Home হৃৎস্পন্দন হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৯ (২)

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৯ (২)

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৯ (২)
সাঞ্জেনা শাজ

“মিস্টার তালুকদার, আসুন একটু আড্ডা দেওয়া যাক। দেখুন আবাহাওয়াটা কি শীতল? ইটস এন বিউটিফুল ওয়েদার। বারিষ হবে মেইবি!” কিছুটা বিদেশিয়ানা সুর নিয়ে বললো শাহজাদ। মেহরাদ দের জরুরি আলাপ আলোচনা এই মূহুর্তে শেষ। তারা উঠেই যাবে এই মূহুর্তে বললো শাহজাদ। আকাশে ঘনঘটা আধার। শীতল আবহাওয়া ছড়াচ্ছে চারদিকে। যেমন বৃষ্টি হওয়ার পূর্বাভাস।
মেহরাদ শাহজাদের দিকে তাকিয়ে উঠে দাড়ালো। ঘড়িতে সময় দেখলো, শুভ্রতা রুমে গিয়েছে আধা ঘন্টা হয়ে যাবে। মেয়েটা কি করছে কে জানে! আর এখন সে এদিকে ওয়েদার ইনজয় করবে? হাও সিলি! সে ব্যাস্ত ভঙ্গিমায় বললো,
“ইনজয় ইউ গাইজ। আমায় যেতে হচ্ছে। আদারওয়াইজ শি উইল ফিল বোরিং । ”

“কোন বরিং হবে না, মিস্টার মেহরাদ। দেখবেন জমিয়ে ওর হাসবেন্ডের সাথে আলাপ করছে। আপনি বসুন। ওর হাসবেন্ড আসলো না সাথে? এতো তাড়াতাড়ি বিয়ে দেওয়ার কারণ কি, মিস্টার মেহরাদ? আপনাদের ফ্যামিলির সাথে তো এটা যায় না!” কিছুটা তাচ্ছিল্য করে বললো আয়রা। যেন সে শুভ্রতাকে নিয়ে কোন গসিপে বসতে চাচ্ছে।
“এসেছে ওর হাসবেন্ড। দ্যা পার্সোন সিটিং ইন ফ্রন্ট ওভ ইউ। একচুয়ালি, ইউ আর রাইট মিস চৌধুরী। আমাদের ফ্যামিলির সাথে এটা যায় না। বাট স্টিল উই আর হাসবেন্ড এন্ড ওয়াইভ নাউ। এন্ড দ্যা ফ্যাক্ট ইজ, শি ইজ মাই বিলাভড চাইল্ডিশ ওয়াইভ। ”

মেহরাদ টেবিল ছেড়ে বেরিয়ে পাশে দাড়ালো। সম্পূর্ণ ভাবলেশহীন ভাবে বিশাল ওজন ওয়ালা কথাটা অনায়াসে হালকা ভাবে বলে দিলো। যেন তেমন কিছুই না। এদিকে কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে গেল আয়রা। মস্তিষ্ক বাক্যটা মাথায় নিতে চাচ্ছে না। আভিজাত্যয় মুড়ে থাকা চেহারাটায় আশ্চর্য অবিশ্বাস্য ভাব সেই সাথে স্তম্ভতা। নিজের কানকেই বিশ্বাস হচ্ছে না। শাহজাদেরও তাই আবস্থা।
এদিকে মেহরাদ রাসেল সাহেবের সাথে ব্যাস্ত ভঙ্গিতে কি কি যেন বলে আবারও ওঁদের দিকে তাকালো। তাদের স্তম্ভিত চেহারা তাকে কিছুই ভাবালো না।
“ইনজয় ইউ গাইজ।মিট ইউ লেটার, ওকেই? বায়…” বলেই রুফটপ ত্যাগ করলো। আকাশের বর্জ্য পাতও যেন আয়রার মস্তিষ্ককে ঠিকানায় আনতে পাড়লো না। সে তখনো স্তম্ভিত হয়ে রইলো। চোখ দুটো আটকে মেহরাদের যাওয়ার পথে। মন মস্তিষ্ক জুড়ে একই শব্দের প্রশ্নের বিচরণ, ‘বিলাভড ওয়াইভ? ম্যারিড? হার হাসবেন্ড?’

বাবার সাথে গাড়িতে শুভ্রতা। সে চলেছে বাবার সাথে তার কোয়ার্টারে। দৃষ্টি নিবদ্ধ তিমিরে ঢাকা অন্ধকার রাস্তার মধ্যে। বাবার জিপ গাড়িতে বসে সারি সারি গাছপালা পিছু ফেলে যাচ্ছে মেয়েটা। সেই সাথে নিয়ে যাচ্ছে এক বুক হাহাকার দুঃখ কষ্ট। চোখের পাতায় জল।
চোখের সামনে মেয়ের ব্যাথিত আদল শায়ান তালুকদারকে অস্থির করে তুলছে। ভিতরে পুড়িয়ে দিচ্ছে। তার মা’টা কেন কষ্ট পাচ্ছে? কেন কাঁদছে? আসার আগে না কতটা খুশী ছিলো? তাহলে?
তিনি বিচক্ষণ মানুষ। ভিতরের অস্থিরতা দমিয়ে আদুরে সুরে মেয়েকে শুধালেন,
“আমার মায়ের কি হয়েছে? কেন কষ্ট পাচ্ছেন আম্মাজান? মেহরাদ কিছু বলেছে? কোন…. ”
শুভ্রতা তড়িঘড়ি করে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টায় লেগে গেলো। বাবা বুঝতে পেড়েছে তার কষ্ট! মেহরাদ ভাইকে ভুল বুঝবেন না তো? কিন্তু মেহরাদ ভাইয়ের তো কোন দোষ নেই? সে তো কষ্ট পাচ্ছে নিজেরই টিনেজার আবেগ নিয়ে। এদিকে লোকটার তো কিছু না! তার এই বোকামির জন্য এর আগের বারও লোকটাকে বাবা ভুল বুঝেছিলো। এখনও যদি তা হয়! নিজের কন্ঠঃ কে আপ্রান স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালিয়ে শুভ্রতা বললো,

