Home হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২৬ (৩)

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২৬ (৩)

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২৬ (৩)
সাবা খান

লাহোরের বুকে নেমে এসেছে গভীর অন্ধকার রাত। আর সেই রাতের বুক চিঁড়ে এগিয়ে চলছে ইকবাল জাওয়ানের গাড়ি টা। গাড়ি অবশ্য নিজের না, রেন্টে নিয়েছে এ কদিনের জন্য। দূরানী হাউসের সামনে এসে থামতেই ইকবালের গাড়ির কাঁচে প্রতিফলিত হতে থাকে ঝলমলে আলো, রঙিন লাইট, উচ্চ শব্দে বাজতে থাকা মিউজিক, আর ভেতর থেকে ভেসে আসছে কোলাহল। বাইরে দাঁড়িয়েই বোঝা যায় ভিতরে চলছে এক বেহায়া উৎসব।
সোফিয়া ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকায় সেই বাড়িটার দিকে, যেখানে তার শৈশব কবর হয়ে আছে। তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে একটা বাঁকা, রহস্যময় হাসি। ঠিক তখনই তার কাঁধে অনুভূত হয় পুরুষালী হাতের চাপ। সাথে সাথে সোফিয়ার হাসিটা মিলিয়ে যায়। সে ঘুরে তাকাতেই নজরে আসে ইকবাল জিজ্ঞেসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে,

–“এটাই… তোমার বাড়ি?”
সোফিয়া কিছু না বলে শুধু মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বুঝায়। তারপর সে বললো,
–“আমি একা ভেতরে যেতে চাই”
ইকবাল ভ্রু কুঁচকে তাকায়, তারপর ঘড়ির দিকে নজর দিয়ে বলে,
–“এক ঘণ্টা”
সোফিয়া কিছুটা এগিয়ে এসে থামে, তারপর নরম স্বরে বলে,
–“প্লিজ… দুই ঘণ্টা…”
ইকবাল কিছুক্ষণ তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। অবশেষে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়ে,
–“ঠিক আছে… কিন্তু সাবধানে থাকবে”
সোফিয়া আর কিছু না বলে গাড়ি থেকে নেমে যায়। দূরানী হাউসের বিশাল দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই তার সামনে খুলে যায় এক বিকৃত বাস্তবতা। হলরুমের ঝলমলে আলোতে নারী আর মদ নিয়ে মেতে উঠেছে লরেন্সের ছেলেরা। কেউ টলতে টলতে হাঁটছে, কেউ বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছে সোফায়, কেউ বা নিজের জগতে ডুবে গেছে। সোফিয়া একবার চারপাশে তাকায়, তার চোখে না ঘৃণা, না বিস্ময় শুধু এক ধরনের শীতল নির্লিপ্ততা ভেসে ওঠে। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় সিঁড়ির দিকে। প্রতিটা কদম ফেলার সাথে সাথে তার চোখের দৃষ্টি বদলাতে থাকে। মনের পাতায় ভেসে ওঠতে থাকে, পুরনো সব স্মৃতি। তার মায়ের চিৎকার, কান্না, অসহায়তা। তার আঙুলগুলো ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে আসে। উপরে পৌঁছে সে থামে এলেনার দরজার সামনে।
ভেতর থেকে আসছে তুলি চালানোর শব্দ। সোফিয়া দরজাটা ধীরে ঠেলে ভেতরে ঢোকে। নজরে আসে এলেনা বসে আছে ক্যানভাসের সামনে, সে নিজের জগতে ডুবে আছে। চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে রঙ, তুলি, অর্ধসমাপ্ত ছবি।

এলেনা নিজের কাজে এতটাই মগ্ন যে খেয়ালই করেনি তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে কেউ। সোফিয়া কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকে তার দিকে। তার চোখে ভেসে ওঠে অতীতের দৃশ্যগুলো। তারপর সে ধীরে একটা ক্যানভাস তুলে এক মুহূর্তও দেরি না করে সজোরে আঘাত করে। এলেনা হঠাৎ আঘাত সামলে উঠতে না পেরে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে। চোখ তুলে তাকাতেই সামনে সোফিয়াকে দেখে তার চোখ বিস্ফোরিত হয়ে যায়।

সে মুখ খুলে কিছু বলার আগেই সোফিয়া চারপাশের জিনিসপত্র ব্যবহার করে একের পর এক আঘাত করতে থাকে। এলেনা চিৎকার করে কাউকে ডাকার আগেই সোফিয়া পাশ থেকে একটা রঙের কৌটা তুলে সম্পূর্ণ রং তার মুখে ঠেসে ধরে। এলেনা একে তো আঘাতপ্রাপ্ত তার ওপর সোফিয়ার শক্তির সাথে যেন পেরে উঠছে না। বাধ্য হয়ে সে সম্পূর্ণ রঙটাকে গিলে ফেলে। সোফিয়া এতে থেমে থাকেনি। সে একে একে সবগুলো রংয়ের কৌটা তার মুখে ঠেসে ঠেসে ধরে। এলেনার নাক মুখ সব জায়গা দিয়ে রঙয়ের সাথে রক্ত বেরুতে শুরু করে। সে বারবার কাশি দিচ্ছে। কিন্তু নিচে পার্টি চলার কারণে উচ্চ শব্দে তার আওয়াজ কেউই শুনতেই পায় না। তারপর সোফিয়া একটা তুলি নিয়ে সরাসরি এলেনার চোখে সেটা ঢুকিয়ে দেয়। সাথে সাথে এলেনার চোখ দিয়ে গলগল করে রক্ত বেরোতে শুরু করে। তারপর একটা পেইন্ট নাইফ নিয়ে বারবার তার বুক, গলা সব জায়গায় আঘাত করতে থাকে সোফিয়া। এলেনা চিৎকার করে ছটফট করতে থাকে। আজ তার চিৎকার গুলো সোফিয়া কে ছুঁতে পারছে না। তারপর সোফিয়া একে একে তার ওপর তার আঁকা ক্যানভাসগুলোকে ছুঁড়তে থাকে। একে তো এলেনা এমনিতেই দুর্বল তারউপর এত আঘাত সহ্য করতে না পেরে এক সময় সে তার সেই বিকৃত ক্যানভাসগুলোর নিচে চাপা পড়ে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে। সোফিয়া এতেই থেমে থাকে না। সে ক্যানভাস গুলোর উপর একটা ক্যান্ডেল ফেলে বেড়িয়ে যায়। মুহূর্তেই আগুন ধরে ওঠে। শিখাগুলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। রঙ, কাপড়, কাঠ সবকিছু গিলে নিতে থাকে আগুন সাথে এলেনা ফ্রাঞ্চেস্কা কেও।

