Tell me who I am 2 part 8 (2)
আয়সা ইসলাম মনি
কারান চুলগুলো পিছনের দিকে ঠেলে শান্ত গলায় বলল, “কারান চৌধুরি সবাইকেই সন্দেহের চোখে দেখে।”
মিরা কাঁধ হালকা সংকুচিত করে অন্য দিকে তাকিয়ে রইল, তার মনটা ভারী হয়ে এসেছে। কারান একবার তার দিকে তাকাল। এরপর চোখে স্নেহের আভাস নিয়ে বলল, “কিন্তু আমি তোমাকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করি।”
এবার মিরার মুখে কোমল হাসি ফুটে উঠল। কয়েক মিনিট পর সে হালকা সংকোচে বলল, “আচ্ছা কারান, তুমি আবার মাফিয়া-টাফিয়া ছিলে নাকি?”
কারান হালকা ঠোঁট বাঁকিয়ে জবাব দিল, “হোয়াট আ বিগ জোক! ওসব দুই আনার গ্যাংস্টারদের কারান কেয়ার করে, তোমার মনে হয়? তবে ওদের লিডার আমাকে বলতেই পারো।”
মিরা নাক ফুলিয়ে বলল, “তুমি একদম ত্যাড়া ত্যাড়া কথা বলবে না। সত্যি করে বলো, এই তুমি আবার গোয়েন্দা বিভাগের নও তো? তবে আমার তো তোমার হাবভাবে আন্ডারওয়ার্ল্ডের কেউই মনে হয়।”
কারান প্যানের তারকারি নাড়তে নাড়তে কপাল কুঁচকে বলল, “আবার বা’লের কথা শুরু করেছ! ওসব জিনিস আমার আন্ডারওয়্যারেরও যোগ্য না। কীসের সাথে কি তুলনা দিচ্ছ তুমি? রাজার সাথে নর্তকীর তুলনা দিলে চলবে?”
মিরা মুখ বেঁকিয়ে বলল, “তোমার সাথে কথা বলার থেকে নিজের চুল টানা অনেক ভালো। একে তো নিজে একটা একরোখা, তারপর উলটো পালটা বকে আমার মাথাটাও খারাপ করবে।”
কারান হালকা হেসে কাজে মনোযোগ দিল। তার ভাবলেশহীন চেহারা দেখে মিরা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলল। মনে মনে বলল, “সবই লুকিয়ে রেখেছে আমার থেকে। সমস্যা নেই, আমি তোমাকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করি। তবে আমার সত্যতা তোমাকে জানানোর আগে, তোমার সত্যতা আমাকে জানিয়ে দিও—এটুকুই চাওয়া।”
মিরার দৃষ্টি এবার কারানের রান্নার দিকে প্রবাহিত হলো। দেখল, প্যান থেকে শোল মাছের কালিয়া তুলে, সে এবার ভর্তা তৈরির জন্য একে একে উপকরণ সাজাচ্ছে; আলু, বেগুন, শিম, শাক, টমেটো, মাষকলাই ডাল, শুঁটকি মাছ, রুই মাছ, ডিম, পেঁয়াজ, মরিচ আর সরিষা—প্রতিটি উপকরণ আলাদা পাত্রে সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো হয়েছে।
মিরার জিভে জলের স্বাদ ঘোরা শুরু হলো। সে চেয়ার থেকে উঠে, প্রিপারেশন জোনের ওপর কনুই ঠেকিয়ে ঘনিষ্ঠভাবে দেখতে থাকল, কারান কী নিখুঁতভাবে বাঙালি খাবারের আয়োজন করেছে। ঠোঁটে একফোঁটা মুচকি হাসি খেলে গেল। এতটাই লোভনীয় লাগছে যে এখনই খেতে ইচ্ছে করছে তার।
কারান একসাথে কিছু পেঁয়াজ মরিচ কেটে নিল। যেগুলোতে শুকনো মরিচের ঝাঁঝ লাগবে, সেগুলো তেলে টেলে নিল। এরপর ভর্তা বানানোর কৌশল শুরু করল। আলু সেদ্ধ করে গরম গরম মাখা হচ্ছে, সাথে সরিষার তেল, কাঁচা মরিচ আর সামান্য লবণ দিয়ে দিল। বেগুনটা চুলার আগুনে পুড়িয়ে নিল, শিমের ক্ষেত্রে হালকা সেদ্ধ করে ঠান্ডা অবস্থায় মাখানো হচ্ছে, যাতে কচকচে স্বাদ থাকে।
রুই মাছের মাথা ভেজে মিহি করে বেছে নেওয়া হচ্ছে কাটা। টমেটোর ভর্তা করার আগে হালকা রোস্ট করা হলো, যাতে মিষ্টি আর ক্যারামেলাইজড স্বাদ মিশে যায়। শেষে উপর দিয়ে অল্প সরিষার তেল ছড়িয়ে দিল।
মিরা একাগ্র দৃষ্টিতে সবকিছু উপভোগ করছিল। অবশেষে দীর্ঘ নীরবতার পর সে বলল, “আমি একটু বাড়িতে কল দিই, বুঝছ?”
