Tell me who I am 2 part 15
আয়সা ইসলাম মনি
মিরাকে তার পৈতৃক নিবাস ‘মিরা মঞ্জিল’-এর দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়ে কারান পুনরায় কে.ছি হাউজের অভিমুখে যাত্রা করল। মিরার সনির্বন্ধ অনুরোধ সত্ত্বেও সে ভেতরে প্রবেশ করেনি। যুক্তিটা অকাট্য, প্রথমবার শ্বশুরবাড়ি গিয়েই লৌকিকতা সেরে দ্রুত প্রস্থান করা শোভন নয়, আবার থেকে যাওয়ার মতো অখণ্ড অবসরও তার হাতে নেই। কারানের ভাবনায় এখন কেবলই অসমাপ্ত কাজের পাহাড়; যত দ্রুত সে এই কর্মব্যস্ততা থেকে নিষ্কৃতি পাবে, তত দ্রুত মিরাকে কোনো পিছুটান ছাড়াই নিজের একান্ত সান্নিধ্যে আগলে রাখতে পারবে।
এদিকে মিরা অন্দরমহলে পা রাখতেই আনন্দের এক বসন্তধারা বয়ে গেল। মমতাজ বেগম কতক্ষণ মেয়েকে বক্ষলগ্নে ধরে রেখেছিলেন, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। আব্দুর রহমানের অবস্থাও তথৈবচ; স্নেহের দুলালীকে আগলে ধরে রাখতে গিয়ে তার চোখের কোণে বারংবার জল চিকচিক করে উঠছিল। মিরা তার মা-বাবার সোহাগমাখা স্পর্শের মাঝেও প্রথমেই খুঁজেছিল ছোট বোন ইলিজাকে। মমতাজ সিক্ত কণ্ঠে জানালেন, মেয়েটা এখনো কোচিং থেকে ফেরেনি, ফিরলে নির্ঘাত খুশির আতিশয্যে বড়ো বোনকে জড়িয়ে ধরে লঙ্কাকাণ্ড বাধিয়ে দিত।
কন্যার আগমন উপলক্ষ্যে আয়োজনের কোনো ত্রুটি রাখেননি তারা। মমতাজ মেয়ের প্রিয় কয়েক পদের সন্দেশ আনিয়েছেন; আব্দুর রহমানও বাজার থেকে সেরা বড়ো মাছ আর তাজা শাকসবজি সংগ্রহ করেছেন। কারান না আসায় তাদের মনে আফসোস জমা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু জামাতার পাঠানো দামি উপহারগুলো দেখে সেই আক্ষেপ যেন বহুগুণ বেড়ে গেল। গুনধর জামাইকে যথাযথ আপ্যায়ন করতে না পারার অতৃপ্তি তাদের বিঁধছিল।
বিকেলটা যখন ম্লান হয়ে আসছে, মিরা তখন মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে ছিল। অবলীলায় সে কারানের গুণকীর্তন করে যাচ্ছিল। হঠাৎ তার কণ্ঠস্বরে কিছুটা বিষণ্নতা খেলে গেল, “জানো মা, আমার মাঝেমধ্যে খুব আফসোস হয়। মনে হয়, ও আমাকে যতটা আগলে রাখে, আমি হয়ত ওকে ততটা ভালোবাসতে পারছি না। নিজেকে বড্ড ঋণী মনে হয় ওর কাছে।”
মমতাজ বেগম মেয়ের চুলে বিলি কাটতে কাটতে এক চিলতে স্নিগ্ধ হাসলেন। ধীরস্থির কণ্ঠে বললেন, “তোর যেমন এমনটা মনে হয়, ওপাশ থেকে কারানের মনেও হয়ত ঠিক একই অনুভূতি খেলে যায় রে, মিরু। একে অপরের কাছে ঋণী থাকার নামই তো ভালোবাসা। তোকে নিয়ে ছোটোবেলা থেকেই বড়ো দুশ্চিন্তা হতো, আমার এই অতি সরল মেয়েটা বাইরের জগতের রুক্ষতা সইবে কী করে! কিন্তু এখন আমি নিশ্চিন্ত। আমি জানি, কারান তোকে ওর অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত একবিন্দু আড়াল হতে দেবে না।”
মায়ের কথাগুলো শুনে মিরা গভীর চিন্তার অতলে তলিয়ে গেল। সে কি সত্যিই কারানকে ততটা ভালোবাসতে পারছে? আর সে কি আসলেই সরল? নিজের সত্তার ভেতরে মাঝেমধ্যে সে এমন সব রহস্য খুঁজে পায়, যা তাকে নিজের কাছেই অচেনা করে তোলে।
এমন সময় কক্ষের দরজায় এসে দাঁড়ালেন আব্দুর রহমান হাওলাদার। কত মাস পর মেয়েকে দু-চোখ ভরে দেখছেন! কারানের নিবিড় তত্ত্বাবধানে মিরা যে বেশ কুশলে আছে, তা তার দীপ্তিময় মুখশ্রী দেখলেই বোঝা যায়। এই ভুবনমোহিনী কন্যার দিকে তাকালে পিতার বুক অভিমানে নয়, বরং তৃপ্তিতে ভরে ওঠে। নিজের আবেগ সংবরণ করে তিনি নিঃশব্দে বিছানার এক কোণে বসলেন। মিরা বা মমতাজ কেউই তার উপস্থিতি টের পায়নি।
চোখের কোণের জলটুকু পাঞ্জাবির খুঁটে মুছে নিয়ে তিনি অতি কোমল স্বরে ডাকলেন, “আম্মাজান!”
বাবার গম্ভীর, মায়াবী কণ্ঠস্বর কানে যেতেই মিরা মায়ের কোল ছেড়ে উঠে বসল। মুহূর্তেই বাবার কোলে মাথা রেখে এক অপার্থিব প্রশান্তি অনুভব করল সে। অনিমেষ নেত্রে সে তাকিয়ে রইল বাবার শ্যামল ও স্নিগ্ধ মুখাবয়বের দিকে। বয়সের ভারে কিছু চুলে রুপালি রেখা দেখা দিয়েছে, দাড়িগুলোও কিঞ্চিৎ পেকে শুভ্র হয়েছে; অথচ মায়ার বিন্দুমাত্র ঘাটতি হয়নি।
মমতাজ বেগমও স্বামীর এই পিতৃত্বের ব্যাকুলতা দেখে মুচকি হাসলেন। মিরা কৃত্রিম অনুযোগের সুরে শিশুর মতো চঞ্চলতায় বলে উঠল, “দেখেছ, মা? আব্বুটা কেমন ভুলোমনা হয়ে গেছে!”
আব্দুর রহমান মেয়ের মাথায় সস্নেহে হাত রেখে কিছুটা অনুতপ্ত স্বরে শুধালেন, “কী অপরাধ করলাম, মা?”
মিরা স্নিগ্ধ হেসে আবদারের সুরে বলল, “আগের মতো আমার চুলে বিলি কেটে তেল দিয়ে দাও না, বাবা!”
মেয়ের এই সরল আবদারে মমতাজ আর আব্দুর রহমান দুজনেই সশব্দে হেসে উঠলেন। গৃহকোণে যেন দীর্ঘকাল পর প্রাণখোলা হাসির ফোয়ারা ছুটল। আব্দুর রহমান মেয়ের কপালে স্নেহের পরশে চুম্বন দিয়ে বললেন, “সবই হবে আম্মাজান, আগে বারান্দায় চলুন। আজ আপনার জন্য আপনার এই বুড়ো বাবা নিজ হাতে চা তৈরি করেছে।”
পাশ থেকে মমতাজ বেগম কৃত্রিম মান অভিমানের সুরে ফোড়ন কাটলেন, “ওমা! মেয়েকে কাছে পেয়ে এখন বুঝি আমাকে পর করে দিচ্ছ? গিন্নির কি তবে আজ চায়ের পেয়ালায় ভাগ জুটবে না?”
হঠাৎ বাবা-মায়ের মধ্যে শুরু হওয়া খুনসুটি দেখে মিরা উৎসুক হয়ে উঠল। বাবার কোল থেকে মাথা তুলে একটু সরে এসে হাঁটু ভাঁজ করে বসল। দুই হাতে হাঁটু দুটো জড়িয়ে ধরে তার ওপর থুতনিটা আলতো করে চেপে রাখল। তার চোখের মণি দুটো একবার বাবার দিকে, তো পরক্ষণেই মায়ের দিকে ঘুরছে। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টুমি ভরা হাসি খেলছে।
আব্দুর রহমান কিছুটা কৌতুকি ভঙ্গিতে স্ত্রীর দিকে এগিয়ে গিয়ে তার নরম হাত ধরে অনুচ্চস্বরে বললেন, “তোমার জন্য তো স্পেশাল চা প্রস্তুত করেছি, মমতা। এক চুমুক দিয়েই দগ্ধ মুখে প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতে বাধ্য হবে, আমার জানেমান!”
বাবার মুখে এমন রসিকতা আর সম্বোধন শুনে মিরা ভ্রূ তুলে মুখ টিপে হাসতে লাগল। প্রৌঢ়ত্বের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে মেয়ের সামনে এমন রসিকতায় মমতাজ বেগমের ফরসা গাল দুটো মুহূর্তেই লজ্জায় আরক্তিম হয়ে উঠল। তিনি হাত ছাড়িয়ে শাড়ির আঁচল টেনে, দ্রুত খোঁপা বাঁধতে বাঁধতে শয্যা ত্যাগ করে দাঁড়িয়ে বললেন, “তোর বাবার বয়সটা একটু বেশিই বেড়েছে রে, মিরু। তাই পাগলের প্রলাপ শুরু করেছে লোকটা!”