এলেনার কক্ষ থেকে বেড়িয়ে সোফিয়া ধীরে ধীরে আরেকটা করিডোর ধরে এগিয়ে গেল তার বাবার স্টাডি রুমের সামনে। একসময় যেখানে বইয়ের গন্ধ ছিল, আজ সেখান থেকে রাসায়নিকের তীব্র গন্ধ ভেসে আসছে। লরেন্স এটাকে নিজের ব্যক্তিগত গবেষণাগার বানিয়ে ফেলেছে। সোফিয়া ধীরে দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢোকে। ভেতরে লরেন্স দাঁড়িয়ে আছে ল্যাব টেবিলের সামনে। হাতে সিরিঞ্জ, চোখে মনোযোগী ভাব, চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কেমিক্যাল, ভায়াল, নোট। সে এতটাই নিজের কাজে ডুবে যে তার পেছনে দাঁড়ানো মৃত্যুকেও টের পাচ্ছে না।
সোফিয়া ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে টেবিলের উপর। সেখান থেকে একটা কাঁচের শিশি হাতে নিয়ে নাড়িয়ে ছাড়িয়ে দেখে। শিশির গায়ে লেখা,
“Hydrofluoric Acid”
এটা এমন একটা এসিড, যা শুধু ত্বক পোড়ায় না, হাড় পর্যন্ত গলিয়ে দিতে ফেলতে পারে। সোফিয়ার ঠোঁটের কোণে এক ফোঁটা হাসি ফুটে ওঠে। লরেন্স নিজের পিছনে কাউকে অনুমান করতে পেরে ঘুরে দাঁড়ায়। আর নজর আটকায় সোফিয়ার বাদামী চোখে। মুহূর্তে তার মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে যায়। কণ্ঠ থেকে ফিসফিস করে বের হয়,
–“তু… তুমি? তুমি তো… জেলে…”
জিহবা খসে বাকি বাক্যটুকু বের করার আগেই সামনের রমণী সরাসরি এসিডটা ছুঁড়ে মারে তার দিকে। এক ঝলকে লরেন্সের শরীর যেন আগুনে জ্বলে ওঠে। তার ত্বক ঝলসে যায়, মাংস গলে পড়তে থাকে। সাথে সাথে কক্ষে প্রতিধ্বনিত হয় একটা তীব্র আত্মচিৎকার,

–“আআআআআআআআহহহহ”
লরেন্সের চিৎকারে যেন পুরো কক্ষ কেঁপে ওঠে। সে মেঝেতে পড়ে যায়, নিজের শরীর আঁকড়ে ধরে ছটফট করতে থাকে। কণ্ঠস্বর থেকে বহু কসরতে বের হয় ,
–“সামবডি হেল্প মি…”
কিন্তু নিচে বাজতে থাকা তীব্র মিউজিকের শব্দের কাছে তার আর্তনাদ গুলো তুচ্ছ মনে হচ্ছে। সোফিয়া ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। তার চোখে কোনো দয়া মায়া নেই। সে টেবিল থেকে একের পর এক সিরিঞ্জ তুলে নেয়। যেগুলোর গায়ে স্পষ্ট লেখা,

–“ম্যানবিস্ট-৩১”
লরেন্স এই ড্রাগস টাকে বিভিন্ন ভাকে ভাগ করে গবেষণা চালাচ্ছে। এটাকে আরও গ্রহণযোগ্য করার জন্য। এটাকে সে পরিণত করতে চায় এমন একটা ড্রাগে, যা মানুষের স্নায়ুতন্ত্রকে বিকৃত করে, ভেতরের হিংস্র প্রবৃত্তিকে জাগিয়ে তোলে, এবং শরীরকে অসহনীয় যন্ত্রণায় ফেলে দেয়। সোফিয়া একের পর এক সেই ইনজেকশন গুলো পুশ করতে থাকে লরেন্সের শরীরে বিরামহীন ভাবে।। প্রতিটা সুচের ঘাঁয়ে লরেন্স চিৎকার দ্বিগুন হচ্ছে। কিন্তু এতে সোফিয়া একফোঁটাও টললো না। লরেন্সের শরীরে একের পর এক ছিদ্র হয়ে যায়। তার চিৎকার আরও কর্কশ হয়ে ওঠে,
–“আআআআআহহহ…আমার শরীর জ্বলছে…”
আর্তনাদ গুলো যেন তার কণ্ঠ ছিঁড়ে বের হচ্ছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। সোফিয়া পাশ থেকে একটা তার তুলে নেয়, ইলেকট্রিক শক ডিভাইস। সে সেটা লরেন্সের গায়ে লাগিয়ে দেয়। সাথেসাথে লরেন্সের পুরো শরীর খিঁচুনির মতো কাঁপতে থাকে। নাক, মুখ সব জায়গা দিয়ে রক্ত বেরোতে থাকে। এসিডে পোড়া, ড্রাগে বিকৃত, শকে বিদীর্ণ হয়ে তার শরীর আর সহ্য করতে পারছে না।
কিয়ৎকাল পর হঠাৎ লরেন্সের চোখ বদলে যায়। তার দৃষ্টি বুনো হয়ে ওঠে, যার মানে ড্রাগ কাজ করতে শুরু করেছে। তার ভেতরের মানবিকতা মরে জেগে উঠেছে পশুটা। এখন আর সে নিজের মধ্যে নেই। সে হাঁফাতে থাকে। চারপাশে পাগলের মতো হন্য হন্য হয়ে খুঁজতে খুঁজতে বিড়বিড়ায়,

