Home মন পবনে বৃষ্টি মন পবনে বৃষ্টি শেষ পর্ব

মন পবনে বৃষ্টি শেষ পর্ব

মন পবনে বৃষ্টি শেষ পর্ব
তাসনিয়া নুর

মেহু বেঘুরে হেঁটেই চলেছে, চারদিকের কোনোরূপ শব্দ তার কানে পৌছাচ্ছে না । যখনই মেইন রোডে পা রাখতে যাবে অমনি বলিষ্ঠ
শক্তপোক্ত একজোড়া হাত তাকে হেচঁকা টান মেরে বুকে মিশিয়ে নিল। পরিচিত সুঘ্রান নাকে পৌঁছাতেই মেহুর বুকটা ধ্বক করে উঠল। তরিগরি মেহু সেভাবে থেকেই ছলছল নয়নে মাথা উচিয়ে তাকাল। আবইয়াজ মুচকি হেঁসে তার দিকে তাকিয়ে আছে । মেহু নিঃশব্দ কিছুক্ষণ স্বরে কান্না ভেজা স্বরে বলল,

—- আ.. আপনি যাননি?
— কেনো চলে গেলে খুশি হতি?
মেহু আজ রাগলো না। জলে থৈ থৈ নয়নজোড়া আবইয়াজের চোখে রাখল। অতঃপর আবইয়াজের গালে আলতো স্পর্শ করে শান্ত স্বরে বলল,
— খুশি হলে কি মরতে আসতাম?
আবইয়াজ শয়তানি হেঁসে বলল,
—- তাহলে আপনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালাম নাকি ম্যাডাম?
মেহু দু-ভ্রু কোঁচকে,
— আপনি চান আমি মরে যাই?
—- অন্যের স্ত্রী হওয়ার চেয়ে তোর মরে যাওয়া অনেক ভালো।
মেহু বোধ হয় এবার কেঁদেই ফেলবে, কোনো রকমে কান্নাগুলোকে গিলে বলল,
— অন্যের স্ত্রী কেনো হব? আমি শুধু আপনার। আপনাকে ছাড়া অন্য কোনো পুরুষকে নিয়ে চিন্তা ও করিনি বিয়ে করা তো দূরের ব্যাপার।
আবইয়াজ কিছু বলার জন্য মুখ খুলবে ঠিক তখনই আনোয়ার মির্জা গলা খাকাড়ি দেন। আনোয়ার মির্জাকে দেখে মেহু আবইয়াজের কাছ থেকে ছাড়া পাবার জন্য ছটফট করতে থাকে, কিন্তু আবইয়াজ তাকে ছাড়ে নি। এতো মানুষের ভিড়ে ছেলের এমন বেহাইয়াপনা দেখে চোখ রাঙালেন আনোয়ার মির্জা, কিন্তু আবইয়াজ দেখেও যেনো দেখল না এমন ভাব। আবইয়াজকে সশরীরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চিত্রা বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করল,

— ভাইয়া তুমি যাওনি?
পাশ থেকে আহির চিন্তার ভাব করে নাটকীয় স্বরে বলল,
— কেনো? আবইয়াজের কোথাও যাওয়ার কথা ছিল নাকি?
আহিরের এমন কথা শুনে চোখ বড় বড় তার দিকে তাকাল সবাই । ননী বিস্ময় নিয়েই জিজ্ঞেস করল,
— আবইয়াজ ভাইয়া চলে যাচ্ছে আপনি-ই তো বলেছিলেন ।
— না আমিতো বলিনি। শুধু শুধু বলেছি আবইয়াজের ফ্লাইট আজকে, আমি কি একবারও বলেছি আবইয়াজ চলে যাচ্ছে?
আবার মাহিরের দিকে তাকিয়ে,
— কিরে মাহির আমি একবারও বলেছি?
— না তো।
এদের এভাবে পল্টি নিতে দেখে বিস্ময়ে হতবাক সকলে । আনোয়ার মির্জা কঠিন চোখে তাকিয়ে চাপা রাগ মিশানো কন্ঠে বললেন,

