Tell me who I am 2 part 5 (4)
আয়সা ইসলাম মনি
মিরার ভেতরের আগুন তাতে আরও দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। সে কটমট করে তাকাতেই কারান হালকা গলা খাঁকারি দিল। তার মনে হলো, সে নিজেরই এক ভয়ংকর নারী অবতার (ফিমেইল ভার্সন) দেখছে।
এবার সে স্বাভাবিক গলায় বলল, “আমি নাইফ আনতে যাচ্ছি। তুমি নিজেই আমার ঠোঁট কেটে দাও।”
বলেই সে সত্যিই ছু’রি আনার জন্য পেছনে ঘুরে হাঁটতে শুরু করল।
মিরা তড়িঘড়ি করে তার হাত চেপে ধরল।
“পা’গল তুমি?”
কারান ঘুরে দাঁড়িয়ে নরম হেসে বলল, “হুম, শুধু আপনার জন্য।”
“তোমার ঠোঁট কে’টে ফেললে আমি চুমু খাবো কোথায়?”
কারান ঠান্ডা, গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল, “বাকি শরীরে। যেখানে তোমার ইচ্ছে হবে সেখানে।”
“আর তুমি? তুমি তখন কীভাবে আমায় চুমু খাবে?”
কারান মাথা নাড়ল।
“রাইট। কথায় যুক্তি আছে। আর… আর তোমার রাগ হওয়াটা স্বাভাবিক। কারণ যেখানে তোমার দিকে কেউ চোখ তুলে তাকালেও আমার র’ক্ত গরম হয়ে ওঠে, সেখানে কিস তো বহু দূরের কথা। সরি। এগেইন সরি, সরি মাই লেডি।”
মিরা ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে মুখ ঘুরিয়ে নিল। কারণ কারান কেবল ভুল করেনি, সে এক অমার্জনীয় অপরাধ করেছে। ভালোবাসা দিয়েও তার দোষ ঢেকে রাখা যাচ্ছে না। মিরার ভেতরে বহুদিনের ক্ষোভ আগ্নেয়গিরির মতো জমা হয়েছে। সে তো এতদিন ধরে নিশ্চিত ছিল, আমেরিকায় রাশার সঙ্গে কারানের অবশ্যই কোনো অ’শ্লীল সম্পর্ক ছিল। মিরা দুই হাত বুকের কাছে শক্ত করে বাঁধল।
তারপর চোখে আগুন নিয়ে কড়াভাবে বলল, “হয়নি, আরো বলো।”
কারান ধপ করে মিরার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। এরপর মিরার পা দুটো আঁকড়ে ধরল। তার পায়ের সাথে মাথা ঠেকিয়ে চোয়াল শক্ত করে ঢোক গিলে ক্ষণকাল নীরব রইল। সে তো জানে, ওই চুম্বনের পেছনে একটাই কারণ ছিল, মিরাকে বাঁচানো। কিন্তু সেই সত্য আজ বলতে পারবে না। আবেগ গিলে ফেলে বলল, “সরি। সরি, মিসেস মিরা। আমি অন্যায় করেছি।”
কাঁধে তীব্র ব্যথা, তবুও সেই ব্যথা উপেক্ষা করে দুই হাতের সমস্ত শক্তি দিয়ে মিরার পা আঁকড়ে ধরে রেখেছে। কারণ মিরার রাগটা আজ নৃশংস রূপে ধারণ করেছে। কারানকে ক্ষমা করার মতো নয়। আজ মিরার মনে হঠাৎই পুরোনো সেই বিষাক্ত স্মৃতি জেগে উঠেছে। কেন মনে পড়েছে, সেটা সেও জানে না। কেবল এটুকু জানে, এই মুহূর্তে কারানের অস্তিত্বও সহ্য হচ্ছে না। তাই সে কারানকে বসা থেকে তোলার চেষ্টা করল না। উল্টো মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিয়ে, বিষণ্ন গলায় বলল, “উঁহুঁ, এক হাজার বার সরি বলো।”
