Home লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি শেষ পর্ব 

লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি শেষ পর্ব 

লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি শেষ পর্ব 
অহনা রহমান

ডিভোর্স লেটার রুহির হাতে আসলো এক স্নিগ্ধ বিকেলে৷ যতক্ষণ না রুহি এটা হাতে পেল তার এক সেকেন্ড আগেও ওর মনে ক্ষীণ আশা ছিলো, রাজ হয়তো তাকে ডিভোর্স দেবে না। রাজের ও ভীষণ রাগ ছিলো হিয়ার উপর। রাজ নিশ্চয়ই ভালো সাজতে সেদিন ওকে ফাঁসিয়েছে! কিন্তু না! এমন তো কিছুই হলো না।
রুহি এখন নিজে হাঁটাচলা করতে পারে মোটামুটি! ও বসে ছিলো বাড়ির পেছনের দিকে। মোবাইল আর কতক্ষণ চালানো যায়! কেউ তো আর কথা বলে না। ওই মোবাইল নিয়েই সারাক্ষণ পড়ে থাকতে হয়। রুহির বিরক্ত লাগছিলো তাই হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির পেছনের দিকে এসেছিলো। ঠিক তখনই, রুহির মা এলেন এদিকে। হাতে একটা চিঠির খাম। তিনি এসে রুহির সাথে খুব একটা কথা বাড়ালেন না।

“তোর নামে চিঠি এসেছে।”
রুহি মায়ের কথা শুনে অবাক হয়েছিলো। তার নামে চিঠি? কে পাঠালো চিঠি? তবে রুহি ও ওর মায়ের সাথে কথা বললো না৷ বলেও না কখনো। কেউ ওর সাথে কথা বলে না, আর রুহি নিজেও সেধে কারো সাথে কথা বলতে যায় না। মেয়েটা কেমন একরোখা! জেদি! রুহির মা খামটা রেখে চলে গেলেন। রুহি দোনোমোনো করতে সেটা খুললো। আর খুলে ডিভোর্স লেটার দেখেই ওর বুকের ভেতরে একটা ধাক্কা লাগলো।
রুহি প্রায় আধঘন্টা যাবত ওই লেটারটার দিকে তাকিয়ে আছে। ওর বিশ্বাস’ই হচ্ছে না, রাজ ওকে ডিভোর্স দিয়েছে। ওই তো..ওই যে নিচে রাজের সাইন টা জ্বলজ্বল করছে। রুহি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো পেপারটা। ঠিক তখনই ওর ফোনটা স্ব জোরে বেজে উঠলো। স্ক্রিনে ভেসে উঠলো একটা অচেনা নাম্বার। রুহির মাথায় কিছু এলো না তখন। আপাতত মাথাটা হ্যাং হয়ে আছে৷ রুহি কিছু না ভেবেই কল রিসিভ করলো।

“হ্যালো।”
ওপাশ থেকে প্রথম কয়েক সেকেন্ড কোনো শব্দ শোনা গেল না। রুহি বারবার হ্যালো হ্যালো করে গেল। কিন্তু কোনো লাভ হলো না। পঞ্চাশ সেকেন্ড এভাবেই কাটলো। এরপর ওপাশ থেকে শোনা গেল ক্ষীণ গলার স্বর।
“রুহি?”
কণ্ঠটি কানে পৌঁছালো মাত্রই আঁৎকে উঠলো রুহি। রাজ কল করেছে। রুহির বুকের বা পাশে ধুকপুক শব্দটা বাড়লো। ও সহসা কোনো জবাব দিতে পারলো না। ওপাশ থেকে আরও কয়েকবার ডাকলো রাজ। শেষবার রুহি জবাব দিলো,
“কেন কল করেছো? সাইন টা তো দেখতেই পাচ্ছি।”
রুহি অভিমান করলো না অভিযোগ তা বুঝলো না রাজ৷ বোঝার কথা ও নয়! রুহির গলার স্বর এক ফোঁটা ও নমনীয় নয়। রাজ বলল,
“তোমার আর আমার যাত্রা এখানেই শেষ হলো। ভাবলে, খারাপ লাগছে ভীষণ। কি অদ্ভুত ভাবে ঘটে গেল সবটা!”
“তুৃমি এসব বলার জন্য কল করেছো?”
“উহুম! একটা প্রশ্ন করার জন্য কল করলাম। এমনিতে তো আর কখনো কথা হবে না।”
রুহির স্বর এবারে একটু নরম হলো। ও বলল,

“কি প্রশ্ন?”
“আচ্ছা রুহি, আমরা কি চাইলেই পারতাম না, সুন্দর একটা সংসার গড়ে তুলতে?”
“না পারতাম না। আমাদের ভেতরে এরকম কোনো কথা ছিলোই না কখনো।”
“না থাকুক। আমরা কি বানিয়ে নিতে পারতাম না? দেখো, এই প্রতিশোধ-প্রতিহিংসার জন্য আজ সব কেমন এলোমেলো হয়ে গেল। এটার কি খুব দরকার ছিলো রুহি?”
রুহি জবাব দিলো না৷ রাজ আবার বলল,
“নিজেকে আয়নায় দেখো রুহি? ঘৃণা লাগে না? নিজের করা অন্যায়ের কথা মনে পড়ে না কখনো? কখনোই কি অনুভব হয়না, তুমি অন্যায় করেছো? তুমি মানো আর না মানো রুহি, তুমি অন্যায় করেছো। আচ্ছা, তোমার বাবা মা ও তো তোমার সাথে কথা বলে না। একবার ভেবেছো, তারা কেন তোমার সাথে কথা বলছে না? আচ্ছা রুহি, তোমার কি একটু ও অনুশোচনা হয় না? কল কেটো না, রাগ করো না। আজই তো শেষ আর কখনোই কথা হবে না আমাদের।

আচ্ছা সব বাদ দিলাম, হিয়া তো অন্তঃসত্ত্বা। মানলাম ও অন্যায় করেছে। কিন্তু ওর বাচ্চাটা? ও তো কোনো কিছু করেনি। ভাবতে পারছো, তুমি একটা খুন করতে চেয়েছিলে? তোমার কতটা অনুতাপ হয় জানি না রুহি। তবে আমার ভীষণ কষ্ট হয়। অনুশোচনা বোধ হয়।
এই কথা গুলো কেন বললাম জানো? বললাম, তোমাকে শাস্তি দিতে।”
এতক্ষণ রুহি রাজের প্রতিটি কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছিলো। তাকে শাস্তি দেওয়ার কথা শুনে সে একটু অবাক হলো। এতক্ষণের ঘোর কাটিয়ে বলল,

