Home মেঘের ওপারে আলো মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৮

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৮

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৮
Tahmina Akhter

মেঘালয় সামনের দিকে অগ্রসর হবার সময় ইচ্ছে করে পেছনে তাকায়নি। যদি একটিবার তাকাত; তাহলে আলোর আশ্চর্য মুখটা দেখে হু হু করে হেসে ফেলত সে।
মেঘালয়ের তো এখন নিজের ওপর প্রচুর গর্ববোধ হচ্ছে। কারণ, একটাই । তার স্ত্রী ভাবছে এতবছর পর দেখা হলো স্বামীর সঙ্গে। অথচ স্বামী স্ত্রীকে দেখেও না দেখার ভান করছে! মাঝেমধ্যে এমন ভাব দেখাচ্ছে যেন স্বামীর দৃষ্টির আনাচে-কানাচে কোথাও স্ত্রীর ছায়ার অস্তিত্ব নেই! অথচ, তার স্ত্রী তো জানেই না গতকালই স্ত্রীর অচেতনতার সুযোগ নিয়ে স্ত্রীকে অল্পস্বল্প আদর করেছে সে । যেই মানুষটাকে একটিবার চোখে দেখার জন্য এতবছরের তপস্যা সেই মানুষটাকে চোখের সামনে দেখলে না ছুঁয়ে থাকা যায়? মোটেও না৷

হেঁটে যেতে যেতেই মেঘালয়ের মাথায় একটা দুষ্ট বুদ্ধি উদয় হলো। কিন্তু, এখনই নয়। সঠিক সময় এলে সঠিক জায়গা সঠিক ফর্মূলা প্রয়োগ করবে সে।
মেঘালয় চলে যাওয়ার পর রিনি রান্নাবান্নায় মনোযোগী হলো। আলো মেঘালয়ের চলে যাওয়ার পথ পানে তাকিয়ে আছে। আলো অপেক্ষায় ছিল মানুষটি একটিবার পেছনে ফিরে তাকাবে কিন্তু তাকালো না তো!!! দুঃখে আলোর চোখ ভিজে আসছে। রিনির সামনে বারবার নিজেকে দূর্বল প্রকাশ করতে আপত্তি তার। মেয়েটার সামনে গতকালই লজ্জিত হলো আর আজ….
আলো নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখে রিনির সামনে গিয়ে বলল,

— হেল্প করব?
রিনি মুচকি হেসে আলোর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
— আজ তোমাদের রান্না করে খাওয়াই! আগামীকাল তো আমাকে আমার শ্বশুরবাড়িতে যেতে হবে। তোমাদের কারণে আমার বিদায়ী হলো না। যদি পরিস্থিতি ঠিকঠাক হতো তাহলে আমার শ্বশুরবাড়িতে আমার আজ দ্বিতীয়দিন হতো।
কথাগুলো বলতে বলতে খিলখিল করে হাসে রিনি। এমন অবস্থায় কেউ স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ করতে পারে? আলো অবাক হয়ে রিনির হাসি দেখছে। মেয়েটাকে যতটা হাসিখুশি মনে মেয়েটা ভেতরে ভেতরে ততটা খুশি না হয়তো। মেয়েটা হাসছে অথচ চোখদুটোতে বিষাদের ছায়া। প্রাণখোলা হাসির সঙ্গে চোখদুটো তো হাসার কথা!
রিনি চুলা অফ করল। তারপর আলোর হাতটা ধরে বলল,
— কার সঙ্গে রাগ করে বেরিয়ে গিয়েছিলে বলো তো? যেই আধ পাগলের জন্য বাড়ি ছাড়ছো সে আদৌও কি চায় তোমার কি একটিবার অনুসন্ধান করা উচিত না ; বলো?
রিনির কথা শুনে আলো ভাবুক হয়। রান্নাঘরের জানালার ওপারে নীলচে আকাশের দিকে তাকিয়ে আলো বলল,