— এখানে হচ্ছেটা কি? আবইয়াজ যখন যাচ্ছে না তোমরা জানোই তাহলে এভাবে আমাদের এখানে কেনো নিয়ে এসোছো? এতো কাহিনীর মানেটা কি? শুধু শুধু আমাদের হয়রানি কেন করলে?
আবইয়াজ মেহুকে নিজের বাহু থেকে সরিয়ে দু-হাত পকেটে গুজে টানটান হয়ে দাঁড়ায়। অতঃপর ব্যঙ্গ স্বরে বলে,
—- নিজেরা এতো বড় নাটক সাজালেন ওটা ঠিক, আর আমরা আপনাদের নাটকের উপর সামান্য নাটক সাজালাম ওটা আমাদের অন্যায় হয়ে গেল? নিজের বেলা ষোলো আনা আমাদের বেলায় এক আনা।
— তার মানে এসব আপনাদের সাজানো নাটক ছিল?
মেহুর প্রশ্ন শুনে তার দিকে তাকাল আবইয়াজ। মেহুর চোখে চোখ রেখে শান্ত স্বরে বলল,
— হ্যাঁ ।
মেহু একটা ঢোক গিলে,
— আপনার এই নাটকের জন্য আমাদের অবস্থা কি হয়েছে ডু ইউ হ্যাভ অ্যানি আইডিয়া?
আবইয়াজ একই তেজ দেখিয়ে বলল,
— আর তোদের জন্য এ কটা দিন আমার উপর দিয়ে কি গিয়েছে ডু ইউ হ্যাভ অ্যানি আইডিয়া?
ওদের তর্কের মাঝে চিত্রা একটা জিনিস বুঝতে না পেরে, দু-হাত সামান্য উপরে তুলে বলল,
— ওয়েট, ওয়েট, ওয়েট, কিন্তু তোমরা কিভাবে আমাদের প্ল্যান সম্পর্কে জানলে?
আবইয়াজ ঠোঁটে কুটিল হাসি টেনে বলল,

— সেদিন মেহুর রুম থেকে আমি বের হওয়ার পর তুই ওর কাছে গিয়েছিলি। ঠিক সে সময় মাহির ও ওর রুমের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল। যার দরুন তোদের সব কথা মাহির শুনে ফেলে, তারপর আমাদের বলে। তোদের মতো কূটনী মহিলা আর একটা দেখিনি বিশ্বাস কর। এতো কূটনামি নিয়ে রাতে ঘুমাস কিভাবে? পেট ব্যাথা করে না?
চিত্রা গাল ফুলিয়ে চিৎকার করে,
— ভাইয়া!!!
আহির ওকে ভেঙিয়ে নাটকীয় স্বরে বলে,
— ভ্যাইয়া।
— থুর বাল, হুদায় নিজের চোখের পানি নষ্ট করলাম।
চিত্রার কথা শুনে আহির দাতঁ দিয়ে ঠোঁট কামড়ে তাকে ভেঙিয়ে দেয়। চিত্রা রেগে আহিরের পিঠে কয়েক ঘা লাগিয়ে দিল।
আনোয়ার মির্জা গমগমে স্বরে বললেন,

— আহ তোমরা থামো।এখানে আর সিন ক্রিয়েটিভ করো না ।বাসায় চলো।
— কষ্ট করে বাসায় গিয়ে আবার বিয়ে করব নাকি? এখন এখানেই বিয়ে করব আমি।
আবইয়াজের উত্তরে আরেকদফা আশ্চর্য হলো সকলে । আনোয়ার মির্জা খ্যাক করে উঠে বললেন,
— এখানে কিভাবে বিয়ে করবে তুমি? কাজি কোথা থেকে পাবে? মজা করো আমাদের সাথে?
আবইয়াজের সোজা প্রতুত্তর,
— কাজি আমি সাথে করেই নিয়ে এসেছি।
বলতে বলতে আহির কাজিকে সাথে নিয়ে হাজির। আনোয়ার মির্জা অনেক বোঝানোর পরও নিজের সিদ্ধান্তে অটল আবইয়াজ ।সে এখানে এই মুহূর্তে বিয়ে করবে। শেষে আবইয়াজের জেদের কাছে হার মেনে আনোয়ার মির্জা রাজি হয়ে যান।
কিন্তু মেহুর মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি চেপে বসে। সে শাড়ি সামান্য উচিয়ে ধরে এক দৌড় লাগায়। পিছনে না ফিরেই হেঁসে সকলকে শুনিয়ে জোর আওয়াজে বলল,