–“রক্ত, আমার রক্ত চাই, রক্ত”
কিন্তু চারপাশে কোথাও তার কাঙ্ক্ষিত জিনিস টা নজরে আসছে না। হঠাৎ তার চোখ পড়ে এক লাল তরলের দিকে,
“ফেরিক থায়োসায়ানেট”
যেটা রক্তের মতো লাল। সে সেটাকে সত্যি রক্ত মনে করে পা টেনে হিচড়ে হিচড়ে সেখানে যায়। কাঁপতে থাকা হাতে তুলে এক ঢোক ফেলে দিল গলায়। সাথে সাথে তার গলা, কণ্ঠনালী জ্বলসে ওঠে। সে নিজের গলা আঁকড়ে ধরে, তার চোখ উলটে যায়। এবার আর গলা ফাটিয়েও চিৎকার বেরুচ্ছে না। কিছু পল পর ক্ষীণ একটা আহত জন্তুর মতো আওয়াজ বের হয়,
–“রক্ত…”
লরেন্স এখন নিজেই নিজের বানানো ড্রাগের ভুক্তভোগী। সে আর কোনো উপায় না পেয়ে নিজের হাত কামড়ে ধরে। মাংস ছিঁড়ে ফেলে দাঁত দিয়ে। নিজের রক্ত নিজেই খেতে শুরু করে। তার চোখে মুখে ফুটে ওঠে উন্মাদনা। শরীর ছটফট করছে মেঝেতে গড়াগড়ি খেয়ে। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে এর সবটাই দেখছে সোফিয়া। তার ঠোঁটে ফুটে ওঠে একটা পৈশাচিক তৃপ্তির হাসি। সে ধীরে দরজাটা টেনে বন্ধ করে বাইর থেকে লক করে দেয়। কেননা সোফিয়া জানে, ভেতরে এখন কি হবে। লরেন্স নিজের ক্ষুধা মেটাতে, নিজেকেই ছিঁড়ে খাবে।

দূরানী হাউসের উপরের তলায় আগুনের লেলিহান শিখা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে, আর নিচে সেই আগুনের কোনো খবরই নেই কারো কাছে। মিউজিকের তালে তালে দুলছে লরেন্সের বংশধররা। সোফিয়া ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসে। সে একবার চারপাশে তাকায় নজরে আসে হেনরি রা মদে বুঁদ, অশ্লীলতায় ডুবে, নিজেদের বিকৃত আনন্দে মত্ত। এদের কারো চোখে হুঁশ নেই, কারো ভেতরে মানবিকতা নেই। সোফিয়ার ঠোঁটের কোণে আবারও সেই বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে।
সোফিয়া একটা ওয়াইনের বোতলের হাতে নিয়ে এক ঝটকায় ভেঙে ফেলে সেটিকে। সেটা নিয়ে এগিয়ে যায় আলেকজান্ডারের দিকে। আলেকজান্ডার তখন টলতে টলতে দাঁড়িয়ে আছে, হাতে গ্লাস, চোখে মাতাল দৃষ্টি।
হঠাৎ সোফিয়া কোনো সতর্কতা ছাড়াই ভাঙা কাঁচটা সোজা ঢুকিয়ে দেয় তার ঘাড়ে। আলেকজান্ডার চিৎকার করে মেঝেতে বসে পড়ে,
–“আআআআআ….”
তার গলা থেকে রক্ত ছিটকে পড়ে চারদিকে। সে কাঁপতে থাকে। হাত দিয়ে ক্ষতটা চেপে ধরে চোখ তুলে তাকায় চারপাশে,

–“হেনরি, হেল্প মি…”
বিপরীতে হেনরি একবার চোখ তুলে দেখে তারপর আবার পাশের মাতাল মেয়েটার ঠোঁটে ডুবে যায়। হাসি, উল্লাস সব চলতে থাকে আগের মতোই। সোফিয়া ধীরে ধীরে নিচু হয়ে বসে সেই কাঁচের টুকরোটা তুলে নিয়ে। আলেকজান্ডারের শরীরে একের পর এক আঘাত করতে থাকে। ঘাড়, বুক, মুখ, চোখ নাক সব জায়গায়। আলেকজান্ডারের চিৎকার ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে আসে। আর তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে সে পরপারে পাড়ি জমায়।
সোফিয়া উঠে দাঁড়ায়, তার বুক উঠানামা করছে দ্রুত, চোখে জ্বলছে প্রতিশোধের লেলিহান শিখা। এরপর এক এক করে সে এগিয়ে যায় বাকি সবার দিকে। সময় নিয়ে আস্তে ধীরে সবাই কে নরক যন্ত্রণা উপভোগ করিয়ে পাঠায় পরপারে। ধীরে ধীরে সব শেষ হয়ে যায়, মিউজিক এখনো বাজছে। কিন্তু মেঝে ভেসে যাচ্ছে লাল রঙের স্রোতে।
সোফিয়া হাঁপাতে হাঁপাতে মেঝেতে বসে পড়ে। তার হাত কাঁপছে, শ্বাস দ্রুত উঠানামা করছে, চোখে এখনো সেই উন্মাদনা। এই সময় দূর থেকে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল একজোড়া নীল চোখ। তার হাতে একটা ছোট কেস, ভিতরে নতুন আবিষ্কৃত অ্যান্টিডোট। সে এসেছিল লরেন্সকে দেখাতে। কিন্তু যা দেখলো তাতে তার শরীর কেঁপে ওঠে। সে দ্রুত ফোন বের করে সব ভিডিও করে নিয়েছে। আলেকজান্ডার, হেনরি, ড্যানিয়েল, ফ্লোজা সব।
হঠাৎ সোফিয়া চোখ তুলে তাকায়। মুহূর্তে চোখাচোখি হয় মারহাবের ভয়ার্ত দৃষ্টির সাথে একজোড়া রক্তচক্ষুর। মারহাবের বুক কেঁপে ওঠে। সে এক পা পিছিয়ে যায়।।তার গলা শুকিয়ে আসছে। কিছু না ভেবেই সে দৌড়ে গিয়ে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে।
আর সোফিয়া তার থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে সামনে পড়ে আছে হেনরির নিথর দেহটায় নখ দিয়ে আঁচড়াতে থাকে। রক্তে ভেজা আঙুল, সাথে সে বিড়বিড় করে,