কারান মিরার দিকে অসহায়ভাবে তাকিয়ে বলল, “হে আল্লাহ… তারপর তোমাকে কিস করারও শক্তি থাকবে না আমার।”
“কিন্তু সরি বলতেই হবে, কারান। এর কোনো বিকল্প নেই আমার কাছে। তুমি কি ভাবছ, এই সরি আমার অভিমান মুছে দেবে? না। তবুও বলো, কারণ আমি শুনতে চাই।”
“বলো, কীভাবে ক্ষমা চাইলে তুমি ক্ষমা করবে? যদি সম্ভব হতো, আমার সমস্ত দম্ভ আর পাপরাশি তোমার পায়ের তলায় পিষে ফেলতাম।”
মিরা তবুও মুখ ফিরিয়ে রাখল। কারান আজ তার কাছে নিজের সমস্ত অহংকার, সমস্ত শক্তি বিসর্জন দিয়ে বসে আছে। কারানের মন গভীর অনুশোচনায় দগ্ধ, তবুও হয়ত মিরার সেই দগদগে ক্ষত এত তাড়াতাড়ি শুকোবে না।
কারানের মাথা ধীরে ধীরে নত হয়ে গেল।
“ক্ষমা করো, ক্ষমা করো, রানী ভিক্টোরিয়া।”
“এইভাবে নয়। নিকনেমের সাথে ক্ষমা চাইতে হবে। আর প্রত্যেকটায় ‘সরি’ শব্দটি থাকতে হবে।”
কারানের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল, সে মিরার মুখের ক্ষিপ্ত ভাব দেখল। শান্তির অবকাশ নেই সেখানে, অদম্য অগ্নিসদৃশে চোখ দুটো জ্বলে উঠছে। কারান স্পষ্ট বুঝতে পারল, ওই ঘটনাটি মিরার হৃদয় কতটা দগ্ধ করছে। কারান হতাশ চাহনিতে বলল, “সত্যিই কি আমাকে হাজারবার সরি বলতে হবে?”
মিরা জোর গলায় জবাব দিল, “কেন, ভয় পেয়ে গেলে নাকি? তুমিই তো বলেছিলে, কারান চৌধুরি চাইলে সব করতে পারে। যাই হোক, যাও, এক হাজার না, তবে কমপক্ষে শতাধিক নিকনেম নিয়ে ‘সরি’ বলতে হবে। আর হ্যাঁ, এই নিকনেমগুলো যেন বিভিন্ন ভাষার হয়। বাকি নয়শতবার ‘সরি’ বলতে হবে শুধু।”
কারান দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করল। ধীরে ধীরে সে মিরার পায়ের কাছে মাথা নত করল, শাড়ির কোমল বুননে আলতো করে এক চুমু দিয়ে শুরু করল,
“সরি, মেরি মুন; সরি, মাই সোল; সরি, লাইটহাউস; সরি, গুআং; সরি, ব্লসম; সরি, জানে হায়াত; সরি, মেরি রূহ; সরি, জ্ভেজ্ডা; সরি, ইুমে নো অন্নানোকো; সরি, রেইনা দেল সোল; সরি, মাই গ্রেস; সরি, স্টেল্লা; সরি, মাই মিউজ; সরি, দিল-কি মুষ্টকান; সরি, মাই গার্ডেন; সরি, স্যুভেনির; সরি, কোকারো নো হি; সরি, মেজেস্টিক; সরি, আঙ্গেল গুয়ার্দিয়ান; সরি, হুইমান্গ; সরি, প্রিণ্সেসা; সরি, রোসা দেল আল্বা; সরি, দীপক; সরি, হিকারি নো শুকোগোশা; সরি, চান্দকা টুকরা; সরি, প্রিয়লতা; সরি, প্যারি; সরি, সুকি নো হোহোএমি; সরি, মি ফ্লোর; সরি, মেরি খুশি; সরি, ঙ্কারিচ; সরি, ফিওরেলা; সরি, নূর আল-কামার; সরি, দুয়াংদাও; সরি, মেরা আশীর্বাধ; সরি, লিয়োনা; সরি, স্পেরানজা; সরি, মেরে ফুল; সরি, আরিনা; সরি, বিনতাং; সরি, কারামেলিতো; সরি, পারলি-না; সরি, বেলা লুনা; সরি, শুভ্র; সরি, বেলা; সরি, এস্পেরানজা; সরি, হিকারি-কো।”
