অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ৭
শ্রাবণী ইয়াসমিন
আনায়া নীরবে বসে আছে তার নানু আপার পাশে। তার ছোট্ট কাঁপা আঙুলগুলো শক্ত করে চেপে ধরেছে নানুর আঁচল। চোখে পানি নেই, কিন্তু মুখে গলাটিপে ধরা ভয় যা শুধুই অনুভব করা যায়।
ড্রয়িংরুমে সামনে বসে আছে জেভিয়ার।
আজকের জেভিয়ার যেন গতকালের সেই ভয়ংকর লোকটা না!
চোখেমুখে অদ্ভুত প্রশান্তি। পরনে হালকা ক্রিম কালারের শার্ট, একটা মৃদু পারফিউমের ঘ্রাণ চারপাশে।
সে আজ একদম ভদ্র, সংযত, একজন ভালো ছেলে হয়ে এসেছে।
জেভিয়ার আস্তে মাথা নিচু করে বলল,
– আমি জানি আপনি আনায়াকে খুব ভালোবাসেন। এর জন্যই সবার আগে আমি আপনার অনুমতির জন্য এসেছি। বিয়ের মত গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজে আমি মনে করি আপনার অনুমতি সবার আগে প্রয়োজন।”
নানু আপা চশমা ঠিক করে ধীরে ধীরে বললেন,
– তোমাদের সম্পর্কের কথা আগে কিছু শুনিনি তো কবে থেকে চেনো তোমরা একে অপরকে?
জেভিয়ার হালকা হাসল।
তার ভদ্র গলায় যেন এক মায়াজাল গাঁথা,
– অনেকদিন, আনায়া শুরুতে বুঝত না, আমার ভালোবাসাটা একটু বেশিই গভীর ছিল। সময় নিয়েছি ধৈর্য ধরেছি। আমি জানতাম, একদিন ও বুঝবে আমি ওকে কতটা ভালোবাসি আর ওর ব্যাপারে কতটা সিরিয়াস।
আনায়া চুপ। মাথা নিচু করে বসে আছে। নানুর কোল চেপে ধরে আছে যেন এই মানুষটা তাকে একমাত্র রক্ষা করতে পারে জেভিয়ারের হাত থেকে।
কিন্তু জেভিয়ার এমনভাবে কথা বলছে যেন কোনো দোষ নেই তার একদম নিষ্পাপ ভদ্র একটা ছেলে!
তার প্রতিটি শব্দ এত ঠান্ডা, মেপে মেপে বলা, যেন আগেই মুখস্থ করা।
নানু আপা একটু ঘাড় ঘুরিয়ে আনায়ার দিকে তাকালেন।
– তুই কী বলিস মা? তোরা কি দুইজন…?
আনায়ার চোখে জল চলে আসে কিন্তু সে মুখ তোলে না। শুধু মাথা নিচু করে বসে থাকে।
জেভিয়ারের ঠোঁটের কোণে এক অদৃশ্য বিজয়ের হাসি খেলে যায়।
নানু আপা এবার গভীরভাবে জেভিয়ারের দিকে তাকান। তার চোখে কিছুটা সন্দেহ, কিছুটা কৌতূহল।
– তুমি কোথায় থাকো, কী করো, পরিবার?
জেভিয়ার যেন এই প্রশ্নের জন্যই প্রস্তুত ছিলো।
– আমি একাই থাকি। আমার মা বাবা আমি অনেক ছোট থাকতেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। আর আমার নিজের বিজনেস আছে।আমি একটা ফরেইন টিমে কাজ করছি।
তার চোখে একটুও জড়তা নেই। এমন ভদ্র, সংযত, সম্মানী ভঙ্গি যে কেউ হয়তো বলবে, এ ছেলে খুব ভালো ভদ্র ঘরের শান্তশিষ্ট একটা ছেলে।
নানু আপা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার মনে ধরেছে জেভিয়ার কে। কেমন নম্র, ভদ্র একটা ছেলে। ছোট বেলা থেকে মা বাবার ভালোবাসা পায়নি তাই এখন যদি একটু ভালোবাসার পরশ পায় তাহলে তার আনায়া কে এই ছেলে ভালো রাখবে।আর তার আনায়াও অনেক সুখী থাকবে।
আর যেইখানে তার নাতনি এই ছেলে কে নিজে পছন্দ করেছে সেইখানে তিনি আর বাধাঁ দেওয়ার কে?
