Home মন পবনে বৃষ্টি মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ৩৯

মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ৩৯

মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ৩৯
তাসনিয়া নুর

মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়ে সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করে আহির ।তার সাথেই রয়েছে আবইয়াজ, মাহির, মেহু, চিত্রা, ননী । আহিরের এই অবস্থা দেখে ছুটে আসেন মুন বেগম ।এসেই ছেলের মুখ আজলে ধরে অস্থির কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
— বাবা কি হয়েছে তোর? মাথা কীভাবে ফাটল?
আহির আড়চোখে চিত্রার দিকে তাকিয়ে প্রতুত্তর করল,
— রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় এক পাগল মহিলা মাথায় বারি মেরেছে।
মুন বেগম রেগে বললেন,
— ওই পাগলটাকে সামনে পেলে একেবারে চুল ছিড়ে হাতে ধরিয়ে দিতাম। কতো বড় সাহস আমার ছেলের মাথা ফাটিয়েছে ।
চিত্রা কাচুমুচু হয়ে দাঁড়িয়ে শুষ্ক এক ঢোক গিলল। মুন বেগম আহিরের মাথায় হাত বুলিয়ে,

— যা বাবা রুমে যা, গিয়ে বিশ্রাম নে। আমি তোর জন্য খাবার নিয়ে আসছি।
মুন বেগম সেই অগ্যাত পাগলটাকে বকতে বকতে কিচেনে চলে গেলেন। সকলের শরীর বেশ ক্লান্ত তাই আর কথা না বাড়িয়ে যে যার যার রুমে চলে গেল।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল, সূর্যের তাপ অনেকটা কমে এসেছে। আহির রুমে বসে বসে মোবাইল দেখছিল। হঠাৎ একটা নিউজ চোখে পড়তেই আহিরের দু-চোখ চিকচিক করে উঠল। শুয়া থেকে ফট করে দাঁড়িয়ে দৌড় দিল দরজা খুলতে।দরজা খোলার সাথে সাথে কারোর মাথার সাথে জোরে বারি খেতেই আহির নিজের কপালে হাত দিয়ে আর্তনাদ করে উঠল। মাথায় হাত দিয়ে সম্মুখে তাকিয়ে দেখে আবইয়াজ দাঁড়িয়ে আছে। আবইয়াজে দেখে আহির তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বলল,

— তোরা দুই ভাই-বোন মিলে কি ঠিক করেই নিয়েছিস আমার মাথাটা আস্ত থাকতে দিবি না?
— তোর মাথার গুস্টি কিলাই । একটা তাজা খবর আছে।
— রাখ তোর তাজা খবর আগে আমার কথা শুন।
আহির হাতে থাকা মোবাইলটা আবইয়াজের সম্মুখে উচিয়ে বলল,
— এটা দেখ।
আবইয়াজ আহিরের মোবাইলে নিউজটা দেখে নিজের ফোন আহিরের সামনে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
—- এটা দেখ। মাত্র ত্রিশ মিনিটের মধ্যে নয়শত প্লাস অর্ডার ।
আহির আবইয়াজ খুশিতে একে অপরের কাধ জড়িয়ে হৈই হৈই করে গুল গুল ঘুরতে আরম্ভ করেছে। তখনের আবইয়াজদের করা কাহিনী কেউ একজন ভিডিও করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিয়েছে ।তারউপর আহিরের গুলি লাগার বিষয়টা নিউজে ছড়িয়ে পড়েছে। অনলাইন পেইজের এমন উদ্ভট নাম দেখে অনেকে আকৃষ্ট হয়ে দ্রুত অর্ডার দিচ্ছে।
দুদিন পেরোলো, এই দুদিনে এক লাখের উপর ইনকাম হয়েছে ওদের। মাহির ও ইতোমধ্যে তার ও ননীর ব্যাপারে বাড়িতে জানিয়েছে। এদের অবস্থা দেখে আনোয়ার মির্জার কপালে হাত। কিন্তু কিছু করার নেই শর্ত সাপেক্ষে এখন ওদের বিয়ে দিতে হবে। অর্ক ও মাইরার বিয়ে নিয়ে কোনো আপত্তি ছিল না মির্জা বাড়ির কারোর । তাই চারজনের বিয়ের ডেট একসাথে ঠিক করা হলো। কিন্তু এতোকিছুর ভিতর বেকে বসল মেহু ।সে কিছুতেই আবইয়াজকে বিয়ে করবে না। মেহুর এই বিয়েতে মত নেই শুনে আনোয়ার মির্জা কাঠকাঠ স্বরে বলে দিয়েছেন মেহুর বিয়ে আবইয়াজের সাথে দেয়া হবে না। মেহুর বেকে বসা পছন্দ হলো না তার মা ও বাবার। সায়মা বেগম অনেক বুঝিয়েছে কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।
মেহু বিয়ে করতে রাজি না শুনেই আবইয়াজ রেগে মেহুর রুমে এসে ওকে দেওয়ালের সাথে চেপে ধরে দাতেঁ দাঁত পিষে বলল,

