Home Tell me who I am 2 Tell me who I am 2 part 15 (2)

Tell me who I am 2 part 15 (2)

Tell me who I am 2 part 15 (2)
আয়সা ইসলাম মনি

“ওয়া আলাইকুমুস সালাম।” প্রাত্যহিক অভ্যাসবশত শব্দগুলো উচ্চারণ করেই আব্দুর রহমান স্থবির হয়ে পড়লেন। সংবিৎ ফিরে পেয়ে দ্রুত ঘাড় ফেরালেন তিনি।
ভ্রূ কুঞ্চিত করে করিডোরের আলোটা জ্বালিয়ে দিলেন। প্রখর আলোয় চারপাশটা স্পষ্ট হতেই গম্ভীর কণ্ঠে শুধালেন, “কে ওখানে?”
ততক্ষণে মিরা অত্যন্ত ক্ষিপ্রতায় কারানকে নিয়ে নিজের শয়নকক্ষে অন্তর্হিত হয়েছে। আব্দুর রহমানের সংশয় কাটল না; তার অভিজ্ঞ কান জোড়া কোনো আগন্তুকের পদধ্বনি কিংবা অস্ফুট স্বর শুনেছে। তিনি দ্রুতপদে মিরার ঘরের দিকে অগ্রসর হলেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখলেন মুখে কৃত্রিম হাসির প্রলেপ টেনে মিরা দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

যদিও ললাটে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘর্মকণা তার স্নায়বিক চাপের সাক্ষ্য দিচ্ছিল। আব্দুর রহমান বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করলেন, “তুই… তুই এখনো জাগ্রত, মা?”
মিরা আমতা আমতা করে মিথ্যার আশ্রয় নিল, “ওই… আসলে ভীষণ তৃষ্ণা পেয়েছিল বাবা, গ্লাসে পানি শেষ হয়ে গিয়েছিল, তাই রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছিলাম।”
“তাই বল। কিন্তু আমি যেন কারো অস্ফুট কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম বলে মনে হলো।”
মিরা তাৎক্ষণিক কোনো প্রত্যুত্তর খুঁজে না পেয়ে বিচলিত হয়ে মাথা চুলকাতে লাগল। অতঃপর হুট করেই বলে বসল, “ও-ওটা আসলে আমিই ছিলাম, বাবা। আপনমনেই কথা বলছিলাম।”
আব্দুর রহমান সামান্য সন্দিহান হলেও এ নিয়ে আর অধিক কৌতূহল দেখালেন না। স্মিত হেসে মেয়ের মাথায় স্নেহের পরশ বুলিয়ে বললেন, “রাত অনেক গভীর হয়েছে। এবার বিশ্রামে যান, আম্মাজান।”

তিনি প্রস্থান করতেই মিরা দ্রুত কক্ষে ঢুকে কপাট বন্ধ করে দিল। বুকে হাত দিয়ে কিছুক্ষণ দীর্ঘ দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলতে থাকলো। ধকধক করে বাড়তে থাকা হৃৎস্পন্দনের শব্দ বোধ হয় মিরা নিজেও শুনতে পাচ্ছে। চোখ তুলে সামনে তাকিয়ে দেখল, কারান শয্যার ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে তার দিকে কৌতুকপূর্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। কারানের ওষ্ঠাধরে হাসির রেখা স্পষ্ট না হলেও তার নীলাভ নয়নজোড়া যেন হাসিতে ফেটে পড়ছে। ভয়ে যেখানে তার প্রাণ যায় যায় অবস্থা, সেখানে কারান কিনা মনে মনে হাসছে! মিরার রোষানল তখন তুঙ্গে; সে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে বাঘিনির ক্ষিপ্রতায় কারানের উদরের ওপর আরোহণ করল, এবং তার সুগঠিত বক্ষে এলোপাথাড়ি ছোট ছোট কিল-ঘুসি বর্ষণ করতে লাগল। কারান শারীরিক যাতনা অনুভব করলেও অট্টহাসি দমন করার আপ্রাণ চেষ্টায় তার মুখাবয়ব আরক্তিম হয়ে উঠল; গৃহবাসীদের সতর্ক উপস্থিতির কথা ভেবে সে কেবল নিঃশব্দে অধর কামড়ে মিরার এই মিষ্ট প্রহার উপভোগ করতে লাগল।

কিছুক্ষণ তাণ্ডব চালিয়ে মিরা হাঁপাতে হাঁপাতে একসময় শ্রান্ত হয়ে পড়ল। ভ্রূ কুঞ্চিত করে বুঝল এই পাথুরে মানবকে শারীরিক আঘাত করা আর অরণ্যে রোদন করা, একই কথা। অবশেষে মিরা এক পরাজিত সৈনিকের ন্যায় তার ওপর থেকে নেমে গেল। এরপর সে অত্যন্ত মনোযোগী ভঙ্গিতে পিৎজার বাক্সটি উন্মোচন করল। এই বিশেষ আহার্যের সুঘ্রাণে ঘরটা ম ম করছে। এক টুকরো পিৎজায় কামড় দিয়ে সে মুক্ত জানালার পানে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল। ঝিরঝিরে বাতাস আর স্বামীর স্বহস্তে প্রস্তুতকৃত খাবারের ঘ্রাণ মিলিয়ে এক অপার্থিব প্রশান্তি তাকে আচ্ছন্ন করল। কারান তখনো শয্যায় এক হাত মাথার নিচে দিয়ে মিরার ভোজন ভঙ্গি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল।
বাইরে অমাবস্যার রিক্ততা ভেদ করে নক্ষত্রের মৃদু আলো আসছিল। মিরা সেই দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে যান্ত্রিকভাবে খেতে লাগল।

বেশ কিছুক্ষণ একটি পিনপতন নীরবতা বজায় রইল।
সহসা কারান উঠে দাঁড়িয়ে এক ঝটকায় জানালার পর্দাটা টেনে দিল। মিরার ধ্যানে ব্যাঘাত ঘটল; সে বিস্ময় বিস্ফোরিত নেত্রে কারানের দিকে তাকাল।
কারান ধীরপদে অগ্রসর হয়ে মিরার দুপাশে বিছানার উপর হাত রেখে তার ওপর ঝুঁকে এলো। তাদের মধ্যবর্তী দূরত্ব তখন কয়েক মিলিমিটারে এসে ঠেকেছে। কারানের তপ্ত নিশ্বাস যখন মিরার কপোলে আছড়ে পড়ছে, তখন মিরা প্রথমবার আলাদা ধরনের শিহরন অনুভব করল। মিরা বুঝতে পারল না কেন এই মানুষটির চোখের নীল রং হঠাৎ তামাটে আগুনের রূপ নিয়েছে।
কারান আরও কিছুটা ঝুঁকে এল। মিরার গ্রীবাদেশে তখন প্রবল কম্পন অনুভব হলো। কারান খুব নিচুভাবে ভারী স্বরে বলল, “ওই স্টারলিট স্কাই কি আমার থেকেও বেশি চার্মিং?”
মিরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে কিঞ্চিৎ মাথা উঁচিয়ে পালটা প্রশ্ন করল, “সরি?”
কারান তার চোখের দিকে তীক্ষ্ণভাবে তাকিয়ে শীতল কণ্ঠে বলল, “আমি লক্ষ্য করছি সেই কখন থেকে তুমি আউটসাইডে তাকিয়ে আছো। ইফ দ্য ভিউ ইজ সো গ্রেট, তাহলে এই রিস্ক নিয়ে আমি কেন এলাম? অ্যাম আই নট ইনাফ টু বি ইওর এন্টায়ার ইউনিভার্স?”

কারানের প্রচ্ছন্ন অভিমানের অর্থ অনুধাবন করতে না পেরে মিরা একরাশ প্রশ্নসূচক দৃষ্টি নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। কারান তার চিবুকটি ধরে ঈষৎ উঁচু করে বলল, “এতটা ইমম্যাচিউর তো তুমি নও, মিরা। পিৎজা তো জাস্ট একটা লেম এক্সকিউজ। মূলত আমি আমার অর্ধাঙ্গীকে নিভৃতে দেখতে এসেছি। এই সাধারণ মনস্তত্ত্বটুকুও কি তোমার ছোট্ট ব্রেইন বুঝতে পারছে না?”
শেষ কথাটা বলার সময় সে মিরার মাথার একপাশে তর্জনী ঠুকতে থাকলো।
মিরা অক্ষিপল্লব বুঝিয়ে একটি দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করল। যখন সে পুনরায় তাকালো, তখন তার চোখে স্পষ্ট ক্লান্তির ছাপ। কারান কি বোঝে না যে, তার এই আচমকা মেজাজের পরিবর্তন মিরার স্নায়ুর ওপর কতটা চাপ সৃষ্টি করে? সে সবই বোঝে, তবুও কেন এই অবুঝপনা?
সে মৃদুস্বরে মিনতি করল, “প্লিজ কারান, ব্যাক টু হোম। কেউ যদি এই অসময়ে তোমাকে এখানে আবিষ্কার করে, বিষয়টা আমার জন্য ভীষণ এমব্যারেসিং হবে।”

কারান এক ভ্রূ তুলে অবজ্ঞার সুরে বলল, “হোয়াই? আমি কি কোনো স্ট্রেঞ্জার? পরপুরুষ?”
মিরার ধৈর্যের বাঁধ এবার ভাঙার উপক্রম। কারান সব জেনেও কেন যে এমন অবুঝের অভিনয় করে, তা তার বোধগম্য নয়। এদিকে কারান পরম আবেশে বিছানায় রাখা নিজের হাতটি তুলে মিরার কপালে লেপ্টে থাকা কেশগুচ্ছ সযত্নে সরিয়ে দিতে লাগল। অথচ কারানের এই অতর্কিত কোমলতাও মিরার চিত্তে কোনো প্রভাব ফেলতে পারল না। সে বিরক্তিভরে কারানের হাতটি সরিয়ে দিয়ে শয্যা ত্যাগ করতে চাইল।
কিন্তু কারান অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে মিরাকে পুনরায় শয্যায় শায়িত করে দিল। তার সবল বাহুদ্বয় মিরার দুপাশে স্তম্ভের মতো গেড়ে বসে তাকে এক প্রকার অবরুদ্ধ করে ফেলল। মিরার চোখে তখন বিরক্তির লেশ।
কারান সম্মোহনী চাহনিতে মিরার মুখাবয়ব নিরীক্ষণ করতে করতে ফিসফিস করে বলল, “আমি তোমার মনস্তত্ত্ব এবং শারীরতত্ত্বের প্রতিটি সূক্ষ্ম বিষয় সম্পর্কে অবগত, সুইটহার্ট। এমনকি তুমি নিজেকে যতটা চেনো, তার চেয়েও বেশি আমি তোমাকে এক্সপ্লোর করেছি।”
মিরা বিদ্রুপের সাথে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল, “হ্যাঁ, নিশ্চয়ই! অনেক জ্ঞান যে আপনার!”
“ডোন্ট ইউ বিলিভ মি? আমি তো এটাও জানি আমাদের কতবার ইনটিমেসি হয়েছে।”
মিরার কর্ণে কথাটি প্রবেশ করতেই সে বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো কারানের দিকে চাইল। অস্ফুট স্বরে বলল, “কী? তুমি কি এগুলোও কাউন্ট করেছ নাকি?”

