Home খান সাহেব খান সাহেব পর্ব ৭০

খান সাহেব পর্ব ৭০

খান সাহেব পর্ব ৭০
সুমাইয়া জাহান

শেখবাড়ির ড্রয়িংরুমের পরিবেশ পুরো থমথমে। সবার মুখে আতঙ্ক, উদ্বেগ আর চাপা উত্তেজনা। সদ্য বিয়ে করা ফারিয়া আর শাহরুখ একপাশে গুটিসুটি মেরে বসে আছে। তাদের মুখে ভয় আর অস্বস্তি স্পষ্ট। শাহরুখ বারবার ঠোঁট কামড়াচ্ছে, আর ফারিয়া ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে চোখ নামিয়ে রেখেছে। বাড়ির মহিলারা এককোণে দাঁড়িয়ে আছে। আরিয়ান, রায়য়ান আর রোজা ডাইনিং টেবিলের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। রায়য়ান চেয়ার বসে আছে। আরিয়ান আর রোজা তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের উদ্দেশ্যে আপাতত ফ্রিতে সিনেমা দেখা।
মুস্তাক সিকদার, মিনা বেগম, আনোয়ার সিকদার, খুশি বেগম, শামীম সাহেব আর সাখাওয়াত সাহেব সোফায় বসে আছেন।

ড্রয়িংরুমের মাঝখানে সামিয়া-রাহিন, নাজমিন-আইয়ুব আর শেরাজ-সুমু দাঁড়িয়ে আছে।
এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে পিয়াস। তার অবস্থা সবচেয়ে করুণ। চোখ লাল হয়ে উঠেছে, রাগে আর অপমানে হাত কাঁপছে। বুক ধড়ফড় করছে, যেন ভিতরটা ছিঁড়ে যাবে। সে চিৎকার করতে চাইছে, কিন্তু ভেতর থেকে শব্দেরা আসছেনা। তার ভেতরে জ্বলন্ত আগুন, কিন্তু সে আগুন প্রকাশ করার মতো ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না। সুমি বেগম ছেলের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন।
সাখাওয়াত সাহেব গম্ভীর মুখে সোফায় বসে, সামনে চায়ের টেবিলে হাত রেখে একদৃষ্টে তাকিয়ে। তার চোখে আগুনের ঝিলিক। খানিক পরই তিনি বজ্রকণ্ঠে বললেন,

“কে দিয়েছে তোমাদের এই সাহস? পরিবারের মানসম্মান শেষ করে দিলে।”
ড্রয়িংরুমের থমথমে পরিবেশ যেন আরও ভারী হয়ে উঠল।
শেরাজ সোজা এগিয়ে এসে বলল,
‌‌ “আজ যেটা হয়েছে, সেটা আর কেউ বদলাতে পারবে না। এখন ওদের দুজনকে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে আপনাদের মেনে নিতেই হবে।”
পিয়াস এক ঝলক শেরাজের দিকে তাকাল, তার চোখে আগুন। রক্তরাঙা চোখ দিয়ে তার উষ্ণ গরম পানি গড়িয়ে পড়ছে।
সুমু শেরাজের পাশে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকাল। সে বুঝতে পারছিল—এবার সত্যিই ঝড় নামতে যাচ্ছে।
সাখাওয়াত কপাল কুঁচকে বললেন,

“শেরাজ, তুমি বুঝে শুনে কথা বলছো তো? বিয়েটা খেলনা নয়। পরিবার, সমাজ—সবকিছু ভেবে দেখতে হয়। আর তোমরা ম‍্যাচিউর হয়ে এমন একটা কাজ কীভাবে করলে? তোমরা জানতে না আজ পিয়াসের সঙ্গে সামিয়ার বিয়ে?”
শেরাজ শান্ত ভঙ্গিতে বলল,
“আমি সব ভেবেই করেছি।”
সুমি বেগম ঠোঁটের কোণে ব্যঙ্গের হাসি টেনে বললেন,
“ওহ! মানে এখন থেকে তুমি এই পরিবারে কোর্ট কাচারি সব চালাবে? যাকে খুশি বিয়ে পড়িয়ে দেবে?”
মুস্তাক সাহেব গম্ভীর মুখে বললেন,
“আমার ছেলে জীবন নিয়ে, আমাদের পরিবারের মান-সম্মান নিয়ে ছেলেখেলা হচ্ছে? তুমি জানো এর ফল কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে?”
আরিয়ান, রায়য়ান আর রোজা বসে হাসছে। আরিয়ান ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি টেনে বলল,

“একজন ম‍্যাফস্টারকে ভয় দেখাচ্ছে।”
রায়য়ান চেয়ার থেকে হেলান দিয়ে হালকা হেসে উঠল,
“আমার কাছে তো মজারই লাগছে। ফ্রি সিনেমা চলছে।”
হঠাৎ আনোয়ার সাহেব রাহিনের উদ্দেশ্যে বললেন,
“রাহিন! তোমার থেকে আমি এমনটা আশা করিনি। তুমি সামিয়া মামণিকে ভালোবাসো, সেটা আমাদের আগে জানাতে পারতে। এখন এসবের মানে কি?”
রাহিন কোনো দ্বিধা না করে বলল,
“আমি এবার জানানোর জন‍্যই এসেছিলাম আব্বু। কিন্তু এসে দেখি, সামিয়ার অলরেডি বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে।”
ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সামিয়া মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
মিনা বেগম কপাল চাপড়ে বললেন,
“হায় আল্লাহ! এসব কি হচ্ছে? কেমন সন্তান জন্ম দিয়েছিলাম আমি।”
খুশি বেগম ঠোঁটে বাঁকিয়ে বললেন,
“শুরু থেকেই তো ওদের চোখেমুখে সব বোঝা যেত ভাবি। আপনার দেখেও, দেখেননি।”
রাহিন এবার স্পষ্ট গলায় বলল,

“আমি কোনো ভুল করিনি। আমরা দুজন দুজনকে ভালোবাসি। আর তাই, আমি যাকে ভালোবাসি তাকে সম্মানের সঙ্গেই বিয়ে করেছি। এখন যদি আপনার আমাদের গ্রহণ না করেন, তাহলে আমাদের কিছু করার নেই।”
পিয়াস হঠাৎ করে সামিয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
রাহিন দ্রুত সামিয়ার হাত শক্ত করে ধরে তার সামনে এসে দাঁড়াল,
“সাবধান, পিয়াস। সামিয়ার কাছে এক কদম এগোনোর চেষ্টা করবে না।”
পিয়াস গর্জে উঠল,
“তুই দূরে যা! সামিয়া আমার ছিল, আছে, থাকবে। আমি মেনে নেব না এই বিয়ে।”
রাহিন এক ধাপ এগিয়ে এসে বলল,
“তোমার মেনে নেওয়া, না নেওয়াতে কিছু যায় আসে না। আজ থেকে সামিয়া আমার স্ত্রী। আমাদের সম্পর্ক আল্লাহর নামে কবুল হয়েছে। তুমি যত চিৎকারই করো, সত্যিটা বদলাবে না।”
পিয়াস রাগে লাল হয়ে দাঁড়িয়ে। সে সামিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“সামু! কেন করলি এমন? উপস্ সরি! তুই তো এখন অন‍্যকারো বউ। তো ম‍্যাডাম বলেন, কেন আমাকে এভাবে শেষ করে দিলেন? আমি তো আপনাকে ভালোবাসি। আপনি কীভাবে আমার সামনে অন্যের বউ হয়ে এলেন?”
সামিয়া মাথা তুলে তাকাল। রাহিন কিছু বলতে যাবে তার আগেই সামিয়া রাহিনকে থামিয়ে দিয়ে সোজা গলায় বলল,

