Home স্নিগ্ধবিষ স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৪৪

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৪৪

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৪৪
সানজিদা আক্তার মুন্নী

অনেক বুঝিয়ে-শুনিয়ে, একপ্রকার জোর করেই নাজহার মুখ বন্ধ করে তাকে ঘরের ভেতর নিয়ে আসে তৌসির। দরজা ভেজিয়ে দিয়ে শান্ত স্বরে সে বলে, “তুমি যা বলছো ঠিক বলছো, কিন্তু এমনে গালি না দিলেও পারতা।”
​নাজহা রক্তচক্ষু মেলে তাকায়, “তো আপনার যদি এতই সহানুভূতি, তাহলে যান ওকে গিয়ে বিয়ে করুন! আমাকে কেন করছেন? ও এত পিরিত দেখায় কেন?”
উত্তপ্ত নাজহাকে সামলাতে তৌসির এক ঝটকায় ওর হাত ধরে নিজের বুকের কাছে টেনে নেয়। নিশ্বাসের দূরত্বে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে ওঠে, “হাঙ্গা ওরে করলে তোমার মতো সুন্দরী বউ পাইতাম কই শুনি? ভালো করছো যা করছো। কয়েকটা থাপ্পড় মারা উচিত আছিলো তোমার।”

​এ কথায় নাজহার ভেতরের আগুন কিছুটা হলেও স্তিমিত হয়। নিজেকে তৌসিরের আলিঙ্গন থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বলে, “জি, হয়েছে। সরুন, আমি চা খেয়ে আসি।”
​কিন্তু তৌসিরের হাত আলগা হয় না। পেছন থেকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সে, নাজহার উন্মুক্ত কাঁধে আলতো চুমু এঁকে দিতে দিতে বলে, “কিছু কথা জিজ্ঞেস করার আছে আমার।”
​বিস্ময়ে নাজহার চোখ বড় হয়ে যায়, “কী কথা?”
​তৌসির এবার নাজহাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নেয়। আলতো হাতে তার থুতনিটা উঁচু করে ধরে। নাজহার কপালে তখনো বিরক্তির স্পষ্ট ভাঁজ, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তৌসিরের দিকে তাকিয়ে সে পুনরায় জিজ্ঞেস করে, “কী কথা?”
​কয়েক মুহূর্ত নাজহার সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টির দিকে নির্নিমেষে তাকিয়ে থাকে তৌসির। এরপর তার কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে তুষারের মতো শীতল, “আমি যা প্রশ্ন করব তার শুধু হ্যাঁ না উত্তর দিবি। শুধু হ্যা আর না, বাড়তি কথা চুদা**বি না।”
​নাজহার ভ্রু আরও কুঁচকে যায়। তীক্ষ্ণ স্বরে সে বলে, “কী প্রশ্ন?”

​তৌসির এবার হিমঘোর স্বরে তার মোক্ষম প্রশ্নটি ছুঁড়ে দেয়, “পুষ্প তোর তিন নম্বর দাদির বোনের মাইয়া, আর না ও ধর্ষিতা! ও এসেছে শুধু তোর খোঁজ আর বাড়ির ভেতরের খবর নিতে, তাই না? হ্যাঁ অথবা না!”
​তৌসিরের হিমশীতল কণ্ঠের এই ধারালো প্রশ্নটা কোনো বিষাক্ত তীরের মতো সোজা এসে বিদ্ধ হয় নাজহার মস্তিষ্কে। এক লহমায় তার চারপাশের পৃথিবীটা থমকে যায়। সে স্তব্ধ হয়ে রয় ঠিক প্রবল বজ্রপাতে পুড়ে যাওয়া কোনো নিথর বৃক্ষ! চোখের তারায় ঘনীভূত হতে শুরু করে অবিশ্বাসের কালো মেঘ। যে সত্য সযত্নে অন্ধকারের চাদরে মোড়ানো ছিল, তা তৌসিরের মুখে শুনে নাজহার মনে হয় পায়ের তলার মাটি নিমেষেই সরে যাচ্ছে। বিস্ময়ের অতল গহ্বরে তলিয়ে যেতে থাকে তার অস্তিত্ব হতবিহ্বল, দিশেহারা নাজহা পাষাণমূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে। ​অবশেষে ঘোর কাটিয়ে ওঠে নাজহা। একপ্রকার অনুরাগহীন স্বরে সে জবাব দেয়, “হ্যাঁ। কেন, আমাকে এখনো বিশ্বাস হয় না?”
​কথাটা শুনে তৌসিরের ঠোঁটের কোণে তীক্ষ্ণ এক পশলা হাসি ফুটে ওঠে। ধীরে ধীরে নাজহার গলা থেকে হাত নামিয়ে আনে সে, আরেকটু কাছে ঘেঁষে হিসহিসিয়ে বলে, “বিশ্বাস করি বলেই প্রশ্নটা করছি।”

​নাজহা তৌসিরের চোখে স্থির দৃষ্টি রেখে জানতে চায়, “যদি না বলতাম, তাহলে কী করতেন?”
​তৌসিরের উত্তর আসে আদিম ও বুনো, “দুই টানে তোমার সাউয়া ফাইরা নিতাম।”
​কথাটা শুনে বুকটা কেঁপে উঠলেও নাজহা নিজেকে সামলে নেয়। তৌসিরের কাছ থেকে নিজের হাত সরিয়ে নিতে নিতে বলে, “পুষ্পের সাথে আমার কোনো যোগাযোগ বর্তমানে নেই। তবে অনুরোধ করছি ওকে জীবিত ছেড়ে দিন। নায়েম চাচাকে বলবেন না প্লিজ।”
​তৌসির নাজহার গলা থেকে হাত নামিয়ে এবার তার কোমর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। নির্লিপ্ত স্বরে বলে, “নায়েম সব জানে। জানার পরও কোন আক্কেলে কালসাপের নামে কবুল পড়ল কে জানে।”
​নাজহা অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলে, “আপনি কোন আক্কেলে এক বিশ্বাসঘাতকের সাথে সংসার করছেন? আপনিই বা তার থেকে কম কী?”