কারান মাথা নাড়িয়ে উত্তর দিল, “হ্যাঁ, যাও। আর বাবা গতকাল কল করেছিলেন।”
তৎক্ষণাৎ মিরার ভ্রূ কুঁচকে গেল। “গতকাল? কখন? আমাকে তো বললে না।”
“তাদের সঙ্গে আমার প্রায় প্রতিদিনই কথা হয়। নিতান্ত সাধারণ আলাপ। তাই তোমাকে আর বলিনি। বললেন সব ভালো আছে, আমরা যেন টেনশন না করি। আর যাওয়ার জন্য বারবার আমন্ত্রণ জানাচ্ছিলেন।”
মিরা হঠাৎ কারানের গলায় দুই হাত জড়িয়ে ধরল, কণ্ঠে আকুলতা মিশিয়ে বলল, “কারান, মা-ও প্রতিদিনই বলে। মাহিটাও আমাকে ছাড়া আর থাকতে পারছে না। চলো না, ঘুরে আসি। প্লিজ কারান, না করো না। প্লিজ…”
কারান তার কপালের ছোট ছোট চুল কানের পাশে গুঁজে দিয়ে কঠিন গলায় বলল, “আমি যতদিনে না সব অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করে নিজেকে গুছিয়ে তুলতে পারব, ততদিনে সম্ভব নয়।”
মিরা বিরক্ত স্বরে বলল, “এত কীসের কাজ বলো তো? আমার একদম ভালো লাগে না। কতদিন হলো মাহিটাকে দেখি না।”
“ভিডিও কলে তো প্রতিদিনই দেখো।”
মিরা ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল, “তো? ওকে জড়িয়ে ধরতে পারি না, একসাথে দুষ্টুমি করতে পারি না। কত যে আবেগ জমে আছে! তুমি এসব বুঝবে না।”
তারপর গলা নীচু করে কষ্টভরা কণ্ঠে বলল, “তোমাকে বুঝিয়েও কোনো লাভ নেই।”
কারান মিরার থুতনি আঙুলে তুলে মুখের দিকে তাকাল। বিষণ্ন মুখ দেখে তার গলা গম্ভীর হয়ে উঠল। “যাও, মাকে কল দাও। তবে এখানেই থাকবে, আমার কাছ থেকে দূরে যেও না।”
মিরা নাক সিটকে বলল, “ঠিক আছে।”
ড্রয়িং রুমের দিকে যেতে যেতে বিড়বিড় করল, “একটুখানি দূরে থাকাও সহ্য করতে পারে না।”
কারান তার চলে যাওয়ার দিকে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর মুখ কঠিন করে রান্নার দিকে মন দিল। এদিকে মিরা সোফায় গিয়ে বসল। মুহূর্ত পর নিজের পোশাক ঠিক করল, সামনের কাচে ভেসে থাকা প্রতিবিম্বে এক ঝলক তাকাল। তারপর দাঁড়িয়ে সিঁড়ির দিকে কয়েক পা এগোতেই হঠাৎ কারানের গলা গর্জে উঠল, “কোথায় যাচ্ছ?”
কারানের হঠাৎ বজ্রনির্ঘোষ চিৎকারে মিরার শরীর কেঁপে উঠল। ঘুরে তাকাতেই দেখল, কারান কটমট করে তার পানে তাকিয়ে আছে। বিবর্ণ হয়ে যাওয়া সেই চেহারার চোখের রংও মুহূর্তে পরিবর্তিত হয়ে গেছে।
মিরা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে অবাক কণ্ঠে বলল, “এ… এভাবে তো আর বাবা-মায়ের সামনে কথা বলতে পারব না। তা-তাই ওড়না আনতে যাচ্ছিলাম।”
কারান দ্রুত পায়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলো। কাছে এসে গম্ভীর স্বরে বলল, “আমি নিয়ে আসছি।”
মিরা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে বলল, “কিন্তু কারান, তোমার তো হাতে ব্যথা। আমি নিজেই আনতে পারি।”
“পায়ে তো ব্যথা নেই। তুমি সোফায় বসো।”
তারপর সামান্য ঝুঁকে মিরার কানে ফিসফিসিয়ে যোগ করল, “আর হ্যাঁ, আমার কাছ থেকে একবিন্দু আড়াল হওয়ার চেষ্টা করবে না।”
এই কথা বলে কারান অনমনীয় ভঙ্গিতে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে চলে গেল। তার মুখের আকস্মিক পরিবর্তন দেখে মিরার কপাল কুঁচকে উঠল। বিড়বিড় করে বলল, “এই লোকের হঠাৎ হঠাৎ হয় কী? আড়াল কোথায় হলাম আমি? যেভাবে চেঁচিয়ে উঠল—উফফ, ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলাম!”
সে মাথা এপাশ-ওপাশ নাড়িয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল এবং সোফায় গিয়ে বসল। কিছুক্ষণ পর কারান হাতে একটি সাদা ওড়না নিয়ে ফিরে এলো। মিরার গলায় সুন্দরভাবে ওড়নার প্রান্তটি সযত্নে গুঁজে দিতে দিতে তার দৃষ্টি স্থির রইল মিরার মুখে।
মিরা মুখ কুঁচকে বলল, “কি বিশ্রী দেখাচ্ছে দেখো! শার্টের সঙ্গে এমন ওড়না! তাও যদি স্কার্ট পরতাম।”
কারান গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে মুগ্ধ কণ্ঠে বলল, “সুন্দর লাগছে। অত্যধিক সুন্দর লাগছে।”
মিরা অবাক চোখে বলল, “আমার মনে হয়, আমি তোমার চোখে সুন্দর, কিন্তু আদোতে এতটা সুন্দরী নই।”