— তোর সাহস হয় কি করে বিয়ে করবি না বলার?
মেহু দ্বিগুণ রেগে বলল,
— কেনো বিয়ে করব আমি তোমায়?
— কজ উই লাভ ইচ আদার।
মেহু তাচ্ছিল্য হেঁসে বলল,
— লাভ? যখন বছরের পর বছর আপনার পিছন পাগল কুকুরের মতো ঘুরে বেড়াতাম তখন কোথায় ছিল আপনার লাভ? যখন ভালোবাসার আবদার নিয়ে আপনার সামনে বারবার হাজির হতাম আর আপনি আমার ভালোবাসাকে অপমান করে তাড়িয়ে দিতেন তখন কোথায় ছিল আপনার লাভ? আপনার মুখে ভালোবাসার কথা মানায় না মি. আবইয়াজ।
আবইয়াজ এবার নরম হয়ে এল। হালকা হয়ে এল তার হাতের বাঁধন। আবইয়াজ নরম আদুরে স্বরে বলল,
—- আমি জানি আমি তোর সাথে অনেক খারাপ করেছি। তোর ভালোবাসাকে নিছক বয়সের পাগলামি বলে চালিয়ে দিয়েছি, কিন্তু এখন তো আমিও তোকে ভালোবাসি আর আগের কৃতকর্মের জন্য খুবই অনুতপ্ত।

—- সময় ফুরিয়ে অনুতপ্ত হলে লাভ কি?
আবইয়াজ অবুঝ শিশুর ন্যায় মেহুর চোখের দিকে তাকিয়ে শুধাল,
— মানে!!
মেহু বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে, রিনরিনিয়ে বলল,
— আমি আপনাকে না আহনাফ ভাইকে বিয়ে করতে চাই।
মেহুর কথা শুনে আবইয়াজের মাথায় যেনো বাঁজ পড়ল। সে মেহুকে ছেড়ে দুকদম পিছিয়ে গেল।অতঃপর সেভাবে দাঁড়িয়ে বলল,
— মানে আমি আগেই সঠিক ছিলাম। আমার প্রতি তোর ফিলিংস ছিল খনিকের। নাহলে কি এতো তাড়াতাড়ি আমাকে ভুলে নিজের হৃদয়ে অন্যকে স্থান দিতে পারতি?
আবইয়াজ হঠাৎ রেগে এসে মেহুর কাধঁ ঝাঁকিয়ে রাগান্বিত স্বরে বলল,

