বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৮
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
মিথির শরীরটা দুর্বল,তার উপর অনিয়মিত ঘুম এবং গতকাল রাতের আদ্রের কান্ডকারখানা। সব মিলিয়ে মিথির আজ ঘুমটা ভাঙ্গল অনেকটা বেলা করেই। ঘুম ছেড়ে উঠে যখন রুমের বাইরে পা রাখল ঠিক তখনই আদ্রর দাদী নাক কুঁচকাল। মিথির দিকে এমনভাবে চাইল যেন দুনিয়ার সর্বোচ্ছ ঘৃণীত কাজটা মিথিই করেছে। মিথি দৃষ্টি অনুসরন করে নিজের দিকেই চাইল। কেন এভাবে চেয়ে আছে তার কারণ না বুঝে যখন কিচেনের দিকে পা বাড়িয়ে যেতে নিল ঠিক তখনই আদ্র দাদী মুখ চোখ কুঁচকে বলে উঠল,
“ একেই তো কোন পরপুরুষের বাচ্চা পেটে নিয়ে ঘুরতাছিস তার উপর কাল রাইতে কিনা আমার নাতিরে তুই চড় মারছস মিথি? তোর সাহস কত? আমার নাতির সংসার করবি না তুই? এইটা বলছস তুই? আরেহ তোরে যে আমার নাতি বিয়ে করছে এইডাই তো তোর সাত পুরুষের ভাগ্য! ”
মিথি শুনল চুপচাপ। অত্যাধিক দুর্বলতায় কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না তবুও উঠতে বসতে এভাবে আদ্রর দাদীর খোঁটাটাও সহ্য করতে কষ্ট হচ্ছে ওর। বিশেষ করে ওটা যখন তার চরিত্র নিয়ে, সন্তান নিয়ে কথা। গত দুদিন যাবৎই ভদ্র মহিলা উঠতে বসতে মিথিকে এটাই প্রমাণ করেছে যে সে নষ্ট চরিত্রের মেয়ে। জঘন্য একটা মেয়ে। মিথি যথাসম্ভব উত্তর না দিয়ে থাকারই চেষ্টা করেছে। আজও যথাসাধ্য চেষ্টা করে আবারও পা বাড়িয়ে যেতে নিতেই উনি আবারও বলল,
“ এতই যখন প্রেমপিরিতি তখন ঐ পোলার লগে চইলা যাইতে পারতাছস না? পইড়া আছস কেন এই বাড়িতে? চইলা যা পেটে যার বাচ্চা তার কাছে। আমি আমার নাতিরে আবার বিয়ে করাব। ”
মিথি এবারেও উত্তর দিল না। কি প্রয়োজন ঝামেলা বাড়ানোর? তাছাড়া, যেখানে কথা বলে বিন্দুমাত্র লাভ হবে না ওখানে কথা বলারও কি প্রয়োজন। মিথি চুপচাপ কিচেনে গেল। অতঃপর আদ্রর মাকে দেখা গেল ওখানে। আদ্রর মা মিথিকে দেখেই এগিয়ে এলেন। কপালে হাত রেখে সুন্দরভাবেই জানতে চাইল,
“ ভালো লাগছে না মিথি? শরীর অসুস্থ? চোখমুখ এমন দেখাচ্ছে…”
মিথি তাকাল। মনে মনে কাল রাতেই সিদ্ধান্ত স্থির করেছিল যে সে আজ সকালেই ফুফিকে বলবে বাড়ি দিয়ে আসতে। ভাই তাকে যাই বলুক, যতই সহ্য না করুক তবুও মিথি এখানের থেকে ওখানেই বেশি নিরাপদ অনুভব করবে। অন্তত এমন পশুর সাথে তো বসবাস করতে হবে না ওকে। মিথি মনে মনে সবটা বলার জন্যই প্রস্তুত হলো। ছোট্ট শ্বাস ফেলে বলল,
“ ফুফি..
