Home Tell me who I am 2 Tell me who I am 2 part 16

Tell me who I am 2 part 16

Tell me who I am 2 part 16
আয়সা ইসলাম মনি

কারান তোয়ালে দিয়ে ঘাড়ের অবশিষ্ট জলবিন্দুগুলো মুছতে মুছতে ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করল। ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে চলা এসির হিমেল হাওয়া শরীরে লাগতেই কারানের মেরুদণ্ড দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। টি-টেবিলের ওপর রাখা ম্যাকবুক প্রোর রেটিনা ডিসপ্লের নীলচে আভা ফারহান আর আয়লার মুখাবয়বে কৃত্রিম ছায়া ফেলেছে। ফারহানের আঙুলগুলো মেকানিক্যাল কী-বোর্ডের ওপর দিয়ে প্রমত্ত বেগে ছুটছে। পাশে বসা আয়লা মন্ত্রমুগ্ধের মতো স্ক্রিনের ডেটা স্ট্রিম লক্ষ্য করছে, আর তার আইপ্যাডে অ্যাপল পেনসিল দিয়ে দ্রুত কিছু এনক্রিপ্টেড কোড নোট করছে।
কারান লেদার সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে তোয়ালেটা পাশে রাখল। তার পেশিবহুল শরীরের টানটান ভাব জানান দিচ্ছে সে মানসিকভাবে চূড়ান্ত যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। আয়লা স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই তীক্ষ্ণ স্বরে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, “প্ল্যান কী?”

কারান সামান্য সামনের দিকে ঝুঁকে বসল। ঘাতকের ন্যায় তীক্ষ্ণ নজরে তাকিয়ে, শান্ত গলায় বলল, “ইব্রাহিম বিন জায়েদ কোনো অর্ডিনারি প্লেয়ার নয়। বয়স পঞ্চাশ ছাড়িয়ে যেতে পারে, কিন্তু ওর নেটওয়ার্ক আর এক্সপেরিয়েন্স অকল্পনীয়। ও দুবাইয়ের রয়্যাল সার্কেলের গোল্ডেন বয়, আর স্থানীয় অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ওর পকেটে। ইভেন আমাদের দেশের পিএম-ও ওর রিয়েল এস্টেট প্রজেক্টের সাইলেন্ট পার্টনার। তো বুঝতেই পারছো, আমাদের এক ইঞ্চি ক্যালকুলেশন এদিক-ওদিক হওয়া মানে এই সিটি থেকে আমাদের ডেড বডি বের হবে।”
ফারহান তার চশমাটা নাকের ওপর ঠেলে দিয়ে ল্যাপটপের স্ক্রিনটা কারানের দিকে ঘুরিয়ে ধরল। “দেখ কারান, ইব্রাহিমের পুরো সিকিউরিটি সিস্টেম এনক্রিপ্টেড। আমি অলরেডি ওর পার্সোনাল ক্লাউডে একটা ব্যাকডোর ক্রিয়েট করেছি। বাট হিয়ার ইজ দ্য ক্যাচ, মেয়েদের পাচার করার রুট ম্যাপ আর অর্গান ট্রান্সপ্ল্যান্টের জন্য যে ইনভেন্টরি লিস্ট থাকার কথা, সেটা ওর মেইন সার্ভারে নেই। ওটা একটা এয়ার-গ্যাপড অফলাইন হার্ড ড্রাইভে রাখা হয়েছে, যেটা ও সব সময় ওর লাক্সারি ইয়ট অথবা গোপন ডেরায় নিজের কাছে রাখে। লোকটা ওল্ড স্কুল, ডিজিটাল ট্রেইল রাখতে চায় না।”

আয়লা তার হাতের দামি পান্না বসানো আংটিটা ঘুরাতে ঘুরাতে নির্লিপ্ত স্বরে বলল, “সেই জন্যই আমাদের কালকের গালা ডিনারে প্রেজেন্সটা মাস্ট। ইব্রাহিমের প্রাসাদে কাল একটা বিশাল জলসা। আচ্ছা ফারহান, তুমি কি ওর শ্যালক জেহেরের প্রোফাইলটা বের করতে পেরেছ?”
আয়লা ভ্রূ কুঁচকে ফারহানের দিকে তাকাল। ফারহান দ্রুত মাউস ক্লিক করে একটা হাই-ডেফিনিশন ছবি জুম করল। ছবিতে এক সুদর্শন যুবককে দেখা যাচ্ছে।
ফারহান এক ভ্রূ উঁচিয়ে বলল, “হ্যাঁ, জেহের। শালায় ইব্রাহিমের রাইট হ্যান্ড হলেও ইমোশনালি বেশ ভালনারেবল। বিশেষ করে প্রিটি ওম্যান আর হাই-স্টেক গ্যাম্বলিং ওর পুরোনো সিকনেস। এটার কথা তো তোমাকে আগেও বলেছিলাম।”

আয়লা আড়চোখে ফারহানের দিকে চেয়ে সামান্য বাঁকা হাসল, “তুমি আমাকে বলেছিলে?”
ফারহান অপ্রস্তুত হয়ে কপাল চুলকাতে চুলকাতে বিড়বিড় করল, “ওই তো হলো, ইয়ার! তুমিই আগে থেকে জেনে বসেছিলে আরকি।”
আয়লা এবার কারানের দিকে সরাসরি তাকালো। অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে বলল, “কারান, কাল রাতের ইভেন্টে তুমি ইব্রাহিমকে এনগেজ রাখবে। তোমার মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের এনার্জি প্রজেক্টের টোপটা দাও। ওকে এমনভাবে ম্যানিপুলেট করো যেন ও মনে করে তুমি ওর সবচেয়ে বড়ো ভেন্ডর হতে যাচ্ছ। ও যখন তোমার সাথে ফিউচার ডিল নিয়ে ফ্যান্টাসিতে থাকবে, ঠিক সেই সুযোগে আমি জেহেরকে টার্গেট করব। আমাদের যে-কোনো মূল্যে ওই ড্রাইভটা পেতেই হবে।”

কারান ডান হাতের তর্জনী দিয়ে ডান ভ্রূ-র ওপরটা সজোরে ঘষছে, অত্যন্ত মনঃসংযোগের সময় এটি তার চিরচেনা মুদ্রাদোষ। ইব্রাহিমের মতো একজন ধুরন্ধর হাঙ্গরকে তার নিজস্ব জলসীমায় পরাস্ত করাটা যে আত্মঘাতী বোকামি হতে পারে, সেটা কারান ভালো করেই জানে। সে আলতো করে ম্যাকবুকটা নিজের কোলে টেনে নিল। ফারহান আগেই ইমেইলে গত এক সপ্তাহের হিট ম্যাপ পাঠিয়েছিল। কারান এখন সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করছে তারা শহরের কোন পয়েন্টগুলোতে সবচেয়ে বেশি সময় অতিবাহিত করেছে। সেই নির্দিষ্ট কোঅর্ডিনেটসের আশেপাশে কোনো সিগন্যাল জ্যামার কিংবা পাবলিক-প্রাইভেট সিসিটিভি আর্কিটেকচার আছে কি না, ফারহান তা আগেই ভেরিফাই করে রেখেছে। যদিও এই হাই-প্রোফাইল জোনগুলোতে সাধারণত সারভেইল্যান্স থাকে না বললেই চলে, তবুও কোনো ব্লাইন্ড স্পট রাখা যাবে না।

কারান গত কয়েকদিন ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত থাকা অবস্থাতেও, ওদের প্রতিটি পদক্ষেপ অত্যন্ত সূক্ষ্ম বিচার-বুদ্ধি ও গাণিতিক নির্ভুলতায় বিশ্লেষণ করেছে। আয়লা ও ফারহান ইতোমধ্যে প্রারম্ভিক প্রস্তুতির প্রায় অর্ধাংশ সুসম্পন্ন করেছে। তবে সংকটের মূল উৎস এর ভূ-রাজনৈতিক গভীরতা। বিভিন্ন রাষ্ট্রের সরকারপ্রধান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ইন্টারপোলের কতিপয় দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা এই আন্তঃরাষ্ট্রীয় মানবপাচার চক্রের লভ্যাংশভোগী।
​এই মানবপাচার ও অর্গান হারভেস্টিং সিন্ডিকেটের যাবতীয় তথ্য যদি একযোগে জনসমক্ষে উন্মোচিত হয়, তবে বিশ্বজুড়ে এক চরম অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলার সূত্রপাত হবে; প্রশাসনের ওপর থেকে জনসাধারণের আস্থা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
​ফারহান বর্তমানে ডার্ক ওয়েবের একটি নিভৃত ফোরামে পাচারকারীদের বিশেষ ‘সাংকেতিক ভাষা’ পাঠোদ্ধারে নিমগ্ন। সেখান থেকেই সে কিছু অস্থিমজ্জা হিম করা তথ্য উদ্ধার করেছে। কারান কোনো বাক্যব্যয় না করেই আয়লার দিকে হাত বাড়ালো। আয়লা তার তীক্ষ্ণ প্রজ্ঞা দিয়ে কারানের অভিপ্রায় অনুধাবন করতে পারল। সে তৎক্ষণাৎ ড্রয়ার থেকে একটি ভাঁজ করা নকশা বের করে কারানের হাতে অর্পণ করল। এটি ইব্রাহিমের সেই প্রাসাদের স্থাপত্য-বিন্যাস, যেখানে আসন্ন অনুষ্ঠানটি আয়োজিত হবে।

কারান দাড়ি চুলকাতে চুলকাতে ব্লু-প্রিন্টটা দেখতে শুরু করল। গম্ভীর গলায় বলল, “আমরা পার্টিতে এন্ট্রি নেওয়ার সাথে সাথে ফারহান ওখানকার সিসিটিভি আর লেজার অ্যালার্ম সিস্টেম হ্যাক করে নেবে। মূলত ফারহান এবার ভেন্যুর ভেতর যাবে না, যতক্ষণ না প্রয়োজন। বাইরে সেফ ডিস্টেন্সে থেকে তুই আমাদের রিয়েল-টাইম গাইডেন্স দিবি। আর নিজেদের মধ্যে কোনো ডিজিটাল কমিউনিকেশন হবে না, শুধু চোখের ইশারা আর ট্যাকটিক্যাল হ্যান্ড সিগন্যাল ব্যবহার করব।”
আয়লা ঘাড়টা সামান্য কাত করে প্রশ্ন করল, “দ্যাট মিনস, শুধু তুমি আর আমি ভেতরে থাকছি! ব্যাপারটা একটু বেশি রিস্কি হয়ে যাচ্ছে না?”
“এমেকাও থাকবে। ওকে বডিগার্ড হিসেবে শো-অফ করব। কিন্তু আসল প্রবলেম হলো সিকিউরিটি চেক। ওরা আমাদের বডি স্ক্যান করবে। কোনো ধরনের মেটাল উইপন নিয়ে ভেতরে ঢোকা ইমপসিবল। মেটাল ডিটেক্টরে বিফ করলেই সব শেষ।”

আয়লা এক চিলতে রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে তুলল।
“মেটাল ছাড়া কীভাবে অস্ত্র ক্যারি করতে হয়, সেই ট্রিক আমার জানা আছে। ডোন্ট ওয়ারি অ্যাবাউট দ্যাট।”
কারান এবার আয়লার চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। এই মেয়েটির সাহসের গভীরতা মাপা কঠিন। কারান ম্যাকবুকটা টেবিলে রেখে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। কক্ষের একদিকের পুরো দেয়ালটা নিরেট কাচের, যেখান থেকে দুবাইয়ের নৈশকালীন স্কাইলাইন দেখা যায়। কারানের পরনে একটি কালো হাফ-স্লিভ টি-শার্ট আর ট্রাউজার। তার সুঠাম পেশিবহুল হাত দুটোর টানটান গঠন আর কাঁধের চওড়া ভঙ্গি আয়লার নজর এড়াতে পারল না। আয়লা সোফায় হেলান দিয়ে চোখে অদ্ভুত মুগ্ধতা আর নির্ভরতা নিয়ে কারানের দিকে তাকিয়ে রইল। ফারহান বিষয়টা লক্ষ্য করে তীর্যক হাসলেও নিজের কাজে মগ্ন থাকল।
কারান কাচের জানালার ওপাশে তাকিয়ে দৃঢ় গলায় বলল, “ইব্রাহিমের পার্সোনাল গার্ডরা মোসাদের লেভেলে ট্রেন্ড। আমি আবার বলছি আয়লা, এটা কোনো ফিকশন নয়। আমি চাই না আমার কোনো ভুলের জন্য তুমি ট্র্যাপে পড়ো। আর ইউ শিউর যে তুমি জেহেরকে সাইডলাইন করতে পারবে?”