— অনুসন্ধান করতে হলেও কাছাকাছি থাকতে হয়। সে তো আমাকে চোখেই দেখছে না এমন ভান করছে। তার কাছে থাকব কেমন করে?
— সে তোমাকে চোখে না দেখুক তুমি তো তাকে দেখছো! এত বছরের রাগ, অপেক্ষা, অভিমান, অনুরাগ কি এক পলকে কমে যাবে? সময় লাগবে। ধৈর্য ধরো।
আলো চুপ করে আছে। ইতিমধ্যে ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে এসে বসেছে রিনির বাবা, আরাফাত এবং মেঘালয়। রিনি তাদের বসতে দেখেই আলোকে বলল,
— দুপুরের খাওয়াদাওয়া শেষ করা যাক।
আলো জবাব দেয় না। রিনি সব খাবারদাবার টেবিলে নিয়ে রাখল। আলো চুপচাপ রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে আছে। রিনি ভেবেছিল আলো হয়তো আসবে। মেঘালয় যতই রাগারাগি করুক একটিবারের জন্যে হলেও মেঘালয়ের পাতে খাবার তুলে দেবে। কিন্তু, আলো…
রিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেঘালয়ের পাতে খাবার তুলে দিলো। মেঘালয় রিনির পানে তাকাতেই রিনি সেই দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে আরাফাতের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। আরাফাতের পাতে খাবার তুলে দেয়। আরাফাত হাসিমুখে খাবার খেতে মনোযোগী হলো। রিনির বাবা খাবার খেতে খেতে রিনিকে বলল,

— মেঘালয়ের বউ কই?
— রান্নাঘরে আছে, বাবা।
রিনি বাবার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে মেঘালয়কে উদ্দেশ্য করে বলল,
— কি হলো খাচ্ছো না, কেন?
মেঘালয় প্রশ্নের জবাব না দিয়ে চুপচাপ প্লেটের ওপর দৃষ্টি রেখে বসে আছে। রিনি মেঘালয়ের নিরবতার মানে বুঝতে পারল কিনা…
রিনি ওর বাবার পাশের চেয়ারে গিয়ে দাঁড়ায়। তারপর, তার বাবার কানে কানে বলল,

— বাবা, ভাবিকে ডেকে দাও তো। তোমার ভাইয়ের পুত্র নিজের স্ত্রীর জন্য ভাত গিলতে পারছে না। অথচ, মুখেও একটিবার বলছে না যে, আমার বউ কই? ওকে খাবার খাওয়ার জন্য ডাকছো না কেন?
মেয়ের কথা শুনে রিনির বাবা হেসে ফেললেন। রিনি অসহায়ের মতো তাকায়। এতে কাজ হলো কিনা? রিনির বাবা আলোর নাম ধরে ডাক দেয়। চাচা শ্বশুরের ডাক শুনে আলো রান্নাঘর থেকে ধীরে ধীরে বের হয়ে আসে। মেঘালয় মাথা তুলে তাকায় না। আলো ডাইনিং টেবিলের সামনে এসে রিনির বাবাকে সালাম জানায়। রিনির বাবা সালামের জবাব দিয়ে আলোকে চেয়ারে বসার জন্য আদেশ করে। আলো মেঘালয়ের মুখের দিকে তাকালো। কিন্তু মানুষটা কি চমৎকারভাবে খাবার খাচ্ছে? স্ত্রীকে একটিবার খাবার খাওয়ার কথা জিজ্ঞেস করার প্রয়োজনবোধ মনে করলো না? আলো নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে চেয়ার টেনে বসল। মেঘালয়ের মুখোমুখি চেয়ারে। রিনি আলোর পাতে খাবার তুলে দেয়ার পর নিজেও আলোর পাশের চেয়ারে বসে পরল। আলো আড়চোখে মেঘালয়কে দেখছে বারবার। খাবার খাওয়া তো বাহানা মাত্র। আলো জানতে চায় গত আটবছর পরে দেখা হবার পর কোনো জাদুর প্রভাবে মানুষটা তাকে দেখেও না দেখার ভান করছে?
আচ্ছা মানুষটাকে আগের থেকে লম্বা দেখাচ্ছে বেশ! কারণটা কি শরীর শুকিয়ে গেছে বলেই হয়তো! ফর্সা লোমশ হাতের ওপর কি চমৎকার ভাবে কালো ফিতার ঘড়িটা স্থান পেয়েছে!
ডাক্তার সাহেব এর উপর আলোর অভিযোগ ধীরে ধীরে মুগ্ধতায় পরিণত হলো যেন।
সবার খাওয়াদাওয়া যখন শেষ পর্যায়ে ঠিক তখনি রিনির বাবা আলোকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

