Home খান সাহেব খান সাহেব পর্ব ৫১

খান সাহেব পর্ব ৫১

খান সাহেব পর্ব ৫১
সুমাইয়া জাহান

শেখ বাড়ির ড্রয়িংরুমে এখন আগুন জ্বলছে। সামিয়া আর নাজমিন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে পানি দুজনের। তাদের দুজনের পাশে দাঁড়িয়ে আছে ফারিয়া আর ফারিন। তারা দুজনেই চুপচাপ। ঘর ভর্তি মানুষ। সাখাওয়াত সাহেব, শামীম সাহেব, রুমা বেগম, হাসি বেগম, মাজেরা বেগম, আশিক, শাহরুখ, ইফতিয়া, রাইশা– সকলেই উপস্থিত ড্রয়িংরুমে। ইফতিয়া আর রাইশা কাল এসেছে এই বাড়িতে। কিছুদিন থাকবে তারা। ঘরের পরিবেশটা চাপা উত্তেজনায় ঠাসা। হঠাৎ হাসি বেগম তেড়ে উঠলেন,

“তোমরা কী ভেবেছ, নিজের মতো করে চলবে? স্কুল ফাঁকি দিয়ে কলেজে গিয়েছ? কোন সাহসে? কার থেকে অনুমতি নিয়ে?”
রুমা বেগম রাগিস্বরে বললেন,
“আর একবার এমন করলে হাত-পা ভেঙে ঘরে বসিয়ে রাখব। আজ পিয়াস সময়মতো না গেলে, কী হতো বুঝতে পারছ? পড়াশোনা করতে ভালো লাগেনা, তাইনা? ছেলে দেখবে দুজনের জন‍্য? বিয়ে দিয়ে দেই তোমাদের দুজনকে? বাদরামি যখন করবেই, শশুর বাড়িতে গিয়ে করো। এই বাড়িতে এসব চলবে না।”
সামিয়া চোখ মুছে বলল,
“ওরা বাজে কথা বলেছিল। আমরা তো কিছু বলিনি।”
হাসি বেগম মেয়েকে মারার জন‍্য তেড়ে আসতে নিলে, শাহরুখ আটকালো তাকে। হাসি বেগম দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,

“অন‍্যায় করে আবার মুখে মুখে কথা বলার সাহস কীভাবে পাস তুই? জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলব। ওরা বাজে কথা বলেছে? তোরা কোন সাহসে স্কুল ফাঁকি দিয়ে কলেজে গেলি, তার জবাব দে?”
সাখাওয়াত সাহেব তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন,
“থামো তোমরা! ওরা এখনো ছোট। কেউ মারবেসনা ওদের। দোষ ওরা করেনি। আমি মানছি ওরা স্কুল ফাঁকি দিয়ে কাউকে কিছু না বলে কলেজে গিয়ে অন‍্যায় করেছে, তাই বলে ওই বদমাশ ছেলেগুলো আমার বাড়ির মেয়েদেরকে বাজে কথা বলবে? তোমরা চুপ থাকো। পিয়াস আসুক, ওর থেকে সব শোনা যাবে।”
সিকদার বাড়ি আর শেখ বাড়ির সবাই জানে পিয়াস রাগান্বিত একটা ছেলে। যখনই আসবে বিস্ফোরণ ঘটবে। ইফতিয়া আস্তে করে ফারিনকে সরিয়ে একটু সাইডে নিয়ে গিয়ে বলল,
“কলেজে কি হয়েছে, ফারিন?”
ফারিন সরল মনে একটা ছোট ঢোক গিলে বলল,