আয়লা ল্যাপটপ বন্ধ করে কারানের বাম পাশে গিয়ে দাঁড়াল। কারানের মনে তার জন্য উদ্বেগ রয়েছে জেনে তার মুখমণ্ডল প্রশান্ত হাসিতে উদ্ভাসিত হলো। দুই হাত বুকের কাছে গুঁজে সে আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল, “একজন ইন্টেলিজেন্ট থিফ কখনো সিন্দুকের তালা ভাঙে না, সে সোজা চাবিওয়ালাকেই নিজের কন্ট্রোলে নিয়ে নেয়। জেহের কাল রাতে আমার সামনে বসলে নিজেই নিজের সব সিক্রেট উগরে দেবে। দ্যাটস এ প্রমিস।”
ফারহানও এবার কারানের অন্যপাশে এসে দাঁড়াল। পকেটে হাত দিয়ে পেশাদার ভঙ্গিতে বলল, “আমি অলরেডি তোমাদের টাই-পিন আর ইয়াররিংয়ে মাইক্রো-ট্র্যাকার আর ন্যানো-রিসিভার সেট করে দিয়েছি। আমি বাইরে ভ্যানে বসে তোমাদের সব অডিয়ো-ভিডিয়ো ফিড মনিটর করব। যদি দেখি সিচুয়েশন হাতের বাইরে যাচ্ছে, আমি সাথে সাথে পুরো এলাকার জিপিএস আর লোকাল পুলিশের রেডিয়ো ফ্রিকোয়েন্সি জ্যাম করে দেব।”
কারান জানালার ওপাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বুর্জ খলিফার দিকে তাকিয়ে চূড়ান্ত রায় দিল, “পরশু রাতের পর ইব্রাহিমের এই ডার্ক এম্পায়ার তাসের ঘরের মতো কলাপস করতে শুরু করবে। গেট রেডি ফর দ্য শো।”
তিন জোড়া চোখ তখন দুবাইয়ের রাতের আকাশের দিকে নিবদ্ধ। তাদের স্তব্ধ দৃঢ় উপস্থিতিই বলে দিচ্ছিল, এই খেলার শেষ তারা দেখেই ছাড়বে।

গতকাল থেকে মিরার মস্তিষ্কের ধূসর কোষগুলোতে কেবল একটি চিন্তাই অবিরাম আবর্তিত হচ্ছে, কৌশিকা পরপুরুষের হাত ধরে গৃহত্যাগ করেছে, এবং কারান সেই ঘটনার চাক্ষুষ সাক্ষী! এই চৌধুরি বাড়ির পরতে পরতে যেন কেবল রহস্যের ঘনঘটা। মিরার অন্তরাত্মা কেন জানি এই পলায়ন এর উপাখ্যান মেনে নিতে পারছে না। যেখানে আম্বিয়া জমাদ্দার কিংবা ফাতিমার মতো সদস্যদের জীবনের প্রতিটি পরিচ্ছেদে কালিমালিপ্ত অতীতের চিহ্ন বিদ্যমান, সেখানে কৌশিকার অন্তর্ধান সেরেফ একটি সাধারণ প্রেমঘটিত পলায়ন হবে—তা বিশ্বাস করা দুষ্কর।
ভোরবেলা ফজরের নামাজ শেষ করে মিরা আম্বিয়ার কক্ষের দিকে পা বাড়ালো। দীর্ঘ বিরতির পর স্নেহের এই নাতবউকে কাছে পেয়ে অশীতিপর আম্বিয়ার চোখে-মুখে যেন পূর্ণিমার আলো ফুটে উঠল। বয়সের ভারে চামড়া কুঁচকে গেলেও আম্বিয়ার আভিজাত্য কমেনি; তিনি মিরার মুখখানি দুই হাতে আগলে নিয়ে পরম মমতায় কপালে একটি চুমু আঁকলেন। মিরাও বেশ খানিকটা সময় এই বর্ষীয়ান নারীর সান্নিধ্যে কাটাল। কয়েকবার কৌশিকার প্রসঙ্গটি জিহ্বার ডগায় চলে এসেছিল, কিন্তু মিরা নিজেকে সংযত করল। আম্বিয়া যদি এ বিষয়ে অজ্ঞ থাকেন, তবে অহেতুক কৌতূহল এই বৃদ্ধ বয়সে তার মস্তিষ্কের ওপর বাড়তি স্নায়বিক চাপ সৃষ্টি করবে। আর এই শক্তপোক্ত মানুষটাকে মিরা কোনো মানসিক দ্বন্দ্বে ফেলতে চায় না।
আম্বিয়ার কক্ষ থেকে বের হয়ে মিরা স্থির করল রান্নাঘরে গিয়ে ফাতিমাকে সকালের খাবার বানানোর কাজে সহায়তা করবে। তাতে যেমন কাজের ভার লাঘব হবে, তেমনি নির্জনে কিছু আলাপ জমানো যাবে। ফাতিমা চরিত্রটি বড়োই বিচিত্র!

মানুষটা সারাজীবনই ক্লেশ আর দহন বুকে নিয়েই পথ চলেছে। ফাতিমা নিতান্তই সরল ও অনাড়ম্বর এক মানুষ, কথা বললে মনে হয় যেন আরও শুনি। অথচ সেই মানুষটিই একদিন হ’ত্যা করেছে! নিঃসন্দেহে তার যন্ত্রণার গভীরতা সাধারণ মানুষের অনুধাবনের বাইরে। এসব প্রাগৈতিহাসিক চিন্তার জটাজাল মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে মিরা যখন দীর্ঘশ্বাস ফেলে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াবে, ঠিক তখনই বহিরাঙ্গন পেরিয়ে তুব্বাকে আসতে দেখল।
তুব্বার মুখমণ্ডলে বিমল আনন্দের আভা থাকলেও কপালে আর নাসারন্ধ্রে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। তার পরনের কমলা রঙের ফ্রকটিতে কর্দমাক্ত মাটির দাগ লেগে আছে। মাথার দুপাশে পরিপাটি করে বাঁধা বেণি দুটি কিছুটা অবিন্যস্ত। মায়ের মতো গাত্রবর্ণ শ্যামল হলেও তুব্বার এই বয়সের লাবণ্য যে কাউকেই মুগ্ধ করার মতো। গায়ের ওপর শীতের জ্যাকেট থাকলেও তার চলনে কোনো জড়তা নেই। মিরা তুব্বার পথ আগলে ধরে তার হাতটা আলতো করে ধরল।

“ব্যাপার কী, তুব্বা? পৌষের এই হিমেল সকালেও তুমি ঘেমে-নেয়ে একাকার কেন?”
মিরাকে দেখা মাত্রই তুব্বার ঠোঁটের কোণে প্রাণবন্ত হাসি উদ্ভাসিত হলো।
“তোমারেই তো খুঁজতে যাইতেছিলাম, ভাবি! আর ঘামছি ক্যান জানো?”
এটুকু বলে তুব্বা মিরার কবজি দুটি শক্ত করে ধরল। মিরার ভ্রূদ্বয় বিস্ময়ে কিঞ্চিৎ কুঞ্চিত হলো। তুব্বা রহস্যময় স্বরে বলল, “হাত দুইটা একসাথ করো তো আগে।”
মিরা কৌতূহলী হয়ে মোনাজাত করার ভঙ্গিতে নিজের অঞ্জলি প্রসারিত করল। তুব্বা এবার তার ঘাড়ের পিছনে ফেলে রাখা ওড়নাটা সামনে এনে, সেটার প্রান্তে প্যাঁচানো পুঁটলির গিটটা খুলল। ওড়নার সেই অস্থায়ী ভাণ্ডার থেকে বেরিয়ে এলো গোটা-কতক টকটকে লাল এবং হলদেটে বর্ণের বরই। তুব্বা দুই মুঠ ভরে সেই রসালো ফলগুলো মিরার অঞ্জলিতে তুলে দিল।

মিরার চোখ দুটি বিস্ময় আর আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তুব্বা খিলখিল করে হেসে বলল, “এইগুলা ওই পশ্চিম পাড়ার গাছের নীচ থেইকা টোকাইছি। দেরি করলে ওই ইশা আর নাফিসা সব নিয়া যাইত। পাকা বরই ভাবি, খাইতে অনেক মজা কিন্তু! তুমি খাও, আমি যাই, বাকিগুলা নানি আর মারে দিয়া আসি।”
কথাটি শেষ করেই চঞ্চল হরিণীর মতো তুব্বা রান্নাঘরের দিকে দৌড়ে গেল। মিরা অবাক বিস্ময়ে নিজের হাতের বরইগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। শহুরে যান্ত্রিকতায় গ্রামীণ এই অকৃত্রিম স্বাদের কথা সে ভুলেই গিয়েছিল। তুব্বার এই সারল্যমাখা উপহার মিরার হৃদয়ের গুমোট মেঘগুলোকে মুহূর্তের জন্য হলেও সরিয়ে দিল।
মিরা পা চালিয়ে এবার অট্টালিকার পেছনের নিভৃত প্রাঙ্গণে চলে গেল। সম্মুখেই বিস্তীর্ণ এক পুকুর, যার স্থির জলরাশি আকাশের নীলিমাকে ধরে রেখেছে। পাড়ের একপাশে শ্বেতপাথর আর টাইলসের কারুকাজ করা একটি সুপরিসর বেঞ্চ রয়েছে। মিরা সন্তর্পণে চারপাশটা অবলোকন করে নিল; না, এই মুহূর্তে জনমানবের চিহ্নমাত্র নেই। থাকবেই বা কেন, এই ভূখণ্ড তো চেয়ারম্যান মুস্তাফা কামাল চৌধুরীর ব্যক্তিগত অভয়ারণ্য, যেখানে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করার স্পর্ধা এই তল্লাটে কারোর নেই।

মিরা অধরকোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বেঞ্চে বসল। অঞ্জলি ভরে আনা বরইগুলো সযত্নে টাইলসের উপর স্তূপ করে রাখল। শীতের সকালের স্নিগ্ধ রোদে ঝিকমিক করা বরইগুলো ধুয়ে নেওয়ার ভাবনায় সে উঠে দাঁড়াল। কাঁধের পশমি চাদরটি খুলে ভাঁজ করে বেঞ্চের ওপর রাখল। এরপর অত্যন্ত নিপুণতায় তার নীল শাড়ির আঁচলটি কোমরে পাকিয়ে গুঁজে নিল, যাতে জলে নামার সময় কোনো বিভ্রাট না ঘটে। পুষ্করিণীর শ্যাওলাহীন ঘাটের সিঁড়ি বেয়ে সে নিচে নেমে এলো। স্বচ্ছ শীতল জলে হাত ডোবাতেই তীব্র শিহরন তার মেরুদণ্ড বেয়ে বয়ে গেল। ওপাশে জলের উপরিভাগে সকালের ম্লান রোদ চিকচিক করছে। মিরা আনমনে বরইগুলো ধুতে থাকল।
“এই পিচ্ছিল ঘাটে একবার পা ফসকে অতল জলে তলিয়ে গেলে কিন্তু রক্ষা নেই। সোজা পরকালের টিকিট কেটে উপরওয়ালার দরবারে হাজিরা দিতে হবে।”
এক জরাগ্রস্ত, কম্পমান কণ্ঠস্বরের আকস্মিক আবির্ভাবে মিরার ধমনিতে রক্তস্রোত মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। সে চট করে পেছন ফিরে তাকাতেই দেখল, এক জরাজীর্ণ বৃদ্ধ লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। লোকটির হাত-পা বার্ধক্যজনিত কারণে অনবরত কাঁপছে। মিরার ভ্রূ মুহূর্তেই কুঁচকে গেল। চেয়ারম্যান বাড়ির এই সংরক্ষিত এলাকায় এই অসময়ে জনৈক অপরিচিত বৃদ্ধের প্রবেশ রীতিমতো এক প্রহেলিকা। ভয়ের চেয়ে বিস্ময়ই তাকে বেশি আচ্ছন্ন করল।