এই বলে তিনি লাজুক হাসিতে দ্রুত ঘর থেকে প্রস্থান করলেন। আব্দুর রহমানও হার মানার পাত্র নন; তিনি গিন্নির মান ভাঙাতে পিছন পিছন যেতে যেতে সুর ধরলেন,
“বয়স আমার বেশি না,
ওরে টুকটুকির মা,
খালি চুল কয়ডা পাইহে গেছে
বাতাসে…”
মিরাও দ্রুত উঠে হাসতে হাসতে তাদের অনুসরণ করল। শীতের এই গোধূলি লগ্নে মা-বাবার সঙ্গে বারান্দায় বসে চা-বিলাস এক পরম প্রাপ্তি। কতকাল বাবার হাতের সেই বিশেষ চায়ের স্বাদ পাওয়া হয়নি! মিরার মনে মনে এক দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল, আজও সে আগের মতো বাবার কাপ থেকেই ভাগ বসাবে কিনা ভাবলো! ছোটোবেলায় ‘চিনি হয়েছে কি না’ দেখার ছুতোয় বাবার কাপটা টেনে নিয়ে পুরোটাই সাভার করে দিত। সেই অম্লান স্মৃতিগুলো হাতড়াতে গিয়ে মিরার দু-চোখ লোনা জলে ঝাপসা হয়ে আসতে চাইল, কিন্তু সে অসীম শক্তিতে সেই আবেগ দমন করল। আজ কেবল আনন্দের দিন, অশ্রুর ঠাঁই দিলে অনুভূতিতে ভাটা পড়বে।
স্কুল আর কোচিংয়ের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে ইলিজার দিনটা আজ ভীষণ ক্লান্তিতে কেটেছে। সামনেই তার এসএসসির চূড়ান্ত পরীক্ষা, তাই পড়ার চাপে প্রাণ ওষ্ঠাগত। তবে এই দুঃসহ ক্লান্তির মাঝেও যখন ‘কাব্য’ নামক ছায়ার মতো মানুষটির কথা তার মানসপটে উদিত হয়, অধরপ্রান্তে অজান্তেই এক চিলতে হাসির রেখা ফুটে ওঠে। সেই হাসিটা যেন মরুভূমিতে এক পশলা বৃষ্টির মতো শীতল।
শীতকাল বলে বেলাটা দ্রুত ফুরিয়ে এলো। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার আঁধার নামতে বেশি দেরি হলো না। চারপাশটা কেমন ধোঁয়াটে আর ম্লান হয়ে আসছে। সাধারণত কোচিং এত দেরিতে শেষ হয় না, কিন্তু পরীক্ষার বিশেষ প্রস্তুতি নিতে গিয়ে আজ শিক্ষক অতিরিক্ত সময় ব্যয় করেছেন। দিনের শুরুতে শীতের প্রকোপ কম থাকায় ইলিজা কোনো গরম কাপড় আনেনি, অথচ এখন হিমেল হাওয়ায় শরীরটা কাঁপছে।
কোচিং থেকে বেরিয়ে ক্লান্ত ইলিজা দুই হাত ঘষে উষ্ণতা খোঁজার চেষ্টা করছিল। পাশে তার বান্ধবী আদিবা বিরামহীন কথা বলে যাচ্ছে। ইদানীং ইলিজা সজ্ঞানেই তার প্রিয় সখী স্নেহাকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছে। কারণ স্নেহার কথা ভাবলেই যে তার চোখের বাঁধ ভেঙে যায়! স্নেহার বাবা তাকে জানিয়েছেন যে স্নেহা গুরুতর অসুস্থ, এবং চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশের খালার বাড়িতে পাঠানো হয়েছে; অসুস্থতার কারণে তার কথা বলাও বারণ।
সপ্তাদশী ইলিজার সরল মন এই মিথ্যাটাকেই ধ্রুব সত্য বলে মেনে নিয়েছে। সে তো আর জানে না, স্নেহার বাবা এই নিদারুণ মিথ্যা কেন বলেছিলেন। স্নেহার বিচ্ছেদে ইলিজা দিনের পর দিন স্কুলে যায়নি, আহার-নিদ্রা ত্যাগ করে কেবল কেঁদেছে। স্নেহার বাবা-মা ইলিজাকে নিজের সন্তানের মতোই স্নেহ করেন, তাই তারা চাননি এক মেয়ের শোকে অন্য মেয়েটার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ তিলে তিলে নষ্ট হয়ে যাক। তারা নিজেরা যে কী ভীষণ দহন আর শূন্যতার মাঝে দিনাতিপাত করছেন, তা কোনো উপন্যাসের পাতায়ও তুলে ধরা সম্ভব নয়। বিশেষ করে স্নেহার মা প্রতিমুহূর্তে মেয়ের বিরহে মূর্ছা যান। অথচ ইলিজার সামনে তারা এক বুক পাথর চাপা দিয়ে স্বাভাবিক থাকার অভিনয় করে চলেছেন।
কোচিং সেন্টারের লৌহফটক অতিক্রম করে আদিবার সাথে বাইরে পা রাখল ইলিজা। দুই কাঁধে ব্যাকপ্যাকের ফিতে আঁকড়ে ধরে শ্রান্ত স্বরে শুধালো, “তোকে নিতে আংকেল কি আজ আসবেন?”
আদিবা সম্মুখপানে দৃষ্টি দিতেই তার বাবার অবয়ব নজরে এলো। তর্জনী উঁচিয়ে সহাস্যে বলল, “ওই তো, চলেও এসেছে। আচ্ছা দোস্ত, চলি তবে। তুই সাবধানে যাস।”
আদিবা চলে যেতেই ইলিজার বুকের ভেতর রিক্ততা হানা দিল। এই জনাকীর্ণ পথে একা পথ চলাটা যদিও প্রাত্যহিক রুটিন, তবু আজকের এই বিলম্বিত গোধূলিতে মনটা বিষাদগ্রস্ত হয়ে উঠল। এককালে স্নেহার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই পথটুকু পার হতো সে, অথচ আজ সেই সখী পাশে নেই। ইলিজা জোর করে ঠোঁটে হাসি টেনে থেমে থেমে উত্তর দিল, “তুইও… সাবধানে… যাস।”
তার জন্য বরাদ্দকৃত গাড়িটা খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে। ইলিজা মস্তক অবনত করে ধীরলয়ে অগ্রসর হতে লাগল। ঠিক তখনই তার দীর্ঘায়িত ছায়ার সমান্তরালে অন্য এক দীর্ঘ ছায়ার উপস্থিতি টের পেল সে। মুহূর্তে ভয়ের এক শীতল স্রোত ইলিজার মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে গেল। সেই কালরাত্রির ‘Owl’দের কথা মনে পড়তেই তার হৃৎস্পন্দন দ্রুততর হলো। জনসমাগম থাকলেও কোনো অশুভ অভিসন্ধিধারী যে তার পিছু নেয়নি, তার নিশ্চয়তা কোথায়? ইলিজা ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলে চরণের গতি বাড়িয়ে দিল।
মনে মনে ভাবল, “আরেকটু কাছে এলেই রাস্তা থেকে ইট তুলে ছুঁড়ে মারব, চিৎকার করে লোক জড়ো করব। ইয়া আল্লাহ! আবার কার খপ্পরে পড়তে চলেছি?”
ইলিজার গতি বাড়ার সাথে সাথে পশ্চাতের ছায়াটিও তাল মিলিয়ে দ্রুত হতে লাগল। এবার ইলিজা রীতিমতো কম্পমান হৃদয়ে স্রষ্টার আরাধনা শুরু করল। যখন সে চূড়ান্ত আতঙ্কে প্রায় দৌড়াতে শুরু করবে, তখন দেখল ছায়াটি আর এগোচ্ছে না। বিস্ময় আর সন্দেহে সে থমকে দাঁড়াল।
সাহসে বুক বেঁধে যেই না পেছন ফিরতে যাবে, তার আগেই মখমলের মতো মোলায়েম এক পুরুষালি কণ্ঠস্বর তার কর্ণকূহুরে প্রবেশ করল, “ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই, সজনেডাঁটা। আমি থাকতে আপনার কোনো অকল্যাণ হবে না।”
কাব্যের সেই অতি পরিচিত কণ্ঠস্বর কর্ণকূহুরে প্রবেশ করতেই ইলিজার ভীতি মুহূর্তে কর্পূরের মতো উবে গেল। সে দ্রুত পশ্চাতে ফিরতেই এক অপূর্ব দৃশ্যের মুখোমুখি হলো। কাব্য তার পকেটে দুই হাত গুঁজে অধরে প্রাণবন্ত হাসির রেখা ধরে অদূরে দণ্ডায়মান। তার চশমার কাচের অন্তরালে চোখ দুটোতেও স্নিগ্ধতা খেলে যাচ্ছে। আজ তাকে অভাবনীয় গাম্ভীর্যপূর্ণ দেখাচ্ছে; বয়সের ভার কিছুটা বেশি হলে নির্ঘাত কোনো বিদগ্ধ প্রফেসরের প্রতিচ্ছবি মনে হতো।
তবে সবকিছু ছাপিয়ে যে বিষয়টি ইলিজাকে সবচেয়ে বেশি মোহাচ্ছন্ন করল, তা হলো কাব্যের অঙ্গে জড়ানো সেই কৃষ্ণবর্ণের শালটি। পেছন থেকে সুনিপুণভাবে পুরো অবয়ব আবৃত করে তার বাম কাঁধের ওপর শেষ প্রান্তটি তুলে রাখা হয়েছে। মুগ্ধতার আতিশয্যে ইলিজা অনিচ্ছাসত্ত্বেও একবার সশব্দে ঢোক গিলল; তার মুখ দিয়ে কোনো বাক্যস্ফূর্তি হচ্ছিল না। কাব্যের সেই শ্যামল বর্ণ গোধূলির ম্লান আলোয় আরও বেশি দ্যুতিময় আর আকর্ষণীয় হয়ে ধরা দিচ্ছিল।
কিন্তু এই মুগ্ধতার আবেশ দীর্ঘস্থায়ী হলো না। এক লহমায় ইলিজার ভ্রূকুটি কুঞ্চিত হয়ে উঠল। সে লক্ষ্য করল, অদূরে তারই সহপাঠিনীরা একদৃষ্টে কাব্যের পানে চেয়ে আছে। তাদের সেই লোলুপ ও মুগ্ধ নেত্রপাত আর নিম্নস্বরে চলা গুঞ্জন ইলিজার চিত্তে অস্বস্তির রেণু ছড়িয়ে দিল। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, সেখানে কাব্যের রূপমাধুর্য নিয়েই তাত্ত্বিক আলোচনা চলছে।
ইলিজা মুখটা বাঁকিয়ে আপনমনে বিড়বিড় করতে লাগল, “নির্লজ্জের দল! আমার ভবিষ্যৎ স্বামীটার দিকে কীভাবে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে অসভ্যগুলো! জীবনে কি পুরুষ দেখিসনি তোরা? লুচ্চার জাত! আর হ্যাঁ, মিস্টার আরভিন কাব্য, আপনাকেই বা কে বলেছিল এমন মনোহর বেশে অবতীর্ণ হতে? নিজের রূপ-লাবণ্য কি শুধু নিজের বধূর জন্য মাচায় তুলে রাখা যেত না?”
একটু থেমে মনের গহিন থেকে শয়তানি হাসি দিয়ে ভাবল, “অবশ্য, চুন্নিগুলোর দোষ দিয়ে আর কী হবে, আমার নিজের চোখই তো সরছে না!”
পরক্ষণেই ইলিজা সচকিত হলো। সে কি তবে ঈর্ষান্বিত হচ্ছে? তার চেয়েও বড়ো কথা, অবচেতন মনে সে কাব্যকে ‘ভবিষ্যৎ স্বামী’ হিসেবে সম্বোধন করে ফেলেছে! লজ্জায় আর আবেশে সে চোখ বুজে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরল। নিজেকে মনে মনে হাজারটা গালি দিলেও পরক্ষণেই স্বগোক্তি করল, “না, ঠিকই তো। এমন এক নয়নকাড়া মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরলে জেলাস হওয়াটাই তো স্বাভাবিক। তাছাড়া…”
কাব্যের সেই অপ্রতিম আভিজাত্যের মনে মনে দরাজ প্রশংসা করে ইলিজা আপনমনেই মৃদু হাসল। সাথে লজ্জার রক্তিমাভা তার কপোলে খেলে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে কাব্যের অতি নিকটবর্তী কণ্ঠস্বর তার কানে মধু ঢেলে দিল, “এভাবেই কি কাব্য নামক মহাপুরুষটার ধ্যানে মগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন? গন্তব্যে যাবেন না?”