কারান এবার গম্ভীর সুরে বলল, “একটা কথা জেনে রাখো, আমার চোখে যে সৌন্দর্য প্রতিফলিত হয়, তা প্রকৃত অর্থেই অতুলনীয়। আর তুমি অপরূপা, ভুবনমোহিনী, স্নিগ্ধা, সুভাষিণী, সুহাষিণী, সুকেশিনী—এসব শব্দও তোমাকে সম্পূর্ণভাবে বর্ণনা করতে অক্ষম। তুমি সৌন্দর্যের চূড়ান্ত সংজ্ঞা। যে একবার তোমাকে দেখবে, সে নিজেকে ভুলে কেবল তোমাকেই দেখতে থাকবে।”
মিরা চুপ করে কারানের মুগ্ধ চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর কারান মিরার মাথায় আলতো চুমু খেয়ে রান্নাঘরের দিকে ফিরে গেল। মিরা কয়েক মুহূর্ত পর ঘুরে কারানের ব্যস্ত ভঙ্গির দিকে তাকাল, তারপর চোখ বুজে মাথা ডানে বামে নাড়িয়ে নিজের ভাবনাগুলো সরিয়ে দিল। অবশেষে মৃদু হেসে মমতাজকে কল দেওয়ার জন্য ফোন তুলে নিল।
সেই মুহূর্তে মমতাজ সকালের রান্নার কাটাকুটিতে ব্যস্ত। ডাইনিং টেবিলের ওপরে রাখা ফোনটা হঠাৎ বেজে উঠল। কপালে ভাঁজ ফেলে মমতাজ খানিকটা চিৎকার করে বললেন, “মাহি… ফোনটা তোল।”
এই সময় আব্দুর রহমান সামনের বারান্দায় বসে পত্রিকা পড়ছিলেন। স্ত্রীর কণ্ঠস্বর শুনে তিনি গলা উঁচু করে বললেন, “মেয়েটা রুমে বসে পড়ছে, পড়তে দাও। বিরক্ত করো না, নইলে আবার উঠে এসে গেম খেলা শুরু করবে।”
মমতাজ হাত ধুয়ে তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে রান্নাঘর থেকে বেরোলেন।
“তা অবশ্য ঠিক বলেছ। এমনিতেই পড়াশোনার ধারেকাছেও ওকে পাওয়া যায় না। আজ যেহেতু পড়ছে, পড়ুক। এত সকালে তো উঠেও না, পড়েও না। ইদানীং কীভাবে যে এত ভালো হয়ে গেল, তা আমিও ভেবে পাই না।”
আব্দুর রহমান স্ত্রীর ব্যঙ্গমিশ্রিত কথায় হেসে উঠলেন। তারপর খবরের কাগজের আরেক পৃষ্ঠা উল্টে চোখ বোলাতে লাগলেন।
মমতাজ টেবিলের কাছে এসে ফোনের পর্দায় তাকাতেই দেখলেন মিরার কল। মুখে প্রশস্ত হাসি ফুটে উঠল। কণ্ঠে উৎফুল্লতা ঢেলে চেঁচিয়ে বললেন, “ওগো, শুনছ? মিরু কল করেছে।”
আব্দুর রহমান সঙ্গে সঙ্গে পত্রিকা ফেলে উঠে দাঁড়ালেন। অদ্ভুত এক উৎকণ্ঠা ভর করল তার শরীরে। কাছে এসে বললেন, “ধরো ধরো, জলদি ধরো।”
মিরার সঙ্গে তাদের প্রতিদিনই কথা হয়, তবু প্রতিবার কল এলেই মনে করে—আজই প্রথম। কন্যার কণ্ঠস্বর যেন প্রত্যেকবার নতুন করে প্রাণ সঞ্চার করে দেয় বুকের ভেতর। মমতাজ প্রশস্ত হাসি নিয়ে ভিডিও কল রিসিভ করলেন। পর্দায় মিরার মুখ দেখেই যেন সমস্ত ঘরে এক মুহূর্তে প্রাণ ফিরে পেল।
মিরা হেসে বলল, “কেমন আছো, মা?”
মমতাজ পর্দার দিকে ঝুঁকে স্নেহভরা চুমু খেলেন। উচ্ছ্বাসমিশ্রিত সুরে বললেন, “আলহামদুলিল্লাহ, খুব ভালো। আর আমার মিরুটা কেমন আছে?”
“অনেক অনেক ভালো, মা। আমি অনেক ভালো আছি। মাহি কই? ও কি এখনো পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছে?”
পাশ থেকে আব্দুর রহমান ফোনের দিকে হাত বাড়িয়ে নিয়ে নিলেন।
“বাবার কথা জিজ্ঞেস করলি না, মা?”
মিরা চোখের কোণে আবেগ জমিয়ে বলল, “আসসালামু আলাইকুম, বাবা। কেমন আছো, তাই বলো?”
“ওয়া আলাইকুমুস সালাম, আম্মাজান। আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু বিয়ে দিয়ে কি মেয়েকে পর করে দিলাম? এতদিনেও একবারও এলি না বাড়িতে।”
মিরার মুখ মুহূর্তেই মলিন হয়ে গেল। বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। যেতে তো সেও চায়, কিন্তু কারান অনুমতি দিচ্ছে না। তাই দ্রুত কথা ঘুরিয়ে বলল, “জানো, আজ কারান তোমার মেয়ের জন্য একশ পদ রান্না করছে। ও কিন্তু খুব ভালো রান্না করে জানো, বাবা? তোমার মেয়েও এত ভালো রান্না জানে না।”
আব্দুর রহমান হেসে ফেললেন, “সেটা সেবার খাওয়ার সময়ই বুঝেছিলাম। তবে আরো একদিন জামাই এর হাতের রান্না খাওয়া তো যায়-ই। কি বলো, মমতা?”
মমতাজ হেসে বললেন, “তা তো খাবোই। ওরা আসুক একবার, সব হবে।”
মিরা হেসে গা বাঁচাল, কিন্তু ভেতরে অদ্ভুত এক অপরাধবোধ জমে রইল। রান্নাঘরে কারান সবই শুনছিল, কিন্তু নির্বিকার। জানত, সেও যদি এখানে এসে কথায় যোগ দেয়, আবার শুরু হবে চাপা প্রশ্ন, ‘কবে বাড়ি আসছ?’ আর সেই প্রশ্নের উত্তর তার জানা নেই।
তবু মমতাজ এবার আর থামলেন না। স্নেহভরা স্বরে বললেন, “আমি কিন্তু এবার আর কোনো বাহানা শুনছি না, মিরু। তুই কবে আসবি বল?”
