Home এক মুঠো চাঁদের আলো এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৪

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৪

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৪
নুসরাত ফারিয়া

ফিজিক্স ক্লাসের একদম শেষ বেঞ্চে বসেছে আলো ও তার বান্ধবীরা। মূলত নিজেকে স্যার নামক স্বামীর থেকে আড়াল করে রাখার সামান্য চেষ্টা। নিত্যদিনের মতো আজও পুরো ক্লাসরুম নিস্তব্ধতার মাঝে বিরাজ করছে। কারোর মুখে টুঁশব্দ পর্যন্ত নেই। মেয়েরা আড়ে আড়ে তাকাচ্ছে সামনে ডেক্সের চেয়ারে বসে থাকা স্যারের দিকে। আধারের দৃষ্টি চশমা ভেদ করে বইয়ের পাতার ওপর নিবদ্ধ। আজ নতুন চ্যাপ্টার নিয়ে লেকচার দিবে। সাথে প্রেজেন্টেশনও!
-“দোস্ত দেখ! আজ স্যারকে কত্ত হ্যান্ডসাম লাগছে। সাদা শার্টে পুরাই মাখন।”
ফারাহ্ ফিসফিসিয়ে কথাটি বলে। তার প্রথম ক্রাশ আধার স্যার। শুধু তার নয়, পুরো ভার্সিটির বেশিরভাগ মেয়েদের ক্রাশ। যাদের বয়ফ্রেন্ড রয়েছে, তারাও মাঝেমধ্যে লাইন মা’রতে দুবার ভাবে না। তবে স্যার কাউকেই পাত্তা দেয় না। মেয়েদের থেকে একশো হাত দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা করে। কেউ যদি বেয়াদবি বা বাড়াবাড়ি করার চেষ্টা করে, তাহলে তাকে ছেড়েও দেয় না। একদম উচিত শিক্ষা দেয়। সেটা হোক না কেন পরিবারের কাছে নোটিশ দিয়ে!

-“দেখতে মাখন হলেও কিন্তু ভেতরে ভিষণ তিতা ফারু।”
তামান্না বই বের করতে করতে বান্ধবীর উদ্দেশ্যে বলল। পিছনের বেঞ্চ থেকে আলো সবটাই শুনতে পাচ্ছে। সে এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে অন্য কান দিয়ে বের করে দিচ্ছে। তার পাশে শিমুল চুপচাপ বসে আছে খাতা-কলম বের করে। তাদের থেকে কিছুটা দূরে ছেলেদের সারিতে মারুফ ও নির্ঝর বসে আছে। একটু পর স্যার লেকচার দিতে শুরু করে। সবাই মনোযোগ সহকারে শুনছে ও জরুরী বিষয়গুলো নোট করে নিচ্ছে। বেশিক্ষণ পর লেকচার শেষ হতে সবাইকে আগামীকাল প্রেজেন্টেশন করে নিয়ে আসতে বলা হলো।
আধার একপলক হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সটান হয়ে উঠে দাঁড়ায়। তারপর গম্ভীর কণ্ঠে একজনের উদ্দেশ্যে বলল,
-“আলো! কাম হিয়ার।”
স্যারের ডাকে ভেবাচেকা খেয়ে গেল আলো। সকলের দৃষ্টি এখন লাস্ট বেঞ্চে। আলো শুকনো ঢোক গিলে চুপচাপ উঠে সামনে এগিয়ে যায়।