​এ কথায় তৌসির নাজহার চিবুক আলতো হাতে ধরে নিজের দিকে ফেরায়। মুচকি হেসে সে বলে, “তুমি বিষাক্ত, তবে সেই বিষ মারাত্মক নয়, স্নিগ্ধ।”
​একটু থেমে সে আবারো মৃদু হেসে মুগ্ধতার সুরে বলে, “বুঝলি নাজহা, তুই এমন এক বিষ, যার কোনো দাহ নেই; আছে শুধু স্নিগ্ধ সুধা।”
​নাজহা কথাগুলো শুনেও না শোনার ভান করে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করে, “বাদ দিন এসব নাটকের কথা। আমি জানি, কে আমায় কতটুকু বিশ্বাস করে। সরুন এখন, আমি চা খেয়ে আসি।”
​যাওয়ার আগে তৌসির তাকে আটকে রাখে। নাজহার গালে, গলায় তৃপ্তি নিয়ে কয়েকবার চুমু খায় সে। এরপর বাঁধন আলগা করে বলে, “যাও।”
​নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যখনই নাজহা দরজার দিকে পা বাড়ায়, ঠিক তখনই পেছন থেকে তৌসির বলে ওঠে, “আমি আগামীকাল ইন্ডিয়া যাচ্ছি।”
​কথাটা শুনে মুহূর্তের জন্য নাজহার পা থেমে যায়। কিন্তু সে কোনো অভিব্যক্তি প্রকাশ না করে শুধু ছোট্ট করে বলে, “ওহহ।”

​এটুকু বলেই সে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। এখন তৌসিরের সামনে থাকলেই কেবল ঝগড়া বাড়বে, তাই এই মুহূর্তে তার কাছ থেকে দূরে থাকাই নাজহার জন্য সবচেয়ে ভালো।
নাজহা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই তৌসির একরাশ ক্লান্তি নিয়ে বিছানায় ধপ করে শরীর এলিয়ে দেয়। শূন্য দৃষ্টিতে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতর জমিয়ে রাখা দীর্ঘশ্বাসটা সশব্দে ছেড়ে দেয় সে। আপন মনেই বিড়বিড় করে ওঠে, “যামু তো ইন্ডিয়া জিন্দা যদি না-ও ফিরতে পারি, না ফিরলেই ভালা!”
চোখ জোড়া সবেমাত্র বুজে এসেছে, ঠিক তখনই বুকপকেটে থাকা ফোনটা বেজে ওঠে। বড্ড অবহেলায় ফোনটা বের করে কানে ঠেকিয়ে ফিসফিসিয়ে ওঠে সে, “হুঁ, বল ইয়াদ।”
ওপাশ থেকে ইয়াদের গলা ভেসে আসে, “তুই নাকি ইন্ডিয়া আসছিস?”
তৌসির নির্লিপ্ত গলায় জবাব দেয়, “কেন? তোকে বলিনি?”
“বললে কি আর জিজ্ঞেস করতাম?”
“মনে ছিল না হয়তো। আইতেছি, সকালেই বের হমু। আমি, নাযেম, রুদ্র আমরা সবাই।”
“ওহ আচ্ছা। এক কাজ করিস, আসার সময় আমার জন্য কিছু কালা মাল নিয়ে আসিস। তোর কাছে তো বহুত আছে।”

“আচ্ছা, আনমু নে। তুই কিন্তু কাল পাটোয়ারী বাড়িতে আসিস। বড় ভাই কিছু বলছে?”
“বড় ভাইয়ের সাথে কথা হইছে। পাটোয়ারী বাড়িতে এখন সে আর তার স্ত্রী ছাড়া অন্য কেউ নাই।”
তৌসির একটু ভেবে বলে, “কিন্তু ইব্রাহিম পাটোয়ারী ছাড়া তো কথা আগানো সম্ভব নয়।”
“তিনিও কাল আসবেন বলে জানিয়েছে বড় ভাই। এখন দেখ, সামনে কী হয়।”
“আচ্ছা, আসার সময় ম্যাপগুলো গুছিয়ে নিয়ে আসিস কিন্তু!”
তৎক্ষণাৎ ইয়াদের মেজাজি উত্তর দেয় , “ওগুলো আগেই গুছানো শেষ। আমাকে অযথা জ্ঞান দিস না, জ্ঞান দেওয়া আমার একদম পছন্দ নয়।”
তৌসিরও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। গলাটা একটু শক্ত করে বলে, “এভাবে কথা বলবি না। বড় গলায় কথা বলা আমারও পছন্দ না।”

কথাটা শেষ করেই লাইনটা কেটে দেয় তৌসির। এই ইয়াদের স্বভাবটাই এমন ঘাড়ত্যাড়া, সবসময় গরুর মতো একগুঁয়ে কথাবার্তা বলবে। ওয়াসেমের সাথে তৌসিরের যতটা সহজে জমে যায়, ইয়াদের সাথে ঠিক ততটাই উল্টো বেশিক্ষণ বনতে চায় না কোনোভাবেই।
তবে এই মুহূর্তের বিরক্তিটুকু তৌসিরের মনের গভীরে থাকা আনন্দকে বিন্দুমাত্র ম্লান করতে পারে না। আজ পুরো দুই যুগ পর নিজের মায়ের পেটের আপন ভাইদের দেখতে পাবে সে! ভীষণ এক আনন্দে বুকটা শিহরণে কেঁপে উঠছে তৌসিরের। মনে হচ্ছে এক অনন্তকালের অপেক্ষা আর আক্ষেপের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। অবশেষে একই রক্ত, একই মায়ের তিন সন্তান দীর্ঘ এত বছর পর আবার একত্রে মিলিত হতে চলেছে! এর চেয়ে আনন্দের কি হয়?

আজ রাতের বয়স এখন সবে দশটা পেরিয়েছে, কিন্তু চারপাশের নৈঃশব্দ্য জানান দিচ্ছে কোনো এক শব্দাতীত শূন্য প্রহেলিকার। গ্রামের বুক থেকে দিনের সমস্ত রুক্ষ কোলাহল মুছে গিয়ে নেমে এসেছে এক অতীন্দ্রিয় নিস্তব্ধতা। অন্ধকারের চাদরে মোড়া বিস্তীর্ণ আকাশে মিটিমিটি জ্বলছে কয়েকটি নিঃসঙ্গ তারা। বারান্দার দিয়ে একফালি জ্যোৎস্না এসে লুটিয়ে পড়েছে মেঝের এক কোণে, আর রাতের হিমেল বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে হাসনাহেনার তীব্র, মাতাল করা সুবাস। বাতাসের প্রতিটি ঝাপটায় মিশে আছে বিষণ্ণতা আর শিহরণ। ​এই আলো-আঁধারির খেলায়, বারান্দার এক কোণে রাখা সোফায় স্তব্ধ হয়ে বসে আছে তৌসির। তার দৃষ্টি বাইরের ঘন অন্ধকারের দিকে প্রসারিত হলেও, সে আসলে অবগাহন করছে নিজেরই ভাবনার এক অতল সমুদ্রে।