“টু হান্ড্রেড নাইন্টিন টাইমস।”
“হাহ! আন্দাজে।”
কারান অধরে দুষ্টু হাসি মেখে ঝুঁকে এসে তার কানের কাছে ফিসফিস করে আওড়ালো, “সো, লেটস মেক ইট টু হান্ড্রেড টুয়েন্টি?”
মিরা বুঝতে পারল কারান কেবল তার মেঘাচ্ছন্ন মনকে প্রফুল্ল করার জন্যই এই অযৌক্তিক তর্কে লিপ্ত হয়েছে। তবুও সে কৃত্রিম গাম্ভীর্য বজায় রেখে কারানের বলিষ্ঠ বক্ষে সজোরে ধাক্কা দিয়ে ওঠার চেষ্টা করে বলল, “ধুর, অসহ্য! সরো তো এখান থেকে।”
কিন্তু আকস্মিকভাবেই কারান মিরাকে জড়িয়ে ধরল। এই অতর্কিত আলিঙ্গনে মিরা দস্তুরমতো থমকে গেল। প্রথমে স্পর্শটি লঘু হলেও পরক্ষণেই কারান তাকে সরীসৃপের ন্যায় আষ্টেপৃষ্ঠে প্যাঁচিয়ে ধরল। তার পুরো অস্তিত্ব এখন কারানের একচ্ছত্র আধিপত্যে। মিরার শ্বাস-প্রশ্বাসের গতিবেগ ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে লাগল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই আকস্মিক আলিঙ্গন মিরার ভেতরে অতীন্দ্রিয় প্রশান্তি এনে দিল। তার অধরপ্রান্তে এক চিলতে স্নিগ্ধ হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে-ও কারানের কাঁধে চিবুক রেখে তাকে দু হাতে জড়িয়ে ধরল, যদিও কারানের সেই সুগঠিত বলিষ্ঠ পিঠের সম্পূর্ণটা তার ক্ষুদ্র হাত দুটোর সীমানায় এলো না।
প্রায় অর্ধঘণ্টা সময় এভাবেই নিস্তব্ধতায় অতিবাহিত হলো। নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে কারান অতি সন্তর্পণে ডাকল, “মিরা।”

“হুম?”
“আগামীকাল আমি দুবাই যাচ্ছি। সেই ইনকমপ্লিট মিশনটা সাকসেসফুলি শেষ করতে।”
মিরা কারানের কেশরাশির মধ্যে আঙুল চালাতে চালাতে পরম মমতায় বলল, “দোয়া করি তোমার অভিযান সফল হোক। আপন নীড়ে বীরের বেশে ফিরে এসো, মাই হার্ট।”
কারানের অধরে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। মিরার এই নিঃশর্ত সমর্থন আর আশ্রটুকুই তার জীবনের পরম সঞ্চয়। সে মিরাকে আরও নিবিড়ভাবে আঁকড়ে ধরল। প্রথমবারের মতো এক অজ্ঞাত আশঙ্কা কারানের বীরত্বগাথা হৃদয়ে হানা দিচ্ছে। ইব্রাহিমের সেই দানবীয় আধিপত্য আর দুর্ভেদ্য ক্ষমতার বিরুদ্ধে এই লড়াই যে কতটা কঠিন হবে, তা তার অজানা নয়। তাই দুবাই যাত্রায় সে এই দীর্ঘসূত্রতা অবলম্বন করেছিল। তার অবচেতন মনে একটি প্রশ্নই বিঁধছিল, যদি সে আর ফিরে না আসে, তবে এই নিষ্ঠুর ও বৈরী পৃথিবীতে মিরাকে আগলে রাখবে কে?
কারানের উষ্ণ নিশ্বাস মিরার গ্রীবাদেশে আছড়ে পড়ছিল। মিরা সেই আলিঙ্গনে কোনো কামুকতা নয়, বরং এক চরম আর্তি ও কোমলতা খুঁজে পেল। কিন্তু তবুও নিজের মনের এই নেতিবাচক ভাবনার জট ছাড়িয়ে মিরা আরও দৃঢ়ভাবে কারানকে জড়িয়ে ধরল।

মমতাজ বেগমের দুচোখে তখন আগ্নেয়গিরির লাভা যেন টগবগ করে ফুটছে। অস্ফুট স্বরে ঘৃণাভরে আওড়ালেন, “কত্ত বড়ো জা’নোয়ার! আমার মেয়ের ঘরে, খাস শয্যায় নিঃসঙ্কোচে শুয়ে আছে! কার ঘর ভেবে এমন স্পর্ধা দেখালো এই বাদর? আর ঢুকলোও বা কীভাবে?”
জানালার কপাট দুটো খোলা দেখে তার ললাটে চিন্তার ভাঁজ আরও প্রগাঢ় হলো। পরিস্থিতির আকস্মিকতায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ভাবলেন, “তার মানে জানালা বেয়ে উঠেছে। চোর নয়তো? মিরুটা বোধ হয় আত্মরক্ষার্থে মাথায় বারি মেরে অজ্ঞান করে রেখেছে। তোর বাকি ব্যবস্থা আমি করছি রে, লেওড়ার পুত।”
পরনের শাড়ির আঁচলটা সজোরে টেনে কোমরে কষে নিলেন তিনি। রণচণ্ডী মূর্তিতে আশেপাশে কোনো জুতসই অস্ত্র না পেয়ে দরজার অন্তরালে রাখা জীর্ণ ঝাড়ুটাকেই তুলে নিলেন।
আপনমনে আওড়ালেন, “আজ ঝাঁটা মেরে তোকে তোর মামার বাড়ি পাঠাবো, হতচ্ছাড়া!”
হাতের মুষ্টি দৃঢ় করে শয্যার দিকে অগ্রসর হয়ে যেই না আঘাত করতে উদ্যত হয়েছেন, অমনি এক আর্তনাদে ঘরটা কেঁপে উঠল, “মা! ও কারান!”

মিরার আকাশফাটানো চিৎকারে কারানের তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাবটা কর্পূরের মতো উড়ে গেল। চোখের পলক মেলতেই দেখল সাক্ষাৎ যমদূতের মতো শাশুড়ি মা মাথার ওপর ঝাড়ু উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কারান এক লম্ফে শয্যা ত্যাগ করে উঠে বসল। মমতাজ বেগম মুহূর্তেই পাথরের মূর্তিতে রূপান্তরিত হলেন।
ওদিকে মিরার হৃৎপিণ্ড তখন কামারের হাপরের মতো ওঠানামা করছে। আসন্ন এক লঙ্কাকাণ্ড আর গৃহস্থালির চরম কেলেঙ্কারি থেকে অল্পের জন্য সে রক্ষা পেয়েছে। কারান আর মমতাজ, দুজনেই তখন বিস্ফারিত নেত্রে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে আছে।
মিরা শুভ্র থ্রিপিসে বাথরুমের চৌকাঠে দাঁড়িয়ে, হাতে তার সিক্ত তোয়ালে। ফ্রেশ হয়ে কেবল মুখটা মুছতে বেরোতেই এমন এক পরাবাস্তব দৃশ্যের সাক্ষী হতে হলো তাকে।
সহসা মমতাজ বেগমের চেতনার উদয় হলো। হাতের ঝাড়ুটা দ্রুত সজোরে দূরে নিক্ষেপ করে অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে মেয়ের দিকে তাকালেন। মিরাও নিজের বোকামিতে কপালে হাত দিয়ে কতগুলো চাপড় মারলো। ভোরের আলো ফুটতেই জানালার পর্দা সরানো, পুষ্পবৃক্ষে জলসেচন আর সদর দরজার ছিটকিনি উন্মুক্ত করা তার প্রাত্যহিক রুটিন। কিন্তু অভ্যাসবশত আজও যে সে খিলটা খুলে রেখেছে, তা তার বিস্মৃতিতে তলিয়ে গিয়েছিল।
পৌষের এই হাড়কাঁপানো শীতে মমতাজ বেগম সাধারণত সাড়ে পাঁচটার আগে শয্যা ত্যাগ করেন না। এখন সবে পঞ্চিকা অনুযায়ী পাঁচটা বাজে। কারান বড়োজোর এক ঘণ্টা হলো নিদ্রাচ্ছন্ন হয়েছে। মিরা চেয়েছিল জামাইকে সুকৌশলে ঘর থেকে বিদায় দিয়ে তারপর দিনের কাজ শুরু করবে। কিন্তু কপাল!
মমতাজ বেগম আজ অকারণেই দ্রুত উঠে পড়েছিলেন। মিরার কক্ষের আলো দেখে ভেবেছিলেন গল্পে মশগুল হবেন। সেই সরল আকাঙ্ক্ষাই এখন এক বিটকেল পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে।
কারান মুহূর্তের মধ্যেই নিজেকে সামলে নিয়ে কিঞ্চিৎ আমতা আমতা করে বলে উঠল, “আহ–আসসালামু আলাইকুম, মা! সুপ্রভাত!”

মমতাজ বেগম কিংকর্তব্যবিমূঢ় হলেও সৌজন্যবোধ হারাননি। কোমরের আঁচল সলজ্জে মাথায় তুলে দিয়ে কম্পিত স্বরে উত্তর দিলেন, “ওয়া–ওয়ালাইকুমুস সালাম, বা… বাবা! তুমি? মানে তুমি এখানে কি করে…”
বাক্যটি অসমাপ্ত রেখেই তিনি মিরার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন। মিরা কালক্ষেপণ না করে দ্রুত এগিয়ে এসে পিছন থেকে মায়ের দু কাঁধে দু-হাত রেখে বাইরের দিকে এগোতে এগোতে বলল, “মা, আসলে ব্যাপারটা হয়েছে কি…”

খাবারের টেবিলে তখন হাসির মৃদু হিল্লোল বয়ে যাচ্ছে, যা ভোরের সেই অপ্রস্তুত পরিস্থিতির গুমোট ভাবটাকে অনেকটাই লঘু করে দিয়েছে। ইলিজার অনুপস্থিতি অবশ্য কারোরই নজর এড়ায়নি; নিদ্রাদেবীর একনিষ্ঠ উপাসক হিসেবে তার খ্যাতি পরিবারে সর্বজনবিদিত। এদিকে কারান আড়ষ্টতা অনুভব করলেও সেটাকে পৌরুষোচিত গাম্ভীর্যের আবরণে ঢেকে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। শ্বশুরবাড়ির আঙিনায় নিজের ব্যক্তিত্বের বিচ্যুতি ঘটানো তার স্বভাববিরুদ্ধ।
মমতাজ বেগম সযত্নে ভাজা একটি ঘৃততপ্ত পরোটা কারানের পাত্রে তুলে দিতে উদ্যত হতেই কারান কুণ্ঠিত স্বরে বলে উঠল, “মা, আসলে…”
শাশুড়ির পরম মমতা মাখা হাতটিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা কারানের পক্ষে অসম্ভব ছিল। তার এই দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থা আঁচ করতে পেরে পাশে বসা মিরা বেশ সাবলীলভাবেই বলল, “ওকে পাউরুটি আর জ্যাম দাও, মা। পরোটায় তেল তো, ও অয়েলি খাবার খেতে অভ্যস্ত নয়।”
মমতাজ বেগম সস্নেহে মাথা নেড়ে যেই না রুটির পাত্রটির দিকে হাত বাড়ালেন, অমনি কারান শিষ্টাচার প্রদর্শন করে আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। বিনীত ভঙ্গিতে বলল, “আপনি দয়া করে বসুন, মা। আমি নিজের প্রয়োজনমতো সার্ভ করে নিচ্ছি।”