“যেমন?”
রাজ খুব কঠিন ভাবে বলল,
“তোমার শরীরে যদি একটুও মানুষের চামড়া থাকে, তবে আমার বলা কথা গুলো তুমি একবার হলেও ভাববে। তোমার অনুশোচনা’ই হবে তোমার শাস্তি। তুমি ক্ষমা চাইবে কিন্তু পাবে না। একাকিত্ব তোমাকে গ্রাস করবে রুহি। তুমি এভাবে কখনোই সুখী হতে পারবে না।”
রাজের কথার জবাবে রুহি কাঠকাঠ গলায় বলল,
“আমি কখনোই কারো কাছে ক্ষমা চাইবো না। কোনোদিন না।”
রুহি কল কেটে দিলো। যদি না কাটতো, শুনতে পেত পুরুষালি দীর্ঘশ্বাসের শব্দ। বুঝতে পারতো, রাজ তাকে ভালোবাসতে চেয়েছিলো৷ হয়তো বুঝতে পারতো, রাজ সুখের কাঙাল হয়ে তার ভালো হওয়ার প্রহর গুনেছিলো।

হেলেনা আর নাসিমা দুজনের যত্নে হিয়াকে আর পায় কে! আদুরে মেয়েটি সারাক্ষণ আদরে থাকে। যত্নে থাকে। সেদিনের ঝামেলার পর থেকে হেলেনা হিয়ার কাছেই থাকেন। হেলেনা অবশ্য বলেছিলেন থাকবেন না। কিন্তু নাফি এবং নাসিমা কিছুতেই যেতে দেননি৷ যদিও ওই বাড়ি থেকে বেশ কয়েকবার কল এসেছে। হেলেনা যেন ফিরে যায়৷ কিন্তু নাফি আর নাসিমা যেতে দিলেন না। হিয়ার এই অবস্থায় হেলেনার থেকে গিয়ে বেশ ভালো হয়েছে। মেয়েটাকে নিজে যত্ন করতে পারছেন। দেখতে পারছেন। আর কি চায়!
রাত নেমেছে ধরনীতে। মাঝ-রাত তখন। হিয়ার আজকাল ঘুম আসছে না। শরীরে অদ্ভুত এক অবসন্নতা। পেট ভারি হয়ে গেছে আগের চেয়ে। নড়তে-চড়তে বেশ কষ্ট হয়। হিয়া বিছানায় শুয়ে শুয়ে এপাশ ওপাশ করছে। দুই পায়ে তার বেশ যন্ত্রণা হচ্ছে। পায়ের যন্ত্রণায় ঘুম আসছে না কিছুতেই। হিয়া নিজে নীরবে যন্ত্রণা ভোগ করছে তবে নাফিকে ডাকলো না মেয়েটা। সে এপাশ ওপাশ করতে করতে উঠে বসলো। নিঃশব্দে বিছানা ছাড়লো মেয়েটা। ভারি পেটটা চেপে ধরে, চললো ওয়াশরুমের দিকে।

বেশ কয়েক মিনিট পর বের হলো হিয়া। হাসফাস লাগছে মেয়েটার৷ হিয়া ওয়াশরুম হতে বের হয়ে দেখতে পেল নাফি নেই বিছানায়। হিয়া খানিকটা অবাক হলো। উদ্বিগ্ন হয়ে চোখ বোলাতে লাগলো সারা রুমে। ঠিক তখনই ব্যালকনি থেকে রুমে ঢুকলো নাফি। হিয়া ওয়াশরুম থেকে বের হয়েছে টের পেয়ে নাফি রুমে ঢুকেছে। হিয়াকে উদ্বিগ্ন হতে দেখে নাফি দ্রুত ওর কাছে এলো।
“ময়না? তুমি আমাকে ডাকো নি কেন বলোতো? কতবার বলেছি, একা রাতে উঠবা না?”
হিয়া নাফিকে শান্ত স্বরে বলল,
“আ–আপনি ঘুমাচ্ছেন বিধায় আর ডাকিনি। তাছাড়া, আমার সমস্যা হচ্ছে না তো।”
“হ্যা সে তো দেখতেই পাচ্ছি।”
কথাটা বলে নাফি হিয়াকে ধরে নিয়ে খাটে বসালো৷ যদিও হিয়ার অতটাও সমস্যা হচ্ছে না। নাফি স্ব-যত্নে হিয়ার পা দুটো উঠিয়ে দিলো বিছানায়। হিয়ার বলা ও লাগলো না, নাফি হিয়ার পায়ে তেল মাখিয়ে মালিশ শুরু করলো। হিয়া এতে ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ে গেল। কেননা, নাফি সারাদিন অফিসে কাজ করে। বাসায় যদি একটু রেস্ট নিতে না পারে! হিয়া একটু রাগ দেখিয়ে নাফিকে বলল,

“আপনি এখন এসব করবেন?”
“কিসব?”
“এই যে! না ঘুমিয়ে, এসব কে করতে বলেছে আপনাকে?”
হিয়ার কথা শুনে নাফি শান্ত দৃষ্টিতে তাকালো হিয়ার দিকে। বেশ কিছুক্ষণ ধরে তাকিয়ে রইলো সে। এরপর কিছু না বলেই আবার নিজের কাজে মন দিলো। হিয়ার মসৃণ সুন্দর পা দুটো খুব যত্ন সহকারে মালিশ করতে লাগলো। হিয়া দ্বিতীয় বার আর কিছু বললো না। এইরকম তো প্রতিদিনই হয়! হিয়া খুব খেয়াল করে দেখলো নাফিকে। সুদর্শন সেই যুবকটিকে বেশ ক্লান্ত লাগে আজ-কাল! আচ্ছা, সত্যিই কেউ এতটা ভালো বাসতে পারে? নাফি হিয়াকে এমন ভাবে ভালোবাসে, মনেহয় হিয়ার শরীরের ব্যথা গুলো হিয়ার আগে নাফিই অনুভব করে৷ নাফির এতো ভালোবাসার মাঝখানে হিয়ার ভালোবাসা কি ঠুনকো হয়ে গেল না? নাফি তার জন্য কতটা কষ্ট করে। নাফি শুধু দিয়েই গেল আর হিয়া শুধু নিয়েই গেল!
নাফির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হিয়া এসব অবাঞ্ছিত ভাবনায় ডুবে গেল। হুঁশ ফিরলো নাফির ডাকে।

