obsession vs love part 5
নিরুর কল্পনারাজ্য
–কার না কার বাচ্চা পেটে নিয়ে ঘুরছিস আর এখন এসে বলছিস বাচ্চার বাবা কেও না?
আইয়ুশ হুট করে মুখ খুললো। মুখায়ব তার চরম লাল। যেনো সে এক্ষুণিই সব ধ্বংস করতে চায়। অথচ শুধু বললো,
—এনাফ ছোট আম্মু। ও এখন অসুস্থ, ওকে এখন রেস্ট করতে দাও। এসব নিয়ে পরে কথা হবে।
তার এমন কথা শুনে ঝিলিক তাচ্ছিল্যে হাসে। শাহদাদ মির্জাও থামালেন স্ত্রীকে। কর্কশ কন্ঠে বললেন,
—চুপ করো তুমি!
অতঃপর মাথা নিচু করে বসে থাকা ঝিলিকের পানে চেয়ে বললেন,
—রুমে চলো মা। এখানে থাকার দরকার নেই তোমার।
শাহদাদ মির্জা মেয়েকে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। সকলকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
—এ ব্যাপারে কেও আর কোনো কথা বলবেনা। যা বলার আমিই বলবো!
অতঃপর তিনি ঝিলিককে নিয়ে সিড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেলেন। তাদের যাওয়ার পানে আইয়ুশ তাকিয়ে বিড়বিড় কর,
—ক্ষমা করে দিও আমায়, ঝিলিক!
এরপর ওসমান মির্জার কন্ঠ ভেসে এলো,
—আইয়ুশ, শোনো। ওই ছেলেকে যেখান থেকে পারো, যেভাবে পারো আমাদের সামনে নিয়ে আসবে।
শাহমীদ মির্জাও তাল মেলালেন,
—হ্যাঁ, আইয়ুশ। মির্জা বাড়ির মেয়ের গায়ে হাত দেওয়ার ফল গুণে গুণে শোধ করতে হবে ওকে। সামনে পেলে কেটে টুকরো টুকরো করবো। চেনেনি এখনো মির্জাদের!
আইয়ুশ কিছু বলেনা। মাথা যন্ত্রণা করছে ওর। একটা মানুষ আর কত চাপই-বা সহ্য করতে পারে? আইয়ুশ মাথা দুলিয়েই রুমে চলে আসে। রুমে আসতেই হঠাৎ সাঁঝকে দেখে বিরক্ত হলো সে। রুক্ষ স্বরে বাণী ছুড়লো,
—তুই এখানে কেনো?
সাঁঝ উইন্ডো সাইডে বসেছিলো। হঠাৎ আইয়ুশের এমন প্রশ্নে ভড়কে গেলো সে। তাড়িতে তার দিকে ফিরে জবাবে বললো,
—আপনি কী ভুলে গেলেন, কিছুক্ষণ আগেই তো আমাদের বিয়ে……
বাকিটা শেষ করতে পারেনা সাঁজ। তার আগেই আইয়ুশ ওকে থামিয়ে দেয়। বলে,
—লিমিট ক্রস করিস না সাঁঝ। বিয়ে নয়, ওটা–এগ্রিমেন্ট হবে। তুই প্লিজ এখন একটু অন্যঘরে যা। আমার খুব বেশি খারাপ লাগছে। একটু রেস্ট নিতে চাইছি।
সাঁঝ মলিন চোখে চাইলো। হ্যাঁ ঠিক। এগ্রিমেন্ট-ই তো। চুপচাপ বেড়িয়ে এলো সে। মনে মনে বললো,
—ভালোবাসা খুব বাজে জিনিস। যা মানুষকে কখনো এতোটাই নিচে নামায় যতটা নিচে নামলে হয়তো জাহান্নাম ও মেলে না।
শাহদাদ মির্জাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে ঝিলিক। মাথাখানা ঠিক বুক বরাবর। শাহদাদ মির্জা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। তিনি যে নীরবে জল ফেলছেন তা স্পষ্ট বুঝতে পারছে ঝিলিক। নীরবতা ভেঙে শাহদাদ মির্জা কান্নারত কন্ঠে বললেন,
—কেনো এমন করলে মামনি? বাবা কী তোমায় কম ভালোবেসেছে? তোমার কিছু হয়ে গেলে বাবার কী হতো?
ঝিলিক মুখ তুলে চাইলো। মলিন হেসে ফের বুকে মাথা ঠেকিয়ে শুধালো,
—আচ্ছা বাবা, ভালোবাসা কী অন্যায়?
