Home ফিরে এসো অনুরাগে ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩১

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩১

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩১
নওরিন কবির তিশা

স্নিগ্ধ প্রভাতের আগমন। নীলিমার বক্ষজুড়ে তপ্ত অরুণের রক্তিম আভার স্ফুরণ ঘটেছে খানিক পুর্বেই। তবে তালুকদার মঞ্জিলে ‌আজ নিস্তব্ধতার বিস্তার বেশ প্রকট। উৎসব মুখর পরিবেশেও কেমন গুমটবদ্ধ থমথমে অবস্থা বিরাজমান সেথায়। কারণটা অবশ্য কারো অজ্ঞাত নয়। একজনই বাড়ির রমণীদের তত একটা ঘাটাচ্ছেনা কেউ।
খাবার টেবিলেও শুনশান নীরবতা। টু শব্দ করছে না কেউ। হঠাৎ নীরবতার অবসান ঘটিয়ে কর্নোগোচর হলো টুইঙ্কেলের প্রাণবন্ত মিষ্টি কণ্ঠস্বর,তৃষাকে উদ্দেশ্য করে ও বলল,,

-‘ তোমরা সবাই আজকে এমন সাইলেন্ট মোডে কেনো বানি? তান্নু পিপি,মিমি, রাইচি কেউ কিছু বলছে না কেনো?
তৃষা অবশ্য অন্যদের মতো ততোটাও গুরুতর মেজাজে নেই। তবুও নিজেকে বেশ গুরুগম্ভীর দেখানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে ও। তবে টুইংকেলের প্রশ্নে সে নাটকের ইস্তাফা ঘোষিত হলো যেনো। তৃষা মুচকি হেসে বলল,,
-‘ ওদের আজ একটু মন খারাপ সোনা।
টুইংকেল বাচ্চাসুলভ কৌতূহলী কণ্ঠে শুধালো,,-‘ কেনো?
তৃষা ওর প্রশ্নের জবাবে কিছু বলতে যাওয়ার আগেই পার্শ্ববর্তী চেয়ার থেকে ভেসে এলো অদ্রিয়ানের কন্ঠস্বর। বিপরীতে বসে থাকা মেহেসানার দিকে একঝলক আড়দৃষ্টিতে চেয়ে ও বলল,,
-‘ কিছু মানুষের অন্যের সাথে মিউচুয়াল হতে প্রবলেম হয় মাম্মাম এইজন্য।
ওর কথা শেষ হতেই মেহেসানা অগ্নিদৃষ্টি হেনে ওর দিকে চাইলো। সঙ্গে সঙ্গে মুখে কুলুপ আটলো আদ্রিয়ান। তৃষা ঠোঁট চেপে হাসলো। খাবার টেবিলে বাড়ির লোকজনের পাশাপাশি নানা আত্মীয়ের অবস্থান হওয়ায় মেহেসানার প্রতিবাদ শুধুমাত্র ওই দৃষ্টিতেই সীমাবদ্ধ রইলো। আর কিছু বলল না ও। টুইংকেল আদ্রিয়ানের কথায় বুঝদারের ন্যায় মাথা নাড়িয়ে গোলাপি ঠোঁটদ্বয় গোল করে বলল,,

-‘ ওওওও।
তৃষা আর ওকে কথা বলতে না দিয়ে মাতৃসুলভ কণ্ঠে বলল,,
-‘ হুম,এইবার প্লেটের সবটুকু ফিনিশ করো তো দেখি। ফার্স্ট মাম্মা।
-‘ ওকে বানি।
ও আর কথা না বাড়িয়ে ঝটপট খেতে শুরু করলো। তৃষা ওর দিকে একপলক তাকিয়ে ফের মনোনিবেশ করলো খাওয়ায়। তবে খেতে খেতেই ওর স্মৃতির পাতায় দোলা দিলো কালকের ঘটনাটা। যার পর থেকে রীতিমতো বিক্ষোভ শুরু হয়েছে বাড়ির আঙিনায়।
গতকাল জমিদার বাড়ির সেই প্রাঙ্গণ রণক্ষেত্রের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ফলাফল যখন অমীমাংসিত রইল, তখন আয়োজক পক্ষ সকলকেই বিজয়ী ঘোষণা করে শান্তি চুক্তির প্রস্তাব দেয়। কিন্তু অন্দরমহলের রমনীদের জেদি মন সেই সমঝোতা মানতে নারাজ। পরাজয়হীন এই জয় যেন তাদের কাছে পরাজয়ের চেয়েও গ্লানিকর ঠেকেছে। পুরুষপক্ষের সেই অবজ্ঞাসূচক হাসি আর তর্কের রেশ এখনো থমথমে কুয়াশার মতো ডাইনিং টেবিলজুড়ে বিরাজ করছে।
ওদিকে পুরুষকূল নির্বিকার হলেও নারীকূলের অন্তরে তখনো ক্ষোভের দাবানল জ্বলছে এক অঘোষিত শীতল যুদ্ধের সূচনা হয়েছে অন্দরমহলে। তবে তৃষা এই দ্বন্দ্বে নিস্পৃহ; জয়-পরাজয় যাই হোক না কেন, আর্যর শাসনের তর্জনী যে তাকেই সইতে হবে এ ধ্রুব সত্য তার জানা।