​দূরে কোথাও একটা রাতজাগা পাখির ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। রাতের এই নিবিড় প্রহর, প্রকৃতির এই রহস্যময় রূপ আর তৌসিরের এই স্পন্দিত ধ্বনিহীন বিস্তৃতি সব মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে, প্রকৃতি তার সমস্ত রূপ আর রহস্য নিয়ে তৌসিরের সামনে কোনো এক অকথিত উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি খুলে বসেছে।
আগামীকাল তৌসির ইন্ডিয়া যাচ্ছে। এই একটাই চিন্তা এখন তার মগজ কুড়ে খাচ্ছে। যদি সে বেঁচে না ফেরে, কী হবে নাজহার? সদ্য প্রস্ফুটিত ফুলের মতো তার এই জীবন, নতুন দেখা স্বপ্নগুলো সব কি নিমিষেই শেষ হয়ে যাবে? এই অল্প বয়সেই যদি তার নাজহার কপালে বিধবার তকমা লেগে যায়! একরাশ গুমোট দুর্ভাবনা নিয়ে তৌসির স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে। ঠিক এমন ভাবনার মাঝে বারান্দায় আসে নাজহা তার হাতে কাঁচের অলিভ অয়েলের বোতল। তৌসিরের চোখেমুখে জমে থাকা বিষণ্ণ মেঘ সে হয়তো খেয়াল করে না, অথবা খেয়াল করেও নিজের মিষ্টি উপস্থিতি দিয়ে তা তাড়িয়ে দিতে চায়। তৌসিরের পাশে এসে দাঁড়ায় সে। তারপর তৌসিরের একটা পা নিজের পা দিয়ে আলতো করে সরিয়ে দিয়ে অনায়াসেই তার কোলে বসে পড়ে। আজকাল আর তৌসিরের পাশে বসার কোনো নিয়ম নেই তার। সোফা হোক, বিছানা কিংবা বারান্দার চেয়ার সবচেয়ে নিরাপদ আর আরামদায়ক জায়গা হলো তৌসিরের এই চওড়া কোল। ​তৌসিরের শক্ত, পেশিবহুল হাত দুটো স্বয়ংক্রিয়ভাবেই নাজহার ছিপছিপে কোমর জড়িয়ে ধরে। তাকে নিজের বুকের আরও গভীরে টেনে নেয়। টেনে নিতেই তৌসিরের ভেতরের সব ভয় নাজহার শরীরের উষ্ণতায় কর্পূরের মতো উড়ে যায়। সে নাজহার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে, “কী ম্যাডাম, কী মতলবে আইজ আমার কোলে?”

​নাজহা ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বোতলের মুখ খোলে। সামান্য একটু তেল নিজের নরম তালুতে ঢেলে নিয়ে বোতলটা তৌসিরের দিকে বাড়িয়ে দেয়। “হুম, ধরুন এটা। মতলবটা একটু পরে বলছি।” দুই হাতে আর গলার কাছে যত্ন নিয়ে তেল মাখতে মাখতে সে তৌসিরকে তাগিদ দেয়, “বোতলের মুখটা লাগিয়ে রাখুন তো।”
​তৌসির বোতলের মুখ আটকে সেটা পাশের টেবিলে রেখে দেয়। তারপর নির্ভরতায় নাজহার মসৃণ কাঁধে নিজের থুতনিটা রাখে। তার নিঃশ্বাসের উষ্ণতা ছুঁয়ে যায় নাজহার ঘাড়। নাজহা মুখ ফিরিয়ে তৌসিরের চোখের দিকে তাকায়। চোখে কৌতূহল নিয়ে নরম স্বরে বলে, “এবার আমার মতলবটা শুনুন।”
​তৌসির নাজহার তেলমাখা ডান হাতটা নিজের মুঠোয় তুলে নিয়ে সেই হাতে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলে, “বলুন ম্যাডাম, আপনার কী মতলব?”
​নাজহা ভীষণ আগ্রহ নিয়ে তৌসিরের চোখের দিকে তাকায় “আমাকে দুদিনের জন্য আমার বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দিন না! আপনিও তো কাল ইন্ডিয়া চলে যাবেন, এখানে আমি একা একা কী করব? তাছাড়া বিয়ের পর থেকে তো আর যাওয়াও হয়নি। ঘুরে আসি?”
কথাটি শুনে কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে থাকে তৌসির। কী একটা ভাবে। তারপর সম্মতি দিয়ে বলে, “আচ্ছা, যাবে। কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু আমার একটা কথা মানতে হবে।”

“কী শর্ত?”
“আমি যে ইন্ডিয়া যাচ্ছি, এই কথাটা যেনোও তোমার বাড়ির কেউ না জানতে পারে।”
বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নেড়ে নাজহা বলে, “আচ্ছা, ঠিক আছে।”
শর্তে রাজি হয়েই নাজহা একটু বেশিই স্বস্তি পায়। একটু নড়েচড়ে বসে ও। তৌসিরের ডান উরুতে নিজের শরীরের সমস্ত ভার ছেড়ে দিয়ে পা দুটো তুলে নেয় সোফার ওপর। তৌসিরও তাকে সাপোর্ট দিয়ে নিজের আরও কাছে টেনে নেয়। তৌসিরের উন্মুক্ত শরীরের ওপর চাঁদের আলো এসে পড়েছে। তার গায়ে কোনো শার্ট নেই। নাজহার চোখের সামনে এখন তৌসিরের সুগঠিত শরীরটা জ্বলজ্বল করছে। চওড়া আর পাথরের মতো পেশিবহুল কাঁধ, যার নিচে প্রশস্ত আর ভরাট বুক। পেটে মেদের কোনো অস্তিত্বই নেই, বরং সেখানে নিখুঁতভাবে খোদাই করা সিক্স-প্যাক আর পেটের দুই পাশের অবলিকস পেশিগুলো চমৎকারভাবে ফুটে আছে। ফোরআর্মের স্পষ্ট, স্ফীত শিরাগুলো জালের মতো ছড়িয়ে আছে যা তার ফিটনেস আর শক্তির প্রমাণ দিচ্ছে। ​নাজহা মুগ্ধ চোখে তার শরীর পরখ করতে থাকে।সাথে ওর নরম আঙুলগুলো আপনমনেই ছুঁয়ে যায় তৌসিরের পেশিবহুল পেট। প্রতিটি অ্যাবসের খাঁজে খাঁজে আঙুল বুলিয়ে দিতে দিতে নাজহা আনমনেই তৌসিরের মুখের দিকে তাকায়। ​নাজহার এই মুগ্ধতা তৌসিরের নজর এড়ায় না। সে মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করে, “কী দেখো এত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে?”
ধরা পড়ে গিয়েও দমে যায় না নাজহা। ঠোঁট উল্টে কপট অবজ্ঞার সুরে বলে, “কী আর দেখব? আপনার শরীরটা দেখতে সুন্দর লাগে, তাই দেখি।”