“আমি ঠিক আছি বাবা। মেহরাদ ভাই কিছু বলেনি। উনি তো মিটিং এ ছিলেন আমি যখন এসেছি। কথাই তো হয়নি। কি বলবে…!”
শায়ান তালুকদার মেয়ের ভিতরের অস্থিরতাটকু মাপলেন। মেয়ের কন্ঠে স্বাভাবিকতার রেষ ধরেও কিছুটা অভিমান পেল মনে হলো। আগ্রহ নিয়ে আবারও জিজ্ঞেস করলো,
“আসার পর থেকে মিটিং এ ছিলো? ”
“উঁহু, সন্ধ্যা থেকে। ”
“তুমি কোথায় ছিলে তখন? তোমায় একা রেখে গিয়েছিলো স্যুটে? তাই মন খারাপ?”
শুভ্রতা তখনও মাথা নাড়িয়ে না জানালো। নিজের অজান্তেই অভিমানে ফুলে উঠা ঠোঁট দুটো নিয়ে রাস্তার ধারে চেয়ে বললো,

“উঁহু, সাথেই নিয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু…কিন্তু সেখানে গিয়ে মিটিংয়ে ব্যাস্ত হয়ে গিয়েছে। খুব গুরুত্বপূর্ণ কি না!”
শায়ান তালুকদার মেয়ের বাচ্চামোতে মনে মনে হাসলেন। মেয়ে তার অভিমান করে তার সাথে চলছে। এতে অবশ্য ভালোই হয়েছে। মেয়েকে একটা দিন নিজের কাছে রাখলো! এমনিতেও তো কোয়ার্টার টা খালিই পড়ে আছে। আজ সেখানেই নিয়ে যাবে মেয়েকে। এমনিতে সবই গুছানো, শুধু এখন থাকা হয় না এই যাহ।
“আপনি বাবার সাথে থাকেন আম্মা। বাবা আপনার জন্য ছুটি নিবো না-হয় দু’দিনেন জন্য? সব ঘুরিয়ে দেখাবো৷ হু? মন খারাপ করে না, ঠিক আছে?””
শুভ্রতা বাবাকে মানা করে দিলো এমনটা করতে। মনে মনে রাগ অভিমান দুঃখ সব নিয়েও মেয়েটা সংকিত। চলে তো এসেছে বাবার সাথে রাগ করে কিন্তু এর পর কি হবে তা তো সে ভাবে নি। কি হবে লোকটা জানলে? না-কি ব্যাস্ততায় তার কথাও ভাববে না? এমনিতেও তো আনতে চায়নি, সে না থাকলেই বা কি?
অভিমানী মেয়েটার আবারও চোখ ছাপিয়ে জল গড়ালো নিঃশব্দে। নিজের এ পুচকে মনে এতো অভিমান যে কিভাবে জরো হয়েছে সে নিজেও জানে না। শুধু জানে, এ লোকটার ছোট ছোট জিনিসও তাকে অনেক পুড়ায়। অনেক কষ্ট দেয়। একদম না মানার মতো। এই কষ্টের আগে পিছে সে আর কিছুই ভাবতে পাড়ে না। কিছুই না।

স্যুটের সামনে মেহরাদ দরজা আনলক পেলো। মেয়েটার বেখেয়ালিতে মুখশ্রী গম্ভীর হলো কিছুটা। ভিতরে ঢুকে কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে ‘শুভ্রা’ বলে ডেকে উঠলো।
নিজের ডাকের শব্দ নিজের কানেই বাড়ি খেলো যেন। উত্তর না পেয়ে ভাবলো, মেয়েটাকি অভিমান নিয়ে ঘুমিয়ে গেলো না খেয়েই? এগিয়ে গেলো আগে নিযের রুমের দিকেই। রুম খালি। কদম বাড়ালো পাশের রুমের দিকে। ভিতরটা হটাৎই বেচেইন, অস্থির। ওই রুমেও সব ফাকা দেখলো। একে একে ওয়াশরুম পুল সাইড সব দেখলো রুমের পাশের। কোথাও নজরে এলো না তার শুভ্রা।
জিব দিয়ে গাল ঠেললো ছেলেটা। ভিতরের অযাচিত অস্থিরতাকে প্রাধান্য না দেওয়ার চেষ্টা মূলত। আবারও কদম বাড়ালো নিজের রুমের দিকেই। উদ্দেশ্য আরেকটু ভালো করে দেখা। কদমে অস্থিরতা। কণ্ঠে তেজ মিশ্রিত হলো,
“শুভ্রা? শুভ্রা? কোথায় তুই? ওয়াশরুমে? ”

নিজের রুমের ওয়াশরুম চেক করেও ওঁকে পেলো না মেহরাদ। নিজের শক্ত পোক্ত বলিষ্ঠ দেহে কম্পন অনুভব করলো সে। ভিতরে নাম না জানা ভয়। মেয়েটাতো অল্পতেই রিয়েক্ট করে বসে বেশি। কোথায় এখন? কই ও?
“শুভ্রা? শুভ্রা? কোথায় আছিস? বের হচ্ছিস না কেন? আমি চলে এসেছি তো? বের হ তাড়াতাড়ি। খুঁজে পেলে কিন্তু মা/র খাবি আমার হাতে!”
কোন সাড়াশব্দ এলো না। মেহরাদ দু হাতে মুখ ঘষলো। মাথার উপরিভাগের চুল গুলো শক্ত হাতে পিছনে ঠেলে চোয়াল শক্ত করে খিঁচে রইলো। অস্থির সে ছটফট করে উঠে বুক ফুলিয়ে শ্বাস ছাড়লো। সম্পূর্ণ মুখশ্রী লাল হয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যে। ব্যাকুলতায় তার হৃৎস্পন্দন থমকে যাওয়ার মতো অবস্থা।
পাইচারি করে ফোনটা খুজলো। মেয়েটার কাছেই তো ছিলো। কই এখন? রাসেল সাহেবকে কল করবে। গাড়ি বের করতে বলবে। আর কি করবে? কি করবে? কোথায় মেয়েটা? তার জান নিয়ে শান্তি পাবে? এরকম না করে বুকে ছুড়ি চালিয়ে দিলেই তো পারে! তার মৃত্যুটা এতে আছান হতো না কিছুটা?
“ওহ গড!” নিজের মোবাইলটা খুঁজে পেলো বিছানার উপরেই মেহরাদ। বাহিরে তুমুল বর্ষনের শব্দ পাচ্ছে সে। অশান্ত প্রকৃতি এই মূহুর্তে বাহিরে। কিন্তু তার চেয়েও বেশি অশান্ত নিজের ভিতরটা। অন্তঃস্তলের ব্যাকুল হাহাকার গুলো বাহিরের ঝড় তুফানকেও যেন ছাপিয়ে যাচ্ছে।
মোবাইল হাতে কল লিস্টে ঢুকেই মেহরাদ শায়ান তালুকদারের কল দেখলো। সেই সাথে ছোট্ট টেক্সট।