কারানের এই অমায়িক ব্যবহারে মমতাজ বেগমের মনটা তৃপ্তিতে ভরে উঠল। তিনি একবার আড়চোখে পতিদেব আব্দুর রহমানের দিকে তাকালেন। প্রথম দর্শনেই এই সুঠাম ও মিষ্টভাষী যুবকটির ব্যক্তিত্ব তাদের মুগ্ধ করেছিল। তবে কারানের আকস্মিক উপস্থিতিতেও আব্দুর রহমানের মধ্যে বিশেষ কোনো চাঞ্চল্য লক্ষ্য করা গেল না।
তিনি ধীরস্থিরভাবে আলুর দমের সাথে পরোটার টুকরোটি মুখে পুরে বেশ রসিয়ে বললেন, “গত রাতে কারানের কণ্ঠস্বর যখন শুনলাম, তখনই আমি নিশ্চিত হয়েছিলাম যে আমাদের জামাতা বাবাজির পদধূলি পড়েছে।”
মিরার কর্ণমূল তখন লজ্জায় আরক্তিম। অন্যদিকে কারান নির্বিকার ভাব বজায় রেখেছে। সে জানে, এই মুহূর্তে বিন্দুমাত্র অপ্রস্তুত হলে পুরো পরিবার তাকে নিয়ে হাস্যরস শুরু করবে। মিরা যখন আরক্ত মুখে কারানের দিকে দৃষ্টিপাত করল, কারান তখন জগতের তাবৎ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ দিয়ে গভীর মনোযোগে রুটিতে জ্যাম লেপন করছে।
মমতাজ বেগম আফসোসের সুরে বললেন, “তুমি একটা খবর দিয়ে এলে না, বাবা! আপ্যায়নের কোনো বিশেষ আয়োজনই তো করার সময় পেলাম না।”

“আপনি বিচলিত হবেন না, মা। আমার হাতে সময় অত্যন্ত লিমিটেড, বেশিক্ষণ থাকা যাবে না। অন্য কোনো সময় শিডিউল করে আয়েশ করে আড্ডা দিতে আসব।”
কারানের এই পেশাদারি গাম্ভীর্য দেখে মমতাজ ও আব্দুর রহমান পরস্পরের দিকে চাইলেন। আব্দুর রহমান কারানের কাঁধে হাত রেখে অনুরোধের সুরে বললেন, “আজকের দিনটা কি কোনোভাবেই থাকা যায় না?”
কারান শ্রদ্ধার সাথে শ্বশুরের হাতের ওপর নিজের হাতটি রাখল।
“বাবা, আমার এই যৎসামান্য দেরি হওয়ার অর্থ হলো কয়েকশো জীবনের অস্তিত্ব সংকটে পড়া।”
এই রূপকধর্মী বাক্যের গূঢ় রহস্য কেউই অনুধাবন করতে পারল না। মিরাও বেশ কৌতূহলী চোখে কারানের দিকে চাইল। কারান তখন দৃষ্টি অবনত করে বিষয়টি খোলাসা করল, “অফিশিয়াল কাজে আমাকে দুবাই যেতে হবে। অন টাইমে কাজটা না করলে অনেকের স্যালারি আসবে না, আর তাহলে তাদের ফ্যামিলি সারভাইভ করতে পারবে না। মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারে অন্নসংস্থান বন্ধ হওয়া তো কাইন্ড অফ ডেথই হলো।”
সবাই স্তব্ধ হয়ে কারানের দায়িত্ববোধের কথা শুনল। তারা উপলব্ধি করল, কারান কেবল একজন আদর্শ স্বামীই নয়, বরং একজন বিচক্ষণ ও মানবিক নেতা। আব্দুর রহমানের মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। তিনি পরম মমতায় কারানের মস্তকে হাত রেখে আশীর্বাদ করলেন, “তোমার কর্মনিষ্ঠা অক্ষুণ্ন থাকুক। আল্লাহ তোমার প্রতিটি পদক্ষেপে সফলতা দান করুন।”
কারান মাথা নেড়ে মৃদু হাসল।

বিদায়ের বিষণ্নতা যখন ঘনীভূত হচ্ছে, ঠিক তখনই ইলিজার চপলতা যেন এক পশলা বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ল। নাছোড়বান্দা ইলিজা মিরাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “না আপু, দিস ইজ নট ফেয়ার। এভাবে ফুরুত করে এসে সুরুত করে চলে যাবে, আর আমি সেটা মেনে নেব? কখনোই না!”
ইলিজার এই শাশ্বত কৈশোরসুলভ হঠকারিতা দেখে মিরা ম্লান হেসে ওর হাত দুটি নিজের হাতের মুঠোয় নিল। পরম মমতায় বলল, “আবার আসবো তো, বাবা। এমন করে না, সোনা।”
কিন্তু ইলিজা মিরার কটিদেশ জাপটে ধরে অনেকটা দাবির সুরেই বলল, “উঁহুঁ! ভাইয়া যেতে চায় যাক, হি ইজ এ বিজি ম্যান, সেটা মানা যায়। কিন্তু তুমি যেতে পারবে না। ইশ, তোমাকে নিয়ে কতগুলো প্ল্যান করে রেখেছি! কোনো এক্সকিউজ শুনছি না আমি, তুমি যাচ্ছ না মানে যাচ্ছ না। ব্যাস!”
মিরা এবার নিরুপায় হয়ে পিছনের দিকে মাথা ঘুরিয়ে কারানের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। কারান তখন হাত দুটি বক্ষস্থলে ভাঁজ করে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে গম্ভীর মুখাবয়বে দাঁড়িয়ে আছে। কারণ এই দুই বোনের আবেগঘন সিস্টারহুডের মাঝে তার অনুপ্রবেশ অনেকটা অপ্রাসঙ্গিক। তাই সে কেবল একজন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে।

ঠিক সেই মুহূর্তে মমতাজ বেগম মিরার কাঁধে হাত রাখলেন। মিরা আর্তি জানিয়ে বলল, “দেখো মা, মাহিটা কেমন পাগলামি করছে! ও এভাবে আটকে রাখলে আমি বেরোবো কী করে?”
মমতাজ বেগমও বিচ্ছেদের আশঙ্কায় ম্লান মুখে বললেন, “আর কয়েকটা দিন থেকে গেলেই তো পারতিস, মা। পরে তোর বাবা নাহয় তোকে ও বাড়িতে দিয়ে আসতেন।”
“ইচ্ছে তো আমারও ছিল, কিন্তু এখন ফিরে যাওয়াটা আমার জন্য অন্তত জরুরি। কিছু অমীমাংসিত রহস্য উন্মোচন করা প্রয়োজন, যা আমাকে মানসিকভাবে ডিস্টার্ব করছে। আর সত্যটা না জানা পর্যন্ত আমি শান্তি পাচ্ছি না।”
“কী সব দুর্বোধ্য কথা বলছিস, মা?”
“তোমাকে অত চিন্তা করতে হবে না। আপাতত কারানের সাথেই যাই। তুমি মাহিকে একটু বোঝাও, ও আমাকে একরকম জিম্মি করে রেখেছে, দেখো!”
মমতাজ বেগমের দীর্ঘশ্বাসটি শীতের বাতাসের চেয়েও ভারী ছিল। মেয়ের প্রস্থান সংবাদে তার মাতৃসুলভ হৃদয়টা খাঁ খাঁ করে উঠল। তবুও পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে তিনি ইলিজার কাঁধে হাত রেখে বললেন, “ছেড়ে দে ওকে, মাহি। ও তো আবার আসবেই। তুই যেভাবে ওকে শক্ত করে ধরে আছিস, বেচারি মেয়েটা আমার পড়ে যাবে তো!”
ইলিজার দু-চোখ তখন অশ্রুসিক্ত। সে রুদ্ধকণ্ঠে বলল, “না। আমি কারো কথা শুনছি না। তোমরা কেউই আমার ইমোশন বোঝো না। আপুকে নিয়ে শপিং করব, হ্যাংআউট করব—সব প্ল্যান এভাবে স্পয়েল হয়ে যাবে?”
বোনের এই অকৃত্রিম ব্যাকুলতা দেখে মিরার চোখের কোণেও অশ্রুর কণা চিকচিক করে উঠল। সে নিচু হয়ে ইলিজার অশ্রুভেজা মুখখানি দুই হাতে আবদ্ধ করে ললাটে এক গভীর চুমু খেল। প্রবোধ দিয়ে বলল, “পরের বার আসার আগে একটা বিশদ লিস্ট করে রাখবি, কোথায় যাবি আর কী কী শপিং করবি। সেবার আর সহজে যাচ্ছি না। পেত্নীর মতো তোর ঘাড়ে চেপে সারা পৃথিবী ঘুরবো।”

ইলিজা ভেজা গলায় একটু হেসেই আবার অভিমানের স্বরে বলল, “খুব অভিমান করেছি, আপু। কত বছর পর এলে! পরের বার তুমি আসতে আসতে দেখবে আমি ইন্না-লিল্লাহ হয়ে ওপারে চলে গেছি। ইউ ডোন্ট লাভ মি অ্যাট অল! যাও, চলেই যাও।”
সে মুখ ফিরিয়ে নিল। বোনের এই অভিমানী প্রলাপ শুনে মিরা এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তাকে নিবিড়ভাবে আলিঙ্গন করল। ইলিজাও তার অস্তিত্বের সবটুকু শক্তি দিয়ে বোনকে আঁকড়ে ধরল, পাছে এই বুঝি সে হারিয়ে যায়। কিছুক্ষণ এই নীরব আলিঙ্গন শেষে মিরা আলতো করে ইলিজার গালে চুমু খেয়ে কৌতুক করে বলল, “পরের বার এসে তোর বিয়ের ব্যবস্থা করবো ভাবছি। আমার লিটল সিস্টার যে আর ছোট নেই, বড়ো হয়ে গেছে!”
মিরার কৌতুকময় মন্তব্যটি যেন জাদুর মতো কাজ করল; ইলিজার ঘনঘোর অভিমান নিমেষেই কর্পূরের মতো উবে গিয়ে সেখানে লজ্জার আরক্তিম আভা ফুটে উঠল। মমতাজ বেগম দুই কন্যার এই চিরায়ত মধুর খুনসুটি দেখে সজল চোখে মৃদু হাসলেন। মিরা এবার ধীরপদে মায়ের নিকট অগ্রসর হয়ে তাকে আলিঙ্গনাবদ্ধ করল। মমতাজ বেগম জামাতার উপস্থিতিতে নিজের মাতৃত্বসুলভ দুর্বলতা প্রকাশ করতে চাইলেন না ঠিকই, কিন্তু চোখের কার্নিশে জমে থাকা অশ্রুবিন্দুগুলো তার অবাধ্য হয়ে উঠল। তিনি মিরাকে নিবিড়ভাবে বক্ষে চেপে ধরে তার ললাটে ও কপোলে বারবার চুম্বনের পরশ এঁকে দিলেন।