— অনেক হয়েছে লাভ ম্যারেজ, কট ম্যারেজ, অ্যারেন্জ্ঞ ম্যারেজ, এবার হবে রানিং ম্যারেজ।
মেহুর কথার মর্মার্থ বোঝতে পেরে আবইয়াজ তৃপ্তির হাসি হাসে, অতঃপর মেহুর পিছন দৌড়ে যাওয়ার আগে কাজি সাহেবকে ইশারা করে । কিন্তু কাজি সাহেব কিছুই বুঝতে পারেনি। আহির তার কাছে এসে বলে,
— এদের পিছনে ছুট লাগান আর বিয়ে পড়াতে আরম্ভ করুন।
আহিরের কথা শুনে কাজি এক হাতে লুঙ্গি অন্য হাতে মাথার টুপি ধরে মেহু ও আবইয়াজের পিছনে ছুট লাগায় । বগলে নিচে তার ফাইল। বহু কষ্টে দৌড়ানোর পর বেচারা কাজি আবইয়াজ ও মেহুকে ধরতে পেরেছে। তিনি তাদের পাশে দৌড়াতে দৌড়াতে হাপাঁতে হাপাঁতে সব কিছু বলে শেষে মেহুকে কবুল বলতে বললেন। মেহু দৌড়াচ্ছে, সে হেসে হাপাঁতে হাপাঁতে বলল,

— কবুল।
মেহু তিনবার কবুল বলার পর আবইয়াজ ও কবুল বলে দেয়। বিয়ে শেষে কাজি দৌড় থামিয়ে ঠাস করে নিচে বসে পড়ে। তারপর আবার চিৎপটাং হয়ে শুয়ে বড় বড় শ্বাস টেনে বলল,
— এমন বিয়ে জীবনে পড়াইনি। জীবন আমার গেল রে। কেউ একটু পানি দে।
মাহির দৌড়ে এসে কাজির মুখের উপর সব পানি ঢেলে দিল। কাজি সাহেব দুহাত বুকে থাপড়াতে থাপড়াতে আজহারি করে বলল,
— পানি খাওয়ার জন্য দিতে বলেছি। মুখে ঢালতে নয় । এ আমি কোন পাগল পরিবারের পাল্লায় পড়লাম , আল্লাহ।
মেহু আবইয়াজ দৌড় থামিয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে হেঁসে ফেলল। আবইয়াজ হাসি থামিয়ে মেহুর চোখে চোখ রেখে বলল,

~যেদিন তোমায় নিয়ে এই হৃদয়ে কাঁপন অনুভব করেছিলাম সেদিন হয়েছিল এই “মন পবনে বৃষ্টি” ~
এদিকে এদের কান্ড দেখে সকলের একসাথে কপালে হাত।
বাড়িতে পৌঁছেছে মির্জা ভিলার সবাই ।আনোয়ার মির্জার মুখ এখনো থমথমে। কাজি সাহেব এখনো তাদের সাথে । বাড়ির ভিতর সবাই প্রবেশ করতে নিবে তখনই আহির চিত্রার হাত ধরে মির্জা ভিলার পিছনে থাকা জারুল গাছটার কাছে যেতে যেতে বলল,
— আবইয়াজ তো রানিং ম্যারেজ করে ইতিহাস গড়ল। আমি পিছিয়ে থাকবো নাকি? কক্ষন না। আবইয়াজ রানিং ম্যারেজ করেছে, আমি করব ট্রি ম্যারেজ।
সকলে একযোগে বলে উঠে,
— মানে!!
আহির ততক্ষণে চিত্রাকে নিয়ে চলে গিয়েছে। আহির চিত্রার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে সবাই তাদের অনুসরন করতে গিয়ে দেখে আহির ও চিত্রা জারুল গাছে উঠে দাঁড়িয়ে আছে। চিত্রাকে শাড়ি পড়া অবস্থায় গাছে উঠতে দেখে ননী বেশ অবাক হলো। শাড়ি পড়ে চিত্রা গাছে কিভাবে উঠল? ননীর ভাবনার মাঝেই আহির তুরি বাজিয়ে কাজীকে উদ্দেশ্য করে বলল,

