Home খান সাহেব খান সাহেব পর্ব ৫৫

খান সাহেব পর্ব ৫৫

খান সাহেব পর্ব ৫৫
সুমাইয়া জাহান

ভোরের আলোয় সুমুর ঘুম ভাঙে শেরাজের বুকের মধ্যে। তার মাথার নিচে শেরাজের হাত। নরম ব্লাঙ্কেটের ভাঁজে লুকিয়ে আছে দুজনের উষ্ণতা। জানালার ফাঁক গলে নেমে আসা রোদ্দুর দুজনের মুখে পড়ছে। সুমু শেরাজের মুখের ওপর হাত দিয়ে রোদ আটকানো চেষ্টা করল। শেরাজ আলতো করে সুমুর চুলগুলো গুছিয়ে দিল। সুমু একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে হাত সরিয়ে বলল,
“আপনি উঠে গেছেন?”
শেরাজ সুমুর কপালের একপাশে চুল সরিয়ে দিয়ে চোখের দিকে তাকিয়ে নরম ঘুমভাঙা কন্ঠে বলল,

“অনেকক্ষণ আগে!”
সুমু লাজুক হেসে শেরাজের বুকে আরেকটু গুটিয়ে গিয়ে মৃদু হেসে বলল,
“ঘুম থেকে ওঠার পর আপনার ভয়েজ এতো নেশালো লাগে কেনো?”
শেরাজ হাসল। এক হাত দিয়ে সুমুর গাল স্পর্শ করে নরম গলায় বলল,
“তোমাকে ছাড়া ঘুম ভাঙলে এই শরীরটাই ঠিকমতো জাগে না। আর আমার ভয়েজটা তোমাকে চায়। তোমার গন্ধ, তোমার স্পর্শ, সব গলার ভেতরে আটকে থাকে, তাই এই নেশা।”
সুমু চোখ বুজে শেরাজের বুকে মুখ লুকাল। শেরাজ সুমুর গলার কাছে ছোট্ট করে কামড় দিয়ে বলল,
“উঠতে হবে, সুইটহার্ট! তোমার মেডিসিনের সময় হয়ে আসছে।”
দুজনে ধীরে উঠে বসল। সুমুর চোখে তখনো ঘুমের রেশ। শেরাজ তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে কোনো কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই সুমুকে আলতো করে কোলে তুলে নিল।
“খান সাহেব, থাক না আমি নিজেই যেতে পারব।”
শেরাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,

“চুপ!”
ওয়াশরুমে নিয়ে গিয়ে দরজা ভেজিয়ে দিল শেরাজ। সুমু অস্বস্তিবোধ করলেও শেরাজের সযত্নের ছোঁয়ায় আর কিছু বলতে পারল না সে। শেরাজ ধীরে ধীরে সব কাজ গুছিয়ে দিল। সুমুকে ফ্রেশ করিয়ে ছোট্ট তোয়ালে হাতে তুলে সুমুর ভেজা মুখ মুছে দিল। ফিরে এসে বিছানায় না বসিয়ে রুমের এক কোণার নরম সোফায় বসিয়ে দিল সুমুকে। নিজে টি-শার্ট পরে নিয়ে ইন্টারকমে কল করল।
“ব্রেকফাস্ট রেডি করুন। বেশি করে ফ্রুটস দেবেন, আপেল বেশি দিবেন। আর দুধটা যেন হালকা গরম হয়। বাকিসব সবকিছুর নাম তো জানেন। কুইক নিয়ে আসুন।”
ফোন রেখে সুমুর কাছে গিয়ে চোখ বন্ধ করে সুমুর খোলা চুলগুলোর ঘ্রাণ বুক ভরে টেনে নিয়ে সযত্নে চুলগুলো বেঁধে দিয়ে বলল,

“এই খোলা চুলগুলো আমাকে ডিস্টার্ব করছে। বউ এখন অসুস্থ, কিছু করতে পারবোনা। তাই বেঁধে দিলাম।
কিছুক্ষণ বাদে দরজায় নক পড়ল। শেরাজ দরজা খুলে দিল। দুজন সার্ভেন্ট সাভিং ট্রলি ভর্তি নানা রকম হেলদি খাবার নিয়ে প্রবেশ করল। দুজন খাবারগুলো সুমুর সামনের সেন্টার টেবিলের ওপর রাখাল। ওটস পোরিজ, উপরে কাটা আপেল ও বাদামের ছড়াছড়ি। গ্রীক ইয়োগার্টের সঙ্গে বেরি মিক্স। সেদ্ধ ডিমের স্লাইস। গ্রিলড চিকেন ব্রেস্টের ছোট ছোট টুকরো। কুইনোয়া ও সবুজ শাক-সবজির সালাদ। ফ্রেশ ফলের প্লেট, যেখানে আপেল, পেয়ারা, এবং কলার কম্বিনেশন। স্ট্রবেরি অ‍্যান্ড ক্রিম ডেজার্ট।
সার্ভেন্টরা খাবার গুছিয়ে রেখে চলে গেল। সুমু খাবারের আইটেমের মধ্যে থেকে স্ট্রবেরি অ‍্যান্ড ক্রিম ডেজার্ট দেখে একরাশ অবাক চোখে শেরাজের দিকে তাকাল। খাবারের আইটেমটা দেখে তার ঠোঁটে দুষ্টু হাসি খেলে গেলেও কন্ঠে কৌতূহল নিয়ে বলল,