সে দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল, “আ… আপনি! কে আপনি? আর এই নিষিদ্ধ সীমানায় কীভাবে ঢুকলেন?”
বৃদ্ধের বলিরেখা পড়া মুখে প্রশান্ত হাসির রেখা ফুটে উঠল। মিরা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আগন্তুককে পরখ করতে লাগল। লোকটির গাত্রবর্ণ তামাটে শ্যামল। গায়ে জড়ানো একটি নোংরা ধূসর চাদর, তার নিচে মলিন এক পাঞ্জাবি। কপাল বরাবর একটি পুরোনো ক্ষতের চিহ্ন দৃশ্যমান। অবিন্যস্ত শ্মশ্রুমণ্ডিত চেহারা; বার্ধক্যের ভারে নুয়ে পড়লেও তার দৃষ্টিতে মায়া আর গভীরতা প্রচ্ছন্ন।
বৃদ্ধ মৃদু স্বরে বললেন, “ঘাবড়ানোর কিছু নেই। এই জনপদের আবালবৃদ্ধবনিতা সবাই আমাকে চেনে। প্রতিদিন কাকডাকা ভোরে একবার পুরো গ্রাম পরিভ্রমণ করি। আপনার (নিজের) মানুষের অভাব, হাতেও কোনো কর্ম নেই, তাই এই যাযাবরের মতো ঘুরে বেড়ানোই এখন আমার নিয়তি।”

কথাগুলো মিরার কানে কেমন যেন মধুর সুরের মতো বাজল, তবে সে গভীরে ভাবার সময় পেল না। দ্রুত কোমরের আঁচলটি ছেড়ে দিয়ে, পিছন থেকে টেনে নিয়ে নিজেকে আবৃত করে নিল। দেখল, হাড়কাঁপানো শীতে বৃদ্ধটি রীতিমতো থরথর করে কাঁপছেন। মিরা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে বেঞ্চ থেকে নিজের চাদরটি তুলে নিল। অত্যন্ত আন্তরিকতায় সেটি বৃদ্ধের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “এই চাদরটা আপনি রাখুন। আপনারটা বড়োই জরাজীর্ণ, ওটা ত্যাগ করুন। আর বরং আমার সাথে ভিতরে চলুন, আপনাকে দেখে বড় ক্লান্ত মনে হচ্ছে। একটু বিশ্রাম নিয়ে নাহয় ফিরবেন।”

বৃদ্ধের ওষ্ঠাধরে পুনরায় সেই মরমি হাসি ফুটে উঠল। চাদরটি গ্রহণের সময় বৃদ্ধের আঙুলের সামান্য স্পর্শ মিরার হাতের তালুতে লাগতেই সে অজানা শিহরনে চমকে উঠল। লোকটার শরীর যেন বরফের চেয়েও শীতল!
বৃদ্ধ শান্ত কণ্ঠে বললেন, “পরের বার।”
অর্থাৎ তিনি পুনরায় আসবেন, এই মৌন প্রতিশ্রুতি দিয়ে বৃদ্ধ যেই প্রস্থান করতে উদ্যত হলেন, মিরা তৎক্ষণাৎ ডাক দিল, “একটু দাঁড়ান!”
বৃদ্ধ মুহূর্তেই পদদ্বয় স্থির করলেন, কিন্তু একবারের জন্যও পেছন ফিরে তাকালেন না। মিরা দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে তার সম্মুখভাগে দাঁড়াল। এরপর স্মিত হেসে বলল, “আপনার হাতটা পাতুন দেখি।”
বৃদ্ধ লোকটা মিরার চোখের দিকে অতিশয় সূক্ষ্ম ও তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে ধীরলয়ে নিজের জরাজীর্ণ ডান হাতটা প্রসারিত করলেন। মিরা তার পরিচ্ছন্ন অঞ্জলি থেকে সিক্ত ও রক্তিম বরইগুলো পরম মমতায় বৃদ্ধের হাতে তুলে দিল। এরপর আর কোনো বাক্যব্যয় না করে সে পশ্চাৎপদে নিজের আসনের দিকে ফিরে আসতে লাগল। ওদিকে সেই রহস্যময় আগন্তুকের ওষ্ঠাধরে এক পশলা কুটিল ও তৃপ্ত হাসির রেখা প্রস্ফুটিত হলো। তিনি স্বীয় বাম হাতে নিজের জীর্ণ চাদরটি গুটিয়ে নিয়ে, মিরার দেওয়া নতুন পশমি চাদরটি আভিজাত্যের সাথে অঙ্গে জড়িয়ে নিলেন। এরপর একটি বরই অবলীলায় শূন্যে নিক্ষেপ করে, হা করে অত্যন্ত ক্ষিপ্রতায় সেটি মুখগহ্বরে গ্রহণ করলেন।

মিরা তখন পারিপার্শ্বিক চিন্তা বিসর্জন দিয়ে দ্রুতপদে বেঞ্চে এসে বসলো। কনকনে শীতের প্রকোপে তার তন্বী দেহটি রীতিমতো কাঁপছে। পুকুরের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে বেশিক্ষণ অবস্থান করা এখন স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বেঞ্চের ওপর রাখা অবশিষ্ট বরইগুলো কুড়িয়ে নেওয়ার জন্য সে হাত বাড়ালো, ঠিক তখনই তার দৃষ্টি স্থির হলো একখণ্ড ভাঁজ করা কাগজের ওপর। মিরা সবিস্ময়ে চারপাশটা একবার পর্যবেক্ষণ করল; এই নির্জন স্থানে এই চিরকুটটি এলো কোত্থেকে? একটু আগেই তো এখানে এমন কিছু ছিল না। সহসা সেই রহস্যময় বৃদ্ধের কথা স্মৃতিপটে উদিত হলো। তিনি কি ভুলবশত এটি এখানে ফেলে গিয়েছেন?
মিরা কাগজটি তুলে নিয়ে বৃদ্ধ যে পথে হেঁটে গিয়েছিলেন, সেদিকে কয়েক কদম দ্রুতপদে এগিয়ে গেল। কিন্তু বিস্ময়ের চরম সীমায় পৌঁছে সে দেখল, দৃষ্টিসীমার কোথাও সেই বৃদ্ধের চিহ্নমাত্র নেই।
মিরা বিড়বিড় করে আপনমনেই বলে উঠল, “অবিশ্বাস্য! মানুষটা এত দ্রুত চোখের আড়াল হলো কীভাবে?”
অবশেষে কৌতূহলের কাছে হার মেনে মিরা কম্পিত হাতে কাগজের ভাঁজটি উন্মোচন করল। নিবিষ্ট মনে পাঠ করতে শুরু করল,

‘হে রহস্যময়ী,
তোমাকে যতই জানার চেষ্টা করছি, ততই গভীর রহস্যে নিমজ্জিত হচ্ছি। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে শুধু ভাবছি, একটি মেয়ে খু*ন করল, অথচ কেউ টেরও পেল না। এমনকি তার চেহারায় তাকিয়ে কেউ কল্পনাও করতে পারবে না যে সে এক নিপুণ ঘাতক। তার অভিনয়ের দক্ষতা কতটা নিখুঁত হলে এমনটা সম্ভব? স্বয়ং কারান চৌধুরিও তার প্রখর ধীশক্তি দিয়ে তোমার ছদ্মবেশের আড়াল ভেদ করতে পারেনি। অবশ্য, কীভাবে পারবে? এ নারী তার রূপের মোহে পুরো বিশ্বকে নিজের পায়ে আছাড় খাওয়াতে সক্ষম। সেখানে কারান চৌধুরি—ওহ সরি,
আবরার কারান চৌধুরি তাহলে ভালোবাসার মোহে নিমগ্ন এক সাধারণ পুরুষ। অভিনয়ে তোমার সমকক্ষ কেউ নেই। তবে একটুখানি সতর্কবার্তা দিচ্ছি। কারান চৌধুরীকে বুঝতে চেষ্টা করো, লিটল গার্ল। তুমি যদি তাকে ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখো, সেও তোমাকে ভস্ম করার সামর্থ্য রাখে।’

চিঠিটা পাঠ করা মাত্রই মিরার শিরদাঁড়া দিয়ে এক অসহ্য হিমশীতল স্রোত প্রবাহিত হলো। তার সমস্ত দেহ থরথর করে কাঁপতে লাগল। ললাট বেয়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম গড়িয়ে পড়তে লাগল। সেই অজ্ঞাত ব্যক্তি তার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়টি—সেই খু*নের ঘটনাটি কীভাবে অবগত হলো, তা ভাবার অবকাশও পেল না। তাকে ‘অভিনেত্রী’ হিসেবে কেন আখ্যায়িত করা হলো, সেই গ্লানিই তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেতে লাগল। কারানের প্রতি তার অনুরাগ কি তবে সেরেফ অভিনয়? না, এ কথা তো সত্যি নয়!
মিরার চোখ দুটো অশ্রুতে প্লাবিত হয়ে উঠল। হৃৎপিণ্ডের অন্তস্থল থেকে এক হাহাকার গলার সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার হয়ে ফেটে পড়ল, “আমি অভিনয় করিনি! না, আমি অভিনয় করিনি!”
আর্তনাদ করতে করতেই মিরা শক্তিহীন অবস্থায় মাটির ওপর ধপ করে বসে পড়ল। তার শরীরের সমস্ত জীবনীশক্তি যেন নিংড়ে নেওয়া হয়েছে। সে হাতের নখ দিয়ে মাটির বুক খামচে ধরল। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বিড়বিড় করতে লাগল, “কারান, তুমি আমায় বিশ্বাস করো… আমি কোনো ছলনা করিনি। আমি তোমাকে সত্যিই ভালোবাসি। আমার এই ভালোবাসায় কোনো কৃত্রিমতা নেই। বিশ্বাস করো, কারান… আমি তোমাকে আমার জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসি। আমি সত্যিই অভিনয় করিনি…”
অবিরাম ঝরতে থাকা অশ্রুধারা ভেজা মাটির স্তরে মিশে গেল। জমিদার বাড়ির নিভৃত প্রান্তরের সেই পবিত্র মাটি যেন আজ এক ভাগ্যহীনা নারীর অব্যক্ত যাতনা আর আর্তনাদ নিজের পাঁজরে লুকাতে ব্যস্ত।

“ওয়াও! হান্ড্রেড!”
কণ্ঠস্বরের সাথে সাথে একটি ছন্দময় করতালির শব্দ গুমোট কক্ষটিতে প্রতিধ্বনিত হলো।
মেঝের ওপর ঘাম ঝরানো পুশ-আপ সেশনটি আকস্মিক স্থগিত করে কারান আর ফারহান দুজনেই ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকালো। সেখানে দরজার সাথে কনুই ঠেকিয়ে সম্মোহনী ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে আছে আয়লা। আওয়ারগ্লাস ফিগারের এই নারী এমনিতেই লাস্যময়ী, তার ওপর সদ্য সমাপ্ত জিম সেশনের উত্তাপ তাকে আরও বেশি আকর্ষণীয় করে তুলেছে। আয়লার পরনে চারকোল ব্ল্যাক স্পোর্টস ব্রা আর হাই-রাইজ জোগা প্যান্ট; পায়ে দামি ব্র্যান্ডের হোয়াইট ট্রেনিং শু। তার উজ্জ্বল কপাল, তীক্ষ্ণ গাল আর উন্মুক্ত উদরের পেশিবহুল ভাঁজে বিন্দু বিন্দু ঘাম মুক্তোর দানার মতো চিকচিক করছে। কারান তার নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে একবার আয়লার অবয়ব মেপে নিয়ে স্প্রিংয়ের মতো নমনীয়তায় উঠে দাঁড়াল। কারানের ভেজা নেভি-ব্লু ফিটেড টি-শার্টটি তার সুঠাম বুকের পেশির সাথে লেপ্টে আছে। তার পায়ে জগার্স, কবজিতে রিস্টব্যান্ড লাগালো।

কারান আয়লার উপস্থিতিকে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে টি-টেবিলের ওপর রাখা হাইড্রো-ফ্লাস্ক থেকে জলপান শুরু করল। এদিকে ফারহান মেঝের ওপরই হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল। উচ্চমাত্রার শারীরিক কসরতে তার ফুসফুস তখন দ্রুত অক্সিজেন পাম্প করছে। আয়লা তার কাঁধের তোয়ালে দিয়ে ঘাড়ের ঘাম মুছতে মুছতে দুলকি চালে এগিয়ে এলো। তার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন সুপরিকল্পিত কোনো ক্যাটওয়াক। ফারহানের দিকে তাকিয়ে সে বিদ্রুপের সুরে বলল, “এতটা ফিজিক্যালি উইক হলে চলবে, ফারহান? কারানকে দেখো, ও অলরেডি সেঞ্চুরি হিট করে ফেলেছে। আর তুমি মাত্র সিক্সটি-ওয়ান এই হাঁপিয়ে গেছ?”
ফারহান অনেক কষ্টে উঠে বসল। পাশের সোফা থেকে তোয়ালে নিয়ে ঘাড়ের ঘাম মুছতে মুছতে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “জিমে গিয়েছিলে নাকি?”