“আমি আপনাকে কোনোদিনও ভালোবাসিনি, পিয়াস ভাইয়া।”
পিয়াস মরিয়া হয়ে উঠল। সে পাগলের মতো বুকের ভেতর চেপে ধরে দুপা পিছিয়ে গিয়ে বলল,
“কিন্তু আমি তো বাসি। আমি আমার হৃদয় নিংড়ে সব ভালোবাসা আপনাকে দিয়েছি। বিশ্বাস করুন ম‍্যাডাম, আমি আপনাকে ভীষণ ভালোবাসি। ঠিক ততটাই ভালোবাসি আপনাকে, যতটা ভালোবাসলে একটা মানুষের পক্ষে আর কোনোদিনও অন‍্য কাউকে ভালোবাসা সম্ভব হয় না। ঠিক ততটাই ভালোবাসি আপনাকে, যতটা ভালোবাসলে একজন মানুষের জীবনে আর ভালোবাসার অভাব থাকে না। ঠিক ততটাই ভালোবাসি আপনাকে, যতটা ভালোবাসলে একটি জীবনের বাকি সব অভাব মুছে যায়।”
সামিয়া চুপচাপ দাঁড়িয়ে শুনছে। তার চোখে সহানুভূতি আছে, কিন্তু হৃদয় সম্পূর্ণ অচল। সে হালকা নিঃশ্বাস নিয়ে বলল,
“পিয়াস ভাইয়া, আমি জানি আপনার ভালোবাসা সত্যিই গভীর। কিন্তু সেই ভালোবাসা আমাকে হয়তো কখনও ছুঁতে পারবে না। আমার জীবন এখন আলাদা পথে চলছে। প্রথম থেকেই আমি রাহিন ভাইকে ভালোবেসে এসেছি। আমি বুঝতাম আপনার ফিলিংস। কিন্তু কখনও কিছু বলতে পারিনি কারণ, আপনি আমাকে কোনদিনও আপনার সেই ফিলিংসের কথা জানান নি। আমি ভেবেছিলাম আপনি আমাকে কোনদিনও জানালে, আমি আপনাকে সত্যিটা বলব। কিন্তু আপনি আমাকে কিছু না জানিয়ে ডিরেক্ট বাসায় বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এলেন। এদিকে, আমি এমন পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম যে, নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে বিয়েটা করতে রাজি হয়েছিলাম।”

পিয়াস হঠাৎ করেই সামনে এগিয়ে এলো। সে ধপ করে সামিয়ার পায়ের সামনে হাঁটুমুড়ে বসে পড়ল। সামিয়ার কথাগুলো শুনে দম বন্ধ হয়ে আসছে তার। রক্তবর্ণ চোখে দিয়ে ফোটায় ফোটায় পানি পড়ছে। সে নিজের মন ও হৃদয়ের যন্ত্রণা সামলাতে পারছেনা। কিছুতেই নিজের মনকে বোঝাতে পারছেনা যে, ‘তার ভালোবাসাটির মানুষটি তাকে না, অন‍্য কাউকে ভালোবাসে, তার ভালোবাসার মানুষটি আজ অন‍্যের বউ হয়ে গিয়েছে।’
রাহিন সামিয়ার হাত শক্ত করে ধরল। পিয়াস মাথা তুলে সেই হাতের দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ তাদের হাতের দিকে তাকিয়ে থেকে সে, ছাদের দিকে তাকিয়ে গগন ফাটিয়ে এক চিৎকার করে উঠল–যেন নিজের বুকের ভেতরের সমস্ত কষ্ট বের করে দিতে চাইছে সে। সাখাওয়াত সাহেবরা উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। সামিয়া থমকে গিয়ে দু’পা পিছিয়ে গেল। সুমি বেগম কাঁদতে- কাঁদতে দৌড়ে এসে ছেলেকে জড়িয়ে ধরল। ফারিয়া আর ফারিন ভাইয়ের কষ্ট দেখে কেঁদে উঠল। সুমুর চোখ দিয়ে দু’ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। পিয়াসের অবস্থা দেখে আরিয়ান, রায়য়ান একসাথে সুমুর দিকে তাকাল। রোজা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। অন‍্যদিকে, আলিশা রায়য়ানের দিকে তাকিয়ে দু’ফোটা চোখের পানি ফেলে আবার সেটা হাত দিয়ে মুছে ফেললো। পিয়াসের বুকের যন্ত্রণা এখানে উপস্থিত সকলে কম বেশি সকলে বুঝতে পারছে। তবে সবথেকে বেশি তারা বুঝল, যারা কাউকে একতরফা নিঃস্বার্থের মতো ভালোবাসে বা কোনদিনও কাউকে একতরফা নিঃস্বার্থের মতো ভালোবেসেছিল।
পিয়াস সামিয়ার সামনে থেকে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে এখন আর শুধু কান্না নেই—ছিল একধরনের উন্মাদনা। সে বুক চাপড়াতে-চাপড়াতে চিৎকার করে উঠল,

“আল্লাহ! কেনো? কেনো আমাকে এভাবে ভেঙে দিলে? আমি তো কাউকে কষ্ট দিইনি। আমি শুধু সামিয়াকে ভালোবেসেছিলাম। আমি শুধু তাকে চাইছিলাম। তাহলে কেনো সে আমার হলো না? কেনো আমার জীবনটা এমন অভিশপ্ত?”
সে দু’হাত দিয়ে মাথার চুল টেনে ধরে এদিক-ওদিক পায়চারী করতে লাগল। তার কণ্ঠস্বর কাঁপছে, চোখ থেকে টপাটপ অশ্রু ঝরছে। হঠাৎ সে করেই দেয়ালে মাথা ঠুকে দিল। চারপাশে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু হলো।
সুমি বেগম ছুটে এসে ছেলেকে আঁকড়ে ধরল,
“পিয়াস! বাবা থাম! এভাবে ভেঙে পড়িস না, বাবা। আল্লাহর নাম নে। এমন করিস না বাপ। নিজের ক্ষতি কেন করছিস?”
কিন্তু পিয়াস থামছে না। সে সুমি বেগমের হাত ঝাঁকিয়ে সরিয়ে দিয়ে আবার সামিয়ার দিকে তাকাল,

“সামু! আমি মরে যাবো, কিন্তু তোকে ভুলতে পারব না। শুনছিস? আমি তোকে ছেড়ে থাকতে পারব না। তুই যদি আমার না হোস, আমি তোকে কারো হতে দেব না।”
রাহিন এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সামিয়ার সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে গর্জে উঠল,
“পিয়াস! সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছো তুমি। সামিয়া আমার স্ত্রী। তাকে নিয়ে একটা বাজে কথা বলার সাহস করো না।”
শাহরুখ আর আশিক এসে পিয়াসকে আটকাল। শাহরুখ পিয়াসকে সামলানোর চেষ্টা করে বলল,
“তোকে এখন শান্ত হতে হবে, পিয়াস। এটা পাগলামি, বুঝতে পারছিস না?”
পিয়াস দমকা শ্বাস নিতে নিতে হাত-পা ছুঁড়ে চিৎকার করতে লাগল। তার মধ্যে শুধু হতাশা আর হাহাকার। সে আর্তনাদ করে উঠল,