“রোদ্দুরী, কি ভাবছো ময়না?”
হিয়া দুই পা সরিয়ে নিলো নাফির কাছ থেকে। হেড বোর্ডের সাথে হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে দিলো। ইশারায় নাফিকে মাথা রাখতে বলল–নিজের পায়ের উপর। নাফি বাধ্য ছেলের মতো কথা শুনলো। শুয়ে পড়লো হিয়ার কোলের কাছে। হিয়া তখন নাফির মাথার চুলের ভাজে হাত ঢুবিয়ে দিলো। ড্রিম লাইটের আলোয় এই দৃশ্য বড়ই মধুর লাগলো।
“তুমি বলো, আমি যেন নিজেকে দেখি। তুমি বলো, আমি যেন একটু বিশ্রাম নিই। আমি তখন ভাবি, তোমার এই ক্লান্ত চোখ দুটো রেখে
আমি কীভাবে নিশ্চিন্তে ঘুমাই? তুমি-ই তো আমার নিজের সবচেয়ে প্রিয় অংশ। তুমি ভালো থাকলে তো আমিও ভালো থাকি।”

“কিন্তু এই জন্য যে আপনার শরীর খারাপ হয়ে যাচ্ছে। নিজেকে দেখছেন আয়নায়? কেমন হয়ে গেছেন আপনি? এসব তো আমার ভালো লাগে না।”
“কেন? কেন? ভালো লাগে না? তুমি যে আমার অংশ তোমার মধ্যে ধারণ করেছো। এই ঋন তো আমি শোধ করতে পারবো না৷ যদি একটু সেবা যত্ন করে তোমাকে খুশি করতে পারি! খুব যে আমাকে বলছো, তুমি তোমাকে আয়নায় দেখেছো?”
“উফফ! আপনার সঙ্গে যে কথা বলে পারবে, সে এখনো দুনিয়ায় জন্ম নেয়নি।”
“ঠিক বলেছো রোদ্দুরী। সে এখনো জন্ম নেয়নি।” কথাটা বলে নাফি হিয়ার পেটে চুমু খেল। আবারও বলল,
“কেননা, সে এখনো এখানে আছে৷”
হিয়া খিলখিলিয়ে হেঁসে উঠলো নাফির কথা শুনে। নাফি মুগ্ধ নয়নে চেয়ে দেখলো সেই হাসি। মা হওয়ার পর হিয়ার সৌন্দর্য যেন বহু গুনে বেড়ে গেছে। শুধুই তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে।

বহুদিন পরে রুহি বাড়ি থেকে বের হলো। গন্তব্য কোথায় তা তার নিজেরও জানা নেই। আজকাল বাড়িতে ভালো লাগে না। সবার মাঝেও রুহির নিজেকে একা মনে হয়। ভীষণ একা। একটু কথা বলার ইচ্ছে রুহিকে ভেতর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়৷ নিজের সাথে আর কতই বা কথা বলা যায়! ক্লান্ত লাগে যে! অনেকদিন কেটে যাওয়ার পরও রুহির সাথে কেউ কথা বলে না। কেউ-ই না! ওই সময়ে রুহির মনে হতো, কেউ না থাকলেও তার চলবে৷ সে কেন সেধে সেধে কথা বলবে, সবার সাথে? তার কি ঠেকা পড়েছে নাকি!

কিন্তু আজকাল মন খুব করে চায়, তার সাথে কেউ কথা বলুক। একটুখানি জিজ্ঞেস করুক, সে কেমন আছে৷ কেমন কাটছে তার সময়৷ কিন্তু আফসোস তাকে কেউই প্রশ্ন করে না। কেউ একটা কথা বলে না৷ না নিজের বাবা আর না তো নিজের মা! অন্য কারোর কথা তো বাদ! ওদিকে রুহিরও কথা বলতে ইচ্ছে করে না সেধে গিয়ে কথা বলতে। সবাই কি ভাববে, কি বলবে এসবই ওকে বেঁধে রেখেছে। বাড়িতে তার দম বন্ধ আসছে।
চারিদিকে সবুজের সমারোহ। মুক্ত বাতাস৷ শহর থেকে বেশ খানিকটা দুরে চলে এসেছে রুহি৷ একটা নদীর পাড়ে। বলা বাহুল্য, রাজও এই নদীর পাড়েই আসতো। রুহি বসলো নদীর পাড়ে। যেখানে রাজ বসতো! রুহি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো অদূরে। এমনিতে, আগে তার এসব নাটক ছাড়া কিছুই মনে হতো না। নদীর পাড়ে দেখে কি মানুষ! কিন্তু আজ রুহির বেশ লাগছে এখানে৷ হঠাৎ রুহির মনে পড়লো রাজের কথা। রাজের কথা’ই কি সত্যি হতে চলেছে? সে কি সুখী হবে না কখনো? এই কথা মাথায় আসতেই রুহি মাথা নাড়লো। হকচকিয়ে উঠলো। না না সে কিছুতেই অসুখী থাকবে না! রুহি মাথা নেড়ে এটা বললেও,
ওর মনের ভেতর থেকে কে যেন ডেকে বলল,

“তুই তো শেষ হয়ে গেছিস রুহি৷ একাকিত্ব তোকে আসলেই গ্রাস করেছে৷ তুই তো বলেছিলি, তোর কাউকে লাগবে না৷ তাহলে আজ তুই এখানে কেন? কেন এসেছিস তুই? তোর তো বাড়িতেই থাকার কথা। তার মানে রাজের কথা সত্যি হয়েছে রুহি।”
রুহি ধরফরিয়ে উঠে দাঁড়ালো। না না এটা কিছুতেই হতে পারে না৷ রুহির চোখ পড়লো নদীর সচ্ছ জলে৷ লাল পাড়ের সাদা শাড়িতে বেশ ভালো লাগছে তাকে–বাসা থেকে তাই দেখে এসেছিলো সে। কিন্তু নদীর জলে ভীষণ কুৎসিত লাগছে রুহিকে৷ নিজের প্রতিবিম্ব দেখে আৎকে উঠলো সে। চোখ দ্রুত অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিলো। কিন্তু তার আগেই কি যেন একটা চোখে পড়লো তার। রুহি ভয়ে ভয়ে তাকালো আবার নদীর পানিতে। রুহি দেখলো তার বিভৎস প্রতিবিম্ব খুব ভয়ংকর ভাবে হাসছে। রুহি কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না। কি করবে কি করবে ভেবে সে ছটফট করতে লাগলো। আচমকা তার কানে এলো একটা অদ্ভুত কন্ঠ।