আনায়া এক কোণে বসে ভিতরে ভিতরে কাঁপছে। কারণ আজ সকালে জেভিয়ার তাকে স্পষ্ট হুমকি দিয়েছে
– এই বিয়েটা যদি তুমি ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা করো, তাহলে জানো তো, লাভ বার্ড? তোমার প্রতিটি ছবি, প্রতিটি ভিডিও, আমার কাছে সেভ করা এক ক্লিকেই পুরো দুনিয়া তোমার এই হট,সে*ক্সি ফিগার দেখতে পাবে। আর তখন তোমার প্রিয় নানু? সে তো তখন এমনিই লজ্জায়, শোকে দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে ওপারে চলে যাবেন। আশা করব তুমি এইসব চাও না লাভ বার্ড তাইনা?
আনায়া তখনই থেমে গিয়েছিল। ভয় তার রক্তের ভেতর ঢুকে গেছে।
তার নিজের ভুলেই সে এখন শিকারে পরিণত। নিজের পায়ে হেঁটে এসেছে এক জানোয়ারের গর্তে।
নানু আপা কিছুক্ষণ পরে ধীরে বলেন,
– যদি আনায়া তোমার সাথে থাকতে চায় আর তুমি প্রতিশ্রুতি দাও, ওকে সম্মান করবে তাহলে আমি না করতে পারি না। যেইখানে তোমরা দুজনেই সম্মত আছো।আর আমিও চাই কেউ আনায়ার দায়িত্ব নেক। কারণ আমিই বা আর কতদিন বাচঁব।
আনায়ার ভেতরে যেন সব কিছু চিৎকার করে উঠতে চাইল। সে চিৎকার করে বলতে চাইলো-
– নানু আপা আমি চাই না ওকে, আমি ওকে বিয়ে করতে চাই না। আমাকে তুমি বাচাঁও। এই নরকের খাচাঁ থেকে আমাকে মুক্তি দাও।
কিন্তু মুখে শব্দ নেই।
জেভিয়ার নিচু হয়ে আদব করে বলেন,
– আপনার আশীর্বাদটাই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড়। এখন আপনার অনুমতি থাকলে আজ সন্ধ্যায় আমরা বিয়েটা সম্পূর্ণ করতে চাচ্ছি।
নানু আপা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন বেশ বিয়ে করতে করবেই একদিন সেইটা আজ করলেই বা ক্ষতি কি। তোমরা সুখী থাকো এই আমার প্রার্থনা। আমার আনায়ার যত্ন নিও ভাই।
জেভিয়ার মাথা নত করে সম্মান জানিয়ে সম্মতি জানায়।
– রবিন আর ওর বউ চলে আসার আগে তোমরা চলে যাও। ওরা এসে তোমাদের দেখলে আনায়ার জন্য সমস্যা হয়ে যাবে। তোমরা বরং সাবধানে চলে যাও। আমার আনায়াকে দেখে রেখো ভাই।
জেভিয়ার বিদায় জানিয়ে আনায়াকে নিয়ে তার গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যায়।
ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় আনায়ার কানে ফিসফিস করে বলে ওঠে,
– দেখলে লাভ বার্ড? আমি যা চাই সেটা আমার হয়ে যায়। প্রস্তুত হও নিজেকে আমার কাছে সপে দেওয়ার জন্য।
আনায়া শুধু ঠান্ডা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। চোখ দিয়ে নেমে পড়ে দুটো নীরব কান্না।
আনায়া কিছু না বলেই চুপচাপ বসে আছে গাড়ির সিটে। চোখের পেছনে ঘূর্ণি চলছিল ভয়, অসহায়তা আর এক অজানা গন্তব্যের আতঙ্ক।
জেভিয়ার স্টিয়ারিং হ্যান্ডেলে হাত রেখে নিঃশব্দে গাড়ি চালাচ্ছে। কোনো শব্দ, কোনো প্রশ্ন কিছুই নয়। শুধু মাঝে মাঝে ওর দিকে তাকিয়ে এক রহস্যময় হাসি খেলে যাচ্ছিল ঠোঁটের কোণে।
ঘণ্টাখানেকের মতো চলার পর আনায়া জানালার বাইরে তাকিয়ে এক অদ্ভুত পরিবর্তন খেয়াল করল।
রাস্তা কেমন সরু হয়ে এসেছে। চারপাশে কুয়াশার মত ঝাপসা গাছগাছালি। পাহাড়ি ঢালু ঘিরে রেখেছে পথ।
দূরে দূরে মাঝে মাঝে কাক ডাকছে অদ্ভুত এক নিস্তব্ধ ভয়।
—এইটা, কোথায় যাচ্ছি আমরা?
আনায়া ধীরে, অনেক সাহস করে জিজ্ঞেস করল।
জেভিয়ারের ঠান্ডা গলা,
– আমার বাড়িতে। এইবার আমাদের একটু গভীর ভালোবাসার প্রয়োজন। পুরোনো জায়গায় আমাদের জন্য যথেষ্ট নিরাপত্তা নেই।
আনায়ার বুকের ভেতর ধ্বক করে উঠল। তবুও পালটা প্রশ্ন করার সাহস পেলো না আর।
পাহাড় ঘেরা এক এলাকায় গাড়ি থামল। চারদিকে নিস্তব্ধতা আর জঙ্গল। বাড়ি বলতে কিছু নেই আশেপাশে।
ডানদিকে মাত্র পনেরো ফুট দূরেই একটা উঁচু খাড়া ঢালু খাই সোজা নীচে অতল গহ্বর। কেউ একবার পড়ে গেলে তার অস্তিত্বও খুঁজে পাওয়া অসম্ভব।
আর সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত কালো রঙের বাড়ি। সম্পূর্ণ ঘরটাই ম্যাট ব্ল্যাক রঙে ঢাকা।
কেবল উপরের ছাদ এবং দেওয়াল রেলিংগুলো সাদা। আনায়া বুঝল না বাড়ির রঙ এমন অদ্ভুত কালো রাখার মানে কি। বাড়ির পেছনের দিকটা ঘন জঙ্গলে ঢাকা এমন গা ছমছমে পরিবেশে আনায়ার বুক ধকধক করতে লাগল।
জেভিয়ার আনায়ার হাত ধরে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল। বাড়িটা ভিতর থেকে অনেক বড়। উঁচু সিলিং, প্রশস্ত হল। দেয়ালগুলো কালো হলেও, কিছু জায়গায় সাদা প্যাটার্ন আঁকা। পায়ের নিচে নরম গ্রে কার্পেট।
ছোট ছোট বাতিগুলো যেন ঝুলে আছে ছাদ থেকে নিচু হয়ে, কিন্তু আলো খুব কম। একরকম রহস্যময় অন্ধকার।
দেয়ালে কিছু রহস্যময় ফ্রেম। কিছু ছবি অস্পষ্ট, কিছু পুরনো টাইপরাইটারে লেখা কবিতা যার কালি যেন লালচে।
ঘরে মানুষের পদচারণার শব্দ নেই। শুধু নিঃস্তব্ধতা।
এটা যেন ঘর না, বরং কোনো সাইলেন্ট কারাগার।
জেভিয়ার আনায়াকে তার রুমে নিয়ে গেল।
রুমের দরজা খুলতেই আনায়ার চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেল।
ঘরের মাঝখানে রাজকীয় এক বিশাল খাট তার হেডসাইড দেওয়ালে লাগানো এক বড় ফ্রেম করা ছবি।
আনায়া থমকে গেল। হাঁ করে তাকিয়ে রইল।
ছবিটা তার…!
তার কয়েক মাস আগের, যখন সে একা বৃষ্টিতে হেঁটে যাচ্ছিল। মাথায় কোনো ছাতা ছিল না। মুখে বৃষ্টির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছিল। একদম ন্যাচারাল, কিন্তু গভীর আবেগে ভরা এক ছবি।
আনায়ার কাঁধ কেঁপে উঠল। তার এই ছবি জেভিয়ার নিলো কি করে?
ঘরের কিছু আসবাবপত্র রক্তমাখা লাল ভেলভেটের সোফা, স্লিপ চেয়ার, একটা ছোট টেবিল। জানালার পাশে লম্বা পর্দা কালো ও রেড মিলিয়ে।
আনায়া হঠাৎ বুঝে উঠতে পারে না সে স্বপ্ন দেখছে, নাকি দুঃস্বপ্ন।
ঠিক তখন জেভিয়ার ধীরে কাছে এসে তার কানের খুব কাছে ফিসফিস করে বলে ওঠে,
– আজ থেকে এইটা আমাদের রুম লাভ বার্ড। ডু ইউ লাইক ইট?