“এই আইটেমটা এখানে কেনো?”
শেরাজ সুমুর পাশে বসে হেসে ঠোঁট কামড়ে রাখল। কিছুক্ষণ পর সুমুর চোখে চোখ রেখে ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“স্ট্রবেরি অ‍্যান্ড ক্রিম, এইটা আমার জন‍্য সুইটহার্ট। আমার ফেভারিট ডেজার্ট।”
সে হাত বাড়িয়ে স্পুন দিয়ে স্ট্রবেরির একপিস তুলে সুমুর ঠোঁটে সাথে মিশিয়ে নিজের ঠোঁট তার ঠোঁটের কাছে এগিয়ে নিয়ে স্পুন থেকে ডেজার্ট মুখের ভেতর নিয়ে বলল,
“জানো, এইটা খেতে অনেক মিষ্টি। তবে তোমার ঠোঁটের থেকে বেশি নয়। কালরাতে তুমি আমাকে বেশি মিষ্টি খাইয়ে ফেলেছ, তাই আজ সুগার কন্ট্রোলে রাখার জন‍্য আমার ফেভারিট ডেজার্ট রাখলাম। তোমার ঠোঁট আমার মোস্ট ফেভারিট ডেজার্ট আর ওইটা মিষ্টি বেশি, তাই আজ এইটা আইটেম হিসাবে এসেছে।
সুমু লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নিল। শেরাজ হালকা হেসে আরেকটু কাছে এগিয়ে বলল,
“হানি নাট গ্রানোলা বার আর স্ট্রবেরি অ‍্যান্ড ক্রিম ডেজার্ট, দুটোই আমার ফেভারিট।”
সুমু খাবারের প্লেটগুলো আবারও একবার দেখে হাসতে হাসতে বলল,
“এতো খাবার কে খাবে?”
শেরাজ একটু মুচকি হেসে বলল,

“তুমি খাবে, আর আমি বাকি অংশটা সামলাবো। তোমার ভালো হয়ে ওঠার জন্য এইটুকু খেতে হবে, সুইটহার্ট।”
শেরাজের ফোনটা টেবিলে ভাইব্রেট করতে লাগল। সে এক ঝলক স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই ভ্রু কুঁচকে ফেলল। ফোনটা ইগনোর করল। সুমু হাত বাড়িয়ে শীতল গলায় বলল,
“কলটা রিসিভ করুন, হয়তো জরুরী কিছু।”
শেরাজ সুমুর চোখের দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ড স্থির রইল। ফোনটা হাতে নিয়ে রিসিভ করে লাউডস্পিকারে দিল।
“হেই শেরাজ, হাউ আর ইউ? আই সো ইউর প্রেজেন্টেশন অন এস.কে ফ্যাশন’স নিউ কালেকশন। আই লাইকড ইট।”
শেরাজ হাসিমুখে বলল,
“থ্যাঙ্ক ইউ, সিস। আই রিয়ালি লাভ ওয়ার্কিং উইথ ইউ।”
দুজনের মধ্যে কয়েক মিনিটের বিজনেসের কথা চললো। সুমু চুপচাপ শুনছিল। তার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি। কিছুক্ষণ পরই মেয়েটি হঠাৎ গলাটা কোমল করে বলল,
“হেই শেরাজ! ক্যান আই আস্ক ইউ অ্যা কোয়েশ্চেন?”
শেরাজ ঠাণ্ডা গলায় বলল,

“ইয়েস!”
মেয়েটি হেসে বলল,
“আর ইউ সিঙ্গেল?”
শেরাজ একটুও দেরি না করে একপলক সুমুর দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে নরম হাসি নিয়ে বলল,
“সরি সিস, নো!”
সে সুমুর দিকে তাকিয়ে ঠোঁট পাউট করে হাওয়ায় ছোট্ট কিস ছুঁড়ে দিয়ে বলল,
“আই হ‍্যাভ অ‍্যা বিউটিফুল ওয়াইফ।”
অপাশ থেকে মেয়েটির মৃদু হাসি শোনা গেল।
“ওহ! কংগ্র্যাচুলেশনস শেরাজ।”
শেরাজ ভদ্রসূচক হেসে বলল,
“থ্যাঙ্ক ইউ, সিস!”
মেয়েটি কৌতুহলবশত বলল,
“ডিড আই জাস্ট হিয়ার সামথিং?”
মেয়েটার কথাটা শুনে সুমু মুখে হাত দিয়ে অন্যদিকে ঘুরে হেসে ফেলল। শেরাজ থতমত খেয়ে হালকা কাঁশি দিয়ে বলল,

“নিউলি ম‍্যারিড কাপল, সিস। আই থিং ইউ আন্ডারস্ট‍্যান্ড?”
সুমু লজ্জায় গালে হাত চাপা দিয়ে হাসি আটকানোর চেষ্টা করল। ওপাশ থেকে মেয়েটা একটু উচ্চস্বরে হেসে নরম গলায় বলল,
“ওহ, আই আন্ডারস্ট্যান্ড। ডিড ইউ কিস ইয়োর ওয়াইফ?”
শেরাজ ঠোঁট কামড়ে হাসল। মেয়েটা একটু লাজুক হেসে আবারও বলল,
“ইউ নো, ওয়ান অফ মাই ফ্রেন্ডস রিয়ালি লাইক ইউ। বাট নাউ আই সি ইউ’আর মেরিড,” একটু থেমে ঠোঁটে মৃদু হাসি টেনে আবারও বলল, “ইটস ওকে শেরাজ, আই উইল এক্সপ্লেইন টু মাই ফ্রেন্ড। ইউ স্পেন্ড গুড টাইম উইথ ইউর ওয়াইফ, বাই!”
শেরাজ ফোন নামিয়ে সুমুর দিকে মিষ্টি চোখে তাকিয়ে হেসে ফেলল। সুমু লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নিল। সে ফোনটা পূনরায় জায়গায় রেখে সুমুর মুখের সামনে আপেলের একটা পিস ধরে বলল,

“ইট ইট, সুইটহার্ট। ইয়োর ফেভারিট। টেস্ট ইট অ্যান্ড সি ইফ ইট’স সুইট।”
সুমু শেরাজের হাত আলতো করে ধরে তার মুখের সামনে থেকে সরিয়ে দিল। সে শেরাজের কোলের ওপর বসে নেশালো গলায় বলল,
“টুডে আই ওয়ান্ট টু টেস্ট অ্যানাদার অ্যাপেল। আই ওয়ান্ট টু টেস্ট ইয়োর অ্যাডাম’স অ্যাপেল টুডে।”
কথাটা বলতে তার একটু দেরি হলেও, শেরাজের গলায় অ‍্যাডাম অ‍্যাপেলে কামড় বসাতে একটুও দেরি হলো না। শেরাজ চোখ বন্ধ করে সুমুকে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরে রাখল। শেরাজের বুকের ভেতর তুমুল ঢেউ খেলতে লাগল। সুমুর ঠোঁটের সেই নরম কামড় আর উষ্ণ নিঃশ্বাসে পুরো শরীরটাই শিহরিত হয়ে উঠল তার। সুমু ধীরে মুখ তুলে শেরাজের চোখের দিকে তাকাল। চোখে তার একরাশ লাজুক দুষ্টুমি। শেরাজ গম্ভীর অথচ নেশাতুর গলায় ফিসফিস করে বলল,