শাহদাদ মির্জা চুপ করে রইলেন। ঝিলিক বলে গেলো,
—আমি তো শুধু ভালোবেসেছিলাম বাবা। আজ আমার ভালোবাসা আমাকে এই পরিস্থিতে নিয়ে এলো।
—ভালোবাসা অন্যায় নয় মা, কিন্তু ভুল মানুষকে ভালোবাসা অন্যায়।
—আচ্ছা বাবা, পৃথিবীতে এতো মানুষ থাকতে আমরা তাকেই কেনো চাই যে আমাদের সাধ্যেই থাকেনা? অথচ তার জন্য আমরা পুরো দুনিয়া পায়ে ঠেলে দিই!
—পৃথিবী এমনই মা। যার জন্য তুমি পুরো পৃথিবীকে পায়ে ঠেলবে সে-ই তোমাকে পা মারিয়ে চলে যাবে। চিন্তা করোনা মা, আমি আছি তো।
শাহদাদ মির্জার নজর এবার দরজার পানে গেলো। তিনি সেখানে আইয়ুশকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ব্যস্ত কন্ঠে বলেন,
—আইয়ুশ, ওখানে কেনো? ভেতরে এসো।
আইয়ুশ ঝিলিকের পানে তাকায়। আইয়ুশের নাম শুনেও মেয়েটা তার দিকে তাকায়নি। দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার বুক চিঁড়ে। মেয়েটাকে না দেখে সে থাকতে পারছিলোনা তাই তো শরীরের অজস্র ক্লান্তি নিয়ে ছুটে এসেছো। সে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় শাহদাদ মির্জার কাছ ঘেষে। রুক্ষ স্বরে বলে,
—কেমন আছে এখন ও?
—হাতের ক্ষতটা একটু গাঢ়।
এমুহূর্তে হঠাৎ তিনি মেয়েকে প্রশ্ন করে বসেন,
—মা, ছেলেটা কী করেছে তোমার সাথে? একবার বলো আমাকে।
ঝিলিক এবারে তাকায় আইয়ুশের পানে। আইয়ুশ চোখ ফেরায় না। তীক্ষ্ণ চোখে ট্রািজারের পকেটে হাত ঢুকিয়ে চেয়ে থাকে। ঝিলিক ব্যগ্র কন্ঠে বলে,
—সে আমায় ভালোবাসেনি বাবা। আমাকে আপন করার প্রতিজ্ঞা করে অন্যকারো সাথে ঘর বেধেছে। আমাকে ব্যবহার করেছে। আমার দেহের মোহে অভিভূত হয়েই হয়তো সে আমায় কাছে টেনে নিয়েছিলো, অথচ আমি ভেবেছিলাম সে আমায় ভালোবাসে। কী বোকা আমি, তাই না বাবা?
আইয়ুশের মুখমন্ডল তড়িৎগতিতে পরিবর্তিত হয়।
অগ্নিঝরা দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ঝিলিকের পানে। সে ব্যবহার করেছে ঝিলককে? এমন বলার সাহস কীভাবে হয় তার?
শাহদাদ মির্জার চোখ ভরে এলো। যে মেয়েকে আজ অব্দি বকাটুকুও দেননি তাকে কিনা এভাবে কষ্ট দেওয়া হয়েছে। তিনি মেয়েকে বোঝালেন,
—না, মা আমার! সে তো একটা কাপুরুষ। যে নিজের সন্তানকেও স্বীকৃতি দিতে পারেনি….
আইয়ুশ হঠাৎ তাদের কথোপকথনের মাঝে বলে ওঠে,
—মেঝোআব্বু, তোমাকে আব্বু ডেকেছিলো৷
বড় ভাই ডেকেছে শুনে তিনি মেয়েকে বললেন,
—মা, আমি একটু আসি কেমন?
ঝিলিক মাথা নাড়ে। বলে,
—না, যেওনা তুমি।
—এক্ষুনি চলে আসবো মা। জরুরি কিছু হয়তো বা। আচ্ছা থাক, তুমি না বললবে পরে কথা বলে নিবো।
—ঠিকাছে যাও, তবে তাড়াতাড়ি এসো।
শাহদাদ মির্জা মাথা নাড়েন। ধীরে-সুস্থে উঠে ধীর পদক্ষেপে পা বাড়িয়ে বেড়িয়ে যান। আইয়ুশ দাঁড়িয়ে থাকে, একধ্যানে ক্ষতটার দিকে চেয়ে। ব্যান্ডেজকৃত হাত। নাড়তেও যেটা প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে তার। মেয়েলি চিকন স্বরে তার ধ্যান কাটে তবে বুকের ভেতর বয়ে যায় উত্থাল সমুদ্রের ন্যায় ঝড়ো হাওয়া,
—ডিভোর্স কবে দিচ্ছেন?