ঠিক সেই মুহূর্তে পারিবারিক এই আবেগঘন আবহে যুক্ত হলেন গৃহকর্তা আব্দুর রহমান। তিনি নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন; তার অবয়বে গাম্ভীর্য বিরাজ করলেও অন্তরে যে বিরহের সমুদ্র গর্জন করছে, তা তার স্থির দৃষ্টিই বলে দিচ্ছিল। মিরা জানে, তার পিতা কখনোই প্রকাশ্যে আবেগ প্রদর্শন করেন না। তাই সে নিজেই এগিয়ে গিয়ে পিতাকে জড়িয়ে ধরল। এবার আর সংযম ধরে রাখা সম্ভব হলো না; আব্দুর রহমানের চোখের কোণ বেয়ে দুফোঁটা নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। তিনি পরম মমতায় কন্যার মস্তকে চুম্বন করে তাকে নিজের প্রশস্ত বুকের আশ্রয়ে টেনে নিলেন।
ওদিকে দোতলার করিডোরের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা কারানের মনস্তাত্ত্বিক জগতে তখন এক বিচিত্র আলোড়ন চলছে। তার ভ্রূদ্বয় কিঞ্চিৎ কুঞ্চিত হলো, আর অজান্তেই হাতের মুষ্টি শক্ত হয়ে উঠল। এই যে বাবা-মায়ের প্রতি মেয়ের অকৃত্রিম অনুরাগ এবং পিতামাতার এই ব্যাকুলতা—দৃশ্যগুলো কেন জানি তার সহনশীলতার সীমা অতিক্রম করছিল। একটি অদৃশ্য দীর্ঘশ্বাস গোপন করে সে সিঁড়ির দিকে মুখ ফিরিয়ে নিচের তলার দিকে তাকাল। কারান সুশিক্ষিত এবং আধুনিক মননসম্পন্ন, সে জানে এই স্নেহ অত্যন্ত পবিত্র, তবুও তার হৃদয়ের কোনো এক অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে এক পশলা অস্বস্তি বারংবার হানা দিচ্ছিল।
সহসা পৃষ্ঠদেশে একটি বলিষ্ঠ হাতের স্পর্শ অনুভব করতেই কারান দ্রুত সংবিৎ ফিরে পেল। পিছনে ফিরতেই দেখল, আব্দুর রহমান আর্দ্র নেত্রে জামাতার দিকে চেয়ে আছেন। ওদিকে করিডোরের অপর প্রান্তে মিরা, ইলিজা আর মমতাজ বেগম নিজেদের বিষণ্নতা বিনিময় করতে মগ্ন।
আব্দুর রহমান একটি দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে অত্যন্ত ধীরলয়ে বললেন, “দুঃখিত, বাবা, তোমাদের জন্য কোনো স্পেশাল অ্যারেঞ্জমেন্টই করতে পারলাম না।”

কারান বিনয়ের সাথে কিছু বলতে উদ্যত হতেই, আব্দুর রহমান তার হাতে একটি কারুকার্যখচিত ছোট বাক্স গুঁজে দিলেন। কারানের বিস্ময়াবিষ্ট চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি মৃদু হেসে বললেন, “এটা ধরো। এটা আমাদের তরফ থেকে তোমার জন্য খুবই ছোট্ট একটা গিফট। এটাকে বস্তুগত উপহার না ভেবে বরং আমাদের ব্লেসিং আর ভালোবাসা হিসেবে গ্রহণ করো।”
অতঃপর তিনি কারানের হাতটি নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে গাঢ় স্বরে বললেন, “বিশ্বাস করবে কিনা জানিনা, এমন কোনো দিন যায়নি যে আমি ডাইনিং টেবিলে বসেছি অথচ আমার আম্মাজানকে মনে করিনি। অথচ দেখো, দীর্ঘ সতেরোটি মাস অতিক্রান্ত হয়ে গেল, কলিজার টুকরো মেয়েটাকে ছাড়াই প্রতিটি লোকমা মুখে তুলতে হচ্ছে।”
আব্দুর রহমান সাহেবের এই অকপট হাহাকার কারানের হৃদয়ের গভীরে সুতীব্র কম্পন সৃষ্টি করল। পিতৃস্নেহের এই আর্দ্রতা তার ভেতরের গুমোট ভাবটাকে নিমিষেই ধুয়ে মুছে দিল। কারান এবার কোনো লৌকিকতা না করে আব্দুর রহমানের হাতটি পরম শ্রদ্ধায় নিজের বুকের ওপর চেপে ধরল। কোনো মৌখিক আশ্বাস বা উচ্চবাচ্য ছাড়াই কারানের চোখের সেই গভীর ও বিশ্বস্ত দৃষ্টি আব্দুর রহমানকে অব্যর্থ নির্ভরতা প্রদান করল। তিনি বুঝে নিলেন, তার আদরের কন্যাটি একটি বিশ্বস্ত হৃদয়ের নিরাপদ আশ্রয়েই রয়েছে। আব্দুর রহমানের ওষ্ঠাধরে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠলেও তার চক্ষুদ্বয় পুনরায় বারিবিন্দুতে সিক্ত হয়ে উঠল।

গাড়ির ভেতরে ইঞ্জিনের মৃদু কম্পন ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। কারান স্টিয়ারিং হুইলে হাত রেখে নিথর বসে আছে। সে সচেতনভাবেই আব্দুর রহমানের ড্রয়িংরুমের সেই আবেগি আবহাওয়া থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিচে নেমে এসেছে। কারণ কারান জানে, রক্ত সম্পর্কের নিবিড় আবর্তে যখন আবেগ তার বাঁধ ভাঙে, তখন সেখানে বহিরাগত কারো উপস্থিতি জড়তার দেয়াল তুলে দেয়, হোক সে জামাতা।
দশ মিনিট অতিক্রান্ত হলো। মিরার দেখা নেই। কারান নিজের কবজিতে থাকা কয়েক কোটি টাকার লিমিটেড এডিশন ঘড়িটার দিকে একবার নির্লিপ্ত দৃষ্টিপাত করল। ঠিক তখনই তার নজর কাড়ল প্যাসেঞ্জার সিটে রাখা আব্দুর রহমানের দেওয়া উপহারের বাক্সটি। কারান দ্বিধাগ্রস্ত হাতটা একবার এগিয়ে নিয়েও, আবার গুটিয়ে নিল। পরক্ষণেই কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে সে প্যাকেজিংটা উন্মোচন করতেই বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেল। ভেতরে সগৌরবে শুয়ে আছে একটি ‘টুডর ব্ল্যাক বে জিএমটি।’ বাংলাদেশি মুদ্রায় এর বাজারমূল্য পাঁচ থেকে ছয় লক্ষ টাকার কম নয়।
কারান নিজে কোটি টাকার টাইমপিস ব্যবহার করে অভ্যস্ত, কিন্তু এই ঘড়িটি দেখে তার মনে হলো, এটি তার সংগ্রহের যে-কোনো ঘড়ির চেয়েও সহস্রগুণ দামি। সে জানে, একজন অবসরপ্রাপ্ত মানুষের জন্য এই পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা কতটা দুঃসাধ্য। এর প্রতিটি গিয়ারের ভেতরে যেন মিশে আছে তার শ্বশুরের অক্লান্ত পরিশ্রম আর অকৃত্রিম ভালোবাসা। এক অজানা অপরাধবোধে কারানের হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল।
হঠাৎ গাড়ির দরজা খোলার শব্দে কারানের ভাবনায় ছেদ পড়ল। মিরা এসে পাশের সিটে বসল; তার চোখদ্বয় অশ্রুসিক্ত, নাসিকার প্রান্তে লালচে আভা ফুটে আছে। কারান নিঃশব্দে একটি টিস্যু বক্স থেকে টিস্যু তুলে ধরল। মিরা ম্লান হেসে সেটা নিয়ে চোখ মুছতে থাকলো। ওদিকে গেটের সামনে মমতাজ বেগম আর আব্দুর রহমান বিষণ্ন মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। হঠাৎ ইলিজা দৌড়ে এসে জানালার কাচের পাশে মুখ বাড়াল।

“ভাইয়া…”
কারান তার নিষ্প্রাণ চোখ মেলে তাকালে ইলিজা একটি ভাঁজ করা রুমাল এগিয়ে দিল। কারানের চোখে প্রশ্নবোধক চিহ্ন দেখে সে মৃদু হেসে বলল, “নেক্সট টাইম যখন আসবেন, প্লিজ অনেক অনেকগুলো কোয়ালিটি টাইম নিয়ে আসবেন। অনেক আড্ডা বাকি রয়ে গেল কিন্তু!”
কারান কোনো উত্তর খুঁজে পেল না, শুধু সম্মতির ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল।
গাড়ি চলতে শুরু করল। বুগাটি শিরনের স্মুথ এক্সিলারেশনে শহর পেছনে ফেলে তারা হাইওয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মিরা জানালার বাইরে তাকিয়ে হয়ত ফেলে আসা শৈশবকে খুঁজছিল। হুট করেই সে কারানের দিকে তাকিয়ে নীরবতা ভেঙে বলল, “মাহি ওটা কী দিল? দেখলে না?”
“হুঁ?” কারান যেন সংবিৎ ফিরে পেল। “ওহ, হ্যাঁ।”
কারান এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে অন্য হাতে ভাঁজ করা কাপড়টি খুলল। এটি একটি হাতে সেলাই করা সাদা রুমাল। রুমালের এক কোণে সুনিপুণ কারুকার্যে ইংরেজিতে লেখা ‘MIRAN’। তার পাশেই দুটি হাস্যোজ্জ্বল ইমোজি; একটির কানের পাশে রক্তবর্ণ পুঁতি দিয়ে গাঁথা লাল গোলাপ, যা স্পষ্টতই মিরাকে রিপ্রেজেন্ট করছে। অন্যটি কারান। পুরো বিষয়টি অত্যন্ত কিউট এবং ঘরোয়া ছোঁয়ায় পূর্ণ। কারানের ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটল, কিন্তু পরক্ষণেই রুমালের অন্য প্রান্ত দেখে তার মুখমণ্ডল গম্ভীর হয়ে গেল।
সেখানে একটি ছোট, একা এবং বিষণ্ন ইমোজি আঁকা। যার মুখটি নিচের দিকে বাঁকানো। সেটি সম্ভবত ইলিজা নিজে। কিশোরী মেয়েটির এই নিঃশব্দ অভিমান আর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ কারানকে বিচলিত করে তুলল।
মিরা যখন কৌতূহলী হয়ে রুমালটার দিকে হাত বাড়াতে চাইল, কারান সহসা সেটা ভাঁজ করে নিজের প্যান্টের পকেটে গুঁজে রাখল। এই ক্ষুদ্র স্মৃতিচিহ্নটি সে সম্ভবত একান্ত নিজের করে রাখতে চাইছে, যেখানে ইলিজার সেই বিষণ্ন ইমোজিটা কেবল তাকেই অব্যক্ত দহন দিচ্ছে।

“কী গো, একটু দেখতেও তো দিলে না! দেখি না কী লিখেছে ও?”
কারান সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করল না। তার দৃষ্টি নিবদ্ধ সামনের উইন্ডশিল্ডের ওপারে বিস্তৃত ধূসর পিচঢালা পথে। গম্ভীর স্বরে সে বলল, “পাশে রাখা ওই বক্সটা বাবা দিয়েছেন।”
মিরা সেন্ট্রাল কনসোলের কাপহোল্ডারের পাশে রাখা বাক্সটা হাতে নিল। ডালা খুলতেই রোদে চিকচিক করে উঠল টুডর ব্ল্যাক বে জিএমটি-এর সেই সিগনেচার ‘পেপসি’ বেজেল। ঘড়িটির মেকানিক্যাল সোফিস্টিকেশন আর স্টিল ব্রেসলেটের আভিজাত্য দেখে মিরার মুখে প্রশান্তির হাসি ফুটল। বাবার পছন্দ যে কারানের উচ্চমার্গের রুচির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে, তা ভেবে সে মনে মনে আশ্বস্ত হলো। কিন্তু পরক্ষণেই এক সংশয় তাকে ঘিরে ধরল, কারান কি আদৌ এটা পছন্দ করেছে? কোটি টাকার পাটেক ফিলিক কিংবা ওডেমার পিগুয়ে যার কবজিতে শোভা পায়, তার কাছে এই উপহারটি কি নিতান্তই সাধারণ ঠেকবে?
মিরা দ্বিধাভরে কিছু জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই কারান নিস্তব্ধতা ভেঙে আদেশ করল, “আমার হাতের এই ওয়াচটা খুলে ওটা পরিয়ে দাও।”