— যখন অন্য কারোর-ই হতে চাস তাহলে আমাকে নিজের জন্য পাগল বানালি কেনো? কেনো নিজের প্রতি আমাকে এডিক্টেড করলি? কি করিনি আমি তোর জন্য? ফোচঁকা ওয়ালা থেকে তরমুজ বিক্রেতা। দিনের পর রাত চিন্তায় ঘুমাতে পারিনি,আর এখন তুই বলছিস আমাকে না তোর আহনাফকে চাই।
আবইয়াজ হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে মেহুর চোয়াল জোরে চেপে বলল,
— এই জানোয়ার তোর কয়টা লাগে হ্যাঁ?
আবইয়াজের এই রূপ আগে কখনো দেখেনি মেহু। মেয়েটা ভয়ে কেমন থরথর করে কেপেঁ উঠল ।তবুও দমল না । ঝাটা মেরে আবইয়াজের হাত সরিয়ে ওর দিকে আঙুল তাক করে বলল,
— মুখের ভাষা সংযত রাখবেন। নিজের এসব রাগ, দাম্ভিকতা আমার সামনে দেখাবেন না।
আবইয়াজ শূন্য চোখে মেহুর দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। আবইয়াজ যেতেই মেহু শুষ্ক ঢোক গিলল ।মনে শুধু সংশয় দানা বাধঁলো, সে কি একটু বেশি-ই করে ফেলেছে?
মেহুর ভাবনার মাঝেই দরজা ঠেলে হুরমুর করে রুমে ঢুকে পড়ল চিত্রা ও ননী । চিত্রা সামান্য রেগে মেহুকে বলল,
— এতো সাধনার পর যখন ভাইকে পাওয়ার সময় হলো এখন কেনো মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিস তুই মেহু? এই আবইয়াজ ভাইয়াকে পাওয়ার জন্য কতো কি-ই না করলি, নিজেকে পরিবর্তন করলি ভুতের এক্টিং করে সিম্থালি কামালি আর এখন কিনা বলছিস আহনাফকে বিয়ে করবি?
মেহু ভ্রু উচিয়ে বলল,

— আমাকে দেখে কি তোমার ভাতারি মনে হয়? যে একজনের পর আরেকজনের কাছে যাবো?
— তাহলে বিয়ে করতে নিষেধ করছিস কেনো?
মেহু ভ্রু কুঁচকে বলে উঠে,
— আমাকে তো কম ঘুরায়নি তোমার ভাই। এখন আমার পালা। একটু হার্ট অ্যাটাক দিব তারপর বিয়ের দিন পিরিতে বসিয়ে বিয়ে করে ফেলবো।
চিত্রা ঠোঁট কামড়ে জিজ্ঞেস করল,
—- তাহলে আব্বু যে বলল তোর আর আহনাফের বিয়ে?
মেহু শয়তানি হাসি দিয়ে বলল,
— ওটা আমি বড় আব্বুকে শিখিয়ে দিয়েছি ।সব আমাদের প্ল্যান। দেখোই না বিয়ের দিন তোমার ভাইকে কেমন চমক দেই।

— আমার মনে হচ্ছে তোরা এখন একটু বেশি-ই বাড়াবাড়ি করছি । দেখিস সবকিছু যেনো হিতে বিপরীত না হয়ে যায়।
এক শ্বাসে কথাগুলো বলে বেরিয়ে গেল চিত্রা। তার পিছু পিছু ননী ও গেল। এদিকে মেহু পরেছে দুটানায় । মন বলছে এমন করিস না, আবইয়াজকে বলে দে তুই ও উনাকে আগের মতোই তীব্র ভালোবাসিস। কিন্তু মস্তিষ্কে বলছে সে এতটুকু ডির্জাভ করে । মন ও মস্তিষ্কের দুটানার মাঝে মস্তিষ্কে জিতে গেল। আর মেহুর এই সিদ্ধান্ত তার কাল হয়ে দাঁড়াল।
করিডর দিয়ে হাঁটার সময় ননীর দেখা হয় মাহিরের সাথে। মাহিরকে দেখে ননী লাজে বেবি হেয়ারগুলো কানের পিছনে গুজে দিল।মাহির হেঁসে ননী গা ঘেসে দাঁড়াল ।হুট করে কিছু একটা মনে পড়তেই মাহির ননীর সামনাসামনি দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,