— তোমার কথা আমি হাজারবার ভাবির কাছ থেকে শুনেছি। ভাবি তোমাকে অত্যাধিক স্নেহ করতো পুরো পরিবার জানে এই ব্যাপারে। এবং ভাবি যখন বেঁচে ছিলেন তখন আমরাও উনাকে শ্রদ্ধা করতাম। আর এখন তো উনি…
এতটুকু বলেই দীর্ঘশ্বাস ফেললেন রিনির বাবা। মেঘালয় আর খেতে পারছে না। আলো মাথা নীচু করে বসে আছে। ভদ্রলোক আলোর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
— ভাবি, মারা গেছে বলে তার সন্তান কিংবা তার পুত্রবধুর খোঁজখবর রাখব না; এমনটা তে হতে পারে না। হয়তো গত কয়েকবছর পরিস্থিতি অনূকূলে ছিল না। কিন্তু, তুমি যেহেতু এখন লন্ডনে চলেই এসেছো পড়ালেখার খাতিরে। সেহেতু আমি চাই তুমি এই বাড়িতে থেকেই পড়াশোনা করবে। হোস্টেলে যাবার দরকার নেই। কি মনে থাকবে তো?
আলো না চাইতেও সম্মতি প্রদান করলো। রিনির বাবা উঠে চলে গেলেন। এরপর ধীরে ধীরে আরাফাত এবং আলো উঠে চলে গেল। বাকি রয়ে গেছে রিনি আর মেঘালয়। টেবিল ফাঁকা হবার পর মেঘালয় রিনিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
—হোস্টেল এর কাহিনি কি?
রিনি সারসংক্ষেপে আলোর লন্ডনে আসার প্রধান কারণ দুটোর একটি কারণ বলল। মেঘালয় একটি কারণ শুনে হতাশ হয়ে বলল,

— আমি আরও ভেবেছি আমার সঙ্গে হয়তো দেখা করতে এসেছে… কিন্তু, তিনি তো উচ্চতর ডিগ্রি নেবার জন্য এসেছেন। কাব্য ভাইয়ের কুট কাঁচালির জন্য আলো আমার দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে, বুঝলে? নয়তো ও কখনোই নিজের আত্মসম্মান বলি দিয়ে আমার কাছে আসত না।
মেঘালয়ের কথাগুলো শোনার পর রিনির ভীষণ বিরক্ত হয়ে বলল,
— তোমার বউ তোমার জন্যই এসেছে লন্ডনে। পুরো ঘটনা জানতে চাইলে কাব্য ভাইয়ার কাছ থেকে জেনে নাও। তবুও, অযথা চিন্তা করে নিজেদের সম্পর্কের বারোটা বাজাবে না। এমনিতেই গতকাল তোমার ওমন গা ছাড়া ভাব এবং সারারাত তোমার অনুপস্থিতিতে আলো জবাব পেয়ে গেছে যে আসলেই তুমি কি চাও? ও তো সকালে কাউকে না বলেই বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিল। পথিমধ্যে আলো যখন ক্যাব ভাড়া করছিল ঠিক সেই সময় বাবার সঙ্গে ওর দেখা হলো। বাবা ওকে বুঝিয়ে বাড়িতে নিয়ে এসেছে। বাবা যদি আলোকে আজ বাড়িতে না নিয়ে আসত তাহলে আজ সত্যি সত্যিই তুমি বাড়িতে ফিরে দেখতে তোমার বউ নাই হয়ে গেছে । অতএব, নাটক কম করো পিও।
রিনি সম্পূর্ণ কথা শেষ করে উঠে চলে গেল। মেঘালয় আরও বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে বসে রইল। এখান থেকে বসে রান্নাঘরে থাকা আলোকে দিব্যি দেখতে পাচ্ছে। আলোর কোমড় ছাড়িয়ে যাওয়া চুলগুলোকে হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখার অদম্য বাসনা বারবার মেঘালয় পথ হারিয়ে ফেলছে যেন। কতদিন নিজেকে এমন শক্তপোক্ত মানুষের খোলসের ভেতরে রাখতে পারবে কে জানে? তবে অতি শীঘ্রই যে শক্তপোক্ত মানুষের খোলস ছেড়ে আলোর মাঝে ডুব দেবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
রান্নাঘরে থাকা আলোর দিকে তাকিয়ে দুষ্ট হাসি দিয়ে মেঘালয় বলল,