তার গলায় মধুরতা ছিল, কিন্তু শব্দগুলো ছিল শিকলের মতো।
আনায়া এক চুলও নড়তে পারে না। কিছু বলতেও পারলো না। শুধু ঠান্ডা ঘরটায় ভেসে বেড়ায় তার নিঃশ্বাসের শব্দ আর দেয়ালে ঝুলে থাকা নিজের ছায়া।
সন্ধ্যার আগেই জেভিয়ার নিয়ে গেলো আনায়াকে এক নির্জন পাহাড়ঘেরা গির্জায়। এটা ছিলো এক পুরনো ক্যাথলিক চার্চ, যেখানে লোকজন খুব একটা আসে না। চারদিকে নিরবতা, যেন শব্দ নিজেই ভয় পায় এই গির্জার পবিত্র নীরবতা ভাঙতে।
ভেতরে ঢুকে আনায়ার চোখে-মুখে জমে থাকা ভয় আরও গাঢ় হয়ে উঠলো।
কোনো আত্মীয় পরিজন নেই, নেই কোনো অতিথি, ফুল, হাসি, বা উল্লাসের শব্দ। শুধু একজন বৃদ্ধ ফাদার, জেভিয়ারের নির্দেশে সব প্রস্তুত রেখেছিলেন।
দুজন সাক্ষী জেভিয়ারের লোক যাদের মুখে কোনো আবেগ নেই।
সাদা গাউনে আনায়া দাঁড়িয়ে রইলো পাথরের মতো।
হাতে জেভিয়ারের হাত রেখে মুখে “আই ডু” বললো।
কিন্তু গলা যেন তার নিজের নয় নিঃস্ব এক আত্মা বলছে বাক্যগুলো।
বিয়ের রেজিস্ট্রি শেষ হলো। কথা মতো কাগজপত্রে স্বাক্ষর করেও ফেলল সে। সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়ার পর, জেভিয়ার ঠোঁটের কোণে খেলে উঠলো সেই পরিচিত ছলনাময় বিজয়ের হাসি।
– এবার তুমি পুরোপুরি আমার, লাভ বার্ড। পুরোপুরি আমার।
রাত গড়িয়ে এলো। আনায়া এখন বসে আছে সেই অদ্ভুত ঘরে যার দেয়ালে টাঙানো তার নিজের ছবি তাকে প্রতি মুহূর্তে মনে করিয়ে দিচ্ছে, সে এখানে ‘আতিথ্য’ পেতে আসেনি সে এখানে বন্দি।
রক্তলাল পর্দা, কালো দেয়াল, ভারী নিস্তব্ধতা সে খাটের এক কোণে বসে আছে, তার চোখে কোনো জল নেই। কারণ চোখেও এখন আর জায়গা নেই কান্নার।
ঠিক তখন দরজা খুলে ঢোকে জেভিয়ার।
কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে গভীর মনোযোগ দিয়ে নিজের লাভ বার্ড কে দেখে সে। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে।
আনায়ার সামনে এসে থেমে যায়। তারপর হালকা জোরে চিবুক ধরে ওর মুখটা ওপরে তোলে।
— কি হয়েছে লাভ বার্ড? কাঁদছো কেন তুমি? আজ তো আনন্দের দিন তোমার জীবনের সবচেয়ে খুশির দিন।
আনায়া কাঁপা গলায় চোখ তুলে বলে,
— এত ছলনার দরকার নেই। আমি জানি, তুমি বিয়ে করেছো শুধু বন্দি করে ভোগ করার জন্য। এই অভিনয়, এই ভালো সাজা সবই মিথ্যে। শান্তি হয়নি?এবার শুরু করুন। অভিনয়ের দরকার নেই।
জেভিয়ার মাথা নিচু করে এক তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,
— ভোগ করার হলে, এই দুনিয়ায় নারী দেহের অভাব আছে নাকি আমার জন্য?
আমি চাইলে যেকোনো এক রাতের জন্য অজস্র শরীর পেতাম, লাভ বার্ড ।
কিন্তু জানো, আমি তোমায় ভোগ করতে চাই না।
আমি চাই তোমাকে আমার আত্মার অংশ বানাতে।
তোমাকে এমনভাবে নিজের করে নিতে, যেন আমার নিঃশ্বাসেও তুমি থাকো।
তোমার কান্না, ভয়, রাগ, ঘৃণা সব শুধু আমায় ঘিরে হোক।
তোমাকে শুধু আমার শরীর না। আমার মানসিক নেশার অংশ বানাতে চাই আমি।
আনায়া তার দৃষ্টি থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়।তবে সে জানে, এই রাত, এই ঘর, এই মানুষ। সবই এক ভয়ঙ্কর শুরু।
গত রাতটা মনে হচ্ছিল যেন এক অনন্ত অপেক্ষার রাত।
ভেবেছিল আজ রাতে জেভিয়ার তার সমস্ত ভয় সত্যি করে দেবে, তাকে ছিঁড়ে ফেলবে নিজের খিদে মেটাতে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, সে কিছুই করেনি।
খাটের এক কোণে নিঃশব্দে গিয়েই যেন জমে গিয়েছিল,
কোনো শব্দ, কোনো ছায়া নীরবতা ছাড়া কিছুই ছিল না সে রাতে।
তবুও চোখ বন্ধ করেনি আনায়া। সে ঠিক করেছিল ঘুমাবে না। এই ভয়ের ঘরে, এই অসহ্য আতঙ্কে কীভাবে ঘুমায় মানুষ?
কিন্তু শরীর একসময় হেরে যায়। ভোর হতেই তার চোখ খুলে যায়।
জানালার ফাঁক গলে বাইরে সূর্যের আলো ছুঁয়ে গেছে পাহাড়ের মাথা, কিন্তু এই ঘরে আলো ঢোকে না।
কালো দেয়াল, ঘন পর্দা, ভারী নিঃশ্বাস এই ঘর যেন আলোকের ভয় পায়।
চুপচাপ ফ্রেশ হয়ে বাইরে বের হয় আনায়া।পা ফেলে হাঁটে নিঃশব্দে। হলঘরে গিয়ে দেখতে পায় জেভিয়ার বসে আছে কাঠের চেয়ারে। হাতে পানি ভর্তি একটা বোতল, সেটা থেকেই সে ধীরে ধীরে পানি খাচ্ছে।
তার পরনে রয়েছে গাঢ় নীল রঙা একটা শর্ট হাতার গেঞ্জি। তার শরীরটা ঘামে ভিজে উঠেছে গেঞ্জিটা যেন দ্বিতীয় চামড়ার মতো লেগে আছে শরীরে।
ফর্সা ত্বক ঘামে চকচক করছে। কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে থুতনির কোণে। বাহুর শিরাগুলো যেন জেগে আছে, বুকের পেশি একটি একটি রেখার মতো স্পষ্ট।
আনায়ার চোখ আটকে যায় তার গলার দিকে অ্যাডামস অ্যাপেলটা উঠছে নামছে প্রতিবার পানি খাওয়ার সময় হালকা ছন্দে দুলছে।
সেই দৃশ্য অদ্ভুত মোহময়।
আনায়া স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। জেভিয়ারের চোখ এখন তার দিকে নয়, তবুও মনে হচ্ছিল এই লোকটার চারপাশে একধরনের চুম্বক আছে, যেটা মানুষকে চাইলেও দূরে থাকতে দেয় না।
তার ধূসর চোখ যা আলোয় পড়লে রূপালী হয়, ছায়ায় পড়লে ধোঁয়ার মতো ঘোলাটে।
গালের চাপদাঁড়ি, নিচু ঠোঁটের রেখা, ভিজে কপাল
একটা মানুষ কীভাবে এমন নির্দয়ভাবে সুন্দর হতে পারে?
আনায়া চোখ সরাতে পারে না আর ঠিক তখনই জেভিয়ার তাকাল আনায়ার দিকে। মুচকি হেসে সে উঠে দাঁড়ায়। ধীরে ধীরে আনায়ার দিকে এগিয়ে আসে।
প্রতিটি পায়ের শব্দে আনায়ার বুকের ভিতর থেকে দম আটকে আসতে থাকে।
সে দাঁড়িয়ে থাকে নিঃস্পন্দ। জেভিয়ার সামনে এসে দাঁড়ায়।
তার গায়ের ঘ্রাণ, পুরুষালী শরীরের ঘাম আর হালকা পারফিউমের গন্ধ যেন ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া কোনো নেশার মতো চেপে ধরে আনায়ার চারপাশ।
জেভিয়ার সামনে হালকা ঝুঁকে আসে।
আঙুল বাড়িয়ে আনায়ার গাল ছুঁয়ে যায় ঠোঁটের কোণ ঘেঁষে।
আনায়ার চোখ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে আসে। শরীরটাও নিঃস্পন্দ হয়ে যায়।
ভেতরে ভেতরে জানে এটা ভয় কিন্তু কোথায় যেন এক অদ্ভুত টানও আছে।
জেভিয়ার থেমে যায়। তার মুখটা এখনো কাছে।
শুধু ফিসফিস করে বলে ওঠে,
অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ৬
— তুমি জানো, লাভ বার্ড? তোমার ভয়টাই তোমাকে আরও বেশি সুন্দর করে তোলে।
আনায়ার বুকের ভিতর কেঁপে ওঠে।
সে জানে,এই পুরুষ আগুনে পুড়িয়ে মারবে তাকে।
কিন্তু সেই আগুনে পুড়ে যাওয়ার মাঝেও একরকম মোহ লুকিয়ে আছে……..।