“সেদিন সকালে সামিয়া, নাজমিন আর ফারুপু মিলে প্ল‍্যান করেছিল, আজ স্কুল ফাঁকি দিয়ে কলেজে যাবে ওরা। একটা ছোট্ট অ্যাডভেঞ্চার বলতে পারো। আমি আর ফারুপু তো আগে থেকেই কলেজে থাকতাম। বাট ওদের কথা ছিল স্কুল ফাঁকি দিয়ে কলেজে আসবে। আমি আর ফারুপু একটা ক্লাস পর কলেজ থেকে বেরিয়ে যেতাম। কলেজ ঘুরে রেস্টুরেন্টে যেতাম, একটু হালকা খাওয়া দাওয়া করতাম। আর তারপর বাড়িতে ফিরে আসতাম। আর আমরা আগে থেকেই জানতাম ভাইয়া আজ কলেজে যাবে না। তবে আমাদের ভাগ্য অন্য কিছুর প্ল্যান করে রেখেছিল। সামিয়া আর নাজমিন কলেজে ঢুকতেই কিছু ছেলের নজর ওদের দিকে পড়ে। ওরা সামিয়া আর নাজমিনকে উল্টাপাল্টা কথা বলেছে। ঠিক তখনই কোথা থেকে ভাইয়া আর তার দলবল কলেজে এসে হাজির। ভাইয়া আসতেই কিছু জুনিয়র ছেলে সবটা ভাইয়াকে বলে দিয়েছে। আর ভাইয়া তো জানোই, ওই ছেলেগুলোকে সে তার দলবলসহ নিয়ে কলেজ ক‍্যাম্পাসের মধ্যে বেধড়ক পিটিয়েছে। তারপর শাহরুখ ভাইয়াকে কল দিয়ে কলেজে আসতে বলেছে। শাহরুখ ভাইয়া আসতেই আমাদের এই বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে। আর তারপরের সবটা তো দেখতেই পাচ্ছো।”
বাহিরে বাইকের শব্দ শোনা গেল। পিয়াস ঢুকে এলো বাড়ির ভেতরে। সে এসেই সোজা সামিয়ার দিকে তাকাল। সাখাওয়াত সাহেব পিয়াসকে দেখে বসতে বলল। পিয়াস কোনো দিকে পাত্তা না দিয়ে সোজা শামীম সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল,

“ওদের বকেছেন?”
শামীম সাহেব ঠাণ্ডা গলায় বললেন,
“আসলে তোমার মামীরা একটু…”
শামীম সাহেব কথা শেষ করার আগেই পিয়াস শান্ত কিন্তু ভারি কণ্ঠে বলে উঠল,
“আমি বারণ করেছিলাম, ওদের কিছু না বলতে, মামু।”
ঘরটা আরও নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কারও মুখে কোনো শব্দ নেই। ফারিয়া, ফারিন আর ইফতিয়া পর্যন্ত নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে রইল পিয়াসের দিকে। সামিয়ার চোখ থেকে পানির গাল বেয়ে নেমে যাচ্ছে। নাজমিন চোখ নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে, যেন পৃথিবীর সব ভুল আজ ওদের ঘাড়ে এসে পড়েছে। হাসি বেগম রেগে বললেন,
“তোমাদের বোনরা ভুল করবে, আর তাদের কিছু বলা যাবে না? তুমি ওদের শাসন না করে উল্টো ওদের পক্ষ নিচ্ছো? তোমাদের এই আধুনিকতার ঠেলায় একদিন কিছু একটা হয়ে…”
পিয়াস মুখ ফিরিয়ে হাসি বেগমের চোখে চোখ রেখে বলল,

“হ্যাঁ, নিচ্ছি! ওদের গায়ে কেউ স্পর্শ করার সাহস দেখালে, তাদের গায়ে আগে আমার হাত উঠবে। আমি জানি ওরা ভুল করেছে, স্কুল ফাঁকি দিয়ে কলেজে গেছে। কিন্তু তাতে কারও অধিকার হয় না ওদের অসম্মান করার। ওরা বোকামি করেছে, কোনো অপরাধ না।”
সাখাওয়াত সাহেব মাথা নেড়ে বললেন,
“ঠিক বলেছো, পিয়াস। আমি প্রথমেই বলেছি, ওরা ছোট। ওদের শিক্ষা দিতে হবে, অপমান নয়।”
মাজেরা বেগম ধীরে ধীরে বললেন,
“তবে পিয়াস, ওদের তুমি বুঝিয়ে দিও যেন আর এমন না করে। সাহস পেয়ে যেন বারবার বোকামি না করে বসে।”
পিয়াস এগিয়ে এসে সামিয়ার সামনে দাঁড়াল। খুব নিচু গলায় বলল,

“তুই কাঁদছিস কেন রে?”
সামিয়া কাঁপা কন্ঠে বলল,
“আমরা তো কিছু করিনি, ভাইয়া। ওরাই তো…”
সামিয়ার কথা আটকে গেল কান্নায়। পিয়াস ধীরে নরম সুরে বলল,
“কাঁদবি না! আমি আছি তো। এইরকম ভুল আর করিস না।”
এই প্রথম পিয়াস একটা সাহস দেখাল। ছোট থেকেই সে সামিয়াকে কখনো ছুঁয়ে দেখেনি। কিন্তু আজ সে সামিয়ার হাত ধরল। সে সামিয়ার হাতটা টেনে নিল নিজের দিকে, আরেক হাত দিয়ে ইশারা করল নাজমিনকে। ঠাণ্ডা গলায় বলল,