মধ্যাহ্নের অলস রোদ্দুরেও তালুকদার মঞ্জিলের অন্দরমহলে তন্দ্রাচ্ছন্নতার লেশমাত্র নাই। জানালার পর্দায় দুপুরের ক্লান্ত পবনকুল দোলা দিয়ে যাচ্ছে, তৃষা সবেমাত্র গোসল সেরে কক্ষে প্রবেশ করল। ভেজা চুলের গোছা থেকে টুপটুপ করে ঝরে পড়া জলবিন্দুগুলো পিঠের কাপড়ে আল্পনা আঁকতে ব্যস্ত।
দীঘল দর্পণ এর সম্মুখে দন্ডায়মান তৃষা নিজের জলসিক্ত কেশরাজ মুছতে তৎপর ঠিক তক্ষুনি পাশে অবহেলায় পতিত ফোনটা মৃদু গুঞ্জনে কেঁপে উঠল।‌ কৌতূহলী বৃষ্টিতে ফোনটা হাতে নিতেই কাঙ্খিত নোটিফিকেশনে ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ফুটে উঠল তৃষার।কিছুদিন আগে যে ‘সিলিং কিং’ একাউন্টটি ওর রিকোয়েস্ট গ্রহণ করেছিল, সেখান থেকে একটি পোস্ট করা হয়েছে। গভীর অনুরাগে সিক্ত উক্তি,
“রৌদ্রতপ্ত নির্জনতায়,তোমার কাজল চোখে আমি পথ হারিয়েছি স্বেচ্ছায় ,প্রহর শেষে যখনই তোমায় দেখেছি একরাশ, বুঝেছি তোমার মায়াবী চাহনিতেই হয়েছে আমার সলজ্জ সর্বনাশ।”
উক্তিটির গভীরতা হৃদগহীনে এক সুপ্ত শিহরণ জাগিয়ে তুলল ‌তৃষার, ও মুগ্ধ নয়নে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে স্ক্রিনে আঙুল ছুঁলো। ওর খুব ইচ্ছে করল জনসম্মুখে একটা মন্তব্য করে নিজের মুগ্ধতা প্রকাশ করতে, কিন্তু পরক্ষণেই কী ভেবে আঙুল থামিয়ে নিল। সে সরাসরি ওই ভিডিওটির লিংক কপি করে আর্যর ইনবক্সে পাঠিয়ে দিল।
কিবোর্ডে দ্রুত আঙুল চালিয়ে খানিকটা রসিকতা আর কৌতূহল মিশিয়ে লিখে পাঠালো,

-‘ কী ব্যাপার মিস্টার? হঠাৎ এমন রোমান্টিক উক্তি! তবে কি কোনো কঠিন প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছেন নাকি আপনারও কারো মায়াবী চোখে সর্বনাশ হয়ে গিয়েছে?
মেসেজটা পাঠিয়েই তৃষা মুচকি হাসল। দর্পনে চেয়ে নিজের ভেজা চুলে তোয়ালেটা ভালো করে পেঁচাতে পেঁচাতে সে ভাবল, দেখা যাক ওপাশের মানুষটি এই অতর্কিত হামলার কী জবাব দেয়। নিথর দুপুরের শান্ত পরিবেশে তার হৃদস্পন্দন উত্তরের প্রতীক্ষায় একটু বেশিই চঞ্চল হয়ে উঠছে।
অতিবাহিত হলেও মুহূর্ত খানেক। হঠাৎ তুমি শব্দের সম্বিৎ ফিরল তৃষার। ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠতেই ওর হৃদস্পন্দন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সেইলিং কিং-এর ইনবক্স থেকে রিপ্লাই এসেছে। ও ভেজা চুলগুলো একপাশে সরিয়ে অধীর আগ্রহে ও মেসেজটা খুলল।
ওপাশে লেখা:
-‘ সর্বনাশ তো অনেক আগেই হয়ে গেছে ম্যাম। তবে সেটা মায়াবী চোখের চাবুকে নাকি ভাগ্যের পরিহাসে সেটা অজানা। আর হাবুডুবু খাওয়ার কথা বলছেন? সাগরের নাবিক তো আমি, ডুবতে দিলেও কি সাগর আমাকে অত সহজে ছেড়ে দেবে?
তৃষা বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পা নাচাতে নাচাতে টাইপ করল,

-‘ বাব্বা! নাবিক মশাইয়ের তো দেখি কথার ধার তলোয়ারের চেয়েও বেশি। তা এই যে বলছেন সর্বনাশ হয়ে গেছে, সেই সর্বনাশী কি জানে যে তার কাজল চোখের মায়ায় একজন আস্ত সেলিং কিং নিজের লজিক হারিয়ে বসে আছে?
কয়েক সেকেন্ডের নিস্তব্ধতা। ‘Typing…’ লেখাটা দেখে তৃষার পেটের ভেতর যেন হাজারো প্রজাপতি ডানা ঝাপটাতে লাগল। কাঙ্ক্ষিত মানবটির সাথে ও সরাসরি ভাবে কথা বলছে ভাবতেই হৃদয় স্পন্দন অবাধ্য ঘোড়ার ন্যায় ছুটলো,ওপাশের উত্তর এল,
-‘ সে জানুক বা না জানুক, ডিকশনারিতে তার নামটা আমি ‌কনফ্লিক্ট হিসেবে সেভ করে রেখেছি। কারণ তাকে দেখলেই আমার হার্ট আর ব্রেনের মধ্যে একটা কোল্ড ওয়ার শুরু হয়ে যায়। আপনার কী মনে হয়? স্যালেন্ডার করা কি সলিউশন?
তৃষা মুচকি হেসে লিখল,