— তোমাকে যদি একটিবার আমার বুকের কাছে টানতে পারি না সবার আগে আমি তোমার আত্মসম্মানকে ভেঙেচুরে ফেলব। তোমার আর আমার ভালোবাসার মাঝে আত্মসম্মানের দেয়ালকে আমার বুলডোজার দিয়ে ধ্বংস করা তীব্র ইচ্ছে রাখি ; বুঝলে? I promise আলো, তোমার সেই আত্মসম্মানের দেয়াল একদিন নিজেই আমার কাছে এসে ভেঙে পড়বে। just wait and see.
সবাই দোতলায় চলে যাওয়ার পর রিনি আর আলো দুজনেই রয়ে গেল নীচে। রিনি হঠাৎ করে আলোকে কফি খাওয়ার জন্য অফার করলো। আলো বলল,
— কফি খেতে পারলে মন্দ হবে না ব্যাপারটা!
রিনি সানন্দে চলে গেল রান্নাঘরে কফি বানাতে। রিনির পিছনে পিছনে আলো যায়। রিনি যখন কফি বানাতে ব্যস্ত ঠিক তখনি আলো রিনিকে ডাকল,,

—রিনি?
— জি, ভাবি?
— তোমার ভাই কি সবসময় এমন এবনরমাল বিহেভ করে?
আলো’র কথা শুনে রিনি ভীষণ রেগে যায়। মানে কি এরা কি শুরু করে দিয়েছে দু’জনে মিলে! বুকভরা ভালোবাসা সিন্দুকে লুকিয়ে রেখে ভান করছে ভালোবাসে না। বউকে ছাড়া ভাত গিলতে পারছে না অথচ মুখ ফুটে বলছে না কিছু। আর বউটা আট বছর পর এসে সবকিছু আগের মতই চাইছে…
রিনি রাগ গজগজ করতে করতে আলোর চোখে চোখ রেখে কঠোর ভাষায় বলল,
— এবনরমাল তো আপনি বানিয়েছেন! ব্যাডা মানুষ ভালোবাসি না বললে নাই। এত চাপাচাপি করার কি আছে? আপনি রাগ-অভিমান দেখিয়ে তাকে ফেলে চলে যাওয়ার পর সে যে গাঞ্জাখোর, মদখোর হয় নাই এটাই তো আপনার সৌভাগ্য।
রিনির কথাগুলো শুনে আলো মাথায় হাত দিয়ে হাল ছেড়ে দেয়ার ভঙ্গিতে বলল,