পঞ্চাশবার নিকনেমের সাথে ‘সরি’ উচ্চারণ করে কারান অবশেষে অধর গোল করে কয়েকটি দীর্ঘ, কষ্টসাধ্য নিশ্বাস ফেলল। তার কপোল বেয়ে ঘাম ফোঁটায় ফোঁটায় গড়িয়ে পড়ছে। পৃষ্ঠদেশেও ঘামের কণাগুলো অল্প আলোতে চিকচিক করছে। গলায় শুকনো ঢোক গিলতে গিলতে যেন নিজের অপরাধবোধটাকেও গলাধঃকরণ করছে সে।
ওদিকে মিরার একটুও হুঁশ নেই। সে দৃষ্টি গেঁথে রেখেছে কারানের মুখের উপর।
কারান একবার চোখ বন্ধ করল। তারপর হঠাৎ করুণ স্বরে আবার বলতে শুরু করল,
“সরি, মাধবীলতা; সরি, ইচিমদেকি ইশিক; সরি, সাঙ্রে দে এস্ত্রেইয়া; সরি, আগাপিমেনি; সরি, ল্যুবিমায়া; সরি, মিলি স্বেত; সরি, হিকারি নো মাত্সুই; সরি, মিও তেসোরো; সরি, মেরে স্বর্গ; সরি, হৃদয়মোহিনী; সরি, যুভিয়া ডে এস্ত্রেইয়াস; সরি, হিকারি নো উতা; সরি, ফ্লার দেসপোয়ার; সরি, কসমিমা; সরি, মাই মেলোডি; সরি, নাজমাত আল-ফজর; সরি, স্ফেতলায়া দুশা; সরি, সবেরা; সরি, আমোরে মিও; সরি, হার্টস্মাইল; সরি, মাই পিস; সরি, আচিমবিয়ল; সরি, পারলা দেল মার; সরি, হিকারি নো হিমে; সরি, জামাল আল-রুহ; সরি, স্টারলিং; সরি, জুরেক্তিন ঝারিগি; সরি, ইতোশি হিটো; সরি, ডলচেভিটা; সরি, আমার আলো; সরি, মেরা তাজ; সরি, ওগনেনায়া জ্ভেজ্দা; সরি, বোম্বোন; সরি, হিকারি নো সে; সরি, নিরালা; সরি, রত্ন; সরি, এস্ত্রেইয়া ফুগাজ; সরি, আসমান কা সিতারা; সরি, হিকারি নো মিচি; সরি, স্লাদকিয় সন; সরি, মায়া; সরি, সিয়েল এতোইলে; সরি, এঞ্জেলহাগ; সরি, প্রিয়তমা; সরি, হিকারি নো কিবো; সরি, কেরিদা ফ্লোর; সরি, ইন্দ্রধনুষ; সরি, স্তেররেনলিচ্ত; সরি, হিকারি নো ত্সুবাসা; সরি, ফাতিহা; সরি, দুলসুরা; সরি, নোভা; সরি, হিকারি নো ইউমে।”
আরো নয়শো বার সরি বলল সে। কথাগুলো এমন করুণভাবে বেরোচ্ছিল, শুনলে যে কারও বুকটা ধক করে উঠত। অথচ মিরা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। মুখের অভিব্যক্তি স্থির। একটুও আওয়াজ করল না।
কারান থেমে গেল। দীর্ঘ, ভারী নিশ্বাস বের হলো বুক চিরে। তার চোখ লাল হয়ে দৃষ্টি ম্লান হয়ে গেছে। তারপর খুব ধীরে মিরার দিকে তাকাল। বুঝতে চেষ্টা করল, মিরা কি এতটুকু হলেও শান্ত হয়েছে? তার প্রতি সেই ঘৃণা কি এক চিলতে হলেও কমেছে? তাকে কি একটুও ক্ষমা করতে পেরেছে?
