Home এক মুঠো চাঁদের আলো এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৫

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৫

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৫
নুসরাত ফারিয়া

রাত বাজে সাড়ে দশটা। নিস্তব্ধ রুমের মাঝে পড়ার টেবিলে বসে থেকে কাজ করছে আলো। তখন সে রান্না করতে চাইলেও শেফালি চাচি করতে দেননি। নিজেও আর জোর করেনি। নয়তো দেখা যেত, হাত-পা পুড়িয়ে বসে আছে। তারমধ্যে স্যারের হুমকি তো ছিলই! সে আর যাইহোক, ওই লোকটাকে এসব ব্যাপারে মোটেও বিশ্বাস করে না। তবে আজ সন্ধ্যার ঘটনার জন্য বেশ মন খারাপ তার। কোথাও না কোথাও নিজের ওপরই বড্ড রাগ হচ্ছে। ফাঁকি না দিয়ে যদি রান্নাবান্না শিখে নিত, তাহলে হয়তো এমন পরিস্থিতিতে পরতে হত না। সব-ই কপাল!
আলো দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে স্লাইড বানাতে মনোযোগ দিল। অলরেডি দুইটা শেষের পথে। আরেকটি হয়ে গেলেই প্রেজেন্টেশন কমপ্লিট! তারপর নাক ডেকে আরামসে ঘুম দিবে। মাথাটাও বড্ড ব্যথা করছে।
আধার কিছু কাজের জন্য বাহিরে গিয়েছিল। বাড়িতে ফিরতে ফিরতে সাড়ে এগারোটা বেজে যায়। ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করতেই তিথি ছুটে এল। আধার নিয়ে আসা ফুচকা, ভেলপুরি, কাবাব ও আইসক্রিমগুলো ছোট বোনের হাতে দিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,

-“কাল রাতে তোকে চট্টগ্রামে ড্রপ করে আসবোনি।”
তিথি অনেক খুশি হলো। আধার আর কিছু না বলে দোতলায় সিড়ি বেয়ে উঠতেই জ্যোতি ডেকে উঠলো,
-“আধার ভাই? আমার ফুল কই?”
আধার পিছনে না ফিরে উপরে উঠতে উঠতে গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিল, -“মনে নেই!”
জ্যোতির মুখটা চুপসে গেল। তিথি ডাইনিংয়ে এসে খাবারগুলো প্লেটে সাজিয়ে রাখতে রাখতে বলল,
-“তুমি হাজারবার বললেও ভাইয়া ফুল এনে দেয় না তোমাকে। তবুও তুমি কেন বারবার ওইটাই চাও আপু?”
জ্যোতি একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে বলল, -“আমার না খুব শখ, তোর ভাইয়ের হাত থেকে ফুল নেওয়ার।”
-“তোমার শখ, শখই থেকে যাবে। পূরণ আর হচ্ছে না। কারণ এখন ফুল নিয়ে এলেও সেটা ভাবীকে দিবে। তোমাকে কেন দিবে হুহ্?”