-“জী স্যার?”
আধার আলোর দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক কণ্ঠে একটা প্রশ্ন বলে, -“আইনস্টাইনের স্পেশাল রিলেটিভিটি অনুযায়ী যদি দুটি বস্তু আলোর কাছাকাছি বেগে বিপরীত দিকে যায়, তবে তাদের আপেক্ষিক বেগের সূত্রটি বোর্ডে লিখে দেখাও।”
আলো লেখাপড়ায় খারাপ না। সেও খুব ভালো স্টুডেন্ট ছিল। তবে সেটা ভার্সিটি উঠা পর্যন্তই। এখন ঘাড়ে শয়তান চাপার ফলে পড়ালেখা ঠিক মতো করে না। কোনোভাবে পরীক্ষার আগের রাতে পড়ে টেনেটুনে পাস করে যেত। কিন্তু সে যেটা একবার ভালো করে মুখস্থ করে, সেটা সহজে ভুলে যায় না। সে জোরে শ্বাস নিয়ে মাথা নাড়িয়ে ডেক্সের ওপর থেকে ব্লাক মার্কার পেন তুলে হোয়াইটবোর্ডে উত্তর লিখতে শুরু করল।
আধার চোখের চশমা ঠিক করে তীক্ষ্ণ নজরে তাকিয়ে আছে বোর্ডের দিকে। সে জানে, মেয়েটা সঠিক উত্তর লিখতে পারবে না। ফেলটুসি মেয়ের থেকে এরচেয়ে বেশি আর কি’বাই আশা করা যায়! কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে আলো প্রশ্নের সঠিক জবাব লিখে সুন্দর করে বুঝিয়েও দিল। আধার কপাল কুঁচকে কয়েকবার ভুল ধরার চেষ্টা করেও পারল না। সে বামহাতে ভ্রু চুলকিয়ে আরেকটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,
-“ভার্চুয়াল ডিসপ্লেসমেন্ট ব্যবহার করে ডি’অ্যালেমবার্টের নীতিটি বোর্ডে লেখো এবং এটি থেকে ল্যাগ্রাঞ্জিয়ান সমীকরণ কীভাবে আসে তার শুরুর ধাপটি দেখাও।”

আলোর মুখ কালো হয়ে গেল। সে বুঝতে পারছে, তাকে এত কঠিন কঠিন প্রশ্ন ইচ্ছে করে করছে। যেন সবার সামনে তাকে নাস্তানাবুদ করতে পারে এই বদলোকটা। কিন্তু এখন সে কি উত্তর লিখবে? এটার জবাব পেটে এলেও মস্তিষ্কের ভেতর আসছে না। আলোকে থম মে’রে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আধার মনে মনে বাঁকা হাসলো। আরাম করে ডেস্কের সাথে হেলান দিয়ে দু’হাত প্যান্টের পকেটে খুঁজে বলল,
-“ইউ আর টেকিং টু লং….আলো রহমান!”
-“স্যার আমি উত্তর ভুলে গেছি।”
আলো সোজাসাপ্টা জবাব দিল।
-“তারমানে তুমি বলছো! উত্তরটা লিখতে পারবে না?”
আলো মাথা নাড়িয়ে বলল, -“জী!”
আধার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় বলল, -“ওকে ফাইন। বাট….শাস্তিস্বরূপ আগামীকাল তিনটে প্রেজেন্টেশন কমপ্লিট করে নিয়ে আসবে। গট ইট?”
স্যারের এহেন কথা শুনে আলোর চোখদুটো বেরিয়ে আসার উপক্রম। যেখানে একটা প্রেজেন্টেশন করতে নাজেহাল অবস্থা হয় সেখানে তিনটা? তাও একরাতে? অসম্ভব! সে কিছু বলতে যাবে তার আগেই ক্লাস টাইমের শেষের ঘন্টা বেজে গেল। আধার নিজের জিনিসপত্র নিয়ে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে সবার উদ্দেশ্যে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“দোজ হু ফেইল টু কমপ্লিট দেয়ার প্রেজেন্টেশনস বাই টুমরো উইল বি অ্যাসাইনড আ ট্রিপল-হার্ড প্রজেক্ট অ্যাজ আ পেনাল্টি, অ্যালং উইথ এক্সট্রা ল্যাব ক্লাসেস!”

আজ বেশি ক্লাস না থাকায় ভার্সিটি থেকে বেরিয়ে এল সবাই। তখন বাজে দুপুর দুইটা! টিফিনের সময় ক্যান্টিনে গিয়ে হালকা পাতলা নাস্তা করেছে সবাই মিলে। রাস্তার ধারে হাঁটতে হাঁটতে নির্ঝর আলোর উদ্দেশ্যে বলল,
-“দোস্ত? বিয়ে তো করে নিলি। এখন ট্রিট দে আমাদের। নয়তো দুলাভাইকে দেখা!”
আলো চোখমুখ কুঁচকে নির্ঝরের পিঠে শক্ত থাবা মে’রে দাঁত কিড়মিড় করে বলল, -“ওই শালা! তুই এত খাদক ক্যান বে? একসপ্তাহ আগে না তোদের দাওয়াত দিছিলাম আমাদের বাসায়? তখন হাঁড়ি হাঁড়ি বিরিয়ানি, পোলাও খেয়ে পেট ভরে নাই?”
নির্ঝর পিঠ ডলতে ডলতে মিনমিন করে বলল, -“পেট ভরলেও মন ভরে নাই।”
তামান্না মুচকি হেঁসে বলল, -“বিয়ে উপলক্ষে আমাদের ট্রিট দিলে মন্দ হত না। আমরা সবাই নাহয় দোয়া করে দিবোনি, যেন দুলাভাই তাড়াতাড়ি তোর কাছে ফিরে আসে। আর আদরে আদরে ভাসিয়ে দেয়!”
কথা শুনে সবাই হো হো করে হেঁসে উঠলো। আলো তপ্ত শ্বাস ফেলে ব্যাগ থেকে নিজের ফোনটা বের করে বিকাশ চেক করে নিলো। আছে দশ হাজারের মতো টাকা। এগুলো তার ঈদ সালামিসহ জমিয়ে রাখা টাকা। কাছেও কিছু টাকা রয়েছে বাবা, চাচার দেওয়া। সেগুলোই এই ক’দিন টুকটুক করে খরচ করে চলছে। আলো ফোন রেখে সবার উদ্দেশ্যে বলল,