ডিভোর্স? আইয়ুশের দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হয়। তবু অভিব্যক্তি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলে,
—কী বললে?
—শুনতে পাননি? বিয়ে করেছেন আপনি; ঘরে বউ আছে আপনার এখন। সে-তো জানেও না যে আপনার প্রথম বউ ও আছে।
—মুক্তি চাইছো?
—চাইছি!
—যদি না দিই?
—বিয়ের কাগজ-পত্র সব আপনার কাছে। রেডি করে পাঠিয়ে দিবেন সাথে ডিভোর্স লেটার ও।
—বিয়ে করেছি প্রমাণ কী?
ঝিলিক কঠোর দৃষ্টিতে চাইলো তার পানে,
—এতোটা স্বস্তা বানিয়ে ফেলেছেন আমাকে যে বিয়ের প্রমাণও দিতে হবে? স্ত্রী হিসেবে অস্বীকার করছেন?
—তোমার কাছে কোনো প্রমাণ নেই বিয়ের; সুতরাং ডিভোর্স দেওয়া না দেওয়াতে কিছুই যায় আসেনা, ঝিলিক!
আইয়ুশ ডিভোর্সের ব্যাপারটা এড়িয়ে যেতে যেতে বললো। ওদিকে ঝিলিকের চোখে খেলে গেলো আফসোস, সত্যিই তার কাছে কোনো প্রমাণ নেই। বিয়ের কাবিননামা তো আইয়ুশের কাছে। একটা কপিও তার কাছে নেই। সে তো আর বুঝতে পারেনি পুরুষটা এমন বদলে যাবে।
—বিশ্বাস করেছিলাম আপনাকে। পরিবর্তে বুঝিয়ে দিলেন আসলে আপনি কখনো আমার ভালোবাসার যোগ্য-ই ছিলেন না।
আইয়ুশ কিছু বলেনা। চোখ ভরে আসতে চায় তার। শুধুমাত্র সে জানে ঠিক কতটা মানসিক যন্ত্রণা ধারণ করে সে প্রতিনিয়ত বেঁচে যাচ্ছে। না চাইতেও তাকে কঠোর হতে হয়,
—আমার কাছে এসবের কোনো মূল্য নেই; ছিলোনা কখনো। আমি শুধু আমার ফর্মালিটি পূরণ করার জন্য দেখতে এসেছি।
বলেই সে বেরিয়ে গেলো। এতোক্ষণ কঠিন পাথর হতে চাওয়া ঝিলিকের চোখ হুট করে ভিজে উঠলো। দু’হাত দ্বারা চোখ ঢেকে নিলো। সে যত চাইছে কঠোর হতে তত যেনো তার বুক ভেঙে কান্না পাচ্ছে। একটা মানুষ, যে তার ছিলো। সে এখন অন্য কারও। যার স্পর্শ তার গায়ে কলঙ্কের ন্যায় বিধে আছে তার কাছে নিজের মূল্য কখনোই ছিলোনা। এতকিছু কীভাবে সইবে সে? এসবের মাঝেই কাজিনমহলের সকলে লাইন ধরে একত্রে ঢুকে পড়লো তার রুমে। সবার আগে নির্ঝর এসে জড়িয়ে ধরলো ঝিলিককে। ভারাক্রান্ত স্বরে বললো,
—বনু, মাই লিটেল প্রিন্সেস! ঠিক আছিস তুই? কেনো এমন করেছিস? আমি কত ভয় পেয়েছি জানিস?
কাঁদো কাঁদো প্রায় অবস্থা তার। পর পর তিয়া চেঁচিয়ে উঠলো,
—সরো তুমি ছোট ভাইয়ু, আমাদের প্রিন্সেস ব্যাথা পাবে।
—তুই সর এখান থেকে। দেখছিস না ভাই-বোনের মধ্যে ইম্পরট্যান্ট কথা হচ্ছে। নাক গলাবিনা একদম।
তোতা তেঁতে ওঠে। অন্যপাশ থেকে গিয়ে ঝিলিককে জড়িয়ে ধরতে ধরতে বলে,
—আমাদেরও তো সুযোগ দাও।
অতঃপর এক এক করে তিয়া আর ঐশিও গিয়ে জড়িয়ে ধরে। তুলনামূলক ঐশির মনটা বেশিই খারাপ। দুয়ে-দুয়ে চার মিলে গেলো যে! তাদের চার ভাই-বোনের মাঝে মিলমিশ বেশি। যৌথ পরিবার হওয়ার দরুণ ছোট থেকেই একে অপরের প্রতি ভীষণ টান। এরইমাঝে সাঁঝ এলো। ঝিলিকের জন্য সুপ নিয়ে। তাদের সাবধান করে বললো,
—এই সর তোরা। ও ব্যাথা পাবে। সরে যা!