“একা থাকার অসুখে জ্বলে মরবি রুহি। নাহলে তোকে সকলের কাছে মাফ চাইতে হবে। ছোট হতে হবে সবার কাছে। ও–ওই হিয়া–হিয়ার কাছেও তোকে ক্ষমা চাইতে হবে। হাহাহা! যদি রাজের কথা সত্যি হয়, তবে তোকে সবাই-ই ফিরিয়ে দেবে৷ তোকে কেউ ক্ষমা করবে না৷ উল্টো আরও হাসাহাসি করবে। হাহাহাহা! কি ভালোই না দেখাবে বল।”
রুহি ঘাবড়ে গেল। কি হচ্ছে তার সাথে। নদীতে থাকা তার প্রতিবিম্ব কিভাবে কথা বলছে তার সাথে? কিন্তু ওর বলা কথাগুলো…..! রুহি দুই হাতে কান চেপে চিৎকার করে উঠলো। এমনটা সে কখনোই হতে দেবেনা। রুহি ধপ করে বসে পড়লো মাটিতে। জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে লাগলো মেয়েটা। চারপাশে তখনও সেই কন্ঠ ভেসে আসছে৷ সেখানে বারবার বলা হচ্ছে, রুহি হেরে গেছে। তাকে নিয়ে দুইদিন পরে মানুষ হাসাহাসি করবে!

সেদিন রুহি দ্রুত ওই স্থান ত্যাগ করেছিলো। কিন্তু তারপর থেকেই ওর জীবনে নেমে এলো অশান্তি আর অশান্তি। কামরুল হাসান অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সংসার ভাগ হলো। রুহির বাবা মা আলাদা হয়ে গেল। যার যার-তার তার! আলাদা হওয়ার কারণও রুহি। রুহি কি কি করেছে এসব সবকিছুই অজানা ছিলো মেঝো চাচির। তিনি জানতেন, হিয়া অসুস্থ তাই হেলেনা ওই বাড়িতে আছে৷ হেলেনাও তো তাই-ই বলেছেন। কিন্তু কিছুদিন আগে সব শুনেছেন তিনি৷ যেই মেয়ে নিজের বাবা কে এমন একটা অপবাদ দিতে পারে তার কাছে সবকিছুই সম্ভব। কথায় আছে, যেখানে থাকে না মান সেখানে ছাড়ো পাকা ধান! তাই তারা আলাদা হয়ে গেছে। কখন না জানি, এসব অপবাদ তাদেরকেও দেয়!
এমতাবস্থায় যেন আরও একা হয়ে পড়লো রুহি৷ তবুও ওর দাম্ভিকতা একচুল পরিমাণ কমলো না। পারিবারিক এতো ঝামেলার মাঝেও রুহি গিয়ে নিজের বাবা-মা কে একফোঁটা শান্তনা দিলো না৷ ওই যে, তাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে হয়তো! তাছাড়া ওই ভয়ংকর প্রতিবিম্ব রুহিকে খুব জ্বালাতন করে। কানের কাছে কুমন্ত্রণা দেয় কতকিছুই!
বাবা মাকে রুমের মধ্যে কান্নাকাটি করতে দেখে সে৷ তবুও একবার সামনে যায় না।

রাজ দেশ ছাড়া আজ বহুদিন। ইতালিতে থাকে সে৷ ভালোই জীবন কাটছে তার। ইতালিতে রাজের একটা বন্ধু আছে৷ ও মুলত সেখানেই উঠেছিলো প্রথমে। এখন অবশ্য একটা জব করে৷ মোটা অংকের বেতন পায়৷ বাড়িতে নাসিমার সাথে মাঝেমধ্যে কথা হয় ওর৷ নাফি-হিয়ার খোঁজ নেয়। কিন্তু ওদের সাথে কথা বলার সাহস করে না৷
যদিও তার জীবনে আর কেউ আসেনি। রাজ ঠিক করেছে তার জীবনে আর কাউকে আসতে দেবে না সে। তার জীবন একা একা বেশ কাটছে। আর ভবিষ্যতেও সে এভাবেই কাটিয়ে দেবে৷

ডেসিন টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে হিয়া। তার পেছনেই দাঁড়ানো নাফি। হিয়ার চুলে বিনুনি গেঁথে দিচ্ছে। হিয়ার মন খারাপ এখন। মুড সুইং যাকে বলে! হিয়া মুখ গোমড়া করে চেয়ে থাকলো আয়নায়৷ এই আশায়, নাফি দেখবে তাকে! হিয়ার ভাবনা সত্যিই হলো। নাফি দেখলো হিয়ার গোমড়া মুখ। নাফি হাসলো তা দেখে। হাসবে নাই বা কেন? এই মেয়ের তো মিনিটে মিনিটে মুড সুইং করছে। নাফি হিয়ার কাঁধে হাত রেখে বলল,
“কি হয়েছে ময়না? শরীর খারাপ লাগছে?”
হিয়া একটু উচ্চস্বরে বলল,

“আপনি না মাত্র হাসলেন? এখন জিজ্ঞেস করছেন কেন, খারাপ লাগছে কি-না!”
“ওটাও দেখে ফেলেছে?” মনে মনে বলল নাফি। মুখে বলল,
“আমি তো হাসিনি। কার এতো সাহস, রোদ্দুরীর মন খারাপ আর সে হাসে!”
নাফির কথা শুনে, হিয়া হাসবে না হাসবে না করেও ফিক করে হেঁসে উঠলো। ঘুরে নাফির দিকে ফিরলো সে। নাফিকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“কিছুদিন পরেই তো অপারেশন। কত মানুষ তখন মারা যায়। আমার ভয় হচ্ছে, আমিও যদি আর ফিরে না আসি।”
হিয়ার কথা শুনে নাফির বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো।
“ধুর! এসব বলো না। আল্লাহ ভরসা, কিছুই হবে না তোমার।”
“শুনুন না, আমি ফিরে না এলে আমার বাচ্চাকে দেখবেন তো আপনি? আমার মা– আমার মাকে ফেলে দিবেন না তো?”