-“ভুলে যাস না, তোর ভাইয়ের এই বিয়েতে মত নেই। শুধুমাত্র তোর দাদাজানের জন্য ওই মেয়েকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছে। কিছুদিন যাক, তখন দেখবি আধার ভাই ওই মেয়েকে ডিভোর্স দিয়েছে।”
তিথির হাতজোড়া থেমে গেল। সে জ্যোতির দিকে তাকিয়ে অবাক কণ্ঠে বলল, -“মানছি ভাইয়ার মত নেই। তাই বলে ডিভোর্স? আমার মনে হয়না, বড় ভাইয়া এমনটা করবে। কারণ দাদাজান এটা কখনোই হতে দিবে না।”
-“সময় বলে দিবে কে সঠিক ও বেঠিক!”
আধার রুমে প্রবেশ করতেই দেখতে পেল আলো টেবিলের ওপর মাথা ঠেকিয়ে ঘুমিয়ে আছে। এটা দেখে বেশ বিরক্ত হলো। এই মেয়েটা যেখানে-সেখানে ঘুমিয়ে যায়। তারওপর ঘুমেরও কোনো ছিঁড়ি নেই। সে নজর সরিয়ে গায়ে থাকা শার্ট খুলে আলমারি থেকে টিশার্ট ও ট্রাউজার নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল।
-“দাদাজান, ছোটমা খেয়েছে?”
তিথি ভাইয়ের প্লেটে ভাত বেড়ে দিতে দিতে বলল, -“হ্যাঁ, সবাই খেয়েছে। শুধু ভাবী বাদে!”
আধারের কপাল কুঁচকে গেল। সে কিছু জিজ্ঞেস করবে তার আগেই জ্যোতি চোখমুখ কুঁচকে বলল, -“নাও, শুরু হয়ে গেছে মেয়েটার নাটক। যত্তসব!”
তিথি আড়চোখে খেয়াল করল তার ভাইয়ের চেহারা একদম স্বাভাবিক। ধীর কণ্ঠে বলল, -“ভাবী বলেছিল, প্রেজেন্টেশন কমপ্লিট হওয়ার পর এসে খেয়ে যাবে৷ কিন্তু তার আগেই ঘুমিয়ে গিয়েছে। তাই আর উনাকে ডিস্টার্ব করিনি ভাইয়া।”
আধার কিছু না বলে চুপচাপ খেতে শুরু করল। জ্যোতি রান্নাঘর থেকে পায়েসের পাত্র নিয়ে এসে টেবিলের ওপর রেখে একগাল হেঁসে বলল,

-“তোমার পছন্দের ডেজার্ট তৈরি করেছি আধার ভাই! খেয়ে বলো, কেমন হয়েছে।”
-“মিষ্টি খেতে ইচ্ছে করছে না!”
আধার স্বাভাবিক গলায় বলে। সেটা শুনে জ্যোতির হাসিটা গায়েব হয়ে গেল। সে কিছু না বলে চুপচাপ ওখান থেকে চলে গেল। মনে মনে বিরবির করে বলল, -“আমিও দেখব, তুমি কতদিন আমাকে ইগনোর করতে পারো আধার ভাই। আজ হোক কিংবা কাল! তোমাকে আমি নিজের করে নিবোই।”
আধার খাওয়া শেষ করে একটা প্লেটে খাবার সাজিয়ে নিয়ে উপরে চলে গেল। তিথি বসে থেকে পায়েস খেতে খেতে ভাইয়ের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে থেকে মুচকি হাসলো।

চোখেমুখে পানি পড়তেই ধড়ফড়িয়ে উঠলো আলো। মেয়েটা এতটাই হকচকিয়ে গিয়েছে যে, চেয়ার নিয়ে উল্টে ঠাস করে নিচে পড়ে গেল। আলো হতভম্ব হয়ে কোমর চেপে ধরে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা স্বামীর দিকে তাকায়। পরিস্থিতি বুঝতে কিছুটা সময় লাগে। কিন্তু যখন বুঝতে পারল, তখনই রাগে চেঁচিয়ে উঠলো,
-“এ্যাই আপনার সমস্যা কি? আমার ঘুমের সাথে আপনার এত শত্রুতা কেন হুম?”
আধার টেবিলের ওপর প্লেট রেখে ধীর কণ্ঠে বলল, -“খাবার খেয়ে তারপর ঘুমাও!”
আলো কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বিরবির করে বলল, -“ভালো করেও তো ডাকতে পারতেন। শুধু শুধু রাতবিরেতে ভিজিয়ে দেন!”
আধার একনজর ভেজা মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে বিছানায় যেতে যেতে বলল, -“এক গ্লাসের জায়গায়, এক বালতি পানি ডিজার্ভ করতে।”
আলো দাঁত কিড়মিড় করল। মনে মনে বলল, -“শালা তোকে যদি গোবরের পানিতে চুবানি না দিয়েছি, তাহলে আমিও আলো রহমান নই!”
এসব বিরবির করতে করতে তোয়ালে দিয়ে চোখমুখ মুছে ওয়াশরুম থেকে হাত ধুয়ে এসে নিচ থেকে চেয়ার টেনে তুলে বসে পড়ল। খিদের জন্য তার পেট জ্বলে যাচ্ছে। কখন যে ঘুমিয়ে গেছে বুঝতে পারেনি। তবে এখন সব ইঁদুরগুলো পেটের মধ্যে তান্ডব শুরু করে দিয়েছে।

আলো চুপচাপ খাবার খেয়ে নিলো। প্লেট গুছিয়ে রেখে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে রুমের লাইট নিভিয়ে ড্রিম লাইট জ্বালিয়ে দিল। ততক্ষণে আধার ল্যাপটপে নিজের কাজ শেষ করে শুয়ে পড়েছে। আলো এখনো ভুতের মতো দাঁড়িয়ে আছে। মূলত সে ভাবছে, আজ কোথায় শুবে! এই ক’দিন সোফায় থেকে পরতে পরতে তার পিঠের, কোমরের বারোটা বেজে গেছে। এইভাবে চলতে থাকলে তার শরীরে আস্ত একটা হাড্ডিও থাকবে না। ওইদিকে বদমাইশ লোকটা কী শান্তিতে ঘুমাচ্ছে। অথচ সে কষ্ট করছে। আলো আজ ঠিক করে নিয়েছে, এখন থেকে সে বিছানাতেই থাকবে। তার সাথে শুতে যদি ওই লোকটার অসুবিধা হয়, তাহলে তিনিই নাহয় সোফাতে ঘুমাবে। তবুও সে আর নিজের শরীরকে কষ্ট দিবে না। অনেক ছাড় দিয়েছে, এখন আর না! আলো টুপ করে নরম তুলতুলে কম্ফোর্টারের মধ্যে ঢুকে গেল। আহা, কি আরাম! কতদিন পর নরম বিছানায় শুয়েছে। আজ একদম রিলাক্সে ঘুমাবে। তারপর যা হবে সকালে দেখা যাবে।

ধীরে ধীরে সময় অতিবাহিত হয়ে যায়। নিজের শরীরের ওপর ভারী কিছুর অস্তিত্ব টের পেয়ে ঘুম হালকা হয়ে গেল আধারের। সে পিটপিট করে চোখ মেলে তাকাতেই আহাম্মক বনে যায়। আলো তাকে কোলবালিশের মতো হাত-পা দিয়ে পেঁচিয়ে ধরে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। মেয়েটার মাথা তার নগ্ন বুকের মাঝে!
আধার কিছুক্ষণ বিস্ময়ে তাকিয়ে থেকে মেয়েটিকে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল। ওইদিকে আলো ঘুমের ঘোরে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বিরবির করল,
-“উমমম….কোলবালিশ! তুই আজ এত নড়ছিস ক্যান? আমাকে একটু শান্তিতে ঘুমাতে দে। নয়তো তোকে রাস্তায় ফেলে আসব হুহ্।”
আধার বিরক্তিকর কণ্ঠে বলল, -“আমি তোমার কোলবালিশ না। জলজ্যান্ত একটা মানুষ। ছাড়ো আমাকে অসভ্য মেয়ে!”
আলোর কান অবধি কথাগুলো আদৌ পৌঁছেছে কি-না সন্দেহ। সে তো নিজের ডান পা স্যারের পেটের ওপর তুলে দিয়ে আরামসে ঘুমাচ্ছে। আধারের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। সে একটু শক্তি খাটিয়ে নিজের থেকে আলোকে দূরে সরিয়ে দিল। এই মেয়েটার ঘুমানোর স্টাইল সাংঘাতিক! আধার ফোঁস করে তপ্ত শ্বাস ফেলে উবুড় হয়ে বালিশে মুখ গুঁজল। একটুপর অনুভব করল, তার উদোম পিঠের ওপর এক জোড়া কোমল পায়ের অস্তিত্ব!