“সুইটহার্ট, তোমার এই দুষ্টামিটা আজ আর ছেড়ে দিচ্ছি না।”
বলেই সে এক হাত দিয়ে সুমুর কোমরটা শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে, আরেক হাতে সুমুর চিবুকটা তুলে ধরে গভীর চুমু এঁকে দিল সুমুর ঠোঁটে। চুমুর ভেতরেই সুমুর ঠোঁট থেকে এক নিমেষে মধুর আর্তনাদ বেরিয়ে এলো। শেরাজের হাত গিয়ে থামল সুমুর গলার কাছে, আঙুলে হালকা চাপ দিতে দিতে বলল,
“আজকে একটাই অ্যাপেল টেস্ট হবে, আর সেটা শুধু আমি টেস্ট করাবো।”
সুমু মৃদু হাসিতে ঠোঁট ভিজিয়ে ফিসফিস করে জবাব দিল,
“আপনি তো আমার সবকিছু…”
থেমে গেল সুমু। লজ্জায় আর মুখ খুলল না। শেরাজে তাকে বুকের সাথে চেপে ধরে ঘাড়ের কাছে মুখ নামিয়ে নিয়ে নিঃশ্বাস ছড়িয়ে দিল। সুমুর গলার কাছে ঠোঁটের ছোঁয়া দিতে দিতে বলল,
“তোমার এই নরম গলা, এই গন্ধ, শুধু আমার, আমার একার।”
সুমু এক হাত দিয়ে শেরাজের চুলে আঙুল চালিয়ে দিতে দিতে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসা গলায় ফিসফিস করে বলল,
“আর আপনি? আপনি শুধু আমার।”

সুমুর কথায় আলতো হাসল শেরাজ। একমিনিটও সময় না দিয়ে আবারও ঠোঁট মেশালো প্রেয়সীর ঠোঁটে। একটা দীর্ঘ চুমু শেষে সুমু হাপাতে হাপাতে শেরাজের বুকের ওপর মাথা রাখল। শেরাজ আঙুলে তার চুলগুলো আলতো করে আলাদা করে দিতে দিতে মৃদু হেসে নরম গলায় বলল,
“সুইটহার্ট! এভাবে যদি আরেকটু দুষ্টুমি করো, তাহলে আমার সব সীমারেখা হারিয়ে যাবে।”
সুমু চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে বলল,
“আপনি হারিয়ে যান না, খান সাহেব। আমিও তো চাই আপনার সবকিছুতে হারিয়ে যেতে। আপনার বুকের ভেতরে, আপনার নিঃশ্বাসে, আপনার ছোঁয়ায়।”
শেরাজ সুমুর চুলের গোড়ায় নাক ডুবিয়ে নিঃশ্বাস নিল।
“তোমাকে ছাড়া আর কিছুতে হারানোর মতো কিছু নেই আমার। শুধু তুমি আছো, শুধু তুমিই থাকবে।”
সুমু চোখ তুলে শেরাজের চওড়া চোয়ালের কাছে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। সেখান থেকে আস্তে করে ঠোঁটটা নামিয়ে শেরাজের বুকের ওপর ছোট্ট চুমু এঁকে দিয়ে বলল,
“আপনি জানেন খান সাহেব? আপনার বুকে কান রাখলে আমার মনে হয়, আপনার হৃদয়টা আমার নামে ধুকধুক করছে।”

শেরাজ হেসে সুমুর কপালে একটা চুমু এঁকে দিল। তারপর আলতো করে সুমুর গালটা দুই হাতের ভেতর নিয়ে বলল,
“তোমার মতো পাগল মেয়ের জন্যই বোধহয় আমার এই পাগলামী।”
সুমু নরম গলায় বলল,
“আপনার পাগলামী আমার খুব ভালো লাগে। কিন্তু আপনার চোখের রাগটা একদম ভালো লাগে না।”
শেরাজ সুমুর ঠোঁটে আঙুল রেখে চোখে চোখ রেখে বলল,
“এই রাগ তো তোমার জন্যই। তুমি যদি আমার না হতে, তাহলে বুঝতে রাগ কাকে বলে।”
সুমু লাজুক হেসে শেরাজের বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে দিল। শেরাজ তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ফিসফিস করে বলল,
“কখনও কোথাও যেও না আমাকে ছেড়ে। সারাজীবন এমন করে আমার বুকেই থেকো। আমি আর কিচ্ছু চাই না।”
সুমু গলা নামিয়ে গা ঘেঁষে বলল,
“আমি কোথায় যাবো, খান সাহেব? আমার তো একটাই ঠিকানা, শুধু আপনার বুক।”
শেরাজের বুকের ভেতর হঠাৎ তীব্র আবেগ খেলে গেল। তার গলার স্বর আরও ভারী হয়ে গেল,
“ব‍্যস এটুকুই যথেষ্ট, সুইটহার্ট।”
সুমু হাত বাড়িয়ে শেরাজের গলার কাছে আলতো করে আঙুল ছোঁয়াল। তারপর ফিসফিস করে বলল,
“আপনি কি জানেন, আপনার অ্যাডাম’স অ্যাপেল কামড় দিতে আমার কেন এতো ভালো লাগে?”
শেরাজ চোখ আধবোজা করে বলল,