-‘ মাঝে মাঝে স্যালেন্ডার করাটাই কিন্তু সবচেয়ে বড় জয়। বিশেষ করে যদি বিপক্ষ দল খুব জেদি আর মিষ্টি হয়। ট্রাই করে দেখতে পারেন, হয়তো আপনার গুমোট একাকীত্ব এক নিমিষেই কর্পূরের মতো উড়ে যাবে!
ওপাশ থেকে এবার শুধু একটা রিঅ্যাকশন এল একটি বাঁকা হাসির ইমোজি। তৃষা ফোনটা বুকের সাথে চেপে ধরে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। কেন জানি না, এই অপরিচিত মানুষটার কথার ধরণ, এই ত্যাড়া যুক্তি আর গাম্ভীর্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সূক্ষ্ম রসিকতাগুলো ওকে বারবার আর্যর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। ও নিজের মনেই বিড়বিড়িয়ে বলল,

-‘ না না, ওনার মতো রোবট কি আর এমন কাব্যিক কথা বলতে পারে? ইটস ইমপসিবল!
ও যখন ভাবনার অতল গহব্বরে নিমগ্ন, ঠিক তখনই কক্ষের নিস্তব্ধতা চিরে আর্যর গুরুগম্ভীর পদধ্বনি কর্ণগোচর হলো। তৃষা তড়িৎবেগে ফোনের স্ক্রিন অফ করে বালিশের নিচে গুঁজে দিয়ে অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে উঠে বসল। ওর আরক্তিম কপোলে তখনো সেই অজানা ভালোলাগার অবাধ্য আভা লেগে আছে।
আর্য ঘরে ঢুকেই তৃষার বিশৃঙ্খল অবস্থা আর ওর মুখের ওই অদ্ভুত রক্তিমাভ চাউনি দেখে থমকে দাঁড়াল। ওর কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ল, চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে যেন কোনো এক লুকানো সংকেত পড়ার চেষ্টা করল ও। আর্য ধীরপায়ে এগিয়ে এসে বেশ গম্ভীর অথচ কিঞ্চিৎ উদ্বিগ্ন কণ্ঠে শুধালো,
-‘ কি হয়েছে তৃষা? এনি প্রবলেম? এভাবে শুয়ে আছেন? অসুস্থ লাগছে?
তৃষার বুকের ধুকপুকানি তখন কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। ও অপ্রস্তুত হয়ে চুলে তোয়ালেটা ভালো করে পেঁচিয়ে নিয়ে তোতলামি করে বলল,

-‘ আরে না, ও কিছু না। জাস্ট একটা… একটা জোকস পড়ছিলাম। আপনি হঠাৎ এভাবে ঘরে ঢুকলেন কেন?
আর্য এক পলক বালিশের নিচে উঁকি দেওয়া ফোনের কোণাটার দিকে চেয়ে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে বলল,
-‘ নিজের ঘরে ঢুকতে পারমিশন লাগে ? নাকি…!
ওর অর্ধসমাপ্ত কথায় তৃষা ভ্রু কুঁচকে শুধাল,,
-‘ নাকি….!
আর্য নির্লিপ্ত ভঙ্গিমায় বলল,,-‘ নাথিং।
তৃষা এবার খানিকটা তেড়েফুঁড়ে বসল। আর্যর এই অবিরত নাথিং নাথিং বলাটা ওর ধৈর্যর সবটুকু বাঁধ ভেঙে দিচ্ছে।ও ভ্রু কুঁচকে, গাল ফুলিয়ে বেশ ঝাঁঝালো স্বরে বলল,
-‘ নাথিং নাথিং কি জিনিস হ্যাঁ। সারাক্ষণ শুধু নাথিং আর নাথিং। খেতে গেলে নাথিং শুতে গেলে নাথিং বলতে গেলে নাথিং।
তৃষার একনাগাড়ে বলা কথাগুলো আর্যর কর্ণগোচর হলো ঠিকই, কিন্তু ওর প্রতিক্রিয়ায় কোনো পরিবর্তন এল না। তৃষা পুনরায় বলল,

-‘ দেখুন।
ওর কথাটা বলতে দেরি সঙ্গে সঙ্গে আর্য অভিজ্ঞ ‌জহুরির ন্যায় সন্ধানী দৃষ্টি দিয়ে তৃষাকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করতে শুরু করল। ভেজা চুলের তোয়ালে থেকে চুঁইয়ে পড়া দু-এক বিন্দু জল তৃষার কপালে মুক্তোর মতো ঝিকমিক করছে।
তৃষা এবার ওর সেই অন্তর্ভেদী চাউনিতে কুঁকড়ে গেল কিঞ্চিৎ। অস্বস্তিতে আড়ষ্ট হয়ে কাঁচুমাচু ভঙ্গিমায় বলল,
-‘ ক-কি করছেন।
-‘ দেখছি।
-‘ ক-কাকে?
আর্য এবার দু’কদম এগিয়ে এলো তৃষার দিকে।ভরাট কণ্ঠে বলল,,
-‘ আপনাকে।
ওর এই অতর্কিত নৈকট্যে ও একটু হকচকিয়ে গিয়ে বিছানার সাথে আরও সেঁটে বসলো তৃষা অপ্রস্তুত স্বরে বলল,
-‘ ম-মানে?
তৃষার অপ্রস্তুত প্রশ্নের পিঠে আর্য এক পা এগিয়ে এসে ওর চোখের মণি বরাবর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে গাম্ভীর্য বিন্দুমাত্র না তেরছাভাবে তাকিয়ে বলল,