-“ওকে চল! আজ তোদের সবাইকে আমার স্বামীর পক্ষ থেকে ট্রিট দিবো, তাও সুলতান ডাইনের কাচ্চি!”
মূহুর্তেই সবাই খুশি হয়ে গেল। তিনটা রিকশা দাঁড় করিয়ে ছয়জন উঠে পড়ল। সবাই উঠতেই নিজ নিজ রিকশা ছুটতে শুরু করল।
কথামতো আলো সবাইকে ট্রিট দিল। সবাই হাসিঠাট্টা, গল্পগুজবের মধ্যে পেট পুরে খেয়েদেয়ে কিছু ছবি তুলে বাহিরে এল। নির্ঝর ও মারুফের তরফ থেকে আইসক্রিম, চকলেট পেল সবাই। নিজেদের বাড়িতে ফেরার উদ্দেশ্যে সবাইকে সবাই বিদায় জানিয়ে রিকশায় উঠে পড়ে।
বাড়িতে ফিরতে ফিরতে বিকেল হয়ে যায় আলোর। মেইন রোডে জ্যামে আঁটকে যাওয়ার জন্য লেট হয়ে গেল। ঢাকা শহরের জ্যাম মানেই ঝামেলা! খান বাড়ির সামনে এসে রিকশা থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। দুপুরের কড়া রোদ্দুরের জন্য ঘেমে একাকার হয়ে গেছে। লাস্ট কবে বৃষ্টি হয়েছিল সেটাই ভুলতে বসেছে একপ্রকার। আলো খুব করে চায়, বৃষ্টি হোক! তার ভীষণ পছন্দের বৃষ্টি। শেষবারে ছোট বোনের সাথে বৃষ্টি বিলাস করেছিল বাগানে। কিন্তু এখন চাইলেও সেটা করতে পারবে না। কোথাও না কোথাও আলোর এখন খুব খারাপ লাগে। না চাইতেও পরিবার ছাড়া থাকতে খুব কষ্ট হয়। সে এখন একটু হলেও উপলব্ধি করতে পারছে, বাপের বাড়ি ও শশুর বাড়ির মধ্যে ঠিক কতটা তফাৎ! আলো দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ওড়না দিয়ে ঘামার্ত চেহারা মুছে কলিং বেল চাপলো। কয়েকবার বাজাতেই শেফালি চাচি দরজা খুলে দিলেন।

-“এতক্ষণ কোথায় ছিলে?”
ক্লান্ত শরীরকে টেনেটুনে ভেতরে প্রবেশ করতেই তাহমিনা খান গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি ড্রয়িংরুমে বসে থেকে চা খাচ্ছিলেন এবং জ্যোতির সাথে কথা বলছিল। জ্যোতি উনার বোনের বড় মেয়ে। আলো একপলক তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“বিয়ের কথা শুনে বন্ধুমহলের সবাই জিদ ধরেছিল ট্রিট নেওয়ার জন্য। ওদেরকে ট্রিট দিয়ে ফেরার পথে জ্যামে আঁটকে যাই মা। তাই দেরি হয়েছে!”
-“বিয়ে হতে না হতেই স্বামীর টাকা উড়ানো শুরু করে দিয়েছো? বাহ!”