​তৌসির এবার কিছুটা দুষ্টুমির সুরে, চোখ টিপে বলে, “আর দেখিও না, পরে আবার তোমার নজর লাইগ্যা যাইব!”
​কথাটা শুনে কৃত্রিম রাগে ফুঁসে ওঠে নাজহা চোখ বড় বড় করে বলে, “আপনি যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকেন? কই, তখন তো আমি বলি না যে আমার নজর লাগছে!”
​নাজহার এই মিষ্টি অভিমান আর রাগে তৌসিরের ভারী হয়ে থাকা মনটা এক নিমেষেই হালকা হয়ে যায়। সে শব্দ করে হেসে ওঠে, আর আগামীর সব দুশ্চিন্তা ভুলে নাজহাকে আরও শক্ত করে নিজের বুকে জড়িয়ে নেয়।
তৌসির নাজহাকে নিজের বুকের মধ্যখানে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে হাসিমাখা কণ্ঠে বলে ওঠে, “দেখ, যত ইচ্ছা দেখ। আমার সবকিছু তো তোর জন্যই বরাদ্দ, আমার সবুজ নাগিন।”

নাজহা তৌসিরের প্রশস্ত বুকে মাথা এলিয়ে দেয়। এই বুকটা এখন তার জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠেছে এই বক্ষপুট ছাড়া আর কোনো নিরাপদ জায়গা সে খুঁজে পায় না। হঠাৎ এক মৌনতা ভেঙে তৌসির বলে ওঠে, “আমি তো যাইতেছি। যদি আর ফিরতে না পারি, তাইলে কী করবা তুমি?”
কথাটি শোনামাত্রই নাজহার বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে। সে তৌসিরের বুক থেকে মাথা তুলে উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তাকায় তার দিকে, “এমন কেন বলছেন? ফিরবেন না মানে?”
তৌসির হালকা হাসে। নাজহার চুলে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে, “আরে ফিরমু তো! আমি এমনেই জিগাইলাম। ধরো, যদি না ফিরি?”
এ কথা শুনে নাজহা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকে। তারপর ধীর গলায় বলে , “অপেক্ষা করব!”
“কত বছর?”
“যত বছর আপনার দেখা না পাই, তত বছর।”
“আর যদি শুনো মারা গেছি?”

​তৌসিরের কণ্ঠের এই একটি মাত্র বাক্য নাজহার কানে সীসার মতো ভারী হয়ে বাজে। কথাটি শোনামাত্র নাজহার বুকের ভেতরটা হঠাৎ হাহাকার করে ওঠে। এক মুহূর্তের জন্য পুরো পৃথিবীটা থমকে দাঁড়ায়, চারপাশের সব শব্দ নিঃশব্দ হয়ে যায়। নাজহার কলিজার ভেতরটা অবশ হয়ে আসছে, কেউ ধারালো কোনো অস্ত্র দিয়ে হৃৎপিণ্ডটা ছিঁড়ে ফেলছে। এক অজানা আশঙ্কায় তার তপ্ত নিঃশ্বাসগুলো গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসছে।
​নাজহা কোনো কথা বলতে পারছে না, তার কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে গেছে । সে অস্থির চোখে, একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে তৌসিরের দিকে। সেই চোখে যেমন আছে তীব্র শূন্যতা, তেমনি আছে গুমরে মরা আর্তনাদ। তার শান্ত শরীরটা এখন এক অশান্ত আগ্নেয়গিরির রুপ ধারণ করেছে, যার ভেতরে সবটুকু আবেগ তছনছ হয়ে যাচ্ছে। তৌসিরের পাথরের মতো সুঠাম দেহের দিকে তাকিয়ে নাজহা শুধু ভাবছে এই মানুষটা ছাড়া তার অস্তিত্বের আর কোনো মানে কি অবশিষ্ট থাকবে? নাজহার স্থির চাউনি নিঃশব্দেই তৌসিরকে মিনতি করছে, এমন নিষ্ঠুর রসিকতা যেন সে আর দ্বিতীয়বার না করে।

কিছুক্ষণ স্থির থেকে নাজহা হঠাৎ ছিটকে সরে যায়। তৌসিরের কাছ থেকে এক লাফে উঠে দাঁড়িয়ে সে অভিমানী গলায় চেঁচিয়ে ওঠে, “একটু সুন্দর মুহূর্ত আমাদের মধ্যে এলেই আপনি শুরু করে দেন আপনার এইসব বকওয়াস বকাবকি! আসব না আমি আর আপনার কাছে। আমাকে কষ্ট দিতে খুব ভালো লাগে আপনার, তাই না? তাই এই কথা বললেন?”
এই বলে সে রাগে গজগজ করতে করতে ঘরের দিকে পা বাড়ায়। ঠিক তখনই তৌসির চটজলদি উঠে দাঁড়িয়ে ওর হাতখানা খপ করে চেপে ধরে। এক টানে নিজের একেবারে মুখোমুখি দাঁড় করায় তাকে। তারপর নাজহার অগোছালো খোঁপা আর তার অবাধ্য চুলগুলোতে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে, “আমি তো মরি নাই! শুধু এমনি বলছিলাম, আর তুই এমনে ফ্যাত ফ্যাত করস ক্যান?”
নাজহা তৌসিরের বুকে হালকা ধাক্কা দিয়ে বলে, “না, বলতে হবে না! সরুন আমার কাছ থেকে। ভালো কিছু তো চান না আপনি, ভালো কিছু হলে
কথাটা শেষ হতে না হতেই এক তীব্র অধিকারবোধে তৌসির নাজহার চুলের একগুচ্ছ নিজের শক্ত মুঠোয় আবদ্ধ করে নেয়। এরপর আর কোনো সুযোগ না দিয়েই নাজহার কম্পমান, রক্তিম ঠোঁটজোড়া সে ডুবিয়ে দেয় নিজের ঠোঁটের উষ্ণ আশ্রয়ে। এই আকস্মিকতায় নাজহার কোনো আপত্তিই নেই বরং মোহাবিষ্টতায় সে নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করে দেয় তৌসিরের কাছে। নিঃশব্দে দু’পা এগিয়ে এসে সে নিজের পা জোড়া তুলে দেয় তৌসিরের পায়ের পাতার ওপর,কারণ দুজনের মাঝে আর এক বিন্দু দূরত্বের অস্তিত্বও সে রাখতে চায় না।