হিয়ার এসব আবোল তাবোল কথা শুনে নাফির মেজাজ খারাপ হলো খুব। ধমকে উঠলো নাফি।
“এসব কি বলছো তুমি? তুমি কি এখন বকা শুনবা আমার কাছে?”
“আরে রাগ করছেন কেন? আমি তো এমনিই বললাম। আরেকটা কথা বলবো?”
শেষের কথাটা হিয়া একটু নাটকীয় স্বরে বলল। নাফি গলে গেল হিয়ার হাসিমুখ দেখে।
“হুউউ বলো।”
“অপারেশনের সময় তো অজ্ঞান করে নেবে তাইনা? যদি আমার জ্ঞান না ফেরে, আমাকে ক্ষমা করে দিবেন হ্যাঁ? আমাদের এইটুকু পথচলায় কত ভুল করেছি। আমাকে ক্ষমা দেবেন হ্যাঁ?”
নাফির কেন জানি বুকটা ভেঙে এলো। একমুহূর্ত ভাবলো হিয়ার কথাটা…… শ্বাস আঁটকে এলো। সম্ভব না। হিয়া বিহীন নাফি অসম্ভব। অসম্ভব মানে অসম্ভব। নাফির চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো একফোঁটা। হিয়াকে বুকে নিলো মানুষটা। যেন ছেড়ে দিলেই পালিয়ে যাবে হিয়া৷
“হাসপাতালে নেবো না তোমাকে। সি সেকশন করা লাগবে না। নরমাল ডেলিভারি করাবো। কোনো অজ্ঞান করা হবে না। না না তোমাকে আমি হারাতে দেবো না। কিছুতেই না।”
হিয়া মলিন হেঁসে বলল,

“আমার সত্যি ভয় হয়, যদি আমি আর না ফিরি।”
হিয়াকে থামাতে না পেরে নাফি জোরে চেঁচিয়ে উঠল।
“আম্মুউউউ……! আম্মুউউ এই হিয়া পাগল হয়ে গেছে। ওকে পাবনায় নিতে হবে। সিট বুকিং করোওওওও।”
হিয়া হকচকালো। কি আশ্চর্য!

“ এসব কি?”
“কোন সব?”
“আম্মুকে ডাকলেন কেন? আর ওটা কি বললেন?”
“কোনটা?”
“এখন কিছু জানবেন না, তাই না?”
“আরে বলো না! ওওও এইমাত্র আম্মুকে যেটা বললাম?”
হিয়া দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“হ্যাঁ।”
“বলেছি, পাবনায় একটা সিট বুকিং দিতে। তোমাকে রেখে আসবো সেখানে।”
হিয়া নাফির কথা শুনে বেজায় খেপে গেল৷ এলোপাতাড়ি কিল বসালো নাফির পিঠে। যদিও তা খুবই আস্তে!

রুহিদের বাড়ির অবস্থা বেশ খারাপ। কথায় আছে, যে ভালো হয় সে এঁকে তেই হয়। আর যে না হয়, সে একাত্তরেও হয় না। রুহির অবস্থা হলো তাই! এতোকিছুর পরও ওর স্বভাবের একফোঁটা পরিবর্তন হলো না। এমনিতে তো সারাদিন ঘরের ভেতরে পড়ে থাকে। বের হয় না তেমন। আর হলেও শুধু ঝগড়া বাঁধায় মেঝো চাচির সাথে৷ মায়ের সাথে যাহোক সম্পর্কটা একটু স্বাভাবিক হয়েছিলো সেটাও ঠিক ভাবে রাখতে পারল না মেয়েটা। সারাক্ষণ খ্যাঁচাখেঁচি লেগেই থাকে। মায়ের সাথেও কোমড়ে গামছা বেঁধে ঝগড়া করে সে।
“মেয়েটার কি হলো বলোতো? ও কেন এমন করছে? আমার সাথে ও এমন ব্যবহার করে, ওর চাচির সাথে ঝামেলা করে। আচ্ছা ওকে নিয়ে কি করি বলোতো!”
কামরুল হাসান মেয়ের ব্যাপারে কথা বলতে আগ্রহী নন। ওই মেয়ের জন্য কতগুলো হাসিখুশি সংসার ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। বাবা হয়ে কত বড় অপবাদ পেয়েছে মেয়ের কাছ থেকে৷ এরচেয়ে লজ্জাজনক আর কি হতে পারে? কামরুল যখন জবাব দিলেন না তখন রুহির মা বারবার বলতে লাগলো একই কথা। শেষে কামরুল হাসান রেগেমেগে বললেন,
“মরতে বলো ওকে। আর সহ্য করা যাচ্ছে। এতো মানুষ মরে আল্লাহ ওরে মারছে না কেন?”
রুহির মা আর দ্বিতীয়বার কিছু বলার সাহস পেলেন না। বাবা যতই দুরে সরিয়ে দিক তিনি তো পারবেন না। তিনি তো মা। তাই না! তাছাড়া কয়েকমাস তো তিনিও দুরে রেখেছিলেন মেয়েকে। আর কি করবেন? ফেলে তো আর দিতে পারবেন না।

ড্রয়িংরুমে বসে আছে হিয়া। ডেলিভারির আর বেশিদিন সময় বাকি নেই। হেলেনা নিজের ঘরে ঘুমাচ্ছেন। নাসিমা বাড়িতে নেই। আর নাফি ও অফিসে। মোটামুটি বাসা পুরো নিরিবিলি। হিয়া টিভিতে কার্টুন দেখছে সোফায় বসে। মেয়েটার পানি পিপাসা অনুভূত হলো তখন৷ অন্য সময় কেউ পাশে থাকলে তাকেই দিতে বলতো পানিটা। কিন্তু এখন হাতের নাগালে কেউ নেই বিধায়, হিয়া নিজেই গেল পানি আনতে। ডাইনিং টেবিলের উপর ছিলো তা। হিয়া জগ থেকে পানি ঢেলে আবার সোফায় এসে বসলো। গ্লাসের পানিটা খেতে নিলো সে। অল্প কিছু পানি খাওয়ার পর হিয়ার পেটে কেমন চাপ লাগলো। তারপর হঠাৎই ব্যথা শুরু হলো পেটে। হিয়া চিৎকার করে উঠলো।
“আম্মুউউ……!”