— আচ্ছা সেদিন তুমি কাকে বলছিলে তুমি একসাথে দুটো ছেলেকে সামলাতে পারবে না তাই আগে একটাকে দিয়ে ট্রাই করবে তারপর আরও বাড়াবে?
মাহিরের প্রশ্ন শুনে ননীর কিছু মনে করার চেষ্ঠা করল, অতঃপর হেঁসে বলল,
— ও আচ্ছা ওটা! ওটাতো আমি আমার এক ফ্রেন্ডকে বলছিলাম। দুটো ছেলেকে পড়ানোর অফার পেয়েছিলাম কিন্তু ছেলেগুলো যা দুষ্টু তাই ভাবলাম আগে একটাকে পড়িয়ে দেখি যদি পারি তবে আরও বাড়াব। কিন্তু আপনি হঠাৎ এই কথা জিজ্ঞেস করলেন?
— না এমনি। আর তোমাকে বের হয়ে কাউকে পড়াতে হবে না, শুধু নিজের স্টাডিতে মনোযোগ দাও।
ননী মাথা নাড়িয়ে সায় জানিয়ে বলল,
— ঠিক আছে।

দুদিন পেরিয়েছে কিন্তু আবইয়াজের দেখা পায়নি মেহু। ভেবেছিল আবইয়াজ আসবে ওকে মানানোর চেষ্টা করবে কিন্তু কিছুই হচ্ছে না। এদিকে বিয়ে উপলক্ষে ননীর বাবা মা দাদি চাচা-চাচি, বোন সবাই মির্জা বাড়িতে হাজির। আনোয়ার মির্জা কাটকাট স্বরে বলে দিয়েছেন বিয়ে এই বাড়িতেই হবে। ননীর বাবা প্রথমে অমত পোষন করলে ও পরে রাজি হয়ে যান। অন্যদিকে অর্কের মা বাবা ও বাংলাদেশে চলে এসেছে।
আজ রাতে মেহেদি পড়ানো হবে। চার কনে সুন্দর করে সেজেগুজে বসে আছে ।হাতে তাদের মেহেদি পরিয়ে দেয়া হচ্ছে। সবার মন আনন্দে ভরে থাকলে ও মেহুর চোখ শুধু আবইয়াজকে খুঁজে চলেছে । কিছুক্ষণ পর মেহুর নজর পরে অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা আবইয়াজের দিকে। কালো পাঞ্জাবি, সাদা পা -জামাতে সুর্দশন লাগছে আবইয়াজকে । আবইয়াজ শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেহুর দিকে। মেহু কেনো যেনো সেই দৃষ্টির দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারল না। সাথে সাথে দৃষ্টি নামিয়ে নিলো। ওদের এমন চোখাচোখি দেখে ফেলে পাশে বসে থাকা চিত্রা। চিত্রা মেহুর কানের কাছে ঝুকে বলল,

— মেহু আমার মন বলছে কিছু একটা হতে যাচ্ছে। প্লিজ এই ড্রামা থামা, ভাইয়াকে বলে দে তোর আহনাফের সাথে না ভাইয়ার সাথে বিয়ে হচ্ছে।
মেহু কিছু বলল না। স্রেফ নির্বাক দৃষ্টিতে মেহেদীর দিকে তাকিয়ে রইল। অতঃপর শান্ত স্বরে মেহেদি আর্টিস্টকে জায়গা দেখিয়ে বলল,
— এখানে আবইয়াজ লিখে দিন।
পরদিন মির্জা বাড়িতে বিয়ের আমেজ। সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত। ছেলে মেয়েরা রুমে রেডি হচ্ছে। আত্নীয় স্বজনদের খাওয়ার পালা চলছে। ননী, মাইরা, মেহু, চিত্রা একই সাজ সেজেছে । মেয়েদের পরনে মেরুন রঙের শাড়ি, ম্যাচ করা অর্নামেন্টস । ছেলেরা পড়েছে কালো পাঞ্জাবি।
একে একে সবাই হাজির হলো হলরুমে। শুধুমাত্র উপস্থিত নেই আবইয়াজ। আবইয়াজকে না দেখে মেহুর কপাল কুঁচকে গেল। পর মুহূর্তে ভাবল হয়তো আসছে । কাজী বিয়ে পরানো শুরু করলেন। প্রথমেই বিয়ে হলো অর্ক ও মাইয়ার। কিন্তু এ পর্যায়ে এসে আবইয়াজকে দেখতে না পেয়ে অস্থির হলো মেহুর মন। মেহু সেই অস্থিরতা নিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আহিরকে জিজ্ঞেস করল,