— এই কাজী তাড়াতাড়ি গাছে উঠে আমাদের বিয়ে পড়ান।
— কিন্তু বাবা আমি গাছে উঠব কিভাবে?
— কেনো আমরা যেভাবে উঠেছি সেভাবে।
বেচারা কাজী আর কি করবে বাধ্য হয়ে এমন মোটা জারুল গাছে উঠার চেষ্টা করতে থাকল। কিন্তু কিছুতেই পারছেনা, এদিকে তার সাহায্য করতে কেউ আসছে না। বহু কষ্টে গাছে উঠে কাজী হাপাঁতে হাপাঁতে আহির ও চিত্রার বিয়ে পরালো। বিয়ে শেষে গাছ থেকে নামার সময় গাছের পিছনে থাকা বড় মই বেয়ে আহির চিত্রা নেমে পরলো। কাজি সেদিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলল,
— এখানে মই আছে? আমাকে আগে কেনো বললে না? তাহলে কি আমি এত কষ্ট করে গাছে উঠি?
আহির ভাবলেশহীন উত্তর দিল,
— আমিতো আপনাকে বলেছি-ই আমরা যেভাবে উঠেছি আপনি ও সেভাবে উঠুন। আপনি কেনো খামোখা গাছ বেয়ে উঠলেন?
কাজি ছ্যাৎ করে উঠে বললেন,

— না বললে আমি কিভাবে জানবো তোমরা কিভাবে উঠেছো?
— আপনি আমাদের জিজ্ঞেস করেছেন?
কাজই আর কি বলবে ফোস করে শ্বাস ফেলে গাছ থেকে নেমে পরলো।
মাহির ইতোমধ্যে ননীর হাত ধরে মির্জা বাড়ির পুকুরে ঝাপ মেরেছে । সেখান থেকে মাহির ননীর হাত ধরে বলল,
—- আমি করব পন্ড ম্যারেজ।
কাজি আর কি করবে পুকুরের পানিতে পা ভিজিয়ে মাহির ও ননীর বিয়ে শেষ করলো। এই বিয়েটা একটু স্বস্তিদায়ক ছিল।
আনোয়ার মির্জা নাক মুখ কুঁচকে ভিতরে চলে গেলেন। সাফিন মির্জা কপাল থাপড়ে বললেন,
— এদের কোন হাসপাতাল থেকে পেয়ে এনেছিলাম কে জানে।

নিস্তবদ্ধ রজনী । ফুলে সাজানো বিছানায় বড় ঘোমটা দিয়ে বসে আছে ননী। নিজের রুমে ঢুকেই দরজাটা লাগিয়ে দিল মাহির । পিছনে ঘুরে খাটের উপর বসে থাকা নিজের বধূকে দেখে পেটে কাতুকাতু দিয়ে উঠে মাহিরের । ক্যাবলার মতো হেঁসে শরীর মোচড়াতে মোচড়াতে ননীর দিকে এগিয়ে যায় সে। ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে বিছানায় বসে পড়ে। আলতো করে ননীর ঘোমটা সরিয়ে মুখটা দেখে নেয়। অবশেষে তার বাসর করার স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে। কিন্তু কাতুকাতু জ্বালায় টিকতে পারছে না বাসর করবে কিভাবে?
ননীকে এভাবে মোচড়াতে দেখে শেষে বিরক্ত হয়ে উঠে ননী। সে বিরক্তি নিয়ে বলল,
— বাদরের মতো এভাবে মোচড়াচ্ছেন কেনো?
— কি করব আমার লজ্জা লাগছে।
— দাঁড়ান আপনার লজ্জা আমি ভাঙাচ্ছি ।
ননী হাঁটু গেড়ে বসে মাহিরকে নিচে শুইয়ে নিজে তার উপর উঠে বসে। অতঃপর মাহিরের গলায় মুখ গুঁজে দিলো । ননীর এমন আকস্মিক কান্ডে মাহির ভড়কে গিয়ে চিৎকার দিয়ে বলল,
— আমার ইজ্জতে হাত দিস না বজ্জাতের হাড্ডিইইইইইই।

আহির বসে বসে চিত্রাকে মন ভরে দেখছে।সারাদিনের এতো এতো কাহিনীর জন্য মন ভরে দেখতে ও পারেনি। এদিকে আহিরের এমন অদ্ভুত দৃষ্টি প্রথমবারের মতো দেখে ভিতরে গলে যাচ্ছে চিত্রা। চিত্রা গলা সামান্য খাকাড়ি দিয়ে বলল,
— এভাবে কি দেখছো?
— তোকে ।
চিত্রা সামান্য কেঁপে উঠল। আহির ধীরে ধীরে চিত্রার কাছে এগিয়ে এল। চিত্রার কানে হিসহিসিয়ে বলল,
— আমি তোমার মাঝে ডুবে যেতে চাই জান।
— আ.. মি.
আহির চিত্রার ঠোঁটে এক আঙুল চেপে ধরে,
— হুশ আর কোনো কথা নয় আজকে আমি সব বলব আর করব তুমি শুধু ফিল করবে।
লজ্জায় আহিরের বুকে মুখ গুজলো চিত্রা। আহির হেসে চিত্রাকে জড়িয়ে ধরল। অতঃপর দুজন বিলিন হলো দুজনায়। দুজনের আত্মা অবশেষে মিলে একাকার হলো।

আবইয়াজ তো রুমে এসে একদন্ড দাঁড়ায়নি। বসে থাকা মেহুকে কোনো কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে তার ওষ্ঠ জোড়ায় নিজের ওষ্ঠ পুড়ে নিয়েছে । আবইয়াজ যখন মেহুর ঠোঁটের উপর নিজের কৃতিত্ব দেখাতে ব্যস্ত তখন তার শক্ত পুরুষালি খরখরে হাত জোড়া অবাধে মেহুর নরম উদরে বিচরন করছে । মেহু আবইয়াজের এহেন স্পর্শ সহ্য করতে না পেরে আবইয়াজের পিঠে নখ দাবিয়ে দিল। একসময় আবইয়াজ মেহুকে ছেড়ে দিতেই মেহু বুকে হাত দিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকে। আবইয়াজ মেহুর একেবারে কাছে এসে হাস্কিস্বরে বলল,
— এতোটুকুতে এই অবস্থা? আর বেশি কিছু করলে কি করবেন ম্যাডাম?
মেহু লজ্জায় মুখ খুলতে পারছে না। কিছু বলবে কিভাবে। মেহুকে লজ্জা পেতে দেখে আবইয়াজ তার দু-গাল আলতো স্পর্শ করে, মেহুর কপালে নিজের ঠোঁট স্পর্শ করে নরম স্বরে বলল,
— ভালোবাসি।
মেহু আবইয়াজের চোখে চোখ রেখে মুচকি হেসে প্রতুত্তর করল,
—- আমিও ভালোবাসি।

ব্যালকনি থেকে পূর্নিমার চাঁদ দেখে চলেছে অর্ক ও মাইরা। অর্ক পিছন থেকে মাইরার পেট জড়িয়ে তার কাঁধে চিবুক ঠেকিয়ে রেখেছে । মাইরাকে এক দৃষ্টিতে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে অর্ক ধীর স্বরে জিজ্ঞেস করল,
— মন খারাপ?
মাইরা সেভাবে তাকিয়ে থেকেই উত্তর দিল,
— আপনি থাকতে আমার আবার কিসের মন খারাপ?
— বিয়ের রাতে বাসর বাসর খেলছিনা তোমার সাথে তাই।
মাইরা রেগে পিছনে ফিরে বলল,
— অসভ্য পুরুষ, সবাইর সাথে আমাকে তখন যেতে না দিয়ে দু দু-বার কি করেছিলেন আপনি হ্যাঁ?
—- ইশশ বউ মনে করিয়ে দিলে।
—- চুপ থাকুন।
অর্ক পিছন থেকে মাইরাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
— ঠিক আছে আজ রাতটা না হয় চন্দবিলাসে কাটাই।