“ বল মিথি। ”
মিথি এবারে সরাসরিই বলল,
“ আমায় একটু বাড়ি দিয়ে আসার ব্যবস্থা করবে? ব্যবস্থা না করলে আমি নাহয় নিজেই যাব। একেবারের জন্য যেতে চাইছিলাম। ”
আদ্রর মা ভ্রু জোড়া কুঁচকে ফেললেন। মিথির কথাটা শুনে দ্রুতই বলল,
“ একেবারের জন্য বাড়ি যাবি মানে? এটা তোর সংসার মিথি। সংসার ছেড়ে চলে যাবি তুই? ”
মিথি ঠোঁট এলিয়ে তাচ্ছিল্য মাখা হাসি হাসল। তার সংসার? এটা হাস্যকর নয়? সংসারের কিছু গড়ে উঠেছিল এখানে? হয়তো উঠেছিল। দৈহিক চাহিদা! আর কিছুই তো গড়ে উঠেনি। মিথি ওভাবেই বলে,
“ আমার সংসার? শুরু থেকেই তুমি যে এই মিথ্যে আশাটা আমায় বলে এসেছিলে ভাগ্যিস ফুফি, মিথ্যে আশাটা আমি দেখিনি কখনো। দেখলে হয়তে আজ কষ্ট পেতাম, এই সংসার আঁকড়ে থেকে যেতে চেষ্টা করতাম মরে যাওয়া অব্দি। সৌভাগ্যবশত এখন আমার মায়া হচ্ছে না সংসার শব্দটার প্রতি। ”
আদ্রর মা আবারও বলল,
“ এত সহজে হাল ছেড়ে দিবি তুই? মাত্র দুই মাসে? তুই প্র্যাগনেন্ট মিথি। যেখানে বাড়িতে তোর ভাই-ই তোকে সহ্য করতে পারে না সেখানে তুই ওদের ওখানে গেলে ওরা খুশি হবে মনে করিস তুই? ”
“ না, মনে করছি না ফুফি। মোটেও মনে করছি না। তবুও আমি যাব। যেখানে আমার মাতৃত্বের কোন নিরাপত্তা নেই ওখানে কি করে থাকব? তাছাড়া এমনও তো নয় যে এখানে আমার উপস্থিতিতে সবাই খুশি। ”
“ তোদের মাঝে ঝামেলা হয়েছে আবার কাল রাতে, তাই তুই এসব বলছিস। তুই আদ্রকে চড় ও মেরেছিলি কাল মিথি? এটা কি সত্যি? আমি, আমি এটা বিশ্বাস করিনি। ”
মিথি তাকাল নিরব চাহনিতে। কেন বিশ্বাস করেনি? কেন? মিথির কি সারাজীবন কেবল আঘাত পেয়ে যাওয়াই উচিত? মার খাওয়া উচিত? ওর নিজের পাল্টা মার দেওয়া কি অবিশ্বাস্য? কেন ফুফির এত বিশ্বাস যে সে তার ছেলের গায়ে হাত উঠাবে না? মিথি ছোট শ্বাস ফেলে। অতঃপর একটা হাসি মিশিয়ে বলল,
“ ফুফি,এই সমাজে ছেলেরা মেয়েদের গায়ে হাত তুললে কোন অপরাধ হয় না তাই না? মেরে জখম করে ফেললেও কিচ্ছু হয় না। এমনকি স্বামীরা বউকে খু’ন করে ফেললেও এটা তো স্বাভাবিক বিষয় তাই না? অহরহ ঘটছে। অথচ মেয়েরা তার স্বামীর গায়ে হাত তুললেই বিষয়টা বিস্ময়কর,আশ্চর্যজনক, পাপ। চরম পাপ! এমনটা হয় নাকি। ”
এইটুকু বলেই মিথি চুপ করল। অতঃপর আবারও আদ্রর মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
”হ্যাঁ, কাল রাতে আমি চড় মেরেছি তোমার ছেলের গালে। বিনা কারণে নিশ্চয় মারব না ফুফি? এই যে তোমার চোখমুখে এই অসহায়ত্ব, তোমার চোখমুখে এই চড় মারার বিষয়টা নিয়ে অবিশ্বাস এটাই বলে দিচ্ছে তুমি কখনো চাও নি তোমার ছেলের গায়ে কেউ হাত উঠাক। তাও আবার আমার মতো একটা সাধারণ মেয়ে? মুখে না বললেও বুঝা যাচ্ছে তুমি এতে খুশি হওনি। আসলে কি জানো তো ফুফি? মেয়েরা মা হবার পর সবার আগে মাতৃত্বকেই অগ্রাধিকার দেয়। নিজের নারীত্বকেও না। নয়তো একজন নারী হয়ে তুমি অন্য নারীর দিকটা ভাবতে। ভেবেছো? ভাবোনি। কারণ আদ্র তোমারই ছেলে, তোমারই সন্তান। জানো ফুফি? তুমি যেমন তোমার সন্তানকে ভালোবাসো আমিও ওভাবেই আমার সন্তানকে অনুভব করি ফুফি। ভালোবাসি। তবুও বলবে তাকে শেষ করার চেষ্টা করা লোকটার সাথে সংসার করতে? সে লোকটাকে চড় মেরে ভুল করেছি এটাই তো বলবে? ”
আদ্রর মা সবটা শুনল। অতঃপর মিথিকেও বলার মতো কিছু পেল ন যেন। ছোটশ্বাস পেনে অনেকটা সময় পর মিথিকে বুঝানোর ভঙ্গিতে উনি আবারও বললেন,