আবেগের প্রবল জোয়ারে নাজহার এক হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরে তৌসিরের ঘাড়ের পেছনের অবাধ্য চুলগুলোকে। তার নরম আঙুলগুলো তৌসিরের চুলের গভীরে এক অস্থির, ব্যাকুল আশ্রয়ের খোঁজ করে ফেরে এই স্পন্দিত স্পর্শটুকুই এ মুহূর্তে পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল থামিয়ে তাকে স্থির থাকার ভারসাম্য জোগাচ্ছে। তারপর অন্য হাতে অতি আদরে তৌসিরের উষ্ণ ঘাড়ে ছুঁইয়ে দিতে দিতেই একরাশ মুগ্ধতা আর প্রণয়ের নিবিড় আবেশে নাজহা ধীরে ধীরে নিজের চোখ দুটো বুজে নেয়। তৌসির সঙ্গ সে পুরোটাই দেয়।
তৌসির প্রচণ্ড অস্থির হয়ে ওঠে। সে নাজহার পরনের জার্সিটা খুলে নিতে চায়। গরমের কারণে কামিজ বদলে কেবল এই জার্সিটাই গায়ে জড়িয়েছে নাজহা। সে সাধারণত নিজের রুমের ভেতরেই এমন পোশাক পরে কারণ বাড়িতে দেবর, ভাসুর, চাচা, মামা মিলিয়ে কত মানুষের আনাগোনা, সবার সামনে তো আর এমন ছোট কাপড় পরা যায় না। নাজহা তৌসিরের কাছ থেকে নিজেকে কিছুটা ছাড়িয়ে নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, “একটু দাঁড়ান, এখানে নয়। চলুন, রুমে যাই।”

নাজহার বলতে যতটুকু দেরি হয়, তৌসিরের তাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিতে এক মুহূর্তও দেরি হয় না। রুমে গিয়ে নাজহাকে অতি আদরে বিছানায় শুইয়ে দেয় । ঘরের আলো আগে থেকেই নেভানো। নাজহা তৌসিরের বুকে আর গলায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে নরম স্বরে বলে, “এত অস্থির হওয়ার কী আছে? আমি তো আপনারই বউ, কোথাও তো আর পালিয়ে যাচ্ছি না। রিল্যাক্স, তৌসির।”
তৌসির একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, “আর রিল্যাক্স মারাইস না ছিনাল! কলিজায় আগুন লাগিয়ে দিয়েছিস তুই।”
এ কথা শুনে নাজহা খিলখিল করে হেসে ওঠে। সে তৌসিরের কাঁধে হাত রেখে ফিসফিসিয়ে বলে, “কাছে আসুন।”
“কতটা কাছে?”
“ততটা, যতটা কাছে এলে আপনার প্রতিটা নিঃশ্বাসের শব্দও আমি স্পষ্ট শুনতে পাব ততটা কাছে।”
এ কথা শুনে তৌসির নাজহার দুই গালে হাত রেখে একেবারে তার সন্নিকটে এসে বলে, “এই তো, এলাম।”
“হয়নি, আরও আসুন।”
তৌসির এবার মুচকি হেসে নাজহার গালের একপাশে, ঠোঁটের ঠিক কোণে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে হিসহিসিয়ে বলে, “এলাম তবে।”
নাজহা তৌসিরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আবেশ জড়ানো কণ্ঠে বলে, “এভাবেই থাকুন।”
বেশ অনেকটা সময় পর।

তৌসির বালিশে কনুইয়ের ভর দিয়ে হাতের তালুতে মাথা রেখে একদৃষ্টে নাজহাকে দেখে যাচ্ছে। রাত এখন প্রায় চারটে বাজতে চলল। নাজহা তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বেঘোরে ঘুমোচ্ছে। এই তো একটু আগেই নাজহাকে ঘুমোনোর সুযোগ দিয়েছে সে। কাঁদতে কাঁদতে ও তো একদম নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছিল। এখনও তার ঘুমন্ত চোখের কোণে কান্নার ছাপ স্পষ্ট। নিজেই আগে বলবে ‘কাছে আসুন’, আর তারপরই শুরু করবে ‘দূরে সরুন, মরে যাচ্ছি, শরীর জ্বলছে, এই হচ্ছে, ওই হচ্ছে, আমি বাড়ি যাব, আব্বার কাছে যাব, আপনার নামে বিচার বসাবো’ আরও কত কী! তৌসির এসব ভেবে আপন মনেই হাসে।
নাজহা নিজের বয়সের তুলনায় অনেক বেশি পরিণত মনের পরিচয় দেয়। সে সব সময়ই তৌসিরকে খুশি করতে নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করে। নিজের এত কষ্ট হওয়ার পরও সে নির্দ্বিধায় বলে, ‘আপনি সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত আমি ঘুমোব না।’ নাজহার কাছ থেকে এতটা কখনোই আশা করেনি তৌসির। মেয়েটা তার জন্য যা করছে, তা প্রত্যাশার সব সীমাকে ছাড়িয়ে গেছে।
তৌসির নাজহার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে অত্যন্ত মলিন গলায় অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে, “এটাই হয়তো আমাদের শেষ মিলন।”
কথাটুকু বলেই সে নিজের ঠোঁটের কোণে এক তিক্ত হাসির রেখা টেনে নেয়।

তৃষ্ণার গায়ের উত্তাপ এখন অনেকটাই স্তিমিত হয়ে এসেছে, কিন্তু ভেতরের দহনটা কিছুতেই জুড়াতে চাইছে না। ব্যালকনির এক কোণে রাখা সোফাটায় সে এক মূর্তির মতো বসে আছে। ঘুটঘুটে নীরবতায় ডুবে থাকা এই বিশাল বাড়িটায় আজ সে বড্ড একা। জ্বরের ঘোরে দুর্বল শরীরটার ওপর রাজ্যের ক্লান্তি, তার সাথে মিশেছে অস্বস্তি আর বুক-চাপা ভয়। তবু সে অন্ধকারের দিকেই শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে বসে আছে। সকালবেলায় যে ওয়াসেম বেরিয়ে গেছে, এখনো ওয়াসেম ফিরে আসেনি। তৃষ্ণা এই চার দেয়ালের মাঝে জ্বরে ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে, সেটুকু খোঁজ নেওয়ার সামান্যতম তাগিদও ওয়াসেম তো অনুভব করে না। করলে তো একটবার দিনে আসত। তবে অবাক করা বিষয় হলো, এই চরম অবহেলায় তৃষ্ণার বুকে আজ আর নতুন করে কোনো রক্তক্ষরণ হয় না। ওয়াসেমের দেওয়া তীক্ষ্ণ বাক্যবাণ আর অবিরত আঘাত তার হৃদয়টাকে পুড়িয়ে এমন এক ধূসর ছাইয়ে পরিণত করেছে যে, সেখানে নতুন করে আর কোনো আঘাতের দাগ বসে না। তাই আজ তার মনে কোনো অভিযোগ নেই, কোনো অভিমানও নেই। বুক চিরে শুধু বেরিয়ে আসে এক দীর্ঘশ্বাস। রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে সে আপন মনেই ফিসফিস করে ওঠে, “আজ যদি আমি এতিম আর অবহেলিত না হতাম তাহলে হয়তো আমারও একটা সুন্দর সংসার হতো!”