— আরে তুমি কি আমার সঙ্গে পায়ে পা বাঁধিয়ে ঝগড়া করতে চাইছো? আমি শুধু জিজ্ঞেস করলাম তার কথা!!
— না আপনাকে আর আপনার স্বামীর পায়ে ধরে আমার প্রণাম করা উচিত। বাহ্, আপনাদের তুলনা হয় না। একজন আরেকজনকে দূরের রাখার যত বন্দোবস্ত করা যায় সবই করছেন। এতবছর পর এসে দু’জনের দেখা হলো কই একে অপরের সঙ্গে জোঁকের মতো আঁটকে থাকবে তা না। উল্টো একজন আরেকজনকে দেখলে মনে হচ্ছে লবন হাতে নিয়ে ছুটে যাচ্ছে।
রিনি কথাগুলো শেষ করে আলোর হাতে কফির মগ দিয়ে চলে গেল । আর আলো কফির মগে চুমুক দিতে গিয়েও দিল না। মেয়েটা না!! শেষমেশ জোঁকের সঙ্গে তুলনা দিতে হলো!!! ছিহ্!!

সারা বিকালবেলা আলো একা একা ড্রইংরুমে কাটিয়ে দেয়। রিনি সেই যে রাগ করে চলে গেছে আর আসেনি। আলো মেঘালয়ের ঘরে যাওয়ার সঞ্চয় করে কিন্তু পরক্ষনেই ভাবে মানুষটাকে আর কয়েকটা দিনের সুযোগ দেয়া হোক। এরপরও যদি না মানে তখন না হয়….
আলো যখন আকাশকুসুম ভাবতে ব্যস্ত ঠিক তখনি তড়িঘড়ি করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে মেঘালয় কোথাও চলে যাচ্ছে। ভুল করেও একটিবারের জন্য আলোর দিকে তাকায় না৷
আলো দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“আল্লাহ, এমন অভিমানী পুরুষের সঙ্গে আমি নয়মাস সংসার করেছিলাম! নয়মাসের সংসারে সে তো ছিল ভিন্ন হৃদয়ের এক অন্য পুরুষ৷ যার কথার মিষ্টতা দেহের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে যেত।
আমি তো এতকাল যাবত জানতামই না তার ভেতরে সুবিশাল অভিমানের পাহাড় আছে! ভাগ্যিস তাকে অভিমান করার সুযোগ দিয়েছিলাম। নয়তো, আমার সৌভাগ্য হতো না তার অভিমান দেখার৷”
এই ফাঁকে আলো মোবাইল হাতে নিয়ে কল করলো বাংলাদেশে। ইতি, কাব্য এবং সবশেষে তার মায়ের সঙ্গে কথা বলল। কাব্য বেশ কয়েকবার আলোকে সরি বলেছে। কাব্যের প্রতিবার সরি বলার বিপরীতে উল্টো আলো কাব্যে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে। কারণ, কাব্য যদি এই সারপ্রাইজ প্ল্যান না করতো তাহলে ডাক্তার সাহেব এর সঙ্গে আর কিছুদিন পর দেখা হতো। সবার সঙ্গে কথা বলার পর আলো কল কেটে দেয়। তারপর, উঠে দাঁড়ালো। বাইরে গিয়ে হাঁটাহা্টি করে আসলে মন্দ হয় না। এই ভেবে আলো বাড়ির বাইরে বের হবার জন্য পা বাড়ায়। ঠিক তখনি আলোকে কেউ ডাক দেয়। আলো পেছনে ফিরে দেখলে রিনি দাঁড়িয়ে আছে। রিনি আলোর সামনে এসে দাঁড়ায়। তারপর, ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

— কোথায় যাওয়া হচ্ছে?
— হাঁটাহাঁটি করতে…
— হাঁটাহাঁটির প্ল্যান আপাতত ক্যানসেল। এখন ঘরে গিয়ে চট করে তৈরি হয়ে নাও। আমরা সবাই মিলে আমার বাবার বিজনেস পার্টনারের ছেলের বার্থডে পার্টিতে যাব।
— কিন্তু, আমি তো কাউকে চিনি না…
—- ওসব ব্যাপার না। যাও তাড়াতাড়ি করে তৈরি হয়ে চলে এসো নীচে।
— ডাক্তার সাহেব যাবে না?
আলো নরম সুরে প্রশ্ন করে। রিনি ঠোঁট বাকিয়ে বলল,
— তোমার ডাক্তারকে গিয়ে তুমি জিজ্ঞেস করো যাবে কিনা?
— সে তো একটু আগে কোথায় যেন চলে গিয়েছে্?
— তাহলে তো হলোই। সে যেখানে যাওয়ার যাক না! তুমি আমাদের সঙ্গে চলো।
রিনির একপ্রকার জোর করেই আলোকে দোতলার মেঘালয়ের ঘরটায় পাঠিয়ে দিলো। তবে যাওয়ার আগে একটা ছাই রঙা জামদানি শাড়ি আর সাদা ব্লাউজ পেটিকোট দিয়ে গেছে। আলো শাড়ি হাতে নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
আলো বেশ কয়েকবার শাড়ির কুঁচি ঠিক করার চেষ্টা করছে। কিন্তু, হলে তো!! এবার শাড়ির কুঁচি গুঁজে দেয়ার আগে হাতের আঙুলের ফাঁক থেকে খসে পড়ল। বিরক্ত হয়ে “বাল” গালি দিয়ে সামনে তাকিয়ে দেখল, ডাক্তার সাহেব। আলো তৎক্ষনাৎ পেছনে ফিরে জিহ্বার ডগায় কামড় দিয়ে ওপরে তাকিয়ে বলল,

— মাবুদ, এই মানুষটার সামনে কেন আমার সবসময় শাড়ির কুঁচি খুলে যায়? এবার তো গালি দিয়ে ফেললাম!!
আলো দাঁত দিয়ে নখ কাটছে ভয়ে। আর মেঘালয় হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আচমকা মেঘালয়ের মনে জাগ্রত হলো যে, কোনো একদিন গিনেস বুক ওয়ার্লডে আলো নাম লেখাবে স্বামীর সামনে শাড়ির কুঁচি বারবার খসে পড়ার কারণে।
—গালি কি আগে থেকে জানত নাকি নতুন শিখেছে?
কথাটি মেঘালয়ের খেয়ালে আসতেই মেঘালয় “o my god” বলে দরজার সামনে থেকে চলে গেল।
মেঘালয় চলে যাওয়ার পর আলো নিজের কপালে দুটো বাড়ি দিয়ে বলল,
—- দরজা লাগাতে ভুলে গেলি ক্যান
তারছিঁড়া মাইয়া?

মেঘালয় নীচে গিয়ে তৎক্ষনাৎ রিনিকে ধরলো। আলোর এত ঘটা করে শাড়ি পরার কারণ তল্লাশি করছে। রিনি মুখ ভেঙচি কেটে বলল,
— তোমার বউ আমাদের সাথে পার্টিতে যাবে। তাই রেডি হচ্ছে।
— কই আমাকে তো একবার বললে না যে, আলো তোমাদের সঙ্গে যাবে?
— কেন বললে কি আমাদের সঙ্গে ধেঁইধেঁই করে চলতে?
রিনির কন্ঠে বিদ্রুপ মেশানো। মেঘালয় রিনির দিকে চোখ পাকিয়ে তাকাতেই রিনি বলল,
—এভাবে তাকিয়ে লাভ না! আমি কাউকে ভয় পাই না। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, তুমি পার্টিতে যাবে কিনা? তুমি বললে, যাবে না। ব্যস শেষ। এবার আর আমার মাথা খাওয়ার দরকার নেই তোমার। তুমি গিয়ে তোমার থিসিস পেপার রেডি করো, যাও।
কথাগুলো বলতে বলতে রিনি খেয়াল করল, আলো সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে। মেঘালয় রিনির দৃষ্টি অনুসরণ করে সেদিকে তাকাতেই থমকে যায়। ছাই রঙা জামদানি শাড়িতে আলোকে অনন্যা লাগছে। সাদা মুক্তোর মালা, কানে সাদা পাথরের ঝুমকা। দুইহাত ভর্তি সাদা কাচের চুড়ি। ঘাড়ের ওপরে যত্নে রাখা খোঁপায় বেলীফুলের মালা ঠাঁই পেয়েছে।
মেঘালয়ের সামনে দিয়ে রিনি আলোর হাত ধরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় ।
মেঘালয় সেই দৃশ্য দেখে বুকের বা পাশে হাত রেখে বিধস্ত প্রেমিকের দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আনমনে বলল,

—এ কোন আলো!
যার মলিন ছায়ায়ও আমার চোখে জ্বলে ওঠে অদ্ভুত দীপ্তি,
যেন অন্ধকারের ভেতর লুকানো এক গোপন জ্যোৎস্না।
যার রূপের উষ্ণতায় চোখ পুড়ে যায় ধীরে ধীরে,
তবুও সেই দহনেই খুঁজে পাই এক অচেনা প্রশান্তি।
চোখ অন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে,
তবুও দৃষ্টিকে ফিরিয়ে নিতে মন সায় দেয় না।
এই আলো কি তবে আলো নয়,
নাকি এক মায়াবী অন্ধকার?
যার চোখের গভীরে ডুবলেই আমি নিজেকেই হারিয়ে ফেলি?
মেঘালয় নীচের ঠোঁটের কোনা কামড় দিয়ে চেপে ধরল। তারপর, ঘাড়ে এক হাত রেখে মুচকি হেসে গান গাইতে লাগল,,

মন আকাশে বৃষ্টি আসে
রৌদ্র মেঘের জুটি
আজ নতুন আলয়
আধার কালোর খুনসুটি
ঝরের বেসে এলো কেসে
কাজল সে চোখ দুটি
দিল কঠিন কথার,ভিষন্নতার ছুটি…
তারি সাথে খেলনাপাতে, অযথা হাসাহাসি
হাজার বারন আরো কারন,তবুও সে দারেই আসি
চলনা সুজন মিলে দুজন,নিলয় আকাশে বাসি
দেখুক লোকে এ দুচোখে,তোর অই দুচোখের হাসি
চলনা সুজন হারায় দুজন,বিনা দুষেই হোক ফাসি
দেখুক লোকে অবাক চোখে,কতটা ভালবাসি ।

রিনি আর আলো গাড়িতে বসে অপেক্ষা করছে ড্রাইভার জন্য। কিন্তু, ড্রাইভার আসছে না দেখে রিনি যখন মোবাইল বের করে কল করবে ঠিক তখনি গাড়ির দরজা খুলে ঝড়েরবেগে কেউ এসে ড্রাইভিং সীটে বসল। রিনি আর আলো বিস্মিত হয়ে মানুষটার দিকে তাকিয়ে আছে। দুজন নারীর বিস্মিত চেহারা উপেক্ষা করেই মেঘালয় রিনিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
— ঠিকানা বলো?

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৭

মেঘালয়কে দেখে আলো সেই যে মাথা নীচু করেছে এখনও মাথা তোলেনি। কারণ, ফ্রন্ট মিরর আলোর দিকে তাক করা। আয়নায় তাকালে বারবার মেঘালয়ের চোখদুটো দেখতে পাচ্ছে। তাছাড়া আলোর বারবার মনে হচ্ছে ডাক্তার সাহেব তার দিকে তাকাচ্ছে! অদ্ভুত তো!
রিনি গাল ফুলিয়ে ঠিকানা বলল মেঘালয়কে। গাড়ি চলতে শুরু করেছে। রিনির হঠাৎ করে ইচ্ছে করছে মেঘালয়ের হাত টেনে ধরে গাড়ি থেকে বের করে দিতে। কত নাটক করছে? প্রথমে যখন যেতে বলল তখন যেতে চাইল না। অমনি যখন জানতে পারল বউ যাচ্ছে। এবার বেহায়ার মতো নিজে সেঁধে সঙ্গে যেতে চাইছে! কই যাবে এই দুটো পাগলকে নিয়ে?

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৯