অপ্রত্যাশিত ভালোবাসা পর্ব ১৩
Sathi
__ মেঘ, আমি বিয়ে করবো না।
” পিছন থেকে হঠাৎ এমন কথা শুনে মেঘ ভ্রু কুঁচকে পিছন ফিরে তাকায়। সেতুকে এত রাতে নিজের রুমের,বেলকুনিতে দেখে সে একটু অবাকই হয়। তবে নিজেকে সামলে নিয়ে সেতুকে একবার আগাগোড়া দেখে স্বাভাবিক গলায় বলে।
__ কেন?
সেতু একটু ইতস্তত করে, চোখ নামিয়ে হালকা স্বরে বলে।
__ আমি পড়তে চাই।
“তার এমন কথায়, মেঘের ঠোঁটে হালকা হাসি খেলে যায়, যেন তার উত্তরটা জানা।
__ বিয়ের পর যত ইচ্ছা পড়িস।
” বলেই মেঘ ধীরে ধীরে সেতুর কাছে এগিয়ে আসতে। সেতু চোখ ঘুরিয়ে এদিক-ওদিক তাকায়। সে জানতো মেঘের জবাব এটাই হবে। তাই একটু বিরক্তি মিশ্রিত কণ্ঠে বলে উঠে।
__ আমি বিয়ের জন্য প্রিপেয়ার্ড না। আমার সময় লাগবে। আমি এখন সংসারের ঝামেলায় পড়তে চাইনা।
মেঘ ভ্রু তুলে তাকায়, কণ্ঠে নরম কন্ঠে বলে।
__ আমি তোকে সংসার করতে বলেছি?
” মেঘের কথা শুনে সেতু মাথা না বোধক মাথা ঝাঁকায়। তা চোখ মেঝেতে আটকে রেখে বলে।
__ না, তবে বিয়ের পর তো, সবার সেটাই করতে হয়।
মেঘ হালকা হেসে মাথা নাড়ে।
__ তোর করতে হবে না।
__ কেন?
” সেতু বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে তাকায়। মেঘ মুচকি হেসে সেতুর একদম কাছে চলে আসে, তবে সামান্য দূরত্ব রেখে, যেন সেতু অস্বস্তি বোধ না করে। আলতো করে তার মাথায় হাত রেখে বলে।
__ আমরা সারা জীবন বন্ধুই থাকবো। আমরা যতই স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে জড়াই না কেন, আমি তোকে আগে বন্ধু হিসেবেই গুরুত্ব দেবো। তাই টেনশন নিস না। তোর আমার সাথে সংসার করতে হবে না। আমরা বন্ধু থাকবো। শুধু নির্দিষ্ট কিছু কারণে এখন বিয়ে করে রাখবো। তোকে নিশ্চয়ই কারণটা বলতে হবে না?
সেতু ধীরে মাথা নেড়ে জবাব দেই।
__ না, আমি জানি।
” সেতুর চোখে এক ঝলক অন্ধকারজেহেফিল নামক ছায়া নেমে আসে। কারণটা যে জেহেফিল, এটা সবারই জানা। তাই নিজের কাছেও নতুন কিছু নয়।
” ভাবনার মাঝে, মেঘ আলতো করে সেতুর থুতনিতে স্পর্শ করে, কোমল আশ্বাস দিয়ে বলে।
__ আমরা বিয়ে করে রাখবো, ছোট করে দুই পরিবার মিলে। দুই বছর পর তোর কলেজ লাইফ শেষ হলে, বড় করে অনুষ্ঠান করে তোকে নিয়ে যাবো, তোর ইচ্ছায়। আপাতত এসব সংসার-বিয়ের চিন্তা বাদ দিয়ে মন দিয়ে পড়াশোনা কর, আর লাইফটা এনজয় কর।
“মেঘের কথায় সেতু স্বস্তি পায়। আবেগে আপ্লুত হয়ে বলে।
__ তুমি এত ভালো কেন, মেঘ?
“সেতুর বাচ্ছামিতে মেঘ একটু হেসে ফেলে।
__ কারণ তুমি মেয়েটাও ভালো।
” দুজনেই হেসে ওঠে। হাসতে হাসতে হঠাৎ মেঘ বলে উঠে।
__ আমি তোকে ভীষণ ভালোবাসি, ঝাঁসির রানী।
” বলেই আবেগময় চোখে তাকিয়ে থাকে মেঘ। সেতু প্রতিবারের মতোই ডেব-ডেব দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে, কোনো জবাব দেয় না।
“মেঘ একটু থেমে হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, তবুও মন খারাপ করে না। সে এটাতে অভ্যস্ত।