শূন্যতায় ভাসতে থাকা সেই ভাবনার মাঝেই হঠাৎ বাইরের নিস্তব্ধতা চিরে একটা শব্দ ভেসে আসে। তৃষ্ণা দৃষ্টি ঘুরিয়ে উঠোনের দিকে তাকাতেই দেখে, অন্ধকারের বুক চিরে একজোড়া হেডলাইটের আলো এসে থেমেছে সেখানে। একটা গাড়ি। অসুস্থতার কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে সে তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ায়। টলমলে পায়ে, বুকভরা এক অস্থিরতা নিয়ে সে ছুটে চলে নিচের দিকে, দরজাটা খুলে দেওয়ার জন্য। ভারী কাঠের দরজাটা খুলতেই বাইরের দমকা হাওয়ার সাথে এক দৃশ্য এসে আছড়ে পড়ে তার চোখের সামনে। দুজন উগ্র সাজের অপরিচিত মেয়ের কাঁধে ভর দিয়ে টলতে টলতে দাঁড়ানোর বৃথা চেষ্টা করছে ওয়াসেম। মেয়েগুলোর সাজপোশাক স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছে, এরা রাতের শহরের কোনো নাইট ক্লাবের মেয়ে। ওয়াসেম এতটাই মাতাল যে, নিজের শরীরের ভারটুকুও সে বইতে পারছে না। দরজার ওপাশে তৃষ্ণার ফ্যাকাশে, অসুস্থ মুখটার দিকে তাকিয়ে মেয়ে দুটোর মধ্যে কোনো বিকার দেখা যায় না। তারা একপ্রকার অবজ্ঞার সাথেই ওয়াসেমকে তৃষ্ণার দিকে ঠেলে দিয়ে যান্ত্রিক গলায় বলে ওঠে, “ম্যাম, উনাকে সামলান।”

কথাটুকু বাতাসে মিলিয়ে যেতে না যেতেই তারা ঘুরে দাঁড়িয়ে উল্টো পথে হেঁটে মিলিয়ে যায় অন্ধকারে। ওয়াসেম কোনোমতে দরজার চৌকাঠে ভর দিয়ে নিজেকে সামলে নেয়। তারপর রক্তবর্ণ চোখ দুটো আধা-বোজা অবস্থায় রেখে, জড়ানো মাতাল গলায় আদেশ করে, “পানি আন, যা পানি আন।”
তৃষ্ণা একটি শব্দও উচ্চারণ করে না, নিঃশব্দে পা বাড়ায় পানির খোঁজে। লোকটার এই বিকৃত রূপটার প্রতি এক তীব্র ঘৃণায় তার ভেতরটা রি-রি করে ওঠে। ভাবে, একটা মানুষ ঠিক কতটা নিচে নামলে এমন নোংরা হতে পারে! কাঁচের জগে করে পানি নিয়ে আসতেই ওয়াসেম খানিকটা পানি নিজের চোখে-মুখে ছিটিয়ে দেয়, নিজেকে একটু সতেজ করার এক ব্যর্থ চেষ্টা। তারপর ঢকঢক করে বেশ কিছুটা পানি গিলে জগটা তৃষ্ণার দিকে এগিয়ে দিয়ে ঔদাসীন্যের সাথে বলে, “নে, দরজা লাগিয়ে দিস। আমি খেয়ে এসেছি।”

তৃষ্ণা ওয়াসেমের চোখের দিকে একবারও তাকায় না, নির্লিপ্ত হাতে জগটা নিয়ে নেয়। ওয়াসেম টলতে টলতে সিঁড়ি ভেঙে উঠে যায় ওপরের দিকে। অথচ, এই পুরো মাতাল দৃশ্যপটের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অন্য মনস্তত্ত্ব, এক অদ্ভুত পুরুষালি বোকামি। এই উগ্র মেয়েগুলোকে সে আজ ইচ্ছে করেই সাথে করে নিয়ে এসেছে, তৃষ্ণাকে এটা বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য যে, তার জীবনে তৃষ্ণার কোনো মূল্য নেই। ওয়াসেমের অবচেতন মনে যে বড্ড ভয়, সে হয়তো নিজের অজান্তেই তৃষ্ণার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ছে। আর সেই আবেগকে চাপা দিতেই তার এই মিথ্যে নাটকের আশ্রয়। কিন্তু নির্বোধ এই ওয়াসেম বুঝতেও পারছে না, তার এই আত্মঘাতী বোকামি তৃষ্ণার মনের ক্যানভাস থেকে তাকে চিরতরে মুছে দিচ্ছে।

ওয়াসেম নিজের ঘরে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার পর তৃষ্ণা সদর দরজার ছিটকিনিটা তুলে দেয়। আজ আর সে নিজের চেনা গণ্ডিতে, ওয়াসেমের ঘরে ফিরে যায় না। সোজা হেঁটে চলে যায় অন্য একটি ফাঁকা ঘরে। সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় বাড়ির অন্য সদস্যরা যতদিন না ফিরছে, ততদিন এই ঘরেই সে নিজেকে সরিয়ে রাখবে। ওয়াসেম তো এটাই চায়! তৃষ্ণা তার চোখের আড়ালে থাকলেই তো তার পরম শান্তি। এই নির্মম সত্যটাকে বুকে জড়িয়েই তৃষ্ণা অন্ধকার ঘরে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়।
গোসল সেরে ভেজা চুলেই বিছানায় এসে আছড়ে পড়ে ওয়াসেম। শরীরটা ক্লান্ত, কিন্তু মনের ভেতর অস্থিরতা পাক খাচ্ছে। ঘরটা বড্ড বেশি নীরব হয়ে আছে । তৃষ্ণা তো এখনো আসছে না! এতক্ষণ তো লাগার কথা নয়। কোথায় গেল মেয়েটা? হঠাৎ এক অমূলক আশঙ্কায় বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে ওঠে তার। নিচে কোথাও মাথা ঘুরে পড়ে-টড়ে গেল না তো?