মিরার চোখেমুখে যেন শরতের রোদেলা আভা খেলে গেল। তার মানে কারানের পছন্দ হয়েছে! সে অতি যত্ন সহকারে কারানের কবজি থেকে দামি ঘড়িটি খুলে বক্সে রাখল, এবং পরম মমতায় বাবার দেওয়া উপহারটি তার হাতে সেট করে দিল। ঘড়িটির লেদার স্ট্র্যাপ কারানের পেশিবহুল হাতে বেশ মানিয়ে গেছে।
হঠাৎ কারান বলল, “আই থিংক, তোমার আরও কিছু দিন থাকা উচিত ছিল এখানে।”
মিরা বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে কারানের দিকে তাকালো। রীতিমতো তার চোয়াল ঝুলে পড়ার উপক্রম। এই সেই কারান, যার কাছ থেকে বাপের বাড়ি মাত্র দু-দিন থাকার অনুমতি আদায় করতে তাকে এক প্রকার যুদ্ধ করতে হয়েছে! কিন্তু কারানের চোয়ালের কাঠিন্য বলে দিচ্ছিল, সে কোনো রসিকতা করছে না।
মিরা ঘড়ি পরানো শেষ করে সামনের দিকে মুখ ফেরাল। জানালার বাইরে দ্রুতবেগে পিছিয়ে যাওয়া গাছপালার দিকে তাকিয়ে বলল, “পুরোনো চৌধুরি বাড়ির হিস্ট্রি সম্পর্কে তুমি কতটুকু জানো?”
“নাথিং। আর সত্যি বলতে, আমার কোনো ইন্টারেস্টও নেই।”
“বাট আই ওয়ান্ট টু নো। কোনো একটা জেনারেশনের তো পুরো স্টোরিটা জানা উচিত, তাই না?”
কারান স্টিয়ারিংয়ে আঙুলের টোকা দিয়ে নিরুত্তাপ গলায় বলল, “সবকিছু নিয়েই বড্ড বেশি কিউরিওসিটি তোমার। মেক শিওর, এই কিউরিওসিটি যেন তোমাকে কোনো ট্রাবলে না ফেলে।”
কারানের গূঢ় মন্তব্যের সারমর্ম বুঝতে পেরে মিরা একবার আড়চোখে তাকালো। এরপর আর কোনো শব্দ উচ্চারিত হলো না। গাড়ির স্পিডোমিটারের কাঁটা এখন 120 km/h ছুঁইছুঁই।

চৌধুরি বাড়ির মূল ফটক থেকে খানিকটা দূরে, ছায়াঘেরা নির্জন এক রাস্তার মোড়ে কারান গাড়ি থামাল। কারান চায় না পুনরায় সেই বিদায়ি আবর্তে জড়িয়ে অযথা সময় নষ্ট করতে। তাছাড়া সে ইতোমধ্যে ফারহানকে টেক্সট করে দিয়েছে এয়ারপোর্টে আসার জন্য।
কারান গাড়ি থেকে নেমে মিরার পাশের দরজাটা সযত্নে খুলে ধরল। মিরা গাড়ি থেকে নামতেই বুনো লতা আর ভেজা মাটির সোঁদা ঘ্রাণ তাকে অভ্যর্থনা জানালো। এই দিকটায় সরু পিচঢালা রাস্তা। চারপাশটা যেন কোনো ল্যান্ডস্কেপ পেইন্টিং, দুপাশে প্রাচীন মেহগনি আর কড়ই গাছের নিবিড় বন।
“কারান, ওই যে ছেলেটাকে তুমি হেলপ করেছিলে, যাকে হসপিটালে অ্যাডমিট করেছিলে… ওর কোনো খবর জানো?” মিরা হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।
কারান পকেটে হাত দিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল, “ডোন্ট ওয়ারি। ও ওর মায়ের সাথে এখন ঢাকাতেই আছে। ইমন একটা ফ্ল্যাটের অ্যারেঞ্জমেন্ট করে দিয়েছে। দে আর সেফ নাউ।”
“আচ্ছা।”

কিছুক্ষণ দুজন চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। বাতাসের শো শো শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। কারানের এই মিতভাষী এবং কিছুটা উদাসীন রূপ মিরাকে বিচলিত করল। সে আলতো স্বরে বলল, “একবার দাদিজানের সাথে দেখা করে আসা উচিত তোমার।”
কারান কবজির নতুন ঘড়িটার দিকে একবার তাকালো। তারপর শীতল স্বরে বলল, “সময় কম। আই হ্যাভ আ ফ্লাইট টু ক্যাচ।”
কারানের সেই কাঠিন্যমাখা উত্তরের পর মিরা আর বাক্যব্যয় করার সাহস পেল না। এই স্তব্ধতার মাঝেই দেখা গেল তারান্নুমকে। দূর থেকে নেচে-কুদে এগিয়ে আসছে সে। পরনে সূর্যমুখী ফুলের মোটিফ আঁকা একটি অ্যালাইন লং ফ্রক, নিচে শুভ্র চুরিদার। ওরনাটা অবিন্যস্তভাবে কাঁধের একপাশে ঝোলানো, আর চুলগুলো নিখুঁত পনিটাইল স্টাইলে বাঁধা। তারুণ্যের চপলতা ওর চোখেমুখে খেলছে। মিরা আর কারানকে দেখেই তারান্নুমের মুখচ্ছবি আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
“ভাবিইই!” চিৎকার করে একরকম দৌড়েই এসে সে মিরাকে জড়িয়ে ধরল। মিরাও সজোরে বুকে টেনে নিল তার আদরের ননদকে। কিন্তু এই ভ্রাতৃবধূ আর ননদের চিরাচরিত সৌহার্দ্যপূর্ণ দৃশ্যটি কারানের চোখে যেন বিষবৎ ঠেকল।
“বাকি ইমোশনাল ড্রামাগুলো বাসায় গিয়ে সেরে নেবেন আপনারা।”
কারানের কঠিন মুখের কথায় তারান্নুম দুষ্টুমিভরে ভেংচি কাটল, যদিও মিরার মুখটা মুহূর্তেই মেঘলা হয়ে গেছে। তারান্নুম মুখ টিপে হেসে কারানকে অনুকরণ করে ভেঙিয়ে ভেঙিয়ে বলল, “কার যেন একটা টেক্সট পাইলাম, ‘বাড়ির পিছনের দিকটায় আয়, মিরা এসেছে।’ বউরে এত সিকিউরিটি না দিয়া, নিজে যাইয়াই তো বাসায় দিয়া আসতে পারতা!”

কারান এক গভীর নিশ্বাস ফেলে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “তুই বোধ হয় ভুলে গেছিস যে তুই কার সামনে দাঁড়িয়ে আছিস। বেশি ইয়ার্কি করলে এমন এক চটকানা মারব যে একটা দাঁতও মুখে থাকবে না, সবগুলো আমার হাতের তালুতে এসে জমা হবে।”
কারানের এই আকস্মিক ও তীব্র রুক্ষতায় মিরা হকচকিয়ে গেল। সে বিস্ময়ভরে বলল, “হয়েছেটা কি তোমার? সবসময় কেন মেয়েটার ওপর এমন টেম্পার দেখাও? ও তো জাস্ট মজা করছিল!”
কারান মিরার দিকে তাকাতেই তার চোখের মণি দুটো যেন মিরার কাছে এই প্রথমবার অন্যরকম ঠেকলো। সে হিংস্র গলায় বলল, “বেশি কথা বললে আপনাকেও মারব আমি।”
মিরার মুখ বিস্ময়ে বিবর্ণ হয়ে গেল।
“চুপচাপ বাসায় যাবে। আমার পারমিশন ছাড়া কোথাও বের হওয়া যাবে না। আই রিপিট, কোথাও না। নট আ সিংগেল স্টেপ! যদি এর অন্যথা হয়, তবে আমার সেই ডার্ক সাইডটা দেখতে বাধ্য হবে যা তোমার কল্পনাতেও নেই। অ্যান্ড আই মিন ইট।”
তারান্নুম আর কথা বাড়ানোর ঝুঁকি নিল না। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সে মিনমিন করে বলল, “ভাইয়া, তু-তুমি একটু দাঁড়াও। আ-আমি আইতেছি।” বলেই সে দ্রুত প্রস্থান করল।
এদিকে মিরা পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। কারানের চোখের সেই অদ্ভুত আভা—যেখানে ভালোবাসার চেয়ে অবসেশন বেশি প্রকট দেখে সে শিউরে উঠল। প্রায় ছয় মিনিট পার হয়ে গেল, কেউ কোনো কথা বলছে না। মিরা অবশেষে ঢোক গিলে অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করল, “তুমি… তুমি কি আমাকে ডমিনেট করতে চাইছ, কারান?”
“হোয়াট ডু ইউ থিংক?” কারান নির্বিকার।
মিরা মুখ ঘুরিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কারান তখন গাড়ির হুডে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রোদ তার চোয়ালের তীক্ষ্ণ রেখাগুলোকে আরও ধারালো করে তুলছে। মিরা ফিরে এসে দু-হাতে কারানের গাল আঁজলায় ধরল। তার চোখ ছলছল করছে।

“আমি জানি না, কারান। মাঝেমাঝে মনে হয়, আমি আমার কারানের সাথে কথা বলছি না। অন্য কেউ তোমার ছদ্মবেশে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আই নো, তুমি আমাকে নিয়ে মারাত্মক অবসেসড, আর আমিও তো আগাগোড়া তোমারই! তবুও কেন… কেন মাঝেমাঝে এমন অ্যাবইউসিভ আচরণ করো?”
হঠাৎ কারান এক ঝটকায় মিরার কোমরে হাত দিয়ে তাকে নিজের দিকে টেনে নিল। মিরা আছড়ে পড়ল কারানের শক্ত পোক্ত বুকে। হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানি দুজনেই অনুভব করতে পারছে। কারান মিরার চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল। তার বুড়ো আঙুল মিরার নরম ঠোঁটের ওপর দিয়ে স্লাইড করছে বারংবার। এমনভাবে যেন সে কোনো মহামূল্যবান প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পরখ করছে। মিরার শ্বাস-প্রশ্বাস উত্তপ্ত হয়ে উঠল, চোখের পাতা কেঁপে উঠছে অবিরত।