–“এটাই চেয়েছিলিস… তাই না?
আরো চাই না?
চিৎকার কর, চুপ করে আছিস কেন?
কিয়ৎকাল পর সে নিজের চুল টানতে থাকে,
–“এখন কেন চুপ…?
বল, বল”
তার হাসি আর কান্না একসাথে মিশে যায়। আর এসব কিছুই কেউ ক্যামেরার মধ্যে দেখছে। একদম শুরু থেকে। সে টা আর কেউ না গাড়িতে বসে থাকা ইকবাল জাওয়ান। সে সোফিয়ার অগোচরে তার সাথে ক্যামেরা লাগিয়ে দিয়েছে। সোফিয়ার পাগলামি গুলো দেখে তার ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে।
“ইকবাল জাওয়ান”

সেহরাজ জাওয়ানের বড় ছেলে আর ছোট ছেলের নাম ফিরোজ জাওয়ান। সেহরাজ ছিলেন পেশায় একজন নামিদামি ব্যবসায়ী। এজন্য তিনি চাইতেন তার ছেলেরাও তার মত ব্যবসায়ী হোক। কিন্তু ইকবাল ছিল তার বিপরীত। তার ছোটবেলা থেকে সাইকোলজিকের প্রতি বিশেষ ঝোঁক ছিল। বিভিন্ন সিচুয়েশনে মানুষের অ্যাকশন, রিঅ্যাকশন, তাদের আচরণ, মানুষের দুর্বলতা ইত্যাদির প্রতি কেমন একটা আকর্ষণ কাজ করতো তার। মানুষের অদ্ভুত আচরণগুলো তাকে নজর কাড়তো। এর জন্য তাকে সেহরাজের কাছ থেকে কম কথা শুনতে হয়নি। কিন্তু তার একদম বিপরীত মেরুর ছিল ফিরোজ, যে সব সময় বাবার সিদ্ধান্তে চলত।

হাই স্কুল পর্যন্ত সব ঠিক ছিল। ক্লাস টেন পর্যন্ত ইকবালের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল সানার বাবা মোসতাক খান। পরবর্তীতে ইকবাল শহরে চলে যায় এবং মোসতাক গ্রামে থেকে যায়। ইন্টার শেষে যখন ইকবাল ভার্সিটিতে যায় সেখানে দেখা হয় তার রাহান, জাহিদ জুয়েলের সাথে। অল্প কদিনের তারা তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে ওঠে। তখন ইকবালের ওঠতি বয়স, ঠিক এমন সময় তার ভিতরের আকাঙ্ক্ষাটা আবার মাথাচড়া দিয়ে ওঠে। তারপর থেকে সে রোজ নতুন নতুন মেয়েদের সাথে রিলেশনে যায়। কিছুদিনের মধ্যে আবার ব্রেকআপ করে ফেলে। দিন যত গড়াতে থাকে ইকবাল ততো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। সে ভার্সিটির এমন কোন খারাপ কাজ নেই, যেখানে তার নাম থাকবে না। বাবার ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে সেসব জায়গা থেকে বেঁচেও যেত। শেষ পর্যন্ত সে ফিজিক্যাল রিলেশনেও চলে যায়। তখন ভার্সিটিতে তাদের লাস্ট ইয়ার চলছে। একদিন ভার্সিটির নিউ কামারদের র‍্যাগিং দিতে গিয়ে তার দেখা হয় তৃণা তুৎমিশের সাথে। আর তৃণাই প্রথম মেয়ে, যার জন্য ইকবাল কিছু অনুভব করে। কিন্তু ইকবাল এটা জানতো না যে তৃণার বাবা ইয়াসিন তুৎমিশ আর তার বাবা সেহরাজ বন্ধু ছিল। ইকবাল তৃনা কে প্রপোজ করতেই তৃণা রাজি হয়ে যায়। শুরু হয় তাদের প্রেম।

ইকবাল তৃণার সাথে থেকে খারাপ কাজ থেকে কিছুটা দূরে সরে আসে। তার ভার্সিটি শেষ হয় তখন তার জন্য বাহিরের দেশ থেকে অফার আসে। সে তৃণাকে অপেক্ষা করতে বলে পড়াশোনার জন্য চলে যায়। কিন্তু চার বছর পর ফিরে এসে দেখে তৃণা তার ভাই ফিরোজকে বিয়ে করে নিয়েছে। বিয়েটা ফ্যামিলিগত ভাবেই হয়েছে, তৃণার বাবা হঠাৎ একটা অ্যাক্সিডেন্টে মারা যাওয়ার পর সেহরাজ বন্ধুর মেয়েকে নিজের বউমা বানিয়ে নিয়ে আসে। আর সেহরাজ ইকবালকে দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে মনে করতেন। এজন্য তিনি তার ছোট ছেলের উপর দায়িত্ব দেন।
সেদিন ইকবালের দেখা হয় তৃণার বড় ভাই আলভীর সাথে। যদিও আলভী তৃণা আর ইকবালের সম্পর্কের ব্যাপারে জানত না তবুও অল্প ক’দিনের মধ্যেই তারা ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে যায়। সেদিন থেকে ইকবালের নারী জাতির প্রতি আরো বেশি বিতৃষ্ণা চলে আসে। সে এবার তাদের ভোগ আর নিজের আকাঙ্ক্ষা মিটানোর জন্য ব্যবহার করে। আর সোফিয়া ছিল তাদেরই একজন।
ইকবাল ফোনটাকে পকেটে ঢুকিয়ে রেখে গাড়ি থেকে বের হয়ে এগিয়ে যায় ভিতরের দিকে। এদিকে সোফিয়া এখনো নিচে বসে হেনরির দেহটাকে নখ দিয়ে আঁচড়াচ্ছে। হঠাৎ তার হাত থেমে যায় পেছন থেকে ভেসে আসে এক কণ্ঠ,