“মেয়েতো বাবার সাথে চলে যেতে চাইছে জামাই সাহেব। আমার মেয়েকে ব্যাস্ততা দেখায়! এ জামাইয়ের কাছে মেয়ে দিবো না আর। বিদায়।”
মেহরাদ শব্দ করে নরম তুলতুলে বিছানায় বসে পড়ল। তার মানে মেয়েটা চাচ্চুর সাথে চলে গিয়েছে? কেন গিয়েছে? এই সামান্য কারণে? তার ঠিক কি করা উচিৎ এই মূহুর্তে?
চোখ দুটো টকটকে লাল মেহিরাদের৷ স্যুট ছেড়ে বের হলো। সেদিনের মতো আজও লিফট নিলো না। ব্যাকুল অগ্রাসি কদমে সিড়ি বেয়েই ঝড় তুলে নেমে যেতে থাকলো। তার পিছু পিছু রাসেল সাহেব।
“স্যার, আজ না গেলে হয় না? আগামীকাল গিয়ে নিয়ে আসবেন না হয় ম্যাম কে? আমিই না-হয় নিয়ে আসবো? একদম ভোরে? বাহিরে তো ঝড় বইছে স্যার! কিভাবে যাবেন? রোড ব্লক পড়লে? ”
টকটকে চোখ দুটো নিয়ে নামতে নামতে শীতল দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো মেহরাদ। কথা গুলিয়ে ফেললো রাসেল সাহেব। স্যারকে দেখে বেচারা মনে মনে ভয়ে কুকড়ে আছে। এই বড়লোকদের কখন কি হয়! অল্পতেই দুনিয়া তোলপাড় করে ফেলে। আর ম্যামটাও না…

মেহরাদ লোকেশন দেখে নিলো একবার। ভাগ্যিস মেয়ের মতো বাবাটাও জ্ঞানহীন না। আর হবেই বা কি করে? তাদের তালুকদার বংশের না? তার তাও মনে হয় এই গবেট টা তার চৌদ্ধ গোষ্ঠীরও কিছু হয় না। এতো বেকুব!
রাসেল সাহেবকে ফেলেই সাই সাই করে গাড়ি নিয়ে ছুটলো মেহরাদ। তুমুল বর্ষনে চারদিকে তখন বৃষ্টির ঝপঝপ শব্দ আর বাতাসের তীব্র শব্দ। গাছ গুলো এদিক সেদিক হেলে পড়ছে৷ ক্ষনে ক্ষনে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছেও। তবে বে সেসব কিছুই ওঁকে আটকালো না।চুম্বুকের ন্যায় ব্যাকুল ভাবে টেনে নিয়ে যাচ্ছে নির্দিষ্ট এক লোকেশনের দিকে। চোখ মুখ অস্বাভাবিক ভাবে শক্ত, শীতল, গুমোট হয়ে আছে। শরীর আধভেজা হয়ে গিয়েছে পার্কিং লট থেকে গাড়িতে উঠতে উঠতেই। তাই নিয়েই গাড়ির মিটারের পারদ শ’য়ের উপরে উঠিয়ে ছুটছে কোথাও…

শায়ান তালুকদার মেয়ের জন্য নিজ হাতেই চটপট কিছু খাবার তৈরি করে দিলো। নিজেও খেতে বসলো। শুভ্রতা মানা করেও আটকাতে পাড়েনি বাবাকে। অগ্যতা নিজেও বসেছে বাবার সাথে। গলা দিয়ে খাবার নামছে না। কিছুক্ষণ ঘেটে ঘুটে উঠে পড়লো। বাবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিজের জন্য বরাদ্দকৃত রুমে চলে গেলে।শায়ান তালুকদার মনে মনে ভাতিজাকে দোষলো। আহারে, তার মেয়েটা কিভাবে মন মরা হয়ে আছে! এই মেয়েটা ছোট থেকেই একটার পর একটা সহ্য করে যাচ্ছে। এখনো যাচ্ছে। মেয়েটা শান্তির মুখ দেখবে কবে? নিজে বাবা হয়েও মেয়ের শান্তি কিনে দিতে পাড়েনি সে। পাড়েনি নিজের ভালোবাসার মানুষটার জন্য। তার মেয়েটা ছোট থেকেই অভাগী। আর নিজেরাই এর সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে।

অপরাধ বোধে বুক ভারী হয়ে আসলো ওনার। নিজেদের ভুল ভ্রান্তি গুলো জানলেও কখনো মেয়েটার মাথায় হাত ভুলিয়ে ক্ষমা চাওয়া হয়নি। কাছে টেনে বুকে জড়িয়ে আদরের চাদরে মুড়িয়ে নেওয়া হয়নি। ছেলের মৃত্যুতে স্ত্রী পাগল পাগল অবস্থা। মেয়েকে যখন দেখে তখন মারে বকে অভিষাপ করে, লানত করে। কুশল না পেয়ে মেয়েজে ফেলেই স্ত্রীকে নিয়ে ছুটে চলে আসলো চট্টগ্রাম কোয়ার্টারে। ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে রেখে সুস্থ করলো। মেয়েকে রেখে আসলো দূরে, বাড়িতে। দীর্ঘ ছয়টা বছর মেয়েটা মা ছাড়া বাবা ছাড়া থেকে গেলো। ছোট ছোট আহ্লাদ করে কথা বলা মেয়েটা নিশ্চুপতায় মিশে গেলো আস্তে আস্তে। স্ত্রীকে রেখে ডাকায় গেলে মেয়ে দূর দূরে থাকতো। ভয় পেতো বাবাও না দোষারোপ করে মায়ের মতো। মেয়েটা কতটাই কষ্টে গেলো। মেয়েটা অভিযোগও করেনি কখনো। অথচ, অল্পতেই ছেলেটার প্রতি কতো অভিমান মেয়েটার! কেন? মেয়েটাও কি খুব বেশি ভালোবাসে ছেলেটাকে তাই?

সেবার এক্সিডেন্টের পর মেয়ের মুখে মুক্তির কথা শুনে ভাতিজাকে মেয়ের থেকে একদম দূরে থাকতে বলে এসেছিলো সে। তার মেয়েকে বুঝেনা, কষ্ট দেয় এমন কাউকে সে মেয়ের পাশে মানবে না কতো বলে শাশিয়ে আসলো। আর সেই মেয়ে আজ অল্পতেই ছেলের উপর কি নিদারুণ অভিমান চেপেছে মনে! একদম বাসা ছেড়ে বাবার সাথেই চলে এসেছে! তিনি হাসলেন, মৃদু হাসি।
উঠে সব গুছিয়ে রেখে দিলেন। বাহিরের তুমুল বৃষ্টিতে কখন লোডশেডিং হয় বলাও যায় না। কিছুক্ষনের মধ্যেই ফোনে কল আসলো। মেহরাদের কল। হেসে রিসিভ করলো,
“কি ব্যাপার ভাতিজা? এতো রাতে কল?”
“মেয়ে কোথায়?”
“আপনি কোথায় ভাতিজা সাহেব?” ঠাট্টা করে বললো শায়ান তালুকদার। ছেলেকে লজ্জা দেওয়ার সামান্য প্রয়াস। ছোট থেকেই মেহরাদের সাথে তার বন্ডিং অন্যরকম ছিলো। তাইতো গোপন বিয়ের কথা শুনিয়ে মেয়ে ভুল কাউকে বেছে নিয়েছি সেই দুশ্চিন্তা মনে কখনোই উঁকি দেয়নি। কখনোই না।

“তোমার বাসার নিচে।”
শায়ান তালুকদার চিন্তিত হলেন। ব্যাস্ত স্বরে বলিললেন,
“বাসায় আয়। বাহিরে তো প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। ”
“উঁহু আসবো না। ওঁকে আসতে বলও। কল রিসিভ করতে বলো। ”
শায়ান তালুকদার মেয়ের রুমের কড়া নেড়ে ডেকে ভিতরে গেলেন। শুভ্রতা বালিশ জড়িয়ে বসে ছিলো। বাবাকে দেখে সোজা হয়ে বসলো। ফোলা ফোলা লাল চোখ দুটো নিয়ে বাবার দিকে প্রশ্নাত্মক চোখে চেয়ে রইলো।
“মোবাইল তুলছো না কেন?”
শুভ্রতা বুঝলো না কিছু। কপালে ভাজ ফেললো। শায়ান তালুকদার আবার বললেন,
“মেহরাদ কল দিচ্ছে। কল না-কি তুলছো না? মোবাইল কই তোমার মা?”

শুভ্রভ্রতার এতক্ষনে মোবাইলের কথা খেয়াল হলো। পার্স খুঁজলো। সেখানেই মোবাইল এখনো। বের করে দেখলো সাইলেন্ট হয়ে আছে। আবারও ভাসলো মেহরাদের মোবাইল নম্বর। বাবার দিকে তাকালো নিচু মস্তকে। শায়ান তালুকদার মেয়ের ইতস্ততভাব বুঝে হেসে রুম ছেড়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বললো,
“তোমরা চলে যাওয়ার আগে বাবা আবার তোমার সাথে দেখা করবো, হু? তোমাকে নিয়ে ঘুরবো সেদিন কেমন? ছেলেটা নিচে দাঁড়িয়ে আছে। ” বলেই তিনি চলে গেলেন রুম ছেড়ে।
শুভ্রতার মস্তিষ্ক যেন কাজ করা বন্ধ করে দিলো। নিচে দাঁড়িয়ে আছে মানে? এখাবে এসেছে? কখন আসলো? জানলো কিভাবে?

মোবাইল ধরে রাখা হাতটা কেপে উঠলো। বাহিরের বজ্রপাতের সাথে তার ভিতরটাও ধ্বক করে উঠলো। ছুটে গেল রুমের সাথে লাগোয়া বারান্দায়। এমন তুমুল বর্ষনে এখন লোডশেডিং হয়নি আশ্চর্যই বটে। নিচটা অন্ধকার। মধ্যরাত প্রায়, আবার বৃষ্টি হচ্ছে তুমুল ভাবে। চারদিকেই আলোহীন বললে চলে। বৃষ্টির সাথে সাথে চমকানো বিদ্যুৎ এ শুভ্রতা দেখলো কানে মোবাইল চেপে দাঁড়িয়ে মেহরাদ। গাড়ির সামনে। আতঁকে উঠলো মেয়েটা। খাঁমচে ধরলো মেয়েটা বারান্দার গ্রিল। থরথর করে কেপে উঠা আঙুলে কল রিসিভ করে কানে ঠেকালো ফোন। উর্ধশ্বাসে বললো,
“বি..বিজছেন কেন? বাসায় আসেন? আল্লাহ অসুস্থ হয়ে যাবেন তো? কি বৃষ্টি হচ্ছে! বজ্রপাত হচ্ছে তো!” বলতে বলতেই কেঁদে উঠলো মেয়েটা।
মেহরাদের দৃষ্টি স্থীর। ভিজে চুপচুপে বলিষ্ঠ দেহ। চেপে আষ্টেপৃষ্টে লেগে আছে গায়ের শার্ট। কানে একিই দাম্ভিক ভঙ্ঙ্গিতে ফোন চাপা। বৃষ্টির তুড়নে চোখের পাতা বুদে আসতে চাইছে। কপাল লেপ্টে থাকা চুল গুলো চোখ পর্যন্ত এসে ছুয়েছে।
একই দাম্ভিক স্থীর ভঙ্গিতে মেহরাদকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শুভ্রতা হু হু করে কেদে উঠলো অজানা আশংকাতেই। আর্জি করলে,

“আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন না? গাড়িতে ঢুকুন নয়তো বাসায় আসুন। শুনছেন? ”
এখনো একিই নিশ্চুপতা। শুভ্রতা পাগল পাগল হলো। লোকটা তার কথাই কানে নিচ্ছে না। টু শব্দও করছে না। সে ছুটলো বাবার রুমের দিকে। শায়ান তালুকদারের রুমের দরজা খোলাই ছিলো। শুভ্রতা গিয়ে কোনরকমে বললো,
“বাবা মেহরাদ ভাই… এসেছে। আমি যাই, হে? ” মেয়েটার কন্ঠে কান্নার তোপে ভেঙে এসেছে।
শায়ান তালুকদার উঠে মেয়ের মাথায় হাত ভুলিয়ে দিলেন। সুন্দর করে বললেন,
“ভালোবাসায় রাগ অভিমান খুব স্বাভাবিক মা। কিন্তু দূরে চলে যাওয়া খুব বোকামি। এই বোকামি দ্বিতীয় বার না, হু? বাবার বাড়িও না, ঠিক আছে? ”
শুভ্রতা বাবার অনুমতি পেয়ে গিয়েছে বুঝে এক ছুটে রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেল, পর পর মেইন ডোর খুলে বের হয়ে গেলো দৌড়ে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে উপস্থিত হলো মেহরাদের গাড়ির সামনে। বৃষ্টির তোপ তখনো একই ভাবে চলমান।
মেহরাদ শুভ্রতার হাপিয়ে যাওয়া কান্না মিশ্রিত মুখশ্রী খানা দেখলো। নিঃশব্দে দেখেই গেলো দু মিনিট। শুভ্রতা মেহরাদের ভারী নিরবতায় নিজেকে কাঠ গোড়ার আসামি মনে করলো। ফুপিয়ে উঠলো। দু হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরতে গেলো। মেহরাদ খুব সাবলীল ভাবে এড়িয়ে গিয়ে গাড়ির দরজা খুলে দাড়িয়ে রইলো। শুভ্রতার কান্নার তোর যেন হুর হুর করে বাড়লো বৃষ্টির সাথে। বোকামি করে ফেলেছে। সে তো সে সবসময়ই করে। কিন্তু আজ বোধহয় অনেক বেশি! লোকটাকে কিভাবে মানাবে? ক্ষমা করবে তো তাকে? কতদিনে করবে?
সময় ব্যায় না করে গাড়িতে উঠে বসলো শুভ্রতা। তারপর মেহরাদও উঠে বসলো। গাড়ি ছুটলো তুমুক ঝড়বৃষ্টি ছাপিয়ে। কত সাড়ি সাড়ি এলোমেলো গাছ ফেলে এগুলো! কেউ খেয়াল করলো না।

ভিজে চুপচুপে গায়ে স্যুটের সামনে এসে দাড়ালো মেহরাদ। তার পিছু শুভ্রতা। লোডশেডিং হয়েছে। চারদিকে অন্ধকার তলিয়ে। জেনারটরেও বোধহয় প্রবলেম হয়েছে। ডোর লক খুলে ভিতরে প্রবেশ করে দেখলো, ক্যান্ডেল জালানো। অবাক হলো না মেহরাদ। রাসেল সাহেবের কাজ হতে পারে।
শুভ্রতাও পিছু পিছু ঢুকলো। এখনো চোখের জল ফেলছে সে। গায়ের ভিজা শুকিয়ে যাওয়া ওড়না দিয়ে নাক মুছে লাল বানিয়েছে। ছিলেও গিয়েছে বোধহয় কিছুটা। গাড়িতে সাড়া রাস্তা কেঁদেছে। মেহি রাদ ভাই একটা বারের জন্যও কিচ্ছু বলেনি। স্বান্তনাও দেয়নি।
এতবড় অকেজ করেও মেয়েটা স্বান্তনা খুজে, কি বোকা!

এই হিমশীতল করা পাহাড় সমান রাগ শুভ্রতা কিভাবে সামলাবে? কিভাবে ক্ষমা চাইবে লোকটার কাছে?
মেহরাদ ত্রস্ত পায়ে হাতের ঘড়ি গাড়ির চাবি সব ছুড়ে ছুড়ে ফেলে রুমের দিকে এগুচ্ছে। নিজের ভিতরের আগ্নেয়গিরির ন্যায় স্ফুলীঙ্গকে এগুলোর দ্বারাই প্রকাশ করছে সে। শুভ্রতা ভয়ে জমে যাওয়া পা নিয়েই মেহরাদের পিছু পিছু রুমে ঢুকলো। রুমে দুটো কেন্ডেল জ্বালানো। মৃদু অন্ধকারাচ্ছন্ন আলো সেই সাথে খোলা জানালা দিয়ে শীতল বৈরি হাওয়া মৃদু। কেন্ডেল গুলো মিটি মিটি করে কেপে উঠছে বাতাস লাগার সাথে। বিদ্যুৎ চমকানোয় আলোকিত হচ্ছে রুম কিছুটা একটু পর পর।
শার্টের বোতাম খুলে শার্ট ছুড়ে ফেললো ফ্লোরে মেহরাদ। বৃষ্টির পানিতে ভেজা গা শুকিয়ে শরীরে চক্রাকারে তাপমাত্রা বেড়ে চলছে। সমস্ত মুখশ্রী লাল হয়ে আছে। চোখ দুটোও দৃষ্টি মেলানো দায়। একদম টকটকে লাল হয়ে আছে।
শুভ্রতা পায়ের কাছে এসে পড়েছে শার্ট। সে দূরে সরে গিয়ে ফুপিয়ে উঠলো। তার গায়ে এখনো ভিজে যাওয়া কুর্তি। মাথা নিত করা। ফুপিয়ে ফুপিয়ে বললো,

“বকছেন না কেন? বকেন? রাগ ঝাড়েন? তা-ও এভাবে চুপ থেকে শাস্থী দিবেন আমায় দয়া করে। আমি তো বোকা, সবসময়ই আপনাকে রাগীয়ে দেই। ভুল করি। পাগলের মতো এটা সেটা করে ফেলি। আপনি বকেন আমায়। রাগ ঝাড়েন। তবুও এভাবে চুপ করে থাকবেন না প্লিইজ। আমার..আমার ভয় করছে তো আপনায়…. আহহহ্…”
বাক্য শেষ হওয়ার আগেই এক জোড়া ক্ষিপ্ত বলিষ্ঠ হাত দেয়ালের সাথে চেপে ধরেছে শুভ্রতাকে। কোন দিন গায়ে হাত না তোলা মেহরাদ শক্ত করে চেপে ধরেছে শুভ্রতার পিছনের গোছার চুল। আরেক হাত বাহুতে চেপে দেয়ালের সাথে চেপে ধরেছে। চাপ এতটা প্রয়োগ করা যেন আঙুল গুলো দেবে যাবে নরম তুলতুলে ছোট্ট বাহুটার ভিতরে।
হটাৎ ধাক্কায় ভয়ে শুভ্রতা চেচিয়ে উঠলো। মাথার পিছনের দিকের ব্যাথায় অঝোরে চোখের পানি ঝড়ছে। তবুও মেয়েটা ছাড়াতে চাইলো না। এটা তার প্রাপ্য। সে শুধু নিজের ঝির্নশির্ন ঠান্ডায় জমে যাওয়া হাত দুটো মেহরাদের সুউচ্চ দু কাধে রাখলো কোন রকম। আর রাখতেই মেহরাদের শরীরের তীব্র তপ্ততা উষ্ণতা অনুভব করলো। নিভু নিভু আলোয় চোখের জল নিয়েই মেহরাদের দিকে তাকিয়ে সাথে সাথেই চোখ সড়িয়ে নিলো। তাকানো যাচ্ছে না চোখ দুটোয়। এতটাই লাল হয়ে আছে। লোকটার গায়ে জ্বর বাসা বাধছে ।

মেহরাস শ্বাস ফেলছে ঘনঘন। দু পাশের চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে আছে মেয়েটার দিকে। মেয়েটাকে ঠিক কিভাবে এই অপরাধের জন্য ট্রিট করবে সে মাথাতেই আনতে পাড়ছে না৷ ভিতরের রোষানল প্রকাশ করতে না পেরে মেহরাদ পিছনের হাতের থাবা আরও শক্ত করলো
মেয়েটা চোখ খিচে নিলো সাথে সাথেই। কিন্তু টু শব্দও করলো না। তা দেখে মেহরাদের রাগ আরও বাড়ল। ভালো সাজা হচ্ছে এদিকে? সে কি শাস্তি দাতা, যে মেয়েটা শাস্তি গ্রহণ করছে বিনা শব্দে? দাত চেপে হিসহিসিয়ে বললো,
“তোকে কি করা উচিৎ বল? কি করা উচিৎ? ”
এতক্ষণ পর মেহরাদের কন্ঠঃ স্বর পেয়ে শুভ্রতার কান্নার বেগ বাড়ালো। নাকের জল চোখের জল নিয়ে বিলাপ করে মেহরাদের উন্মুক্ত কাধ দুটোই দু হাত আরও ভালো ভাবে চেপে ধরলো,
“যা ইচ্ছে করুন। শুধু এভাবে চুপ থাকবেন না দয়া করে। আমায় মাফ করতে হবে না। শাস্তি দিন। তবুও কথা বলুন..”

“এই এই! তোর কি মনে হয় আমাকে হ্যাঁ? মানুষ না আমি? মানুষ মনে হয় না আমায়? সবসময় পাগলের মতো দৌড়াস কেন আমায় দিয়ে? বুঝবি কবে বল? কবে বড় হবি? কবে….” চেচিয়েই শুভ্রতাকে ধাম করে ছেড়ে দিয়ে দেয়ালে দু চারটে ঘুষি মেরে দিলো। হাতের চামড়া থেতলে গেলো। বাহিরের বজ্রপাতের সাথে তাল মিলিয়ে শুভ্রতা বিকট চিৎকার করে হাতটা নিজের বুকে আগলে নিতে চাইলো। মেহরাদ দিলো না। সড়িয়ে দিতে চাইলো ওঁকে। শুভ্রতা পাগলের মতো ক্ষমা চাইতে চাইতে মেহরাদের বুকে সেটে গেলো। আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরলো মেহরাদকে। ভয়ে, কান্নার তোপে মেয়েটা থরথর করে কাঁপছে। মেহরাদের উষ্ণতায় নিজের শীতল দেহেও উষ্ণতা অনুভব করলো কিছুটা। পরে রইলো উন্মুক্ত বক্ষপিঞ্জিরায়৷
সময় নিয়ে মেহরাদের মস্তিষ্কের নিউরন গুলো ধপাধপ্ থামাচ্ছে। রিল্যাক্স হচ্ছে যেন কিছুটা। এদিকে শুভ্রতা কি যেন বারবার বিরবির করিছে। বারবার বলছে, আর করবো না। আর করবো না। আর করবো না।
মেহরাদ শান্ত স্থীর হয়ে দাড়াতেই মিনিট দশেকের পর শুভ্রতা মাথা তুলে চাইলো লোকটার দিকে। আবারও চোখ উপচে জল গড়াচ্ছে। নাক টেনে ঠোঁট দুটো চাপলো। কাপা কাপা পা’য়ের আঙুলে ভর দিয়ে নিজেকে একটু উচু করে মেহরাদের চোয়ালে দু’হাত ছুয়ালো। ছোট্ট হাত দুটো দু গালে চেপে গলা দলামথিত কান্না নিয়ে বললো,
“আর হবে না। সত্যিই হবে না। এরপরও এমন করছে কেটে গঙ্গায় ভাসিয়ে দিবেন। আমার মতো ম্যান্টালদের বেচে থেকে…. ” আর বলতে পাড়লো না নেয়েটা।

চলতি বুলি বন্ধ হয়ে গিয়েছে এক জোড়া তপ্ত ক্ষিপ্র ওষ্ঠের আক্রমনে। পা দুটো জমিনে লেগে আরও কয়েক কদম পিছিয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যে। ভেঙে আসতে চাইছে। কিন্তু একটা বলিষ্ঠ হাত তৎক্ষনাৎ কোমর পেচিয়ে ধরেছে। আগ্রাসী ক্ষিপ্ত চুমুর তুড়নে নিশ্বাস আটকে আসছে মেয়েটার। লোকটা যেন ভিতরের সমস্ত রাগ, ঝাল, কমলার কোয়ার ন্যায় কোমল জুসি ঠোঁট দুটোয় ঝাড়ছে। নোনতা স্বাদ পেলো মেয়েটা সেই সাথে তীব্র জ্বলন। পলিশ করা স্টাইলিশ নখ জোড়া দাবিয়ে দিয়েছে কাধে সেদিকে খেয়াল নেই মেয়েটার।
ছাড়া না পেয়ে মেয়েটা অস্থির হলো। শ্বাস নিতে পাড়ছে না সে। দু হাত কাধ বেয়ে মাথার কাছে নিয়ে গেলো। চুল গুলো টেনে ধরলো স্বজরো। যদি হুশ ফিরে লোকটার!

মেহরাদ ছাড়লো শুভ্রতাকে। নিশ্বাস নিতে দিলো মেয়েটাকে। হাপরের মতো হাপাতে হাপাতে থাকা মেয়েটার ক্ষতবিক্ষত ওষ্ঠ জোড়ায় বৃদ্ধা আঙুল চেপে হিসহিসিয়ে হিংস্র স্বরে আওড়াল,
“সাহস হয় কি করে এ কথা বলার? ভুলেও এ কথা আরও একবার শুনলে এই ঠোঁট দুটো আস্ত রাখবো না। ”
শুভ্রতা বড়ো বড়ো শ্বাস টেনে মাথা দুলিয়ে সম্মতি দিলো অর্থাৎ সে আর বলবে না। কিন্তু মেহরাদ তো এতে সন্তুষ্ট না। গাল চেপে বললো,

“গলায় সাউন্ড নেই? মুখে বল।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ আর বলবো। কিচ্ছু বলবো না এসব। কক্ষনো না।”
মেহরাদ ছেড়ে দিল ওঁকে। দাঁড়িয়ে রইলো ওর সামনেই দূরত্ব শুধু তিন চার সেন্টিমিটারের। মেয়েটার বড় বড় নিশ্বাস তার উষ্ণ উন্মুক্ত বুকে এসে আছড়ে পড়ছে। ভিজে লেপ্টে যাওয়া কুর্তিটা বক্ষবিভাজের সাথে সেটে গিয়ে নিখুত সুন্দর্য ফুটিয়ে তুলেছে যেন চোখ দুটোর সামনে।
নিজেকে মিনিট খানেকে শান্ত করে মেহরাদের ক্ষিতবিক্ষত হাতটা চেপে ধরলো শুভ্রতা। নিজের ক্ষত হওয়া ঠোঁটের কথা সে ভুলেই বসেছে। টেনে নিয়ে গেলো লোকটাকে নরম বিছানার কাছে। বেড সাইড টেবিলের পাশে মোমবাতি রাখা। সেখানটাতেই বসালো। হাতটা মোমবাতির কাছে নিয়ে দেখলো অনেকটা জায়গা জুড়ে লাল হয়ে আছে আর কিছু কিছু জায়গায় ফেটে রক্ত কনিকা উঁকি দিয়ে আছে। মেয়েটা ক্ষিতবিক্ষত ঠোঁট নিয়েই সেদিনের মতোই আবারও পাগলের চুমু খেলো পার্থক্য সেদিন ছিলো মুখে আজ হাতে।

ফ্লোরে বসে হাতটা নিজের অর্ধ শুকানো ওড়না দিয়েই মুছিতে নিলে মেহরাদ তা ছুড়ে ফেলে দিলো হাতে পেচিয়ে। ওড়নার অবস্থান হলো অন্ধকার ফ্লোরে। শুভ্রতার কান্না বাড়ল। আবারও নাকটা ফুলে ফেপে উঠলো ফুপানোর তোপে। মেহরাদের হাতটা বুকে জড়িয়ে শুধালো,
“আপনার রাগ কমানো যাবে কিভাবে? এই যে দেখেন? এগুলো কতটা ক্ষিতবিক্ষত করেছেন। আর কিভাবে শাস্তি দিয়ে রাগ কমাবেন বলুন? যা করার করুন। শুধু রাগ অভিমান শেষ করুন। সেবারের মতো এতো দূরে থাকতে পাড়বো না আপনায় ছেড়ে। আজকের মধ্যেই সব শেষ করুন। দরকার হলে এখানে আরেকটু ক্ষত করুন তবুও আজই শেষ করুন এ রাগ। ” বাচ্চাসুলভ হয়ে বললো মেয়েটা, নিজের ঠোট দেখিয়ে।
মেহরাদ মেয়েটাকে হেচিকা টানে কোলে এনে ফেললো নিচ থেকে। হাতে টান পড়েছে, হাত ঝাড়া দিয়ে তা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলো। আবারও পেচিয়ে ধরে কোলে বসালো ভালো করে। দু পায়ে পেচিয়ে ধরলো মেহরাদের কোমর মেয়েটা, কোন কুশল না পেয়ে। স্তম্ভিত চেহারা মেয়েটার। মেহরাদ ওর কুর্তির পিছনের চেন টেনে খুলতে খুলতে বললো,

“,এতটুকু ক্ষততে রাগ কমবে না আমার। আজকের মধ্যে রাগ কমাতে চাইলে আরও ক্ষত করে রাগ ঝাড়তে হবে। তুই সেটা চাইছিস? আজকেই সব রাগ শেষ করে দিবো?”
অবুঝ মেয়েটা উপর নিচ মাথা নাড়াল দ্রুত। সে আজকেই চায় সব শেষ করতে। কিন্তু মেহরাদের চেন খোলার কারণ বুঝলো না। শিরশির করে উঠলো দেহখানা। শীতলতা ছেড়ে দেহ এখন উষ্ণতায় মুড়ে যাচ্ছে। তবুও শীত শীত করছে।
মেহরাদ কুর্তি টেনে কোমর পর্যন্ত নিচ অব্দি নামিয়ে দিলো। হাতের ছোয়া নাশকারী। শুভ্রতার নারী সত্তাকে যেন শুষে নিতে চাচ্ছে দু হাতের আজলায়। অন্ধকারের মধ্যে নিভু নিভু আলোয় তবুও দেখলো মেহরাদের চোখ জোড়া শুভ্রতা। এ চোখে হিংস্রতা নেই না আছে শাস্থি দেওয়ার আকাঙ্খা। তাহলে কি এ চোখ দুটোয়? কেমন নেশাগ্রস্ত, আফিম মেশানো! শুভ্রতার পুরো নারী সত্তা থরথরিয়ে কেপে উঠলো যখন মেহরাদের আঙুলের ছুয়া অনুভব করলো ইনারের স্ট্র‍্যাপে।

বাহিরের তুমুল বর্ষনের সাথে তাল মিলিয়ে রুমের ভিতরেও ঝড় মাতাল করা অনুভূতিরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। উষ্ণতা বাড়লো দুটো দেহের। মেহরাদ অশান্ত প্রকৃতির ন্যায় নিজেও অশান্ত হলো। মেয়েটাকে কোলে নিয়েই ঘুরে নরম তুলতুলে বিছানায় ফেললো। দু’জনেই সাথে সাথে দেবে গেলো কয়েক ইঞ্চি। দু’জনের গরম নিশ্বাসে বেসামাল অস্থিরতা। শুভ্রতার নারী মন যেন আচ করে ফেলেছে কি হতে যাচ্ছে তা ভেবে। তলপেটে অজস্র প্রজাপতিরা ডানা ঝাপটাতে শুরু করলো। উন্মাদ মেহরাদ অজস্র চুম্বনে ভড়িয়ে তুলছে মেয়েটাকে। একসময় হাপিয়ে গিয়ে মেয়েটা থামাতে বললো,
“উমমমম, একটু স্থীর হোন। রিল্যাক্স। রিল্যাক্স। জ্বরের ঘোরে পাগলামো করছেন… ” কোন রকমে আওড়াল মেয়েটা।

“নোপ। ইটস নট মেডনেস, ইটস কল্ড লাভনেস। ইটস দ্যা ও-য়ে হাও আই লাভ। মাই ওন ই/রোটিক ও-য়ে….” বলেই মেয়েটার হাত দুটো মাথার উপরে চেপে ধরলো। রাশভারি স্বরে হুশিয়ারি দিলো,
“ডিস্টার্বনেস আমার একদম পছন্দ হচ্ছে না, জান..”
মেয়েটার নিশ্বসের গতি যেন আরও বাড়ল। নিশ্বাসের সাথে দেহের কোমল সত্তার ভাজ কেপে কেপে উঠছে মেয়েটার । মেহরাদের উন্মাদনা আরও বাড়ল। নাক ডুবালো সেথায়। শ্বাস টেনে বললো,
“আরও ক্ষত করতে চাই। নিজের ওষ্ঠ দ্বারা উন্মোচন করতে চাই, আমার ভালোবাসার নারী অঙ্গের রহস্য। সম্পূর্ণ নিজের করে নিতে চাই। আজ এই মূহুর্তে।” দাত বিধিয়ে আবারও শুভ্রতার দিকে চাইলো। শুভ্রতার চোখে জল, লজ্জার আবরণ সেই সাথে নীরব সম্মতি যেন। মেয়েটা কাপা কাপা হাতে মেহরাদের কাধ টেনে এনে নিজেকে মেহরাদের বক্ষে আড়াল করতে চাইলো।

আদুরে বোকা বউয়ের নীরব সম্মতি পেয়ে মেহরাদ খেয় হাড়ালো। দলামথিত হলো নিজেদের দেহের পরিহিত পোশাক গুলো অন্ধকার ফ্লোরে। নরম বিছানার বালিশ কম্ফর্টার একে একে সব উলট পালট হলো তাদের উত্তাল প্রেমের জোয়ারে। মেয়েটা ক্ষনে ক্ষনে স্বামীর দেওয়া তীক্ষ্ণ সুচালো আঘাতে মুশড়ে উঠছে। ছাড়া পেতে চাইছে না। কিন্তু গ্রহণ করতে চাইছে সবটুকু আদুর স্বামী নামক প্রণয় পুরুষের। সেই সাথে প্রান প্রিয় ভালোবাসার পুরুষের কাছে নিজেকে সপে দিতে চোখের কোল ঘেঁষে পানি ঝড়ালো। লোকটার আগের বলা বারবার সাবধানি বানী গুলো স্মরণ করলো। ইরোটিক ভালোবাসা কি তার প্রমাণ পেলো। সেই সাথে উন্মাদ লোকটার সবশেষে নিজেকে গম্ভীর খোলস ছেড়ে বহিপ্রকাশ করার আদুরে ছুঁয়া গুলো তাকে আরও পাগল করলো।
“আমার জানকে খুব ভালোবাসি। খুউউব৷ এই ক্ষত গুলো আমার ভালোবাসার। এই মিষ্টি যন্ত্রণা গুলো তো আমার জানের-ই পাওনা তাই না? হু? ”
শুভ্রতা তীক্ষ্ণ মিষ্টি যন্ত্রণায় তখন কাঁতর। ছটফট করছে শুধু। মুক্তি পেতে চাইছে না, কিন্তু নিজেকে মানিয়েও নিতে পাড়ছে না। ঠিক সেই মূহুর্তে আবারও অতল সমুদ্রের ন্যায় কোমল, গভীর গলায় ভেঙে ভেঙে ধ্বনিত হলো তার প্রান প্রিয় পুরুষের কন্ঠঃ,

“বি ব্রেভ, জান। ফার্স্ট টাইম, আ’ উইল ড্রাইভ স্লোলি এন্ড জেন্টলি, হু? আমার জান….অনেক ভালোবাসি, ইইনফিনিটি.. ….” তাকে ভ্রেব হতে বলছে। অথচ, আদুরে ছোঁয়ায় ভিতর থেকে শুষে নিচ্ছে সমস্ত সত্যা। হৃৎস্পন্দনে যেন রক্ত ছলকে ছলকে উঠছে। আসন্ন কিছুর আগামী সংকেত থরথর করে কাপিয়ে দিচ্ছে তনুমন সর্বাঙ্গ।
এর মিনিট দু’য়েকের মধ্যেই শুভ্রতা তীক্ষ্ণ সুচালো ব্যাথায় তরপিয়ে উঠলো। অদ্ভুত স্বরে গুঙ্গিয়ে উঠলো, চাপা সেই সুচালো স্বর। পূর্বের ক্ষতবিক্ষত ওষ্ঠ জোড়া আবারও দাত দ্বারা চেপে ধরতে চাইলো কিন্তু এর আগেই আবারও আরেকজনের দখলে চলে গেলো ওষ্ঠ জোড়া। দিশেহারা সে নখ দিয়ে খাঁমচে ধরলো মেহরাদের বলিষ্ঠ প্রজাপ্রতি ন্যায় শেইপ পিঠ। কত আঁকিবুঁকি ইতিমধ্যে সেথায় হয়ে গিয়েছে তার ইয়াত্তা নেই। আবার নতুন উদ্দ্যমে তাতে নেমে গেলো মেয়েটার নখ জোড়া। ফুপিয়ে জীবনের মিষ্টি প্রথম পাওয়া যন্ত্রণা টুকু গ্রহণ করায় লেগে গেলো। প্রণয়ের পুরুষটিকে সম্পূর্ণ নিজের করে পেয়ে নিজেকে পরিপূর্ণ মনে হলো তার। মেহরাদের বার বার আদুরে কথা গুলো ঝড় তুলছে অন্তস্থলে। তার এই আদুরে মেহরাদ ভাইয়ের জন্য হলেও সে এরকম হাজার যন্ত্রণা চুটকিতে সহ্য করে নিবে। গভীর অরন্যের ন্যায় গভীর এ স্বর সে বারবার শুনতে চায়। লোকটাকে তার জন্য এতটা উন্মাদ তার চক্ষুকে শীতল করছে। এই শীথীলতা নিয়ে সে মরতেও রাজি। একবার না বারবার। ক্রন্দনরত রমনীর, এমন তুমুল বর্ষনের প্রণয়া জোয়ারে উত্তাল আবেগী নির্লজ্জ মনটা গেয়ে উঠতে চাইলো,

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৯

❝একবার বলি বারবার,
বলি বলি যে লক্ষ বার….
তুমি আমার প্রিয়তম,
তুমি যে আমার…❞

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪০