Home এক মুঠো চাঁদের আলো এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৮

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৮

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৮
নুসরাত ফারিয়া

আজ রাতের সব রান্না আলো নিজ থেকে রেঁধেছে। এতদিন সে আজাইরা শুয়ে-বসে থেকে ফোনে রান্নার ভিডিও দেখে শিখেছে। যেন তাকে পরবর্তীতে রান্না-বান্না নিয়ে কেউ-ই কিছু বলতে না পারে৷ সবচেয়ে বড় কথা, এটা তার বাপের বাড়ি না! শশুর বাড়ি। একটু অসুবিধা হলেও সে প্রাণপণ চেষ্টা করছে সবকিছুতে মানিয়ে নেওয়ার জন্য। হাজার হোক, সে খান বাড়ির বড় বউ! বিয়েটা স্বাভাবিক না হলেও এসব অস্বীকার করতে পারবে না। যেখানে দুটো পরিবারের সম্মান জড়িয়ে আছে। আর মেয়েদের বিয়ে তো একবারই হয়! সেও না-হয় এই অনাকাঙ্ক্ষিত সম্পর্কের মাঝে থাকার চেষ্টা করবে। কারণ চাইলেও তো আর এখন সে কিছুই করতে পারবে না।

রান্না করার সময় আলো কতবার ছ্যাকা খেয়েছে তার কোনো হিসেব নেই। প্রথম প্রথম, তাই এমনটা হয়েছে। তবে আজ সে শরীরের কষ্টের চেয়েও বেশি খুশি। তার এই আনন্দকে দিগুণ করতে দাদাজান তাকে একটি ডাইরি দিয়েছিল। পুরো ডাইরির পাতা ভর্তি ছিল রান্নার রেসিপি দিয়ে। মেয়েটা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, এটা কার ডাইরি! তখন জানতে পারে এটার মালিক তার-ই আসল শাশুড়ী মা। উনি রান্না করতে খুব ভালোবাসতেন। সঙ্গে সকল রেসিপিগুলো লিখে রাখতেন। বিয়েতে সে শাশুড়ী মায়ের অনেক গহনাই পেয়েছিল। তাহমিনা খানও দিয়েছিলেন কিছু গহনা! তার আবার এই সোনাদানা খুব একটা পছন্দ না। তাই তো এই সামান্য ডাইরিটা পেয়ে খুশিতে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিল। শাশুড়ী মা আজ যদি বেঁচে থাকতেন তাহলে সে সোজা গিয়ে হাতে চুমু খেত, এত চমৎকার একটি রেসিপি বুক তৈরি করার জন্য। কিন্তু আফসোস! সেটা চাইলেও করতে পারবে না।

ঘড়ির কাঁটায় রাত এগারোটা ছুঁইছুঁই। নিত্যদিনের ডিনার দশটার মধ্যে শেষ হলেও আজ কিছুটা দেরি হয়ে যায়। এর পিছনে অবশ্য আলোই রয়েছে। মেয়েটা সবকিছু আস্তে-ধীরে করেছে। কারণ তাড়াহুড়ো করা শয়তানের কাজ। যেখানে সে প্রথম এত আইটেম বানিয়েছে সেখানে রান্না খারাপ হোক, সেটা মোটেও চায় না। নয়তো দেখা যাবে এটা নিয়েও কিছু না কিছু কটুকথা শুনে বসে আছে। আলো এতদিনে বুঝে গেছে তার দ্বিতীয় শাশুড়ী মা মোটেও পছন্দ করে না তাকে। এতে তার খারাপ লাগেনি, সব মানুষের পছন্দ তো আর এক নয়! যেখানে তার স্বামীই তাকে পছন্দ করে না, সেখানে শাশুড়ী মায়ের থেকেও কিছু আশা করা যায় না। সেও ওই লোকটাকে পছন্দ করে না। নিজের পরিবার ও দাদাজানের কথা ভেবে একপ্রকার বাধ্য হয়েই থাকছে। তবে ওই মানুষটা যদি তাকে মেনে নিতে চায়, তাহলে সে ভেবে দেখবে।

-“কি গো নাতবউ? তোমার রান্নাবান্না হইলো? নাকি পেটে গামছা বেঁধে আজ রাতটা কাটিয়ে দিতে হবে?”
আলো ডাইনিংয়ে খাবার সাজিয়ে রাখছিল আর আকাশপাতাল ভাবছিল। তখন সোবহান খান এগিয়ে এসে কথাগুলো বলে। আলো একগাল হেঁসে বলল,
-“এইতো দাদাজান সব কমপ্লিট। তুমি খেতে এসো!”
সোবহান খান মুচকি হেঁসে চেয়ার টেনে বসতে বসতে বললেন, -“যাও, তোমার বরকে ডেকে নিয়ে আসো।”
আলো মাথা নাড়িয়ে আগে তাহমিনা খানের রুমে গেল। দরজায় হালকা টোকা দিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“মা, খেতে আসুন!”
অপরপ্রান্ত থেকে কোনো সাড়াশব্দ ভেসে এল না। আলো কিছুক্ষণ চুপ থেকে রিনরিনিয়ে বলল,

-“আজ আমার প্রথম রান্না ছিল মা। তাই একটু দেরি হয়ে গিয়েছে। আপনি প্লিজ রাগ করবেন না। পরেরবার থেকে সময়ের খেয়াল রাখব।”
এবারেও হতাশ হলো আলো। কিছুসময় দাঁড়িয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চলে গেল। রুমে এসে দেখল—আধার স্যার বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসে থেকে বই পড়ছে। সে এগিয়ে এসে বলল,
-“খাবার খেতে আসুন!”
আধার বইয়ের পাতা থেকে মুখ তুলে সামনে তাকায়। মেয়েটার ফর্সা চেহারা লাল টমেটো হয়ে আছে, মাথায় ওড়না দেওয়া থাকলেও বোঝা যাচ্ছে ঘেমে গিয়েছে। আধার নজর সরিয়ে একবার দেয়াল ঘড়ি দেখে নিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“চার ঘন্টা ধরে রান্না করছিলে, তা একমাসের মনে? নাকি একবছরের জন্য?”
-“এক মাসও না, এক বছরও না! দশ বছরের মনে রান্না করেছি। খেতে ইচ্ছে হলে আসুন, নয়তো বসে থেকে বই খান।”

-“খাবার আদৌ মুখে তোলা যাবে তো?”
-“মুখে তুলতে না পারলে নাকে তুইলেন।”
একথা বলে আলো ওয়াশরুমে চলে গেল। ফ্রেশ হয়ে এসে দেখে রুমে আধার স্যার নেই। আলো তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে সোফার ওপর রেখে মাথায় ওড়না জড়িয়ে চলে গেল বাহিরে।
ডাইনিংয়ে সোবহান খান, তাহমিনা খান ও আধার খান বসেছে। আলো নিজ হাতে খুশিমনে খাবার সার্ভ করে দিচ্ছে। তাকে শেফালি চাচিও সাহায্য করছে।
-“তুমিও বসো নাতবউ।”
দাদাজানের কথা শুনে আলো ধীর কণ্ঠে বলল,
-“আমি পরে চাচির সাথে খেয়ে নিবো দাদাজান।”

সোবহান খান আর কিছু বললেন না। ওইদিকে আধার থমথমে মুখে বসে আছে। কারণ এখানে বেশিরভাগ খাবারই তার পছন্দের! যেখানে ছোট মা-ই তার পছন্দের, অপছন্দের ব্যাপারে জানে না, সেখানে এই মেয়েটা কীভাবে জানলো? তাহলে কি দাদাজান বলেছে? উমম….হতে পারে।
আধার কিছুক্ষণ চুপ থেকে ইলিশের লেজ ভর্তা, মাথা দিয়ে কচু শাঁক ও ঢেঁড়স ভাজি প্লেটে তুলে নিয়ে গরম ভাতে মেখে এক লোকমা মুখে নিতেই থমকে গেল। অবিশ্বাস চোখে আলোর দিকে তাকায়। তারপর গম্ভীর কণ্ঠে জানতে চাইল,
-“তুমি এইগুলো রান্না কোথায় থেকে শিখেছো?”
আলো থমথমে মুখে বলল, -“দাদাজান একটা রেসিপি বুক দিয়েছিল। ওটা দেখেই রান্না করেছি। তাই তো দেরি হয়েছে।”
আধার চট করে দাদাজানের দিকে তাকায়। নাতির তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দেখেও না দেখার ভান করে মনোযোগ সহকারে খেতে খেতে স্বাভাবিক গলায় বললেন,