–“সোফিয়া…”
তাৎক্ষণিক সে ঘুরে তাকায় নজরে আসে ইকবাল ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে তার দিকে। সে এসে সোফিয়ার সামনে বসে পড়ে একদম মুখোমুখি। কিছুক্ষণ শুধু তাকিয়ে থাকে তার দিকে। তারপর হালকা হেসে পকেট থেকে রুমাল বের করে সোফিয়ার মুখে লেগে থাকা রক্ত মুছতে থাকে। অতি পরম যত্নে যেন সে এখনো সেই আগের মেয়েটাই। রক্ত মুছে রুমালটা ফেলে দেয় দূরে। তারপর পকেট থেকে একটা ছোট বক্স বের করে খুলে সোফিয়ার সামনে ধরে। যার ভিতরে ঝলমল করছে একটা ডায়মন্ড রিং। এই রক্তমাখা পরিবেশে রিং টা অদ্ভুতভাবে বেমানান লাগছে। ইকবাল তার চোখে চোখ রেখে বলে,

–“সোফিয়া…উইল ইউ ম্যারি মি?”
সোফিয়া কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ইকবালের দিকে। সেই দৃষ্টিতে ছিল না ভালোবাসার স্পষ্টতা, না ঘৃণার তীব্রতা ছিল এক গভীর শূন্যতা, এক ক্লান্ত আত্মার নিঃশ্বাস। সে একটা দীর্ঘ শ্বাস নিল। তারপর নিজের জীবনটাকে আরেকটা সুযোগ দেওয়ার মতো করে হাত বাড়িয়ে দিল ইকবালের দিকে। ইকবালের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক রহস্যময়, কুটিল হাসি। সে সোফিয়ার বাড়ানো হাতটা নিজের হাতে নিয়ে তারপর পকেট থেকে বের করা ডায়মন্ড রিংটা আলতো করে তার আঙুলে পরিয়ে দিল। এক মুহূর্তে দুইটা সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতের মানুষ এক অদ্ভুত বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গেল। অথচ সোফিয়া বুঝতেই পারল না সে একটা অতল গহ্বর থেকে আরেকটা গভীর অন্ধকারে গহ্বরের দিকে পা বাড়াচ্ছে।
রাত আরও গভীর হতেই ইকবাল তার ফোন বের করে দ্রুত তার বন্ধুদের কল করে ডাকে। তারাও তার সাথে পাকিস্তানেই ছিল। অল্প সময়ের মধ্যেই তার তিন বন্ধু জাহিদ, জুয়েল, আর আলভী দুরানী হাউসে পৌঁছে যায়।
দূরানী হাউসের করিডোরের শেষ প্রান্তের এক কক্ষ ইকবাল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে ঠিক করছে, সাদা শার্ট, কালো কোট চোখে সেই চিরচেনা অদ্ভুত ঝিলিক। জাহিদ আর জুয়েল হালকা হাসি আর মজায় ব্যস্ত,

–“ওহহ ভাই, হঠাৎ বিয়ে। তাও এই অবস্থায়”
জুয়েল হেসে বলে,
–“কাহিনি জম্পেশ, বস”
কিন্তু তাদের হাসি ঠাট্টার মধ্যে আলভী নিশ্চুপ, তার চোখে স্পষ্ট অস্বস্তি। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে ইকবালের সামনে দাঁড়িয়ে চাপা রাগ নিয়ে বলে,
–“তুই কি পাগল হয়ে গেছিস?”
ইকবাল আয়নার দিকেই তাকিয়ে হালকা হেসে প্রতুত্তর করে,
–“পাগল! মে বি…”
তার এমন খাপছাড়া জবাবে আলভীর কপাল কুঁচকে বলে,
–“এই মেয়েটা কে জানিস তুই? সে এইমাত্র… এইমাত্র পুরো একটা পরিবার শেষ করে ফেলেছে”
ইকবাল এবার ধীরে ঘুরে দাঁড়ায়। তার চোখে এখনো সেই গভীর, অস্বস্তিকর শান্তি। সে ফিসফিস করে বলে,
–“ঠিক এজন্যই তো…”
আলভী হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করে,
–“মানে?”
ইকবাল একটু কাছে এগিয়ে এসে আওড়ায়,
–“তুই জানিস, আলভী… আমি সবসময় মানুষকে পর্যবেক্ষণ করতে চেয়েছি। মানুষ কিভাবে ভাঙে, কিভাবে গড়ে কিভাবে অন্ধকারে ডুবে যায়…”
সে একটু থেমে তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে ফের বলে,

–“কিন্তু এমন ‘স্পেসিমেন’ আমি আগে কখনো পাইনি”
–“তুই একটা মানুষকে স্পেসিমেন বলছিস?”
ইকবাল এক পল হেসে ঠান্ডা স্বরে বলে,
–“মানুষ! মানুষরা আমার কাছে অনেক আগেই মানুষ থাকা বন্ধ করে দিয়েছে”
–“তাহলে বিয়ে করছিস কেন?”
–“বিয়ে? এটা শুধু একটা ট্যাগ, একটা সুবিধাজনক কভার”
আলভীর তার বলা একটা কথাও পছন্দ হলো না তাই সে রাগে ফেটে পড়ে,
–“তুই শুধু একটা পরীক্ষা চালানোর জন্য একটা মেয়ের সাথে বিয়ে করছিস? তুই জানিস এটা কি?”
ইকবাল ঝুঁকে এসে তার কানে ফিসফিস করে,
–“এটা একটা ‘লাইফটাইম এক্সপেরিমেন্ট”
আলভী এক ধাক্কায় পিছিয়ে গেল। সে চিৎকার করে ওঠে,
–“তুই অসুস্থ ইকবাল, মানসিকভাবে অসুস্থ”
ইকবাল তার বিপরীতে হালকা হেসে বলল,
–“আমি সাইকিয়াট্রিস্ট… অসুস্থতা চিনি খুব ভালো করেই। আর সোফিয়া আমার কৌতূহলের সবচেয়ে বড় উত্তর”
আলভী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলে,
–“শেষবার জিজ্ঞেস করছি… থামবি?”
ইকবাল একটুও দেরি না করে মাথা নাড়ল,

–“না”
আলভী চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য। তারপর ধীরে পিছিয়ে গিয়ে বলে,
–“ঠিক আছে… আমি আর কিছু বলব না। কিন্তু আমি আঙ্কেল কে কিছুই বুঝাতে পারব না”
সেই রাতেই রক্তমাখা প্রাসাদের এক কক্ষে, অল্প কিছু মানুষের উপস্থিতিতে, এক অদ্ভুত বিয়ে সম্পন্ন হলো। না ছিল কোনো স্বাভাবিক আনন্দ, না ছিল কোনো স্বপ্নময়তা। তবুও সোফিয়া সেই মুহূর্তে, নিজেকে সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দিল ইকবালের কাছে। পরবর্তী এক মাস ছিল সোফিয়ার কাছে একটা স্বপ্নের মতো রঙিন সময়। তারা রোজ রোজ পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে ঘুরে বেড়াতো। যেই সোফিয়া কোনদিন দূরানী হাউসের বাইরে পা রাখেনি সে সারা শহর দেখছে। তার বাবার কাছে সময় না থাকাতে সে কোনদিনও ঘুরতে যেতে পারেনি। তারপর লরেন্স এসে তাদের বন্দী করে ফেলে, তারপর জেল, ম্যান্টাল অ্যাসাইলাম।
এই সময়টা সোফিয়ার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময় হয়ে উঠে। সে ধীরে ধীরে হাসতে শিখে, কাঁদতে শিখে, আবার ভালোবাসতেও শিখে। ইকবালের সাথে কাটানো প্রতিটা মুহূর্তে সে নিজেকে হারিয়ে ফেলল এমনভাবে যেখান থেকে আর ফিরে আসা সম্ভব ছিল না। তার কাছে ইকবাল হয়ে উঠে, তার আশ্রয়, তার শান্তি, তার বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ।

এক মাস পর ইকবাল তাকে নিয়ে চলে এল নিজের দেশে। দেশে আসার পর ইকবাল জানতে পারে তার বাবা শেহরাজ জাওয়ান আরো এক সপ্তাহ আগে মারা গিয়েছেন। কিন্তু ছেলের প্রতি এতটা বিতৃষ্ণা জন্মেছে যে তিনি ছেলে কে শেষ সংবাদটা পর্যন্ত দেননি কেননা তিনি ছেলের ভার্সিটিতে করা প্রতিটা কাজের ব্যাপারে জানতে পেরেছে। সোফিয়ার তখন দেখা হয় তৃণার সাথে। কিন্তু বিপরীতে তৃণা সোফিয়া কে দেখেই তার মনে প্রতিহিংসার আগুন জ্বলতে শুরু করে। সে সোফিয়া কে ইকবালের পাশে কিছুতেই সহ্য করতে পারত না। সোফিয়া প্রথম তাকে এতটা পাত্তা দেয়নি। কিন্তু সে প্রায় সময় এটা লক্ষ্য করতো তৃনা ইকবালের আশেপাশে ঘুর ঘুর করছে। এভাবেই কেটে যায় এক মাস।
এক দিন গভীর রাতে সোফিয়া হঠাৎই ঘুম ভেঙে গেল। অদ্ভুত ভাবে তার বুকটা কেমন যেন ধকধক করছে। কেন যেন মনে হচ্ছে কিছু একটা ঠিক নেই। সে ধীরে ধীরে পাশে হাত বাড়াতেই দেখে ইকবাল নেই। এক মুহূর্তে তার বুকের ভেতর অজানা এক শূন্যতা নেমে আসে। সে উঠে বসে চারপাশে তাকায় কিন্তু কোথাও ইকবাল নেই। সে নিম্ন স্বরে ডাকে,

–“ইকবাল…?’
বিপরীতে নিস্তব্ধতা বেদ করে কোন উত্তর আসে না। সে ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে আসে দরজা খুলে করিডোরে বের হয়। হঠাৎ তার কানে আসে কারো দম বন্ধ করা শীৎকার। সোফিয়ার পা থেমে যায়। তার ভ্রু কুঁচকে ওঠে। শব্দের উৎস খুঁজতে গিয়ে তার চোখ আটকায় তৃণার রুমের দিকে। তার চোখে একরাশ বিস্ময় খেলে গেল। ফিরোজ তো বাড়িতে নেই। সে আরো দুই সপ্তাহ আগে ব্যবসার কাজে লন্ডন গেছে। তার বাবার মৃত্যুর পর ফিরোজ কে একহাতে সবটা সামলাতে হচ্ছে। সে যদি না থাকে তাহলে তৃণার কামরা থেকে এমন আওয়াজ কেন আসছে?
সোফিয়া দরজার সামনে দাঁড়িয়ে হাত রাখতেই বুঝে দরজাটা পুরো বন্ধ নয় আধখোলা। ভেতর থেকে আসা সেই শব্দ গুলো আরও স্পষ্ট, আরও তীব্র হয়ে ওঠে। সোফিয়া এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে এক ধাক্কায় দরজা খুলে ফেলে। আর সামনের দৃশ্য দেখে এক সেকেন্ডে তার পুরো পৃথিবী ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। কেননা তার সামনেই ইকবাল আর তৃণা একই বিছানায় অন্তরঙ্গ অবস্থায় জড়িয়ে আছে।
সময় যেন থমকে গেল সাথে সোফিয়ার শ্বাসও। তার চোখ বড় হয়ে যায়। সে যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না সে কি দেখছে। সে এক পা, দুই পা করে পিছিয়ে যায়। মনে হচ্ছে মাটিটাও তার পায়ের নিচ থেকে সরে যাচ্ছে।
তার বুকের ভেতর যেন কেউ বারবার ছুরি চালাচ্ছে। তার চোখের সামনে ভেসে উঠতে থাকে, সেই দিনগুলো, ইকবালের হাসি, তার ছোঁয়া, তার বলা কথা,

–“আমি তোমাকে বিশ্বাস করি…”
সবকিছু… সবকিছু যেন এক মুহূর্তে মিথ্যে হয়ে গেল। তার ভেতরটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। বহু কসরতে একটা ভাঙা, নিঃশ্বাসহীন ডাক বের হয় তার ঠোঁট থেকে,
–“ইকবাল…”
মূহুর্তে তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। চারপাশ অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে ধীরে। শেষবারের মতো সে তাকায় ইকবালের দিকে যে এখনো মজে আছে তৃণাতে। সোফিয়ার চোখে একটাই প্রশ্ন ভেসে ওঠে,
–“কেন…?”
কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর আর পাওয়া হলো না তার আগেই মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে।
নিশীথ রাতের ভারী নীরবতা ভেঙে সোফিয়ার বুকের ভেতর ওঠানামা করা ক্ষীণ শ্বাসের শব্দটা সারা কক্ষে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। ধীরে ধীরে তার চোখের পাতা কেঁপে ওঠে। চোখ খুলতেই সে কিছুক্ষণ বুঝতেই পারে না কোথায় আছে। তারপর এক ঝটকায় স্মৃতিস্পটে সবকিছু ফিরে আসে। তার মনে হচ্ছে তার বুকের ভেতর যেন কেউ আগুন ঢেলে দিয়েছে। সে তৎক্ষনাৎ উঠে বসে। দৃষ্টি ঘুরতেই সামনে দেখতে পায়, ডিভানের উপর বসে আছে ইকবাল। একদম শান্ত, নির্বিকার চিত্তে যেন কিছুই হয়নি। এক মুহূর্তও দেরি করে না সোফিয়া চিৎকার করে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার উপর,
–“ইকবাল”
সোফিয়া শক্ত করে তার শার্টের কলার চেপে ধরে, চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে। রুক্ষ স্বরে হিসহিসিয়ে বলে,

–“কেন করেছো এটা? কেন?
আমি কি কম ছিলাম তোমার জন্য?
তুমি তো বলেছিলে তুমি আমাকে বিশ্বাস করো। তাহলে আমার সাথে এত বড় প্রতারণা কেন করলে, ইকবাল?”
রমণী এক নিঃশ্বাসে তার দিকে একের পর এক প্রশ্ন ছুড়তে থাকে। বিপক্ষে ইকবাল কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকে তার দিকে। তারপর হঠাৎ জোরে একটা ধাক্কা দেয় সাথে সাথে সোফিয়া ছিটকে পড়ে বিছানায়। গম্ভীর স্বরে বুলি ছুড়ে সোফিয়ার দিকে,
–“ডোন্ট টাচ মি”
সোফিয়া হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল। ইকবাল ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। তার চোখে কোনো অনুভূতি নেই আর না অনুশোচনা, আছে শুধু একরাশ বিরক্তি। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে,
–“তুমি জানতে চাও, কেন?
তোমার কাছে আছে কি, সোফিয়া?”
একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে ওঠে তার ঠোঁটে। সে সোফিয়ার চিবুকটা শক্ত হাতে চেপে ধরে দন্ত চেপে আওড়ায়,

–“এই সুন্দর চেহারা?
নাকি এই শরীরটা?”
সে নিচু হয়ে ঝুঁকে তার কানের কাছে ফিসফিসায়,
–“যেটা তোমার সৎ ভাইরা ব্যবহার করে ছুঁড়ে ফেলেছে?”
বাক্যগুলো ছুরি হয়ে বিঁধে যায় রমণীর বুকে। সোফিয়া নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকে। তার চোখে এখন আর জল নেই, আছে এক শূন্যতা। কিন্তু সেই শূন্যতা, সবকিছুর চেয়ে ভয়ংকর। ইকবাল থামে না সে বলতে থাকে,
–“আমি তোমাকে বিয়ে করেছি ভালোবাসার জন্য না। আমি তোমাকে বিয়ে করেছি আমার কৌতূহলের জন্য’
সে হালকা হেসে তাচ্ছিল্যের সুরে বলে,
–“আমি দেখতে চেয়েছিলাম একটা ভাঙা, বিকৃত, অন্ধকারে ডুবে থাকা মেয়ের মন কিভাবে কাজ করে। একটা ‘মনস্টার’ কিভাবে ভালোবাসে”
ইকবালের চোখে ঝলসে ওঠে এক অদ্ভুত উন্মাদনা। সে কিয়ৎকাল অপেক্ষা করে সোফিয়ার জবাবের জন্য কিন্তু সোফিয়া কিছু না বলায় সে ফের বলে,
–“এন্ড ইউ নো, সোফিয়া?
তুমি আমার এক্সপেরিমেন্ট ছাড়া আর কিছুই না, শুধু মাত্র একটা কৌতূহল”
বিপরীতে কোন প্রতুত্তর নেই, কোনো প্রতিক্রিয়া নেই, কোনো প্রতিবাদ নেই শুধু নিঃশেষ হয়ে যাওয়া এক আত্মা। সোফিয়া একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। ইকবাল ঘুরে দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করে। কিন্তু বেরুনোর আগেই তার কানে আসে সোফিয়ার ভাঙ্গা কণ্ঠস্বর,

–“ইকবাল…”
তার পা থেমে যায়। সে পিছনে ফিরে না তাকিয় দাঁড়িয়ে পড়ে। সোফিয়া ধীরে ধীরে বলে ওঠে,
–“যদি… আমার কাছে সবকিছু থাকতো, ক্ষমতা, সাম্রাজ্য, সব। তাহলে তুমি কি আমাকে ভালোবাসতে?’
কক্ষে আবার নিস্তব্ধতা নেমে আসে। বিপরীতে মানব কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে তারপর
একটা ঠান্ডা, নিষ্ঠুর উত্তর দেয়,
–“ভেবে দেখব”
এই বলেই সে চলে যায়। দরজাটা বন্ধ হয়ে যায় ধীরে ধীরে। আর সেই শব্দটা যেন সোফিয়ার হৃদয়ে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়। কিছুক্ষণ পুরো কক্ষ জুড়ে একটা ভারী নীরবতা নেমে আসে। তারপর সেই নীরবতা ভেঙে হঠাৎ সোফিয়া হেসে ওঠে, একটা অদ্ভুত, ভাঙা অট্টহাসি। সে বিছানা থেকে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। তার চুল এলোমেলো, চোখ দুটো পাগলের মতো। সে নিজের বুক চাপড়ে বলতে থাকে,

–“এক্সপেরিমেন্ট…?
আমি… আমি একটা এক্সপেরিমেন্ট?”
হাসতে হাসতে হঠাৎ নিজের গালে একের পর এক সজোরে চড় মারতে থাকে,
–“তুই তো এটার-ই প্রাপ্য, সোফিয়া”
সবাই তোকে ব্যবহার করবে, আর তুই ভালোবাসা খুঁজবি?
তুই লরেন্সের এক্সপেরিমেন্ট হবি, তুই…তুই ইকবালের এক্সপেরিমেন্ট হবি। সবাই তোর উপর এক্সপেরিমেন্ট করবে। কেউ তোকে ভালোবাসবে না। আমি একটা এক্সপেরিমেন্ট, শুনছো সবাই, আমি… আমি….একটা..’
আর বাকিটা তার কণ্ঠস্বর ফুড়ে বেরিয়ে আসলো না। সে আবারও পাগলের মতো হেসে ওঠে। আর সেই হাসি ধীরে ধীরে কান্নায় ভেঙে যায়। সে মেঝেতে বসে চিৎকার করতে থাকে,
–“কেন… কেন আমার সাথে এমন হয়?
আমি কি এতটাই খারাপ?
আমি কি কখনো কারো ভালোবাসার যোগ্য না?”
সে মুখে এগুলো বলতে থাকে আর হাত দিয়ে মেঝেতে বারবার আঘাত করতে থাকে। তার চিৎকার পুরো ঘরকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে,
–“কেন? কেন? কেন?
আমি খুনি না, আমি খারাপ না, আমি শুধু ভালোবাসতে চেয়েছিলাম”
প্রতিটা শব্দ কেমন তার গলা জড়িয়ে আসছে। সে কাঁদতে কাঁদতে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে,
–“মা… মা তুমি কোথায়। তোমার ফিয়া ভালো নেই। পাপা…পাপা, দেখো না, এরা কেউ রাজকন্যা কে ভালোবাসে না। কেউ তোমাদের মতো করে কেন ভালোবাসছে না আমায়?
আমি আর এখানে থাকতে পারছি না,
পাপা, মা, প্লিজ আমাকে তোমাদের কাছে নিয়ে যাও, আমি আর পারছি না….”
তার কান্না গুলো ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে আসে।
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। হঠাৎ করে সব থেমে যায়। সোফিয়া ধীরে ধীরে মাথা তোলে। তার চোখের জল শুকিয়ে গেছে। তার চোখে এখন আর কান্না নেই বরং তার জায়গায় জ্বলছে একটা ঠান্ডা আগুন। সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। তার ঠোঁটে এক অদ্ভুত, ভয়ংকর হাসি ফুটে ওঠে। সে নিজের চোখের জল মুছে বলে,

–“ভালোবাসা?
যদি ভালোবাসার মানে হয় ক্ষমতাই হয়, তাহলে আমি সেই ক্ষমতা তৈরি করব”
ধীরে ধীরে ডে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় সে। নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে দন্ত পাটি চেপে আওড়ায়,
–“আমি এমন এক সাম্রাজ্য গড়ব, যেখানে সবাই আমার কথায় চলবে। ইকবাল জাওয়ান…”
সে ধীরে ধীরে নিচু স্বরে ফিসফিস করে,
–“তুমি ভালোবাসা চাওনি, তুমি ক্ষমতা চেয়েছো”
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকে কিয়ৎকাল। মনের পাতায় ভাসতে থাকে পাকিস্তানে ইকবালের সাথে কাটানো মুহূর্ত গুলো। তার ঠোঁটে বাঁকা, ভয়ংকর একটা হাসি ছড়িয়ে পড়ে ধীরে ধীরে,

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২৬ (২)

–“আমি তোমাকে সেই ক্ষমতাই দেখাবো।
“আর যেদিন তুমি হাঁটু গেড়ে আমার সামনে দাঁড়াবে, সেদিন আমি ঠিক করব তোমাকে ভালোবাসব, নাকি ধ্বংস করব”
ঘরের বাতাস ধীরে ধীরে জমে যায়। আর সেই রাতেই একটা ভাঙা মেয়ের মৃত্যু হয়। আর তার জায়গায় জন্ম নেয় একটা অন্ধকার সাম্রাজ্যের রাণী।

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২৬ (৪)