হাসপাতালের অপারেশন রুমের সামনে দাঁড়িয়ে আছে নাফি। নাসিমা হেলেনা সহ ওই বাড়ির আরও কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। সবাই’ই মুটামুটি স্থির কিন্তু ছটফট করছে নাফি। চোখ দুটো লাল টকটক করছে। ছোঁয়া লাগলেই যেন রক্ত গড়িয়ে পড়বে।
তখন হিয়ার পেইন উঠেছিলো। যেহেতু এখনো ডেলিভারির সময় হয়নি তাই ডাক্তার ইমার্জেন্সি সিজার করা লাগবে। ব্যাস অনিচ্ছা সত্ত্বেও সি সেকশনে নিতেই হলো হিয়াকে। হিয়াকে অপারেশন রুমে নেওয়ার আগে, ও সবার কাছে ক্ষমা চেয়েছে।
হিয়ার এমন বিপদে, ওর চাচা-চাচিরা না এসে পারেনি।
নাফির বারবার মনে পড়ছে হিয়ার বলা সেই কথাগুলো। ছটফট করে মরছে ভেতরটা। কেমন আছে তার হিয়া!
অবশেষে অপেক্ষার অবসান ঘটলো। নাফি দরজার পাশে দেয়ালের সাথে মাথা ঠেকিয়ে ছিলো। ঠিক তখনই অপারেশন থিয়েটারের দরজার খোলার শব্দ হলো। নাফি হকচকিয়ে তাকালো সেদিকে। হৃদপিণ্ডটা চলছে অস্বাভাবিক গতিতে। ধুপধুপ শব্দ যেন দুর থেকেও শোনা যাচ্ছে। নাফি দেখলো দুজন নার্স হাসিমুখে বেরিয়ে এসেছে।
একজনের হাতে তোয়ালে দিয়ে মোড়ানো ছোট্ট কিছু একটা৷ নাফির বা পাশের ধুকপুকানি আরও বাড়লো। ও বেচারা একটা শব্দ ও করতে পারলো না ভয়ে। শুধু ড্যাবড্যাব করে দেখে গেল কি হচ্ছে।
নাসিমা নার্সদের দেখে সামনে এগিয়ে গেলেন। একজন নার্স বলে উঠলো,
“মিষ্টি নিয়ে আসেন মিষ্টি। একটা পুতুল এসেছে আপনাদের ঘরে। মেয়ে হয়েছে মেয়ে।”
সবাই-ই খুশি হলো। খুশিতে আত্মহারা যাকে বলে! প্রথমে হেলেনা কোলে নিলেন হিয়ার মেয়েকে। তারপর সবাই একে একে দেখতে লাগলো। কিন্তু নাফি স্তম্ভিত। তার মেয়ে হয়েছে? পুতুলের মতো মেয়ে? আচ্ছা পুতুলের মা কেমন আছে?

নাফি আগে মেয়েকে দেখার আগে নার্সকে বলল,
“রো–রোগী কেমন আছে? মা..মানে আমার হি..হিয়া কেমন আছে?”
“সুস্থ আছে৷ ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই বেডে দিয়ে দেবো।”
নার্সরা চলে যেতেই হেলেনা এলেন নাফির সামনে। ছোট্ট পুতুলটাকে সামনে ধরলেন নাফির।
“তোমার মেয়েকে দেখবে না নাফি?”
নাফি দিশেহারা হয়ে দু’হাত শার্টে মুছে নিলো। এরপর মেয়েকে কোলে নিলো সে৷ নরম তোয়ালে টা সরিয়ে দেওয়া হলো মুখের কাছ থেকে। নাফি দুচোখ ভরে দেখলো তার মেয়েকে। একদম হিয়ার ফটোকপি। বাচ্চাটা কেঁদে উঠলো তখন। সাথে নাফিও কেঁদে ফেললো। তবে এই কান্না দুঃখের নয় সুখের। এই কান্না, পুর্নতার।

“ম র তে পারিস না তুই অলক্ষি! কোন ভুলের সাজা হিসেবে যে আল্লাহ তোকে আমার মেয়ে করেছিলো৷ আমি জানি না।” রুহির মা এরপর দু’হাত তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“ও আল্লাহ এই অলক্ষির হাত থেকে আমাদের মুক্তি দাও। আল্লাহ বাঁচাও আমাদের।”
রুহির হঠাৎ যেন কি হলো! আর একটা কথাও বলতে পারলো না ও। বলার মুখও নেই ওর। শেষ মুহুর্তে এসে কেন, শয়তানের ধোঁকায় পড়লো ও? ওর কালো থাবা থেকে ওই–ওই ফুটফুটে বাচ্চাটাকেও ছাড়লো না ও? হায় আল্লাহ!
হিয়াকে হসপিটাল থেকে বাড়িতে এনেছে বেশ কয়েকদিন আগে৷ রুহি বাড়িতে নিজের মায়ের সাথে জেদ ধরেছিলো, ও হিয়ার বাচ্চাকে দেখতে চায়। ডিভোর্সের পুরো কথাটায় রুহি লুকিয়েছে সবার কাছ থেকে। রাজ অবশ্য নাসিমাকে জানিয়েছিলো!
রুহি এখনো নাফিদের বাড়ির বউ। তাই রুহির মা আর না করেনি। এমনিতে রুহি আগের চেয়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছে।

রুহিকে নিয়ে রুহির মা এলো হিয়াদের বাড়িতে। রুহিকে দেখে সবাই খুবই অবাক হয়েছিলো। কিন্তু ভদ্রলোকের বাড়িতে এসেছে তাড়িয়ে তো আর দিতে পারে না! নাসিমা সাদরে মেহমানদারি করলেন। কাউকে বুঝতে দিলেন না ডিভোর্সের ব্যাপারটা।
রুহি এলেও হিয়া কথা বললো না ওর সাথে। একবার ফিরেও তাকালো না ওর দিকে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে রুহি হিয়ার পায়ের কাছে বসলো। অনুনয়ের সাথে বলল,
“মাফ চাওয়ার মুখ নেই। তবুও বলছি ক্ষমা করে দে আমাকে।”
হিয়া একটুও বিশ্বাস করলো না ওর কথা। কেননা, এরকম কথা রুহি আগেও বলেছে। হিয়া ইগনোর করলো রুহিকে। রুহি আর হিয়ার সাথে কিছু বললো না। একপ্রকার জোরে টান দিয়ে মেয়েকে কোলে নিতে চাইলো৷ হিয়া কাঠকাঠ গলায় বলল,