-“আমার মুখ না দেখে চুপচাপ খাবার খাও। মেয়েটা অনেক কষ্টে রেঁধেছে। আশা করছি সম্পূর্ণ খাবার শেষ করবে।”
তারপর আলোর রান্নার অনেক প্রশংসা করলেন। বিশেষ করে হাঁসের কষা মাংসের! মেয়েটা খুশিতে গদগদ হয়ে আরো মাংস তুলে দিল দাদাজানের পাতে! আধার কিছু না বলে খেতে শুরু করে।
-“মা আরেকটু রুই মাছ দেই?”
আলো খেয়াল করেছে তার শাশুড়ী মা রুই মাছের কালিয়াটা দিয়েই খাচ্ছে। হয়তো মজা হয়েছে। তাই সে জিজ্ঞেস করে। তাহমিনা খান ধীর কণ্ঠে বললেন,
-“না থাক!”

আলো মুখ কালো করে প্লেটের দিকে তাকায়। মাছ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। তাই সে সহসাই দুটো মাছের বড় পিস তুলে দিল শাশুড়ীর পাতে। এতে তাহমিনা খান মুখ তুলে তার দিকে তাকায়। আলো বিনিময়ে হাসার চেষ্টা করল। তাহমিনা খান কিছু বললেন না। কারণ তার কাছে রান্নাটা খুবই ভালো লেগেছে। তিনি তো ভাবতেই পারেন নি, মেয়েটার রান্নার হাত এতটা মারাত্মক হবে। কিছু কিছু আইটেমের ক্ষেত্রে নুন-ঝাল একটু বেশি হলেও খেতে মন্দ নয়! বরং খাবারের স্বাদটাই একদম আলাদা! আলো আড়চোখে স্বামীর দিকে তাকায়। লোকটার প্লেটের ভাত প্রায় শেষের পথে! তাই সে আবারো এক বুক সাহস নিয়ে দম আঁটকে ভাতের পাত্র এগিয়ে নিয়ে গেল। তারপর প্লেট ভরে ভাত বেড়ে দিল।
আধার ঘাড় ঘুরিয়ে মেয়েটার দিকে তাকায়। আলো শুকনো ঢোক গিলে সরে গেল। মনে মনে ভাবছে, এই বুঝি তার উপর ধমকে উঠবে। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে মানুষটা কিছু না বলে চুপচাপ খেতে থাকল। এটা দেখে আলো ঠোঁট কামড়ে হেঁসে তরকারি তুলে দিল। মানুষটা তার রান্না করা সব তরকারি দিয়েই খাচ্ছে। বিশেষ করে ভর্তার আইটেমগুলো!
খাওয়াদাওয়া শেষে সবাই একটু রেস্ট করে নিজ নিজ রুমে চলে গেল। সোবহান খান যাওয়ার আগে নাতবউয়ের উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলে যায়—
-“নিজের মা’কে হারানোর পর আজ প্রথম আমার নাতিটা তৃপ্তি সহকারে খাবার খাইছে।”

❝Betahasha dil ne tujhko hi chaaha hai
Har dua mein maine tujhko hi maanga hai
Tera jaana jaise koi baddua…
Door jaoge jo tum, mar jayenge hum
Sanam teri kasam o… Sanam teri kasam o…
Sanam teri kasam!❞

​দুবাইয়ের সেই বিশাল স্টেডিয়ামে তখন পিনপতন নীরবতা। হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিও যেন হার মেনেছে নিস্তব্ধতার কাছে। পুরো স্টেডিয়াম অন্ধকার, শুধু মাঝখানের মঞ্চে কৃত্রিম ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে নীল রঙের একটি তীব্র স্পটলাইট নিবদ্ধ হয়ে আছে এক যুবকের ওপর। ​যুবকটির বুকের সাথে লেপ্টে আছে তার অতি পরিচিত, সিগনেচার গিটারটি। পরণে কালো লেদার জ্যাকেট, কপালের ওপর অবাধ্যের মতো পড়ে থাকা এলোমেলো দীর্ঘ চুলগুলো তাকে এক অদ্ভুত বিষণ্ণ রূপ দিয়েছে। তার ডান হাতের আঙুলে ঝিলিক দিচ্ছে রুপালি আংটি, আর কব্জিতে বিশেষ ব্রেসলেট—যা ভক্তদের কাছে তার পরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ​যুবকটি চোখ বুজে আছে। চারপাশের হাজারো চিৎকার তার কানে পৌঁছাচ্ছে না। গিটারে তারে আঙুল ছোঁয়াতেই সুরের এক সম্মোহনী ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল পুরো গ্যালারি জুড়ে। দেশি-বিদেশি অসংখ্য তরুণ-তরুণী মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে আছে সেই বিমোহিত গায়কের দিকে। তার কণ্ঠের জাদুতে তখন মরুর বুকে যেন নীল জোছনা নামছে।

​কনসার্ট শেষ হতেই সমস্ত নীরবতা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল গগনবিদারী চিৎকারে। যুবকটি যখন মঞ্চ থেকে ধীরপায়ে নেমে আসছিল, শত শত ভক্ত বডিগার্ডদের কড়া বেষ্টনী ভেদ করে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইল প্রিয় তারকার ওপর। কেউ একটা ছবি, কেউ বা এক পলক ছোঁয়া বা একটু অটোগ্রাফের জন্য রীতিমতো মরিয়া হয়ে উঠেছে। কিন্তু যুবকটির দৃষ্টি স্থির ও ভাবলেশহীন। সেই বিশাল উন্মাদনা আর ভিড় এড়িয়ে সে দ্রুতপায়ে গিয়ে উঠে পড়ল তার কালো রঙের বিলাসবহুল গাড়িটিতে। ​বাইরে তখনো তার নাম ধরে শত শত মানুষের হাহাকার শোনা যাচ্ছে, কিন্তু কাঁচের ওপারে সে সম্পূর্ণ একা। এক জনপ্রিয় তারকার এই বিষণ্ণ একাকীত্বই যেন তাকে সাধারণের চেয়ে আলাদা করে রেখেছে সবার কাছে….

এতক্ষণ ছায়া নিজ ফোনে কনসার্টটা খুব মনোযোগ সহকারে দেখছিল। ভিডিও শেষ হতেই সে ফোনটা বুকে চেপে ধরে চোখ বুজে নিলো। শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিরবির করে বলল,
-“আপনার দেখা কবে পাবো গায়ক সাহেব? এই র’ক্ত-মাংসের আপনি’টাকে একটিবারের জন্য সচক্ষে দেখার বড়ই ইচ্ছে আজ মনে জেঁকে বসেছে। দোহাই আপনার, এবার জলদি দেশে ফিরে আসুন! নয়তো আপনাকে দেখার এই অপূর্ণ স্বাদ হয়তো এ জন্মে আর মিটবে না। আমার এই অবুঝ হৃদয়টা যে আপনার কণ্ঠ আর উপস্থিতির জন্য বড্ড ব্যাকুল হয়ে আছে…..বড্ড!”

রাত বাজে আড়াইটা! এই সময়টাতে সবাই গভীর ঘুমে তলিয়ে থাকলেও আজ আধারের চোখে একটুও ঘুম নেই। অজানা ব্যথায় বুকের ভেতরটা ছটফট করছে। আজ নিজের মা’কে ভীষণ মনে পড়ছে তার। ছোট বেলা কতোই না সুখের, আনন্দের ছিল। তারপর….তারপর এক ঝড়োহওয়ায় সব শেষ! অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে মা’কে হারানোর পর তার জীবন থেকেও সুখ নামক বস্তুটা গায়েব হয়ে যায়। সে যাকেই মন থেকে ভালোবেসেছে এবং আঁকড়ে ধরে থাকতে চেয়েছে, ওপরওয়ালা তাদেরই কেঁড়ে নিয়েছে। তাই তো আজকাল আর কাউকেই ভালোবাসতে ইচ্ছে করে না, সয়ং নিজেকেও না!