কারান হঠাৎ খুব নিচু গলায় সম্মোহনী স্বরে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি আমাকে ভালোবাসো, মিরা?”
কারানের এই অদ্ভুত জেরা মিরার কাছে একান্তই অপ্রাসঙ্গিক এবং নিরর্থক মনে হলো। প্রণয়ের এতগুলো বসন্ত অতিবাহিত করার পরও কি কারান তার হৃদয়ের ভাষা বুঝতে অক্ষম? অনুরাগের সবটুকু কি সর্বদা বাচনিক অভিব্যক্তিতেই প্রকাশ করতে হবে? মিরা কিঞ্চিৎ ভ্রূ কুঞ্চিত করে কারানের চোখের মণির অতল গহ্বরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল, অথচ নিজের আঁখিপল্লব ততক্ষণে অশ্রুভারে নুয়ে পড়েছে।
কারান মিরার কোমল অধরে আঙুলের ডগা দিয়ে কিঞ্চিৎ নিষ্ঠুর চাপ প্রয়োগ করল। ব্যথার তীব্রতায় মিরা ককিয়ে উঠল। কারান তার তপ্ত নিশ্বাস মিরার ওষ্ঠাধরের সান্নিধ্যে এনে হিসহিসিয়ে বলল, “হাবলার মতো তাকিয়ে থাকার জন্য প্রশ্নটা করিনি।”
মিরা এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। কারানের কর্কশ স্পর্শ ততক্ষণে তার চিবুক ছাড়িয়ে গাল, ললাট, ও কানের লতির পাশের অবাধ্য কেশগুচ্ছের ওপর বিচরণ করছে। এই পৈশাচিক অথচ মোহনীয় স্পর্শে মিরার শরীর আবেশিত হলেও সে চোখ বুজে এক দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করল। দহনজ্বালা উপেক্ষা করে সে ধীরস্থিরভাবে বলল, “তুমি যদি আমার সামনে বিষের পাত্র রেখে বলো, ‘পান করো’, আমি এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে সেই কালকূটকে অমৃত ভেবে পান করে নেব। আমার এই আনকন্ডিশনাল লাভ কোনো পার্থিব শব্দ দিয়ে ডিকশনারিতে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়, কারান।”
বলতে বলতে এক বিন্দু নোনা জল মিরার গাল বেয়ে টুপ করে ঝরে পড়ল। কারান মুহূর্তেই সংবিৎ ফিরে পেল। সে অনুধাবন করল, তার আদিম ডমিন্যান্স আর সজোর স্পর্শ মিরাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে ব্যথিত করছে। সে হুট করেই হাত সরিয়ে নিল।
যদিও সে চেয়েছিল মিরা তাকে সরাসরি বলুক, ‘সে তাকে ভালোবাসে’, তবে এই সমর্পণ তার চেয়েও সহস্রগুণ গভীর।

কারান এবার মায়াবী কণ্ঠে শুধালো, “জড়িয়ে ধরব, সুইটহার্ট?”
মিরার বাঁধভাঙা কান্না তখন কেবল আশ্রয়ের সন্ধান করল। সে চোখ বন্ধ অবস্থাতেই কারানের প্রশস্ত বুকে মুখ গুঁজলো। তার উষ্ণ অশ্রু কারানের দামি জ্যাকেটের ফ্যাব্রিকের ওপর টপ টপ করে পড়ে শুষে যেতে থাকল। কারানও পরম মমতায় মিরাকে বাহুপাশে আবদ্ধ করে তার পিঠে আঙুল বোলাতে থাকল। প্রায় বিশ মিনিট এভাবেই অতিবাহিত হলো। মিরার এই নিবিড় সান্নিধ্যেই কারান তার সেই উন্মাদ সত্তা থেকে বিচ্যুত হয়ে স্বাভাবিক মানুষের রূপে ফিরে এলো।
“অ্যাহেম অ্যাহেম!”
হঠাৎ এই কৃত্রিম কাশির শব্দে এই অপার্থিব আবেশ চূর্ণ হলো। মিরা ধড়ফড়িয়ে মুখ তুলে দেখল, তারান্নুম তার ওড়নার প্রান্ত দিয়ে মুখ চেপে হাসি চাপার চেষ্টা করছে। লজ্জায় মিরার গাল মুহূর্তেই রেড রোজের মতো রক্তিম হয়ে উঠল। সে কারানের আলিঙ্গন থেকে নিজেকে বিমুক্ত করতে চাইল, কিন্তু কারান এবার আরও হিংগ্রতায় তার কোমরে হাতের বেষ্টনী সুদৃঢ় করল। মিরা ভ্রূ কুঁচকে চোখের ইশারায় ‘ছেড়ে দেওয়ার’ আর্তি জানালে কারান নির্বিকার ভঙ্গিতে বোঝাল, হু কেয়ার্স?

কারান এবার আরও নিবিড়ভাবে মিরাকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। কোমরের ঘেরটা অতিরিক্ত প্যাঁচিয়ে সে নিজের থুতনি রাখল মিরার কাঁধে। মিরা শত চেষ্টা করেও এই লৌহকঠিন বন্ধন থেকে নিষ্কৃতি পেল না। এদিকে অদ্ভুতভাবে তারান্নুমের কৌতুকী হাসির রেখা নিমেষেই উবে গেল। এক অজানা অস্বস্তি আর মনস্তাত্ত্বিক যাতনা তার মুখমণ্ডলকে বিবর্ণ করে তুলল। তারান্নুমের এই আকস্মিক বিষণ্নতা কারানের প্রখর দৃষ্টি এড়ালো না। এই প্রকাশ্য ঘনিষ্ঠতা সম্ভবত সে ইচ্ছে করেই করছে, যেন তারান্নুমের অবচেতন মনে চিরস্থায়ীভাবে অঙ্কিত হয়ে যায়—কারান কেবল এবং কেবলমাত্র মিরারই একচেটিয়া অধিকার।
“আ’ম গোয়িং টু কিস হার।”
কারানের এই সরাসরি এবং চরম বোল্ড ঘোষণাটি তারান্নুমের কানে যেন গরম সিসার মতো বিঁধল। তার কণ্ঠনালি মরুভূমির মতো শুষ্ক হয়ে এলো। সে ঢোক গিলে অবিশ্বাসের চোখে কারানের দিকে তাকাল। মিরা এবার সর্বশক্তি দিয়ে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ছটফট করতে লাগল।
“কারান, হচ্ছেটা কী? জাস্ট লেট মি গো!”

মিরার এই ছটফটানি কারানকে আরও বেশি উত্তেজিত করল। সে বাহুডোর আরও সংকুচিত করল, ফলে মিরা তার বাহুদ্বয়ে কারানের বুকের কঠিন চাপ অনুভব করল। ওদিকে তারান্নুমের দু-চোখ ফেটে কান্না আসতে চাইল। তার ভ্রূ কুঁচকে গিয়ে প্রায় একসাথে হয়ে গেছে। হৃদয়ের কোনো এক কোণে রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে।
কারান তারান্নুমের দিকে শীতল দৃষ্টি ছুঁড়ে দিয়ে নির্বিকার গলায় বলল, “আই হোপ, তোকে ম্যানার্স শেখাতে হবে না যে ভাই-ভাবিকে কখন প্রাইভেট স্পেস দিতে হয়।”
তারান্নুম নিজের মুষ্টিবদ্ধ হাতদুটোর দিকে তাকাল; নখের চাপে তালুর চামড়া সাদা হয়ে গেছে। শরীরটা যেন থরথর করে কাঁপছে। কারানের এই সূক্ষ্ম মানসিক নিষ্ঠুরতা আর ইঙ্গিতবাহী আচরণ সে নিখুঁতভাবে ধরতে পেরেছে। তার বাম হাতে ধরা শপিং ব্যাগটা যেন এক বিশাল বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে টালমাটাল পায়ে কিছুটা দূরে সরে গিয়ে একটি প্রাচীন মহীরুহের গুঁড়ি আঁকড়ে ধরল। বারবার ঢোক গিলছে সে, কিন্তু গলার কাছে দলা পাকিয়ে থাকা অব্যক্ত যাতনাটা কিছুতেই প্রশমিত হচ্ছে না।
আপনমনে ফিসফিস করে উঠল সে, “তুই এতটা নির্লজ্জ কবে থেইকা হইলি, তরু? নিজের উপ্রে ন্যূনতম নিয়ন্ত্রণ নাই তোর? কী ভাবতেছিস এইসব তুই?”

নিজের শরীরের অবশ ভাবটা কাটাতে সে গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে ধীরে ধীরে ঘাসের ওপর বসে পড়ল। বুকের ভেতরটা অসহ্য দহনে ছটফট করছে।
“এমন ক্যান হইতেছে? এমন লাগতেছে ক্যান ভিতরটায়? ক্যান এই হৃৎপিণ্ডের অলিন্দে-নিলয়ে চিনচিনে একটা ব্যথা ফিল হইতেছে? অনুভূতি এত বেহায়া ক্যান? আমি তো সমস্ত স্মৃতি আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করতে চাইতেছি। তবুও এই স্মৃতির কোলাহল ক্যান থামতেছে না?”
বলতে বলতে তার দুই নয়ন বেয়ে অবাধ্য অশ্রুধারা গাল গড়িয়ে মাটির ধূলোয় মিশে গেল।
“উফফ, এই ব্যথাটা বিরক্তিকর। থামতেই চায় না। ধুর ধুর!”
এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে নিজের বুকের বাম পাশটা শক্ত করে চেপে ধরল। ঘাম জমে তার গ্রীবাদেশ এবং কপালের উপরিভাগ সিক্ত হয়ে উঠছে; বাতাসের অক্সিজেনও যেন এই মুহূর্তে তার ফুসফুসের জন্য যথেষ্ট নয়।
ওদিকে মিরা এবার কারানের ইস্পাতদৃঢ় বুকে সজোরে ধাক্কা দিল। তার কণ্ঠে কাঠিন্য ঝরে পড়ল, “তুমি ইচ্ছে করেই ওর সামনে এই ডিসপ্লে করছ, তাই না কারান? হোয়াই আর ইউ সো ক্রুয়েল?”
কারান ভ্রূ উঁচিয়ে ঠোঁট উলটিয়ে শান্ত স্বরে বলল, “খুব দরদ দেখছি আপনার ননদিনীর ওপর। ঠিক আছে, তাহলে যাই, ওকেও একটা ওয়ার্ম হাগ দিয়ে আসি।”

কারান পা বাড়ানোর উপক্রম করতেই মিরা ক্ষিপ্র গতিতে কারানের গালে একটা চড় বসিয়ে দিল। যদিও আঘাতটা ছিল অতি কোমল, শাসনে ঘেরা। কারান চোখ দুটো সরু করে মিরার দিকে তাকাল। মিরা রাগে ফুঁসছে, ভ্রূ যুগল প্রখরভাবে কুঞ্চিত। অথচ কারানের অধরে কপট হাসি ফুটে উঠলো। মিরার এই স্বত্বাধিকারী মনোভাব আর এই ঈর্ষান্বিত ভাব তাকে প্রতিবারই আদিম আনন্দ দেয়।
“ইডিয়ট!” মিরা রাগে গজগজ করতে করতে কারানের গাল দুটো নিজের দুই করতল দিয়ে সজোরে চেপে ধরল। কারানের ওষ্ঠাধর তখন পুঁটি মাছের মতো ফুলে উঠেছে। মিরা মুহূর্তেই নিজের সমস্ত ক্ষোভ আর ভালোবাসা উগরে দিল কারানের অধরে। কারান এবার গাড়ির বনেটের কিছুটা উপরে উঠে বসল, এবং মিরাকে নিজের বলিষ্ঠ ঊরুর ওপর টেনে বসাল।
নিস্তব্ধ নির্জন রাস্তায় কেবল তাদের দ্রুততর শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ ধ্বনিত হলো। মিরার আঙুলগুলো কারানের ঘাড়ের চুলে বিলি কাটছে, আর কারানের হাত অস্থির নেশায় মিরার পিঠজুড়ে উপরে-নিচে বিচরণ করছে।
যখন অধরের বিচ্ছেদ ঘটল, মিরার অধরপল্লব তখন আরক্তিম, হৃৎস্পন্দন দ্রুততর হচ্ছে। আলতো লাজুক হাসিতে তাকে আরও মোহনীয় দেখাচ্ছে।