“হ্যাঁ, এই হোটেলের থার্ড ফ্লোরেই ওয়ার্ল্ড-ক্লাস জিম আছে।”
আয়লা ফারহানের সামনে দাঁড়িয়ে সোফার কোনে পা ঠেকিয়ে, তার জুতোর ফিতে ঠিক করতে করতে পুনরায় বলল, “তোমরাও জয়েন করতে পারতে। শুধু শুধু এই বন্ধ ঘরে কসরত করার মানে হয় না।”
“শুধু শুধু না, আয়লা।” ফারহান তার চশমাটা রুমাল দিয়ে পরিষ্কার করতে করতে যোগ করল, “আমরা আসলে মাসল মেমোরি ঝালাই করার সাথে সাথে কাল রাতের ব্লু-প্রিন্টটাও সাজাচ্ছিলাম। জিমে বাকিদের সামনে তো আর শেখ ইব্রাহিমের সাম্রাজ্য ধ্বংস করার ছক কষা যায় না।”
আয়লা ভ্রূ উঁচিয়ে অবাক হওয়ার ভান করল।
“এমেকা কখন জয়েন করছে আমাদের সাথে?”
ফারহান পাশ থেকে ফোনটা হাতে তুলে কিছু একটা দেখতে দেখতে আওড়ালো, “ওকে পার্টি ভেন্যুতে সরাসরি আসতে বলেছি।”

কারান জলের পাত্রটি শব্দ করে টেবিলে রাখল। আয়লা এবার আলতো পায়ে কারানের দিকে এগিয়ে গেল। তার ঠোঁটের কোণে রহস্যময় কপট হাসি ফুটলো। সে তার হাতের তোয়ালেটা কারানের ঘাড়ের দিকে বাড়িয়ে দিল, উদ্দেশ্য তার শরীরের ঘাম মুছে দেওয়া। কিন্তু কারান এক ঝটকায় তোয়ালেটা কেড়ে নিয়ে আয়লার আরও সন্নিকটে ঝুঁকে এলো। কারানের চোখের মণি তখন বরফশীতল। সে গম্ভীর স্বরে সতর্ক করল, “ছোঁয়ার সাহসও করবে না।”
কথাটা বলেই কারান তর্জনী দিয়ে আয়লার বিউটিবোনের ঠিক ওপরে এক জোরালো ধাক্কা দিল। ধাক্কার প্রাবল্যে আয়লা কিছুটা পিছিয়ে গেল। কারান নির্বিকার মুখে তোয়ালেটা পাশেই থাকা ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করে গটগট করে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল। কারান চোখের আড়াল হতেই আয়লা খটখট করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।
ফারহান এবার এগিয়ে এসে দুই হাত বুকে ভাঁজ করে আয়লার সামনে দাঁড়াল। তার চোখে তীব্র বিরক্তি স্পষ্ট। আয়লা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ফারহানের কাঁধে হাত রেখে পরম তৃপ্তিতে বলল, “তোমার বন্ধুকে খেপাতে যে কী লেভেলের থ্রিল লাগে না, জাস্ট বোঝাতে পারব না। হিজ রিঅ্যাকশন ইজ জাস্ট… প্রাইসলেস! মানে, রাগের চোটে যখন ওর চোয়ালটা শক্ত হয়ে যায়, তখন মনে হয় যেন কোনো গ্রিক গড জ্যান্ত হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছে!”
​আয়লা এবার একটু পা উঁচিয়ে ফারহানের কানের কাছে ফিসফিস করে যোগ করল, “সিরিয়াসলি ড্যুড, এত হট কেন এই বান্দা? একেকবার যখন ওই ধারালো চোখে তাকায় না, আমার সেলফ-কন্ট্রোল তখন সোজা সাত আসমানে গিয়ে ঠেকে! মনে হয় সব প্রটোকল ভুলে গিয়ে এই মুহূর্তেই ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ি!”
ফারহান ঝটকা দিয়ে কাঁধ থেকে আয়লার হাত সরিয়ে দিয়ে দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বিড়বিড় করল, “শালি ভণ্ড একটা!”
আয়লা এবার হাঁটুতে হাত দিয়ে আরও জোরে হাসতে লাগল। ​কিছুক্ষণ পর আবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নিজের চুলগুলো পেছনে ঠেলে দিয়ে একটা লম্বা শ্বাস নিল।
“ওর ওই পাথরের মতো ব্যক্তিত্বটাই তো আসল নেশা। আই জাস্ট লাভ হাউ হি ট্রাইজ টু ইগনোর মি!”

কারান আইফোনের ক্যামেরার লেন্সের দিকে নিবদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। দীর্ঘ ত্রিশ মিনিট অতিক্রান্ত হয়েছে, অথচ মিরা নিথর হয়ে বসে আছে। সেই শুরুতে দায়সারা ‘ভালো আছি’টুকু ব্যতীত তার ওষ্ঠাধর থেকে একটি শব্দও নিঃসৃত হয়নি। কারান মিরার এই অস্বাভাবিক অন্তর্মুখী আচরণ সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল। অবশেষে নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে কারান সোফায় হেলান দেওয়া দেহটি সোজা করে বসলো। গম্ভীর স্বরে প্রশ্ন করল, “কী হয়েছে?”
কারানের আচমকা প্রশ্নে মিরার স্নায়ুগুলো যেন বিদ্যুদ্বেগে কেঁপে উঠল। সে কোনোক্রমে একটি ঢোক গিলে দৃষ্টি নিচু করেই অত্যন্ত ক্ষীণ স্বরে উত্তর দিল, “কিছু না।”
“লুক ইনটু মাই আইজ।”
“সম্ভব না।”
“আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছো?” কারানের গলার স্বর এবার আরও কয়েক পর্দা নিচে নেমে এলো, যা এক ধরনের সতর্কবার্তা।

এবার মিরা বাধ্য হয়ে অত্যন্ত ধীরলয়ে চোখ তুলল। তার চোখের মণিতে বিষাদ আর ব্যাকুলতার সংমিশ্রণ কারানের অন্তর্দৃষ্টি এড়াতে পারল না। কারান কিছুক্ষণ নীরব থেকে আচমকা একটি ব্যক্তিগত প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, “ডু ইউ মিস মি?”
মিরা নিঃশব্দে কেবল অশ্রুসজল চোখে হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। কারান এই মৌন সম্মতিতে কতটা প্রীত হয়েছে তা তার নিস্পৃহ মুখমণ্ডল দেখে বোঝার উপায় নেই। সে যখন মিরার চোখের সেই মৌন আর্তি নিয়ে কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই অনাহূতভাবে মিরার পাশে এসে বসলো তারান্নুম। তারান্নুমের মুখমণ্ডল প্রফুল্ল উদ্ভাসে উজ্জ্বল। মিরা চমকালো না ঠিকই, তবে জড়সড় হয়ে বিছানার এক কিনারায় সরে বসল।
তারান্নুম বেশ উৎফুল্ল ভঙ্গিতেই বলল, “ভাই, তুমি কি খালি ভাবির লগেই কথা কইবা? বোনের দিকেও একটু নজর দাও!”

“কেন, তোর তো মজনু আছে!”
তারান্নুম কৃত্রিম রাগে মুখ ঘুরিয়ে ভেংচি কেটে বলল, “হুমম! তোমার সাথে থাকলে ওই বেয়াদ্দব ব্যাটা তো আমার অস্তিত্বই ভুইলা যায়!”
নিজের পরম বন্ধুর জন্য বোনের মুখে এমন বিশেষণ শুনে কারানের ওষ্ঠাধরে এক চিলতে দুর্লভ হাসির রেখা ফুটে উঠল; তবে সে হাসিও বোঝার মতো নয়। কারান এক ভ্রূ উঁচিয়ে বেশ রহস্যময় ভঙ্গিতে বলল, “তোর মজনু এখন কী করছে দেখবি?”

তারান্নুম কৌতূহলী চোখে তাকাল। কারান সোফা থেকে উঠে ক্ষিপ্র পায়ে পাশের কক্ষে গেল, এবং কৌশলে ফোনটি ওয়ারড্রবের ওপর এমনভাবে সেট করল যাতে পেছনের ক্যামেরা ফারহানের কক্ষের পুরো দৃশ্যপট ধারণ করতে পারে। ওদিকে ফারহান তখন সবেমাত্র গোসল শেষ করে কোমরে সাদা তোয়ালে জড়িয়ে বেরিয়ে এসেছে। তবে পরিস্থিতি সেখানেই সীমাবদ্ধ থাকল না। ফারহানের কক্ষের ব্যাং অ্যান্ড ওলুফসেন স্পিকার সিস্টেম থেকে তখন হাই-ভলিউমে বাজছে বলিউড হিট গান।
ফারহান তার উন্মুক্ত ও সুঠাম শরীর নিয়ে বিছানা থেকে একটি সাদা শার্ট তুলে নিয়ে সেটাকে ওড়নার মতো গলার পেছনে প্যাঁচিয়ে ধরল। এরপর গানের তালে তালে শুরু হলো তার প্রমত্ত ও উরাধুরা নৃত্য। শার্টের দুই প্রান্ত দুই হাতে ধরে সে কোমরের এক অদ্ভুত দোল দিয়ে গাইতে শুরু করল,
“আব তো না হোতা হ্যায় একরোজ ইন্তেজার সোনি,

আজ নেহি তো কাল হ্যায়,
তুঝকোতো বাস মেরি হোনি রে…
তেনু লেকে ম্যায় জাভাঙ্গা,
দিল দ্যেকে ম্যায় জাভাঙ্গা…”
গানের চরম মুহূর্তে সে শার্টটি মাথার ওপর বনবন করে ঘোরাতে থাকল। ভিডিয়োর ওপাশে ফারহানের এই সেমি-নেকড এবং উদ্ভট নাচের ভঙ্গি দেখে তারান্নুম মুহূর্তেই লজ্জায় আরক্তিম হয়ে উঠল। অন্যদিকে, ফারহানের এমন নিখাদ পাগলামি দেখে মিরা আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না; সে দু-হাতে মুখ ঢেকে শব্দহীন হাসিতে ফেটে পড়ল।
তারান্নুম দুই হাতে চোখ বন্ধ করে চিৎকার করে উঠল, “ইয়া আল্লাহ! এইটা কোন ধরনের নির্লজ্জ ব্যাটাছেলে! ছিহ! ভাইয়া, এই মুহূর্তে ক্যামেরা সরাও!”

নিভৃত কক্ষের গাম্ভীর্য চূর্ণবিচূর্ণ করে যখন এক নারী কণ্ঠের আকস্মিক নিনাদ কানে এলো, ফারহানের শরীরী হিল্লোল মুহূর্তেই স্থবির হয়ে গেল। সে যেন কোনো এক অদৃশ্য বৈদ্যুতিক শকে আক্রান্ত। স্পিকারের শব্দ তড়িৎগতিতে রুদ্ধ করে, মাথার ওপর উত্তোলিত শার্টটি কুঁচকানো অবস্থায় হাতে নামিয়ে সে বিস্ফারিত নেত্রে সামনে তাকাল। দেখল, কারান দরজার চৌকাঠে কাঁধ ঠেকিয়ে তার দ্বিতীয় ফোনটি দিয়ে তার নাচের পূর্ণ ভিডিয়ো ধারণ করছে।
কারানের মুখাবয়ব পাথরের মতো নিস্পৃহ থাকলেও চোখের কোণে হাস্যকর বিদ্রুপের ঝিলিক ফুটে উঠেছে। সে অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে আদেশ জারি করল, “কন্টিনিউ।”
ফারহান তোতলামি মেশানো স্বরে বলে উঠল, “কী রে… তু-তুই এখানে কী করিস? আর মাত্র কোনো মেয়ের ভয়েস শুনলাম মনে হলো! আয়লা তো অলরেডি ওর অ্যাপার্টমেন্টে চলে গেছে, তাই না?”
কারান কোনো বাচনিক উত্তর না দিয়ে চিবুকের ইশারায় ওয়ারড্রোবের ওপর রাখা ফোনটির দিকে নির্দেশ করল। ফারহান অবিশ্বাসের দোলাচলে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ফোনটির স্ক্রিনে তারান্নুমের প্রতিচ্ছবি দেখামাত্রই এক গগনবিদারী চিৎকার ছুঁড়ে দিল, “আআআআ!”