“আমার মেয়েকে ছোঁবে না তুমি৷ প্লিজ ওর গায়ে হাত দিও না।”
রুহির রাগ উঠলো। ভালোভাবে বলেছে, কানে যায়নি তাই না? রুহি ইচ্ছে করেই সর্বশক্তি দিয়ে বাচ্চাটাকে টেনে নিলো। নরম কোমল পুতুলটা ব্যথায় কেঁদে উঠলো। বাচ্চার কান্না দেখে হিয়াও চিৎকার করে উঠলো। রুহির মা ও হেলেনা এগিয়ে বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিলো৷ দেখতে লাগলেন কোথায় লেগেছে। হাতে টান দিয়েছে রুহি। হেলেনা দেখলেন পুতুলের হাতটা লাল হয়ে গেছে মুহুর্তেই। তিনি হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখলেন জায়গাটা। অমনি বাচ্চাটা আরও জোরে কেঁদে উঠলো। মেয়ের কান্না কিছুতেই সহ্য করতে পারলো না হিয়া। হিয়াও কেঁদে ফেললো ডুকরে।
রুহির মা তখন উপরিউক্ত কথাগুলো বলেছিলো।
রুহি একটা কথাও বললো না আর। ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে। আশেপাশে তখন অজস্র প্রতিবিম্ব দেখা যাচ্ছে তার। কেউ ধিক্কার জানাচ্ছে। কেউ হাসছে। কেউ বা রেগে আছে৷ রেগে আছে কেননা বাচ্চাটার তেমন কিছুই হয়নি। এটাই ব্যর্থতা! রুহি সেই নদীর কাছে গেল আবার। নদীর পাড়ে বসলো সেদিনের মতো করে৷
নদীর পানিতে আজও তাকে দেখা যাচ্ছে।

“তুই এখনো বেঁচে আছিস? ছিঃ ছিঃ! তোর মা ও তোকে মরতে বলেছে রুহি। মরে যা তুই। তুই বেঁচে থাকলে, আর ভালো থাকতে পারবি না। পারবি না ভালো থাকতে। ওই হিয়া জিতে গেছে। ওর বাচ্চার কোনো ক্ষতিই হয়নি। কিন্তু… কিন্তু তুই আবার সবার চোখে খারাপ হয়ে গেছিস। আর কখনো ভালো হতে পারবি না তুই। তোর বাবা তোকে ঘৃণা করে রুহি। যা নিজের বাবার কাছে ক্ষমা চা। আর সুযোগ হবে না কিন্তু।”
রুহি আজ শুনলো কুৎসিত মানুষটার কথা। কুৎসিত? কি আশ্চর্য, আজ যে ওকে মায়াবী লাগছে। কিভাবে সম্ভব এটা? তবে রুহি সেসব দেখলো না। পুরো পৃথিবীটা যেন একটা জাহান্নামে পরিণত হয়েছে তার কাছে৷ শুধু জ্বলন আর জ্বলন! উফফফ! একটু বাঁচার জন্য হলেও তাকে মরতে হবে। মরতেই হবে। এভাবে আর যাইহোক বাঁচা যাবে না। রুহি উঠে দাঁড়ালো। ফোনে খানিকক্ষণ টাইপ করলো কি যেন। একটা মেসেজ সেন্ট করেই রুহি ধীরেধীরে নামতে লাগলো নদীর ঠান্ডা পানিতে। ও যেন সম্মোহনী হয়ে গেছে। সামনের প্রতিবিম্বটা ওকে হেঁসে হেঁসে ডাকছে। আর রুহি নিজেও চলে যাচ্ছে সেদিকে। রুহি তখন বুক সমান পানিতে চলে এসেছে।

“তাহলে তুই সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছিস? ক্ষমা চাইবি না বাবার কাছে?”
রুহি জবাব দিলো না সেই অদ্ভুত কন্ঠের। ক্ষমা তো চাইতে গিয়েছিলো সে। কিন্তু সবটা শেষ করার পর! এমন কেন হলো! ওর কি এই মতলব ছিলো? আসলেই ছিলো? মা তো বলেই দিয়েছে, ও যেন মরে যায়। তাহলে আর বেঁচে থেকে লাভ কি!
সাঁতার না জানা রুহি আরও এগিয়ে যায়। পিছনে ফেরার একটুও চেষ্টা করে না সে৷ কিছুক্ষণের মাথায় সে ডুব দিলো অথৈ জলে। পাড় থেকে আর একটুও দেখা গেল না রুহিকে। শুধু লাল পাড়ের সাদা শাড়িটা ভেসে উঠলো অল্প একটু।
পুতুলের হাত ভেঙে গেছে। বাচ্চাটার কান্না সহ্য করার মতো নয়। ইশশ! পনেরো দিনের বাচ্চা কি ব্যথায় না পেয়েছে!
হিয়া আর নাফি যখন হসপিটালে ছোটাছুটি করছে বাচ্চাটাকে নিয়ে। তখন খবর এলো, রুহি মা রা গেছে। পানিতে ভেসে ছিলো ওর মর দেহ। এমন একটা খবর কেউই আশা করেনি। কেউ না। রুহির এই পরিণতি তো হওয়ার কথা ছিলো না।”