এত কাছ থেকে কাব্যের কণ্ঠস্বর শুনে ইলিজা দ্রুত নেত্রপল্লব উন্মোচন করল। দেখল, কাব্য তার হাঁটুদ্বয়ে ভর দিয়ে কিঞ্চিৎ ঝুঁকে একদম তার মুখের সামনে মুগ্ধদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ইলিজার হৃৎপিণ্ড যেন আজ বিদ্রোহ শুরু করেছে; তার প্রবল ধকধকানি বোধ হয় কাব্যের কর্ণকূহর পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে।
লজ্জা ঢাকতে ইলিজা অপ্রস্তুতভাবে পেছনে ফিরতে গেল, আর তাতেই ঘটল বিপত্তি। তার ললাটের সাথে কাব্যের ললাটের টোকা লাগল। মুহূর্তের জন্য ইলিজা স্তব্ধ হয়ে গেল। পরক্ষণেই নিজের এই বিড়ম্বনার দায় কাব্যের কাঁধে চাপিয়ে বিড়বিড় করল, “ঠিকই আছে। হাদারামটাকে এভাবে সামনে এসে লজ্জা দিতে কে বলেছিল?”
কপালের সেই ব্যথাতুর অংশ ডলতে ডলতে ইলিজা দ্রুতবেগে হাঁটতে শুরু করল। ওদিকে কাব্যও কপালে হাত বুলিয়ে মুখ কুঁচকে সোজা হয়ে দাঁড়াল। নিজের মনেই কৌতুক করে বলল, “দেখতে এইটুকুনি হলে কী হবে, শরীরটা তো দেখছি পাথরের মতো শক্ত! মনে হলো কোনো ইটের প্রাচীরে ধাক্কা খেলাম। এবার কপালে আলু না গজালেই বাঁচি!”
নিজের রসিকতায় নিজেই স্মিত হেসে সে ইলিজার দ্রুত চরণের অনুগামী হলো। আসলে কিছুক্ষণ আগে কাব্য ইচ্ছে করেই খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল, কারণ সে আঁচ করতে পেরেছিল, ভয়ে ইলিজা বোধ হয় সংকুচিত হয়ে আছে।
বেশ কিছুক্ষণ তারা নিস্তব্ধ পথ চলল। পৌষের তীব্র হিমেল হাওয়া ইলিজার গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল; সে দুই হাত ঘষে এবং নিজের বাহু জড়িয়ে উষ্ণতা খোঁজার প্রাণপণ চেষ্টা করছিল। ঠিক তখনই তার দক্ষিণ পাশ থেকে কাব্য নিজের সেই কৃষ্ণবর্ণের বিশাল চাদরটি দিয়ে তাকে সযত্নে আবৃত করে দিল। ইলিজা বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে বাম পাশে তাকিয়ে দেখল, চাদরের অর্ধেক কাব্যের অঙ্গে, আর বাকি অর্ধেক তার ওপর। কাব্য যেন এক নিপুণ মনোবিজ্ঞানী, তার হৃদয়ের কম্পন ঠিকই টের পেয়েছে।
ইলিজার বিষ্ময়ভরা চাহনি দেখে কাব্য কিঞ্চিৎ ঝুঁকে রসিকতার সুরে বলল, “এতটা বিমুগ্ধ হওয়ার কিছু নেই। ফিল্মের হিরোদের মতো সম্পূর্ণ চাদর আপনাকে বিসর্জন দিতে পারব না। দুর্ভাগ্যবশত, আই’ম নট ইমিউন টু দ্য কোল্ড, মিস, উইন্টার অ্যাফেক্টস মি টু।”
কাব্যের মুখে এই সাবলীল ইংরেজি বাক্য শুনে ইলিজা ক্ষণিকের জন্য থমকে গেল। লজ্জা পেলেও ঠোঁট উলটিয়ে আলতো হেসে সে আড়চোখে মানুষটিকে একবার পর্যবেক্ষণ করে নিল, সেই চিরচেনা চপলতা পেরিয়ে কাব্যকে আজ বড়ো বেশি পরিণত ও স্থিতধী মনে হচ্ছে। ইলিজা কোনো প্রত্যুত্তর না করে চাদরের প্রান্তটি নিজের বাম কাঁধে টেনে নিল। কাব্য সম্ভবত তাকে আরও খানিকটা বিব্রত করার সংকল্প নিয়ে প্রণয়াবেশমাখা কণ্ঠে বলল, “শীতকালটা আমার কাছে কখনোই বিশেষ কিছু ছিল না। কিন্তু আজ এই আধখানা চাদরের ভাগাভাগি, তোমার কাঁধের মৃদু উষ্ণতা আর এই শব্দহীন পথচলা—সব মিলিয়ে ঋতুটা বড়ো বেশি মায়াবী ঠেকছে। আমার অভিলাষ, প্রতিটি শীত যেন এমন লগ্ন নিয়েই আসুক; পথ বদলাক, নগরী বদলাক, কিন্তু পাশের এই মানুষটির সাথে পথচলাটা যেন অবিনশ্বর থাকে। এটাই তো জীবনের পরম সার্থকতা।”
কাব্যের মুখে এই ‘তুমি’ সম্বোধনটি যেন এক অলৌকিক সুধা। যতবার সে এই সম্বোধনটি উচ্চারণ করে, ততবারই ইলিজার সর্বাঙ্গে শিহরন বয়ে যায়।
কাব্যের মুখে তুমি শব্দের চেয়েও যে মেয়েদের লজ্জা দেওয়ার জন্য আর কোনো শব্দ আছে, এটা ইলিজা বিশ্বাস করে না। তার হৃদয় থমকে দেওয়ার জন্য কাব্য কি আজ পণ করেছে নাকি? হৃৎস্পন্দনের এই অস্বাভাবিক দ্রুতি কি সে টের পায় না?
কথার মোড় অন্যদিকে ফেরানোর অভিপ্রায়ে ইলিজা শুধালো, “আজকে এই অসময়ে হঠাৎ শুভাগমনের কারণ কী?”
কাব্য এবার এক গাল প্রশান্ত হাসি দিয়ে উত্তর দিল, “ভাবলাম, অনাগত অর্ধাঙ্গিনীর কিছুটা রক্ষণাবেক্ষণ করা প্রয়োজন। এত মনোহরণকারী এক নারীকে নিয়ে আমার দুশ্চিন্তার অন্ত নেই, কখন কোন ছেলে এসে… তাই সেই অবকাশ আর দিচ্ছি না। নিজের অমূল্য সম্পদ তো নিজেকেই আগলে রাখতে হবে, তাই না?”
কাব্যের সেই প্রগাঢ় অধিকারবোধ আর মধুমাখা চপলতায় এবার ইলিজার লজ্জার পারদ যেন গগনচুম্বী হলো। তার ইচ্ছা করছিল এই মুহূর্তেই লোকচক্ষুর অন্তরালে কোথাও নিরুদ্দেশ হয়ে যেতে। অধর কামড়ে সে নিঃশব্দে চরণে গতি বাড়াল। কাব্য আড়চোখে তার এই আরক্তিম মুখচ্ছবি দেখে মনে মনে হাসল। আসলে সে ইলিজাকে দেখাতে চেয়েছিল যে, ইলিজার সেই কাল্পনিক কোরিয়ান নায়কদের তুলনায় তার রোমান্টিক সত্তা কোনো অংশেই ন্যূন নয়।
তবে এই হাস্যোজ্জ্বল আবরণের অন্তরালে কাব্যের মনে এক নিবিড় উদ্বেগ কাজ করছিল। সে সেই অশুভ আউলদের পৈশাচিক প্রকৃতি সম্পর্কে সম্যক অবগত। আসন্ন পরীক্ষার কারণে ইলিজার এই সান্ধ্যকালীন কোচিং বন্ধ করা অসম্ভব, তাই সে নিজেই ইলিজার অভয়বরণ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদিও চারদিকে পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে, তবু ওই হিংস্র প্রাণীদের হাত থেকে ইলিজাকে নিরাপদ রাখতে তার মন বিন্দুমাত্র স্বস্তি পাচ্ছিল না। সে কেবল সেই মুহূর্তের প্রতীক্ষায় আছে, যখন আইনশৃঙ্খলার রক্ষীবাহিনী এই অশুভের বিনাশ ঘটাবে।
এদিকে কাব্য ও ইলিজার গন্তব্যের সমান্তরালে, পশ্চাতের এক নির্জন চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে ছিল শুভ্র। তার হাতে থাকা গিটারের তারে হঠাৎ এক করুণ সুর মূর্ছিত হয়ে উঠল। নিজের ভাঙা গলায় সে লালন শাহ এর সেই চিরন্তন বিরহের বাণী তুলে ধরল,
“লালন ফকির ভেবে বলে সদাই
প্রেম যে করে সে জানে
ঐ প্রেম যে করে সে জানে
আমার মনের মানুষের সনে
আমার মনের মানুষের সনে… ”
শুভ্রের দুই ছলছল নেত্র অনিমেষ চেয়ে ছিল ওই দূরগামী যুগলের দিকে। তার কণ্ঠে সুর থাকলেও আজ যেন তাতে প্রাণ ছিল না। কীভাবে থাকবে? তার অন্তরাত্মা যে আজ সহস্র খণ্ডে বিদীর্ণ। শুভ্র আবারও গেয়ে উঠল,
“চাতক প্রায় অহর্নিশি
চেয়ে আছে কালো শশী
চাতক প্রায় অহর্নিশি
চেয়ে আছে কালো শশী
হব বলে চরণদাসী
হব বলে চরণদাসী
ও তা হয় না কপালগুণে
ও তা হয় না কপালগুণে
আমার মনের মানুষের সনে
আমার মনের মানুষের সনে…”
চায়ের দোকানদার গরম ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা তার পাশে রেখে গেলেও শুভ্র সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করল না। তার ভারাক্রান্ত দৃষ্টি কেবল কাব্য আর ইলিজার মিলিয়ে যাওয়া অবয়বে নিবদ্ধ। এই সুদর্শন তরুণের চেহারা আজ এক নিদারুণ মালিন্যে ঢেকে গেছে। পরনের দামি গ্যাবাডিং আর জ্যাকেটেও আজ সেই আভিজাত্য নেই, যা মানুষের নজর কাড়ে।
একসময় শুভ্র শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে স্বগোক্তি করল, “তোমাকে চেয়েছিলাম আষাঢ়ের সেই অবিরাম বর্ষণের মতো, যা একবার শুরু হলে থামার নাম নেয় না। কিন্তু তুমি এলে পৌষের সেই ক্ষণস্থায়ী বৃষ্টির মতো, এত অল্পতে কি এই তৃষ্ণার্ত চাতকের পিপাসা মেটে? তোমাকে দেখার ব্যাকুলতায় আমার এই চক্ষু আজ খাঁ খাঁ মরুভূমি হয়ে গেছে, তা কি তুমি জানো? আমার সমস্ত সুখ আজ এক অন্ধকার কারাগারে বন্দি, যার চাবিকাঠি কেবল তোমার দর্শনে নিহিত। অথচ আমি কেবল চেয়েই গেলাম, পাওয়ার ভাগ্যটুকু আর হলো না।
আমি ডিসেম্বর আর তুমি জানুয়ারি—আমাদের অবস্থান বড়ো কাছে, অথচ ব্যবধানটা পুরো এক বছরের!”