“ মিথি, আরেকটু সময় নে। তুই রাগের মাথায় তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছিস লক্ষী। ভাব একবার, তোর সন্তান। তোর বাচ্চা। জানি তো আমি তুই ভালোবাসিস। কিন্তু তুই ওকে একা বড় করবি? ওর বাবার প্রয়োজন পড়বে না মিথি? ”
সমাজ মেয়েদের মাতৃত্বকে মেয়েদের দুর্বলতা বানায়। এই যে তার প্রমাণ। একটা সন্তান হলেই ঐ সংসারে হাজারটা অত্যাচারের পরেও টিকে থাকতে হবে। কারণ কি? কারণ তার সন্তানের বাবা ঐ লোকটাই। ঐ নিকৃষ্ট লোকটাই। মিথি হাসে। বলে,
“ পড়বে না। ও বাবা ছাড়াই বড় হবে। পৃথিবীতে কত সন্তানই তো বাবা ছাড়া বড় হয়। তুমি দেখোনি ফুফি? ”
“ তুই যাই বলিস দিনশেষে ও বাবা বলে আদ্রকেই তো জানবে। ওর ইচ্ছে হবে না বাবার সাথে ঘুরতে, বাবার কোলে উঠতে? ওকে বাবার আদর থেকে বঞ্চিত করবি? ”
মিথি এবারের আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই উত্তর করল,
“ ওর বাবার আদরের প্রয়োজনই পড়বে না ফুফি। ওকে ওর আম্মুই এত ভালোবাসবে যে ও কখনো বাবার অভাব বোধ করবে না।”
“ মিথি, আমার ছেলেটা অন্যায় করেছে।মানছি তো আমি। একটুও সময় ও তো দে ওকে শুধরানোর। প্লিজ। ”
মিথির আর কথা শুনতে ইচ্ছে হলো না। এই যে শুধরানোর কথা বলল না? কি শুধরাবে আদ্র নিজেকে? যদি শুধরায়ও, আদ্র কখনো পারবে নিজের সন্তানের দিকে চোখ তুলে চাইতে? পারবে যে সন্তানকে অস্বীকার করেছে সে সন্তানের সামনে দাঁড়াতে? মিথি শুধু শুধাল,
“ আমি তোমায় ভুল বলছি না ফুফি। তবে আমার জায়গায় তুমি থাকলে কি করতে তাই ভেবে বলো নাহয়। ”
এইটুকু বলেই মিথি পা বাড়াতে নিল। আদ্রর মা তড়িঘড়ি করে এবারে বলল,
“ দাঁড়া, খেয়ে যা। ”
মিথি তবুও দাঁড়াল না। না পেরে আদ্রর মা হাত টেনে ধরেই বলল,
“খেয়ে যা মিথি। রাগ দেখাচ্ছিস আমার সাথে? ”
“ আমার অতটুকু যোগ্যতাই নেই ফুফি। ”
অতঃপর মিথি ফুফির থেকে খাবার নিল। বসে মুখে খাবার তুলতে নিল। অথচ ইচ্ছে এল না খাওয়ার। তবুও যেটুকু ও খেল তা মুহুর্তেই উগড়ে আসতে চাইল। না পেরে মিথিকে দ্রুতই দৌড়াতে হলো বেসিনে। পেট উগড়ে আসা বমিটা বেরিয়ে আসতেই সোফায় বসে থাকা আদ্রর দাদী মুখচোখ কুঁচকে বলে উঠল,
“ কার না কার বাচ্চা পেটে রেখে দিনে তেরোবার খালি বমিই করতাছে। মাঝখানে আমার নাতির কপালটা পুড়ল এই মাইয়াডার জন্য। ”
মিথি শুনল নিরবে। মুখচোখে পানি নিয়ে পুনলায় আবার ফিরেও। এই যে সমাজের সাধারণ মানুষরা পুরুষের কথাকে এতোটা গুরুত্ব দেয়, মেয়েদের কথাকে কেন গুরুত্ব দেয় না? কেন ভাবে না, মেয়েরাও সত্যি বলতে পারে।
বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৭
মিথি ব্যাগপত্র সব গোঁছাল। ফুফির সাথে কথা বলেও যখন লাভ হলো না তখন নিজ থেকেই সিদ্ধান্তে অটল থাকল। রুম থেকে তার জামাকাপড়ের ব্যাগ গুলো বের করতে নিতে নিতেই আদ্র এল। ভ্রু কুঁচকে মিথির দিকে তাকিয়ে থেকে শুধাল,
“ ব্যাগপত্র গুঁছিয়ে কাঁধে অপবাদ নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিস নাকি মিথি? নাকি ভয় পেয়ে পালিয়ে যাচ্ছিস? কোনটা? ”
মিথি তাকাল। তাচ্ছিল্য নিয়ে হেসে বলে উঠল,
“ অপবাদ? আদ্র? জানেন, আপনি একদিন এই অপবাদের জন্যই খুব করে পস্তাবেন। একটা কথা জানেন তো? এই পৃথিবীতে আপনি কাউকে যেমন আঘাত উপহার দিবেন, ঠিক তেমনই কোথাও না কোথাও, কেউ না কেউ আপনাকেও ঠিক একইরকম আঘাতটাই উপহার দিবে। শুধু সময়ের অপেক্ষা!”