—— আহির ভাই, আবইয়াজ ভাই কোথায়?
আহির ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
— তুই আবইয়াজকে দিয়ে কি করবি?
— বর উপস্থিত না থাকলে বিয়ে কিভাবে করব?
— কিন্তু তোর বর তো আহনাফ।
—- আহনাফ বা উনার ফ্যামিলির কাউকে দেখছেন এখানে? আমার বিয়ে আবইয়াজ ভাইয়ের সাথেই। এখন সব কথা দিয়ে আগে বলুন উনি কোথায়?
আহির সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে মেহুর দিকে তাকিয়ে পকেট থেকে একটা কাগজ বের করল। অতঃপর মেহুর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,

— আবইয়াজ যাওয়ার আগে এটা তোকে দিতে বলল।
মেহু কপালে ভাজ ফেলে চিঠিটা খুলে পড়তে আরম্ভ করল।
প্রিয় মেহু,
কি এতো সুন্দর সম্বোধনে অবাক হচ্ছিস? অবশ্য হওয়ার-ই কথা, কতো সময় কতো নামে তোকে ডেকেছি হিসেব ছাড়া, তাই ভাবলাম শেষ বেলায় তোর নামটাই লিখে যাই।জানিস কি লিখব সেটা ভাবতে ভাবতেই একদিন লাগিয়েছি । তোর জন্য একটা খুশির সংবাদ আছে, সেই সুবাদে এই চিঠি লিখতে বসা । আমি চলে যাচ্ছি দূর প্রদেশে যেখান থেকে হয়তো আর কোনোদিন ফিরে আসা হবে না। আর হ্যাঁ কোনোদিন আর কারোর সাথে যোগাযোগ করব না। তোকে অন্য কোনো পুরুষের পাশে দেখতে পারবনা, সে জায়গায় তোর অন্য পুরুষের সাথে বিয়ে কিভাবে সহ্য করব ভেবেছিস? তাই ভাবলাম একেবারে দূরে সরে যাই আর যাই হোক তোর সুখে আমি কাটা হতে চাই না। জানিস চিঠিটা লিখতে সারা শরীর খুব বাজেভাবে কাপছেঁ, আমি কিভাবে থাকব তোদের ছাড়া আমার বাকিটা জীবন? চোখের পানি কিছুতেই আটকে রাখতে পারছি না। আমি বড্ড দেরি করে ফেলেছি তোকে ভালোবাসতে তাই না? সময় ফোরালে নাকি মানুষ সবকিছু টের পায় কিন্তু এই অবেলায় টের পেয়ে কি লাভ? তোকে তো আর কোনোদিন পাওয়া হবে না। আজ অন্য পুরুষের হাত ধরে নতুন জীবনে পদার্পণ করবি, তুই বোধ হয় খুব খুশি তাইনা? কিন্তু তোর এই খুশি আমার সহ্য হচ্ছে না বিশ্বাস কর। বুকটা খুব কাপঁছে খুব।
যাকগে বেশি কিছু বলে তোর আজকের এই খুশির দিনটা নষ্ট করতে চাইনা না আমি। শুধু এতটুকুই চাইব তুই সুখে থাক, খুব সুখে থাক। চিরবিদায়।