লজ্জা আর অপমানের এক তীব্র জোয়ার ফারহানের ধমনিতে বয়ে গেল। সে দ্রুত হাতের শার্টটি বর্মের মতো বুকের ওপর চেপে ধরল; তার হৃৎপিণ্ড তখন কামারের হাপরের মতো সশব্দে স্পন্দিত হচ্ছে। ওদিকে কারান আর নিজের গাম্ভীর্য ধরে রাখতে পারল না। সে মুখ টিপে হাসতে হাসতে কক্ষের এক প্রান্তে থাকা মখমলের ডিভানে গিয়ে রাজকীয় ভঙ্গিতে দুই পা ছড়িয়ে বসল। নিজের ডান হাতের কনুই হাতলে রেখে সে রাজার মতো হাতের ইশারায় বলল, “নাচ বাসান্তী নাচ!”
কারানের এই অপ্রত্যাশিত রসবোধে ফারহান হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “শালা জানো’য়ার! তোকে আমি জুতো ছুঁড়ে মারব!”
কারান এবার বাঁধভাঙা খিলখিল হাসিতে ফেটে পড়ল। তার এই দুর্মূল্য হাসির ধ্বনি কক্ষের দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হতে থাকল। তখন ফারহানের কণ্ঠ শুনে মিরা ক্যামেরার ফ্রেম থেকে সাময়িকভাবে দূরে সরে গিয়েছিল। এদিকে তারান্নুম এবার সাহস করে চোখ মেলল। ফারহানের এই বিপর্যস্ত ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা দেখে তারান্নুমের লাজুক আরক্তিম মুখেও এক পশলা অদম্য হাসি ফুটে উঠল। কারান তখন সময় নষ্ট না করে নিজের হাতে থাকা ফোনটি দিয়ে মিরাকে ভিডিয়ো কলে সংযুক্ত করল। স্ক্রিনে সবার সম্মিলিত হাস্যোজ্জ্বল দেখে মিরার বিষণ্নতার মেঘ নিমেষেই কেটে গেল; সেও খিলখিল করে হেসে উঠল। মিরার সেই স্নিগ্ধ হাসি দেখে কারানের চোখের মণি এক অদ্ভুত জ্যোতিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

ফারহানের আত্মসম্মানে তখন প্রবল আঘাত লেগেছে। সে জেদ ধরে ভাবল, যখন ইজ্জত গেছেই, তখন তা রাজকীয়ভাবেই যাক! সে পুনরায় স্পিকারে ভলিউম বাড়িয়ে দিল, এবং গানের তালকে চ্যালেঞ্জ করে গায়ের শার্টটি এক পাশে ছুঁড়ে ফেলে দিল। কোমরের তোয়ালেটি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পুনরায় গিঁট দিল, পাছে বিয়ের আগেই তার হবু স্ত্রীর সামনে কোনো চূড়ান্ত অঘটন ঘটে যায়। তারান্নুমের চক্ষু তখন চড়কগাছ। ফারহান গানের বাজনার সাথে এক দুর্দান্ত ব্রেক-ড্যান্স ও হিপ-হপ স্টেপের সংমিশ্রণে শরীর দোলাতে শুরু করল,
“লাইক মিঠাই (লাইক মিঠাই)
লাইক কুলফি, রাস মালাই (আই), পিস্তা বারফি
সারদিয়াঁ বিচ, গারমি লাগদি
জাদ ভি তু মেরে রাহ বিচো চালদি…”
কারানের শরীরেও যেন হঠাৎ অপ্রতিরোধ্য উদ্দীপনা সঞ্চারিত হলো। সে এক ভ্রূ উঁচিয়ে অত্যন্ত সম্মোহনী ও প্রগাঢ় দৃষ্টিতে মিরার চোখের দিকে তাকিয়ে গানের পরবর্তী অংশটুকু গাইতে শুরু করল,
“ইয়াহ, ক্লাব বিচ মেরে কোলো লাংদি,
থ্রো ইট ব্যাক অ্যান্ড বু-বু-বাবল আপ ইন ফ্রন্ট অফ মি
এভরিবডি ট্রাইনা ফিগার আউট ইয়োর রেসিপি
আই’ম জাস্ট ট্রাইনা গেট আ পিস…”

কারান ফোনটি সামনে ব্যাক ক্যামেরায় রেখে সোফা থেকে উঠে এলো, এমনভাবে রাখলো যেন মিরাকে ফারহান না দেখে। মিরা বিস্মিত নেত্রে দেখল, তার সেই গম্ভীর, রাশভারী স্বামী আজ সমস্ত আভিজাত্যের খোলস ত্যাজ্য করে এক লহমায় কিশোরসুলভ চঞ্চল হয়ে উঠেছে। ফারহান আর কারান এবার পিঠের সাথে পিঠ মিলিয়ে এক সুসংগত ‘সিঙ্ক্রোনাইজড’ ড্যান্স স্টেপ শুরু করল। দুই তরুণের এই পেশাদার ও ছন্দময় নাচ দেখে ওপাশে মিরা আর তারান্নুমও মাথা দুলিয়ে তালের সাথে একাত্ম হয়ে গেল। তারা সমস্বরে গেয়ে উঠল,
“বেবি,
আই নো দ্যাট ইউ ওয়ানা গেট ক্রেজি, ক্রেজি
শটি টেক ইট স্লো দ্যান চেতি, চেতি
বান যা তু মেরি
জালেবি বেবি।”
একটি নিখুঁত ‘হুক-স্টেপ’ শেষ করে কারান পুনরায় মিরার স্ক্রিনের সামনে এসে বসল। তার ললাটে ঘামবিন্দু, কিন্তু ঠোঁটে পরম তৃপ্তির হাসি ফুটে আছে। কারান চৌধুরি কখনো জনসমক্ষে নৃত্য পরিবেশন করে না, এটি তার চারিত্রিক কাঠামোর সম্পূর্ণ পরিপন্থি। কিন্তু আজ সে তার চিরচেনা ‘পারসোনা’ বিসর্জন দিয়েছে কেবল মিরার মনের কোণে জমে থাকা মেঘগুলো উড়িয়ে দিতে। সে চায় মিরা সবসময় এই প্রফুল্লতায় ভাসুক। কারান জানে, সে এখন দূরে আছে, আর এই দূরত্ব যেন মিরার হাসিকে ম্লান করতে না পারে, সেটাই ছিল এই রুদ্ধদ্বার নাচের সার্থক শিল্পায়ন।

রাত্রির নিবিড় স্তব্ধতাকে চিরে মার্সিডিজ মেব্যাক এজি দ্রুতগতিতে ছুটে চলছে দুবাইয়ের মসৃণ হাইওয়ে দিয়ে। পেছনের সিটে কারান আর আয়লার মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক টানাপড়েন কাজ করছে। কারানের পরনে আজ একটি মিচেল অ্যান্ড নেস ঘরানার কাস্টম-মেড ব্ল্যাক টার্টলনেক, যার ওপর ডার্ক গ্রে রঙের ইতালিয়ান উল ব্লেজার পরিহিত। লেদার লোফারের পালিশ করা উপরিভাগে গাড়ির ভেতরকার মৃদু আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। পাশে বসা আয়লা আজ যেন স্বয়ং দেবী আফ্রোদিতি। তার পরনে পান্না সবুজ শেডের একটি স্লিম-ফিট ইভিনিং গাউন, যা তার শরীরের প্রতিটি রেখাকে অত্যন্ত মার্জিতভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। গলায় হীরার সূক্ষ্ম নেকলেস আর হাতে আইকনিক কার্টিয়ার ব্রেসলেট।
আয়লার কাজলকালো চোখের সম্মোহনী দৃষ্টি অনেকক্ষণ ধরেই কারানের ওপর স্থির হয়ে আছে।
কারান তার স্টিলের মতো শক্ত চোয়াল না ঘুরিয়েই শীতল গলায় প্রশ্ন করল, “এভাবে তাকিয়ে আছো কেন?”
আয়লা ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে উত্তর দিল, “তোমার চোখের পাওয়ার চেক করছি। দেখতে চাইছি কতটা ডেপথ আছে ওগুলোতে।”

“তুমি আমাকে কবে থেকে স্টক করো?”
কারানের এই আকস্মিক ও তীক্ষ্ণ প্রশ্নে আয়লা সামান্য ভ্রূ কুঁচকালেও বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। সে জানত, কারান চৌধুরীর মতো একজন তুখোড় বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন মানুষের নজর এড়ানো অসম্ভব।
আয়লা অকপটে স্বীকার করল, “পাঁচ বছর আগে থেকে। যখন জানলাম তুমি বিবাহিত, ভেবেছিলাম নিজেকে ডিটাচ করে নেব। কিন্তু তোমার ইন্টেলেক্ট আমাকে ক্রমশ আরও বেশি অ্যাডিক্টেড করে তুলছে। আই গেস, আমি একজন সেপিওসেক্সুয়াল পারসন।”
“অথচ আমি তোমাকে মা’রতেও এক সেকেন্ড সময় নেব না।”
“তাই?” আয়লার কণ্ঠে কৌতুক ফুটলো। সে জানে কারান তাকে বাঁচাতে কতটা মরিয়া।

হুট করেই কারান তার বাম হাতের ঘড়ির বিশেষ মেকানিজমটি স্লাইড করল। চোখের পলকে ঘড়ির স্ট্র্যাপের আড়াল থেকে একটি ক্ষুদ্র অথচ ভয়াবহ তীক্ষ্ণ ফোল্ডিং নাইফ বেরিয়ে এলো। মুহূর্তের মধ্যে সেটার অগ্রভাগ আয়লার সুডৌল গ্রীবার ওপর চেপে ধরল কারান। আয়লা ভয় পাওয়ার বদলে খিলখিল করে হেসে উঠল। কারান নির্বিকার রইল; সে আসলে ইব্রাহীমের আস্তানায় যাওয়ার আগে আয়লার স্নায়ুচাপ শেষবারের মতো পরীক্ষা করে নিচ্ছিল। আয়লা কারানের হাত ধরে, হাতের ওপর চাপ বাড়িয়ে ছুরির ফলাটি আরও নিজের গলার কাছে টেনে আনল।
কারানের চোখের মণি বরাবর তাকিয়ে সে ফিসফিস করে বলল, “ছুরি ধরা আর ছুরি চালানো—দুটোর মধ্যে বিশাল পার্থক্য আছে, আবরার কারান চৌধুরি। তুমি সেটা ভালো করেই জানো।”
কারান সামান্য তীর্যক হাসল। হাত সরিয়ে নিয়ে ছুরিটি আবার ঘড়ির গোপন কুঠুরিতে লক করে দিল।
“তুমি যদি আমার ট্রাম্প কার্ড না হতে, তবে কথা বলার এই সুযোগটাও পেতে না।” বলতে বলতেই সে পকেট থেকে একটি সিল্কের রুমাল বের করে একটু আগে আয়লার ধরা নিজের হাতটা এমনভাবে মুছতে শুরু করল, যেন কোনো বিজাতীয় অপবিত্র কিছু স্পর্শ করেছে। আয়লার তীক্ষ্ণ নজর সেই অপমানটুকুও গোগ্রাসে গিলে নিল।

গাড়িটি যখন দুবাই মেরিনা বে-র তীরে ইব্রাহিমের রাজকীয় ভিলার সামনে পৌঁছাল, তখন চারপাশ আলোকসজ্জায় ঝলমল করছে। ভিলার সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে বুগাটি চিরন, ল্যাম্বরগিনি অ্যাভেন্টাডোর আর গোল্ড-প্লেটেড রোলস রয়েস।
গাড়ি থেকে নামার পর তাদের প্রাইভেট এন্ট্রির দিকে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে অত্যাধুনিক মেটাল ডিটেক্টর আর এক্স-রে স্ক্যানার দিয়ে তাদের শরীর তল্লাশি করা হলো। কারান জানত এখানে কোনো ফায়ার-আর্মস নেওয়া অসম্ভব। তার ঘড়ির সেন্সরটি যখন রেড সিগন্যাল দিল, সিকিউরিটি ইন-চার্জ সেটাকে বিলাসজাত ঘড়ির অভ্যন্তরীণ মেকানিজম ভেবে এড়িয়ে গেল, ঠিক যেমনটা কারান পরিকল্পনা করেছিল।
আটটা নাগাদ তারা কনভেনশন হলের চারতলায় ইব্রাহিমের বিশেষ বিজনেস লাউঞ্জে প্রবেশ করল। নিচতলায় তখন উদ্দাম ডিজে পার্টি আর হাই-প্রোফাইল মেহমানদের কোলাহল তুঙ্গে। কিন্তু এই ওপরতলার নিস্তব্ধতা অনেক বেশি ভয়ংকর। এখানেই বিশ্বের তাবড় তাবড় রুই-কাতলারা বসে ঠিক করে—কোন দেশের কতজন মেয়েকে পা*চার করা হবে আর কার কিডনি বা হার্ট কত দামে কালোবাজারে বিক্রি হবে।

কারান আয়লার দিকে তাকিয়ে সংক্ষেপে ইশারা করল। সময় শুরু। শো এখন অন।
কারান আর আয়লা আত্মবিশ্বাসের বর্ম গায়ে জড়িয়ে করিডোর ধরে অগ্রসর হতে থাকল। তাদের ঠিক দুই কদম পেছনে বডিগার্ডের ছদ্মবেশে ছায়ার মতো অনুসরণ করছে এমেকা ওকনকো। নাইজেরিয়ান বংশোদ্ভূত এই মানুষের সুঠাম কৃষ্ণাঙ্গ দেহ আর চোয়ালের কঠিন রেখাগুলো যেন ইস্পাত দিয়ে গড়া। পরনে বডি-ফিটেড ব্ল্যাক স্যুট আর স্নো-হোয়াইট শার্ট, যা তার বলিষ্ঠ পেশিবহুল অবয়বকে আরও বেশি প্রকট করে তুলেছে। এমেকা মূলত কারানের সবচেয়ে বিশ্বস্ত অপারেশনাল হ্যান্ড, যার উপস্থিতিতে শত্রুপক্ষ কথা বলার আগে দুবার ভাববে। বয়সে সে কারানের চেয়ে পাঁচ বছরের বড়ো। জীবনযাপনে চরম মিতভাষী; পেশাগত প্রসঙ্গের বাইরে তার কণ্ঠস্বর শোনা ভার।
করিডোরের অন্য প্রান্ত দিয়ে তখন ইব্রাহিম আর তার শ্যালক ইলিয়াস জেহের সদলবলে এগিয়ে আসছেন। ইব্রাহিমের পরনে ধবধবে সাদা ঐতিহ্যবাহী ‘কান্দুরা’, তবে তার হাতের প্যাটেল ফিলিপ ঘড়ি আর গলার আভিজাত্য বলে দিচ্ছে তিনি সাধারণ কোনো আরবীয় শেখ নন। কারানকে দেখা মাত্রই তার চোখের মণি উজ্জ্বল হয়ে উঠল, মুখে ফুটে উঠল কৃত্রিম প্রফুল্লতা।

“ভাবিনি আবার আপনার দেখা পাবো। ওয়েলকাম টু মাই হাম্বল অ্যাবোড, মিস্টার চৌধুরি,” ইব্রাহিম উষ্ণভাবে কারানের সাথে করমর্দন করলেন।
কারান তার প্রফেশনাল হাসিটা বজায় রেখে বলল, “আই হ্যাড টু কাম ব্যাক। বিজনেস ডিল যখন আপনার মতো কিংমেকারের সাথে, তখন ফিরে না আসাটা আনপ্রফেশনাল হতো।”
এরপর তাদের নিয়ে যাওয়া হলো চতুর্থ তলার সেই এক্সক্লুসিভ প্রাইভেট জোনে। কক্ষটির ভেতরকার বায়ুমণ্ডল কিছুটা গুমোট এবং রহস্যময়। ইন্টেরিয়র ডিজাইনে ভিক্টোরিয়ান গথিক এবং মডার্ন অ্যারাবিক স্থাপত্যের সংমিশ্রণে তৈরি। সোফাগুলোর ভেলভেট কভার টকটকে লাল রঙের। এক কোণে একটি গ্রামোফোন থেকে ভেসে আসছে হন্টিং মেলোডি। হলঘরটির একপাশে চকলেট ফাউন্টেন আর বিচিত্র সব এক্সোটিক খাবারের সুগন্ধ ভেসে আসছে।
কারান এক পলকে উপস্থিত ভিআইপিদের মুখগুলো স্ক্যান করে নিল। আয়লা তার হ্যামারহেড শার্কের মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে প্রথমেই জেহেরকে মার্ক করল। জেহের বারের কাউন্টারের পাশে দাঁড়িয়ে শ্যাম্পেন হাতে আয়লার দিকে লাস্যময়ী কিন্তু বিকৃত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আয়লা অস্বস্তি লুকিয়ে পালটা মোহনীয় হাসি উপহার দিল, যেন সেও এই সাইলেন্ট ফ্লার্টেশনে বেশ আনন্দ পাচ্ছে।

ইব্রাহিম গ্লাসের বরফ কুচিগুলোকে রুপালি চামচ দিয়ে নাড়তে নাড়তে সোফায় জাঁকিয়ে বসলেন। তার পেছনে বিশালকায় ব্যক্তিগত রক্ষীরা পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। অন্যদিকে, কারানের ঠিক পেছনে দুই হাত বুকে ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে রইল এমেকা, যার চোখ দুটো বাজপাখির মতো চারপাশের মুভমেন্ট পর্যবেক্ষণ করছে।
ইব্রাহিম শান্ত গলায় কথা শুরু করলেন, “আই ইউজ্যুয়ালি ডোন্ট বিলিভ ইন সেকেন্ড চান্সেস। কিন্তু আপনার টেক্সটাইল ডিলের যে ভলিউম আর আপনার গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন আমাকে আবার টেবিল শেয়ার করতে বাধ্য করল। লাস্ট টাইম আপনি যখন মাঝপথে বিলিয়ন ডলারের ডিলটা অসম্পূর্ণ রেখে হুট করে বাংলাদেশে চলে গেলেন, আমি সারপ্রাইজড হয়েছিলাম। আমার ডিকশনারিতে অপেক্ষা বলে কিছু নেই। তো, নিজের দেশে গিয়ে এমন কী পেলেন যা দুবাইয়ের এই এম্পায়ারের চেয়েও প্রিমিয়াম ছিল?”
কারান আয়েশ করে সোফায় হেলান দিয়ে বসল। তার চোখেমুখে কোনো জড়তা নেই। সে সরাসরি ইব্রাহিমের চোখের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “কিছু পেন্ডিং চ্যাপ্টার ওপেন রেখে বড়ো ডিল শুরু করা যায় না, শেখ সাহেব। বাংলাদেশে আমার একটা পুরোনো অ্যাকাউন্ট সেটল করার ছিল। ওটা শেষ না করে যদি টেক্সটাইল ডিলের প্রফিটে মন দিতাম, তবে ক্যালকুলেশনে ভুল হতো। নাও আই অ্যাম টোটালি ফোকাসড অন দ্য মাল্টি-বিলিয়ন ডলার ভেঞ্চার।”

আয়লা একপাশে হাঁটুর ওপর পা তুলে দিয়ে বেশ ডমিন্যান্ট ভঙ্গিতে বসল। সে জানে, ইব্রাহিম আর তার শ্যালক জেহেরের মতো মানুষরা নারীর সৌন্দর্য আর ক্ষমতার মিশ্রণকে দুর্বলতা হিসেবে দেখে।
আয়লা চোয়াল শক্ত করে আপনমনে আওড়ালো, “আর এই উইকনেসটাই হবে তোদের তুরুপের তাস।”
জেহের গ্লাসে চুমুক দিয়ে আয়লার দিকে তাকিয়ে এক চোখ টিপল। আয়লার ঠোঁটের কোণে হাসি আরও গভীর হলো, কিন্তু মনের ভেতরে তখন ফারহানের সেই তথ্যগুলো বাজছে—এই জেহেরই হলো পাচার হওয়া মেয়েদের ট্রানজিট পয়েন্টের ইনচার্জ।
ইব্রাহিমের ওষ্ঠাধরে এক চিলতে বক্র হাসি ফুটে উঠল।
“মিস্টার চৌধুরি, বিজনেস মাইন্ডে পার্সোনাল ইকুয়েশন রাখাটা কি একটু বেশি রিস্কি হয়ে গেল না? আমার আর্থিক ক্ষতি আপনি ডলারে পুষিয়ে দেবেন বলছেন, দ্যাটস ফাইন। কিন্তু আমার ইগোর কী হবে? এই সার্কেলে আমার প্রেস্টিজ আর প্রফিট—দুটোই প্যারালাল চলে।”
“সাকসেসফুল বিজনেসম্যানরা জানে যে ইগোর চেয়ে বড়ো লায়াবিলিটি আর কিছু নেই। আমি আপনাকে গতবারের চেয়ে ২০% অতিরিক্ত প্রফিট মার্জিন দেব। আশা করি এই ফিগারটা আপনার ইগোর সব ক্ষত নিরাময় করার জন্য যথেষ্ট।”

ইব্রাহিম আলতো করে মাথা দোলালেন। কারানের এই শীতল নির্লিপ্ততা তাকে ভাবিয়ে তুলছে। “মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের ডিল টেবিলের ওপর, অথচ আপনার পালস রেট একদম নরমাল। কোনো এক্সাইটমেন্ট নেই। এটা কি আপনার অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, নাকি আড়ালে অন্য কোনো গেম প্ল্যান আছে?”
কারান এবার সামান্য সামনের দিকে ঝুঁকে বসল। আঙুলের ইশারায় একজন ওয়েটারকে ডাকল। শ্বেতশুভ্র অ্যাপ্রন পরা ওয়েটার অত্যন্ত সন্তর্পণে ট্রে এগিয়ে দিল। কারান একটি ক্রিস্টাল গ্লাস তুলে নিয়ে তাতে মৃদু চুমুক দিল। ড্রিংকসের ঝাঁঝালো স্বাদ উপভোগ করতে করতে সে বলল, “এক্সাইটমেন্ট অপেশাদারদের জন্য রেখে দিয়েছি। আমি হার্ড ক্যালকুলেশন আর ডেটায় বিশ্বাস করি, ইমোশনে নয়। ড্রাফট পেপারস অলরেডি রেডি, আপনি চাইলে আমরা এখনি এক্সিকিউটিভ সামারি আর মেইন ক্লজগুলো নিয়ে ডিসকাস করতে পারি।”
কারানের এই ইস্পাতদৃঢ় ব্যক্তিত্ব ইব্রাহিমের ভেতরের সন্দেহকে কিছুটা দমিত করলেও পাশ থেকে জেহেরের কণ্ঠস্বর পরিবেশের গাম্ভীর্য নষ্ট করে দিল। জেহের বারের কাউন্টারে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে নিজের গ্লাসটা উঁচিয়ে ধরল।
“কাম অন, কারান! কাজের কথা তো সারা রাত হবেই। কিন্তু আপনার সঙ্গিনীকে তো বেশ ডাল দেখাচ্ছে। মিস আয়লা, আমাদের এই স্পেশাল অ্যারাবিক ককটেলটা ট্রাই করবেন নাকি? পুরোনো পরিচয়ের খাতিরে আমি স্পেশালি আপনার জন্য এটা মিক্স করে দিতে পারি।”

আয়লার অধরে এক চিলতে অভিজাত হাসি ফুটে উঠল। সে কারানের দিকে একবার পলকহীন আড়চোখে তাকিয়ে জেহেরকে লক্ষ্য করে বলল, “থ্যাংকস ফর দি অফার, মিস্টার জেহের। কিন্তু আগে বিজনেস ডিলটা একটা সলিড গ্রাউন্ডে পৌঁছাক, সেলিব্রেট করার মতো পানীয় তখন না হয় বেশি উপভোগ্য হবে।”
জেহের আয়লার আপাদমস্তক একবার স্ক্যান করে নিল, যেন সে কোনো মানুষ নয়, বরং একটি মূল্যবান পণ্য।
“শুনেছি বাংলাদেশের ওয়েদার নাকি খুব আনপ্রেডিক্টেবল। কিন্তু আপনার ওপর তো তার কোনো ইফেক্টই পড়েনি। বরং মরুভূমির তপ্ত রোদের মতো আপনার গ্ল্যামার আরও বেশি রেডিয়েট করছে। শেখের সাথে এই বোরিং ডিলটা শেষ হলে কি আমার সাথে একান্তে একটা ডিনার ডেটে যাওয়ার সময় হবে?”
আয়লা এবার সরাসরি জেহেরের চোখের দিকে তাকাল। তার ভেতরে ঘৃণার লাভা টগবগ করলেও উপরে সে হিমশীতল আভিজাত্য বজায় রাখল। অত্যন্ত সাবলীলভাবে উত্তর দিল, “শেখ ইব্রাহিমের সাথে ডিল করাটা আমার কাছে একটি আমানত বা পবিত্র দায়িত্বের মতো। আর দায়িত্ব পালনের সময় আমি অন্য কিছুতে মনযোগ দিই না। আমার প্রতিটি সেকেন্ড আপাতত কারানের সাকসেসের জন্য ডেডিকেটেড। বাট ডোন্ট মাইন্ড, আপনি এনজয় করতে থাকুন।”

আয়লার এই নিরুত্তাপ প্রত্যাখ্যান জেহেরের ইগোতে সজোরে আঘাত করল। সে দাঁত কিড়মিড় করে ড্রিংকসে চুমুক দিলেও মনে মনে ভাবল, এই শিকারকে সে কিছুতেই হাতছাড়া করবে না। আয়লার এই অবজ্ঞাই তার ভেতরের জিদকে দ্বিগুণ করে দিল, ঠিক যেমনটা আয়লা চেয়েছিল। আয়লা জানত, সস্তা প্রস্তাব গ্রহণ করলে জেহেরের আগ্রহ দ্রুত মরে যেত, কিন্তু এই আভিজাত্যভরা উপেক্ষা তাকে আরও বেশি উন্মত্ত করে তুলবে।
জেহের জিহ্বা দিয়ে গালের ভেতরটা একবার ঠেলে, ওষ্ঠপ্রান্তে বক্রহাসি ফুটিয়ে আয়লার দিকে তাকালো।
ওদিকে জেহেরের এমন কদর্য আলাপন শ্রবণ করে কারান নিজের হাতের ঘড়িটির দিকে দৃষ্টিপাত করলো, যার মধ্যে সুইচব্লেডটি রাখা আছে। কারান বিলক্ষণ জানে, ইব্রাহিম শেখের সাথে আলোচনা সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত তাকে চরম আত্মসংযম প্রদর্শন করতে হবে। অন্যথায়, নারীর মর্যাদাহানির অপরাধে জেহেরের কণ্ঠে ছুরিকাঘাত করার তীব্র প্রবৃত্তি সে আর দমন করতে পারতো না।
ইব্রাহিম তার শ্যালকের বোকামিতে কিছুটা বিরক্ত হয়ে আবার কারানের দিকে ফিরলেন। গ্লাসটা সশব্দে টেবিলে রাখলেন।
“ঠিক আছে কারান, লেটস টক বিজনেস। আমার নতুন কন্ডিশন হলো, শিপমেন্টের ৫০% অ্যাডভান্স পেমেন্ট আমি দিচ্ছি না। মাল পোর্টে পৌঁছানোর পর আমার লোক যখন কোয়ালিটি আর লজিস্টিকস ইনস্পেকশন শেষ করবে, তখন ফুল পেমেন্ট হবে। আর ইউ রেডি টু টেক দিস রিস্ক?”
কারান ধীরস্থিরভাবে তার পানীয়তে চুমুক দিয়ে আয়লার দিকে একটি অর্থবহ চাহনি ছুঁড়ে দিল। আয়লা তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারল দাবার প্রথম চালটি তাকেই দিতে হবে। চার ইঞ্চি স্টিলেটো হিলের ঠক-ঠক শব্দে কক্ষের গুমোট নীরবতা চিরে সে বারের দিকে অগ্রসর হলো। তার শরীরের প্রতিটি হিল্লোল এবং কোমররেখার ছন্দময় দোলা বারের আশেপাশে থাকা প্রতিটি পুরুষের আদিম প্রবৃত্তিগুলোকে জাগ্রত করে তুলল। জেহেরের গ্লাস থেকে মদ্য উপচে পড়ার উপক্রম; তার চোখে এখন লালসার দাবানল। তার লুব্ধ দৃষ্টি আয়লার ইভিনিং গাউনের বিভাজিকার ওপর স্থির হয়ে আছে, আর নাসারন্ধ্র দিয়ে দ্রুত তপ্ত নিশ্বাস নির্গত হচ্ছে।
আয়লা বারের কাছে পৌঁছে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে একটি চারকোল ব্ল্যাক ফ্রেমের চশমা পরে নিল। এটি ফারহানের তৈরি একটি অত্যাধুনিক আই-স্ক্যানার এবং ক্যামেরা ডিভাইস। সে জেহেরের ঠিক গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে এক গ্লাস সফট ড্রিংক তুলে নিল। বারের কাউন্টারে নিজের অনাবৃত কনুই ঠেকিয়ে সে ড্রিংকসে চুমুক দিতে দিতেই আলতো করে তার স্মিথ-লক ডিজাইনের ক্লাচ ব্যাগটি খোলার চেষ্টা করল। এমনভাবে অভিনয় করল যেন চেইনটি বিশ্রীভাবে আটকে গেছে।
জেহেরের মতো শিকারির জন্য এই টোপটুকুই যথেষ্ট ছিল। সে এগিয়ে এসে কামাতুর কণ্ঠে বলল, “মে আই হেলপ ইউ, লেডি?”

আয়লা ঠোঁটের কোণে প্রশ্রয় মাখিয়ে হাসল। জেহের যখন নিচু হয়ে ক্লাচটি খোলার কসরত করছে, আয়লা তখন তার সাইকোলজিক্যাল ম্যানিপুলেশন শুরু করল।
“পার্টিটা ভীষণ বোরিং লাগছে, মিস্টার জেহের। টু মাচ বিজনেস টক।”
জেহের ক্লাচটি সাবলীলভাবে ঠিক করে ফেরত দিয়ে তার চোখের দিকে তাকাল।
“ইব্রাহিম ভাইয়ের তো সেরেফ প্রফিটের নেশা। বাট আমি ডিফারেন্ট। আই থিংক উই শেয়ার দ্য সেম ভাইব। আপনি চাইলে আপনার এই বোরডম আমি কয়েক সেকেন্ডে ভ্যানিশ করে দিতে পারি।”
আয়লা এবার আলতো করে জেহেরের কাঁধে হাত রাখল। জেহেরের হৃৎপিণ্ড তখন প্রমত্ত বেগে লাফাচ্ছে। আয়লা আরও কাছে এগিয়ে গিয়ে জেহেরের কানের লতির খুব কাছে ফিসফিস করে বলল, “এই প্যালেসের সবথেকে লাক্সারি আর প্রাইভেট জায়গাটায় গেলে মন্দ হয় না৷ এখানে বেশ সাফোকেশন হচ্ছে।”
জেহেরের গলার স্বর বুজে এলো উত্তেজনায়। আয়লা তার সিল্কের টাইটি ধরে আলতো করে ঠিক করতে থাকলো। জেহেরের ঘাড় বেয়ে তখন ঘামের ধারা নামছে। সে নেশাতুর চোখে আয়লার পিছু নিল।

ওদিকে ভিলার বাইরে একটি কালো গ্লাসের ভ্যানে বসে ফারহান তার হাই-পারফরম্যান্স ম্যাকবুকে সব মনিটর করছে। কারানের টাই-পিনের মাইক্রো-ক্যামেরা আর আয়লার ইয়াররিংয়ের ব্লুটুথ সেন্সর থেকে হাই-ডেফিনিশন অডিয়ো-ভিডিয়ো ফিড আসছে। ফারহান আয়লার ইয়ারপিসে ফিসফিস করে নির্দেশনা দিল, “আয়লা, শুনতে পাচ্ছ? শালাকে ড্রিংকস খাইয়ে টাল করো। আর ওর ফোনের পাসওয়ার্ড যখন ও প্রেস করবে, তোমার চশমার স্ক্যানার দিয়ে ওটা কপি করে আমাকে পাঠিয়ে দাও। আই নিড দ্যাট এক্সেস।”
আয়লা হালকা খুকখুক করে কাশির শব্দ তুলে সিগন্যাল দিল যে সে প্রস্তুত। জেহের তাকে নিয়ে ভবনের একটি গোপন উইংয়ের প্রাইভেট কক্ষে প্রবেশ করল। সেখানে চারদিকে নগ্নপ্রায় নর্তকীরা বিকৃত সুরের সাথে দেহ প্রদর্শন করছে। ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কোলে বসে থাকা এই মেয়েগুলোর চোখে কোনো প্রাণ নেই, কেবল যান্ত্রিকতা। কেউ কেউ প্রকাশ্যে শারীরিক মিলনে লিপ্ত। আয়লার ভেতরে তীব্র ঘৃণা আর বিতৃষ্ণা জেগে উঠল। এই নারীদের অধিকাংশই পাচার হয়ে আসা শিকার, যাদের জীবন এই অন্ধকূপের আড়ালে শেষ হয়ে যাচ্ছে।

জেহের ইতোমধ্যে নেশায় টলমল করছে। সে আয়লার কোমরে অধিকারবোধের সাথে হাত রাখল। আয়লার ইচ্ছে করল ঠিক এই মুহূর্তেই জেহেরের বুক চিরে ফেলতে। তার নেকলেসের পেন্ডেন্টটি আসলে একটি নিউরো-টক্সিক নিডল হোল্ডার। এর ভেতরে থাকা সূক্ষ্ম সুইটিতে এমন বিষ রয়েছে, যা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মানুষের সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমকে প্যারালিসিস করে দেয়। মেটাল ডিটেক্টরও এই হাই-গ্রেড পলিমার নিডল শনাক্ত করতে পারে না।
আয়লা জেহেরকে আরও একটি ককটেল অফার করে তার আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়াল।
“জেহের, তোমার ফোনটা কি একটু দিবে? আমার ফোনের নেটওয়ার্ক কাজ করছে না, একটা জরুরি মেসেজ চেক করতে হবে।”
জেহের কোনো চিন্তা না করেই তার আইফোনটি বের করল। আয়লার চশমার ফ্রেমটি ঠিক এই মুহূর্তটির জন্যই ফোকাস সেট করে রেখেছিল।
জেহেরের শরীরের মদের উৎকট দুর্গন্ধ আর ঘাম আয়লার নাসারন্ধ্রে এসে ধাক্কা দিল। সে যখন আয়লার কাঁধে নিজের নাক ঘষল, আয়লার পাকস্থলীতে বমির ভাব হলো। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করাটা এখন তার জন্য কোনো পেশাদার অভিনয়ের চেয়েও বেশি কিছু—এটি এখন টিকে থাকার লড়াই। জেহের তার শক্ত সমর্থ বাহু দিয়ে আয়লার কোমর বেষ্টন করে নিজের দিকে আরও সজোরে টেনে নিল। তার অর্ধোন্মীলিত চোখে এখন আদিম শিকারির হিংস্রতা আর লালসা খেলা করছে।
জেহের ওষ্ঠাধরে বিচ্ছিরি এক বাঁকা হাসি খেলিয়ে ফিসফিস করে বলল, “ইউ লুক টু মাচ সে’ক্সি টুনাইট, বেবিগার্ল! তোমাকে এই গোলকধাঁধায় কেন এনেছি জানো?”
আয়লা দাঁতে দাঁত চেপে নিজের শারীরিক ঘৃণা সংবরণ করল।

“কেন?”
জেহের আয়লার কানের লতির ঠিক নিচে এক অসভ্য চুম্বন আঁকল। আয়লার পুরো শরীর যেন বিষিয়ে উঠল। জেহের তার উত্তপ্ত নিশ্বাস আয়লার ঘাড়ে ছেড়ে দিয়ে বলল, “যেন তুমি বোঝো যে তুমি কতটা প্রেশাস। এখানকার ওই হাড় জিরজিরে মেয়েগুলোর মতো তোমাকেও নাচাতে পারতাম, বাট আমি তোমাকে আমার সেই ইনার স্যাঙ্কটাম-এ নিয়ে যাবো, যেখানে আমাদের গোপন রাজত্ব।”
কথাটা শেষ করেই জেহের আয়লাকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠার সময় আয়লা বেশ দক্ষ, লাস্যময়ী ভঙ্গিতে জেহেরের গলা জড়িয়ে ধরল। ঠিক সেই মুহূর্তে সে দূর থেকে কারানের চোখে চোখ মেলাল। কারানের চোয়াল শক্ত হলেও আয়লার সেই বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের ইশারা তাকে আশ্বস্ত করল যে, শিকার এখন সম্পূর্ণ জালে।

নিচে মূল আলোচনায় কারান তখন তার দাবার চূড়ান্ত চালটি চালল। সে হাঁটুর ওপর পা তুলে অত্যন্ত রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে ইব্রাহিমের চোখের দিকে চেয়ে বলল, “আর যদি বলি টাকাও আমি দেব, আর মালও… তবে?”
ইব্রাহিমের মতো একজন ধুরন্ধর অপরাধ সম্রাটও এই প্রস্তাবে মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন। তার প্রশস্ত কপালে সূক্ষ্ম বলিরেখা দেখা দিল। কারানের এই অযাচিত দাক্ষিণ্যের আড়ালে যে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র থাকতে পারে, তা তার অভিজ্ঞ মস্তিষ্ক জানান দিল। সে এক আঙুলের ইশারায় তার সহধর্মিণী আমিরা নূরকে সিগন্যাল দিল। লাল সিল্কের গাউন পরা নূর অত্যন্ত মোহনীয় ভঙ্গিতে এসে ইব্রাহিমের পাশে বসল, এবং একটি কিউবান চুরুট ধরিয়ে তার ঠোঁটে তুলে দিল। অথচ নূরের গভীর কাজলমাখা চোখ জোড়া নিবদ্ধ ছিল কারানের সুঠাম অবয়বের ওপর। কারানও একবার তীক্ষ্ণ নজরে এই রহস্যময়ী নারীকে পরখ করে নিল। নূর তাকে লক্ষ্য করে এক অদ্ভুত সম্মোহনী হাসি উপহার দিল।
ইব্রাহিম ধোঁয়া ছেড়ে নিজের আধপাকা দাড়িতে আঙুল বোলাতে বোলাতে বললেন, “আই অ্যাম কিউরিয়াস, মিস্টার চৌধুরি। এমন দানশীলতার কারণ জানতে পারি?”