“আমি ইচ্ছে করেই ছোট বাচ্চাটাকে কষ্ট দিয়েছি রাজ। তোমার কথা’ই সত্যি হলো। আমি ভালো থাকতে পারলাম না৷ সত্যিই অশান্তির আগুন আমাকে জ্বালিয়ে মারছে। আমি শেষ মুহুর্তেও চেয়েছি, হিয়ার কষ্ট। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা ওর সুখ লিখেই রেখেছে। আমি পারবো না ওকে কষ্ট দিতে। বলতেই হয়,ভাগ্যবতী মেয়েটা। জানো, আমার হিংসা হয়। এই পর্যন্ত যা করেছি, সবকিছুই একটু ভালো থাকার জন্য। আমার আর ভালো থাকা হলো না। তবে আমি জিতবোই রাজ। আমি জিতবো। আমি কারো কাছেই মাথা নোয়াবো না। কিছুতেই না। তুমি দেখে নিও আমি তোমাদের সবাইকে হারিয়ে দিয়ে জিতে যাবো।”
মেসেজটা পড়ার সাথে সাথেই রাজ কল করলো রুহিকে কিন্তু তার বন্ধ দেখালো। বাড়িতে কল করে জানতে পারলো, পুতুলের হাত ভেঙে গেছে৷ হসপিটালে গেছে সবাই।
তার কয়েক ঘন্টা পরই রাজ শুনতে পেল রুহি মা রা গেছে। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলো রাজ৷ রুহির খবরটা শুনেই ধপ করে বসে পড়লো মাটিতে। কিভাবে সম্ভব এটা৷ রুহি এমনটা কিভাবে করতে পারলো! রাজের কি হলো কে যানে, ও হঠাৎই কেঁদে উঠলো। চিৎকার করে আর্তনাদ করে উঠলো রাজ।

কেটে গেছে কয়েকমাস। এখন পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক। সবাই ফিরে গেছে নিজেদের জীবনে। হেলেনা চলে গেছে ওই বাড়িতে৷ রাজ ইতালিতেই থাকে৷ নাফি হিয়া ও তাদের মেয়ে নাবিহাকে নিয়ে সুখেই কাটছে ওদের সংসার। সেদিন শুক্রবার। ছুটির দিন। হিয়াকে নিয়ে অনেকদিন ঘুরতে যায় না নাফি। শুক্রবার সকাল থেকেই নাফি হিয়াকে জোর করছে ঘুরতে যাওয়ার জন্য। হিয়া মেয়েকে নিয়ে যেতে চায়নি। কিন্তু নাফির এতোবার বলার পর আর না গিয়ে থাকতে পারলো না সে।
আজ অনেক দিন পরে হিয়া কালো একটা শাড়ি পড়লো। মেয়েকে ও পড়ালো কালো একটা জামা। নাফি নিজে পড়লো কালো পোশাক। দুপুর তিনটার দিকে ওরা বের হলো বাড়ি থেকে। একটা সুন্দর পার্কের সামনে গিয়ে থামলো নাফির গাড়ি। একহাতে মেয়েকে কোলে নিয়ে অন্যহাতে হিয়ার হাত ধরে নাফি পার্কের ভেতরে ঢুকলো। একটা সুন্দর জায়গা দেখে বসলো ওরা।
হিয়া নাফির কাছ থেকে মেয়েকে নিলো। আবদার করলো নাফির কাছে,

“ওই তো ফুসকা। একটু ফুসকা এনে দিবেন?”
“এভাবে বলতে হয়? তুমি শুধু বলবা, এইটা লাগবে। ব্যস!”
নাফি হিয়াকে সাবধানে বসিয়ে রেখে গেল ফুসকা আনতে। কয়েক মিনিট পরে ফিরে ও এলো সে। ফুসকার প্লেট হিয়ার হাতে দিয়ে মেয়েকে কোলে নিলো সে। হিয়া ফুসকা খেতে লাগলো৷ মাঝেমধ্যে নাফির গালে ও একটা দিলো। সুর্য তখন পুব আকাশে। মিঠা ঝলমলে রোদ তখন হিয়ার উপর এসে পড়লো৷ গাছের ছায়ায় তা কয়েক খন্ডে ভাগ হয়ে গেছে। যেন রোদ গুলোও লুকোচুরি খেলছে। হিয়া তখন খাওয়ায় ব্যস্ত। নাফি মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগলো হিয়াকে। কয়েক মিনিট পর রোদটা পুরোপুরি এসে পড়লো ওদের গায়ে। এবারে শুধু হিয়া নয়, নাফি ও নাবিহার শরীরেও লাগলো সেই রোদ্দুর। নাবিহা কেদে উঠলো তখনই। নাফি হিয়াকে বিরক্ত না করে নিজেই নাবিহাকে খাওয়াতে লাগলো। নাবিহার মুখে ফিডার দিয়ে নাফি বলে উঠলো,

“জানো রোদ্দুরী, সুখের লুকোচুরি শেষ হয়েছে আজ। শেষ বিকেলের রোদটা সুখ হয়ে নেমে এসেছে আমাদের উঠোনে। জীবনের এত বাঁক পেরিয়ে অবশেষে বুঝলাম, এই সুখ নামক রোদ কখনো হারায়নি। এই রোদ্দুরটা লুকোচুরি খেলেছিল আমাদের সাথে। লুকিয়ে ছিল এই দিন টির অপেক্ষায়। যেন শেষ পর্যন্ত এসে দাঁড়াই, একই আকাশের নিচে, পাশাপাশি-কাছাকাছি। অবশেষে দেখো, আজ আর কোনো বাঁধা নেই। তুমি, আমি আর আমাদের পূর্নতা।”
“হুম পূর্নতা! আমরা আজ ভালোবাসায় পরিপুর্ন তাই না?”
নাফি হিয়াকে টেনে নিজের পাশে বসালো। ওদের সামনে বসে থাকা একজন লোককে ডাকলো নাফি। নিজের ফোনটা লোকটার কাছে দিয়ে বলল,
“একটা ছবি তুলে দিন।”
লোকটা এমন কিউট একটা পরিবার দেখে না করলো না। নাফির হাত থেকে ফোনটা নিয়ে ক্যামেরা ধরলো ওদের সামনে। মুখে বলল,

লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ৪১

“হাসুন একটু।”
লোকটার কথা শুনে হিয়া খিলখিল করে হেঁসে উঠলো। হিয়ার হাসি শুনে নাফি আর ক্যামেরার দিকে তাকালো না। তাকালো হিয়ার দিকে। ঠিক তখনই লোকটা ক্যাপচার করলো ছবিটা। লোকটা অনেকক্ষণ যাবত ওদের দেখেছে। সবশেষে লোকটা মনে মনে বলল,
“ইশশ! এমন একটা পরিবার যেন প্রতিটি ছেলের হয়। এমন স্বামী যেন প্রতিটি নারী পায়।”

সমাপ্ত