এই এক ভাবনায় আর স্থির থাকতে পারে না ওয়াসেম। এক লাফে বিছানা ছাড়ে। পা দুটো দ্রুত ছুটে যায় করিডোরের দিকে। রেলিং আঁকড়ে ধরে নিচে তাকায় সে, নাহ, পুরো ড্রয়িংরুম খাঁ-খাঁ করছে। তৃষ্ণার কোনো চিহ্নমাত্র নেই। রান্নাঘরে গেল নাকি?
দ্রুত পায়ে সিঁড়ি ভাঙতে শুরু করে সে। রান্নাঘরের দিকে এগোতেই হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়। সিঁড়ির নিচের ওই ছোট, ঘরটার দরজা আজ সামান্য ফাঁক করা কেন? সরু ফাটল দিয়ে ভেতরে চোখ রাখতেই ওয়াসেমের রক্ত প্রায় মাথায় ছিটকে ওঠে। আবছা অন্ধকারে বিছানার এক কোণে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে তৃষ্ণা! তৃষ্ণাকে এখানে দেখে ওয়াসেমের ইগোতে তীব্র চাবুকের ঘা পড়ে। সশব্দে, প্রায় একটা লাথি মেরেই দরজাটা পুরো খুলে ভেতরে ঢোকে সে।

আচমকা এই হিংস্র শব্দে তৃষ্ণা ধড়ফড় করে উঠে বসে। তার চোখেমুখে রাজ্যের বিহ্বলতা, কণ্ঠস্বর মৃদু কাঁপছে। সে জড়সড় হয়ে প্রশ্ন করে, “আপ আপনার কি কিছু প্রয়োজন?”
ওয়াসেমের দুই চোখ দিয়ে আগুন ঝরছে। তীক্ষ্ণ, খনখনে দৃষ্টিতে সে তৃষ্ণার আপাদমস্তক মেপে নেয়। কন্ঠস্বর খাদে নামিয়ে, দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “তুই এই ঘরে কেন?”
তৃষ্ণা মুহূর্তেই নিজের দৃষ্টি নামিয়ে নেয় মেঝের দিকে। অত্যন্ত শান্ত গলায় বলে , “আপনি তো চান না আমি আপনার চোখের সামনে থাকি, তাই না? তাই ভাবলাম, যতদিন মা-বাবা ফিরে না আসছেন, আমি এই ঘরেই থাকি। সেটাই আপনার জন্য ভালো হবে, তাই তো?”

কথাগুলো ওয়াসেমের মগজে বারুদের মতো বিস্ফোরণ ঘটায়। রাগে তার হাত নিশপিশ করতে থাকে, ইচ্ছে করে সজোরে একটা চড় বসিয়ে দিতে ওর ওই ফ্যাকাশে গালদুটোয়। কিন্তু তার আকাশছোঁয়া অহংকার তাকে আটকে দেয়। রাগকে গলার কাছে জোর করে চেপে রেখে তীব্র বিষ উগরে দেয়, “খুব ভালো করেছিস। তুই মরতে পারিস না? যা না, গিয়ে মরে যা! তাহলে আরও বেশি ভালো হয়। কুকুরের কুকুর কোথাকার!”
তৃষ্ণার বুকের ভেতরটা তীক্ষ্ণ কোনো বর্শার ফলায় ফালাফালা হয়ে যায়। কী অদ্ভুত তার পোড়া কপাল! নিজের মৃত্যুঞ্জয়ী অভিশাপ তাকে নিজের কান দিয়েই শুনতে হচ্ছে। বুক চিরে বেরিয়ে আসতে চাওয়া দীর্ঘশ্বাসটাকে গিলে ফেলে তৃষ্ণা। সামনে থাকা দেয়ালটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তার শূন্য চোখে কোনো অভিযোগ নেই, শুধু আছে এক জমাটবাঁধা অন্ধকার। সে মৃত গলায় বলে, “আমাকে তো মৃত্যুও ঘেন্না করে। তাই তো মরি না। নয়তো আমার মতো অভিশপ্ত মানুষের এতকাল বাঁচার কথা নয়। তা আপনি কি কোনো দরকারে এসেছেন এখানে?”
ওয়াসেম থতমত খেয়ে যায়। কী প্রয়োজনে সে হন্যে হয়ে তৃষ্ণাকে খুঁজছিল, তার কোনো সদুত্তর এখন তার নিজের কাছেই নেই। নিজের দুশ্চিন্তাকে আড়াল করতে সে তড়িঘড়ি একটা মিথ্যের বর্ম গায়ে চাপায়, “হ্যাঁ, এসেছি। কাল বাড়িতে কিছু আত্মীয় আসবে। ওদের জন্য ভালো করে কিছু রান্না করিস।”

তৃষ্ণা শুধু যান্ত্রিকভাবে একবার মাথা নাড়ায়, “আচ্ছা।”
এই দীর্ঘ কথোপকথনের পুরোটা সময় তৃষ্ণা একবারের জন্যও ওয়াসেমের দিকে চোখ তুলে তাকায় না। কথা বলার সময়ও না। তৃষ্ণার এই উপেক্ষা, এই নিদারুণ অবহেলা ওয়াসেমের ভেতরের পুরুষতান্ত্রিক অহংকারকে তুষের আগুনের মতো দাউদাউ করে পুড়িয়ে মারে। একটা দমবন্ধ করা ছটফটানি শুরু হয় তার ভেতর। সে ভাবতে বাধ্য হয়, আজ বাড়িতে অন্য মেয়ে নিয়ে এসেছিল দেখেই কি তৃষ্ণা এমন পাথরের মতো মুখ ফিরিয়ে আছে? নিজের ইগো বাঁচাতে গিয়ে সে উল্টো নিজেই দহনে পুড়তে থাকে। এই অস্বস্তিকতা ভাঙতে হালকা একটা কাশি দিয়ে এদিক-ওদিক দৃষ্টি ঘুরিয়ে ওয়াসেম হঠাৎ বলে ওঠে, “শোন, ওই মেয়েগুলোর সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আমাকে নিয়ে মনে মনে কোনো খারাপ ধারণা পুষে রাখিস না।”

কথাগুলো শুনে তৃষ্ণার শুষ্ক ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিষণ্ণ, তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে ওঠে। দৃষ্টি আগের মতোই মেঝের দিকে নিবদ্ধ রেখে সে মৃদু, কিন্তু ধারালো স্বরে বলে, “আমার মতো একটা কুকুরের কি আদৌ কোনো অধিকার আছে আপনার সম্পর্কে ধারণা পোষণ করার? আর আমার ধারণাতেই বা আপনার কী আসে যায়!”
এ কথা শুনে ওয়াসেম কথা বলার একটা মোক্ষম সুযোগ পেয়ে যায়। সে কিছুটা তীক্ষ্ণ গলায় বলে ওঠে, “ধারণা করতেই তো পারিস, আমি যে সেবার একটা মেয়ে নিয়ে বাড়িতে এসেছি, সেটা মা কী করে জানল?”