তোর অপ্রিয়,
আবইয়াজ..
চিঠিটা পড়ে মেহুর মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। পড়ে যেতে নিলে সে পাশে থাকা আহিরের হাত আকড়ে ধরে। ততক্ষণে মেহুর হাতে থাকা চিঠিটা মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে । মেহুকে পড়ে যেতে দেখে সায়মা বেগম দৌড়ে এসে মেয়ের হাত ধরে বললেন,
— কি হয়েছে মা তোর? শরীর খারাপ লাগছে?
মেহু জলে টুইটুম্বুর চোখ নিয়ে মায়ের দিকে তাকাল। অতঃপর অস্ফুটস্বরে আওড়াল,
— আম্মু আবইয়াজ ভাই ।
আনোয়ার মির্জা এদিকে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন,
— আবইয়াজ আবার কি করেছে?
মেহু একমুহুরতো থামে । হঠাৎ মাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— আম্মু আমার আবইয়াজ ভাইকে এনে দাও। উনি চলে যাচ্ছে আম্মু ।উনি চলে যাচ্ছে আমার উপর অভিমান করে ।উনাকে আটকাও।
আনোয়ার মির্জা সন্দিহান চোখে আহিরের দিকে তাকাল। আহির আনোয়ার মির্জার দৃষ্টি বুঝতে পেরে শান্ত অথচ গম্ভীর স্বরে বলল,

— আজকে রাত নটায় আবইয়াজের ফ্লাইট।
আনোয়ার মির্জা বিস্ময়ে হতবিহব্বল হয়ে পরলেন। অর্ক তরিগরি হাতে থাকা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় দেখে বলল,
— এখন আটটা বাজে। মানে আমাদের হাতে শুধু এক ঘন্টা বাকি আছে আবইয়াজকে যাওয়া থেকে আটকানোর।
আহির ঠোঁট কামড়ে বলল,
— আবইয়াজ একবার চলে গেলে আর ওকে পাওয়া যাবে না।
আহির ফট করে মেহুর মাথায় গাট্টা মেরে বলল,
— দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফ্যাচ ফ্যাচ না করে জলদি চল গাধি । তুই যে ব্লান্ডার করেছিস ওটা তোকেই ঠিক করতে হবে।
আহির দ্রুত পায়ে বেরিয়ে যেতে নেয় তার পিছন পিছন মেহু যাওয়া শুরু করে। হাঁটার গতি হুট করে থামিয়ে আহির মাহিরের দিকে তাকিয়ে বলল,
—- আমি মেহুকে নিয়ে বাইকে করে যাচ্ছি। তাড়াতাড়ি পৌঁছাতে পারব। তুই বরং ওদের গাড়ি করে নিয়ে আয়।
আবার মেহুর দিকে তাকিয়ে বলল,

— চল তাড়াতাড়ি।
আহির বাইকে বসেছে তার পিছনে মেহু। আহির সর্বোচ্চ স্পিডে বাইক চালাচ্ছে । তাদের পিছনে আছে মাহিরদের গাড়ি। আহির ভয়ংকর স্পিডে বিভিন্ন গাড়ি ক্রস করে বাইক চালাচ্ছে।
অন্যদিকে সবাই আহিরের পিছন পিছন এয়ারপোর্টে গেলেও অর্ক মাইরাকে যেতে দেয়নি। মাইরা যেতে নিলেই অর্ক তার হাত চেপে ধরে রুমে নিয়ে যেতে যেতে বলল,
—- অনেক অপেক্ষা করেছি বউ, আর না। ওদেরকে ওদের ছেলে, ভাই, শোয়ামীকে আনতে দাও আর আমাকে বাসর করার সুযোগটা দাও।
এদিকে গত দশ মিনিট ধরে জ্যামে আটকে আছে আহির। বিরক্তিতে মেজাজ বিগড়ে যাচ্ছে । আর মেহুর কান্না তো বন্ধ হওয়ার নামই নেই । পিছন থেকে মাহির গাড়ির জানালা দিয়ে মুখ বের করে,
— আস্তে চালা ভাই এক্সিডেন্ট করবি তো । মরবি তো মরবি সাথে আমার বোনটাকে নিয়ে মরবি ।
মাহিরকে আর কিছু বলার সুযোগ দিল না আহির। চিপাচাপা দিয়ে হাই স্পিডে বাইক চালিয়ে নিয়ে গেল। মাহির হা হয়ে ওদের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
আফসোসের কথা হলো এতো চেষ্টার পরও ওরা সময় মতো এয়ারপোর্টে পৌছাতে পারেনি । মেহু যখন বাইক থেকে নেমে একটু সামনে আগাল তখনই দেখল তার মাথার উপর দিয়ে প্লেনটা উড়ে চলে যাচ্ছে। মেহু সেদিকে তাকিয়ে থেকে ধ্বপ করে মাটিতে বসে পরল। আহির প্লেনটার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ডান হাত উপর থেকে নিচে ঝাঁকিয়ে বলল,