মিরা চোখে আকুতি এনে বলল, “যাব তো, মা। কারানের কাজটা শেষ হলেই যাব।”
মমতাজ মৃদু অভিমানী গলায় বললেন, “সে জামাই না হয় অন্য সময় আসুক। কিন্তু তুই এসে পড়। ভালো লাগে না তোকে ছাড়া। ঘরটা কেমন নিস্তব্ধ হয়ে গেছে, জানিস? মাহিটাও এখন আর ঘরে মাতামাতি করে না, সবকিছু যে তোকে ঘিরেই ছিল। মেয়েটা কেমন জানি হয়ে গেছে ইদানীং!”
পাশ থেকে আব্দুর রহমান বললেন, “আর না করিস না। এবার চলে আয়, মা। বাবার কথা রাখবি না?”
মিরা একবার পিছনে কারানের দিকে তাকাল। দেখল সে ব্যস্ত, কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। তারপর ফিরে উজ্জ্বল হাসি দিয়ে বলল, “আচ্ছা বাবা, আচ্ছা মা। খুব জলদি আসছি। আর মা, এবার কিন্তু আমের আচার বানিয়ে রাখবে, অনেকদিন খাই না। আর বাবা, তুমি আমার দোলনাটা সারিয়ে রাখবে। ওখানে বসে তোমার চুল টানব, যেমনটা ছোটবেলায় দিতাম আর টাকা নিতাম। এবারও নেব। এবার এসে তোমার পাকা চুলগুলো একটা একটা করে তুলে দিব। আর প্রতি চুলের জন্য দুই টাকা, এতে কিন্তু কোনো ছাড় নেই।”
আব্দুর রহমান আর মমতাজ একসাথে হেসে ফেললেন। তাদের চোখে জল চিকচিক করছে। মমতাজ বললেন, “ও আমার সোনাটা, আমার লক্ষ্মীটা। মা, তুই শুধু চলে আয়, সব হবে সব। তোর পছন্দের সব পিঠে বানিয়ে খাওয়াব এবার।”
মিরা মুচকি হেসে বলল, “মাহিকে কিন্তু জানাবে না। ওর জন্য সারপ্রাইজ থাকবে এটা। আর ওই বান্দর কি ঘুমাচ্ছে?”
মমতাজ হেসে উত্তর দিলেন, “পড়ছে রুমে।”
মিরা অবিশ্বাস ভরা স্বরে বলল, “ও আবার পড়াশোনাও করে? দেখো গিয়ে শয়তানটা না পড়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।”
হঠাৎ আব্দুর রহমান গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, “তোকে একটা কথা জানানো হয়নি। এদিকে অনেক বড় কাহিনি হয়ে গেছে।”
আচানক আরিয়ান তীব্র ভঙ্গিতে রোমানার গাল দুটোকে নিজের হাতে শক্ত করে আবদ্ধ করল। চোয়ালে অদম্য দৃঢ়তা আর চোখে উন্মত্ত ক্রোধ নিয়ে বলল, “কারণ, জানো’য়ারের বাচ্চা তুই আমাকে ভালোবাসিস না। এই জীবন নিয়ে কি করব আমি? বা’লের একটা বউ জুটেছে, যে স্বামীকে দেখতেই পারে না। তোর সাথে প্রেম করব কবে আমি?”
রোমানা চোখ পাকিয়ে অন্যদিকে তাকাল।
“কেন, তোমার ইভানা আছে না?”
আরিয়ান তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে গালটা ছেড়ে জবাব দিল, “আবার শুরু করেছে! তোর মাথায় গোবর ভরা, জান। আরে বইন আমার, ওর সাথে আমার কোনো সম্পর্কই ছিল না। ও শুধু তোমার স্বামীকে পছন্দ করত, ব্যস এটুকুই।”
রোমানা গালে ব্যথা পেলেও মুখাবয়বে তার প্রতিফলন প্রকাশিত করল না। মুখ শক্ত করে গম্ভীর স্বরে বলল, “আচ্ছা, তাই?”
আরিয়ান এবার গভীর, ক্লান্ত একটি নিশ্বাস ছাড়লো। “উফফ… তুমি অফিসে গিয়ে যে কাণ্ডটা দেখেছিলে, ওটা ছিল সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত। কেমনে জানি, শয়তান শালী হঠাৎ সি’ডিউস হয়ে আমাকে চুমু দিয়ে বসেছে। আর সেটা দেখেই তুমি যা খুশি ভেবে নিয়েছ। সেই থেকে তুমি আর আমাকে রেসপেক্টের ‘র’-ও করো না। শতবার বলেছি, ওকে অনেক আগেই জব থেকে ফায়ার করেছি। তাই আর ওই প্রসঙ্গ তুলিস না, আমার মা।”
রোমানা ঠোঁট বাঁকিয়ে কটাক্ষ ছুঁড়ে দিল।
“হুম, আমি তো তোর মা-বোন লাগি, ব’লদের বাচ্চা। আর শোন, তোর ঠোঁট ওই মেয়ে খেয়ে ননভা’র্জিন করে ফেলেছে, তাই তোকে আর আমি চিনি না। দূরে গিয়ে মর। সর!”
আরিয়ান হালকা ব্যঙ্গের হাসি হেসে বলল, “কিন্তু তুমি যে তারও আগেই আমার উপর টু নীচ খেয়ে দিয়েছিলে, তার কী হবে?”