“আমার বুকের ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে। আমার কষ্ট হচ্ছে।”
পুরো ড্রয়িংরুম নিস্তব্ধ হয়ে আছে, শুধু শোনা যাচ্ছিল পিয়াসের আর্তনাদ, আর সুমি বেগমের কাঁদো কণ্ঠে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা।
শেরাজ একপাশে দাঁড়িয়ে ঠোঁট শক্ত করে চেপে ধরল। তার দৃষ্টি পিয়াসের দিকে স্থির—সে বুঝতে পারছে, এই ক্ষত সহজে শুকাবে না।
সুমু শেরাজের পাশে এসে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল,
“খান সাহেব, পিয়াস ভাই তো পুরো ভেঙে পড়েছে। আমার অনেক কষ্ট হচ্ছে ভাইয়াকে দেখে।”
শেরাজ গভীর গলায় উত্তর দিল,
“অপূর্ণ একতরফা ভালোবাসার ব্যথা সবচেয়ে কষ্টের, সুইটহার্ট। এ ব্যথা একটা মানুষকে ভয়ংকর করে তুলতে পারে।”
সুমু দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। শেরাজ সুমুর হাত ধরে তাকে আশ্বাস দিল।
পিয়াস মায়ের কোলে মুখ গুঁজে হাহাকার করছে। তার কণ্ঠ ভেঙে কেঁপে কেঁপে বেরিয়ে আসছে,

“আম্মু! সামু ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না। আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। ওকে ছাড়া আমি রোজ একটু একটু করে মরব, আম্মু। তুমি আমাকে শান্তি দাও, আম্মু। আমাকে মরে যেতে দাও।”
সুমি বেগম কাঁদতে কাঁদতে তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“না বাবা! এমন কথা বলিস না। বেঁচে থাকতে হয়তো এখন কষ্ট হবে, কিন্তু আল্লাহ সব ঠিক করে দেবেন। তুই আমার ভরসা, তুমি আমার চোখের মণি। তোর কিছু হয়ে গেলে, আমি মরে যাব বাবা।”
শাহরুখ পিয়াসের কাঁধ চেপে ধরল বলল,
“ভাই, শান্ত হও। এভাবে নিজেকে শেষ করিস না। ভালোবাসা হারালে জীবন শেষ হয় না। আমরা সবাই আছি তোর পাশে।”
কিন্তু পিয়াস যেন কিছুই শুনছে না। সে মাথা নাড়াতে নাড়াতে চিৎকার করে বলল,
“না! তোমরা বুঝবে না। সামু ছাড়া আমি কিছুই না। আমার প্রতিটা নিঃশ্বাস, প্রতিটা রাত-দিন শুধু ওর জন্য ছিল। ও এখন অন‍্যের! আমি বাঁচব কিভাবে?”
ফারিয়া আর ফারিন দৌড়ে এসে ভাইয়ের দুই হাত ধরে কাঁদতে লাগল।
ফারিয়া কান্নামিশ্রিত গলায় বলল,

“ভাইয়া, তুমি আমাদেরকেও তো ভালোবাসো। আমাদের জন্য হলেও তুমি ভেঙে পড়ো না।”
ফারিন কাঁদতে-কাঁদতে বলল,
“ভাইয়া, প্লিজ! আমি তোমার কষ্ট সহ্য করতে পারছি না। তুমি প্লিজ, এমন করো না।”
সাখাওয়াত সাহেব এবার এগিয়ে এসে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“পিয়াস বাবা! মানুষ যা চায় সবসময় তা পায় না। আল্লাহ যেভাবে লিখে দেন, আমাদের তা-ই মেনে নিতে হয়। এভাবে ভেঙে পড়লে তুমি শুধু নিজেকেই নয়, তোমার পরিবারটাকেও শেষ করে দেবে।”
কিন্তু পিয়াস আবার হঠাৎ ছটফট করতে শুরু করল। সে বুক চাপড়াতে চাপড়াতে বলে উঠল,
“এখানে জ্বলছে। আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে। আমি সহ্য করতে পারছি না আম্মু। আমাকে ছেড়ে দাও। আমাকে মরতে দাও।”
সুমি বেগম শক্ত করে ছেলেকে আঁকড়ে ধরলেন,
“না বাবা! আমি তোকে ছাড়ব না। তুই এসব বলিস না, বাবা।”
ড্রয়িংরুম জুড়ে সকলে আজ ভেঙে পড়েছে। পিয়াসকে সান্ত্বনা দেবার মতো কারো মুখে ভাষা নেই। এমন শক্ত ছেলেটা এভাবে ভেঙে পড়বে, কেউ কল্পণাও করতে পারেনি। হঠাৎ সকলের মধ্যে রুমের এককোণে দাঁড়িয়ে থাকা ইফতিয়ার ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। সে সকলের আড়ালে ফোনটা নিয়ে ওপরে চলে গেল।
পিয়াস হঠাৎ রাগে ফেটে পড়ল। বুকের ভেতরের সব যন্ত্রণা যেন এক মুহূর্তে উল্টে গিয়ে বিষ হয়ে উঠল। সে গর্জে উঠল,

“তুই আমাকে ধোঁকা দিলি, সামু। তুই শুধু আমাকে শেষ করলি না, আমার ভালোবাসাকেও খুন করলি। তুই যদি আমার না হস, তবে কারও না হবি।”
এইকথা বলে সে দৌড়ে গিয়ে সামিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ একহাত দিয়ে তার গলা টিপে ধরে একদম দেয়ালের সাথে মিশিয়ে ফেললো তাকে। ঘটনা এতো তাড়াতাড়ি ঘটল যে, সকলে স্তব্ধ হয়ে গেল। রাহিন পিয়াসকে সরানোর চেষ্টা করে চিৎকার করে উঠল,
“সামুকে! ছাড় পিয়াস।”
হাসি বেগম মেয়ের অবস্থা দেখে কেঁদে ফেললো। বাড়ির সকলে ছুটে গিয়ে পিয়াসকে সরানোর চেষ্টা করল। কিন্তু পিয়াসের শরীরের তখন যেন দশগুন শক্তি বেড়ে গেছে। সে উন্মাদের মতো বলল,
“না! আমি ছাড়ব না। সামু আমার। ও শুধু আমার।”
আইয়ুবরা সকলে মিলে জোরে ধাক্কা দিয়ে পিয়াসকে সামিয়ার থেকে আলাদা করল। রাহিন ভয়ে কাঁপতে থাকা সামিয়াকে আঁকড়ে ধরে পেছনে সরিয়ে নিল।
পিয়াস তখনো উন্মাদ চেহারায় হাঁপাচ্ছিল, চোখ থেকে জল ঝরছিল, মুখে শুধু একটা কথাই শব্দ,
“আমি তোকে অন‍্যকারো হতে দিব না।”
সুমি বেগম এসে ছেলেকে ধরে ঝাঁকিয়ে বলল,
“পাগল হয়ে গেছিস তুই? কি করছিস এসব? তুই কি সামিয়াকে মেরে ফেলতে চাইছিস?”
হুঁশে ফেললো পিয়াস। সে কাঁপা কন্ঠে বলল,

“মারব কেন, আম্মু? আমি তো ওকে ভালোবাসি। আমার বউ করব ওকে। আমার লাল টুকটুকে বউ হবে আমার, সামু।”
সে ধীরে পায়ে হেঁটে আবারও সামিয়ার সামনে গেল। রাহিন বুকের মধ্যে আগলে নিল সামিয়াকে। সামিয়া ভয়ে গুটিয়ে গেল।
পিয়াস হঠাৎ কেঁপে ওঠা গলায় বলল,
“সামু! তুই কি সত্যিই আমার জন্য এক ফোঁটা জায়গাও রাখিস নি হৃদয়ে? আমি কি শুধু বোকার মতো একাই স্বপ্ন দেখতাম? প্রতিদিন রাতে তোর নাম ধরে, সকালে তোর ছবি দেখে যে আমি ঘুম ভাঙাতাম, যে আমি আমার আল্লাহকে সিজদায় পড়ে বলতাম, হে আল্লাহ, সামুটা যেন শুধু আমার হয়— সবকিছু কি মিথ্যে হয়ে গেল?”
সে বুকের ভেতর হাত চেপে ধরে নিঃশ্বাস নিতে নিতে বলল,