-‘ আপনিই তো বললেন দেখুন, তাই দেখছি।
তৃষা এবার রাগে ফেটে পড়ল। বিছানা ছেড়ে দাঁড়িয়ে কোমরে হাত দিয়ে তড়পে উঠে বলল,
-‘ আমি কি আমাকে দেখতে বলেছিলাম? উফ! অসহ্য।
আর্য নির্লিপ্ত গলায় জবাব দিল,
-‘ স্পষ্ট বাংলায় দেখুন বললেন, এখন অস্বীকার করছেন? অদ্ভুত তো!
-‘ আমি তো এমনি কথা বলার সময় দেখুন বলেছি। তা বলে আপনি ওভাবে আমায় ঘাবড়ে দিবেন? আপনি না আস্ত একটা সুযোগসন্ধানী রোবট! আর আপনার লজিক বড্ড বেশি ত্যাড়া।
তৃষা দাঁত কিড়মিড় করতে করতে তোয়ালেটা ঝাপটা দিয়ে ঘাড় থেকে সরাল। আর এক মুহূর্ত ব্যয় না করে গটগট করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

আর্যর সঙ্গে দীর্ঘ হোক বাকবিতণ্ডার সমাপ্তি ঘটিয়ে তৃষা আনমনের দোতলার করিডোর ধরে হাঁটছিল চঞ্চল পদক্ষেপে। তবে সিঁড়ির অভিমুখে এগোতেই হঠাৎ ওর চটুল চলন স্তিমিত হয়ে এল। সিঁড়ির ঠিক ওপরের ধাপটায় একফালি অবাধ্য রোদ এসে পড়েছে, যেখানে মেঝের মসৃণতা কেমন যেন এক বিসদৃশ আর পিচ্ছিল ঔজ্জ্বল্যে চকচক করছে তৃষা কৌতূহলী হয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল এবং সাবধানে সামান্য নুয়ে বসে আঙুল ছুঁইয়ে পরখ করল ওর অনুমানই নির্ভুল, চটচটে তৈলাক্ত আস্তরণ।
তৃষার কপালে চিন্তার সূক্ষ্ম ভাঁজ গভীর হলো। এত লোকজনের ভিড়েও এতটা অসতর্কতা! হঠাৎ আশেপাশে উপস্থিতি দেখতে এক ঝলক চাইলো সঙ্গে সঙ্গে ওর দৃষ্টিগোচর হল অদূরবর্তী স্তম্ভের আড়ালে একঝলক পরিচিত বেগুনী ওড়নার আঁচল বাতাসের ঝাপটায় দুলছে, ওকে চাইতে দেখেই সরে গেল সেটি। ব্যাস তৃষার বুঝতে বাকি রইল না যে কাজটা কার মস্তিষ্কপ্রসূত।
তবে তৎক্ষণাৎ কোনরূপ প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে ও পাশ থেকে একজন পরিচালিকাকে ডেকে স্থানটা পরিস্কার করে দেওয়ার জন্য বলল।

-‘ বানি ও বানি?
আকস্মিক পেছন থেকে ভেসে আসা মিষ্টি কণ্ঠটায় পিছু ফিরে চায় তৃষা। টুইংকেল গাল ফুলিয়ে দুহাত কোমরে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তৃষা খানিক এগিয়ে গিয়ে ওর সমান উচ্চতায় হাঁটু মুড়ে বসে বলে,,
-‘ ইয়েস প্রিন্সেস?
-‘ তুমি কই ছিলে, হ্যাঁ?
-‘ এইতো গোসলে গিয়েছিলাম।
-‘ গোসল করতে এত টাইম লাগে বুঝি? ইদানিং আমি নোটিশ করছি তুমি আমাকে একদম প্রায়োরিটি দাও না একদম আদর করো না।
টুইংকেলের এমন বাচ্চামীপূর্ণ অভিমানী সুরে তৃষা নিজেও ঠোঁট উল্টায়। ওর আদুরে তুলতুলে চোয়ালে নিজের নরম হাত ঠেঁকিয়ে বলে,

-‘ তাহলে তো বানি পঁচা হয়ে গিয়েছি প্রিন্সেস। বাট আমি খুব করে স্যরি। আসলে এত মানুষের ভিড়ে তো। অ্যান্ড আই প্রমিস ঢাকায় ফিরে আমরা আবার আগের মত খেলা করব।
টুইংকেল পুর্বের ন্যায় গাল ফুলিয়ে বলল,,-‘ প্রমিস তো!
তৃষা ওর কনিষ্ঠ আঙুলটি বাড়িয়ে দিয়ে টুইংকেলের ছোট্ট আঙুলের সাথে আলতো করে জড়িয়ে বলল,,
-‘ পিংকি প্রমিস সুইটহার্ট!
টুইংকেলের মেঘাচ্ছন্ন মুখশ্রীতে এবার স্বচ্ছ রোদ্দুরের দেখা মিলল,তৃষা ওকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিয়ে ওর নাকে নিজের নাক ঘষে আদর করে দিল।