“তোর মেইন পয়েন্টে যে কামড় বসাইনি, এটা তোর ভাগ্য। যদিও ওই অকাজের জিনিসটাকে অকেজো করে দেওয়াই উচিত। যেন অন্য মেয়েদের গর্ভে বাত্তি না জ্বালাতে পারিস।”
আরিয়ান হাতটা আলতো করে তার কণ্ঠনালীতে জড়িয়ে ধরে গলায় কোমলতা এনে বলল, “ছাড়ো এসব। আর ক’দিনই বা বাঁচব? এই কয়দিন আমাকে নিজের করে নাও, আর সময় দাও। চলো, আমাদের ছোট্ট একটা রাজ্য বানাই। তুমি থাকবে সেই রাজ্যের রানি, আর আমি তোমার রাজা। ঝগড়াঝাঁটি করতে আর ভালো লাগছে না। এবার আমার হয়ে থাকো, প্রিয়দর্শিনী।”
রোমানার ঠোঁটে ক্ষণিকের হাসি ফুটল। কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই হঠাৎ আরিয়ানের গলা কেঁপে উঠল প্রবল কাশিতে।
রোমানা সজাগ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল, কণ্ঠে উদ্বেগ নিয়ে বলল, “কি হয়েছে?”
আরিয়ান নাক ঘষতে ঘষতে বলল, “সেদিন বৃষ্টিতে ভিজে অফিস থেকে ফিরতে হয়েছিল। মনে হয় ঠান্ডা লেগে গেছে।”
রোমানা কিছুটা সহানুভূতি প্রদর্শন করতে চেয়েছিল—মৃদুভাবে কথা বলতে মুখ খুলতেই, হঠাৎ আরিয়ান তার শাড়ির আঁচল ধরে নাক মুছা শুরু করল। রোমানার চোখ-মুখ কুঁচকে উঠলো, আঁচলটি টান দিয়ে বলল, “গিদোর একটা! যা গিয়ে টিস্যু ইউজ কর।”
মুখ ঘুরিয়ে যেতে যেতে বিড়বিড় করল, “এই আধবুড়ো দামড়াটাকে আবার আমি যত্ন করতে চেয়েছিলাম!”
আরিয়ান হেসে হঠাৎই পিছন থেকে তার আঁচলটি ধরে শক্তভাবে টান দিল। রোমানা পিছন ঘুরতেই আরিয়ানের বুকের সঙ্গে সংযুক্ত হলো। রোমানা সেখানে ছটফট করতে লাগল, তবে আরিয়ানের শক্ত আলিঙ্গন তাকে শিথিল হতে বাধ্য করল। গভীর আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আরিয়ান বলল, “একটু ভালোবাসো আমাকে। ম’রে যাচ্ছি তোমার অভাবে।”
রোমানাও হঠাৎ তাকে আলিঙ্গন করে ঢোক গিলে নিজেকে শান্ত করল। ঘরের নীরবতায় দু’জনের নিশ্বাসের গতি চলতে থাকল। দুজনের শরীরেই আবেশ ছড়িয়ে পড়ল। রোমানা চোখ বুঝে আরিয়ানের ঘাড়ে একটি কোমল চুম্বন রাখল। আরিয়ানের চোখে প্রশান্তির দীপ্তি আর ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল।
শান্ত গলায় বলল, “কতগুলো বছর আমাকে ভালোবাসো না, প্রিয়দর্শিনী। বড্ড স্বার্থপর তুমি।”
রোমানা কোনো শব্দ করল না; শুধু দীর্ঘ নিশ্বাসে তার সমস্ত আবেগ বাতাসে ছড়িয়ে দিল। তারপর আরও দৃঢ়ভাবে আরিয়ানের আলিঙ্গনে মিলিত হল। আরিয়ানও হেসে তাকে আরো জাপটে ধরে রাখল। দুজনেই চোখ বন্ধ করে মুহূর্তের নীরবতা উপভোগ করছিল, তাদের হৃদয়ের স্পন্দন এক হয়ে গিয়েছিল। প্রায় অনেকটা সময় কেটে গেল।
হঠাৎ আরিয়ান শীতল কণ্ঠে বলল, “তোমার কোলে ঘুমাব একটু, সারা রাত ঘুমাইনি।”
রোমানা হালকা হেসে আরেকটি চুমু দিল আরিয়ানের কাঁধে। বলল, “কতবার বলেছি, অফিসের কাজের জন্য সারা রাত জেগে থাকার দরকার নেই। কেন শোনো না?”
“কারানের মন তো জয় করতে হবে বলো?”
রোমানা একটু মুখ বেঁকিয়ে বলল, “কারান কি বাঘ না ভাল্লুক, যে এত ভয় পেতে হবে? আমার ভালো লাগে না আমার স্বামী সারা রাত আমাকে সময় না দিয়ে অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকে।”
আরিয়ানের চোখ বড় হয়ে গেল। মনপ্রাণে যেন বসন্তের ফুল ফুটল। চোখগুলো চকচক করতে লাগল। হুট করেই রোমানাকে জড়িয়ে ধরার হাত খুলে আকুল গলায় বলল, “আরেকবার বলো।”
রোমানা ভ্রূ কুঁচকে বলল, “কি বলব?”
“ওই যে বললে, ‘আমার স্বামী’। বলো না আরেকবার।”
রোমানা এবার মনে মনে জিভ কেটে অনুতাপ গোপন করল, আসলে কথাটা অন্তরের হলেও মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে। তারপর মাথা নীচু করে নিস্তরঙ্গ কণ্ঠে বলল, “সব কথা সিরিয়াসলি নিও না। তোমার ওই অফিসের দৃশ্যটা আমি আজীবনেও ভুলতে পারব না।”
আরিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে হতাশ গলায় বলল, “বাসায় থেকে আর কী-ই বা করব বলো? তোমার কাছে তো যেতে দাও না। তাই অফিসের কাজের ব্যস্ততায় নিজেকে ইচ্ছে করেই তোমার থেকে দূরে রাখি। একটা চুমুর শাস্তি আমাকে এত বছর ধরে না দিলেও পারতে।”
রোমানা চোখ কুঁচকে, ঠোঁটে অনমনীয় ব্যঙ্গ টেনে বলল, “ভুলে যেও না আমি সাওদা রোমানা। তোমার ঠোঁট ছিঁড়ে ফেলতে আমার হাত একটুও কাঁপবে না। আমি সহজে কাউকে ক্ষমা করি না। সেই সিনের কিছুই ভুলিনি, না ভুলব।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আরিয়ান দৃষ্টি গাঢ় করে জিজ্ঞেস করল, “‘এহজারা’ নামটা সবসময় বাদ দিয়ে কেন নিজের পরিচয় দাও?”