“বলনা সামু! আমি তোকে ছাড়া বাঁচতে পারব না সামু। তুই হয়তো এখন থেকে হাসবি, কিন্তু আমার সত্যিই বাঁচার কোনো মানে নাই তোকে ছাড়া। আমি তোকে ভালোবেসেছি নিজের থেকেও বেশি। তোকে ছাড়া আমার পৃথিবীর আলোও অন্ধকার মনে হয়। তুই যদি আমাকে না চাইতি, অন্তত একবার বলতি— পিয়াস ভাই, আমাকে ভালোবেসো না। আমি মরে যেতাম তোর চোখের সামনেই, কিন্তু এভাবে তুই অন‍্যের হাত ধরে বিয়ে করে আসবি— এটা আমি কোনোদিন ভাবতে পারিনি।”
চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রু মুছতে না পেরে সে ভাঙা কণ্ঠে আবার বলল,
“সামু, আমি তোর কাছে কিছু চাই না। শুধু চাই একবার তুই বলবি— তুই আমারে একটুখানি হলেও ভালোবাসতি। আমি তোর সেই মিথ্যে কথাতেই সারা জীবন বেঁচে থাকব।”
সামিয়া চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। পিয়াসের চোখে জমে থাকা হাহাকার তাকে ভেতর থেকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে। সামিয়া কেঁপে ওঠা ঠোঁটে বলল,
“পিয়াস ভাইয়া, আমি কখনো আপনাকে কষ্ট দিতে চাইনি। কিন্তু আমার হৃদয়, আমার হৃদয়টা অন্য কারো জন্যই ছিল। আমি আপনাকে ভালোবাসতে পারিনি।”
পিয়াস ঠোঁটে হাসি টেনে মাথা নেড়ে বলল,
“মানে তুই কোনোদিনই আমার ছিলি না, তাই না সামু?”
সামিয়া চোখ মুছতে মুছতে বলল,

“না, পিয়াস ভাইয়া। আমি রাহিন ভাইকে ভালোবাসি। আর আজকে আমি তার স্ত্রী হয়েছি।”
এই কথাটা শুনে পিয়াসের বুক যেন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ, তারপর চোখ তুলে ছাদের দিকে তাকাল। হঠাৎ সে সামিয়ার দিকে এগোতে গেল। রাহিন বাঁধা দিল তাকে।
সুমু হঠাৎ পিয়াসের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখে অশ্রু থাকলেও কণ্ঠে ছিল তীব্র কঠোরতা,
“পাগল হয়ে গেছ তুমি? কি করছো এসব? সামিয়া তোমাকে কোনদিনও ভালোবাসেনি, এটা কি বুঝতে পারছো না? আজ যদি বিয়েটা হতো, তাহলে তোমরা কোনদিনও সুখী হতে না।”
পিয়াস দাঁত কিড়মিড় করে গর্জে উঠল,
“চুপ! তুই আর তোর স্বামী এসব করেছিস। আর এখন বড় বড় ডায়লগ দিচ্ছিস? সর, এখান থেকে।”
কথা শেষ হবার আগেই সে উন্মাদের মতো হাত বাড়িয়ে সুমুকে ধাক্কা দিল। সুমু পড়ে যেতে গেলেই শেরাজ বিদ্যুতের মতো এগিয়ে এসে তাকে শক্ত করে ধরে ফেলল। সুমু শেরাজের বুকে ঠেসে রইল, আর চারদিক থেকে মহিলারা চিৎকার করে উঠল। রুমা বেগম চিৎকার করে বলল,
“পিয়াস! তুই কি করছিস এসব? সুমু যে গর্ভবতী, এইটা তুই ভুলে গেলি?”
আরিয়ান আর রায়য়ান একই সাথে তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়াল। তাদের চোখে ঝলসে উঠল রাগ আর আতঙ্ক। রায়য়ানের চোখ দুটো কুঁচকে উঠল। সে টেবিলে জোরে আঘাত করল। আরিয়ান চোয়াল শক্ত করে সামনের দিকে তাকাল,

“এবার সীমা ছাড়াচ্ছে।”
শেরাজ সুমুকে আঁকড়ে ধরে ধীরে ধীরে পাশে সরাল, তারপর রক্তবর্ণ চোখে পিয়াসের দিকে তাকাল। তার মুখে নীরব বজ্রপাতের মতো ভয়ংকরতা নেমে এল।
সে এক ধাপ এগোতেই সুমু শেরাজের হাত আঁকড়ে ধরল,
“দয়া করুন খান সাহেব, আর কিছু করবেন না। ভাইয়ার এখন মাথা ঠিক নেই। ওনাকে মাফ করে দিন।”
শেরাজ থমকে দাঁড়াল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল সুমুর দিকে। তার চোখ যেন রক্তে রঞ্জিত। সেখানে কঠিনতা আর নির্মমতা ফুটে উঠেছে।
সুমুর বুক কেঁপে উঠল। সে জানে এই দৃষ্টি কেবলমাত্র একবার দেখেছিল— সেই তিন বছর আগে, ওই পাতালের গভীরে, অন্ধকারের রাজ্যে। যেখানে শেরাজের চোখে সে প্রথম এই ভয়ঙ্কর অগ্নি-ঝড় দেখেছিল।
শেরাজের দৃষ্টি যেন মুহূর্তে পুরো ড্রয়িংরুম জমাট করে দিল। নিস্তব্ধতা নেমে এলো, কেবল শ্বাস নেওয়ার শব্দ হচ্ছিল।
“খান সাহেব, দয়া করুন। আমি অনুরোধ করছি।”
শেরাজ চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য। আবার চোখ খুলতেই দৃষ্টির তীব্রতা সামান্য হলেও নরম হলো। কিন্তু তার ভেতরের আগুন যে পুরোপুরি নেভেনি, তা স্পষ্ট বোঝা গেল।
শেরাজ হঠাৎ গর্জে উঠে বলল,

“আমার বউকে ধাক্কা দিয়েছে ও, আমার। মিসেস শেরাজ খান আর আমার বাচ্চাদের দিকে হাত বাড়িয়েছে ও। আর তুমি আমাকে ছেড়ে দিতে বলছো?”
শেরাজের বুক ওঠানামা করছে রাগে। সে আঙুল দিয়ে পিয়াসের দিকে ইশারা করল,
“আজ আমার মম এখানে থাকলে বলত—ওর কলিজা বের করে এনে তোমার পায়ের সামনে রাখতে।”
শব্দগুলো ড্রয়িংরুমে প্রতিধ্বনিত হলো। উপস্থিত সকলে শিউরে উঠল। সুমি বেগম কেঁদে উঠলেন, ফারিন আঁতকে ফারিয়াকে শক্ত করে ধরল। আরিয়ান ঠোঁটে ঠাণ্ডা হাসি ফুটিয়ে রায়য়ানকে কনুই দিয়ে খোঁচা দিল,
“দেখলি? এটাই শেরাজ খান।”
সুমু শেরাজের হাত শক্ত করে ধরল , যেন একমাত্র সেই তাকে এই মুহূর্তে আগুন থেকে টেনে আনতে পারে।
“খান সাহেব! দয়া করে শান্ত হোন।”
শেরাজ এক মুহূর্ত থেমে তার দিকে তাকাল। তার ভেতর তীব্র ঝড়, কিন্তু সুমুর হাতের কোমল স্পর্শে সেই ঝড় ধীরে ধীরে নিভে আসতে লাগল।
সে ইশিতা আর নাতাশার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“সুমুকে নিয়ে বসাও।”
ওরা তড়িঘড়ি সুমুকে ধরে সোফায় বসাল। সুমুর মুখ ফ্যাকাশে, চোখে ভয় জমে আছে।
শেরাজ ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে পিয়াসের সামনে দাঁড়াল। দুজনের চোখাচোখি হলো। শেরাজ দাঁতে-দাঁত চেপে গর্জে উঠে বলল,