-‘ এইযে মিস্টার হনুমান আমার রুমে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছেন কেন?
আদ্রিয়ান দরজার ফ্রেম থেকে দ্রুত মাথা সরিয়ে নিয়ে পকেটে হাত গুঁজে বেশ ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে দাঁড়ায়। মেহেসানা ভেজা হাত মুছতে মুছতে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ওর সামনে দাঁড়িয়ে কপালে কয়েকটা ভাঁজ ফেলে ফের বলে,,
-‘ সিসিটিভি হওয়ার শখ হয়েছে নাকি? এটা কিন্তু একটা গার্লস রুম, গেট ইট?
আদ্রিয়ান এক মুহূর্ত অপ্রস্তুত হলেও দমে গেল না একটুও,
-‘ প্রথমত, হনুমান নয়, আদ্রিয়ান নামটা মুখস্থ করার চেষ্টা করুন। আর দ্বিতীয়ত, এই দরজার ওপর কি আপনার নাম খোদাই করা আছে যে এখানে দাঁড়ালেই সেটা আপনার পার্সোনাল টেরিটোরি হয়ে যাবে? আমি জাস্ট ল্যান্ডস্কেপ ভিউ দেখছিলাম, আপনার মতো নয়েজ মেশিন দেখার শখ আমার অন্তত নেই!
-‘ ভিউ দেখার আর জায়গা পেলেন না? এই করিডোরে কি টেলিস্কোপ লাগানো আছে? অজুহাত না দিয়ে স্বীকার করুন যে আপনি ঝগড়া করার জন্য টার্গেট খুঁজছিলেন। প্রাইভেসির একটা ব্যাপার আছে সেটা জানেন তো?
-‘ প্রাইভেসি তো তাদের জন্য যারা শান্ত থাকে, আপনার মতো সারাক্ষণ সাউন্ড পলিউশন করা মানুষের তো ব্রডকাস্টিং লাইসেন্স নেওয়া উচিত! আর এমনিতেও আমি সাবরিনাকে খুঁজছি ওকে দেখেছেন?

-‘ না।
-‘ তাও দেখবেন কেন? সারাদিন চেঁচামেচি করতে থাকলে অন্যের খবর রাখার সময় হয় নাকি!
আদ্রিয়ান বিড়বিড় করে বলা। মেহেসানা ঠিক শুনতে পেল না কথাগুলো, তাই কিঞ্চিৎ কৌতূহলী হয়ে ও ফের শুধালো,
-‘ কি বললেন?
-‘ কই কিছু নাতো, আপনার মত বাঘিনীর সামনে আবার কি বলবো? প্রশ্নের জবাব তো পেয়ে গিয়েছি।
মেহেসানা কিছু একটা বলতে গিয়েও নাক ফুলিয়ে দরজাটা সশব্দে বন্ধ করে দিল। আদ্রিয়ান করিডোরে একা দাঁড়িয়ে নিজের বিজয়ীর হাসিটা চেপে আর একবার দরজার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বিড়বিড়ালো,,
-‘ শ্যি ইজ টু মাচ ইন্টারেস্টিং! আই লাইক ইট!

অন্তরীক্ষের বক্ষজুড়ে একফালি চাঁদের আধিপত্য।তালুকদার মঞ্জিলের পূর্ব পার্শ্বের বিস্তৃত কক্ষটিতে আজ চাঁদের হাট বসেছে। আম্রকাননের পাতায় পাতায় ঝিঁঝিঁ পোকার সুরলহরী আর দূর থেকে ভেসে আসা বকুল ফুলের মাদকতাময় ঘ্রাণে যামিনী আজ বড্ড মায়াবী। আজ অহনার মেহেদী। সেই উপলক্ষেই রীতিমতো জনাকীর্ণ স্থানে পরিণত হয়েছে কক্ষটা।
আসরের মধ্যমণি অহনা পার্শ্ববর্তী সোফায় বসে আছে।তার দু’হাত জুড়ে মেহেদীর সূক্ষ্ম কারুকাজ পল্লবিত হচ্ছে লতার ন্যায়। সম্মুখে উপস্থিত রমণীদের মধ্যে হাত সাজানোর তৎপরতা স্পষ্ট। একে একে প্রত্যেকের মেহেদীর দেওয়ার সম্পূর্ণ হলেও এক কোণে চুপিসারে বসে আছে তৃষা। মেহেদি দেওয়া তার অপছন্দনীয় ব্যাপারটা এমন নয় তবে মেহেদী দিতে গেলেই এখন সবাই বলবে হাতে আর্যর নাম লিখতে।
বিষয়টা আর্য কিভাবে নেবে সেটা জানা নেই। এজন্যই মূলত মেহেদী দেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও যাচ্ছে না ওখানে তৃষা। হঠাৎ মেহেসানার সঙ্গে সাবরিনা মৃত্তিকা রাইসা আর তামান্না ওর পাশে এসে ধপ করে বসে পরলো। প্রত্যেকের হাত সজ্জিত মেহেদির গাঢ় রঙে।
মেহেসানা তৃষার কাঁধে একটা ধাক্কা দিয়ে বলল,

-‘ কিরে? এভাবে কোণায় বসে মশা তাড়ানোর মানে কী? সবার হাত বুকিং হয়ে গেল, আর তুই এখনো হাত গুটিয়ে বসে আছিস?
তৃষা আমতা-আমতা করে বলল,
-‘ না মানে মেহু… আমার না আজ কেন জানি মুড নেই। আর এই মেহেদির গন্ধটা কেন জানি বড্ড কড়া লাগছে।
রাইসা পাশ থেকে টিপ্পনী কাটল,
-‘ ভাবিমনি, মুড নেই নাকি আর্য ভাইয়ার নামের অক্ষর লিখতে লজ্জা লাগছে? আমরা তো ভাবছিলাম তোমার হাতের তালুতে একদম হার্ট শেপ দিয়ে ভাইয়ার নামটা ইনভেস্ট করবা!
তামান্না এক গাল হেসে রাইসার কথায় সায় দিল,
-‘ একদম ঠিক! ভাবি, তুমি যদি এখন মেহেদি না পরো, তবে কিন্তু আর্য ভাইয়া ভাববে আমরা তোমাকে একঘরে করে রেখেছি। আর ভাইয়ার ওই পজেশিভ মোডের কথা তো জানোই! শেষে দেখা যাবে আমাদেরই ধমক খেতে হচ্ছে।
তৃষা বিরক্তি নিয়ে বলল,

-‘ আরেএএ। উনি এসব মেহেদি-টেহদি খেয়ালই করেন না। উনি আছেন ওনার ল্যাপটপ আর ধমক নিয়ে।
তামান্না খানিক রসিকতা করে বলল,-‘ ল্যাপটপ না ওনার তৃষাকে নিয়ে হবে।
ওর কথার প্রত্যুত্তরে তৃষা কিছু বলতে যাবে তার আগেই ‌মেহেসানা ওর হাত ধরে একরকম হ্যাঁচকা টান মেরে নিজের কবজিতে বন্দি করে ফেলল। অতঃপর তৃষার দিকে তাকিয়ে বলল,
-‘ তোমার বিলাভড হ্যাজবেন্ড কী খেয়াল করে আর কী করে না, সেটা আমরা খুব ভালো করেই জানি রে ডার্লিং। তুই এখন সুড়সুড় করে আমাদের সাথে যাবি, নাকি আমরা চারজন মিলে তোকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে যাব, সেটা ডিসাইড কর। আমাদের কিন্তু গায়ে অনেক জোর!
রাইসা, সাবরিনা মৃত্তিকা আর তামান্নাও তখন তৃষাকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরেছে। তৃষা নিরুপায় হয়ে অসহায় স্বরে বলল,

-‘ আরে, আচ্ছা ছাড় বাবা, আমি যাচ্ছি।
চারমূর্তির সম্মিলিত প্রাবল্যের কাছে তৃষার সকল প্রতিরোধ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। একপ্রকার জোরজবরদস্তি করেই ওকে মেহেন্দির আসরে বসালো ওর। শিল্পীটিও ওদের সম্মতিক্রমে নিপুণ আঙুল তৃষার ফর্সা হাতের তালুতে শীতল মেহেদীর প্রলেপ ছুঁইয়ে সূক্ষ্ম নকশার জাল বুনতে শুরু করল।
কিছুক্ষণ অতিবাহিত হতেই শিল্পী অতি নমনীয় স্বরে শুধালেন,
-‘ আপনার হাতের মাঝখানে কার নাম লিখব ম্যাম? নামের প্রথম অক্ষরটা বলুন।
তৃষা কিঞ্চিৎ লজ্জিত হয়ে আমতা-আমতা করে বলতে চাইল,
-‘ না থাক, নামের দরকার নেই। আপনি শুধু ডিজাইনটাই পূর্ণ করুন।
কিন্তু তৃষার মুখের কথাটুকু কেড়ে নিয়ে পাশ থেকে মেহেসানা ফোঁড়ন কাটল,
-‘ আরে বলছিস কী! নাম ছাড়া মেহেদী কান্নাকাটি শুরু হয়ে করবে তো। আর এমনিতে ও তত পার্সোনাল ওয়ার্ড আছেই।
অতঃপর ও মেহেদী আর্টিস্টের দিকে তাকিয়ে বলল,,

-‘ আপনি একদম বড় বড় করে আর্য লিখে দিন।
তৃষা বাধা দিতে গিয়েও ওদের ধমকের তোড়ে হার মানল। শিল্পী ওর হাতের তালুতে অতি নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুললেন একজোড়া বর্ণমালা। তৃষা শুধু চেয়ে রইল সেদিকে কোনো প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পেল না নিজের শব্দ ভান্ডারে।

মেহেদির আসর তখন অনেকটাই পাতলা হয়ে এসেছে। অহনাকে নিচে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সেখানে উপস্থিত শুধুমাত্র রাইসা আর মেহেসানারা। তৃষা নিজের দু-হাত মেলে ফ্যানের নিচে বসে আছে মেহেদি শুকানোর প্রতীক্ষায়। হঠাৎই কক্ষের নিস্তব্ধতা চিরে ঝড়ের বেগে প্রবেশ করল টুইংকেল। পেছন পেছন আর্যও ঢুকলো, তবে ওর মুখভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে ও কোনো মহাবিপদে পড়ে এই একরত্তি মেয়ের পিছু নিয়েছে।
টুইংকেল এসেই তৃষার পাশে ধপ করে বসে পড়ে আর্যর দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলল,
-‘ পাপা, তুমি বড্ড চিটার! তুমি বলেছিলে না বানিকে মেহেদি দিয়ে সাজিয়ে দেবে? এখন কেন পালানোর চেষ্টা করছো?
আর্য কপালে হাত দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ও তৃষার দিকে এক পলক তাকিয়ে বেশ অসহায় স্বরে বলল,