“কেন?”
সুমু মিষ্টি হেসে বলল,
“কারণ তখন আপনার গলার স্বরটা বদলে যায়। আপনার নিঃশ্বাস থমকে যায়। আর আপনার চোখে আমার জন্য পাগলামি ফুটে ওঠে।”
শেরাজ হেসে ফেলে সুমুর চুল মুঠো করে ধরে ঠোঁটের কাছে টেনে বলল,
“তোমার এসব খুনসুটি একদিন আমায় শেষ করে দেবে।”
সুমু দুষ্টু হাসি দিয়ে বলল,
“আপনিই তো বলেন, শেষ হয়ে যেতে চান আমার ভেতর।”
শেরাজ এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সুমুকে বুকের মধ্যে টেনে কোলে করে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল। সুমুর চুল ছড়িয়ে পড়ল বালিশের ওপর। শেরাজ এক হাত দিয়ে সুমুর কপালে, গালে, গলায় আলতো ছোঁয়া বুলিয়ে দিতে দিতে ফিসফিস করে বলল,
“তোমাকে দেখে কিছুতেই তৃপ্তি হয় না। কী জাদু করলে বলো তো?”
সুমু অল্প হেসে বলল,
“আপনি না দেখলে, ছুঁয়ে না থাকলে আমি থাকতে পারিনা। আমার এই থাকতে না পারাটা, এটুকু জাদুই তো যথেষ্ট।”

শেরাজ নিচু হয়ে সুমুর গলার কাছে আরেকটা গভীর চুমু এঁকে দিল। সুমুর ঠোঁটের কোণে লাজুক হাসি আর মৃদু শ্বাসের কম্পন উঠল। চোখ বন্ধ করে একে অপরের গভীরে হারিয়ে যেতে চাইল তারা। লাল আপেলের টুকরাগুলো টেবিলেই পড়ে রইল। আজ সেই আপেল আর টেস্ট করা হয়নি। কারণ আজকে তারা শুধু একে অপরের স্বাদ খুঁজে পেতে ব্যস্ত হলো। কিছু সময় ব‍্যয় হতেই সুমু ঠোঁটে কামড়ে হেসে বলল,
“খান সাহেব! আমার অপারেশন…”
শেরাজ হুঁশে ফিরল। সে অপরাধীর ন‍্যায় তাকিয়ে বলল,
“ওহ শিট! সরি সুইটহার্ট!
নিজেকে সামলে সুমুর দিকে মায়াভরা দৃষ্টিতে তাকাল। সুমুর কথায় যেন বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল তার। সুমুর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকেই নরম গলায় বলল,
“সুইটহার্ট, আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। তুমি ঠিক আছো? পেইন হচ্ছে?”
সুমু হাসি চেপে শেরাজের গালে হাত রাখল।
“পেইন তো আপনার ছোঁয়ায় থাকে না, খান সাহেব। কিন্তু এখন আরেকটু সিরিয়াস হতে হবে, বুঝলেন?”
শেরাজ ওকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে এক হাত দিয়ে চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে কপালে ছোট্ট একটা চুমু এঁকে দিয়ে বলল,

“সরি, আমার পাগলী। তোমাকে এভাবে অযথা কষ্ট দিচ্ছিনা তো?”
সুমু চোখ বন্ধ করে শেরাজের বুকে মুখ গুঁজে হাসল।
“আপনি থাকলে কোনো কষ্টই কষ্ট না। আমার সব ব্যথার ওষুধ তো আপনিই।”
শেরাজ সুমুর কোমল মুখটার দিকে একবার তাকিয়ে নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল,
“বাট আই ডোন্ট কান্ট্রোল মাইসেল্ফ।”
তার মুখের প্রতিটি রেখায় একধরনের অসহায়তা ফুটে উঠল। সুমুকে আর শক্ত করে বুকে ধরে রাখতে পারল না সে। ধীরে ধীরে আলতো করে সুমুকে ছেড়ে দিয়ে পাশে সরে গিয়ে বিছানার কিনারায় বসে পড়ল। হাতদুটো মুষ্টিবদ্ধ করে কপালের সাথে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। সুমু অপরাধীর ন‍্যায় তাকিয়ে রইল তার খান সাহেবের দিকে। নিজের কর্মকান্ডের জন‍্য নিজেই নিজের কাছে অনুতপ্ত হলো।

সন্ধ্যা নামার আগে শহরটায় আচমকা এক অচেনা থমথমে ভাব। সারাদিনের আগুনের মতো রোদ্দুর এক লহমায় লুকিয়ে যায় দূরের পাহাড়ের গায়ে জমে থাকা কালো মেঘের নিচে। মরুভূমির ধুলোর স্তর যেন বাতাসে লাফিয়ে ওঠে ছুটে আসে শহরের রাস্তায়, দোকানের কাচের দরজায় ধুলো জমে। রাস্তার পাশে থেমে থাকা গাড়িগুলোর জানালা গুঁড়ো বালিতে ঢেকে যাচ্ছে। দূরে মসজিদের মিনার অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে হাওয়ার ধুলোয়। গরম হাওয়ার দাপট ছাপিয়ে এবার হিমেল এক ঝাপটা যেন মরুর বুক ফুঁড়ে কোনো পাহাড়ি ঠান্ডা বাতাস নেমে আসছে।
রায়ায়ন চৌধুরীর অফিস কেবিনটা ছিল একেবারে বিচিত্র এক জায়গা। দেওয়ালগুলো গাঢ় বাদামি কাঠের প্যানেলিংয়ে মোড়ানো, যেন নিজের মতো করে গোপনীয়তা আর আড়াল রক্ষা করছে। দেয়ালের একপাশে বিশাল কাচের জানালা থেকে দেখা যাচ্ছে দূরের শহরের আলো আর গগনের অন্ধকার মেঘ, যা ঝড়ের আগমনের আভাস দিচ্ছে। জানালার বাইরে বাতাস বইছে ঝঞ্ঝার মতো, আবার কখনো কখনো বজ্রপাতের ঝলকানি অফিসের অন্ধকারে অদ্ভুত এক গুঞ্জন সৃষ্টি করছে। মাঝখানে কালো মার্বেলের টেবিল, যার উপর ছড়িয়ে রয়েছে নানান ধরনের গোপন নথি, ফাইল আর রিপোর্ট। একপাশে রাখা স্ফটিকের বোতলে হুইস্কি, যার গ্লাসে অর্ধেক ভরা থাকা সত্ত্বেও আজ কেউ হাত দিচ্ছেনা। টেবিলের পেছনে বসে আছে রায়য়ান, কালো চামড়ার হাই-ব্যাক চেয়ারে হেলান দিয়ে। তার চোখ দুটো কঠিন আর তীক্ষ্ণ, যেন চোখের মাধ্যমে সবকিছু জানার চেষ্টা করছে। মুখের ওপর এক দৃষ্টিতে সূক্ষ্ম বিদ্রুপের ছায়া।
দেয়ালের উপর ঝুলছে একটি বিশাল বিমূর্ত চিত্রকর্ম। লাল রঙের আঁকাবাঁকা রেখাগুলো যেন রক্তের দাগ, যা তার ভিতরের অন্ধকার গল্প বলে যাচ্ছিল। কেবিনের একপাশে দাঁড়িয়ে আছে রুদ্র। তার মুখে চিন্তার ভাঁজ। হাত ঘোরাতে ঘোরাতে সে নিজের অস্থিরতাই বোঝাচ্ছে। রুদ্র একটু এগিয়ে এসে বলল,

“বস! ফ্লাইটের টিকিট কবে কাটব? আমাদের হাতে আর বেশি সময় নেই। আপনাকে তো ইন্ডিয়া যেতে হবে।”
রায়য়ান তার দিকে তাকাল। চোখে ঝলমল করছে আভিজাত্যের সঙ্গে কঠোরতা, যেন কোনও অপরাধীকে একটুখানি দমন করতে চাচ্ছে। কিছুক্ষণ নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকার পর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল মৃদু একটি হাসি, যা বিদ্রুপ আর হুমকির মিশ্রণ।
“সময় নেই বলছিস? সময় তো আমি নিজে বানিয়ে নিতে পারি, রুদ্র। কিন্তু ওরা কি প্রস্তুত?”
রুদ্র হতভম্ব হয়ে গেল। রায়য়ান হাতে ধরা সোনালি কলমটির ঢাকনা খুলতে খুলতে বলল,
“টিকিট কাটবি? কিন্তু কী নিয়ে ফিরবি, সেটা আগে ঠিক করে নিস।”

জানালার বাইরে ঝড়ের গর্জন এবং বজ্রপাত অফিসের ভেতর ভয়ংকর এক উত্তেজনা সৃষ্টি করছে। রুদ্র গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে বুঝল এখন এক অন্য মাত্রার খেলায় ঢুকেছে। রায়য়ান আবার নীরবে ফাইলে চোখ ফেরাল। তার মনে হচ্ছিল, সময়, দেশ আর মানুষ, সবই তার জন্য শুধু খেলার মোহর। রুদ্র বুঝল, শত্রুর অস্তিত্ব রায়য়ানের কাছে নড়বড়ে এক খেলা মাত্র। সে যেন বাতাসে ভাসমান এক ধোঁয়া, যা কখনোই স্থায়ী নয়। রুদ্র টেবিলের কোণায় রাখা পুরনো মানচিত্রটার দিকে একবার তাকাল। তাতে লাল মার্কারে আঁকা কয়েকটা গোল চিহ্ন, যেন শিকারীর নিশানা। সে জানে, ওসবের মানে কী। ওখানেই তাদের যেতে হবে রায়য়ানের নির্দেশে।
হঠাৎ করেই ঘরের ভেতরের সাইলেন্স ভেঙে কড়া একটা শব্দে টেবিলের উপর সোনালি কলমটা রায়য়ান আছড়ে রাখল। রুদ্র চমকে উঠে চোখ মেললো তার দিকে। রায়য়ান চেয়ার থেকে হেলে সামনের দিকে ঝুঁকে এলো। কাচের জানালার বাইরে ঝড়ের তাণ্ডব যেন তার মনের অস্থিরতা আর শক্তির প্রতিচ্ছবি।

“রুদ্র! আমার জন্য ব্যর্থতা শব্দটা নেই। গেমটা শুরু হবার আগেই শেষ করে আসবি, বুঝলি?”
রুদ্র গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
“বুঝেছি, বস!”
রায়য়ান চোখ নামিয়ে নথিগুলোর পৃষ্ঠা উল্টে বলল,
“ফ্লাইট, হোটেল, গাড়ি, সবই তোর জন্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু মনে রাখিস, ইন্ডিয়া গিয়ে তুই আমার ছায়া। যা করবি, আমার নামেই করবি। আর আমি পরশু ফ্লাইটে ইন্ডিয়া ফিরব।
ঝড়ের এক বিকট শব্দে জানালার কাচ কেঁপে উঠল। রুদ্র সেদিকে তাকিয়ে দেখল বিদ্যুতের আলোয় রায়য়ানের মুখে এক অদ্ভুত ছায়া। রায়য়ান হুইস্কির গ্লাসটা তুলল। ঠোঁট ছুঁয়েই আবার নামিয়ে রাখল। খালি চোখে দেখা গেল, তার মুখে হাসি নেই, আছে অদৃশ্য আগুন।
“যা, রুদ্র। টিকিট কেটে ফেল। আর হ‍্যাঁ…”, সে চোখ সরিয়ে আবার বাইরের অন্ধকার শহরের দিকে তাকাল, “যাদের শিকার করবি, তাদের গায়ে যেন আমার ছায়া লেগে থাকে। ওরা ভুলেও যেন না ভাবে, পালানোর রাস্তা আছে।”
রুদ্র কোনো জবাব দিল না। সে জানে, এই খেলার শেষ নেই। আর এই খেলার মাস্টার প্লেয়ার রায়য়ান চৌধুরী।
ঝড়ের গর্জনে কেবিনের দেওয়ালগুলো যেন কেঁপে উঠল আর এক মুহূর্তের জন্য, বাইরে অন্ধকার শহরের আলোয় রায়য়ানের চোখ দুটো জ্বলে উঠল অন্ধকারের চেয়েও ভয়ঙ্কর হয়ে।

ঘড়ির কাঁটা তখন ঠিক রাত নয়টা ছুঁই ছুঁই। বাইরে ঝড়ের শব্দ এখন অনেকটাই কমে এসেছে, তবুও বাতাসে ভেজা ঠাণ্ডা ছোঁয়া লেগে আছে। শেরাজ ধীরে ধীরে সুমুর পাশে বসে তাকে ওষুধ খাইয়ে দিচ্ছে। সুমুর চোখে একরাশ ক্লান্তি। তবুও শেরাজের স্পর্শে একটু স্বস্তি খুঁজে পাচ্ছে সে। ওষুধ খাওয়া শেষ হতে না হতেই শেরাজের ফোনটা আচমকা বেজে উঠল। ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠল “সান” নামটা। নামটা দেখেই শেরাজের চোখের কোণ এক মুহূর্তের জন্য কঠিন হয়ে উঠল। সুমুর দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল,
“তুমি শুয়ে পড়ো, সুইটহার্ট।”

সুমুর ঠোঁটে অস্পষ্ট হাসি ফুটল। সে কিছু বলার আগেই শেরাজ ফোনটা হাতে নিয়ে বেলকনির দিকে পা বাড়াল। ঝড় থেমে যাওয়া রাতের ঠাণ্ডা হাওয়ায় ওর শার্ট উড়তে লাগল। শেরাজ বেলকনির অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ফোন কলটা রিসিভ করল। বেলকনির একপাশে গিয়ে শেরাজ ফোনটা কানে তুলতেই ওপাশ থেকে স্যান্ডির কন্ঠ শোনা গেল।
“স্যার, আপনাকে এখনই এখানে প্রয়োজন। একে আর বাঁচিয়ে রাখা যাবে না।”
শেরাজ এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তার চোখের গভীরে হঠাৎ যেন এক রকম অদ্ভুত অন্ধকার নেমে এল। ঠোঁটের কোণে হালকা কঠোর হাসি ফুটে উঠল।
“ঠিক আছে। সব ব্যবস্থা করে রাখো।”
কলটা কেটে দিল সে। রুমে এসে সুমুর কাছে গিয়ে বসল। সুমু ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কিছু কি হয়েছে?”
শেরাজ সুমুর দিকে তাকিয়ে একটু সময় নিল, যেন মনের ভিতর কিছু লড়াই চলছে। সে ধীরে সুমুর কাঁধে হাত রেখে বলল,

“একটা জরুরী কাজ পড়ে গেছে। এখনই যেতে হবে। কিন্তু তোমার এই অবস্থায়…”
সুমু ভ্রু কুঁচকে তাকাল। তার কণ্ঠে অস্পষ্ট উদ্বেগ,
“এত রাতে? খুব দরকারি?”
“হুম!”
সুমু মৃদু হেসে বলল,
“আমি তো বাচ্চা মেয়ে নই, খান সাহেব। আপনি যান।”
“কিন্তু তুমি অসুস্থ। এভাবে একা ফেলে যেতে পারব না।”
“কতোক্ষণ লাগবে?”
“এই জাস্ট দু’ঘন্টা মতো।”
“মাত্র নয়টা পঁচিশ বাজে। আপনি যান। আমার কোনো সমস্যা হবেনা। আর সমস্যা হলে তো বাড়ি ভর্তি লোক আছে। আম্মু আছে, ইশিতা আছে।”
শেরাজ মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বলল,

“দরকারি না হলে যেতাম না, সুইটহার্ট। তুমি এখন একটু ঘুমাও।”
সুমু এক মুহূর্ত তার চোখে চোখ রাখল, যেন তার অভ্যন্তরের অস্বস্তিটা বোঝাতে চাইছে।
“আপনি সাবধানে যাবেন?”
শেরাজ এবার একটু নরম হয়ে সুমুর কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। তারপর উঠে দাঁড়াল। ধীর পায়ে আলমারির দিকে এগিয়ে গিয়ে ধূসর রঙের কোটটা গায়ে চাপিয়ে নিল। নিজেকে একটু পরিপাটি করে সুমুকে “আসি” বলে বেরিয়ে গেল।
সুমু তখনো তাকিয়ে রইল। তার চোখে হাজারো প্রশ্ন, কিন্তু মুখে একটাও শব্দ নেই। দরজার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে গেল শেরাজ। বাইরের রাস্তা তখন প্রায় নিস্তব্ধ। শুধু দূরের কোথাও একটা গাড়ির হর্ণ, আর আকাশের মাঝে মাঝে গর্জে ওঠা বিজলির ঝলকানি। শেরাজ নিজের গাড়িতে উঠে বসল। গাড়ি ছুটে চলল তার গন্তব্যে।

সুমুর ঘুম কিছুতেই আসছে না। চোখ বন্ধ করলেই মন ছুটে যাচ্ছে শেরাজের দিকে। তার কথার সুর, চোখের গভীরতা, আর একটু আগেই দরজার দিয়ে হেঁটে চলে যাওয়া সেই চেহারা বারবার চোখে ভাসছে। হঠাৎ সে উঠে দাঁড়াল। ঘরটা নিঃস্তব্ধ, কেবল ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দ আর জানালার ফাঁক দিয়ে আসা ঠাণ্ডা হাওয়ার স্পর্শ। ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে আয়নায় নিজেকে একবার দেখল। চোখে হালকা ক্লান্তি, কিন্তু মন বলছে, আজ রাতটা কেমন যেন অচেনা। অস্থিরতা থেকে মুক্তি পেতে সে নিজেকে ব‍্যস্ত রাখার জন‍্য হঠাৎ তার একটু সাজতে ইচ্ছে করল। সে ধীরে আলমারির দিকে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলল। ঠিক উপরের তাকেই তার চোখে পড়ল একটা সুন্দর মোড়ানো প্যাকেট। তার ওপর একটা ভাঁজ করা কাগজ।

সুমু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। এই প্যাকেটটা সে আগে দেখেনি। সে নিঃশব্দে হাতে তুলে নিল প‍্যাকেটটা। কাগজটা খুব যত্নে ধরে প্যাকেটসহ বেডের ওপর এসে বসে প্যাকেটটা পাশেই রাখল। ধীরে ভাঁজ খুলে কাগজটা চোখের সামনে ধরল। কাগজটায় ছিল শেরাজের হাতের লেখা। সাদা কাগজে কালো কালিতে মায়া মেশানো অক্ষরগুলোর দিকে তাকিয়ে থেকে সুমুর হৃদয়টা একবার ধক করে উঠল। সে লেখাগুলো পড়তে শুরু করল,
প্রিয়তমা,
আজকের এই ব্যস্ত ডিজিটাল যুগে দাঁড়িয়ে, এই যান্ত্রিক শহরে থেকে যখন সবাই কেবল স্ক্রলে ভালোবাসে, যখন ভালোবাসার সংজ্ঞা আটকে গেছে ইমোজিতে, রিআক্টে। তখন আমার হৃদয়টা বারবার ফিরে যেতে চায় সেই নব্বই দশকে। যেখানে চিঠির প্রতিটা অক্ষরেই লুকিয়ে থাকতো অনুভবের গভীরতা, অপেক্ষার মাধুর্য আর ভালোবাসার গন্ধ। এখন এই শহরে যতোটা গতি, ঠিক ততোটাই শূন্যতা। এই শহরে প্রেম বোঝায় রিলেশনশিপ স্ট‍্যাটাসে। কিন্তু আমার হৃদয়ের গভীর থেকে আমি এখন সেই নব্বই দশকের প্রেমিক হয়ে বসে আছি। এই চিঠি কোনও ইনবক্সে নয়। এটা বুকপকেটে রাখার মতো একটা সময়হীন বার্তা।

প্রিয়তমা আমি চাই, তুমি একদিন সাজবে শুধু আমার জন্য। নব্বই দশকের সেই রূপে, যা দেখলে সময়ও থমকে দাঁড়াবে। তুমি পরবে লাল পাড় সাদা শাড়ি, যার প্রতিটি ভাঁজে থাকবে আমাদের স্মৃতির ছোঁয়া। তোমার হাতে আর পায়ে থাকবে আলতার রাঙা রঙ, যেন প্রেমের প্রথম লাজ। গলায় সিলভারের হার, হাতে চুড়ি, আর পায়ে নুপূরের শব্দে ধ্বনিত হবে তোমার আগমন। কপালে একটা ছোট্ট কালো টিপ, ঠোঁটে লাল রঞ্জক, যেটা আমার নাম করে লাগাবে। আর চোখে গাঢ় কালো কাজল। তোমার চোখে থাকবে সেই মায়া, যার গভীরতায় আমি হারিয়ে যেতে চাই।
সেদিন আমার পরণে থাকবে সাদা পাঞ্জাবি -পাজামা, কাঁধে থাকবে পুরোনো কাশ্মীরি শাল। তুমি যখন সেই সাজে আমার সামনে এসে দাঁড়াবে, তখন আমি তোমার চোখে চোখ রেখে বলবো, এই তো আমার স্বপ্নের সেই মেয়েটি, আমার খান সাহেবা। সময় বদলাচ্ছে, যুগ পাল্টাচ্ছে। আমি হয়তো নব্বই দশক‍ের পুরুষ নয়, কিন্তু আমি তোমাকে ভালোবাসি ঠিক সেই নব্বই দশকের প্রেমিক হয়ে আমার মতো করে।

এই যুগের কৃত্রিম ভালোবাসা আমার দরকার নেই, আমি তোমার কাছ থেকে নব্বই দশকের ভালোবাসা চাই। যেখানে অপেক্ষা থাকবে, চিঠি থাকবে, চোখে চোখ রাখা থাকবে। থাকবে না অনলাইন স্ট্যাটাস, কিন্তু থাকবে অফলাইন হৃদয়ের সংযোগ। আমি চাই, তুমি সাজো আমার চোখের মতো করে। যেমন সাজতো সেই সময়ের মেয়েরা, আর যাদের ভালোবাসা এক জীবনের জন্য যথেষ্ট ছিল।

প্রিয়তমা, নব্বই দশকের প্রেম নামে ছিল, কাউকে দেখে বুকের মধ্যে হালকা ব‍্যথা অনুভব করা। অকারণে কারো অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসে থাকা। আমি সেই অপেক্ষাগুলো তোমার জন‍্য করতে চাই। তুমি জানো, নব্বই দশকের প্রেম মানেই হাতে চিঠি, বৃষ্টিতে ছাতা ভাগাভাগি, আর স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা। সেই প্রেমে ছিল না দ্রুততা, ছিল শুধু ধৈর্য্য আর গভীর টান। সেই সময়ের প্রেম ছিল অল্প শব্দে, গভীর অর্থে। তখন একটা “ভালো থাকো” মানে ছিল সারাজীবনে চাওয়া। আমি তোমার চোখে সেই চাওয়া দেখতে চাই। আমি তোমার কাছে সেই নব্বই দশকের ঘ্রাণ পেতে চাই। আজ আমি সেই প্রেমটাই চাই, তোমার কাছ থেকে। আমি চাই একটা স্নিগ্ধ বিকাল। তখন আমরা ছাদে বসে থাকব। বৃষ্টির শব্দ শুনব আর বৃষ্টিবিলাস করব।

তোমাকে দেখে আমার মনে হয়, তুমি হয়তো ভুল করে আজকের যুগে এসে পড়েছো। আসলে তোমার জায়গা ছিল কোনো পুরোনো দিনের উপন‍্যাসে। যে সময়ে মেয়েরা শাড়ি পড়ে ভালোবাসা দিতে। আর ছেলেরা চোখে চোখ রেখে বলে দিতো, ‘তুমি আমার পৃথিবী’। খান সাহেবা, তুমি আমাকে দেবে সেই ভালোবাসা। যে ভালোবাসায়, ভালোবাসা আর প্রতিক্ষার ভেতর কোনো সীমারেখা থাকবে না।
প্রিয়তমা, এই চিঠির শেষ নেই, কারণ প্রেমের কোনো সময়সীমা হয় না। তবে যদি পারো, একদিন আমার জন্য ঠিক ওইভাবে সাজো। নব্বই দশকের ভালোবাসার সাজে, যেখানে তুমি হবে আমার অপেক্ষার পূর্ণতা। তোমাকে আমি ভালোবাসি, সেটা বলার জন্য ভাষা খুঁজে পাইনা, কারণ ভালোবাসাটা কেবল শব্দে আটকানো যায় না। তুমি আমার শান্তি, আমার তীব্রতা, আমার সবচেয়ে দুর্বল জায়গা। আজ আর নই, ইচ্ছে করলে একদিন সেজো আমার জন‍্য। আমি অপেক্ষায় থাকব সেই দিনটার জন‍্য।

“তোমার খান সাহেব”
(নব্বই দশকের প্রেমিক, আধুনিক যুগে পথ ভুলে ফেলা এক ভালোবাসার যাত্রী)
সুমু চিঠিটা ভাঁজ করে সাইডে রেখে প্যাকেটটা হাতে তুলে নিল। প্যাকেটটা খুলে দেখতে পেল নব্বই দশকের সাজের সমস্ত সরঞ্জাম, লাল পাড় সাদা শাড়ি নিখুঁত করে ভাঁজ করা। পাশে রাখা কাঁচের চুড়ি, ছোট্ট টিপ, লাল লিপস্টিক আর সেই পুরনো দিনের মতো কাজলের ডিবি, আরও কিছু অর্নামেন্টস। সুমু আলতো হেসে শাড়িটা বুকে জড়িয়ে ধরে বলল,

“সাজব আমি আপনার জন্য।”
একটু হাসি লেগে রইল তার ঠোঁটে। সে সবকিছু আবার গুছিয়ে প্যাকেটটাকে আলমারিতে রাখতে গেলে, হঠাৎ তার চোখ গেল আলমারির কোণায়। প্যাকেটটা জায়গামতো তুলে রেখে সুমু আলমারির কোণায় গিয়ে দাঁড়াল। দেয়ালের অংশটা কেমন যেন উঁচু-নিচু। সে একটু ঝুঁকে ভালো করে দেখতে লাগল। ভ্রু কুঁচকে নিজেকেই বলল,
“আমরা তো কিছুদিন ধরে বাড়িতে ছিলাম না। আলমারিটা কি কেউ সরিয়েছে? জায়গাটা কেমন খসে গেছে। আর আলমারিটা দেখে মনে হচ্ছে, এটা সরানো হয়েছে।”

সন্দেহ আর কৌতূহল একসাথে দলা পাকিয়ে উঠল তার মাথায়। সুমু আস্তে হেঁটে বেড থেকে ফোনটা এনে ফ্ল্যাশ জ্বালাল। আলমারির কোণায় ফ্ল্যাশ মারতেই স্পষ্ট দেখতে পেল দেয়ালের একটা অংশ কেমন গর্তের মতো, কিন্তু একেবারে গর্তও নয়। সে হাত দিয়ে ঠেলে দেখতে গিয়ে অনুভব করলো, দেওয়ালের ওই অংশটা আলাদা। আলমারিটা সরাতে হবে বুঝেই সে ধীরে ধীরে সব জামাকাপড়, শাড়ি একে একে নামিয়ে বিছানায় রাখল। পুরো আলমারি খালি হতে না হতেই দু’হাত দিয়ে ঠেলা দিতে লাগল। প্রথমে কিছুই হলো না। আরেকটু জোরে ঠেলা দিতেই শব্দ করে আলমারিটা অল্প নড়ে গেল। পেছনে স্পষ্ট হলো দেয়ালের গায়ে ছোট একটা কাঠের প্যানেল, যেন ছোট্ট একটা গোপন দরজা।

সুমু থমকে গেল। চোখ বড় বড় হয়ে গেল তার। বুকের ভেতর ধুকপুক করতে শুরু করল। এতদিন ধরে সে জানতোই না এখানে এমন কিছু লুকানো আছে। সে হাত বুলিয়ে দেখতে লাগল। পুরনো কাঠের দরজায় ধুলো আর জালের আস্তরণ। প্যানেলের পাশে ছোট একটা হ্যান্ডেলও আছে, যা দেয়ালের রঙের সাথে এমনভাবে মিশে গেছে, যে দূর থেকে বোঝার উপায়ই নেই। আর সেই প‍্যানেলের সামনে এতো বড় একটা আলমারি রাখা, কেউ কীভাবে বুঝবে এখানে এতো বড় দরজা আছে। সুমু ধীরে ধীরে হ্যান্ডেলে হাত রাখল। হাতের তালুতে হঠাৎ শীতল ঠাণ্ডা লাগল। একবার শ্বাস বন্ধ করে দরজার হাতলটা ঘোরাতে গেল। একটা শব্দ হলো, আর সেই সাথে দরজা যেন নিজে থেকেই খুলে গেল। সুমু আলতোভাবে দরজার প্যানেলটা টেনে খুলে ফেলল। ভেতরে অন্ধকার গহ্বর। ফোনের ফ্ল্যাশে কেবল ধুলো আর কুয়াশার মতো অদ্ভুত অন্ধকার। কোথা থেকে যেন বাজে গন্ধ ভেসে আসছে। সুমু মুখে ওড়না দিয়ে নিঃশ্বাস আটকে বলল,

“এর ভেতরে কি আছে?”
হালকা কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে সামনে ধরল। আর ঠিক তখনই সে দেখল সামনে একটা সিঁড়ি। ধুলোর চাদরে ঢাকা, পুরনো সরু সিঁড়ি, যা ধীরে ধীরে নিচের দিকে নেমে গেছে অন্ধকার গহ্বরে। প্রথমে তার গলা দিয়ে কোনো শব্দই বের হলো না। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। সে নিজের মনে মনে বলল,
“আচ্ছা! এটা নিচে কোথায় নিয়ে যায়?”

খান সাহেব পর্ব ৫৪

সিঁড়ির ধাপে জমে থাকা ধুলোর উপর আঙুল বুলিয়ে দেখল, কেউ বহু বছর এই দরজা খোলেনি বোঝাই যাচ্ছে। তবু আশ্চর্যের বিষয়, দরজাটা খুলে গেল এতো সহজে। একটু ভালো করে চোখ বুলাতেই দেখল, কারো পায়ে ছাপ। সুমু কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। সে আবারও ফ্ল্যাশ মারল। সিঁড়িটা অনেক নিচে গেছে। নিচে কোথাও যেন একটা নরম আলো জ্বলজ্বল করে জ্বলছে, কিন্তু তার উৎস দেখা যাচ্ছে না। হঠাৎ একটা ঠাণ্ডা বাতাসের ঝাপটা গায়ে এসে লাগল তার গায়ে। মুহুর্তেই গা শিহরে উঠল তার।

খান সাহেব পর্ব ৫৬