-“কী নানুভাই? আজ সকাল সকাল মুখটা ওমন প্যাঁচার মতো করে রেখেছো কেন? চোখদুটোও ভীষণ লাল লাগছে। রাতে ঘুমাওনি?”
সিড়ি বেয়ে নিচে নামতেই নাতিকে দেখে সোবহান খান প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন। আধারের আজ মন-মেজাজ একদম ভালো নেই। এর পিছনে ওই মেয়েটাই রয়েছে। সারারাত একটুও তাকে শান্তি মতো ঘুমাতে দেয়নি। দূরে সরিয়ে দিলে আবারো কাছে এসে লেপ্টে ছিল। সোফা যদি লম্বা হত, তাহলে সে উঠে সোফাতেই শুয়ে থাকত। কিন্তু সেটাও করতে পারেনি। মেয়েটার জ্বালায় ইচ্ছে করছিল রুম থেকেই বেরিয়ে যেতে!
-“তেমন কিছু না দাদাজান৷”

আধার সোফায় বসে ধীর কণ্ঠে বলল। সোবহান খান হেঁসে বলল, -“উমম…বুঝি, বুঝি!”
আধার কথা বাড়াল না। শেফালি এসে কফি দিয়ে গেল। তাহমিনা খান তাদের থেকে কিছুটা দূরে সোফায় বসে থেকে গম্ভীর মুখে চা খাচ্ছেন আর আধারকে পর্যবেক্ষণ করছেন। উনার সাথে জ্যোতিও আছে। আর তিথি এখনো ঘুমে!
-“আধার ভাই? তোমার ঘাড়ে ওটা কিসের দাগ?”
জ্যোতির কথা শুনে সবার নজর আধারের উন্মুক্ত ঘাড়ের দিকে নিবদ্ধ হলো। জায়গাটা লাল হয়ে আছে, দেখেই বোঝা যাচ্ছে ধারালো নখের আঁচড় লেগেছে। সোবহান খান মিটমিট করে হাসছেন। আধার শান্ত ভঙ্গিতে উঠে গিয়ে বলে উঠলো,

-“আমার শরীরে দাগ রয়েছে কি-না নেই, সেটা তোর দেখার বিষয় না। আমি আগেও বলেছি, আজ আবারো বলছি। নিজের সীমার মধ্যে থাকার চেষ্টা কর। আর আমার ব্যাপারে অযথা নাক ঘামানোটা বন্ধ কর!”
রাগে, কষ্টে, অপমানে জ্যোতির কান্না পেল। তাহলে কী তার আধার ভাই ওই মেয়েটার কাছে গিয়েছে? কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব? আধার ভাই তো ওই মেয়েটাকে একটুও পছন্দ করে না, আর না এই বিয়েটা মেনে নিয়েছে। তাহলে?
জ্যোতি ছলছল চোখে তাহমিনা খানের দিকে তাকায়। তিনি ইশারা করে শান্ত হতে বললেন। মেয়েটা অসহায় কণ্ঠে বিরবির করে বলল,
-“আর কত শান্ত থাকব খালামণি? শান্ত থাকতে থাকতেই তো আমি আমার আধার ভাইকে হারিয়ে ফেললাম। তুমি আমায় কথা দিয়েছিলে! কিন্তু সেটাও রাখতে পারলে না। অথচ আমাকে শান্ত থাকতে বলছো। সরি টু সে খালামণি! এবার থেকে আমার অশান্ত রূপটাই দেখবে! অনেক সহ্য করেছি, কিন্তু আর না।”
বলেই জ্যোতি হনহন করে সেখান থেকে চলে গেল। আর পিছনে ফেলে গেল চিন্তিত তাহমিনা খান-কে!
আধার কফির মগে চুমুক দিতে দিতে রুমের ভেতর পা রাখতেই থমকে গেল। বিস্ময়ে লালচে চোখজোড়াও আঁটকে যায়, কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্যের মাঝে! তার থেকে কিছুটা দূরে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে আলো এলোমেলো ভাবে শাড়ি পরার চেষ্টা করছে ফোন দেখে। মেয়েটা এতটাই মনোযোগ সহকারে শাড়ি পরছে যে, তার অস্তিত্বটুকুও টের পেল না। আধার কিছুক্ষণ থম মে’রে দাঁড়িয়ে থেকে এক নিঃশ্বাসে গরম পুরো কফিটা-ই খেয়ে নিলো। তারপর উল্টো ঘুরে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। এই অসভ্য মেয়েটার জন্য এখন নিজের রুমেই যখন-তখন ঢুকতে পারবে না। ডিসগাস্টিং!