-‘ মাম্মাম, আমি বলেছি বানি মেহেদি পরলে সুন্দর লাগবে। তার মানে এই নয় যে আমি নিজে ওকে সেটা পরিয়ে দেব। আই অ্যাম আ মেরিন ইঞ্জিনিয়ার, নট আ মেহেন্দি আর্টিস্ট!
টুইংকেল এবার গাল ফুলিয়ে তৃষার কোল ঘেঁষে বসল। তৃষা নিজের ভেজা মেহেদি রাঙানো হাত দুটো সাবধানে সরিয়ে রেখে টুইংকেলকে সামলাতে চাইল। টুইংকেল এবার তৃষার হাতটা আর্যর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
-‘ দেখো পাপা, বানির হাতের এই ডিজাইনটা এখনো অসম্পূর্ণ। এখানে একটা গ্যাপ আছে। তুমি এখানে একটা ছোট্ট হার্ট এঁকে দাও তো! প্রমিস, এটা করলেই আমি তোমাকে বেস্ট পাপা বলব।
পাশে বসা চারমূর্তি টুইংকেলের কথায় ঠোঁটে চেপে হাসছে। এদিকে লজ্জায় রীতিমতো মাটির নিচে গেড়ে যেতে ইচ্ছা করছে তৃষার ও আমতা-আমতা করে বলল,
-‘ আরে টুইংকেল, থাক না সোনা। পাপা তো এগুলো পারে না। আর ডিজাইন তো অলরেডি ডান।
টুইংকেল জেদ দেখিয়ে বলল,-‘ নো পাপা ইজ আ লায়ার। পাপাই তো আমাকে প্রমিস করেছিল বলেছিল তোমাকে পরিয়ে। বাট তোমাকে যখন মেহেদি পড়াচ্ছিল ওরা, তখন পাপা কোথায় গিয়েছিল?
টুইংকেল তৃষার এমন কথোপকথন এর মাঝে অপ্রস্তুত হয়ে উঠছে আর্য ওর এমন অবস্থা লক্ষ্য করে, বসে থাকা চারমূর্তি উঠে দাঁড়ালো রুম থেকে প্রস্থান করতে করতে বলল,,

-‘ আমরা চাই বাপু। কাবাব মে হাড্ডি হতে চাই না টাটা। টুইংকেল মামনি তুমি যাবে? চলো আমরা আইসক্রিম খেতে যাব।
টুইংকেল আইসক্রিমের প্রলোভনে আর একদন্ড দাঁড়ালো না। চললো ওদের সঙ্গেই। ওরা বেরিয়ে যেতেই ঘরটা যেন এক নিমেষে নিস্তব্ধতার চাদরে ঢাকা পড়ল। কিন্তু সেই নিস্তব্ধতা স্থায়ী হলো না; দরজার ওপাশ থেকে রাইসা আর মেহেসানার চাপা হাসি আর হুট করে দরজার বাইরের সিটকিনিটা আটকে দেওয়ার শব্দে তৃষার বুকটা ছলাৎ করে উঠল।
তৃষা অপ্রস্তুত হয়ে তড়িৎবেগে বিছানা ছেড়ে দরজার দিকে ছুটতে গেল, কিন্তু মেহেদীর ভেজা হাত দুটো সামলাতে গিয়ে ওর গতি স্তিমিত হয়ে এল। ও দরজার হাতল ধরে কয়েকবার ঝাকুনি দিয়ে করুণ স্বরে ডাকল,
-‘ এই মেহু! রাইসা! দরজা খোল বলছি। ফাইজলামি করিস না, খোল!
ওপাশ থেকে মেহেসানার চপল কণ্ঠ ভেসে এল,

-‘ ব্যস্ত থাক ডার্লিং! কাল সকালের আগে এই দরজার চাবি ইন্তেকাল করিয়াছে। পড় ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। গুড নাইট!
তৃষা হতাশ হয়ে দরজার সামনেই মেঝেতে বসে পড়ার মতো ভঙ্গি করল। ও আর্যর দিকে তাকাতেই দেখল, আর্য জানালার কাছে দাঁড়িয়ে এক হাত পকেটে গুঁজে বেশ শান্ত চোখে ওকে দেখছে। ওর নির্লিপ্ত ভঙ্গিমায় তৃষা রীতিমতো বিচলিত হয়ে বলল,
-‘ একী! আপনি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন কেন? আপনি একবার ধমক দিলেই তো ওরা দরজা খুলে দিত।
আর্য ধীর পায়ে এগিয়ে এল তৃষার দিকে। বিছানার কিনারে বসে পায়ের ওপর পা তুলে বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে বলল,
-‘ ধমক দিয়ে কোনো লাভ নেই তৃষা। এই টিমে আপনার বান্ধবী মেহেসানা আছে। আর তাছাড়া, বাইরে এখন ডজনখানেক সিসিটিভি ক্যামেরা (আত্মীয়স্বজন) ঘুরছে। আমি সিন ক্রিয়েট করতে চাই না।
তৃষা চোখ বড় বড় করে বলল,