“আমি শুধু চাচ্ছি আমাদের এই স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপটা যেন পাথরের মতো মজবুত হয়। কারান চৌধুরীর কাছে টাকা সেরেফ হাতের ময়লা। আপনি অফার করলেও আমি নিতাম না।”
কারান এবার তার প্রেজেন্টেশনটি প্রদর্শনের অজুহাতে ইব্রাহিমের ম্যাকবুকটি চাইল। তার আসল উদ্দেশ্য হলো ফারহানের তৈরি সেই ম্যালওয়্যার ইনজেক্ট করা, যা দিয়ে ইব্রাহিমের সমস্ত এনক্রিপ্টেড ফাইল হ্যাক করা সম্ভব। কিন্তু ধুরন্ধর ইব্রাহিম নিজের কমপিউটার না দিয়ে জেহেরের ল্যাপটপটি এগিয়ে দিলেন। কারান বুঝল এই ‘ডেজার্ট ফক্স’-কে বাগে আনা সহজ নয়। সে নির্লিপ্তভাবে জেহেরের ল্যাপটপেই প্রেজেন্টেশন শুরু করল।
ঠিক তখনি কারানের ইশারায় এমেকা ওকনকো সামনে এগিয়ে এলো। সে বিশাল দশটি কালো ব্রিফকেস একে একে ইব্রাহিমের সামনে উন্মুক্ত করল। প্রতিটি ব্রিফকেসে থরে থরে সাজানো কড়কড়ে আমেরিকান ডলারের বান্ডিল। ইব্রাহিমসহ কক্ষের বাকি সবার চোখ মুহূর্তের জন্য বিস্ফোরিত হলো।

ইব্রাহিম বিস্ময় ঢাকতে না পেরে সিট থেকে প্রায় দাঁড়িয়েই পড়লেন। কিন্তু পুনরায় বসে নূরের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বললেন, “নূর, বিজনেস ডিলের সময় তোমাকে থাকতে বারণ করেছি। সম্ভবত তুমি রুলসগুলো ভুলে গেছ।”
নূর আর কথা না বাড়িয়ে কারানকে এক শেষ নজর দেখে তার দুই দেহরক্ষীসহ অন্দরের দিকে চলে গেল। কারান নূরের প্রস্থানের দিকে একবার তাকিয়ে আবার ইব্রাহিমের দিকে মনোনিবেশ করল। টাকার পাহাড় দেখে ইব্রাহিমের কপালে তখন বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। কারান পকেট থেকে একটি শুভ্র রুমাল বের করে অত্যন্ত নির্বিকারভাবে ইব্রাহিমের দিকে বাড়িয়ে দিল।
ইব্রাহিম হেসে রুমালটি নিয়ে কপালের ঘাম মুছলেন, পাশে দাঁড়ানো ম্যানেজারকে চোখের ইশারায় টাকাগুলো সত্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ দিলেন।
কারান পরিস্থিতি আরও সহজ করে দিয়ে বলল, “আপনি চাইলে এই ছোটোখাটো গিফট এখনই আপনার ব্যক্তিগত সেফে পাঠিয়ে দিতে পারেন। আমাদের কথা তো চলতেই থাকবে।”
এ তো মেঘ না চাইতেই জল! ইব্রাহিম আহ্লাদিত হয়ে তার প্রহরীদের টাকাগুলো ভেতরের গোপন প্রকোষ্ঠে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিলেন। তিনি জানতেন না, ওই প্রতিটি টাকার বান্ডিলের ভেতরের মাঝখানের স্তরে ফারহানের সেট করা ন্যানো-ট্র্যাকার রয়েছে, যা সরাসরি তাদের সেই গোপন অফলাইন হার্ড ড্রাইভ বা সার্ভারের লোকেশনটি বের করে আনবে।

জেহের আয়লাকে একরকম আছড়ে ফেলল কক্ষের বিশাল কিং-সাইজ ভেলভেট বেডের ওপর। কক্ষের ভেতরে মৃগনাভির উগ্র সুবাস আর ডিম লাইটের মায়াবী আলো এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি করেছে। আয়লার শিরদাঁড়া দিয়ে ভয়ের হিমশীতল স্রোত বয়ে গেলেও, সে তার দীর্ঘদিনের প্রশিক্ষিত স্নায়ুচাপকে বিন্দুমাত্র প্রকাশ হতে দিল না। সে বিছানায় শুয়েই অত্যন্ত রাজকীয় ভঙ্গিতে এক পায়ের ওপর অন্য পা তুলল। তার গাউনের কাটা অংশ দিয়ে উন্মোচিত শুভ্র উরু দেখে জেহেরের ভেতরের আদিম পশুটা যেন শৃঙ্খল ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইল। সে কোনো রকম ভূমিকা ছাড়াই আয়লার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু আয়লা ক্ষিপ্রতায় শরীরটা স্লাইড করে পাশে সরে যেতেই জেহের বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ে গেল।
সুযোগ বুঝে আয়লা নিজেই জেহেরের ওপর আরোহণ করল। তার উদ্দেশ্য ছিল ড্রেসিং টেবিলের নিচে লুকিয়ে রাখা হ্যান্ডকাফ দিয়ে জেহেরের হাত দুটো বিছানার পায়ার সাথে লক করে দেওয়া। কিন্তু জেহের কোনো আনাড়ি মদ্যপ নয়; সে ঝটকা দিয়ে আয়লার কবজি ধরে উলটে দিল, এবং তাকে নিজের নিচে পিষ্ট করল। আয়লার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো—প্ল্যান ‘এ’ ব্যর্থ। জেহের হুট করেই আয়লার চশমাটা টেনে নিয়ে ঘরের অন্য প্রান্তে ছুঁড়ে মারল। দামি লেন্সটা দেয়ালে লেগে চুরমার হয়ে যেতেই আয়লার হৃৎস্পন্দন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। ওটাই ছিল তাদের একমাত্র ভিডিয়ো সোর্স।

তবুও হার মানার পাত্রী আয়লা নয়। সে জেহেরের গাল বেয়ে নিজের কোমল আঙুলগুলো স্লাইড করতে করতে সম্মোহনী হাসি দিল। জেহেরকে আবার ঘোরের মধ্যে ফেলে সে তার হাত দুটো কৌশলে হ্যান্ডকাফে আটকাতে আটকাতে প্রশ্ন করল, “ডার্লিং, একটা কথা বলো তো, তোমরা এত বিশাল বিজনেস হ্যান্ডেল করো… মানে মুভির মতো তোমাদেরও কি কোনো আন্ডারগ্রাউন্ড সিক্রেট হেডকোয়ার্টার আছে?”
জেহের তখন আয়লার শরীরের ঘ্রাণ আর মদের নেশায় হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। সে বিড়বিড় করে উত্তর দিল, “হেডকোয়ার্টার? ধুর! ওসব তো বোরিং ক্লিশে। তবে হ্যাঁ, আমাদের আসল ইনভেন্টরি মানে ওই অর্গানগুলো আর মেয়েদের যেখানে প্রসেস করা হয়, সেই আজমান বর্ডারের ওয়্যারহাউসটা দেখলে তুমি ভিরমি খাবে। ওটা টোটালি সায়েন্স ফিকশন ল্যাব!”
বাইরে ভ্যানে বসা ফারহানের ল্যাপটপে তখন অডিয়ো ফিড আসছে। সে উল্লাসে টাইপ করল, “Got it! Ajman Border Warehouse.”
আয়লা জয়ের হাসিতে জেহেরের অধরের দিকে ঝুঁকে এলো, কিন্তু হঠাৎ করেই মাথার পেছনে এক প্রচণ্ড ভোঁতা আঘাত অনুভব করল সে। মুহূর্তেই তার চারপাশের জগৎ দুলতে শুরু করল। মাথার পেছনে হাত দিয়ে অনুভব করল উষ্ণ র*ক্ত গড়িয়ে পড়ছে। তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো, সে সংজ্ঞাহীন হয়ে জেহেরের বুকের ওপরই গড়িয়ে পড়ল। তখনি কক্ষের ছায়া থেকে বেরিয়ে এলো আমিরা নূর। তার হাতে একটি ভারি ব্রাস স্ট্যাচু। সে অত্যন্ত নির্লিপ্তভাবে আয়লার কান থেকে ব্লুটুথ ডিভাইস আর গলা থেকে নেকলেসটি এক টানে ছিঁড়ে নিয়ে বাথরুমে গিয়ে ফ্ল্যাশ করে দিল।
জেহের অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। নূরের দিকে তাকিয়ে লোলুপ স্বরে বলল, “গুড জব, সুইটি।”

এদিকে ফারহানের মনিটরে আয়লার বায়ো-সিগন্যাল ড্রপ করতেই সে সোজা হয়ে বসল।
“ওহ ফা*ক! শিট! আয়লার কানেকশন লস্ট! কারান, সামথিং ইজ ভেরি রং!”
কারান তখন ইব্রাহিমের সামনে বসে কন্টাক্ট পেপারে সই করার অভিনয় করছে। তার কানের পর্দার ঠিক ভেতরে থাকা ন্যানো ইন্ডাক্টিভ ইয়ারপিসটি সামান্য ভাইব্রেট করে ফারহানের কণ্ঠস্বর পৌঁছে দিল। এটি এতটাই ক্ষুদ্র যে চিকিৎসকের এন্ডোস্কোপ ছাড়া শনাক্ত করা অসম্ভব। কারানের চোখের মণি একবার স্থির হয়ে গেল, কিন্তু সে তার পেশাদারিত্বের খোলস থেকে বের হলো না। ইব্রাহিম তখন চুরুট টানতে টানতে কারানের প্রতিটি কলমের খোঁচা পর্যবেক্ষণ করছেন।

ফারহান কিবোর্ডে আঙুলের ঝড় তুলে বলল, “শোন কারান, উই আর রানিং আউট অফ টাইম। আমি লোকেশন পেয়ে গেছি, এখন জেহেরের পার্সোনাল ক্লাউড হ্যাক করছি। ওই সার্ভারে ঢুকতে পারলে এই পাচারচক্রের পুরো ডেটাবেজ আমাদের হাতে আসবে। তোকে ইব্রাহিমের ওয়াইফাই রাউটারের একদম ক্লোজ রেঞ্জে থাকতে হবে। তোর পকেটে রাখা ‘পকেট জ্যামার কাম স্নিফার’ ডিভাইসটা অন কর। জলদি কর, আয়লা বিপদে!”

Tell me who I am 2 part 15

কারান কলমটা নামিয়ে রাখল। তার পকেটে থাকা ক্ষুদ্র ডিভাইসটির সুইচ টিপে সে ইব্রাহিমের দিকে তাকালো। মুহূর্তেই কক্ষের অদৃশ্য তড়িৎ-চৌম্বকীয় তরঙ্গগুলো স্ক্যানড হতে শুরু করল। ডিভাইসের ন্যানো-ডিসপ্লেতে একটি সবুজ আলোকবিন্দু জ্বলে ওঠার অর্থ হলো, রুমটি এখন সম্পূর্ণ ডিজিটাল সারভেইল্যান্স মুক্ত। কারান জ্যামার মোড সক্রিয় করতেই ইব্রাহিমের রক্ষীবাহিনীর ওয়্যারলেস হেডসেটে কর্কশ যান্ত্রিক শব্দ তৈরি হলো; বহির্জগতের সাথে এই কক্ষের সংযোগ এখন সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। একজন দেহরক্ষী বিচলিত হয়ে ইব্রাহিমের কানে কিছু একটা বলতেই শেখের চোখেমুখে সন্দেহের ছায়া ঘনীভূত হলো। তিনি মাঝপথেই ডিনার ত্যাগ করে দাঁড়িয়ে পড়লেন।

Tell me who I am 2 part 16 (2)