প্রেজেন্টেশনের জন্য আজ আলো আকাশি রঙা সুতির শাড়ি পরেছে। তার পছন্দের রং আকাশি ও সাদা! সে এক হাতে লম্বা আঁচল ও অন্য হাতে কুঁচি ধরে আস্তে-ধীরে নিচে নেমে এল।
-“মাশাআল্লাহ! আমার নাতবউরে একদম আকাশের পরীর মতো লাগছে।”
সোবহান খান মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থেকে প্রসংশা করলেন। আলো একগাল হেঁসে কাছে এসে দাদাশশুরের পাশে বসল। তারপর দু’হাতে জড়িয়ে ধরে আহ্লাদি গলায় বলল,
-“তুমি আমার থেকেও খুব সুন্দর দাদুভাই!”
সোবহান খান শব্দ করে হেঁসে দিয়ে মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, -“আমার বউ তো আর এমনি এমনি পাগল হয়নি আমার জন্য!”
আলো ফিক করে হেঁসে দিল।

-“মানতেই হচ্ছে, দাদীজানের পছন্দ মারাত্মক।”
সোবহান খান কিছু একটা ভেবে বললেন, -“আমার বউকে জান বলছিস! আর আমাকে ভাই?”
-“ঠিক আছে। এখন থেকে নাহয় তোমাকেও দাদাজান বলে ডাকব।”
সোবহান খান মুচকি হেঁসে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিল। তাহমিনা খান ডাইনিং সাজিয়ে ধীর কণ্ঠে বললেন,
-“নাস্তা রেডি। সবাই চলে এসো!”
আলো তার দাদাজানের সাথে উঠে গেল। খেয়াল করল, আধার স্যারের পাশের চেয়ারে জ্যোতি বসেছে। আর তার পাশে তিথি! সোবহান খান প্রথম চেয়ারে বসতে বসতে জ্যোতির উদ্দেশ্যে বলল,
-“আমার নাতির পাশে শুধু নাতবউয়ের বসার অধিকার আছে জ্যোতি। তুমি তিথির পাশে বসো!”
জ্যোতির মধ্যে কোনো হেলদোল দেখা গেল না। তার হাবভাবই বলে দিচ্ছে, সে ওখান থেকে উঠবে না। আলো ঘুরে এসে দাদাজানের পাশের চেয়ারে বসে বলল,

-“সমস্যা নেই দাদাজান। আপু ওখানেই বসে থাকুক।”
সোবহান খান শক্ত চোখে নাতির দিকে তাকায়। সেই তীক্ষ্ণ নজর দেখেও না দেখার ভান করে বসে থেকে একমনে নাস্তা করতে থাকল। আশেপাশে কি হচ্ছে, সেটা দেখার কোনো আগ্রহ নেই তার।
নাস্তা করা শেষে আলো ব্যাগ, ফাইলগুলো নিয়ে বেরিয়ে এল ভার্সিটিতে যাওয়ার জন্য। আধারও ফর্মাল পোশাকে রেডি হয়ে বেরিয়ে এসেছে।
-“নাতবউরে সাথে করে ভার্সিটিতে নিয়ে যাও নানুভাই!”
আধার ড্রয়িংরুমে আসতেই গম্ভীর কণ্ঠে আদেশ ছুঁড়ে দিল সোবহান খান। আলোও থমথমে মুখে চেয়ে রইল। আধার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বাহিরে যেতে যেতে বলে উঠলো,
-“এসো!”