কারান নিজের চিবুকে হাত রেখে মিরার আবেশিত এবং লজ্জায় অরুণিম মুখমণ্ডল পর্যবেক্ষণ করতে থাকল।
“ইউ আর জাস্ট সো ইনক্রেডিবলি প্রিটি, মাই গর্জাস লেডি। ইট’স ওভারহুইলমিং… আই লিটারালি ক্যান নট পুট ইনটু ওয়ার্ডস হাউ স্টানিং ইউ লুক। হোয়াই আর ইউ সো প্রিটি, সুইটহার্ট? হোয়াই?”
তার কণ্ঠস্বর এতটাই গভীর যে মিরার গায়ের লোম কণ্টকিত হয়ে উঠল। কারানের চোখের সেই অতিপ্রাকৃত মাদকতা মিরার দম বন্ধ করে দেওয়ার উপক্রম করছে। সে এক ঢোক গিলে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। কারানের এই অবসেশন যেন এক সুন্দর বিষের মতো তার রক্তে মিশে যাচ্ছে।
বেশ কিছুক্ষণ পর তারান্নুম নিজেকে কিছুটা স্থিতধী করল। বুকের বাম দিকে কয়েকটা মৃদু চাপড় দিয়ে সে আসন্ন প্যানিক অ্যাটাক থেকে নিজেকে পুনরুদ্ধার করল। কাঁপাকাঁপা হাতে আইফোনটা বের করে হোয়াটসঅ্যাপে টাইপ করতে থাকল, ‘শুনুন মিস্টার ফারহান, আপনাকে আমাকে অনেক অনেক ভালোবাসতে হবে। এতটা বেশি যেন কারান নামক এই অধ্যায়টা আমার মস্তিষ্ক থেকে চিরতরে মুছে যায়। সেখানে যেন কেবল আপনারই একক আধিপত্য থাকে।’
কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর হঠাৎ তীব্র বিতৃষ্ণায় পুরো লেখাটা মুছে ফেলল। নিজের মাথায় মৃদু আঘাত করে নিজেকেই তিরস্কার করল সে, “মাথায় কয়েকটা শক্ত গাঁট্টা পড়লে ঠিকই সব ভুইলা যাবি, স্টুপিড গার্ল! ফারহান তোরে অনেক বেশি ভালোবাসে, অনেক বেশি। উফফ, নাহ! নিজেরে সামলানোর দায়িত্ব তোর নিজেরই। অন্য কেউ আইসা তোর গণ্ডমূর্খ মাথা থেইকা এই ভূত তাড়াইতে পারবে না। বি স্ট্রং, তরু!”
সামনের দিগন্তের দিকে তাকিয়ে সে কয়েকবার বুক ভরে নিশ্বাস নিল। ওড়না দিয়ে চোখের নোনা জল মুছে সে মুখে কৃত্রিম হাসির আস্তরণ লেপে দিল।

“এইটা তোমার বন্ধুরে দিও, গতবার দিতে একদম ভুইলা গেছিলাম।”
তারান্নুমের কণ্ঠস্বরের কম্পনটুকু কারানের তীক্ষ্ণ কান এড়াল না। কারান শপিং ব্যাগটা গ্রহণ করল।
“কী আছে এতে?”
“ওই যে…”
তারান্নুম একবার ঢোক গিলল। দৃষ্টি মাটির দিকে নামিয়ে নিয়ে সে নিজের অবাধ্য কণ্ঠস্বরকে শাসনের মধ্যে নিয়ে এলো। এরপর কারানের চোখের দিকে তাকিয়ে অবিচল স্বরে বলল, “লাস্ট টাইম ঢাকা যাইয়া মল থেইকা যে সাদা পাঞ্জাবিটা কিনছিলাম, ওইটা তহন তো দেওয়া হয় নাই। এইটা তোমার বন্ধুরে দিও।”
কারান কোনো উত্তর দিল না। কিন্তু হঠাৎই তার ঈগলের মতো প্রখর দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো তারান্নুমের কবজিতে। পরক্ষণেই সে বিদ্যুদ্বেগে তারান্নুমের হাতটা খপ করে ধরে ফেলল। এই আকস্মিকতায় মিরা আর তারান্নুম দুজনেই বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেল। কারান ললাটে গভীর ভাঁজ ফেলে অত্যন্ত কঠোর স্বরে শুধালো, “হাত থেকে এই জঘন্য ব্রেসলেটটা এখনো খুলিসনি কেন?”

মিরার নজর এবার সেই অলংকারের দিকে গেল। সে আগে এটি খেয়াল করেনি; সম্ভবত সে আমেরিকা থাকাকালীন তারান্নুম এটি ধারণ করেছে। ব্রেসলেটটি যেন কোনো এক ঐশ্বরিক শিল্পের প্রতিফলন। এর কেন্দ্রস্থলে একটি বিরল ব্লু ডায়ামন্ড সগৌরবে অবস্থান করছে, যার নীল আভা চারপাশকে আলোকিত করে তুলছে। হীরাটির চারপাশে প্লাটিনামের সূক্ষ্ম ফ্রেমে বসানো অসংখ্য ছোট ছোট সাদা হীরে। পুরো অলঙ্কারটিতে প্রাচীন রাজকীয়তা বিদ্যমান। সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো এর সূক্ষ্ম খোদাই করা নকশা; মনে হচ্ছে, কারো জীবনবৃত্তান্ত প্যাঁচানোভাবে ধাতুর ওপর উৎকীর্ণ করা হয়েছে। মিরা স্তব্ধ হয়ে ভাবল, পৃথিবীতে এত শৈল্পিক সৌন্দর্যও কি সম্ভব?
সেদিন মূলত এই ব্রেসলেটিই শেফ নিজের হাতে পড়েছিল।
তারান্নুম সিক্ত চোখে হাসার চেষ্টা করল।
“ওহ, এইটা? এইটা তো আমি কক্ষনোই খুলুম না। আমার সব থেইকা পছন্দের জিনিস যে! স্মৃতির শ্যাষ চিহ্ন বলতে তো এইটুকুই অবশিষ্ট আছে।”

কারান এক পৈশাচিক ঝটকায় তারান্নুমের হাতটা ছুঁড়ে দিল। হাড়ের ওপর হাড়ের ঘর্ষণে তারান্নুমের মুখ যন্ত্রণায় নীল হয়ে গেল, কিন্তু কারান সেদিকে ভ্রূক্ষেপহীন। সে অন্য দিকে তাকিয়ে এক গভীর, উত্তপ্ত নিশ্বাস ত্যাগ করল। মিরা ব্যথিত হয়ে তারান্নুমের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, “খুব লেগেছে, তাই না?”
তারান্নুম যন্ত্রণার রেখা ধামাচাপা দিয়ে বলল, “ক-কই না তো, ভাবি। আমি একদম ঝাক্কাস আছি।”
কারান আর এক মুহূর্তও সেখানে ব্যয় করল না। শপিং ব্যাগটা গাড়ির পেছনের সিটে ছুঁড়ে দিয়ে সে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে উপবিষ্ট হলো। তার চোয়ালের হাড়গুলো রাগে কাঁপছে। স্টিয়ারিং হুইলটা এমনভাবে চেপে ধরেছে যেন ওটা ভেঙে চুরমার করে দেবে। কারানের এই আকস্মিক রূপান্তর বাইরে দাঁড়িয়েই মিরা লক্ষ্য করল। সে জানালার পাশে এগিয়ে গিয়ে কঠোর স্বরে বলল, “সবার ওপর এভাবে রাগ ফলানোটা কি তোমার রেগুলার হ্যাবিটে পরিণত হয়েছে?”
কারানের হাতের শিরাগুলো ফুলে উঠেছে। সে সজোরে নিশ্বাস ফেলছে। মনে হচ্ছে, এক আহত বাঘ খাঁচায় বন্দি। মিরার দিকে না তাকিয়েই সে গুমোট স্বরে বলল, “আমি কী করব আর না করব, সেটা তুমি আমাকে বলে দিবে না।”
এরপর হঠাৎ সে মিরার চোখের দিকে আক্রোশ মিশ্রিত দৃষ্টিতে তাকালো।

“যদি কখনো নিজের চোখে দেখতে তোমার সবচেয়ে বিশ্বস্ত মানুষটা, তোমার জন্মদাত্রী মা—পরপুরুষের হাত ধরে পালিয়েছে, তখন বুঝবে এই বিট্রেয়ালের পেইন কেমন হয়।”
কথাটা বলেই কারান প্রচণ্ড বেগে স্টিয়ারিং ঘোরাতে শুরু করল। বাম হাতে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে করতে সে নিজের ডান হাতের বুড়ো আঙুল কামড়ে ধরল, যা তার চরম অস্থিরতা আর সাইকোটিক ডিসঅর্ডারের লক্ষণ। দাঁতে দাঁত চেপে সে যোগ করল, “যার জন্য আমার ইনোসেন্ট শৈশব আর কৈশোর ধ্বংস হয়েছে, যার জন্য মাত্র আট বছর বয়সে আমি নিজের হাত র*ক্তে রঞ্জিত করে খু’নিতে পরিণত হয়েছি, সেই মানুষটাই যখন পৃথিবীর জঘন্যতম কাজটা করে, তখন হৃদয়টা ঠিক কেমন লাগে… সেই এক্সপেরিয়েন্স তোমার কল্পনারও বাইরে, আইদাহ আহসান মিরা।”
মিরা নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কারানের উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ যেন কোনো অদৃশ্য তীরের মতো তার হৃৎপিণ্ডকে বিদ্ধ করেছে। কারানের সেই রূঢ় স্বীকারোক্তির প্রচ্ছন্ন অর্থ বুঝতে পেরেও মস্তিষ্ক যেন তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করছে। মিরাকে এভাবে বিমূঢ় অবস্থায় দেখে তারান্নুম ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে তার কাঁধে হাত রাখল। সেই অতর্কিত স্পর্শে মিরা এক ঝটকায় সংবিৎ ফিরে পেয়ে তারান্নুমের দিকে তাকাল।
তারান্নুমের কণ্ঠে করুণ বিষণ্নতা ফুটে উঠলো, “এই… এই ব্রেসলেটটা আসলে কৌশিকা মামির আছিল।”
মিরার বিস্ময়ের সীমা রইল না।

“মা-মায়ের? এই ব্রেসলেট মায়ের?”
তার ভ্রূকুটি আর প্রশ্নসূচক দৃষ্টির উত্তরে তারান্নুম ব্যাখ্যা করতে শুরু করল, “হুঁ। তবে এইটা কিন্তু আসল অলংকার না। অরিজিনাল ব্রেসলেটটা কারান ভাইয়ের কাছেই আছে।”
সে হালকা হেসে মিরার হাত ধরে সামনের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলতে লাগল, “আহো ভাবি, তোমারে একটা ছোট্ট স্টোরি শোনাই। আসল ব্রেসলেটটা এর চাইতেও বহুগুণ দৃষ্টিনন্দন। ওইটা মূলত ছেলেদের জন্য তৈরি করা হইছিল। ছোটোবেলায় কারান ভাইয়ের হাতে ওইটা দেইখা আমি এমন বায়না ধরছিলাম যে মামি অবশেষে উপায় না পাইয়া আমারে এই রেপ্লিকাটা বানাইয়া দিছিল। চেইন সিস্টেম হওয়ার কারণে এইটা ছোট-বড়ো করোন যায়। তাই এহনো হাতে লাগে। কিন্তু অরিজিনাল ডিজাইনটা আছিল ইতালিয়ান আর্কিটেকচারের, তাই হুবহু নকল করা সম্ভব হয় নাই। এমনকি এর মাঝখানের এই নীল হীরাটাও কিন্তু ফেইক; কারান ভাইয়ের কাছে যেইটা আছে, সেইটাই আসল রত্ন।”
মিরা কোনো প্রত্যুত্তর দিল না। সে কেবল ভাবতে লাগল, কারান তার মাকে কতটা অন্ধের মতো ভালোবাসলে আজ তার ঘৃণা এমন হিমালয়সম রূপ নিতে পারে।

কারান যখন এয়ারপোর্টে পৌঁছাল, তার অবয়বে তখন বজ্রগর্ভ মেঘের ঘনঘটা। ফারহানকে সেখানে অত্যন্ত প্রফুল্ল দেখালেও কারানের সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ নেই। ফারহান উচ্ছ্বসিত হয়ে কারানকে আলিঙ্গন করলেও কারান ছিল সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত; তার দেহভঙ্গি ছিল পাষাণের মতো অনমনীয়, চোয়াল শক্ত হয়ে আটকে আছে।
বিমানের ভেতরে নিবিড় প্রশান্তি বিরাজমান। প্রাইভেট জেটের বিলাসবহুল সিটে বসে ফারহান বিভোর হয়ে কিছু শুনছিল। তার কানে প্রিমিয়াম কোয়ালিটির নয়েজ-ক্যানসেলিং হেডফোন লাগানো। ফারহানের মুখাবয়বে স্বর্গীয় আবেশ ফুটে আছে; সে যেন কোনো অতিলৌকিক সুরে নিজেকে সঁপে দিয়েছে। কারান প্রায় এক ঘণ্টা যাবৎ পাশে বসে থাকলেও ফারহান তা লক্ষ্যই করেনি। অবশেষে কারান কিছুটা কৌতূহলী হয়ে ফারহানের ঊরুর ওপর হাত রেখে প্রশ্ন করল, “কী শুনছিস এত মনোযোগ দিয়ে?”
ফারহান সংবিৎ ফিরে পেয়ে হেডফোনটা সরিয়ে স্মিত হাস্যে বলল, “কিছু বললি, মামা?”
কারানের প্রশ্নহীন দৃষ্টি হেডফোনের দিকে নিবদ্ধ। ফারহান এবার একটু লাজুক হেসে জানালার বাইরের মেঘেদের দিকে তাকিয়ে বলল, “ও হো, এটা? আমার কুইনের ভয়েস শুনছিলাম।”
কারান নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল। ফারহান সিটে একটু আরাম করে হেলান দিয়ে যোগ করল, “তোর তো পার্মানেন্ট সঙ্গিনী আছে রে ভাই, আমার তো সেই লাক নেই। তাই প্রতিবার কথা বলার সময় আমি ওর কণ্ঠ রেকর্ড করে রাখি। যখনই একা থাকি বা মন খারাপ হয়, এই ভয়েস নোটগুলো শুনি। বিশ্বাস কর, জাস্ট ম্যাজিকের মতো কাজ করে।”
ফারহানের চেহারার সেই নির্মল উজ্জ্বলতা দেখে কারান বুঝতে পারল, তার বোনকে এই মানুষটি ঠিক কতটা গভীরতা দিয়ে অনুভব করে। কারানের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটে উঠল। যাক, অন্তত তার বোনটি সঠিক মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছে।
ফারহান হঠাৎ একটু দুষ্টুমিভরে কারানের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা ভাই, তোর বোন কি কি ডিশ রান্না করতে পারে?”

“জানি না। কেন?”
ফারহান এক গাল হেসে বলল, “না, ভাবছিলাম বিয়ের পর কিচেন সামলাবে কে? সত্যি বলতে, আমি আমার বউকে দিয়ে হাড়ভাঙা খাটুনি করাতে চাই না। ও জাস্ট রাজকন্যার মতো বসে হুকুম করবে আর খাবেদাবে। আর রাত হলে আমাকে আদর করলেই চলবে!”
ফারহানের আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে কথা বলা শুনে কারানের বাম ভ্রূ কিঞ্চিৎ উঁচু হলো। সিটে আরাম করে হেলান দিয়ে সে নির্বিকার কণ্ঠে শুধালো, “ও রান্না না করলে কে করবে?”
“কেন, আমি করব! আমার হাতের স্পেশাল রান্না তো তুই একবার খেয়েছিলি। খুব বেশি খারাপ লেগেছিল কি?” ফারহান বেশ বুক ফুলিয়ে বলল।
“না। খারাপ না। জঘন্য। লাইক… টক্সিক ওয়েস্ট।”
“এ ভাই, এভাবে বলিস না! অনেক এফোর্ট দিয়েছিলাম সেদিন।”
কারান এবার সরাসরি ফারহানের চোখের দিকে তাকিয়ে গম্ভীরতায় বলল, “ভুলেও আমার বোনকে তোর ওই অখাদ্যগুলো গেলাতে যাবি না। ওর যদি ফুড পয়জনিং বা হেলথ রিলেটেড কোনো প্রবলেম হয়, তবে গুণে গুণে রিভলভারের ছয়টা গুলিই তোর পেটে লোড করব। আই অ্যাম নট জোকিং।”
ফারহান হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। কারান যে এক কথার মানুষ, সেটা তার চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না। ফারহানের এই বিমূঢ় অবস্থা দেখে কারান ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল, “বাই দ্য ওয়ে ফারহান, একটা বিষয় মাথায় ঢুকছে না। তুই তো এতবার ইনটিমেট হয়েছিস, অথচ আজ পর্যন্ত কোনো গুড নিউজ এলো না কেন? তোর আবার ওই প্রবলেম নেই তো?”

ফারহান দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরে বিরক্তিতে ফেটে পড়ল, “ভাই, ওগুলো জাস্ট সেফটি মেজারস বা হেলমেট ব্যবহারের ফল। প্রোটেকশন বলে একটা কথা আছে তো নাকি?”
“উঁহুঁ, তোকে আমার ডাউট হচ্ছে। প্রপার চেক-আপ দরকার।”
“তুই শালারপো বউয়ের কাছ থেকে আসলেই লুচ্চামি শুরু করিস।”
কারান এবার জানালার বাইরের বিস্তৃত মেঘমালার দিকে তাকিয়ে একটা লম্বা শ্বাস নিল। ফারহানকে খেপানোর জন্য যোগ করল, “আসলে তোর নসিব দেখে আমার মাঝেমধ্যে মায়া হয়। আমার লাকটা দেখ, চাইলেই মিরাকে একটা ডোজ দিয়ে নিজের এনার্জি রিচার্জ করতে পারি। বাট তুই… ইয়োর হ্যান্ড মাস্ট বি টায়ার্ড ফ্রম চোকিং ইয়োর চিকেন টু দোজ ভয়েস নোটস অল ডে।”
ফারহান আগুনের দৃষ্টিতে কারানের দিকে তাকাল। ইচ্ছে ছিল কারানের পাঁজরে কষে একটা পাঞ্চ দেওয়ার, কিন্তু কারান তখন এমন ভাবলেশহীন মুখ করে বসে আছে যেন সে পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্পাপ কথাটি বলেছে।

প্রাইভেট জেট থেকে নেমে কারান শীতল বাতাস ফুসফুসে টেনে নিল। ফারহান নিজের জ্যাকেট সামলে এগিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই কারান তার সামনে সেই শপিং ব্যাগটা বাড়িয়ে ধরল। তারান্নুমের ওপর মেজাজ খারাপ থাকায় এতক্ষণ এটা দেওয়ার কথা তার মস্তিষ্কের নিউরনে ছিল না।
ফারহান অবাক হয়ে ব্যাগটা ধরল। কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই কারান বলল, “তরু দিয়েছে।”
কথাটা শোনামাত্র ফারহানের দুই চোখ বিস্ময়ে গোল গোল হয়ে গেল। তার মুখমণ্ডলে যেন কয়েক হাজার ওয়াটের আলো জ্বলে উঠল। ব্যাগের ভেতর কী আছে তা দেখার আগেই কারান ফারহানের হাতের দিকে তীক্ষ্ণ নজর দিল। মুহূর্তেই তার কপাল কুঁচকে গেল।
“এই… এই ব্রেসলেট তোর হাতে এলো কী করে?”

ফারহান বেশ ভাব নিয়ে নিজের কবজিটা নেড়েচেড়ে দেখল। নীল হীরাটি সূর্যের আলোয় চিকচিক করছে। সে হেসে বলল, “ওহ এটা! সেদিন কুইনের হাতে এই মাস্টারপিস ব্রেসলেটটা দেখে আমার দারুণ পছন্দ হয়ে গিয়েছিল। তাই ইমিডিয়েটলি একটা রেপ্লিকা বানিয়ে নিলাম। কাপল ব্রেসলেট! আইডিয়াটা অসাম না?”
কারান আর তর্কে গেল না। কেবল একটা হতাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামনে হাঁটতে লাগল। ওদিকে ফারহান আড়ালে গিয়ে উত্তেজনায় কাঁপাকাঁপা হাতে ব্যাগটা খুলল। ধবধবে সাদা পাঞ্জাবিটা বের করতেই তার মুগ্ধতা কয়েক গুণ বেড়ে গেল। তারান্নুমের পছন্দ যে এত ক্লাসি, তা সে জানত না। সে পাঞ্জাবিটা নাকের কাছে নিয়ে গভীর করে শ্বাস টানল। প্রিয়তমার হাতের ছোঁয়া লেগে থাকা কাপড়ের ঘ্রাণ যেন তার স্নায়ুতে প্রশান্তি এনে দিল।
“অনেক হয়েছে। আর ওয়েট করা পসিবল না। এই মিশন-ফিশনটা সাকসেসফুলি শেষ করে দেশে ফিরেই তোমাকে বিয়ে করব, গ্লিমার! তারপর যা হওয়ার দেখা যাবে।”

Tell me who I am 2 part 15

কারান পার্কিং লটের দিকে এগিয়ে যেতেই দেখল, একটি ‘কাওয়াসাকি নিনজা এইচ-টু-আর’ বাইকের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আয়লা। পরনে ব্ল্যাক লেদার রাইডিং জ্যাকেট, ভেতরে ধূসর রঙের গ্রাফিক টি-শার্ট, আর ফিটিং ব্লু ডেনিমের সাথে পায়ে শাইনি অ্যাঙ্কল বুট। তার ফিঙ্গারলেস গ্লাভ্‌স পরা হাতে বাইকের চাবিটা অবিরাম ঘুরছে।
কারানকে দেখা মাত্রই আয়লার কঠোর মুখাবয়বে ঝিলিক খেলে গেল। তার ন্যুড লিপস্টিক মাখানো ঠোঁটে একটা তীর্যক হাসি ফুটল। কারান একদম সামনে এসে দাঁড়াতেই আয়লা তার নীল চোখের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, “লং টাইম নো সি।”

Tell me who I am 2 part 16