তিনদিন পেরিয়েছে, চার জোড়া কোপতকোপতি মিলে কক্সবাজার এসেছে। বিকেল বেলা সূর্যের তির্যক রশ্মি সমুদ্রের স্বচ্ছ জলে হলদে ভাব সৃষ্টি করেছে। সমুদ্রের পার দিয়ে নানান কথা বলে হেঁটে যাচ্ছে চার জোড়া কাপল । আবইয়াজ মেহুর হাত ধরে সামনে হাঁটছে। আবইয়াজের পরনে ব্লু শার্ট ও সাদা প্যান্ট। চুলগুলো জেল দিয়ে সেট করা। মেহুর পরনে সাদা লেহেঙ্গা ও ব্লু শার্ট, গলায় পেচানো সাদা ওরনা । তাদের পিছনে আহির ও চিত্রা। আজ আহির পরেছে সাদা শার্ট ও ব্ল্যাক বগি জিন্স । চিত্রা ওলিভ গ্রিন টপস ও ব্ল্যাক জিন্স।
তাদের থেকে কিছুদূর অর্ক, মাইরা, ননী, মাহির । মাহির স্কাই ব্লু চেক শার্ট ও অর্ক ব্ল্যাক শার্ট। ননী পরেছে কুর্তি ও জিন্স। মাইরা মেহুর মতো লেহেঙ্গা পরেছে ।
সকলে নগ্ন পায়ে বালুর উপর হেঁটে চলেছে। হঠাৎ একে অপরের দিকে তাকিয়ে কিছু ইশারা করে মুচকি হাসে। আবইয়াজ মেহুর হাত, আহির চিত্রার হাত, মাহির ননীর হাত ও অর্ক মাইরার হাত ধরে আপনমনে খুশিতে দৌড়াতে আরম্ভ করে। দৌড়ানোর এক পর্যায়ে যখন হাঁপিয়ে উঠে তখন সমুদ্রের একেবারে কাছে দাঁড়ায় তারা আটজন ।সমুদ্রের পানি ওদের পা স্পর্শ করে আবার চলে যাচ্ছে । অতঃপর একে অপরের কাধে হাত রেখে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে জোরে চিৎকার করে একসঙ্গে বল উঠে,

— উই আর এইট ইডিয়েটস।
ঠিক তখন পিছন থেকে একজন তাদের এই সুনালি মুহূর্ত ক্যামেরায় ক্যাপচার করে নিল।
নয় বছর পর,
অ্যালবামটা বন্ধ করে চোখের চশমাটা ভালোভাবে পড়ে নিলেন আনোয়ার মির্জা। সোফায় বসে থাকা ছোট খাটো প্রত্যেক মুখ জোড়ায় বিস্ময়ের ছাপ। শুধুমাত্র একজন গম্ভীর মুখ নিয়ে বসে আছে, সে আর কেউ নয় আবইয়াজ ও মেহুর একমাত্র ছেলে আযলান মির্জা। আনোয়ার মির্জার কাছে বসে থাকা ছোট্ট আতুশি তার ডাগর ডাগর চোখ আরো বড় করে আনোয়ার মির্জার দিকে তাকাল। নিজের দু-গালে হাত দিয়ে অবাক কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
—- পাপা এতো দুত্তু চিল?
আনোয়ার মির্জা আতুশির মাথায় হাত বুলিয়ে হেঁসে বললেন,
— শুধু কি দুষ্টু? তোমার বাবা চাচ্চুরা হাড়ে হাড়ে বজ্জাত ছিল।
পাশ থেকে ফিরোজা বেগম চোখ রাঙিয়ে বললেন,
— এসব কি বলছেন বাচ্চাদের?
— ওদের বাপ চাচার কান্ডকারখানার কথা বলছি।
আতুশি গুটি গুটি পায়ে আযলানের কাছে গিয়ে তার হাঁটুতে হাত রেখে বলল,
— চুনেচো আজরাইল ভাইয়া পাপা তাত্তু কত্তো দুত্তু চিল। আর আমি একতু দুত্তুমি কললে চুদু আমালকে বকা দেয়।
আযলান কঠিন চোখে আতুশির দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,
— আরেকবার আজরাইল বললে থাপড়ে একদম সব দাতঁ ফেলে দিব বেয়াদব।
পাশ থেকে আহনাব চিপস খেতে খেতে দাতঁ কেলিয়ে বলল,