“চল, আজ আমাদের বাসায় থাকবি। এই বাড়িতে আজ থাকতে হবে না।”
সামিয়া একটু কাঁপা গলায় বলল,
“কিন্তু, ভাইয়া…”
পিয়াসের গলা এবার কঠিন হলো। সে হালকা কড়া মেজাজে বলল,
“চুপ, একটাও কথা না।”
দু’জনকে সামনে নিয়ে দরজার দিকে হাঁটা শুরু করল সে। সবাই নীরবে তাকিয়ে আছে। পিয়াস কাউকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে বেরিয়ে এলো ওদের নিয়ে। শামীম সাহেবরাও আর কিছু বলল না। সেই মুহূর্তেই পেছন থেকে একটা চেনা গলা শোনা গেল। শাহরুখ হালকা ফিসফিস করে পিয়াসকে বলল,
“আমার বোনকে নিয়ে যাচ্ছিস। তাহলে, তোর বোনকে এখানে রেখে যা।”
পিয়াস থেমে গেল। সামিয়ারা একটু সামনে চলে গেল। পিয়াস এক’পা পেছনে এসে, শাহরুখের চোখে চোখ রেখে বলল,

“ঠিক এইভাবেই একদিন বউ করে নিয়ে যাব।”
“আমিও আনব তোর বোনকে। এখন তোর বোনকে রেখে যা।”
“তুইও চল আমাদের বাড়িতে। আজ রাত আড্ডা দিয়ে কাটাব।”
ওদের দুজনের কথার মাঝে ইফতিয়া, রাইশা আর আশিক এলো। আশিক আলতো হেসে বলল,
“সবাই ফুফুমনির বাড়িতে চলে গেল, আমরা এখানে কেনো থাকব? আমরাও যাব।”
পিয়াস আর শাহরুখ হাসল। সকলে মিলে একসাথে বেরিয়ে পড়ল সিকদার বাড়ির উদ্দেশ্যে।

কেবিনের জানালায় আলতো আলো এসে পড়েছে। বাইরের নীরবতা যেন কেবিনের ভেতরের ভারি নিস্তব্ধতাকে আরও গাঢ় করে তুলেছে। সুমু চুপচাপ বসে আছে বিছানায়, এক হাত পেটের ওপর রাখা। তার চোখে জল নেই, কিন্তু সেই নিস্তব্ধ দৃষ্টিতে যে কষ্ট লুকানো, তা যেন পুরো ঘরটাকে নিঃশব্দে কাঁদিয়ে দিচ্ছে। সে পেটের ওপর হাত বুলিয়ে বলল,
“মা তো তোর জন্য স্বপ্ন বুনেছিল রে। তুই কি সত্যিই আসবি না?”
তার গলা কেঁপে উঠল, বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। কাল অপারেশন। ডাক্তার বলেছেন, ‘ঝুঁকি আছে, কিন্তু জরুরি’। সুমু জানে, ওটা একটা টিউমার। কিন্তু সে জানে, ওর মধ্যে যে একটা জীবন ছিল, ছোট্ট একটা আশা ছিল, যেটা ওর হৃদয়ের কোথাও আজও বেঁচে আছে।
হঠাৎ দরজায় হালকা নক পড়ল। সুমু চোখ মুছে মুখ ফেরালো।
“সুমু!”
অনন‍্যা খাতুন, ইশিতা, রিয়াজ আর ফিরোজা এসেছে। সবার মুখেই চাপা বিষণ্ণতা। অনন‍্যা খাতুন সুমুর পাশে বসে হাত ধরে বললেন,