কাব্যের প্রতিও তার আজ কোনো অভিযোগ নেই। সে জানে, কাব্যের হৃদয়ে ইলিজার প্রতি যে অনুরাগ, তা হয়ত তার চেয়েও গভীর। তবে সে জানত না, তার প্রিয় নারীকে ভালোবাসার অনুভূতি তার বন্ধুরও ছিল। যে মানুষটিকে সে সবচেয়ে কাছের বন্ধু মানত, সেই কাব্য কেন তার এই অনুরাগের কথা তাকে জানালো না? সে কি কাব্যের কাছে এতটাই পর ছিল যে, নিজের হৃদয়ের গোপন সংবাদটুকু তার সাথে ভাগ করে নিতেও কাব্য দ্বিধাবোধ করল?
তবে কিছুক্ষণের মধ্যে শুভ্র নিজেই অনুভব করল, কাব্যের প্রতি তার এই আক্ষেপ কিছুটা অযৌক্তিক। কাব্য তো কখনোই নিজের হৃদয়ের অর্গল উন্মোচন করেনি, তবে কেন সে আজ অভিযোগের পাহাড় গড়ছে?
একটি দীর্ঘশ্বাসের সাথে সে নিজের ভেতরের দহনকে প্রশমিত করার চেষ্টা করল। চোখের কোণে জমা হওয়া নোনা জলটুকু অবাধ্য হয়ে বেরিয়ে আসতে চাইল, কিন্তু জনসমক্ষে নিজের পুরুষালি গরিমা আর আত্মসম্মান বিসর্জন দিতে সে নারাজ। তাই বিষাদের মেঘ সরিয়ে জোরপূর্বক এক চিলতে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলল সে।
ঠিক তখনই চা বিক্রেতা প্রফুল্ল চিত্তে বলে উঠলেন, “কই গো মামা, চা যে ঠান্ডা হইয়া যাইতেছে! আর গানটা থামাইলা কেন? তোমার কণ্ঠে কিন্তু জাদু আছে; গান শুইনে আমার সেই না-পাওয়া প্রেমিকার কথা মনে পইড়ে গেল। আবার গানটা ধরো ধরো।”
শুভ্র ম্লান হেসে গিটারটা হাঁটুর উপর আবার তুলে নিল। সে বুঝল, এই সাধারণ মানুষটির ব্যথার সাথে তার ব্যথার সুর আজ এক বিন্দুতে মিলে গেছে। চায়ের পেয়ালায় এক চুমুক দিয়ে সে অস্ফুট স্বরে আপনমনে আওড়াল,
“তোমারে বনের পাখি পাইলো,
নদীর কলতানে পাইলো,
গিটারের সুরে পাইলো,
শরতের কাশফুলে পাইলো,
ভোরের ঘাসের শিশিরে পাইলো,
নির্জন রাতের নীরবতায় পাইলো।
দুনিয়ার কত মানুষ হেলায়-ফেলায় তোমারে পাইলো;
শুধু আমি এক অধম কাঙাল—
দু’হাত পেতে দিন-রাত মিনতি করবার পরও
তোমারে পাইলাম না!
আমার ভালোবাসা কি তবে এতটাই অভিশপ্ত?”
আবারও গিটারের তারে আঙুল ছোঁয়াল সে। বিষণ্ণতারও যে এক অলৌকিক মাধুর্য আর প্রশান্তি থাকে, শুভ্রের কণ্ঠ আজ তারই প্রমাণ দিচ্ছিল।
কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর ইলিজা তার গাড়ির কথা স্মরণ করিয়ে দিল। কিন্তু কাব্য আজ প্রথাগত আভিজাত্যের পথে হাঁটতে নারাজ। সে চালককে বিদায় করে দিয়ে হঠাৎ ইলিজার হাত আঁকড়ে ধরে এক অভাবনীয় দৌড় শুরু করল। ইলিজা কিছু বুঝে ওঠার আগেই নিজেকে এক চলন্ত বাসের সম্মুখে আবিষ্কার করল। কাব্যের চোখের চঞ্চলতা আর অধরপ্রান্তের কুটিল হাসি বলে দিচ্ছিল, সে এই চলন্ত যানেই আরোহণ করতে চায়।
ভয়ে ইলিজার হৃৎপিণ্ড যেন কণ্ঠনালিতে উঠে এলো। সে ডানে-বামে মাথা নেড়ে এই দুঃসাহসিক কাজ থেকে বিরত থাকতে বলল। কিন্তু কাব্য তার হাতটি আরও নিবিড়ভাবে চেপে ধরে অভয় দিয়ে বলল, “কাব্যকে কি ভরসা করেন না?”
ইলিজা কোনো কপটতা না করে মাথা নেড়ে মৌন সম্মতি দিল। কাব্য এক গাল হেসে দরাজ গলায় বলল, “তবে চলুন মিস ইলি, আজ আপনাকে পাখির মতো উড়িয়ে নিয়ে যাই!”
নিমিষেই কাব্য এক হাতে বাসের হাতল আঁকড়ে ধরে, অন্য হাতে এক হেঁচকা টানে ইলিজাকে বাসের ভেতরে তুলে নিল। ভারসাম্য রাখতে না পেরে ইলিজা সজোরে কাব্যের প্রশস্ত বক্ষে আছড়ে পড়ল। তার উত্তাল শ্বাস-প্রশ্বাস কাব্যের অস্তিত্বকে ছুঁয়ে যাচ্ছিল। মুহূর্তটি ছিল যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনই নস্টালজিক। যখন ইলিজা হতভম্ব হয়ে কাব্যের চোখের দিকে তাকাল, তখন দুজনেই মুখ ফুলিয়ে খপ করে হেসে উঠলো।
বাসের জানালার পাশের আসনে বসার পর কাব্য মৃদু হেসে বলল, “আপনার ওই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিলাসযানে এই উন্মুক্ত শিহরনটুকু পাবেন না, ম্যাডাম। জানালার বাইরে চেয়ে দেখুন, প্রকৃতি কেমন চমৎকারভাবে আপনার গতির সহযাত্রী হয়েছে।”
কাব্য আসলে চায় ইলিজা যেন জীবনের প্রতিটি ক্ষুদ্র অনুভূতিকে আস্বাদন করতে পারে। ইলিজা জানালার দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে, বাইরের অন্ধকারের মাঝেও এক বিচিত্র সৌন্দর্য খুঁজে পেল। প্রিয় মানুষের পাশে থেকে ধরণির এই পরিবর্তনশীল রূপ দেখা যে কতটা তৃপ্তিদায়ক, তা সে আজ মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছে। কাব্য পরম মমতায় জানালাটি বন্ধ করে দিল, পাছে হিমেল হাওয়ায় তার সজনেডাঁটার অসুখ করে।
কিছুক্ষণ নীরবতার পর কাব্য হঠাৎ এক গভীর প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, “আপনি কেন কোনো প্রতিষ্ঠিত পুরুষকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিলেন না, মিস ইলি?”
ইলিজা ক্ষণিকের জন্য বাইরের দিগন্তের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর প্রাণবন্ত হাসিতে চারপাশ মুখরিত করে উত্তর দিল, “কারণ সেই প্রতিষ্ঠিত পুরুষের সাফল্যের পেছনে আমার কোনো অবদান থাকত না। আমি এমন একজনকে চাই, যার উত্তরণের প্রতিটি ধাপে আমার ঘাম আর শ্রম মিশে থাকবে। যেন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সে গর্বের সঙ্গে দুনিয়াকে বলতে পারে, আজ আমি এই শিখরে আসীন হতে পেরেছি কেবল আমার প্রিয়তমা পাশে ছিল বলে।”
ইলিজার সেই দূরদর্শী এবং ব্যক্তিত্বদীপ্ত উত্তর শুনে কাব্য মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। কোনো প্রকার সংকোচ বা দ্বিধা না রেখে সে বাসের সিটে রাখা ইলিজার কোমল হাতখানা নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নিল। ইলিজা প্রতিবাদ করল না, বরং এক চিলতে লাজুক হাসিতে সায় দিল। কাব্যের শিরায় শিরায় যে বিদ্যুন্ময় অনুভূতির প্রবাহ বয়ে যাচ্ছিল, ঠিক একই স্পন্দন ইলিজার ধমনীতেও অনুরণিত হচ্ছিল।
সারাদিনের ক্লান্তি আর যান্ত্রিক দৌড়ঝাঁপের পর ইলিজার শরীর ও মন যখন একটু স্নিগ্ধতার জন্য হাহাকার করছিল, তখন কাব্যের প্রশস্ত কাঁধটাই তার কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আশ্রয় মনে হলো। সে ধীরলয়ে নিজের মাথাটা কাব্যের কাঁধে এলিয়ে দিয়ে মুদ্রিত নয়নে সেই প্রশান্তিটুকু আস্বাদন করতে লাগল। গন্তব্যে পৌঁছাতে বড়োজোর আর দশ মিনিট বাকি, কিন্তু এই স্বল্প সময়ে প্রিয়তমের সান্নিধ্যে যে পরম শান্তি সে খুঁজে পেল, তা কোনো বিলাসযানের নরম গদিতে সম্ভব নয়।
কাব্য তখন নিজেকে এক অনির্বচনীয় সুখের সাগরে ভাসমান দেখছে। জীবনের প্রতি তার যে পুঞ্জীভূত শত শত অভিযোগ ছিল, আজ তা এক নিমিষে উবে গেছে। সে আকাশের পানে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে আল্লাহর দরবারে লক্ষ কোটি শুকরিয়া জ্ঞাপন করল।
মনে মনে ভাবল, “হয়ত পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষটির নাম আজ শেখ আরভিন কাব্য।”
এক গভীর ও তৃপ্তিময় নিশ্বাস ফেলল সে।
বাড়ির চৌকাঠ অতিক্রম করার সময়ও ইলিজার মুখে সেই মায়াবী হাসির রেশ লেগে ছিল। কাব্য যেন তার সেই কল্পনার রাজপুত্র, যাকে সে বাস্তবের রুক্ষ মাটিতেও এত যত্নশীল এবং মার্জিত রূপে পেয়েছে। আল্লাহর অশেষ রহমত যে সে পরিবারের পর এমন একজন মানুষকে নিজের ভাগ্যে পেয়েছে। ইলিজা প্রায় নাচতে নাচতে এবং চপল ভঙ্গিতে নিজের ঘরে প্রবেশ করল।
সারাদিনের পোশাক পরিবর্তন করার জন্য যেই না সে আলমারির সামনে দাঁড়াল, অমনি পেছন থেকে এক পরিচিত কণ্ঠের গর্জন শোনা গেল, “ভাও!”