তৃষ্ণা হাতের কাজ না থামিয়েই একেবারেই নির্বিকার ভঙ্গিতে উত্তর দেয়। তার কণ্ঠে কোনো রাগ নেই, অভিমানও নেই, “আপনি কাকে নিয়ে আসবেন, কার সাথে রাত কাটাবেন, কাকে কী বলবেন এসব বিষয় আমি দেখলেও কাউকে বলার প্রয়োজন মনে করি না। এসব বলার অধিকারই বা আমার কোথায়? মাকে আমি এসব বলতে যাইনি।”
ওয়াসেমের বুকের ভেতরটা মুহূর্তেই কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে। সে স্পষ্টই অনুভব করতে পারছে তৃষ্ণার এই শান্ত, নিরাসক্ত রূপের আড়ালে লুকিয়ে আছে তার প্রতি এক জমাট বাঁধা ঘৃণা। এই অস্বস্তি ঢাকতেই ওয়াসেম কিছুটা জেদ আর রাগ মিশিয়ে একটা অযৌক্তিক কথা বলে বসে, “তুই নিজের চোখে দেখেছিস আমি কারো সাথে শুয়েছি?”
তৃষ্ণার সাফ জবাব, “দেখব না কেন? সেদিনই তো কাকে যেন নিয়ে এসে তিন ঘণ্টা যাবৎ ঘরের ভেতর বন্দী ছিলেন। আমি তো আর অন্ধ বা বধির নই, আর আপনি নিজেও তো এখন নিজের মুখেই বলছেন!”
ওয়াসেম নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করে বলে, “বলেছি মানেই যে করেছি, এমন তো নয়! মানুষের মুখের কথা আর কাজ কি সবসময় এক হয়?”

এমন ঠুনকো যুক্তি শুনে তৃষ্ণার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ফিকে, করুণ হাসি ফুটে ওঠে যে হাসিতে কোনো আনন্দ নেই, আছে তীব্র এক দীর্ঘশ্বাস। শান্ত গলায় সে বলে, “সে আপনার একান্ত ব্যক্তিগত ইচ্ছে। আপনার যা খুশি করুন, এসব জানার বা এসব নিয়ে কথা বলার আমি তো কেউ না।”
ওয়াসেম আর কোনো যুতসই কথা খুঁজে পায় না। তৃষ্ণা নীরবে নিজের মতো করে বসে আছে মাথা নিচু করে। ওর এই নীরবতা ওয়াসেমকে আরও বেশি বিদ্ধ করে। ওয়াসেম ধীরে ধীরে বিছানার দিকে এগিয়ে গিয়ে এক কোণে বসে পড়ে। নীরবতা ভাঙতে হঠাৎ করেই অপ্রাসঙ্গিকভাবে জিজ্ঞেস করে বসে, “আমাদের বিয়ের কতদিন হলো সেটা জানতে এসেছি, তুই জানিস কতদিন হলো?”
‘বিয়ে’ শব্দটা শুনে তৃষ্ণার বুকের ভেতরটা হুহু করে ওঠে। একেও কি বিয়ে বলে? যেখানে কোনো সম্মান নেই, ভালোবাসা নেই, শুধু একটা আশ্রয়ের নাম কি বিয়ে হতে পারে? সে কোনো আবেগ প্রকাশ না করে নিচু কিন্তু স্পষ্ট গলায় উত্তর দেয়, “এক বছর, এক মাস, ছয় দিন।”
ওয়াসেম অবাক হওয়ার ভান করে বলে, “বাহ! বেশ কড়াকড়ি হিসেব রেখেছিস দেখছি।”
তৃষ্ণা চোখ তুলে তাকায় না, শূন্য দৃষ্টিতে মেঝের দিকে তাকিয়ে বলে, “জীবনের প্রথম শান্তিতে দু’মুঠো ভাত খেতে পারছি তো, তাই দিনগুলোর হিসেব মনে থাকে।”
“এত অপমান করি, এত গালিগালাজ করি! কেবল দু’মুঠো ভাতের জন্য এসব কী করে সহ্য করে থাকিস? তোর কি একটুও লজ্জা করে না?”

তৃষ্ণার গলাটা এবার সামান্য কেঁপে ওঠে, তবে পরক্ষণেই সে নিজেকে সামলে নেয়। বড় নিরাসক্ত হয়ে বলে “ভাতের অভাবে বড় হয়েছি। পেট ভরে গরম ভাত খেতে তো জীবনে কখনো পাইনি, অনেক সময় দিনের পর দিন বাসি ভাতও কপালে জুটেনি। আর এখানে অন্তত পেট ভরে খেতে তো পারি, পরতে পারি। খিদের যন্ত্রণার কাছে আপনার ওই দু-একটা মার বা গালাগাল বড় কিছু না!”
কথাগুলো সজোরে আঘাত করে ওয়াসেমকে। তার বুকটা হঠাৎ করেই তীব্র যন্ত্রণায় টান মেরে ধরে। সে অস্ফুট স্বরে, জিজ্ঞেস করে বসে,”তোর সৎ মা তোকে খেতে দিত না?”
তৃষ্ণা আবার সেই বুক-চেরা আলতো হাসিটা হাসে, “দিত তো! সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি খাটিয়ে, বাষি আর এঁটো যা বেঁচে থাকত তা সবই তো আমায় দিত!”
ওয়াসেমের কলিজাটা এক অব্যক্ত, তীব্র যন্ত্রণায় দগ্ধ হয়ে ওঠে।সে অবিশ্বাসের সুরে বলে, “তুই তুই ওইসবই খেতিস?”

“না খেয়ে আর কী করতাম? খিদের যে খুব জ্বালা!”
তৃষ্ণার সহজ উত্তরটা তীক্ষ্ণ ছুরির মতো ফালাফালা করে দেয় ওয়াসেমকে।
“তোর বাবাকে এসব বলতি না তুই?”
তৃষ্ণা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে, যে দীর্ঘশ্বাসে মিশে আছে তার জীবনের সমস্ত বঞ্চনার গল্প। “আপনি যেমন অকারণে আমায় দু’চোখে দেখতে পারেন না, আমার জন্মদাতা বাবাও ঠিক তেমনই আমাকে দেখতে পারত না। অভিযোগ করলে তো মা-বাবা দু’জনে মিলে উল্টো আমাকেই মারত। অভাগীদের জীবন এমনই হয়।

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৪৩

” আমি তো অভাগী আর অভাগীদের কোনো অভিযোগ থাকতে নেই।”
এ কথা শোনার পর ওয়াসেমের আর একটা শব্দও উচ্চারণ করার মতো সাহস থাকে না। নিজের জঘন্য রূপটা সে আজ নিজের চোখেই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। সত্যিই তো, সে কোনো কারণ ছাড়াই এত ঘৃণা, এত তাচ্ছিল্য এই অসহায় মেয়েটাকে দিয়ে যাচ্ছে! যার জীবনে কেউ কোনোদিন ভালোবাসার হাত রাখেনি, তাকে সে-ও অকারণ যন্ত্রণাই দিয়ে গেল!

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৪৫

3 COMMENTS

Comments are closed.