“তুমি একা একা কাঁদছিলে না তো?”
সুমু মাথা নাড়ল, কিন্তু চোখে নতুন জল চিকচিক করে উঠল। অনন‍্যা খাতুন সুমুর মাথায় হাত রেখে বললেন,
আমরা আছি তোমার পাশে, মামনি। সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি খুব শক্ত মেয়ে। এতো সহজে ভেঙে পড়োনা।”
ইশিতা কিছু না বলে চুপচাপ সুমুর জন্য আনা কমলার রসটা গ্লাসে ঢেলে দিল। রিয়াজ সুমু অন‍্যহাত ধরে বলল,
“মাই পার্টনার! সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি কষ্ট পেয়োনা।”
সুমু রিয়াজের দিকে তাকিয়ে আলতো হেসে অনন‍্যা খাতুনের উদ্দেশ্যে বলল,
“বাকিরা আসেনি, আম্মু?”
অনন‍্যা খাতুন সুমুর কপালে আদরের পরশ এঁকে দিয়ে বললেন,
“রাতে সকলে আসবে। ইভেন তোমার মামা শশুরবাড়ির সকলেও আসবে।”
ইশিতা সুমুর হাতে ফলের রসের গ্লাসটা দিল। সুমু খেতে চাইল না। ঠিক তখনই কেবিনের দরজাটা খুলে চেক শার্ট পরে ভিতরে ঢুকল শেরাজ। চোখে হালকা ক্লান্তি, হাতে সুমুর পছন্দের কিছু চকলেট। তার চোখ সবার ওপর দিয়ে চলে গিয়ে থামে সুমুর মুখে।

“সবাই এসেছো?”
সে সোজা এসে ফিরোজাকে কোলে নিয়ে ফিরোজার হাতে একটা চকলেট দিল। ফিরোজা চকলেটটা নিতে চাইল না। সে বলল,
“চকনেত তুমি নিউ ফ্রেন্ডকে দাও। নিউ ফ্রেন্ড কততো তষ্ট পাচ্ছে।”
শেরাজ আলতো হেসে ফিরোজার গালে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
“পাকা বুড়িটা। তুমি একটা নাও, আর একটা তোমার রিয়াজ ভাইয়াকে দাও। বাকিগুলো তোমার নিউ ফ্রেন্ডের জন‍্য।”
ফিরোজা তবুও নিবেনা চকলেট। সে শেরাজের কোল থেকে নেমে ইশিতার কোলে গিয়ে বলল,
“আমাল নিউ ফ্রেন্ড তুস্ত না হওয়ার পযর্ন্ত আমি চকনেত থাবো না।”
সুমু অবাক হয়ে তাকাল ছোট্ট ফিরোজার দিকে। কতো ভালোবাসে এই বাচ্চা মেয়েটা তাকে। ইশিতা অনন‍্যা খাতুনের কাঁধে হাত রাখতেই অনন‍্যা খাতুন আস্তে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,

“তোমরা একটু কথা বলো। আমরা এখন বাইরে আছি।”
কেবিনের দরজাটা নরম শব্দে বন্ধ হয়ে গেল। ঘরটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কেবল হৃদস্পন্দনের শব্দ যেন শোনা যাচ্ছে। শেরাজ চুপচাপ তাকিয়ে আছে সুমুর দিকে। সুমুর স্নিগ্ধ মুখটা যেন কোনও অদৃশ্য শোকের নিচে চাপা পড়ে গেছে। চোখের কোণে একটা অস্পষ্ট ব্যথা, যেটা সে লুকাতে চায়। শেরাজ একটা গভীর ভারি দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুমুর মন ভালো করার জন‍্য বলল,
“একটু আদর করবে, বউ? একটা চুমু খাবে? আমিও একটা চুমু খাবো, বউ?”
সুমু চমকে তাকাল তার দিকে। শেরাজের ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক হাসি। সেই চেনা কঠিন মুখটা আজ এত কোমল লাগছে যেন সুমুর সমস্ত কষ্ট একটুখানি হালকা হয়ে গেল। সে তাকিয়ে রইল তার খান সাহেবের চোখে। কি অপূর্ব দেখতে তার খান সাহেব। চোখের গভীরতা, গালের সেই হালকা খোঁচা খোঁচা দাড়ি, আর ঠোঁটের কোণে যে অদম্য ভালোবাসার রেখা– সবকিছুতে যেন সুমুর মন বসে গেল। সে শেরাজের বুকে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করল। শেরাজ তার চুলে আলতোভাবে হাত বুলিয়ে দিল। হঠাৎই শেরাজের মুখে একটা দুষ্টু হাসি খেললো। সে সুমুকে হাসানোর জন‍্য হালকা গলা ক্লিয়ার করে বলল,

“একটা চুমু খাইনা, বউ?”
সুমু মাথা তুলল। শেরাজ তার ডান গালে ঠোঁট ছুঁয়ে তার দিকে তাকিয়ে তার নাকে নাক ঘষে গান ধরল,
“তোকে প্রথমবার দেখেই,
চোখে চোখ রেখেই,
কখন জানিনা আমি,
কেস খেয়েছি!
তোর সেক্সি হাসিতে,
মন দিতে দিতে,
কখন জানিনা আমি,
কেস খেয়েছি!
স্বপ্নেরই জ্বালে,
তোর হাই ভোল্টেজ গালে,
যেই হালকা ঠোঁট রেখেছি!
ওহ শীট!
সলিড কেস খেয়েছি!
ওহু ওহু ও,
সলিড কেস খেয়েছি!
যতোই তোকে কাছে পাই ও সোনা,
দিল মাঙ্গে যে আরও হায় হায় হায়!
স্ট্রবেরি, ক‍্যাটব্রেরি আর নাতো না,
এই ঠোঁটে তোকে যে চায় চায় চায়!
স্বপ্নেরই জ্বালে,
তোর হাই ভোল্টেজ গালে,
যেই হালকা ঠোঁট রেখেছি!
ওহ শীট!
সলিড কেস খেয়েছি!
ওহু ওহু ও,
সলিড কেস খেয়েছি!”
সুমু হেসে উঠল শেরাজের গান শুনে। সুমুর হাসিটা ছিল এক টুকরো বৃষ্টির মতো, যা শেরাজের মনে শান্তি দিল। শেরাজ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল তার প্রেয়সীর দিকে। এই হাসিটাই তো এতক্ষণ দেখতে চাইছিল সে।

শেরাজ হসপিটালে সুমুর পাশে দিনরাত কাটাচ্ছে। নিজের স্ত্রীকে ছাড়া এক মুহূর্তও সে থাকতে পারছে না। তাই শেরাজের অফিসের সমস্ত দায়িত্ব গিয়ে পড়েছে সারবাজের ওপর। সারবাজ এখন “এস.কে লাক্স”-এর অফিসের হেড হিসেবে কাজ করছে। সে আগের থেকে অনেক বেশি কঠিন, রূঢ় আর নিয়মনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। মুখে কোনো হাসি নেই, চোখে শুধু ক্লান্তি আর দায়িত্বের ভার। অফিসে এখন শেরাজের সব বন্ধুরা কাজ করছে। আইয়ুব, অমিত, ফাহিম, রাহিন— সবাই একসঙ্গে ব্যস্ত। নতুন ব্র্যান্ড শ্যুটিংয়ের প্রস্তুতি চলছে। স্যান্ডিও ওদের মার্কেটিং সেকশনে কাজ শুরু করেছে। অফিসের কাজে সকলে যার যার মতো ব‍্যস্ত।
ইনায়া হেড ডিজাইনার হিসেবে নিজের কাজ শেষ করল। একটা গুরুত্বপূর্ণ ফাইল তৈরি করেছে, যেখানে নতুন কালেকশনের কাপড়, ডিজাইন, থিম, আর বাজেট অল কম্পাইলড নিটলি। তবে সমস্যা একটাই। এই ফাইলটা এখন সারবাজকে দিয়ে চেক করাতে হবে। আর তাতেই ইনায়ার কেমন যেন লাগছে। সেই ঝগড়ার পর থেকে আর তারা দুজনে কথা বলেনি।
ইনায়া নীরবে ফাইল হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। ধীর পায়ে হেঁটে সারবাজের কেবিনের সামনে এসে দাঁড়াল। ইনায়াকে সারবাজের কেবিনের সামনে দাঁড়াতে দেখে আইয়ুব বলল,

“আজ আবারও যুদ্ধ লাগবে মনে হচ্ছে।”
ইনায়া সারবাজের কেবিনের দরজায় নক করল। সারবাজ গম্ভীর গলায় বলল,
“কাম ইন!”
ইনায়া কেবিনে ঢুকল। সারবাজ মাথা না তুলে বলল,
“বলুন, কী দরকার?”
ইনায়া ফাইল এগিয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“এইটা অ্যাপ্রুভাল লাগবে। কাল প্রেজেন্টেশন।”
সারবাজ ফাইল খুলে পড়তে লাগল। তার ভ্রু কুঁচকে গেল। সে রাগান্বিত কন্ঠে বলল,
“বাজেট ব্রেকডাউন, এ এই জায়গায় ভুল। ফ্যাব্রিক সোর্সিং-এ রেফারেন্স নেই। টাইমলাইন মিসম্যাচ করছে। আপনি এগুলো দেখন নি?”
ইনায়া একটু চড়াস্বরে বলল,
“আমি সব দেখে দিয়েছি। আপনি ভালো করে দেখেন নি।”
সারবাজ ঠাণ্ডা গলায় বলল,
আপনি ভুল করেছেন, অ্যাকসেপ্ট ইট।”
ইনায়া গর্জে উঠল,
“আমি কারো সামনে মাথা নিচু করি না, মিস্টার সারবাজ খান। এস্পেশালি, হোয়েন আই নো আই ডিড ইট রাইট।”
সারবাজ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। সে রাগান্বিত স্বরে বলল,

“আপনার অ্যাটিটিউড এই অফিসে চলবে না। পার্সোনাল ফিলিংস থেকে ডিসিশন নিচ্ছেন আপনি। দ্যাটস নট প্রফেশনালিজম, মিস ইনায়া।”
ইনায়ার গলার স্বর আরও চড়া হলো,
“পার্সোনাল ফিলিংস? আপনি নিজের পার্সোনাল ইগো নিয়ে পুরো অফিস চালাচ্ছেন।”
বাইরে থেকে সবাই থমকে গেল। কেবিনের কাচের জানালার ওপাশ থেকে চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে আছে অমিত, আইয়ুব, স্যান্ডিরা।
সারবাজ কাগজ ছুঁড়ে দিল টেবিলের ওপর।
“রিরাইট দ্য প্রোপোজাল। প্রপারলি না পারলে, লিভ দ্য ডেস্ক।”
ইনায়া গর্জন করে বলল,
“আপনি কে আমাকে এইভাবে বলার? এই কম্পানির বস জানে আমি কেমন কাজ করি।”
“এই অফিস এখন আমার অধীনে। কাজ ঠিক না হলে, আপনি যেমনই কাজ করেন না কেন, আমি ভুল দেখাবোই।”

“একদিন আপনি বুঝবেন, সব ভুল ধরলেই কেউ বড় বস হয় না, মিস্টার খান।”
“দিস ইজ প্রফেশনাল স্পেস। কোনো সার্কাস দেখানোর জায়গা না।”
“প্রফেশনাল স্পেসে মানুষ মানুষকে সম্মান দেয়। আমি এখানে কাজ করতে এসেছি, সার্কাস দেখাতে না। কারও ব্যক্তিগত নাটক হ্যান্ডেল করার জন্য আমি দায়ী না।”
“তাহলে ওটা প্রমাণ করেন। প্যাশন দিয়ে নয়, প্রিসিশন দিয়ে। ফাইলটা ফেরত নিয়ে যান এবং আগামী এক ঘণ্টার মধ্যে ঠিক করে নিয়ে আসুন। নো এক্সক্সিউজ।”
ইনায়া ফাইলটা নিয়ে বেরিয়ে যাবার আগেই আইয়ুবরা কেবিনে ঢুকল। সারবাজ চোখ বড় করে বলল,
“তোরা সবাই কেবিনে ঢুকলি কেন?”
নিহাল ঠোঁট টিপে হেসে বলল,
“আমরা দেখলাম, তুই ইনায়াকে কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলবি, এমন একটা অবস্থা। তাই রেসকিউ মিশনে এসেছি।”
আরবাজ হেসে বলল,
“আহা, কী ডায়লগ! প্যাশন নয়, প্রিসিশন দিয়ে প্রমাণ করুন। ভাই রে ভাই! হিরো-হিরোইন এক ফ্রেমে থাকলেই এরকম আগুন লাগে।”
অমিত বলল,
“অফিসে কী দারুণ টিভি সিরিজ চলছে।”
রিয়াদ ক‍্যামেরা অন করে বলল,
“তোরা ঝগড়া কর, আমি তোদের একটা রিলস বানাই।”
সারবাজ চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে বলল,
“সবাই বের হ, এখনই। আর যাকে তাকে আমার সাথে জড়াবি না।”
ইনায়া রাগ আর অপমান গিলে বলল,
“আমি নিজের কাজ আর সম্মান দুটোই গুরুত্ব দিই। আপনি সেটা বোঝেন না, কারণ আপনি আপনার ইগো ছাড়া কিছু দেখতে পারেন না। আর তাই মানুষকে মানুষ বলে ভাবেন না। ভাবেন আপনি একাই সব।”
সারবাজ এক ধাপ এগিয়ে এসে বলল,

“আপনি জানেন, আপনি ঠিক কোন জায়গায় হাত দিচ্ছেন? আর কাকে কি বলছেন?”
“আপনি আমার সম্পর্কে ভুল ধারণা নিয়ে বসে আছেন।”
“তাহলে কি? সকলকে দেখাচ্ছেন, যে আপনি আমার সাথে তর্কে জড়ানোর ক্ষমতা রাখেন?”
ইনায়ার আর কিছু বলতে ইচ্ছা করল না। সে বেরিয়ে গেল কেবিন থেকে। সরবাজ, আইয়ুবদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“সবাই বাইরে যা। এখনই যা। আমি কাউকে দেখতে চাই না।”
সবাই চুপসে গিয়ে হাসতে হাসতে একে একে বের হয়ে গেল, কিন্তু বাইরে দাঁড়িয়ে আবার ফিসফিস চালাতে শুরু করল তারা।
আরবাজ ঠোঁট টিপে হেসে বলল,
“একদিন ওরা একসাথে কফি খাবে, আমি বাজি রাখলাম।”
ফাহিম ভ্রু কুঁচকে বলল,
“না ভাই, কফি না। ওরা একসাথে ফাইল ফাইনাল করবে।”
স‍্যান্ডি ফিসফিস করে বলল,
“ওরা ঝগড়ার মধ্যেই প্রেম করে। আর ওদের ঝগড়াটা আমাদের বিনামূল্যে এন্টারটেইনমেন্ট দেয়।”

হাসপাতালের কেবিনটা নিঃস্তব্ধ। বাইরের করিডরে টিমটিমে আলো জ্বলছে, কিন্তু সুমুর কেবিনের ভেতর সব আলো নিভিয়ে রাখা যেন ঘুমটা ভেঙে না যায় সুমুর। সন্ধ্যা নামার কিছুক্ষণ আগেই পেটে হঠাৎ আবার ব্যথা শুরু হয়েছিল তার। সুমুর কুঁচকে যাওয়া মুখ দেখে শেরাজ ডাক্তারকে ডাকে। এক ডোজ ঘুমের ইনজেকশন দেওয়ার পর সুমুর শরীর নিস্তেজ হয়ে আসে, আর তারপর চোখজোড়া ভারী হয়ে বন্ধ হয়ে যায়। এখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন সে। শেরাজ আজ সারাদিন সুমুর কাছেই ছিল। এক’পা নড়েনি তার প্রেয়সীর কাছ থেকে। তবে কিছুক্ষণ আগে সুমুর কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস আনতে বাহিরে গিয়েছে। বডিগার্ড দুজনকে কেবিনের সামনে থেকে সরতে না বলে গেছে। কিন্তু শেরাজ হসপিটাল থেকে বের হতেই গার্ড দুজন পাশের ক্যান্টিনে নাস্তা করতে গেছে, এই ভেবে যে কয়েক মিনিটেই ফিরে আসবে তারা। সুমুর কেবিনের সামনে এখন একেবারেই শূন্য। কখনো কখনো কেউ কেউ যাওয়া আসা করছে, তবে সুমুর জন‍্য পাহারাতে কেউ নেই।

খান সাহেব পর্ব ৫০

হঠাৎ সুমুর কেবিনের দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে গেল। হসপিটালের করিডরের সাদা আলো ঢুকে পড়ল কেবিনের অন্ধকারে। আলো গিয়ে পড়ল সুমুর নিস্তেজ ঘুমন্ত মুখ মুখটাতে, তবে ঘুমের ইনজেকশনের ফলে তার ঘুমের ব‍্যাঘাত ঘটল না। একজোড়া পা ধীরে ঢুকে পড়ল কেবিনের মধ্যে। ভেতর থেকে ধীরে ধীরে দরজাটা বন্ধ করে দিল সে। কেবিন রুমটা আবারও নিঃস্তব্ধ হয়ে গেল। এখন শুধু শোনা যাচ্ছে সুমুর ধীর নিঃশ্বাস আর সেই আগন্তুকের ধীরে ধীরে এগিয়ে আসা পায়ের শব্দ।

খান সাহেব পর্ব ৫২