ঝিলিক তাকায় তার আপুর দিকে। হুট করেই সে অনুভব করে তার মনটা ভার হয়ে আসছে আবারও। কিছুক্ষণের জন্য যে আনন্দটা মনে লেগেছিলো তা ধীরে ধীরে গায়েব হয়ে গেলো। তার মনে পড়ে গেলো তার আপু শুধু তার আপু নেই আর। সে এখন তার নিজের জায়গা নিয়েছে। আইয়ুশের বউ হয়েছে। তবু তার মুখে লোক দেখানো হাসি ফুটে উঠলো। সে তার আপুকে বড্ড ভালোবাসে। তবু নিজের ভেতর কোথাও একটা আক্ষেপ অনুভব করলো। যেমনটা শত বছরের কোনো চাওয়া কেও হঠাৎ করেই বাতাসের গতিতে ছোঁ মেরে নিয়ে নিলে হয়। সাঁঝ এসে তার পাশে বসলো। বললো,
—এখন কেমন আছিস, মণি?
অল্প হাসে ঝিলিক। বলে,
—অনেকটাই ভালো আপু।
—হুম, শুধু ভালোনা। শক্তিশালী ও তো হতে হবে। নে, স্যুপ টা ফিনিস কর।
সাঁঝ চামচ এগিয়ে দিলো ঝিলিকের সামনে। ঝিলিক তা মুখে পুরতে পুরতে লক্ষ্য করলো–একটি সোনার নাকফুল! যা সাঁঝের সৌন্দর্য অনেকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সাঁঝ তুলনামূলক সবার থেকে একটু বেশিই ফর্সা। বাংলাদেশের তুলনায় তা অনেকটায়। তবু আজ কেনো যেনো ঝিলিককে তার পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবান এবং সুন্দর রমণী মনে হলো। অতঃপর তার মন কঠোর হয়ে এলো। যার মনে তাকে নিয়ে বিন্দুমাত্র মায়া তার জন্য তার কষ্ট পাওয়া ঠিক কতটুকু সাজে? মির্জা বাড়ির মেয়ে হিসেবে এবং ঝিলিকের আত্মসম্মানের সাথে তা একদমই সাজে না। নাহ! এখন থেকে ওই লোকটাকে নিয়ে আর কোনো কষ্ট পাবেনা সে। খুব সুখে থেকে দেখিয়ে দেবে সেও।
মির্জা’স গ্রুপের সিইও হওয়ার দরুণ আইয়ুশ বেশিরভাগ সময়ে কাজের বাহানায় অফিসে পড়ে থাকে। আজও একই। তবে কোনো কাজ নেই। যা আছে সবই চিন্তা। কপালে দু’হাত ঠেকিয়ে মাথা নিচু করে বসেছিলো সে। হঠাৎ রায়ান আসে,
—মে আই কামিন, স্যার?
আইয়ুশ ক্লান্ত ভঙ্গিতে মাথা তোলে।
—ইয়েস!
—স্যার, আপনার জন্য একটা পার্সেল এসেছে।
আইয়ুশের ভ্রু কুঁচকে উঠে। দ্বিধান্বিত স্বরে শুধায়,
—পার্সেল? কে পাঠিয়েছে?
—জানিনা স্যার, নাম নেই।
রায়ান এগিয়ে গিয়ে বক্সটা দিলো তাকে। আইয়ুশ ধীরে বক্সটা খোলে। শুরুতেই চোখে পড়ে একটি লিখা। যা তার মস্তিষ্কের ভাবনাগুলোকে আরও তীব্র করে ওঠে। কাগজটিতে লিখা–
obsession vs love part 4
‘THIS GIFT IS FOR NOT GETTING DIVORCED WITH JHILICK MIRJA. GOOD LUCK!’
From,
‘MK’
নিচে একটি ফোন। কাঁপা হাতে সে ফোনটা ওপেন করলো। মুহূর্তেই তার হৃদয় কম্পিত হলো। গর্জে উঠলো জোরে,
—ওহ শিট, নো! নো, নেভার।