— ওর দাঁত আছেই বা কটা যে তুই ফেলবি।
কথাটা বলেই হু হা করে হেসে উঠে আহনাব। আযলান তিক্ষ্ম দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাতেই আহনাব হাসি থামিয়ে নিজের খাওয়াতে মনোনিবেশ করে ।
আহির ও চিত্রার একমাত্র আদরের মেয়ে আতুশি মির্জা। মাহির ও ননীর ছেলে আহনাব মির্জা। অর্ক ও মাইরার মেয়ে অমা শেখ মাশফি ।
মাইরা বিয়ের কিছুদিন পর অর্কের সাথে চলে গিয়েছিল। মাঝে মাঝে বাংলাদেশে এসে কিছুদিন থেকে যায়। এই দুদিন হলো মাইরা অর্ক মেয়েকে নিয়ে এসেছে।
আযলানের বয়স আট বছর অথচ চালচলন খুবই গম্ভীর ।তেমন কথা বলে না কারো সাথে। সারাক্ষণ গম্ভীর ভাব নিয়ে বসে থাকে। আবইয়াজ বুঝে পায়না তার ঘরে এমন ছেলে হলো কিভাবে? কার মতো হলো ছেলেটা। আবইয়াজ যখনই আযলানকে জিজ্ঞেস করে বাপ তুমি কার মত হয়েছো, তখন আযলানের একটাই উত্তর আমি কারোর মতো না আমি নিজের মতোন।
আযলানের 2 মাসের ছোট আহনাব। আহনাব খুবই দুরন্ত, হাসি-খুশি ছেলে । আতুশির বয়স তিন বছর, মাশফি আতুশির ছয়দিনের ছোট ।
হল রুমে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে মির্জা ভিলার সকলে। কেউ বসেছে সোফার উপরে কেউ ফ্লোরে আসন পেতে বসেছে । এমন আড্ডা মুখর পরিবেশে হুট করেই এলোমেলো পায়ে দৌড়ে তাদের সামনে দিয়ে যাচ্ছে আতুশি। আর বহু কষ্টে বলছে,

— পাপা তাত্তু বাতাও ।
আযলান তার পিছু লাঠি নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে বলল,
—- আজ কেউ তোকে আমার হাত থেকে বাঁচাতে পারবেনা। আজরাইল আজরাইল বলিস না? আজকে আমি তোর রূহ বের করেই ছাড়ব।

মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ৩৯

ওদের এভাবে ছুটতে দেখে সবাই কপালে হাত। অতঃপর সশব্দে হেঁসে উঠে সবাই। এটা নতুন কিছু না আতুশি আজরাইল ভাইয়া বলে প্রতিদিন মুখে ফেনা তুলবে আর আযলান লাঠি নিয়ে তার পিছু দৌড়াবে। দৌড়ানোর একপর্যায়ে আতুশি যখন ক্লান্ত হয়ে পড়বে তখন আবার তার ঠাই হবে আযলানের কোলে। আযলান তাকে কোলে নিয়ে খুব সতর্পনে ঘুম পারিয়ে ফেলবে ।
এভাবেই কাটছে দিন, হাসিতে খুশিতে ভড়ে রয় মির্জা বাড়ির পরিবেশ। মির্জা পরিবার সবচেয়ে সুখী পরিবার। এভাবেই সবসময় হাসিতে খুশিতে ভড়ে থাকুক তাদের পরিবার।

সমাপ্ত

1 COMMENT

Comments are closed.