আধারের বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। সে চোখের ওপর থেকে ডান হাত সরিয়ে নিজের বুকের দিকে তাকায়। মেয়েটা ইঁদুরের বাচ্চার মতো গুটিশুটি মে’রে শুয়ে আছে। খোলা কালো চুলগুলো তার সর্বাঙ্গ জুড়ে লেপ্টে রয়েছে। সে কতবার যে মেয়েটাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে, তবুও ওই ঘুরেফিরে তার বুকের মাঝেই আসবে। একসময় বাধ্য হয়েই
হাল ছেড়ে দেয়। আধার অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ্য করছে, মেয়েটা ঘুমন্ত অবস্থায় থাকাকালীন একটু পরপর ঘাড়, গলা চুলকাচ্ছে। এতে দুই ভ্রুয়ের মাঝে চারটে ভাজ পড়ল আধারের। কৌতূহলী হয়ে একহাতে এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে নিয়ে একপাশে রাখল। একরাশ অস্বস্তি নিয়েই মেয়েটার কাঁধ থেকে সামান্য টি-শার্টের গলা সরিয়ে নেয়। এবং সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠলো। পুরো ফর্সা কাঁধ লালচে হয়ে র‍্যাশে ভরে গিয়েছে। আধার চট করে উঠে বিছানায় শুয়ে দিল আলোকে। চুলগুলো সরিয়ে গলার দিকে তাকিয়ে দেখে, সেখানেও লাল হয়ে র‍্যাশে ভরে আছে। কোমল দু’হাতেও গুরিগুরি র‍্যাশ বের হয়েছে। অথচ মেয়েটা কী নিশ্চিতেই না ঘুমাচ্ছে!
আধার বুঝতে পারল, কোনো কারণে সম্ভবত মেয়েটার এলার্জি জেগেছে। তাই সে কয়েকবার ডেকে উঠলো। কিন্তু আলোর ঘুম ভাঙার কোনো নামগন্ধ নেই। আধার কিছুক্ষণ চুপ থেকে পর মূহুর্তে ঘুমন্ত মেয়েটার নাক, মুখ চেপে ধরে নিঃশ্বাস নেওয়াটা বন্ধ করে দিল। কয়েক মিনিটের পরই আলো ফট করে চোখ মেলে তাকায়। মেয়েটার বুক অস্বাভাবিক ভাবে উঠানামা করছে।
আলোকে জাগতে দেখে হাত সরিয়ে নিলো আধার। মেয়েটা চোখদুটো বড়বড় করে জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে অবিশ্বাস সুরে বলল,

-“আ-আপনি, আপনি আ-আমাকে ম-মে’রে ফেলার প্ল্যান করেছেন স্যার?”
আধার বিছানায় থেকে নেমে গায়ে টিশার্ট জড়িয়ে বিরক্তিকর কণ্ঠে বলল, -“মা’রার হলে প্রথম রাতেই মা’রতাম।”
আলো উঠে বসে দাঁত কিড়মিড় করে বলল, -“তাহলে মাঝরাতে এমন করে নাকমুখ চেপে ধরার মানেটা কী? আমি যদি দম আঁটকে ম’রে যেতাম, তাহলে কী হত হুম?”
-“কী হত? কিছুই না। বরংচ আমার ঘাড় থেকে একটা পাগল নেমে যেত!”
আলোর রক্তিম চোখদুটো ছলছল করে উঠলো। অভিমানী সুরে বলল, -“হ্যাঁ ঠিকই তো! আমি কে হই আপনার যে আমার জন্য কষ্ট পাবেন? আমি ম’রলেও কী আর বাঁচলেও কী! আপনার কখনোই যায় আসবে না। উল্টো পৃথিবীর সবচেয়ে খুশি ব্যক্তি আপনিই হবেন। দিনশেষে আলো নামক গলার কাটা-টা অন্তত নেমে যাবে!”
আধার ওয়ারড্রবের কাছে দাঁড়িয়ে থেকে এইড বক্সে এলার্জির ঔষধ খুঁজতেছিল। সেসময় মেয়েটার কথাগুলো শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় এক জোড়া অশ্রুসিক্ত নয়নের দিকে। আলো নাক টেনে বিছানায় থেকে নেমে একটা বালিশ বগলদাবা করে রুমের দরজা খোলার চেষ্টা করতেই আধার গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলো,

-“কোথায় যাচ্ছো?”
-“থাকব না আপনার ঘরে। নয়তো দেখা যাবে আপনি আবারো আমার ঘুমের সুযোগ নিয়েছেন।”
-“আমার জানামতে, এখন পর্যন্ত তোমার কোনোরকম সুযোগ নেইনি। যদি নিতাম—তাহলে নিজ পায়ে অক্ষত শরীরে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারতে না!”
আলোর ভ্রু কুঁচকে গেল। পিছনে ফিরে ঝাঁঝাল কণ্ঠে বলল,
-“একদম মিথ্যে বলবেন না। আপনি আমার ঘুমের সুযোগ আলবাত নিয়েছেন। নাহলে কী তখন ওমন করে নাকমুখ চেপে ধরতেন? আপনি তো আমাকে একদম জানে মে’রে ফেলতে চেয়েছেন। ভাগ্যিস তখন ঘুম ভেঙে গিয়েছিল, নয়তো এতক্ষণে আমি আকাশের চাঁদের আলো হয়ে যেতাম। আপনার নামে মামলা দিবো আমি। কতবড় সাহস, একটা জলজ্যান্ত ঘুমন্ত মেয়েকে মে’রে ফেলার চেষ্টা করেন।”

আধারের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। রাগে ঘাড়ের শিরা ফুটে ওঠে। সে খপ করে আলোর বাম হাতের বাহু চেপে ধরলো এবং টেনে ড্রেসিং টেবিলের সামনে নিয়ে যায়। বড় আয়নার দিকে ইশারা করে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
-“আয়নায় একবার নিজেকে দেখো। তারপর নাহয় আমাকে দোষ দিও!”
আলো কপাল কুঁচকে আয়নার দিকে তাকাতেই চোখ দুটো কপালে উঠে গেল। সে ফ্যালফ্যাল চোখে নিজের দিকে তাকিয়ে রয়! গলায়, হাতের উন্মুক্ত বাহুগুলোতে র‍্যাশে ভরে গেছে। চোখদুটোও ভীষণ লাল হয়ে আছে। চেহারা হালকা ফোলা-ফোলা! সে এতক্ষণ রাগের মাথায় অনুভব-ই করেনি, তার শরীর বাজেভাবে চুলকাচ্ছে। আলো তড়িঘড়ি করে গলা চুলকাতে শুরু করল। আধার আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে টি-টেবিলের ওপর থেকে পানির গ্লাস নিয়ে এসে আলোর সামনে খোলা ঔষধ বাড়িয়ে ধরে বলল,

-“খেয়ে নাও!”
আলো কৌতূহল নিয়ে জানতে চাইল,
-“ক-কিসের ঔষধ?”
আধারের মেজাজ বিগড়ে গেল। এমনিতেই মেয়েটা দুই লাইন বেশি বুঝে উল্টাপাল্টা বকে যাচ্ছে। তাই সে রাগে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৭

-“এটা বার্থ কন্ট্রোল পিল! একটু আগে না বললে আমি তোমার ঘুমের সুযোগ নিয়েছি? তাহলে তো এখন এটা খেতে হবে। নয়তো দেখা যাবে প্রেগন্যান্ট হওয়ার অপরাধেও আমার নামে মামলা ঠুকে দিলে।”
স্যারের এহেন কথা শুনে আলো পুরাই বাকরূদ্ধ হয়ে গেল। পর মূহুর্তে নাকমুখ কুঁচকে অস্ফুটস্বরে বলল,
-“আপনার মাইন্ড তো আমার মুখের থেকেও মাশাআল্লাহ স্যার!”

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৯