ভয়ে ইলিজার হৃৎপিণ্ড যেন মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। চমকে পেছনে ফিরতেই তার চক্ষু চড়কগাছ! সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার প্রিয় আপুমণি, মিরা। পরনে গোলাপি রঙের স্নিগ্ধ এক থ্রিপিস, আর কানের পাশে গুঁজে রাখা ইলিজারই প্রিয় সেই টকটকে লাল গোলাপ। মিরা তার সুদীর্ঘ বেণিটা পেছন দিকে এলিয়ে দিয়ে দুহাতে বুক বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে বোনের বিহ্বল প্রতিক্রিয়া উপভোগ করার জন্য।
পরক্ষণেই ইলিজার সমস্ত জড়তা আর আবেগ বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো উপচে পড়ল। সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে এক লাফে মিরাকে জাপটে ধরল। ইলিজার এই অতর্কিত আক্রমণে মিরা প্রায় ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছিল, কিন্তু পেছনে থাকা চেয়ারটি অবলম্বন করে নিজেকে সামলে নিয়ে বোনকে নিবিড় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করল। ইলিজার কান্নার বিরাম নেই। ফোনে করা সেই হাজারো অভিমান, ‘বিয়ের পর আপু বদলে গেছে’, ‘দুলাভাইকে পেয়ে বোনকে ভুলে গেছে’—সব অভিযোগ যেন এই এক আলিঙ্গনে ধূলিসাৎ হয়ে গেল।
হাসিখুশি মিরার চোখও আজ আর্দ্র। কয়েক মাস পর নাড়ির টানে বোনকে এতটা কাছে পেয়ে তারও বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে এলো। প্রায় আধঘণ্টা পর ইলিজা নিজেকে কিছুটা মুক্ত করে হেঁচকি তুলতে তুলতে বলল, “তুমি… তুমি অনেক খারাপ, জানো? অনেক পাষাণ! ছাড়ো আমাকে। আমি তোমার কে শুনি? যাও, জিজাজির কাছেই চলে যাও। এখানে কী করতে আসছ? হ্যাঁ?”
বোনের এই অভিমানী তিরস্কার শুনে অশ্রুসিক্ত মিরার অধরে হাসির ঝিলিক খেলে গেল। সে বোনের অশ্রুভেজা, লাল হয়ে ওঠা মুখে আলতো করে হাত বুলিয়ে জলটা মুছে দিল। তারপর পুনরায় ইলিজাকে নিজের বুকে টেনে নিয়ে পরম মমতায় বলল, “যাব তো অবশ্যই, তবে তার আগে তোকে একটু জ্বালিয়ে নেওয়া বাকি যে, আমার লক্ষ্মী সোনাটা!”
ইলিজাও চোখের জল মুছে হাসল, “সে দেখা যাবে! জ্বালানো কাকে বলে, তা হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে ছাড়ব এবার। হুহ!”
মিরা সশব্দে হাসলেও মনের কোণে এক ফালি মেঘ তাকে বিষণ্ন করে দিচ্ছিল। কারান তাকে মাত্র দুই দিনের সময় দিয়েছে। এই স্বল্প সময় যে তার তৃষিত পরিবারের জন্য যথেষ্ট নয়, তা সে ভালো করেই জানে। সে এখনো জানায়নি যে সে ক্ষণিকের অতিথি। এই আনন্দের মুহূর্তে সে কারোরই মন ভাঙতে চায় না। তবে এও সত্য যে, কারানের সান্নিধ্য ছাড়া মিরারও নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়; বিরহের এক অদৃশ্য সুতোর টানে সেও তো তার স্বামীর কাছেই বাঁধা।
মিরার প্রত্যাবর্তনে ‘মিরা মঞ্জিল’ আজ যেন তার হারানো যৌবন ফিরে পেয়েছে। সকাল থেকেই উৎসবের আমেজ—হাসি, আনন্দ আর উপহারের প্লাবনে ভেসে যাচ্ছিলেন বাড়ির সকলে। ইলিজার জন্য কারানের পাঠানো উপঢৌকনগুলো ছিল আক্ষরিক অর্থেই রাজকীয়। আইফোন, অ্যাপল ওয়াচ, কাস্টমাইজড ম্যাকবুক এয়ার থেকে শুরু করে হীরের কর্ণফুল; অর্থাৎ সতেরো বছরের এক কিশোরীর মন জয় করার যাবতীয় রসদ সেখানে বিদ্যমান। ইলিজা উল্লাসে আত্মহারা হয়ে বারংবার বন্ধুদের ফোন করে এসব জানাচ্ছিল। তবে ক্ষণিকের জন্য তার মনে স্নেহার অনুপস্থিতির বিষাদও ছুঁয়ে যাচ্ছিল, সখী থাকলে আজ ভাগাভাগির আনন্দটা দ্বিগুণ হতো।
কারানের দেওয়া সবচেয়ে বড়ো বিস্ময়টি ছিল ইলিজার জন্য একটি ব্যক্তিগত পাঠাগার। গত বিকেলেই কারিগররা এসে কক্ষটি সাজিয়ে দিয়ে গেছে। সেখানে কেবল পাঠ্যবই নয়, বরং বিশ্বসাহিত্যের ধ্রুপদী উপন্যাস থেকে শুরু করে ইলিজার অতি প্রিয় স্প্যানিশ সাহিত্যের এক দুর্লভ সংগ্রহশালা তৈরি করা হয়েছে। এই ঐশ্বর্য দেখে ইলিজার আফসোস যেন কিছুতেই কমছিল না—দুলাভাই কেন আসল না? তাহলে তো সেও কিছু একটা করে ঋণ শোধ করে দিত! তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে নতুন ফোনটিই তার কাছে পরম পাওয়া, কারণ এখন কাব্যের সাথে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগের এক অবারিত দ্বার খুলে গেল।
বিকেলটা অতিবাহিত হলো মতিঝিলের পরিচিত অলিগলিতে স্মৃতি রোমন্থন করে। শৈশবের সেই চেনা ধূলিকণা আর শীতের মিষ্টি রোদে বাবা-মায়ের স্নেহের পরশ যেন মিরাকে আবারও সেই ছোট্ট খুকুটি বানিয়ে দিয়েছিল। আর ইলিজা পুরোটা সময় বোনের হাত ধরেই পথ চলেছে।
সন্ধ্যা নামতেই বাড়ির আঙিনায় এক চিরচেনা আমেজ তৈরি হলো। গায়ে ভারী চাদর জড়িয়ে মিরা টুলের উপর বসেছে তার বাবার পাশে, আর সম্মুখেই উনুনের পাশে বসে পিঠাপুলি তৈরিতে ব্যস্ত আনোয়ারা মমতাজ। মিরা বারংবার সাহায্যের হাত বাড়াতে চাইলেও দম্পতিটি একজোট হয়ে তাকে বাধা দিল। মমতাজের সাফ কথা, মেয়ে আজ রাজকন্যা হয়ে এসেছে, কাজ কেন করবে? উলটো আব্দুর রহমান নিজেই স্ত্রীর সাথে হাতে হাত মিলিয়ে উনুন সামলাচ্ছেন।
মিরা তৃপ্তিসহকারে সরিষা, চিংড়ি আর ধনেপাতার ঝাল ভর্তা দিয়ে গরম গরম চিতই পিঠার আস্বাদ নিচ্ছিল।
তার পাশেই আরেক টুলে বসা আব্দুর রহমান একটি ভাপা পিঠায় কামড় বসিয়ে স্মিত হেসে বললেন, “তোর রহিমা ফুফু গ্রাম থেকে বিশেষ এই খেজুরের গুড় পাঠিয়েছেন। তুই আসবি শুনে তার যেন আর তর সইছিল না। সাথে তোর প্রিয় কুলের আচার আর চালতার আচারও পাঠাতে ভোলেননি।”
মমতাজ ভাপা পিঠার ছাঁচটি চুলোয় বসাতে বসাতে হাসিমুখে যোগ করলেন, “আপাকে কত বারণ করলাম, বললাম শরীরটা আপনার ভালো না, এই বয়সে এত হাঙ্গামা করার কী দরকার? আপনি শুধু দোয়া দিয়েন আমার মেয়েটাকে। কিন্তু আপা কি আর শোনে? বললেন, ‘আমার মেয়ের জন্য পাঠাব, এতে আবার কষ্টের কী আছে? লোক পেলে তো আরও অনেক কিছু পাঠাতাম!'”
মিরা এক টুকরো পিঠা মুখে পুরে সজল চোখে বলল, “ফুফু আসলো না কেন, মা? কতদিন দেখি না। সে তো আবার ভিডিয়ো কল কীভাবে রিসিভ করতে হয়, বা দিতে হয়, জানে না। কলে যদিও মাঝেমধ্যে কথা বলি, কিন্তু তাতে কি আর মন ভরে?”