—- শিট!!!
মির্জা বাড়ির সদস্যরা ততক্ষণে আহিরদের কাছে এসে হাজির। মেহু ও আহিরের অবস্থা দেখে সবাই বুঝে যান কি হয়েছে। ফিরোজা বেগম কেঁদে দিলেন। কাঁদতে কাঁদতে আনোয়ার মির্জাকে বললেন,
—- আমার ছেলেটা কোথায় গেল। কিভাবে পারল মাকে ছেড়ে চলে যেতে। সব হয়েছে আপনার জন্য, আমার ছেলেটাকে এতো কষ্ট দিয়েছেন সে সহ্য করতে না পেরে চলেই গেল। আমার বুকটা খালি করে আমার ছেলেটা চলে গেল। আমার ছেলেকে এনে দাও।
আনোয়ার মির্জা শূন্য চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। সব উনার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। শুধু বুকে চিনচিন ব্যথা অনুভব হচ্ছে। নিজের ছেলের সাথে যে বড় অন্যায় করে ফেললেন তিনি। চিত্রা ননীর পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। তার ভাইয়া কি আর সত্যিই ফিরবে না?
মেহু তাকিয়ে আছে দূর সেই আকাশের দিকে যেখানে রাতের সেই তারারা মিটিমিটি আলোয় জ্বলছে । মেহুর চোখে শুধু ভাসছে আবইয়াজের কথাগুলো । আবইয়াজ তো বলেছে আর কোনোদিন দেখা হবে না, কথা হবে না তবে কি সেদিন রাতেই ছিল তাদের শেষ দেখা শেষ কথা? ভাবতেই মেহুর হৃদয়টা অসম্ভব ব্যাথায় সিক্ত হলো । তবে কি সে একটু বেশি-ই কষ্ট দিয়ে ফেলেছে লোকটাকে?

মেহু নিস্প্রভ চোখে সবার ভেজা নয়নে তাকাল। আচ্ছা সব দোষ তো তারই। তার জন্যই তো আবইয়াজ দেশ ছাড়ল আর এখন সবাই কাঁদছে। তার কি বেঁচে থাকার অধিকার আছে? না নেই তো। মেহু ধীরগতিতে বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। অতঃপর টলমল পায়ে এগিয়ে যেতে লাগল দ্রুত গতিতে চলা গাড়ির রাস্তার দিকে। অথচ আবইয়াজের চলে যাওয়ার শোকে কেউ খেয়াল-ই করল না মেহুর দিকে।
ঠিক তখনই অদূর থেকে ভেসে এল গানের সুর,

মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ৩৮

রাতে জান্দের আলো ঝরে বন্ধু
বন্ধু তোমারও ঘরে
হায় আলো যে জ্বলে না
আমি একলা আন্ধারে
বন্ধু বিব্রতী দে না, আমি খুঁজি তোমারে
তুমি কোথায় আছো কোথায়, দেইখা যাও আমারে

মন পবনে বৃষ্টি শেষ পর্ব