কিন্তু মিরার নিস্তব্ধ আদল অবলোকন করে কিছুই বুঝতে পারল না। মিরা বসল। নীরবতা ভেঙে কিছুই বলল না। শুধু কাঁপা হাতদুটি দিয়ে কারানের মুখের চারপাশে আলতোভাবে স্পর্শ করল।
কারানের ঠোঁট কেঁপে উঠল। অস্ফুট, করুণ স্বরে বলল, “হাঁপিয়ে গেছি, মিরা। প্লিজ, কাডল মি।”
মিরা আর বিলম্ব না করে কারানকে বুকের গভীরে চেপে ধরল। কারান তার বক্ষের আঁচলটা সরিয়ে, মুখখানা সুচারুভাবে মিরার উষ্ণ মাংসপিণ্ডের ফাঁকে ঢুকিয়ে নিল। বিক্ষিপ্ত শ্বাসপ্রশ্বাসে ফিসফিস করে বলল, “তোমার ভিতরে ঢুকে যেতে ইচ্ছে করছে।”
মিরা সঙ্গে সঙ্গেই নিজের পৃষ্ঠদেশের ব্লাউজের গ্রন্থিতে টান দিল। ঢিলা হয়ে আসা ব্লাউজটা কাঁধ বেয়ে ধীরে ধীরে নেমে যেতে লাগল। মিরা শাড়ির আঁচলটি কারানের পিছন থেকে ঘুরিয়ে টেনে এনে তার বক্ষপিঞ্জরের ফাঁকটিতে তার মস্তক শক্ত করে গুঁজে রাখল। কারান চোখ বুজে ফেলল। তার দ্রুত নিশ্বাস মিরার বুকের ওপর বারবার আছড়ে পড়ে মিরার অন্তর্লীন কামনা আরও প্রগাঢ় করে তুলল। কারান পরম ক্লান্তিতে, নিগূঢ় আরামে, জড়িয়ে শুয়ে রইল তার বক্ষপিঞ্জরের ভাঁজে। দীর্ঘ সময় গড়িয়ে গেছে। কারানের শ্বাসও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে এসেছে।
অবশেষে মিরা মৃদু কণ্ঠে বলল, “কত ভাষায় ‘সরি’ বললে তুমি?”
কারান চোখ বন্ধ অবস্থাতেই বলল, “বাংলা, হিন্দি, উর্দু, আরবি, ফরাসি, স্প্যানিশ, ইতালিয়ান, জাপানি, রাশিয়ান, গ্রিক, তুর্কি, ফিলিপিনো, মালয়, জার্মান, কোরিয়ান, হাঙ্গেরিয়ান, পর্তুগিজ, থাই, পোলিশ, ইংলিশ।”
এরপর চোখ খুলে মিরার দিকে তাকিয়ে বলল, “আই ম্যানেজড টু সে ইট ইন অনলি টুয়েন্টি ল্যাঙ্গগুয়েজেস, মাই সুইটহার্ট। ডোন্ট বি আপসেট; আই সিম্পলি ডোন্ট নো এনি মোর।”
মিরা আর নিজেকে সংবরণ করতে পারল না। বুক থেকে কারানের মাথা আস্তে করে তুলল। তারপর হঠাৎ সে কারানের পুরো মুখ জুড়ে উন্মুখ চুমুতে ভরিয়ে দিল। তার উষ্ণ ঠোঁটের আর্দ্রতায় কারানের গাল, কপাল, চোখের কোণ ভিজে উঠল। এদিকে কারান যেন কোনো অতল শান্তির নগরে প্রবেশ করেছে, যেখানে সমস্ত ব্যথা, ক্লান্তি আর ক্ষ’ত মুছে যাচ্ছে। মিরার এমন স্নিগ্ধ, উন্মোচিত সোহাগই তো তার কামনা। আজ সে পরিপূর্ণ, আজ সে বিজয়ী।
তার কোমল ঠোঁটে অতৃপ্ত চুম্বন দিল মিরা। সেই স্পর্শে ভিজে গেল তার ঠোঁটের রেখা।
মিরা ভেবেছিল, সে যতই গম্ভীরভাবে বলুক, কারান হয়ত তাকে খুশি করতে কিছু একটা বুঝিয়ে দিবে। কিন্তু কারান সত্যিই সত্যিই এক হাজার বার, তাও ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় ‘সরি’ বলবে, এমনটা তার কল্পনাতেও ছিল না। কী গভীর, নিবিড় ভালোবাসা কারানের! যা বলেছে, তাই করে দেখিয়েছে। মিরার মনে হলো, সে কি আদৌ এমন ভালোবাসার যোগ্য?
Tell me who I am 2 part 5 (3)
অনেকটা সময় মিরা চুপ থেকে ভাবল। তারপর আবার কারানের চোখের সামনে এলো। তার কণ্ঠস্বরে কিছুটা স্নিগ্ধ বিস্ময় নিয়ে বলল, “তুমি এতগুলো ভাষায় কীভাবে বললে? আমি তো হিসাব মিলাতে পারছি না, কারান। কোথা থেকে শিখলে এতো শব্দ?”
কারান মৃদু হাসি নিয়ে বলল, “এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকি আছে, বেগম।”