” সেতুকে ধরে রুমে এনে, বেডে বসিয়ে সে আলমারি খুলে কিছু কাগজ নিয়ে আসে।
__ এইসব কি?
” সেতু অবাক চোখে ট্রেনের টিকিটগুলো দেখতে থাকে। মেঘ নিঃশব্দে তার পাশে বসে সাভাবিক ভাবে বলে।
__ আমরা গ্রামের বাড়ি যাচ্ছি। বিয়েটা গ্রামেই হবে।
__ সত্যি?
” খুশিতে লাফিয়ে উঠে সেতু। চোখে মুখে আনন্দের ছোঁয়া। চোখের সামনে সেই ছোটবেলার স্মৃতিগুলো ভেসে ওঠে,গ্রাম, উঠোন, কাঁঠাল গাছ, নদীর হাওয়া।আবেগে ভেসে মেঘের হাত ধরে বলে।
__ থ্যাংকু, ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চা।
মেঘও ছাড়ে না।
__ মোস্ট ওয়েলকাম, গরুর চার নম্বর বাচ্চা।
” বলেই সেতুর নাকে টোকা দেয়। সেতু রেগে যায়, স্বভাবসুলভ মেঘের চুল খা*মচে ধরে।
__ একদম আমার নাকে টোকা দিয়ে তোমার মতো চ্যাপ্টা, চৌরাস্তার মোড়ের মতো করবে না!
__ আমার নাক চ্যাপ্টা?
__ তো কি! পুরো একটা চৌরাস্তার মোড়।
” সেতুর কথায় ,মেঘ হাত তুলে আত্মসমর্পণ করার মতো করে বলে।
__ ঠিক আছে মেরি মা, মেনে নিলাম। তোর সাথে পারবো না। এখন অনেক রাত হয়েছে,মাথা থেকে সব ফা/লতু চিন্তা বাদ দিয়ে ঘুম দে। গুড নাইট।
” উঠে টিকিটগুলো আগের জায়গায় রেখে দেয় মেঘ। সেতুও উঠে যেতে যেতে স্বভাবসুলভভাবে বলে।
__ গুড মর্নিং।
” তার কথায় মেঘ পিছন ফিরে হেসে ফেলে। এই মেয়েটা কখনো বদলাবে না,আর সে চাইও না, বদলাক।
” রাত বাড়ার সাথে সাথে মেঘের চোখে আর ঘুম আসে না। বু*কের ভেতর অজানা একটা চাপা দুশ্চিন্তা জমে ওঠে। জেহেফিল, তার সম্পর্কে যত খোঁজ নিয়েছে, ততই র*হস্য বেড়েছে। একটাই পরিচয়,সে সিআইডি অফিসার। কিন্তু তার অতীত? পরিবার? কিছুই জানা যায় না। জাস্ট দুইজন ব্যক্তি? বাবার কেন কোনো পরিচয় নেই? আদৌ সে কোথায় থেকে এসেছে? এখানে এসেছে মাত্র ৪ মাস তাহলে আগে কোথায় ছিল?মেঘের মনে প্রশ্ন জাগে।
আসলে লোকটা কে? ব্যাপারটা অদ্ভুত, ভীষণ অদ্ভুত।
“সকাল ৮ টা”
” সকালের নরম আলো জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকছে, কিন্তু সেই আলো যেন সেতুর ঘুম ভাঙাতে পারেনা। মিতু টেনে হিঁ*চড়ে ঘুম থেকে তুলেছে সেতুকে। পাশের রুমে ভাই আছে,চাইলেও বাঁ”দরামি করে তুলতে পারছে না।
কিন্তু তুলেও লাভ নেই। সেতু কোনোদিন সকাল সকাল ওঠে না,কমপক্ষে ৯টা।কিন্তু আজ তো উঠতেই হবে।কারণ ১০টায় ট্রেন ছেড়ে দেবে। ওর বাবা, মা, সেতুর বাবা মা ,সবাই রওনা দিয়েছে এখানে আসার জন্য। অথচ এই মেয়ের কোনো খবরই নেই!
” অনেক কষ্টে ঘুম থেকে তোলার পরও, বসে বসে দেওয়ালে হেলান দিয়ে আবার ঘুমাচ্ছে সেতু। মাথাটা কাত হয়ে পড়ছে, চোখ আধখোলা, একেবারে বাচ্চাদের মতো অবস্থা।
“দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিতু সেইদিকে তাকিয়ে থাকে। আর না পেরে বিরক্ত হয়ে ধুপধাপ পা ফেলে ভাইয়ের রুমের দিকে রওনা দেয়।
” রুমে এসে দেখে ভাই নেই। সব গুছানো,একটা আলাদা পরিপাটি ভাব। ভাইকে না দেখে,ভ্রু কুঁচকে যায় তার।নিচ থেকে শব্দ শুনে নিচে গিয়ে দেখে,ভাই কিচেনে।
” মেঘ নাস্তা বানাচ্ছে। গরম ভাপ ওঠা রান্নাঘরে মেঘের মনোযোগী মুখটা দেখে মিতু থমকে যায়। জীবনে প্রথম ভাইকে রান্না ঘরে দেখলো। বিষ্ময় কাটিয়ে তারপর রেগে মেগে এসে দাঁড়ায়, মেঘ ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করে।
__ রেগে আছিস কেন? কি হয়েছে?
মিতু যেন রাগে ফেটে পড়ে।
__ তোর জানের জান, পরানের পরান যেখানে আছে, সেখানে মানুষ কি টেনশন ছাড়া থাকতে পারে?
__ করেছে কি?
মিতু বিরক্তিতে হাত নাড়ে।
__ কোনটা করেনি সেটা বল!
” বাঘা ক্ষে*পিনীর মতো ফুঁসতে ফুঁসতে কথাটা বলে মিতু।মেঘ এবার চোখ সরু করে তাকায়।
__ আপাতত কি করেছে, সেটা বল।
__ ঘুম থেকে উঠছে না।অথচ এখনো প্যাকিংও করেনি।
মেঘ শান্ত গলায় বলে।
__ দরকার নেই। আমি করে নিয়েছি। ও ঘুমাক। মাম্মা-পাপা আসছে, সাথে সেতুর পরিবারের সবাই। সবাই আসার দুই মিনিট আগে ডেকে দেবো। এখন ডিস্টার্ব করিস না, যা।
মিতু এতো কথার মাঝে, ভাইয়ের একটা কথার মাঝে থমকে যায়। চোখ বড় বড় করে প্রশ্ন করে।
__ তুই প্যাকিং করে ফেলছিস ওর? কখন? কিভাবে?
“মেঘ শুধু মুচকি হাসে, কোনো জবাব দেয় না। মেঘের অবস্থাঃ দেখে, মিতু মিটিমিটি হেসে ভাইযকে জ্বা*লানোর জন্য বলে।
__ আহা ভালোবাসা! যে ছেলে এক গ্লাস পানি নিজে নিয়ে খায় না, সে এখন রান্না করছে! যে ছেলে জীবনে কাপড় প্যাকিং তো দূরের কথা, একটা কাপড়ও গুছিয়ে রাখেনি,সে এখন নিজের সাথে অন্যের কাপড়ও প্যাকিং করছে!
__ যাবি তুই?
“মেঘকে তেড়ে আসতে দেখে, মিতু দৌড়ে উপরে চলে যায়। বোনের কান্ড দেখে, মেঘ নিজেই হেসে ফেলে,
” উপরে রুমে এসে মিতু সেতুর সামনে এসে দাঁড়ায়।
ঘুমন্ত সেতুর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মিতু। তার বু*কের ভেতরটা কেমন হালকা ব্য*থা করে ওঠে। ধীরে ধীরে বলে।
__ তুই কত লাকি, সেতু। না চাইতেও দুই দুইটা মানুষ তোকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসে যাচ্ছে।যা আমি হাজার চেয়েও পাচ্ছি না।
” কথাগুলো বলতে বলতে মিতুর চোখ ছলছল করে ওঠে। আলতো করে সেতুর কপালে একটা চুমু দেয়।মনের ভেতর অ*পরাধ*বোধ আর হিং*সার অদ্ভুত মিশ্রণ। নিজেকে খুব স্বা*র্থপর মনে হয় তার।তবে নিজেকে বোঝায়। তার ভাই আগে ভালোবেসেছে,
আর সেও আগে ভালোবেসেছে। এটা অন্যায় না। নিজের মনে নিজেকে বুঝায় মিতু।
” আদনান দৌড়াতে দৌড়াতে জেহেফিলের রুমে ঢুকে পড়ে। জেহেফিল মাত্র শাওয়ার নিয়ে বের হয়েছে। গলায় ঝুলছে তোয়ালে, পরনে শুধু একটা ট্রাউজার।
সকালবেলার ঠান্ডা পরিবেশেও তার চোখে তীক্ষ্ণতা।
আদনানকে হাঁপাতে হাঁপাতে ঢুকতে দেখে ভ্রু কুঁচকে বলে।
__ কু*ত্তা দৌড়ানি দিছে নাকি? এমন করছিস কেন?
আদনান হাঁপাতে হাঁপাতে বলে।
__ আরে ভাই, সেতুর ব্যাপারে খবর পেয়েছি!
জেহেফিলের চোখ মুহূর্তে তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে ছটফট করে জিজ্ঞেস করে।
__ কি খবর পেয়েছিস?
” আদনান মোবাইল বের করে একটা ছবি দেখায়।
__ এটা হচ্ছে মেঘ। সেতুর বেস্ট ফ্রেন্ড, বলতে পারিস, অনেক বেশি ভালো ফ্রেন্ড,ছোটবেলা থেকে।
জেহেফিল ভ্রু কুঁচকে বলে।
__ছেলে ফ্রেন্ড ? যখন আমি খবর নিয়েছি, তখন তো এই রকম কিছু শুনিনি।
আদনান ঢুক গিলতে গিলতে বলে।
__ কারণ লোকটা তখন বাইরে ছিল। কালকে দেশে এসেছে।আর কালকেই সেতুকে কলেজে ছেড়েছে।এবং সেতু কালকেই নিখোঁজ হয়েছে, সাথে লোকটাও।
“মুহূর্তে জেহেফিলের চোখ লাল হয়ে ওঠে।
__ তুই শিওর?
__ ফাক্কা শিওর। আর এই লোকটা মারুফ চৌধুরীর খুব বিশ্বস্ত বন্ধুর ছেলে। সম্পর্ক খুব ভালো। তাই সেতু আর এই ছেলের সম্পর্কও ভালো।
জেহেফিল ধীরে বলে।
__ কি বলতে চাচ্ছিস?
__ মানে,বেস্ট ফ্রেন্ড ভালো সম্পর্ক।
জেহেফিল ছবিটার দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলে
__ তাহলে তো একে একটু দেখতেই হয়…
আর পাখিকে খাঁচায় বন্ধ করার সময় এসেছে।আমার সাথে প্রতারণার শাস্তি খুব ভ*য়ংকর হবে, মারুফ চৌধুরী।
“বলেই রাগে মোবাইলটা ছু*ড়ে মা*রে।আদনান হতবাক হয়ে নিজের প্রিয় মোবাইলটার দিকে তাকিয়ে থাকে। জেহেফিলের রাগ দেখে,কিছু বলার সাহস পায় না।
জেহেফিল দাঁত চেপে বলে।
__ আদনান, লোক লাগা মারুফ চৌধুরীর বাসার সামনে।কখন, কোথায় যাচ্ছে,সব খবর আমার চাই।
আদনান বুক ছিঁ*ড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
__ লোক লাগানো আছে। কিন্তু যেই মোবাইলে কল করবে, সেই মোবাইল নেই,তুই ইন্নাহলিলাহ করে দিছস।
জেহেফিল ঠান্ডা গলায় বলে।
অপ্রত্যাশিত ভালোবাসা পর্ব ১২
__ নতুন পেয়ে যাবি।
” কথা শেষ হতেই তার নিজের ফোন বেজে ওঠে। গার্ডের কল দেখে সে অবাক হয়।
কল রিসিভ করতেই অপর পাশ থেকে ভেসে আসে।
__ হ্যালো স্যার, আসসালামু আলাইকুম,আপনাকে বিরক্ত করার জন্য সরি,আদনান স্যারকে পাচ্ছিলাম না কলে, তাই আপনাকে দিচ্ছি। একটু আগে ম্যাডামের মা-বাবা, ভাইসহ কোথাও যাওয়ার জন্য বেরিয়েছে।
জেহেফিল চোখ সরু করে আদনানের দিকে তাকিয়ে বলে।
__ ওকে, তুমি পিছু নাও। লোকেশন সেন্ড করবে আমাকে।
” কল কেটে দিয়ে আদনানের দিকে তাকায়। তার ঠোঁ*টে সুক্ষ্ম এক বিপজ্জনক হাসি ফুটে ওঠে।
__ লেটস গো আদনান, ঘুঘু ফাঁদে পা দিয়েছে।