আলো শাড়ি সামলিয়ে গাড়ির প্রথম ডোর খুলতে যাবে তখনই জ্যোতি শাড়ি পরে, সেজেগুজে এসে তাকে পাশ কাটিয়ে সোজা আধার স্যারের পাশে বসে গেল।
-“আমি পিছনে বসতে কম্ফর্ট ফিল করি না। তোমার কোনো অসুবিধা নেই তো পিছনে বসতে?”
আলো দ্রুত মাথা নাড়িয়ে বলল, -“না, না আপু! আমার কোনো অসুবিধা নেই।”
তারপর পিছনের ডোর খুলে বসে পড়ল আলো। ওইদিকে আধারের চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। সে নিজেকে যথেষ্ট সামলিয়ে জানতে চাইল,
-“তুই কোথায় যাবি?”
জ্যোতি একগাল হেঁসে বলল, -“তোমার ভার্সিটিতে। অনেকদিন যাওয়া হয় না, একটু ঘুরতাম ওই আরকি!”
আধার আর কিছু না বলে সিট বেল্ট বেঁধে গাড়ি স্টার্ট দিল। অনেকটা সময় পেরিয়ে ভার্সিটি থেকে কিছুটা দূরে গাড়ি থামিয়ে দিল। আলো কোনো কথা না বলে চুপচাপ নেমে গেল। কারণ সে জানে, তার জন্যই এখানে থেমেছে। তার মতো ওই লোকটাও চায় না, ভার্সিটির কেউ জানুক তাদের দুজনের সম্পর্ক কী!

-“তুইও নাম!”
আধারের কথা শুনে জ্যোতি অবাক কণ্ঠে বলল, -“কেন?”
-“আমি এক কথা দুবার বলতে পছন্দ করি না।”
জ্যোতি মন খারাপ করে নেমে গেল। ততক্ষণে আলো অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছে। খোলা কালো চুলগুলো বাতাসে উড়ছে, সাথে শাড়ির লম্বা আঁচলও! জ্যোতি ভেবেছিল, আলো রিয়াক্ট করবে কিংবা জেলাস হবে। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে মেয়েটা কিছুই মনে করল না। আর না কোনো অস্বস্তি ছিল।
সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে এসেছে। আজ প্রেজেন্টেশন ভালোই হয়েছে আলোর। আধার স্যার প্রসংশা না করলেও অন্য স্যার-রা করেছে। তাই সে খুব খুশি! বন্ধুমহলের সাথে ক্যান্টিন থেকে হালকাপাতলা খাবার খেয়ে ক্যাম্পাসে এসে বসেছে সবাই। এখন টিফিন টাইম। তারপর ল্যাব-ক্লাস রয়েছে। নির্ঝর একজন সিনিয়রের কাছ থেকে একটা গিটার নিয়ে ছুটে এল। তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
-“নে দোস্ত! একটা গান শোনা। বহুদিন হয়ে গেল তোর গান শুনি নাই।”
নির্ঝরের সাথে বাকীরাও সায় জানিয়ে আলোকে বলে গান গাইতে। যেহেতু এখন ফ্রী টাইম, তাই কারোরই কোনো অসুবিধা হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। আলো কিছুক্ষণ থম মে’রে বসে থেকে নির্ঝরের হাত থেকে গিটার নিয়ে সবুজ ঘাসের ওপর বসে পড়ল। আর তার আশেপাশে গোল হয়ে বসল বন্ধুমহলের পাঁচ জন সদস্য!
আলো মুচকি হেঁসে চোখ বুজে লম্বা শ্বাস নিলো। অতঃপর গিটারে টুংটাং শব্দ তুলে তার মায়াবী, চিকন কণ্ঠে গুনগুন করে গেয়ে উঠলো,

❝মাধবীলতা আমি, আমি কাননবালা!
তোমার গানের সুর আমি, আমি গলার মালা।
​দিঘির জলের রোদ আমি, আমি সাঁঝের বেলা,
মাধবীলতা আমি, আমি কাননবালা!
তোমার গানের সুর আমি, আমি গলার মালা।
নীল আকাশের সূর্য আমি, আমি জোছনার আলো,
তোমার সাধের প্রদীপ আমি—তাই আমায় বাসো ভালো!❞

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৪

সকলে গানের মাঝে ডুবে রয়েছে। আশেপাশের স্টুডেন্ট অনেকেই এসে তাদের সাথে বসেছে। কারণ তারা এই মিষ্টি কণ্ঠস্বরের সাথে বেশ পরিচিত৷ সবাই যখন মুগ্ধতার সাথে আলোর গান উপভোগ করছিল, তখন অদূর থেকে কেউ একজন নিজ মনে অস্ফুটস্বরে বলে উঠলো,
-“তোমার কণ্ঠ শ্বেত-কটি শ্যামা পাখির মায়াবী সুর…!”

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৬