আব্দুর রহমান তখন সস্নেহে একটি গরম পিঠার অংশ স্ত্রীর ঠোঁটের কাছে এগিয়ে ধরলেন। মেয়ের সামনে এমন অপ্রস্তুত রোমান্টিক আচরণে মমতাজ বেগম লোকলজ্জায় কুঁকড়ে গেলেন। চোখের ইশারায় বারবার বারণ করলেও আব্দুর রহমান নাছোড়বান্দা। তিনি উচ্চস্বরে হেসে বললেন, “আরে খাও খাও! মেয়ের সামনে এতে আবার লুকোছাপার কী আছে? মেয়ে তো আমাদেরই।”
মমতাজ অবশেষে লজ্জায় আরক্তিম হয়ে পিঠাটি মুখে নিলেন। আব্দুর রহমান আয়েশ করে চিবোতে চিবোতে আবার বললেন, “আসার কথা তো ছিলই, কিন্তু তোর ফুপাতো ভাই রিয়ন তো ওর স্ত্রীকে নিয়ে সিলেট থাকে। ওদিকে গ্রামে ইদানীং চুরির উপদ্রব বেড়েছে, তাই ঘরবাড়ি আর হাঁস-মুরগি আগলে রাখার জন্য শেষমেষ তোর ফুফু আর পা বাড়াতে পারলেন না।”
বাবার স্নেহচ্ছায়া থেকে উঠে গিয়ে মিরা মমতাজ বেগমের পাশে চুলার ধারে বসল। ছোট্ট মাটির সরায় অতি যত্নে চালের গুঁড়ি আর দানাদার গুড় সাজিয়ে সে একটি ভাপা পিঠা তৈরির প্রচেষ্টায় মগ্ন হলো। মমতাজ ধমক দিলেও মিরা আদুরে ভঙ্গিতে মায়ের শরীরে লেপ্টে গিয়ে বলল, “সামান্য একটু সাহায্য করতে দাও না, মা! ব্যস্ত নাগরিক জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, আবার কবে এমন অখণ্ড অবসর পাব আর কবেই বা তোমার হাতের পিঠা খেতে আসব, তার তো কোনো নিশ্চয়তা নেই।”
মেয়ের কণ্ঠে লুকানো সেই বিদায়ের সুর মমতাজকে মুহূর্তেই নিস্তব্ধ করে দিল। মাতৃহৃদয় এক অজানা আশঙ্কায় সংকুচিত হলো, তিনি কেবল একটি ম্লান হাসি উপহার দিলেন। মিরা প্রসঙ্গের মোড় ঘুরিয়ে কাজ করতে করতেই বাবার পানে তাকিয়ে শুধালো, “কতকাল হলো আমাদের বরিশালে যাওয়া হয় না। ফুফু ওখানে একা একা জীবনযাপন কীভাবে করে, বলো তো? আমাদের এখানে নিয়ে আসলেও তো পারো।”
আব্দুর রহমান দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দিলেন, “সে প্রস্তাব অনেকবারই দিয়েছি, আম্মাজান। কিন্তু আপনার ফুফু শিকড়বিচ্ছিন্ন হতে চান না। ওই মাটির সোঁদা গন্ধে আর স্মৃতির আস্তরণেই তিনি নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পান; ওখানেই তিনি তার অন্তিম নিশ্বাস ত্যাগ করতে চান।”
রান্নাঘর থেকে কিছু গরম পিঠা একটি সুদৃশ্য পিরিচে সাজিয়ে মিরা পা টিপে টিপে ইলিজার কক্ষের অভিমুখে যাত্রা করল। উদ্দেশ্য, বরাবরের মতোই বোনকে চমকে দেওয়া। কক্ষের অভ্যন্তরে উঁকি দিয়ে সে দেখল, ইলিজা শয্যায় উপুড় হয়ে শুয়ে পরম আহ্লাদে পা দুটো উপরে তুলে নাড়াচ্ছে, আর নতুন ফোনের স্ক্রিনে একমনে কিছু একটা অবলোকন করছে। তার মুখচ্ছবিতে যে আভা ছড়িয়ে ছিল, তা কোনো সাধারণ প্রাপ্তির নয়, বরং এক গূঢ় অনুরাগের। পিছন থেকে মিরা যখন বোনের পিঠে চাপড় দিতে উদ্যত হলো, ঠিক তখনই তার দৃষ্টি স্থির হলো ফোনের উজ্জ্বল পর্দায়।
সেখানে এক সুঠাম তনু আর মায়াবী নেত্রপল্লববিশিষ্ট তরুণের ছবি ভাসছে। মিরা কণ্ঠস্বর মুহূর্তেই গম্ভীর করে ডাকল, “মাহি!”
সেই বজ্রকঠিন ডাক শুনে ইলিজার হৃৎপিণ্ড যেন ফেটে পাঁজরের হাড় ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইল। সে তড়িৎবেগে উঠে বসল; তার মুখাবয়ব ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। চোখদুটো বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ়! কোনো ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন দেখলেও হয়ত সে এতটা ভয় পেত না। ঢোক গিলে সে কেবল অস্ফুট স্বরে কাঁপা গলায় বলতে পারল, “মি-মি-মিরু আপু!”
মিরা স্থির দৃষ্টিতে বোনের দিকে তাকিয়ে শীতল কণ্ঠে প্রশ্ন করল, “ছেলেটা কে?”
ধরা পড়ে যাওয়ার গ্লানিতে ইলিজা মস্তক অবনত করল। উত্তেজনার আতিশয্যে সে কক্ষের দ্বার রুদ্ধ করতে ভুলে গিয়েছিল, আর সেই অসাবধানতাই আজ তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিল। এতক্ষণ যে হৃদয়ে প্রেমের রঙিন প্রজাপতিরা ডানা মেলছিল, মুহূর্তেই সেখানে এক বিষাদময় ঝড়ের আভাস পাওয়া গেল।
মিরা একটি নিবিড় দীর্ঘশ্বাস পরিত্যাগ করে ধীরস্থিরভাবে ইলিজার পাশে শয্যায় উপবেশন করল। মিরাকে এমনভাবে কাছে বসতে দেখে ইলিজার বুক কেঁপে উঠল। সে বারবার ঢোক গিলল। বোনের এই রহস্যময় নীরবতা তাকে চিন্তিত করলেও মিরার বাহ্যিক প্রকাশ ছিল অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত। ইলিজা তখন মনে মনে কোনো অলৌকিক সাহায্যের প্রার্থনা করছিল। ভয়ে সে এতটাই কুঁকড়ে গিয়েছিল যে গুটিসুটি হয়ে বসে রইল। ঠিক তখনই মিরা শান্ত স্বরে মন্তব্য করল, “দেখতে কিন্তু মা শা আল্লাহ; বেশ সুদর্শন।”
অপ্রত্যাশিত এই প্রশংসায় ইলিজার অন্ধকারাচ্ছন্ন মুখাবয়ব মুহূর্তেই সহস্র দীপাবলির আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। সে বিস্ময়বিস্ফোরিত নেত্রে বোনের দিকে তাকিয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠল, “তোমার কি সত্যিই পছন্দ হয়েছে, আপু? মানে আমি আসলে… আমি বলতে চাচ্ছিলাম…”
আবেগের আতিশয্যে সে তার প্রিয় আপুকে জড়িয়ে ধরল। ইলিজার এই আকস্মিক চপলতায় মিরার অভিব্যক্তিতে কোনো পরিবর্তন এলো না। তবে সে মনে মনে স্বীকার করতে বাধ্য হলো যে, সত্যিই তরুণটির অবয়বে এক অনন্য আভিজাত্য আর পৌরুষের সংমিশ্রণ রয়েছে, যা যে কোনো ললনার চিত্তহরণ করতে সক্ষম। কিন্তু কেবল বাহ্যিক রূপ তো আর চারিত্রিক দৃঢ়তার পরিচয় নয়।
মিরা আলতো করে ইলিজার হাত ধরে গলা ছাড়িয়ে, নিজের থেকে সরিয়ে দিয়ে মুখাবয়বে গাম্ভীর্যের চাদর জড়িয়ে নিল। বোনের চোখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে নির্দেশসূচক স্বরে বলল, “আমি সবকিছু বিস্তারিত জানতে চাই।”
মিরার সাথে ইলিজার সখ্যতা চিরকালই এক নিবিড় সুতোয় গাঁথা; সেখানে লুকোচুরির কোনো অবকাশ নেই। ইলিজা ক্ষণকাল চিন্তা করল, কাব্যের সবটুকু কি বলা সমীচীন হবে? কিন্তু বোনের তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে মিথ্যার বেসাতি করা অসম্ভব। ইলিজা একটি মৃদু দীর্ঘশ্বাস ফেলে আদিগন্ত বিস্তৃত এক কাহিনির অবতারণা করল। তাদের পরিচয়ের সেই নাটকীয় সূত্রপাত, প্রথম দেখার সেই অম্লমধুর ঝগড়া, আর ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা অনুরাগের প্রতিটি অণু-পরমাণু সে সবিস্তারে বর্ণনা করল। এমনকি কাব্যের সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন ও বিভীষিকাময় অতীতটুকুও সে বাদ দিল না।
শুরুর দিকে মিরা হাঁটুদ্বয় ভাঁজ করে তার ওপর কনুই ঠেকিয়ে অত্যন্ত একাগ্রতার সাথে শ্রবণ করছিল। তাদের মান-অভিমান আর ছোটোখাটো অঘটনের কথা শুনে মিরার গাম্ভীর্যের আড়ালে এক চিলতে হাসির রেখা ফুটে উঠছিল। কিন্তু কাহিনির অন্তিমে যখন কাব্যের সেই দুঃসহ অতীতের কালো মেঘগুলো ঘনীভূত হলো, তখন মিরার অভিব্যক্তিতে এক আমূল পরিবর্তন এলো। সে হাঁটু থেকে কনুই সরিয়ে ঋজু হয়ে বসল; তার প্রদীপ্ত মুখচ্ছবিতে বিষাদময় ছায়া নেমে এলো। তবে সে নিজের ম্লানতা ইলিজার কাছে প্রকাশ হতে দিল না, পাছে বোনের মনে এমন ধারণা জন্মায় যে আপু কেবল করুণার বশবর্তী হয়ে কাব্যের প্রতি নমনীয় হচ্ছে।
পুরো উপাখ্যান বর্ণনা করতে গিয়ে ইলিজার নেত্রপল্লব সিক্ত হয়ে এলো। সে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বোনের চোখের দিকে তাকিয়ে আর্দ্র স্বরে বলল, “আপু, এখন তুমি যদি আদেশ করো, তবে আমি নিজেকে সামলে নিয়ে ওনাকে চিরতরে ভুলে যাবো।”
ইলিজার চোখের সেই আর্তি দেখে মিরার হৃদয় মথিত হলো। সে স্পষ্ট বুঝতে পারল, কাব্য যতটা এই মেয়েটিকে ভালোবাসে, ইলিজার হৃদয়েও কাব্যের স্থান তার চেয়ে কোনো অংশে ন্যূন নয়।
ঠিক সেই মুহূর্তেই কক্ষের দ্বারে করাঘাতের শব্দ শ্রুত হলো। আব্দুর রহমার ভেতরে প্রবেশ করতেই দুই বোন মুহূর্তেই বাস্তবতার রূঢ় জমিনে আছড়ে পড়ল। ইলিজা দ্রুত ওড়নার প্রান্ত দিয়ে চোখের জল মুছে নিজেকে স্বাভাবিক করার ব্যর্থ চেষ্টা করল। আব্দুর রহমান মেয়েদের কাছে এসে কিছুটা তফাতে দাঁড়ালেন। তার গম্ভীর মুখাবয়ব দেখে মিরা কৃত্রিম হাসি টেনে বলল, “বাবা, তুমিও না! দাঁড়িয়ে আছো কেন? এসে বসো এখানে।”
আব্দুর রহমান বসলেন ঠিকই, কিন্তু চিন্তিত মুখমণ্ডলে মিরার দিকে তাকিয়ে বললেন, “মা, তোকে ফোনে বলেছিলাম না একটা জরুরি কথা আছে?”
মিরা ক্ষীণ ভ্রূ কুঞ্চিত করে হালকা মাথা নাড়াতেই, তিনি OWL’দের আক্রমণের সেই কালরাত্রির বিভীষিকাময় কাহিনি বিবৃত করলেন। সেই পৈশাচিক অধ্যায়ের বর্ণনায় মিরার শিরদাঁড়া দিয়ে এক শীতল স্রোত বয়ে গেল, আতঙ্কে তার নিশ্বাস হয়ে এলো প্রগাঢ়।
পুরোটা শেষ করে আব্দুর রহমান একটি দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বললেন, “ওরা কারা ছিল, কী ওদের উদ্দেশ্য, আজও তা রহস্য।”
তিনি স্নেহের পরশে মিরার মস্তকে হাত রেখে পুনরায় আশ্বস্ত করলেন, “তবে চিন্তা করিস না মা, ইলিজা এখন সম্পূর্ণ সুরক্ষিত। আর স্নেহাও আপাতত ওর ফুঁপির কাছে ইন্ডিয়াতে আছে।”
মেয়ের দুশ্চিন্তা বাড়াতে চান না বলে, স্নেহার ব্যাপারে তাকেও মিথ্যার আশ্রয় নিতে হলো। তিনি আরো যোগ করলেন, “তুইও নিজের খেয়াল রাখবি। যদিও জানি কারান থাকতে তোর চুলও স্পর্শ করার দুঃসাহস কারো হবে না, তবুও… বাবা তো, মন তো আর মানে না।”
মিরা ভ্রূ কুঁচকে মনে মনে ভাবলো, “এরা… এরা কি সেই তিনজন? কিন্তু বাবা তো বলল, পুলিশ জানিয়েছে, ওদের ধরে ফেলা হয়েছে। তাহলে তো ভয় পাওয়ার কিছু নেই। যদি সত্যি এরা-ই হয়, তবে আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু… এরা যদি ওরা না হয়, তবে ওই ন*রখাদকগুলো এখন কোথায়?”
কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে, সামনের বসে থাকা মানুষটার ব্যাকুলতা দেখে মিরা তার হাতটি পরম মমতায় চেপে ধরল, এবং দৃঢ়তার সাথে বলল, “তুমি নিশ্চিন্ত থাকো, বাবা। কারান পাশে না থাকলেও তোমার এই কন্যাটি প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজেকে রক্ষা করার সামর্থ্য রাখে।”
আব্দুর রহমান আশ্বস্ত হয়ে স্মিত হাসলেন, অন্যদিকে বসা আরেক মেয়ে ইলিজার মাথায় হাত বুলিয়ে কক্ষ ত্যাগ করলেন। এদিকে ইলিজার মনে তখন আউলদের নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তা নেই; কারণ সে জানে কাব্য থাকতে কোনো অপশক্তিই তার ক্ষতি করতে পারবে না। তার সমস্ত মনোযোগ এখন মিরার সিদ্ধান্তের ওপর নিবদ্ধ, বোন কি তবে কাব্যের বিষয়টি মেনে নিবে না?
মিরা যখন কক্ষ থেকে নিষ্ক্রান্ত হওয়ার জন্য দরজার দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, ইলিজা তখন রুদ্ধশ্বাসে বোনের দিকে তাকিয়ে রইল। ঠিক যখন মিরা চৌকাঠ অতিক্রম করতে যাবে, তখনই সে থমকে দাঁড়াল। পেছনে না ফিরেই গম্ভীর স্বরে বলে উঠলো, “আপাতত ঘরের মধ্যেই থাকিস, বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রাইভেটের ব্যবস্থা আমি ঘরে করে দিব। আর… কাব্যের সাথে যোগাযোগটা এখন ফোনেই রাখিস। তবে… আমি কিন্তু আপনার এসএসসির রেজাল্টের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখব।”
এই অলিখিত সম্মতির বাণী শোনামাত্রই ইলিজা খুশিতে আত্মহারা হয়ে শয্যা থেকে লাফিয়ে উঠল, এবং পেছন থেকে মিরাকে সজোরে জড়িয়ে ধরল। মিরার অধরপ্রান্তেও তখন প্রশান্ত হাসি খেলে গেল।
“তুই আসবি কি না, সেটাও তো স্পষ্ট করছিস না, কারান।”
“আসব।”
“কবে?”
“তুই কি এখনো দুবাইতেই আছিস?”
ফারহান এবার কিঞ্চিৎ দমে গিয়ে বলল, “নাহ, বাংলাদেশে।”
কারান সামান্য ভ্রূ কুঁচকালো, কিন্তু প্রশ্ন করল না। ফারহানই বলতে থাকল, “তোকে বগলদাবা করে কোলে তুলে নিয়ে যেতে এসেছি। নাহলে তো বউকে ছেড়ে এক পা-ও নড়বি না।”
কে.ছি হাউজের প্রশস্ত ড্রয়িং রুমে তখন এক নিস্তব্ধ কর্মব্যস্ততা। কারান সামনের টি-টেবিলের ওপর পা দু-খানি তুলে দিয়ে কোলের ওপর ম্যাকবুক রেখে কাজ করছিল। ফারহানের ঠাট্টায় সে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না; তার সমস্ত মনোযোগ পর্দার কোডিং আর ডেটা অ্যানালাইসিসে নিবদ্ধ। ফারহান ফোনের অপর প্রান্তে নীরবতা দেখে ভাবল সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল কি না, কিন্তু পরক্ষণেই কারানের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, “I just received the email. Ibrahim has confirmed the meeting date.”
ফারহানের কণ্ঠে এবার প্রবল উত্তেজনা প্রকাশ পেল, “So that means we’re heading back to Dubai tomorrow, right?”
“এক মিনিট! বউ কল করেছে।”
বলেই কারান কলটি বিচ্ছিন্ন করে দিল। ফারহান ফোনের ওপাশে বিদ্রুপের হাসি হেসে ঠোঁট উঁচিয়ে ব্যঙ্গ করলো, “শালাকে এবার মাটির তলা খুঁড়েও পাওয়া যাবে না।”
মিরার কলটি আসতেই কারানের মুখাবয়বে অদ্ভুত প্রশান্তি আর হাসির রেখা প্রস্ফুটিত হলো। মিরা তখন তার পৈতৃক নিবাসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিশাচর আকাশের সৌন্দর্য অবলোকন করছিল। পূর্ণশশীর স্নিগ্ধ জ্যোৎস্না তার ললাটে আর কপোলে আছড়ে পড়ছে, যেখানে মিরা নিজেই এক জীবন্ত নক্ষত্র। পাশের গাছগুলো থেকে আসা হিমেল বাতাস তার উন্মুক্ত কেশরাশি নিয়ে খেলায় মেতেছে। সে নিজের অঙ্গে একটি নীলবর্ণ চাদর জড়িয়ে রাতের নিস্তব্ধতা উপভোগ করছিল।
“এতক্ষণে তবে আপনার আমাকে মনে পড়ার সময় হলো?”
মিরা হেসে মিহি সুরে উত্তর দিল, “Believe me, you stayed in the deepest corner of my memory all day.”
“মিথ্যে কেন বলছ?”
“সত্য বলছি। তোমাকে প্রতিটি পলে পলে ভীষণ মিস করেছি।”
কারান সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে এবার কিছুটা গম্ভীর হয়ে বলল, “তাহলে তো আপনি আমার শ্বশুরবাড়ির মানুষদের প্রতি অবিচার করেছেন, বেগম। যদি সেখানে গিয়েও আমাকেই মনে করেন, তবে যাওয়ার সার্থকতা কোথায়? আপনার তো উচিত ছিল প্রতিটি মুহূর্ত তাদের সান্নিধ্যে কাটানো, তাদের প্রতিটি ভাবনায় নিজেকে বিলীন করে দেওয়া। যাতে আপনার বিরহে তাদের যে দীর্ঘদিনের ক্ষত তৈরি হয়েছে, তা কিছুটা হলেও উপশম হয়।”
কারানের এই প্রাজ্ঞ আর উদার দৃষ্টিভঙ্গি মিরাকে মুগ্ধ করল। মানুষটি কেবল তাকেই ভালোবাসে না, বরং তার শেকড়কেও অগাধ সম্মান করে। মিরা প্রসঙ্গ পালটাতে আদুরে গলায় বলল, “জানিনা কেন, খুব ক্রেভিং হচ্ছে।”
“কারানকে খাওয়ার?”
মিরা শব্দ করেই হেসে বলল, “নো, হানি! হঠাৎই কেন জানি পিৎজা খাওয়ার তীব্র ইচ্ছা হচ্ছে। হয়ত আজ সারাদিন বাঙালি খাবার খাওয়ার ফলে!”
“এত রাতে?” বলতে বলতেই কারান সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। ম্যাকবুকটি বন্ধ করে টেবিলের উপর রেখে দিয়ে সে ক্ষিপ্র চরণে রান্নাঘরের দিকে অগ্রসর হলো। কে.ছি হাউজে থার্মোস্ট্যাটের কল্যাণে আরামদায়ক উষ্ণতা সবসময় বজায় থাকে, তাই বাইরের হাড়কাঁপানো শীত ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। কারানের ঊর্ধ্বাঙ্গ তখন সম্পূর্ণ উন্মুক্ত, কেবল পরনে একটি কালো ট্রাউজার।
সে নগ্ন দেহের ওপর একটি অ্যাপ্রোন জড়িয়ে নিল। পেছনে ফিতেটি বাঁধার সময় অ্যাপ্রোনের পাশ থেকে তার সুঠাম বক্ষপিঞ্জর আর পেশিবহুল পিঠের অংশ বিশেষ দৃশ্যমান হচ্ছিল। সে একে একে পিৎজার উপকরণগুলো বাছাই করতে শুরু করল।
মিরা বাম পাশ থেকে চাদরটি গায়ের সাথে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে নিল। বিষণ্ন হাসির রেখা তার অধরে ফুটিয়ে মৃদুস্বরে বলল, “হুম। তবে দুর্ভাগ্য এই যে, আমার উইশ পূরণ করতে এই নিশুতি রাতে কেউ পিৎজা প্রস্তুত করে বসে নেই।”
ওদিকে কারান তখন একনিষ্ঠ শিল্পীর মতো রন্ধনকলায় মগ্ন। একটি কাচের পাত্রে ময়দা, সামান্য শর্করা ও লবণের মিশ্রণে অতি সন্তর্পণে গরম জল ঢালছে সে। তার সুঠাম হাতের আঙুলগুলো নিপুণ দক্ষতায় ময়দা ও জলের সংমিশ্রণে এক স্থিতিস্থাপক ও মসৃণ ডো প্রস্তুত করল।
মিরা অধৈর্য হয়ে শুধালো, “ধুর, বোকার মতো কি সব বলছি! এসব প্রসঙ্গ থাক। এই, তুমি কিছু বলছ না যে বড়ো?”
কারান তখন পিৎজার রুটিতে টমেটো সসের প্রলেপ বিছিয়ে তার ওপর পনিরের শুভ্র আস্তরণ ছড়িয়ে দিচ্ছিল। একে একে ক্যাপসিকাম, ওলিভস, মাশরুম আর ওরেগানোর সুগন্ধি টপিংসগুলো দিয়ে সাজালো। সবশেষে জলপাই তেলের ছিটে দিয়ে ওভেনে পিৎজাটি ঢুকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল, “হুম্, শুনছি। বলো।”
মিরা ভ্রূ কুঞ্চিত করে অভিমানী স্বরে বলল, “এখন তো শুনছি বলবেন, আবার পরে সুযোগ পেলে বলবেন, আমি নাকি আপনাকে বিন্দুমাত্র মিস করি না!”
মিরার এই মান-অভিমানটুকু কারানের অন্তরে প্রশান্তির প্রলেপ দিল। সে কিচেন কাউন্টারের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল।
“বর্তমানে তুমি কোথায় আছ?”
“এত রাতে নিশ্চয়ই রাজপথে ডাকাতি করতে নামিনি! বাসা ছাড়া আর কোথায় থাকব, কারান?”
“ঘরের কোথায় অবস্থান করছ, আমি সেটা জানতে চেয়েছি।”
“ওহ, বারান্দায় আছি। কেন গো?”
কারান কোনো উত্তর দিল না। সে দ্রুত ড্রেসিং রুমে গিয়ে একটি টি-শার্ট আর চামড়ার জ্যাকেট গলিয়ে নিল। হাতে গাড়ির চাবি নিয়ে নিচে আসতেই দেখল পিৎজাটি তখন একদম প্রস্তুত।
গাড়িতে ওঠার আগে কারান ফোনের অপর প্রান্তে থাকা মিরাকে প্রশ্ন করল, “তার মানে আমার সহধর্মিণীকে এখন নিশীথ রাতের চাঁদ, উন্মুক্ত আকাশ আর প্রকৃতির রূপরাশি দেখতে পাচ্ছে, তাই তো?”
মিরা বারান্দার রেলিংয়ে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আড়চোখে আকাশের দিকে তাকাল। হেসে বলল, “এখন এটা বলো না যে, তুমি এই জড় প্রকৃতির ওপরও জেলাস হচ্ছ?”
কারান এক হাতেই গাড়ির স্টিয়ারিং ধরে চালাচ্ছিল। মিরার প্রশ্নটা শোনামাত্রই আঙুলগুলো স্টিয়ারিংয়ে শক্ত হয়ে গেল। চোয়ালটা শক্ত করে গম্ভীর, রুক্ষ কণ্ঠে বলল, “ভিতরে যাও।”
নিশুতি রাতের ২টা পেরিয়ে গেছে। শৈত্যের প্রকোপ এখন প্রবল। মিরা আর বিতর্কে না গিয়ে শয়নকক্ষে প্রবেশ করল, এবং ধপাস করে বিছানায় শুয়ে পড়ল। তার খোলা কেশরাশি এলোমেলো হয়ে আশেপাশে ছড়িয়ে গেল। সিলিংয়ের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে মিরা বলল, “হুকুম দেওয়ার সার্বভৌম অধিকার তো আমার থাকার কথা ছিল, মিস্টার; অথচ এখন নিজেই একনায়কতন্ত্র শুরু করেছেন।”
কারান তখন তার বুগাটি শিরনের স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে অত্যন্ত দ্রুতবেগে রাজপথ দিয়ে ছুটে চলছে। গম্ভীর স্বরে উত্তর দিল, “অধিকারের সেই দলিল তো তুমি নিজেই আমার হাতে সঁপে দিয়েছ, মহারানি। আমি সেনাপতির পদ নিয়ে সন্তুষ্ট হতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি নিজ হাতে আমাকে রাজার মুকুট পরিয়েছ। এখন এই রাজা যদি তার সাম্রাজ্যের অধিকার ভোগ করতে চায়, তবে তাকে রুখবে কে?”
কথা বলতে বলতেই ঘণ্টাখানেকের ব্যবধানে কারান মিরা মঞ্জিলের গেটে এসে পৌঁছাল। নিস্তব্ধ রাতকে চিড়ে হঠাৎ একটি গাড়ির হর্নের শব্দ ভেসে এলো। মিরা সচকিত হয়ে উঠল। শয্যা থেকে উঠে সে কৌতূহলী ও কিছুটা ভীত মনে আবারও বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। দোতলা থেকে নিচে দৃষ্টিপাত করতেই তার বিস্ময়ের সীমা রইল না; মনে হলো তার হৃৎপিণ্ড এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে গেছে।
দেখল, সেই পরিচিত বুগাটি শিরনের গায়ের সাথে হেলান দিয়ে কারান দণ্ডায়মান। এক হাত পকেটে গোঁজা, আরেক হাতের মুঠোয় ধরা ফোনটা কান থেকে মাত্র নামালো। কারান হালকা মাথা কাত করে তার অর্ধাঙ্গিনীর দিকে সম্মোহনী ও তীব্র আকাঙ্ক্ষাভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মিরা নিজের চোখ দুটি রগড়ে নিল, এটি কি কোনো মায়াবী বিভ্রম নাকি প্রগাঢ় বাস্তব?
কারান নিচ থেকেই দুই আঙুল অধরে ছুঁইয়ে একটি উড়ন্ত চুমু ছুঁড়ে দিয়ে নিজের ঘন ভ্রূ যুগল নাচাল।
মিরার বুকের ভেতরে তখন বসন্তের হাওয়া বইছে। উত্তেজনার আতিশয্যে তার অধরে মুহূর্তেই হাসি ফুটে উঠল। সে দ্রুত দুই হাতে মুখ চেপে নিজের উচ্ছ্বাস সংবরণ করল, এবং অঙ্গুলি নির্দেশ করে কারানকে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকতে ইশারা করল।
মিরা মাথায় ওড়না টেনে নিজেকে আবৃত করল। গায়ের চাদরটি নিবিড়ভাবে জড়িয়ে অতি সন্তর্পণে কক্ষ থেকে বেরিয়ে সে গৃহের দুয়ার পার হলো। সম্মুখে কারানকে দেখামাত্রই সমস্ত জড়তা বিসর্জন দিয়ে মিরা একছুটে গিয়ে তার প্রশস্ত বক্ষে আছড়ে পড়ল। কারানও এক অলৌকিক প্রশান্তিতে চোখ বুজে মিরাকে দুই বাহুর বন্ধনীতে পিষ্ট করল। বিচ্ছেদের মাত্র একটি দিন যেন তাদের কাছে একেকটি যুগান্তরের সমান ছিল; হৃৎপিণ্ডের প্রতিটি স্পন্দন যেন একজনেরটা অপরের জন শুনছিল।
দীর্ঘক্ষণ সেই নিবিড় আলিঙ্গনে আবদ্ধ থাকার পর মিরা নিজেকে কিছুটা মুক্ত করে অস্ফুট স্বরে শুধালো, “তুমি… এখানে মানে… কীভাবে কি?”
কারান কোনো মৌখিক উত্তর না দিয়ে বুগাটির জানালা দিয়ে হাত গলিয়ে সযত্নে রাখা পিৎজার বাক্সটি বের করে মিরার হাতে তুলে দিল। মিরা বিস্ময়ে বাগরুদ্ধ, তার মুখ আধ ইঞ্চি পরিমাণে খুলে গেছে; তার আয়ত নেত্র দুটি যেন কপালে ওঠার উপক্রম।অবিশ্বাসের সুরে বলল, “তু-তুমি… তুমি নিজ হাতে বানিয়েছ এটা?”
কারান কেবল উপর-নীচ হালকা মাথা নেড়ে নিঃশব্দে সম্মতি জানাল। মিরা আপ্লুত হয়ে পুনরায় কারানের গলায় দুই হাত প্যাঁচিয়ে সকৃতজ্ঞ চিত্তে বলল, “অসংখ্য ধন্যবাদ!”
কারান কেবল এক চিলতে রহস্যময় হাসি দিয়ে তার ভ্রূ যুগল হালকা উপরে তুলল। দুজনেই ক্ষণকাল একে অপরের চোখের গভীরে হারিয়ে রইল।
মিরা যখন পিৎজা হাতে বাড়ির ভেতরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল, তখনই তার ওড়নার প্রান্তে টান পড়ল। সে তৎক্ষণাৎ পেছনে ফিরে দেখল, কারান তার ওড়নার কিনারা নিজের হাতের মুঠোয় প্যাঁচিয়ে ধীরে ধীরে তাকে নিজের দিকে আকর্ষণ করছে। না চাইতেও মিরাকে পুনরায় সেই চৌম্বকীয় আকর্ষণে কারানের অতি সন্নিকটে ফিরে আসতে হলো।
“সাবধানে পা ফেলো। নাহলে সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে আমার স্বামীর পা ভাঙবে।”
কারান আক্ষেপের স্বরে বিড়বিড় করল, “কি কপাল আমার! জীবনে প্রথমবার শ্বশুরবাড়িতে আসলাম, তাও চোরের মতো!”
মিরার হাসি পেলেও সে নিজেকে সংযত রেখে টিপ্পনী কাটল, “এসব তোমারই কর্মফল! তখন কত অনুরোধ করলাম বাড়িতে আসার জন্য। সে আসবেই না। কাজের বাহার নিয়ে কত শত এক্সকিউজ!”
কথার মাঝপথেই হঠাৎ উপরতলার করিডোর থেকে কারো পদশব্দ শ্রুত হলো। মুহূর্তেই কারান ও মিরা সতর্ক হয়ে গেল। অন্ধকারের নিবিড় চাদরে একে অপরের চোখের ভাষা দেখা না গেলেও, উভয়ের অন্তরে তখন আতঙ্কের হিল্লোল বয়ে যাচ্ছে। দুজনেই সিঁড়ির পাশের দেয়ালের সাথে টিকটিকির ন্যায়ে সেঁটে রইল। কারান অতিরিক্ত সুরক্ষার খাতিরে মিরার সামনে এক হাত দিয়ে আড়াল তৈরি করল। মিরার প্রাণ তখন যায় যায় অবস্থা, চোখ দুটি বিস্ফোরিত; সে নিশ্বাস বন্ধ করে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। কারণটা এই যে, দুর্ভাগাবশত, কারানের হাতের অবস্থান ছিল ঠিক মিরার বক্ষস্থলের ওপর। মিরার শ্বাসরোধের ব্যাকুলতা অনুভব করে কারান অন্ধকারের মাঝেও বাঁকা হাসল।
সে মুখটি মিরার কানের কাছে নামিয়ে নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “এভাবে নিশ্বাস বন্ধ করে রাখলে মরে যাবে তো, আমার বউ!”
Tell me who I am 2 part 14
ভয়ের মাঝে এমন নির্লজ্জ রসিকতায় মিরা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। সে এক ধাপ নিচে দাঁড়িয়ে থাকা কারানের পায়ে সজোরে এক পদাঘাত করল। যন্ত্রণায় কারানের মুখ বিকৃত হয়ে গেলেও সে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে আর্তনাদ চেপে রাখল। মিরার বুক থেকে হাত সরিয়ে নিজের ব্যথাতুর পা-টি চেপে ধরল।
ঠিক সেই মুহূর্তে আব্দুর রহমান ছায়াচ্ছন্ন বারান্দা থেকে নিজের শয়নকক্ষের দিকে পা বাড়াতে যাচ্ছিলেন।
এমন সময় কারান হঠাৎই মুখ ফসকে বলে উঠল, “আসসালামু আলাইকুম, বাবা।”