-‘ তাহলে এবার কি হবে?
-‘ নাথিং।
ফের সেই নাথিং শুনে মস্তক গরম হলো তৃষার,
-‘ মানে কি আপনি কি বুঝতে পারছেন? এই রুমে আলাদা কোনো শোবার স্পেস নেই তার উপর আমার হাতে মেহেদি।
-‘ সো?
-‘ আপনার মাথা। ঘুম আসছে আমার‌।
-‘ তো ঘুমিয়ে পড়ুন।
-‘ আল্লাহ! আপনি কি বুঝছেন না?
-‘ কি বুঝব?
তৃষা হতাশ হয়ে একটা তপ্ত শ্বাস ফেলল। ও বুঝে গেছে, এই পাথরের মূর্তিকে যুক্তি দিয়ে টলানো ওর সাধ্যের বাইরে আর বোঝানো তো অসম্ভব! ও রাগে গজগজ করতে করতে বলল,
-‘ আপনি আপনার নাথিং নিয়ে থাকুন। আমি চললাম ঘুমাতে।
তৃষা সাবধানে নিজের মেহেদী রাঙানো হাত দুটো বালিশের বাইরে ঝুলিয়ে রেখে বিছানার এক কোণে গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ল। আর্য কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে থেকে পরক্ষণেই বিছানার অন্য প্রান্তে গিয়ে উল্টো দিকে ফিরে শুলো।

নিশীথিনী তখন নিবিড় নিদ্রায় মগ্ন। বাতায়নের ফাঁক দিয়ে গলিত রূপোলি জ্যোৎস্না কক্ষের মেঝেতে মায়াবী জাল বুনেছে। আর্যর তন্দ্রাচ্ছন্নতা হঠাৎই এক মৃদু ভারে টুঁটে গেল। ও অনুভব করল, ওর প্রশস্ত বক্ষের ওপর এক উষ্ণ, কোমল পরশ।তৃষার একটি মেহেদি রাঙা হাত আর্যর শার্টের বোতামের ওপর অবিন্যস্তভাবে রাখা; ধীরলয়ে নয়ন মেলে এমন স্পর্শে হাতটা সরানোর প্রয়াসে আর্য যেই না পাশ ফিরলো।
সঙ্গে সঙ্গে ওর হৃৎপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে পুনরায় প্রবল বেগে স্পন্দিত হতে শুরু করল।তৃষা কখন যে ঘুমের ঘোরে সীমানা পেরিয়ে ওর একেবারে সান্নিধ্যে চলে এসেছে, সেটা অজানা। তৃষা শাড়ি পরে ঘুমানোর দরুন সেটা হয় একেবারে আল-থালু হয়ে আছে। আঁচলটা অবাধ্য হয়ে বুক থেকে বিচ্যুত হয়ে একপাশে লুটিয়ে পড়েছে,ফলে ওর মেয়েলী বক্ষদেশ আর মেদহীন পেটের উপরিভাগ সম্পূর্ণ অনাবৃত হয়ে আছে।
কক্ষের আলো না নেভানোর দরুন তৃষার এমন অবস্থা সরাসরি চাক্ষুষ আর্যর সম্মুখে। এদিকে ওকে এমন অবিন্যস্ত অবস্থায় দেখে আর্যর ‌চক্ষুদ্বয় কোটর থেকে বের হয়ে আসার উপক্রম। কণ্ঠনালীতে এক শুষ্ক ঢোক গিলে তৎক্ষণাৎ দৃষ্টি সরিয়ে নিজেকে সামলানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টায় মগ্ন ও।

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩০ (২)

তবে পার্শ্ববর্তী রমনীটি হয়তো চায়না ওকে শান্ত রাখতে। আর্য পাশে ঘুরতেই নিদ্রাচ্ছন্ন ‌তৃষা আরও বেশি কুঁকড়ে এসে আর্যর বাহু জড়িয়ে ধরল। ওর ‌উষ্ণ নিঃশ্বাস এখন আর্যর গ্রীবাদেশে তপ্ত বাতাসের ন্যায় আছড়ে পড়ছে। ওর অবিন্যস্ত আঁচল আর অনাবৃত ত্বকের শুভ্রতা আর্যর সংযমের দেওয়ালে প্রবল বেগে আঘাত হানছে।
আর্যর পেশীবহুল শরীরটা পাথরের মতো শক্ত হয়ে আছে। ও তৃষাকে সরিয়ে দিতে গিয়ে টের পেলো তৃষা শক্ত হাতে খামচে ধরে আছে ওর শার্টটা। উপায়ান্তর না পেয়ে আর্য ওর দিকে ঘুরলো, নিজেকে ছাড়ানোর প্রয়াসে। সঙ্গে সঙ্গে বাতাসের ঝাপটায় তৃষার অবাধ্য কেশরাজি আর্যর নাকে-মুখে আছড়ে পড়লো। আর্য নিজের চোখ দুটো শক্ত করে বুজে বিড়বিড়িয়ে বলল,
-‘ মাই স্টুপিড লেডি, তুমি জানো না তুমি কোন আগুনের সাথে খেলছো। আমার ধৈর্যর বাঁধ আর কতক্ষণ টিকবে সেটা আমার নিজেরও জানা নেই। আ’ম রিয়েলি স্যরি ফর মাই ফল্ট!

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩২