমে বেজে কেটে গেলো। তারপর আবার বাজলো, এরপর আবারও। নাক টেনে হাটু মুড়ে সেদিকে এগিয়ে গিয়ে মোবাইলটা হাতে নিলো। স্ক্রিন ফেটেছে। ফাটুক! সায়তানটার মোবাইল ভেঙে ঘুরো ঘুরো হয়ে যাক! তাইলেই সে খুশি হবে। বাচ্চাদের মতো কথা বলছে মেয়েটা।
তারপর দেখলো ছোট চাচ্চু দিয়ে সেভ করা নাম্বার থেকে কল আসছে। তার বাবা! মনে পড়লো, তার বাবার আসার কথা তো। তাই কি ফোন দিচ্ছে? সে ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে তার বাবা বললো,

“মেহরাদ, কই আছিস তোরা? আমি হোটেলের সামনে আছি।”
শুভ্রতা নাক টেনে বললো,
“আমি বাবা। ”
শায়ান তালুকদার কিছুটা অবাক হয়ে বললেন,
“ওহ, আমার মা রিসিভ করেছে কল! কোন স্যুটে আছো তুমি? বাবা এসেছি। মেহরাদ কই? ওঁকে বলো তোমাকে নিয়ে আসতে। না-কি বাবা আসবো?”
বাবার আহ্লাদে শুভ্রতার কষ্ট গুলো যেন পশ্রয় পেলো। বসা থেকে উঠে দাড়িয়ে বললো,
“তোমার আসতে হবে না। উনি খুব ব্যাস্ত। ওনাকে যেতে হবে না। আমি-ই আসছি। তুমি একটু দাড়াও।”৷ বলেই কল কেটে দিলো মেয়েটা।

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৮ (২)

গা’য়ের ওড়নাটা ঠিক করে মেহরাদের মোবাইলটা বিছানায় ছুড়ে ফেললো। নিজের মোবাইলটা রুম থেকে নিয়ে বের হয়ে গেলো স্যুট ছেড়ে। যেতে যেতে বারং বার আওড়াল, ব্যাস্ত মানুষকে ডিস্টার্ব করে লাভ নেই। সে থাকুক ব্যাস্ত তার মিটিং আর মিস চৌধুরীকে নিয়ে। সে কে? তারা কে? তাদের কথা ভেবে লাভ কি?
এদিকে রোফটপে মিটিং এ ব্যাস্ত মেহরাদ চিন্তাতেও আনলো না তার প্রিয়তমা রাগ করে বাবার কাছে চলে যাচ্ছে। তার কল্পনার বাহিরে থাকা এরকম একটা কর্মকান্ডের জন্য কি করবে মেহরাদ? কতটা দুঃখ পাবে সে? ঠিক কতটা রাগ করা উচিৎ? কতটা পাগলামু হবে তার দ্বারা এরপর…..

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৯ (২)