রোমানা ভ্রূ কুঁচকে হঠাৎ থমকে গেল।
“তোমাকে এই নামটা কে বলল?”
“তোমার সম্পর্কে যেহেতু সবই জেনেছি, স্বাভাবিক এটাও জানা। যাই হোক, তোমার বোনই বলেছে।”
রোমানার বুক ভরে উঠলো এক অদৃশ্য ভারে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে পা টেনে জানালার দিকে এগোল। বাইরে স্নিগ্ধ বাতাসে গাছের ডাল দুলছিল, আকাশে হালকা মেঘ ভেসে যাচ্ছিল। সেদিকে দৃষ্টিপাত করতে করতে নিশ্বাস ফেলে বলল, “ওটা বাবা রেখেছিল। বাবাই ডাকত। তাই এখন আর নিজের সাথে ওই নাম জুড়ি না, বাবাকে মনে পড়ে যায় খুব করে।”
আরিয়ান একটু উজ্জ্বল হেসে বলল, “তার মানে তোমার শর্ট নাম আর.এ?”
রোমানা কপাল কুঁচকে তীব্র ভঙ্গিতে তার দিকে এগিয়ে এলো। গলা শক্ত করে বলল, “শর্ট নেইম আবার কী? আমার পুরো নাম এহজারা সাওদা রোমানা। সংক্ষেপ করলেও এ.এস.আর হয়।”
“ওহ আচ্ছা। ধুর, এসব বাদ দাও। তুমি এবার আমাকে শুতে দাও।”
রোমানা ঠোঁট বাঁকিয়ে বিদ্রূপভরে বলল, “তোকে কি আমি ধরে রেখেছি? যা গিয়ে ঘুমা না।”
আরিয়ান নিজের অন্তর্লীন ক্ষোভ সংযত করতে হাত মুঠো শক্ত করল। আপনমনে বিড়বিড় করল, “দিল মুডটার বেয়াল্লিশটা বাজিয়ে…”
হঠাৎ করেই সে এগিয়ে এসে রোমানাকে এক ঝটকায় কোলে তুলে নিল। রোমানা চমকে উঠে ছটফট করতে লাগল। বিরক্ত কণ্ঠে বলে উঠল, “আরিয়ান, নামাও! আমার মেজাজ ভালো নেই। নামাও বলছি।”
কিন্তু আরিয়ান তার অনুনয়কে অগ্রাহ্য করল। সরাসরি বিছানায় গিয়ে ধীরে তাকে নামিয়ে দিল। রোমানা উঠে বসে পড়তেই ঠোঁট খুলে কিছু বলার চেষ্টা করল, কিন্তু তার আগেই আরিয়ান হঠাৎই রোমানার কোলের মধ্যে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল।
রোমানা চোখমুখ কুঁচকে বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। আরিয়ান তার হাতটি শক্ত করে টেনে নিজের মাথার ওপর রাখল। চোখ আধবোজা করে গভীর ক্লান্তি মিশ্রিত কণ্ঠে বলল, “হাত বুলিয়ে দাও, আমি ঘুমাব।”
রোমানা মাথা নেড়ে ঠোঁট টিপে কৌতুকভরা হাসি ছুড়ল। হঠাৎই আরিয়ানের চুলগুলো শক্ত হাতে ধরে টানতে লাগল। ব্যথায় আরিয়ান তড়িঘড়ি উঠে বসল। চোখের রক্তিম তেজে সে হাত উঠিয়ে রোমানার গালে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিল। রোমানা বিস্ময়ে চোখ বড় করে তাকাল, তারও চোখ ঝলসে উঠল। সে-ও পালটা হাত চালাল। আরিয়ানের গালেও পড়ল চড়।
দুজনেই কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে পরস্পরের চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে রইল। সেই চোখে যেন দাবানলের মতো ক্রোধ জ্বলন্ত। দুজনের মুখেই স্পষ্ট ব্যথার রেখা, তবুও কাউকেই দুর্বল মনে হচ্ছিল না।
কিন্তু হঠাৎই আরিয়ান ফেটে পড়ল হাসিতে। রোমানা চোখ সরু করল। হাসির ফাঁকেই আরিয়ান বলল, “বেবি, আজ আমি টু মাচ রোমান্টিক মুডে আছি।”
রোমানা নির্লিপ্তভাবে জবাব দিল, “তো?”
“কি তো? কাছে এসো না।” বলেই তার হাত টেনে রোমানাকে হুট করেই নিজের উপর ফেলে দিল।
কিন্তু রোমানাও সুযোগ হাতছাড়া করল না। মুহূর্তেই তার সুঠাম বাহুতে নির্দয়ভাবে দাঁত বসিয়ে দিল। আরিয়ান ব্যথায় হাত নাড়াতে নাড়াতে চিৎকার করে উঠল, “কুত্তীইইই! হাত ছাড়, জল্লাদ বউ! আমার হাত… আহ!”
অবশেষে রোমানা হাত ছেড়ে দিল, তবে ফেটে পড়ল হাসিতে। রসিক ভঙ্গিতে বলল, “ছাড়তে বলছ কেন, সোনা? এটা তো আমার লাভ ল্যাঙ্গুয়েজ।”
টানা হাসিতে তার চোখে পানি চলে এলো। এদিকে টিশার্টের ফাঁক গলে আরিয়ানের সুঠাম বাহু উন্মুক্ত হয়ে আছে। সেখানে দাঁতের দাগে ত্বক লালচে হয়ে উঠেছে। আরিয়ান হাত ঘষতে ঘষতে অসহায়ভাবে তাকাল রোমানার দিকে।
রোমানা তার হাতের দিকে ঝুঁকে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “আহারে, ব্যথা পেয়েছে অবলা বেচারাটা। খুব লেগেছে, বাবু?”
এরপর বিছানার কিনারায় দূরে গিয়ে বসলো। কঠিন গলায় বলল, “ঝাঁটার বারি চিনিস? আমি এখন এসব মুডে নেই। তবে একটা কাজ করতে পারো, আমার পা দুটো টিপে দাও। তাহলে হয়ত রোমান্স মুডে চলে আসব।”
আরিয়ান দাঁত খিঁচিয়ে তার পশ্চাৎদেশে হালকা লাথি মারল। বলল, “শালী, তুই কি আমাকে চাকর ভেবেছিস? আমি এই ঘরের মালিক।”
লাথিটা জোরে লাগেনি। তাই রোমানা রেগে গেল না। কিন্তু দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করে বলল, “আর আমি এই ঘরের মালকিন। কাজ করলে তুমিও মালিকের মতোই আনন্দ পেতে।”
আরিয়ান গজগজ করে জবাব দিল, “লাগবে না তোকে আমার।”
“ঠিক আছে,” বলে রোমানা পাশ থেকে মোবাইল তুলে অনায়াস ভঙ্গিতে টিপতে শুরু করল।
আরিয়ান হেডবোর্ডে মাথা ঠেকিয়ে দীর্ঘক্ষণ পা নাচাতে থাকল। অভিমানী দৃষ্টিতে রোমানার দিকে তাকিয়ে রইল। কিন্তু রোমানার ভ্রূক্ষেপের বিন্দুমাত্র দেখা গেল না। অবশেষে পরাজিত স্বরে, আমতা আমতা করে আওড়াল, “ওই জান…”
রোমানা ঠোঁটের কোন বক্রতর করে উদাস ভঙ্গিতে আঙুল চালিয়ে যাচ্ছিল মোবাইলের পর্দায়। আরিয়ান হাই তুলতে তুলতে টানটান কণ্ঠে বলল, “জাআআন…”
রোমানা ভ্রূক্ষেপ না করে নিস্পৃহ গলায় উত্তর দিল, “শুনছি।”
“এবার কাছে এসো, সোনা।”
“আগে সরি বলো।”
আরিয়ান কপাল কুঁচকালো। রোমানা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে যোগ করল, “সরি না বললে আসব না তো।”
যে কিনা জীবনে কাউকেই কখনো ‘সরি’ বলেনি, অথচ আজ বউয়ের সান্নিধ্য পেতে হলে স্বভাববিরুদ্ধ আত্মসমর্পণ করতে হবে। তাই অনিচ্ছাসত্ত্বেও কণ্ঠ ভারী করে বলল, “ঠিক আছে, সরি।”
রোমানা ভ্রূ তুলল, ঠোঁটে কুটিল রেখা টেনে বলল, “হয়নি।”
আরিয়ান বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। সাউন্ডবক্স অন করতেই ঘর ভরে উঠল চঞ্চল সুরে। প্রথমে তাল মিলিয়ে পা ঠুকতে লাগল। তারপর গানের সাথে গাইতে গাইতে শুরু করল নাচ,
“নাইন তোহার কাজরারী,
দিলওয়া পে কারে বম্বারি…”
তার এক হাত আকাশে উঠল, বুকের পেশি নাচিয়ে হাস্যকর ভঙ্গিতে নাচের তাল বাড়াল। রোমানা ঠোঁটে হাত চাপা দিয়ে হাসি আটকে রাখল, কিন্তু চোখের কোণে আনন্দ উথলে উঠল। রাজাদের মতো আধশোয়া ভঙ্গিতে, গালে হাত রেখে, কনুই বিছানার গদিতে ছুঁইয়ে, রোমানা উপভোগ করতে লাগল তার পাগলাটে স্বামীর উন্মত্ত নৃত্য।
আরিয়ান বুক দুলিয়ে গাইতে লাগল, “লপকে লা কামরিয়া এইছে, যেইসে লপকেলা বা সওয়ারি…”
হঠাৎ সে ঝটকা মেরে রোমানাকে ধরে টেনে নিল বুকে। অবাক চোখে স্তব্ধ হয়ে রোমানা তার দিকে তাকাল, আর পরক্ষণেই ফুটল অবাধ্য হাসি। আরিয়ান চোখ টিপ মারল, কোমরে জড়ানো হাতের দৃঢ়তা বাড়াল, আরেক হাত কপালে রেখে নৃত্যের অদ্ভুত ভঙ্গিমায় গাইল,
“সরি সরি কাহা তারু…
সরি সরি কাহা তারু
বডি দেহ মে ছুয়া কে
জান লেবু কাহে জানু জিয়াতে মুয়া কে…”
নিজের নৃত্যছন্দের সঙ্গে রোমানার কোমরও ছন্দময়ভাবে দুলাতে লাগল। ধীরে ধীরে তাদের দেহদোলন একাকার হয়ে গেল। আরিয়ান তার গাল রোমানার গালের সঙ্গে নিবিড়ভাবে ঠেকিয়ে দিল, আর গানের তালে তালে দুই গালের সংস্পর্শে মৃদু ধাক্কা লাগতে থাকল। সেই ক্ষণিক সংঘর্ষে তাদের অন্তরের গভীরে আলোড়ন তুলছিল।
রোমানার ঠোঁটের কোণে উল্লাসের রেখা প্রশস্ত হতে লাগল; সে মুহূর্তের মগ্নতায় ডুবে নাচকে উপভোগ করছিল সর্বান্তঃকরণে। দুজনের হাসি মিলেমিশে ঘরটা গুঞ্জরিত করে তুলল।
গানের শেষ লাইনে আরিয়ান রোমানাকে ঘুরিয়ে নিজের হাতে শুইয়ে দিল। এক ভ্রূ উঁচু করে সম্মোহনী গলায় বলল, “Now is it perfect, baby?”