“জাস্ট বউ বলেছে বলে, বেঁচে গেলি। নয়তো তোকে কেঁটে টুকরো টুকরো করে তোর শরীরের মাংস দিয়ে মালা বানিয়ে, সেই মালা তোর হাড়ের সঙ্গে বেঁধে দিতাম।”
ঘরে উপস্থিত সকলে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। পিয়াস চোখ বড় বড় করে শেরাজের দিকে তাকিয়ে রইল।
সুমি বেগম বললেন,
“আমার সামনে দাঁড়িয়ে, আমার ছেলেকে তুমি হুমকি দিচ্ছো?”
শেরাজ চোখ ঘুরিয়ে তার দিকে তাকাল, কিন্তু উত্তর দিল না। কেবল পিয়াসের দিকে ঝুঁকে হালকা স্বরে বলল,
“আমার বন্ধুর বউয়ের দিকে চোখ তুলে তাকানোর চেষ্টা করলে, পরিণতি কল্পনারও বাইরে হবে।”
শব্দগুলো শীতল ছুরির মতো কেটে গেল। পিয়াস বাঁকা হেসে বলল,
“হুমকি দিচ্ছো? তাও এই পিয়াস সিকদারকে? সিরিয়াসলি? এই তুমি আমাকে চিনো না। আমার কলিজাটাকে আমার থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছ তোমরা। আমি এখনো চুপ করে আছি মানে এই না যে, আমি কিছুই করব না। আমার একটা ইশারাতে তোমার কবর এখানে খোঁড়া হয়ে যাবে।”
পিয়াসের কথাশুনে যেন শেরাজ বহুত মজা পেল। সে হঠাৎ হেসে উঠল। পিয়াস ভ্রু কুঁচকে বলল,
“তোমার হাসি কারণ বুঝলাম না।”
শেরাজ হাসি থামিয়ে তীব্র কন্ঠে বলল,

“আমাকে বুঝতে চেষ্টা করো না, কারণ আমাকে বোঝার মতো এখনো কেউ জন্য তৈরি হইনি। আমি যেভাবে চলি, সেটা আমার নিয়মে। আমার নীরবতাকে দুর্বলতা ভেবে ভুল করো না, কারণ সময় এলে ঝড়ের মতো বোঝাতে জানি আমি কে। আমি কারো পেছনে ছুটি না, মানুষ নিজে থেকেই আমার সামনে দাঁড়াতে ভয় পায়। আমি হিরো নই, আমি ভিলেন। আমার রাগ, আমার নীরবতা, আমার কথাগুলো—সবকিছুর দাম আছে। আমি সহজে কাউকে পাত্তা দিই না, আবার কাউকে ভয়ও করি না। আমি যখন রাগি, তখন সবাই দূরে সরে যায়। আর যখন চুপ থাকি, তখনও সবাই ভাবে—আমি কিছু একটা করতে যাচ্ছি। মনে রেখো, আমি শেরাজ খান! আমাকে ভালোবাসা যায়, কিন্তু অবহেলা করা যায় না। আমার দিকে তাকিয়ে থাকতে সাহস লাগে, আর আমার দিকে চোখ তুলে কথা বলতে বুক লাগে। আমি কারও কাছে নরম হই না। তবে যাকে ভালোবাসি, তার জন্য আমার ভেতরের আগুনকেও ছাই বানিয়ে দিতে পারি। ভুলেও ভেবো না, আমাকে হারানো সহজ—কারণ আমি হারতে শিখিনি, আর ভাঙতেও জানি না।”
সুমু এসব অশান্ত হয়ে উঠল। নাতাশা সুমুকে সামলানোর চেষ্টা করে বলল,
“ভয় পাবেন না, ম‍্যাম। স‍্যারের কিছু হবেনা। কেউ স‍্যারের কোন ক্ষতি করতে পারবে না।”
সুমু নিচু গলায় বলল,

“ভয় আমি তোমার স‍্যারের জন‍্য না, পিয়াস ভাইয়ার জন‍্য পাচ্ছি।”
হঠাৎ মুস্তাক সাহেব গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“আমি তোমাদের কাউকে ছেড়ে দিব না। আমার ছেলের জীবন নিয়ে খেলা করার প্রতিশোধ আমরা নিয়েই ছাড়ব।”
তার চোখ আগুনে ঝলসে উঠেছে। সারা রুমে উপস্থিত সবাইকে সে এক মুহূর্তে নিশ্চুপ করে দিল।
তারপর সে সুমি বেগমের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল,
“অনেক নাটক হয়েছে। মান-সম্মান অনেক গেছে। এবার ছেলেকে নিয়ে বাড়িতে চলো। আর একটা কথা কান খুলে শুনে রাখো—আজকের পর তুমি তোমার বাবার বাড়ির কারো সঙ্গে কোনো রকমের সম্পর্ক রাখতে পারবে না। যদি রাখো, তাহলে এই বয়সে এসে তোমাকে আমি তালাক দিব।”
সুমি বেগম অল্পস্বরে মাথা নেড়ে মান্যতা জানালেন। সাখাওয়াত সাহেবরা এমন কথাশুনে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। ড্রয়িংরুমে একটা থমথমে নীরবতা নেমে এলো। কেউ সাহস করে মুখ খোলার চেষ্টা করতে পারছে না।
মুস্তাক সাহেব ফারিয়ার সামনে এসে কড়া কণ্ঠে বললেন,

“তুমি তো এখন এই বাড়ির বউ। তবে আমি তোমাকেও বলছি, আমাদের সঙ্গে ফিরে চলো। শাহরুখের সঙ্গে তোমার ডিভোর্স করিয়ে আমি তোমাকে অন্য কোথাও, ভালো ঘরের ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেব।”
ফারিয়ার মাথায় যেন বাজ পড়ল। সে মুহূর্তে থমকে গেল। সে শাহরুখের হাত শক্ত করে ধরে বলল,
“আমি মানছি, তোমাদের কষ্ট হচ্ছে। কষ্ট আমারও হচ্ছে আব্বু। কিন্তু তাই বলে, আমি আমার ভালোবাসা ছাড়তে পারব না। আজ যেমন পিয়াস ভাইয়ার কষ্ট হচ্ছে। ঠিক তেমনই, হয়তো সামিয়া আর রাহিন ভাইয়ারও কষ্ট হয়েছে। আমি সামুর জায়গায় নিজেকে ভেবে দেখেছি, আব্বু। সামু কোনো অন‍্যায় করেনি।”
ফারিয়ার কথাগুলো পুরো রুমে প্রতিধ্বনিত হলো। শাহরুখ ফারিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। মুস্তাক সাহেব কিছুক্ষণ চুপচাপ কপাল কুঁচকে দাঁড়িয়ে রইলেন।
তিনি একটু সময় নিয়ে বললেন,
“তাহলে, তুমি যাবে না?”
ফারিয়া সরাসরি দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“না!”
মুস্তাক সাহেব এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে নিজের গম্ভীরতা ধরে রাখলেন। তারপর তার কণ্ঠ আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল,
“তাহলে তুমিও শুনে রাখো, আজকের পর আমার একটাই মেয়ে, আর সে হলো ফারিন। আজকের পর তুমি আমাদের কাছে মৃত।”
ফারিয়ার চোখে অটল দৃঢ়তা, কিন্তু শরীর কেঁপে উঠল। সে জানে এই হুমকি শুধু শব্দ নয়—মুস্তাক সাহেবের কথা মানে সত্যিই ভয়ঙ্কর।
শাহরুখ ফারিয়ার হাত আরও শক্ত করে ধরে বলল,

“ভয় পাবি না, ফারু। আমি আছি তোর সাথে।”
ফারিয়া হালকা মাথা নেড়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু তার চোখে এক গভীর অদম্য অঙ্গীকার—যেন তার লাইফে যেমনই হুমকি আসুক, সে তার ভালোবাসা ছাড়বে না।
মুস্তাক সাহেবেও নিজের সিদ্ধান্তে অটল। সে পিয়াসের সামনে গিয়ে বলল,
“এখান থেকে চলো।”
“কিন্তু আব্বু…”
“পিয়াস! তুমি যদি আর একটা কথাও বলো, তাহলে আমার মরা মুখ দেখবে।”
পিয়াস থেমে গেল। মুস্তাক সিকদার শক্ত হাতে ছেলেকে ধরে বাইরে বের করলেন।
ড্রয়িংরুমে উপস্থিত সবাই নিস্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। ফারিয়ার চোখে অশ্রু। সে জানে, সে তার ভালোবাসার জন্য লড়েছে।
হঠাৎ সাখাওয়াত সাহেব দৃঢ় গলায় বললেন,
“তোমাদের জন্য আজ আমার বোনের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হলো।”
শামীম সাহেব সামিয়া আর রাহিনের উদ্দেশ্যে বললেন,

“তোমাদের এই বাড়িতে আর এক মুহূর্তের জন্যও দেখতে চাইনা।”
সামিয়া তার বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।
শেরাজ বাঁকা হাসি দিয়ে বলল,
“আমার বন্ধু আর বন্ধুর বউয়ের যে বাসায় জায়গা নেই, সে বাসায় আমাদের থেকেও কোনো লাভ নেই।”
শামীম সাহেব কপাল কুঁচকে বললেন,
“তোমাদের তো বারণ করিনি থাকতে।”
শেরাজ ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলল,
“মাফ করবেন, শশুরআব্বু। বন্ধুগুলো আমার কলিজার টুকরো। তাই এদের মধ্যে একজন যেখানে নেই, সেখানে আমিও নেই।”
এরপর শেরাজ স‍্যান্ডিকে ডেকে বলল,
“এক ঘন্টার মধ্যে একটা বাড়ি দেখো। আমাদের থাকার ব্যবস্থা করো।”
স‍্যান্ডি শেরাজকে সম্মতি দিয়ে মাথা নাড়ল, সঙ্গে সঙ্গেই ফোন কানে তুলে কোথাও কল লাগালো। শেরাজ একবার সুমুর দিকে তাকালো। সুমু চোখে ভরসা নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
আনোয়ার সাহেব উঠে এসে ছেলের পাশে দাঁড়িয়ে বললেন,
“চল বাবা, নতুন বউ নিয়ে বাড়িতে ফিরি।। সকলে আমাদের সাথেই চলো।”
রাহিন স্থিরভাবে বাঁধা দিল,

“না বাবা! আমি আমাদের ব্যবস্থা নিজেই করে নিব। যেদিন সকলে আমাদের মেনে নিবে, সেদিনই আমার বউ তার শশুর বাড়িতে যাবে।”
আনোয়ার সাহেব নীচু গলায় বললেন,
“তুই যেটা করছিস, ঠিক করছিস বাবা। সংসার মানে শুধু চার দেওয়াল না। সংসার মানে একটা পরিবার, ভালোবাসা, ভরসা আর সম্মান।”
রাহিন বাবার কথায় ভরসা পেয়ে সামিয়ার হাত শক্ত করে ধরে বলল,
“আমি তোকে ছাড়ব না, সামু। সবাই ছেড়ে দিলেও আমি আমার ভালোবাসাকে ছাড়ব না। একদিন সকলে বুঝবে।”
সামিয়ার চোখ ভিজে উঠল। সে আস্তে করে বলল,
“আজকের রাতটা খুব ভারী লাগছে, রাহিন ভাই। জানি না কী হবে।”
রাহিন শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিল,
“যতক্ষণ আমি আছি, ততক্ষণ তোর ভয় পাওয়ার কিছু নেই।”
এদিকে শেরাজ সুমুর কাছে গিয়ে বলল,
“ভয় পেয়ো না, সুইটহার্ট। আমি আছি, আমি থাকতে কেউ তোমাকে একচুলও আঘাত করতে পারবে না।”
সুমু কেঁপে উঠে বলল,

“কিন্তু সবাই তো এখন আমাদের বিপক্ষে, খান সাহেব।”
শেরাজ আলতো হেসে বলল,
“যারা আমাদের বিপক্ষে দাঁড়াবে, আমি তাদের শেখাব কীভাবে শেরাজ খানের সামনে দাঁড়াতে হয়।”
কথাগুলো শুনে সুমুর বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল। ঠিক তখনই স‍্যান্ডি ফিরে এসে বলল,
“স্যার, বাড়ির ব্যবস্থা হয়ে গেছে। দারুন একটা রাজকীয় বাড়ি। আপনার জন‍্য পারফেক্ট। তবে, দামটা অনেক বেশি চাইছে।”
শেরাজ মাথা নেড়ে বলল,
“যা চাইছে তাই দিয়ে দাও। আর বাড়িতে আমার বউয়ের নামে করার ব‍্যবস্থা করো।”
স‍্যান্ডি সম্মতি নাড়িয়ে চলে গেল। শেরাজরাও সকলে বেরিয়ে গেল। দরজার কপাট ধীরে ধীরে বন্ধ হওয়ার শব্দে পুরো ড্রয়িংরুমটা আরও ভারী হয়ে উঠল।
হাসি বেগম হঠাৎ উঠে এসে স্বামী শামীম সাহেবের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন,
“ওদের আটকান। ওরা চলে যাচ্ছে।”
পাশ থেকে রুমা বেগমও এগিয়ে এসে সাখাওয়াত সাহেবের হাত আঁকড়ে ধরলেন,
“আপনি কিছু বলবেন না?”

কিন্তু সাখাওয়াত সাহেব গম্ভীর মুখে কোনো উত্তর দিলেন না। শুধু একবার তাকিয়ে ধীরপায়ে নিজের রুমের দিকে চলে গেলেন। শামীম সাহেবও দীর্ঘশ্বাস ফেলে পিছু নিলেন।
রুমা বেগম হতাশ চোখে নাজমিন আর আইয়ুবদের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
“তোমরা যেওনা। নাজমিন, তুই যাস না মা।”
নাজমিন কিছু বলতে পারছিল না। তার চোখে জল জমে উঠেছে।
ঠিক তখনই আইয়ুব এক পা এগিয়ে এসে নরম অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“তোমার ইচ্ছা হলে থাকো, নাজমিন। আমি যাচ্ছি। আমি আমার বন্ধুদের ছেড়ে থাকতে পারব না।”
নাজমিন এক মুহূর্তের জন্য আইয়ুবের দিকে তাকাল, তারপর রুমা বেগমের হাত থেকে আস্তে করে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে আইয়ুবের পাশে গিয়ে দাঁড়াল,
“আমি খুব তাড়াতাড়ি তোমাদের কাছে ফিরে আসব আম্মু। আপাতত আমি যাচ্ছি। কিছুদিন সময় দাও। তোমার জামাইকে নিয়ে, আর আমার বোনকে নিয়ে আমি ফিরে আসব।”
রুমা বেগম একদৃষ্টে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে,
“তুই কি আম্মুকে এভাবে ছেড়ে যেতে পারবি, নাজমিন?”
নাজমিন কান্না চেপে আলতো গলায় বলল,

“মেয়েকে তো বিয়ে দিয়ে দিয়েছ, আম্মু। আজ বাদে কাল তো আমাকে শশুর বাড়িতে পাঠাতেই হতো, আম্মু। এখন থেকেই অভ‍্যাস করো। আর, আমি কাউকে ছাড়ছি না আম্মু। আমি কেবল আমার স্বামী আর আমার বোনের পাশে দাঁড়াচ্ছি। তুমি যদি আমাকে ভালোবাসো, তাহলে আমাকে বুঝবে।”
আইয়ুব নাজমিনের কাঁধে হাত রাখল,
“চল, নাজমিন। ওরা অপেক্ষা করছে।”
রুমা বেগম ছুটে গিয়ে আবার নাজমিনের হাত ধরলেন।
“দোয়া করি তোদের জন‍্য। সাবধানে যাস।”
নাজমিন এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। বুকভরা কান্না বেরিয়ে এলো, তবুও আইয়ুবের হাত ছেড়ে দিল না। সে মায়ের দিকে তাকিয়ে কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“আম্মু, আমিও প্রতিদিন তোমাদের জন্য দোয়া করব।”
দরজার বাইরে গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ ভেসে এলো। শেরাজরা ইতিমধ্যেই সবার অপেক্ষায় বসে আছে।
আইয়ুব নাজমিনকে নিয়ে এগিয়ে গেল দরজার দিকে। তাদের সাথে আজ আরিয়ান, রায়য়ান, আলিশা আর রোজাও বেরিয়ে গেল। নাজমিন একবার পেছন ফিরে তাকাল। মায়ের ভিজে চোখ, ভাঙা বুক আর হাহাকার করা নিঃশ্বাস যেন তাকে শ্বাসরোধ করে ধরেছে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে মাথা নিচু করে ধীরে ধীরে দরজা পেরিয়ে বেরিয়ে গেল।
দরজার কপাট আবার বন্ধ হলো। ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা আর বাইরে গাড়ির শব্দ ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে গেল।

পিয়াস বাড়ি এসেই নিজের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। সে রুমে সমস্ত জিনিসপত্র ভাঙচুর করল। সুমি বেগম দরজা ধাক্কাতে শুরু করল।
পিয়াসের রুমের ভেতর থেকে কাঁচ ভাঙার শব্দ, টেবিল উল্টে ফেলার শব্দ, আর বুক ফাটানো আর্তনাদ একসাথে বেরিয়ে আসছিল। ঘরের ভেতর যেন ঝড় বইছে।
সে বুক চাপড়াতে চাপড়াতে চিৎকার করছিল,
“কেন সামিয়া! কেনো করলি এমন? আমার সমস্ত স্বপ্ন, সমস্ত ভালোবাসা তুই শেষ করে দিলি।”
হাতের সামনে যা পাচ্ছে তাই ছুড়ে মারছে। আলমারি থেকে জামা টেনে এনে ছিঁড়ে ফেলছে। বিছানার গদি ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে মেঝেতে।
সুমি বেগম কাঁপা কণ্ঠে দরজায় ধাক্কাতে ধাক্কাতে বললেন,
“দরজা খোল বাবা, দরজা খোল।”
ফারিন কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“ভাইয়াকে থামাও, আম্মু। নয়তো ভাইয়া নিজেকে মেরে ফেলবে।”
মুস্তাক সিকদার চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। মুখে কঠোরতা, অথচ বুকের ভেতরটা কাঁপছে। তিনি ভারী গলায় বললেন,

“ওকে আটকিও না। আজ ওর ভেতরে যত ঝড়, যত আগুন আছে—সবকিছু বেরিয়ে আসুক। যতক্ষণ না ভেতরের আগুন নিভবে, ও শান্ত হবে না।”
ঠিক তখনই ভেতর থেকে ভাঙা আয়নার শব্দ এলো। আর তারপর পিয়াসের তীব্র চিৎকার,
“আমি কিছুতেই মেনে নেব না। সামিয়া শুধু আমারই ছিল। আমি ছাড়া ও আর কারো হতে পারবে না।”
সুমি বেগম হাত কানে দিয়ে কেঁদে উঠলেন। ফারিনও হুহু করে কাঁদছে। আর মুস্তাক সিকদার দাঁতে দাঁত চেপে শুধু ছাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন, যেন ভেতরের অশান্তি দমন করার চেষ্টা করছেন।
ঘরের ভেতর পিয়াস এক কোণে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল। তার দু’হাত রক্তাক্ত, শ্বাস অস্থির। বুকের ভেতরের আগুনে সে নিজেকে গলিয়ে দিচ্ছে। তার সামনে সামিয়ার সমস্ত ছবি। সে সামিয়ার একটা ছবি হাতে তুলে বলল,
“তোকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না, সামিয়া। তুই বুঝলি না আমাকে। তোকে ছাড়া আমার জীবনটা অন্ধকার। আমি তোকে ছাড়তে পারব না, কখনোই না।”
সে ছবিটার উপর নিজের রক্তাক্ত হাত বুলিয়ে দিল। তারপর হঠাৎ করে বুকের কাছে চেপে ধরে আবার আর্তনাদ করে উঠল,

“তুই আমার ছিলি, তুই আমারই থাকবি। তোকে অন‍্য কেউ বিয়ে করেছে, তাতে কি হয়েছে। তোকে অন‍্য কেউ ছুঁয়ে দেখলেও আমার কিছু যায় আসে না। কারণ, আমার স্পর্শ ছাড়া তুই সর্বদা কুমারী থাকবি।”
পিয়াস সামিয়ার ছবির দিকে তাকিয়ে বলল,
“শুনেছি গান গাইলে নাকি মানুষের মনের কষ্ট হালকা হয়, তবে আমিও একটু চেষ্টা করি, সামু।”
পিয়াস সামিয়ার ছবিটা বুকের সাথে চেপে ধরে গান ধরল,
“সুন রাহা হে না তু
রো রাহা হু মে
সুন রাহা হে না তু
কিউ রো রাহা হু মে!”
সে কেঁদে উঠল। উঠে দাঁড়িয়ে আবারও ভাঙচুর শুরু করল। রুমের ভেতর আবারও কাচ ভাঙার শব্দ হলো। পিয়াস আঘাত করতে করতে ক্লান্ত হয়ে বিছানায় ঢলে পড়ল। ছেঁড়া জামার মাঝে বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। চোখ বন্ধ করল, আবার হঠাৎ খুলে সামিয়ার ছবির দিকে তাকাল।
বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সুমি বেগম বুক চেপে বসে পড়লেন মেঝেতে। চোখে পানি থামছে না।
ফারিন কাঁপা কণ্ঠে বলল,

“আব্বু, ভাইয়া যদি কিছু করে ফেলে?”
মুস্তাক সিকদার এবার চোখ মেলে মেয়ের দিকে তাকালেন,
“তোমার ভাইয়ের ভেতরে যে ঝড় বইছে, তা এখন ওকেই সামলাতে হবে। আমরা আটকালে ও আরও ভেঙে পড়বে।”
ঠিক তখন ভেতর থেকে এক অদ্ভুত নীরবতা নামল। আর কোনো শব্দ এলো না ভেতর থেকে।

বাড়িটা দুই তলা বিশিষ্ট, রাজকীয় শৈলীতে নির্মিত। প্রবেশদ্বারের দিকে বড় সিঁড়ি, চারপাশে মার্বেল ফ্লোর, গোল্ডেন কারুকার্যময় হ্যান্ডেলযুক্ত রেলিং। মূল হলের উচ্চ ছাদ, মাঝখানে ঝুলন্ত বিশাল স্ফটিক লাষ্টিংয়ের চিত্রমালা। দেয়ালে ভেসে আছে আধুনিক আর ঐতিহ্যবাহী মিলিয়ে করা চিত্রকর্ম।
ড্রয়িংরুম বিশাল, মেঝে থেকে ছাদের উচ্চতা প্রায় বারো ফিট। সাদা এবং ক্রিম রঙের দেয়াল, মাঝখানে বড় গোল্ডেন ফ্রেমের আয়না, চারপাশে সুগঠিত সোফার সেট। লাল মখমল কার্পেট মেঝে ঢেকে রেখেছে, আর কোণে স্থাপিত ল্যাম্পপোস্টগুলো হালকা সোনালি আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে।
কিচেনের দিকে একদম মার্বেল এবং গ্রানাইটের মিশ্রণে ফ্লোর, আধুনিক ফিটিংস। প্রতিটি রুমে বড়-বড় জানালা, বাইরে বাগানের দৃশ্য সুন্দরভাবে দেখা যাচ্ছে। বাগানটি ল্যান্ডস্কেপিং করে সাজানো—গোলাকার লনে রঙিন ফুল, ঝরনা, আর মাঝখানে ছোট পাথরের ফোয়ারা।
রুমগুলোতে চওড়া বিছানা, ফ্রেমযুক্ত চিত্রকর্ম, কনসোল টেবিল এবং মডার্ন লাইটিং। দেয়ালে সোনালি ও ক্রিমের কারুকার্য, আসবাবগুলো কাঠের মার্বেল মিশ্রণে তৈরি।
বাড়ির পুরো পরিবেশই শান্তি, রাজকীয়তা আর অভিজাততার মিশ্রণ। কিন্তু সেই শান্তির মধ্যে এখন ঝড়ের মতো পরিস্থিতি। শেরাজরা সকলে বাড়ির ভেতর ঢুকল। রায়য়ানরা তাদের সাথে আসেনি। তার আজ একটা হোটেলে উঠেছে। আজ সকলে ক্লান্ত। সুমু নাজমিন, সামিয়া আর ইনায়ার উদ্দেশ্যে বলল—
আজ তোমরা তিনজন আলাদা রুমে থাকবে।
আইয়ুব হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে বলল,

“আমার বাসর…”
সে পুরো কথা শেষ করার আগেই নাজমিন কনুই দিয়ে আইয়ুবকে ধাক্কা মারল। নাজমিনের ধাক্কার মানে বুঝে আইয়ুব চুপ করে গেল।
কিন্তু রাহিন হঠাৎ করে বলল,
“অনেক যুদ্ধ করে বউকে পেয়েছি। আমি আমার বউকে ছেড়ে থাকতে পারব না।”
সামিয়া চোখ রাঙিয়ে নীচু গলায় বলল,
“কতোটা নির্লজ্জ আপনি সবাই দেখছে। সবার সামনে বার বার আমার বউ, আমার বউ করছিলেন কেন? আপনি তো আগে এমন ছিলেন না রাহিন ভাই।”
রাহিন আলতো হেসে নীচু গলায় বলল,
“আমি আগেই থেকে নির্লজ্জ। আগে তো আর তুই আমার বউ ছিলিনা, তাই জানতিস না। একটা বাসর ঘরে যেতে দে, র্নিলজ্জতা কাকে বলে দেখাচ্ছি।”
“আমার এখন মনে হচ্ছে, আপনাকে বিয়ে করে আমি ভুল করেছি। অসভ্য আপনি।”
সে গিয়ে নাতাশার পাশে দাঁড়াল।
রাহিন বিড়বিড়িয়ে বলল,
“বিয়ে করেছি একটা দিনও হলো না। কিন্তু বউ আমার রোমান্স করার কথা শুনে এখনই বলছে, তার আমাকে বিয়ে করা ভুল হয়েছে।”
রাহিন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। শেরাজ সকলের উদ্দেশ্যে বলল,

“রাত প্রায় শেষের দিকে। সবাই এখন রুমে গিয়ে রেস্ট নাও।”
স‍্যান্ডি সবাইকে যার যার রুম দেখিয়ে দিল। সকলে একে-একে রুমে চলে গেল।
শেরাজ আর সুমু রুমে ঢুকল। রুমটা প্রশস্ত আর রাজকীয় শোভা, চাদরে সোনালি হালকা কারুকার্য, চারপাশে মার্বেল ফ্লোর আর জানালার বাইরে বাগানের দৃশ্য ঝলমল করছে।
শেরাজ ফোনে স্ক্রল করতে করতে ধীরেসুস্থে বেডে বসল। চোখে একটা চিন্তার ভাঁজ, কিন্তু মুখে শান্তির ছোঁয়া। সুমু বেড সাইড টেবিল থেকে পানি গ্লাস তুলে পানি খেয়ে বলল,
“পানি খাবেন, খান সাহেব?”
সে এক গ্লাস পানি শেরাজের সামনে ধরে দাঁড়াল।
“হুম! যেটা কষ্ট করে পাওয়া যায়।”
শেরাজের কথা শুনে সুমু থতমত খেলো। কাশি উঠে গেল তার। সে তার হাতে থাকা পানি থেকে একটু পানি খেয়ে নিজেকে সামলে নিল,

“ইয়াক ছিঃ! কষ্ট করে তো ঘামের পানি পাওয়া যায়। আপনি কি ঘামের পানি খেতে চাইছেন?”
শেরাজ কটমট দৃষ্টিতে সুমুর দিকে তাকাল। সুমুর হাত থেকে পানি নিয়ে পুরোটা শেষ করে বলল,
“যেটার কথা ভেবে তুমি থতমত খেয়েছ, আমি সেই পানির কথা বলেছি। আনরোমান্টিক বউ একটা। দিল মুডটার চব্বিশটা বাজিয়ে।”
সুমু কিছু বলতে যাবে তার আগেই সুমুর ফোনটা বেজে উঠল। সে বেড থেকে ফোনটা তুলে দেখল রুমা বেগমের নাম্বার। সুমু একপলক ফোনের দিকে তাকিয়ে থেকে কলটা রিসিভ কানে দিয়ে “হ‍্যালো” বলতেই অপরপাশ থেকে রুমা বেগমের কথা শুনে সুমু স্তব্ধ হয়ে গেল।
শেরাজ সুমুকে চুপ করে থাকতে দেখে বলল,

খান সাহেব পর্ব ৬৯ (২)

“কি হয়েছে সুইটহার্ট? হ‍্যাং হয়ে গেলে কেন?”
সুমু তবুও কোনো কথা বলল না। শেরাজ উঠে দাঁড়াতেই সুমু শেরাজের বুকের ওপর পড়ে কেঁদে উঠল। শেরাজ সুমুকে জড়িয়ে ধরে, ফোনটা সুমুর হাত নিয়ে কানে ধরল।

খান সাহেব পর্ব ৭১