আলোর কথা শেষ হতেই মাঝখান থেকে জ্যোতি কথাটি বলে ওঠে। আলো কিছু বলতে যাবে তখনই তাহমিনা খান বলে উঠলেন, -“ফ্রীতে স্বামীর টাকা পেয়েছো মানে এই না যে, অহেতুক খরচ করে বেড়াবে। আমার ছেলে দিনরাত কষ্ট করে টাকা ইনকাম করে। আর তুমি সেখানে আজাইরা খরচ করে বেড়াচ্ছো? এরপর থেকে টাকা খরচ করার আগে হিসেব করে চলবে। নয়তো ক’দিন পর সংসার রসাতলে যাবে তোমার অতিরিক্ত খরচের জন্য!”
শাশুড়ীর কথা শুনে এক মূহুর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায় আলো। সে এখন পর্যন্ত ওই লোকটার এক পয়সাও খরচ করেনি। বিয়েতে যা টাকা পেয়েছিল সবটাই রেখে দিয়েছে। তার নিজের কাছে যতটুকু ছিল ততটুকু দিয়েই চলছে। এমনকি আজ বিকাশ থেকে টাকা বের করেই সবাইকে ট্রিট দিয়েছে। যেখানে মানুষটা তাকে বকাবকি, ধমকাধমকি ছাড়া আর কিছুই দেয়নি। সেখানে সে নাকি অহেতুক স্বামীর টাকা খরচ করছে? হাস্যকর ব্যাপার। তবে তার খুব খারাপ লাগছে। কখনো টাকাপয়সা নিয়ে এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি। আর এখন দোষ না থাকা স্বত্বেও কথা শুনতে হচ্ছে।
আলো জোরে শ্বাস নিয়ে শান্ত গলায় বলল, -“আপনি ভুল বুঝছেন মা। আমি আপনার ছেলের এক টাকাও খরচ করিনি। যা খরচ করেছি ওসব আমার জমানো টাকা ছিল। আর….!”
-“হয়েছে থাক, আর অজুহাত দিতে হবে না। এখন তুমি আসতে পারো!”
আলোকে সম্পূর্ণ কথাটা শেষ করতে না দিয়ে বিরক্তিকর কণ্ঠে তাহমিনা খান বলে উঠলেন। আলো আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চুপচাপ চলে গেল নিজেদের রুমে। দিন যত যাচ্ছে তত তার দমটা বন্ধ হয়ে আসছে।

-“ভাবী? আপনাকে আম্মু ডাকছে।”
আলো লম্বা একটা গোসল নিয়ে টেবিলে বসে থেকে ল্যাপটপে স্যারনামক স্বামীর দেওয়া প্রেজেন্টেশনের স্লাইড তৈরি করছিল। তখন পিছন থেকে বাক্যটি শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে তার ননদ তিথি দাঁড়িয়ে আছে৷ মেয়েটা চট্টগ্রাম ভার্সিটিতে পড়ে এবং ওখানেই হোস্টেলে থাকে। মাসে দুএকবার করে বাড়িতে আসা-যাওয়া করে। তার থেকে এক বছরের ছোট হবে। বড় ভাইয়ের বিয়ের জন্য এসেছে। আগামীকাল চলে যাবে আবার। তার সাথে একটু পরিচয় হয়েছে। মেয়েটা দেখতে যেমন সুন্দর, তেমন নম্র-ভদ্রও। ভীষণ শান্তশিষ্ট একটা মেয়ে।
আলো মুচকি হেঁসে বলল, -“তুমি যাও। আমি আসছি।”
তিথি মাথা নাড়িয়ে চলে গেল। আলো ল্যাপটপ বন্ধ করে মাথায় ওড়না দিয়ে বাহিরে যায়।
-“মা আমাকে ডেকেছেন?”

ঘড়ির কাঁটায় পাঁচটা ছুঁইছুঁই। ড্রয়িংরুমে সোফায় বসে থেকে সোবহান খান চা খাচ্ছেন এবং পত্রিকা পড়ছেন। সকালে পড়া হয়ে ওঠেনি। তাই এখন অবসর সময়ে পড়ছেন। তাহমিনা খান ও শেফালি রান্নাঘরে সবার জন্য নাস্তা তৈরি করছে। তখন আলো এসে শাশুড়ীর উদ্দেশ্যে ধীর কণ্ঠে বলে।
তাহমিনা খান পাস্তা নাড়াচাড়া করতে করতে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, -“তুমি যে এই বাড়ির বউ, সেটা ভুলে গিয়েছো?”
-“না, কেন?”
-“তাহলে সারাক্ষণ ঘরের মধ্যে বসে থাকো কেন? সংসারের কোনো কাজকাম নেই? নাকি বাপের বাড়ির মতো এখানেও শুয়ে-বসে থেকে দিন পার করবে!”

আলো থমথমে মুখে বলল, -“কি কাজ করতে হবে বলুন মা। আমি এক্ষুনি করে দিচ্ছি।”
-“বেসিনে রাখা সমস্ত থালাবাসনগুলো পরিষ্কার করো। আর হ্যাঁ, ভুলেও কিছু ভাঙ্গে না যেন!”
আলো কিছু না বলে বেসিনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। তখন শেফালি বলে উঠলো,
-“নতুন বউ! আপনে খাড়ান। মুই সব পরিষ্কার করে দিতাছি।”
কাজের লোকের কথা শুনে তাহমিনা খান চোখ গরম করে তাকালেন। আলো মুচকি হেঁসে বলল, -“চাচি আপনে সবজি সাবধানে কাটুন, আমি এইগুলো করছি।”
তারপর আলো ধীরে ধীরে ও সাবধানে সবকিছু ধুয়েমুছে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখল। হাতে হ্যান্ডওয়াশ করতে করতে জানতে চাইল, -“আর কিছু করতে হবে মা?”
-“আজ রাতের সব রান্না তুমি করবে।”
রান্না করার কথা শুনে আলো চুপসে গেল। তার কখনো রান্নাঘরে যাওয়ার প্রয়োজন হয়নি। সবার আদরের মেয়ে ছিল কি-না! নুডলস, পাস্তা, অমলেট ও কফি পর্যন্তই রান্না জানে। তাই সে কিচেন টাওয়ালে ভেজা হাত মুছে শাশুড়ীর পাশে এসে দাঁড়িয়ে আমতাআমতা করে বলল,

-“আসলে মা! আমি তেমন একটা রান্না করতে পারি না। তবে আপনি যদি শিখিয়ে দেন তাহলে আমি কাল থেকে রান্না করব। কারণ আমি চাচ্ছি না, আমার জন্য খাবারগুলো নষ্ট হোক।”
আলোর কথা শুনে তাহমিনা খান চোখ দুটো বড়বড় করে তাকায়। জিজ্ঞেস করল, -“তুমি সত্যিই রান্না জানো না?”
আলো দুইদিকে মাথা নাড়িয়ে “না” বোঝায়। যেটা পারে না সেটা নিয়ে মিথ্যে বলে কি লাভ? দরকার হলে সে আস্তেধীরে সবকিছু শিখে নিবে। আলো ভেবেছিল তার শাশুড়ী মা হয়তো এটা নিয়ে তেমন রিয়াক্ট করবেন না। কিন্তু তিনি তাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে, চুলা বন্ধ করে দ্রুত বেরিয়ে গেলেন রান্নাঘর থেকে।
-“বাবা? আপনি এ কোন মেয়েকে নাতবউ করে নিয়ে এসেছেন?”
ছেলের দ্বিতীয় বউয়ের কথা শুনে সোবহান খান মুখ তুলে তাকিয়ে জানতে চাইলেন, -“কী হয়েছে ছোট বউমা? হঠাৎ এমন প্রশ্ন করছো কেন?”
-“এমন প্রশ্ন করব না তো আর কি করব বাবা? আপনি কেমন মেয়েকে আমার ছেলের বউ বানিয়েছেন? যে মেয়ে কি-না সামান্য রান্নাটুকু করতে পারে না। আর সেই মেয়েই খান বাড়ির বড় বউ? এটা হওয়ার আদৌ যোগত্যা ছিল ওই মেয়ের?”

-“মুখ সামলে কথা বলো ছোট বউমা। কার কোন যোগত্যা আছে কি-না নেই, সেটা আমাকে শেখাতে এসো না।”
সোবহান খান গম্ভীর মুখে বাক্য ছুঁড়ে। ততক্ষণে সবাই ড্রয়িংরুমে হাজির। তাহমিনা খান তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন,
-“একটা বাহিরের মেয়ের জন্য আপনি আমার সাথে এমন ব্যবহার করছেন বাবা?”
-“তুমি যাকে বাহিরের মেয়ে বলছো, সে আমার বড় নাতির বিয়ে করা একমাত্র বউ। আমার আদরের নাতবউ!”
আধার কিছুক্ষণ আগে বাড়ি ফিরে রুমে গিয়ে শাওয়ার নিয়ে বেরিয়েছে। ড্রয়িংরুম থেকে চেঁচামেচির আওয়াজ শুনে রুম থেকে বেরিয়ে এল। তখনই তার নজর সর্বপ্রথম গিয়ে পড়ল, অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা রমণীর এক জোড়া অশ্রুসিক্ত নয়নের দিকে। আধার দৃষ্টি সরিয়ে তাহমিনা খানের দিকে নিবদ্ধ করে শান্ত গলায় জানতে চাইল,
-“কী হয়েছে? আপনি এত রেগে রয়েছেন কেন? কোনো সমস্যা?”

-“এ বাড়ির বউ রান্না জানে না। তাকে বলার পর সে উল্টো আমাকেই হুকুম করে রান্না করার জন্য। তুমি তো জানো, আমার বাতের ব্যথা রয়েছে। বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না। সেখানে ওই মেয়ে আমাকে সাহায্য করা বাদ দিয়ে শুয়ে-বসে থেকে দিন পার করছে। তুমিই বলো! এইভাবে চললে সংসার কীভাবে চলবে?”
আধার কিছুক্ষণ চুপ থেকে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, -“আগে যেভাবে সংসার চলেছে সেভাবেই নাহয় চলবে ছোটমা! ও রান্না জানুক আর না জানুক! এতে কোনো সমস্যা নেই। রান্না করার জন্য শেফালি চাচি রয়েছে তো। তবুও যদি আপনি চান, বাড়ির বউ রান্না করবে! তাহলে ওকে কিছুটা সময় দিন সবকিছু শিখে নেওয়ার জন্য। আমরা শুরু থেকে কেউই সবকিছু শিখে-পড়ে আসি নাই। তিথি যেমন আমাদের বাড়ির আদরের মেয়ে, ঠিক তেমন আলোও তার বাড়ির আদরের মেয়ে। আপনি যেমন তিথিকে রান্নাঘরে যেতে দেন না, তেমন তার মাও তাকে যেতে দিত না। এটা একদম স্বাভাবিক বিষয়। আমি আশা করছি, আপনি আলোকে সময় দিবেন সবকিছুতে মানিয়ে নেওয়ার জন্য। কিছু ভুল করলে, শুধরে দিয়ে শিখিয়ে দিবেন। আপনি না পারলে শেফালি চাচিকে বলবেন। উনি সব শিখিয়ে দিবে।”
আলো এক মূহুর্তের জন্য ভেবেছিল তার শাশুড়ীর মতো হয়তো এখন ওই মানুষটাও তাকে কথা শুনাবে। কিন্তু তার পক্ষ নিয়ে এইভাবে যে প্রতিবাদ করবে সেটা কখনোই ভাবতে পারেনি। ঠিক তেমন তাহমিনা খানও ভাবতে পারেননি। তিনি তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন,

-“বিয়ে করতে না করতেই মা’কে পর করে দিলে?”
-“আপনি ভুল ভাবছেন। আমি জাস্ট ফ্যাক্ট তুলে ধরেছি। এই সামান্য রান্নার বিষয় নিয়ে খান বাড়িতে ঝামেলা সোভা পায় না। আর আপনি খুব ভালো করেই জানেন, আমি সবসময় ঝামেলা এড়িয়ে চলি। বাড়িতে কোনো বিষয়ে অশান্তি হোক সেটা একদম চাই না। তবুও যদি আপনারা এমন করেন, তাহলে বলুন। আমি এক্ষুনি চলে যাচ্ছি। এসব ড্রামা দেখার মোটেও ইচ্ছে নেই!”

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৩

তাহমিনা খান কিছু না বলে হনহন করে নিজ রুমে চলে গেল। উনার পিছু পিছু জ্যোতি ও তিথি যায়। নাতির কথাগুলো শুনে আজ বেশ খুশি হয়েছে সোবহান খান। তবে সেটা মুখে প্রকাশ করল না। চুপচাপ বসে থেকে ঠান্ডা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে খবরের কাগজে দৃষ্টি রাখলেন। আলো আড়ালে ওড়না দিয়ে চোখের পানি মুছে পিছনে ফিরে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াতেই আধার গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলো,
-“আগামীকাল যদি প্রেজেন্টেশন খারাপ হয়, তাহলে আপনাকে দশ তলা থেকে টুপ করে ফেলে দিবো মিস. কালো! তখন হাসপাতালের বেডে শুয়ে থেকে রান্নাবান্না কইরেন।”

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৫