রোমানা তার কবজি থেকে মাথা সরিয়ে আবার বিছানায় গিয়ে বসল। নাটকীয় ভঙ্গিতে চিবুক উঁচু করে বলল, “এভাবেও হবে না। অনেক সুন্দর করে বলতে হবে। যেন মনে হয় আমি এই ঘরের মালকিন বাঘিনী, আর তুমি আমার পোষা বিলাই।”
আরিয়ান দাঁত চেপে ঝুঁকে এসে ফোঁস করে বলল, “কু’ত্তারবাচ্চা, জুতার বারি মারব তোকে।”
রোমানা তৎক্ষণাৎ নিচে রাখা ঘরোয়া জুতার দিকে তাকাল। ঝুঁকে সেটা হাতে তুলে আরিয়ানের গায়ে ছুড়ে মারল। আঘাত এসে পড়ল আরিয়ানের উদরে।
কিন্তু আশ্চর্য! সে রাগ করল না। বরং ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি টেনে নিল।
রোমানা বিস্মিত চোখে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “শালা পা’গল-টাগল হয়ে গেল নাকি? হাসছে কেন? এখন আবার আমাকে জুতার বারি না মারলেই হলো!”
কিন্তু আরিয়ান অপ্রত্যাশিত ভঙ্গিমায় ঝুঁকে জুতাটা তুলে নিল। তারপরে ধীরে ধীরে রোমানার দিকে অগ্রসর হয়ে মেঝেতে বসে পড়ল। অবাক করা কোমলতায় রোমানার পা দুটো নিজের হাতে ধরে একে একে জুতা পরাতে লাগল। অর্থাৎ এই বউয়ের জন্য সে নিজের অহংকেও ত্যাগ করতে প্রস্তুত।
আরিয়ান ঠোঁটে হাসি টেনে বলল, “চরিইইই, আমার গুন্ডি বউ। এবার আমার কাছে এসো।”
রোমানা হতচকিত হয়ে গেল। বিস্ময়ে তার দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল আরিয়ানের দিকে। যাকে সে মুহূর্ত আগেই রাগের ঝোঁকে জুতো ছুঁড়ে মেরেছিল, সে-ই কিনা নিজের হাতে সেই জুতো পড়িয়ে দিচ্ছে, আবার বিনয়ের স্বরে ক্ষমাও চাইছে! রোমানার অন্তরে খানিকটা অপরাধবোধ উঁকি দিল। অস্বস্তির হালকা স্রোত বয়ে গেল মনের গহীনে।
কিন্তু আরিয়ান আবারও খুনশুটির সুরে বলল, “এবার ঠিক আছে, শালী?”
রোমানা ঠোঁট বাঁকিয়ে নরম হাসল, মুখ ফিরিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে বলল, “ঘরের জুতো এত যত্ন করে পরানোর দরকার ছিল না।”
আরিয়ান ধীরচালায় তার পাশে গিয়ে বসল। হেডবোর্ডে মাথা ঠেকিয়ে শ্বাস ফেলল ভারী ভঙ্গিতে। কণ্ঠ নরম হয়ে গেল, “তোমাকে কি আমি কোনোদিন অযত্নে রেখেছি? প্রতিটি ক্ষণ, প্রতিটি পরতে তোমার যত্ন নিতে চাই। শুধু আমাকে একটুখানি ভালোবেসে দেখাও। এখন আমাকে খাইয়ে দাও, বেবি… ভীষণ খিদে পেয়েছে।”
“কেন, তোমার হাতে কি ফোসকা পড়েছে নাকি? নিজের হাতে খাও। আল্লাহ তো দুটো হাত শুধু শুধু দেয়নি।”
এই উত্তর শুনে আরিয়ানের চোখে আগুন জ্বলে উঠল। ঠোঁট চেপে রাগে ফুঁসে উঠল। এক ঝটকায় রোমানাকে লাথি মেরে বিছানা থেকে নিচে ফেলে দিল।
রোমানা ধপ করে পড়তেই ব্যথায় ছটফট করতে করতে কোমর চেপে গোঙাতে লাগল, “ওহ আল্লাহহহ…! পরেরবার ঝাঁটার বারি যদি না মারি তোকে…”
আরিয়ান মুখ বেঁকিয়ে ব্যঙ্গাত্মক হাসি ছুঁড়ে দিল, “আল্লাহ তো বউকেও শুধু শুধু দেয়নি। বউ মানে স্বামীর আদর করবে, খাইয়ে দেবে। কিন্তু তুই বেয়াদব কোনো কাজের না!”
এ কথামাত্র সে বিছানা থেকে উঠে পা চালিয়ে সরে যাওয়ার উপক্রম করল। কিন্তু রোমানা হঠাৎ বিদ্রোহিণীর মতো হাত বাড়িয়ে তার পা চেপে ধরে এক টান দিল। ধপ করে পড়ে গেল আরিয়ান। আঘাতে তার হাঁটুতে এক চোরা ব্যথার ঝাঁকুনি বয়ে গেল।
Tell me who I am 2 part 8
এবার দুজনেই একসাথে ব্যথায় গড়াগড়ি খেতে লাগল। মুখ বেঁকে গোঙাতে লাগল। অথচ কয়েক মুহূর্ত পরেই দুজনের ঠোঁটেই হাসির ঢল নেমে এলো।
স্পষ্ট বোঝা যায়— এই দম্পতির ঝগড়া কোনো দিন শেষ হবে না। কেউ কাউকে ছাড়বেও না, আর তাদের সম্পর্কও ভাঙবে না কখনোই।
