Home বিষাদ ও বসন্ত বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৩০

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৩০

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৩০
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

আদ্রর মা জানালার ধারে বসা। স্বামীর একটু থেকে একটু হলেই যে নারী বিচলিত হতো সে নারীর মধ্যে আজ কোন উদ্বেগ দেখা গেল না। কোন চিন্তা দেখা গেল না। বরং প্রকাশ পেল তাচ্ছিল্য, অবহেলা আর রাগ! আদ্রর মায়ের শরীর ভালো নেই। চোখের নিচে কালি বসেছে এই কয়েকটা দিনেই। হয়তো এই বয়সে স্বামীর এই রূপ দেখতে হবে সে কখনো কল্পনাও করেনি। যে পুরুষটা তাকে এতোটা ভালোবেসেছে বলে আজীবন বিশ্বাস করেছে সে পুরুষের এই বিশ্বাসঘাতকতা কিভাবেই বা মেনে নিবে? আদ্রর মা আকাশের পানে তাকায়। ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি নিয়ে বিড়বিড় করল এবারে,

“ প্রিয় আমজাদ! বিশ্বাস করে৷ তুমি যদি আজ মরেও যেতে আমজাদ। আমি একটুও কষ্ট পেতাম না। বরং, বরং প্রিয় পুরুষের বিশ্বাসঘাতকতা দেখতে দেখতে ক্লান্ত হওয়া এই আমিটা খুব বেশিই খুশি হতাম আমজাদ। তুমি মরে গেলে না কেন আমজাদ? কেন?”
বলেই কিয়ৎক্ষন থামল। ফের আপসোস নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“ আমজাদ? দীর্ঘ এই বত্রিশ বছরের সংসারে তোমার কি আমার প্রতি একটুও মায়া জম্মায়নি আমজাদ? একটুও না? আমায় তুমি ভালোবাসোনি আমজাদ? তাহলে এই দীর্ঘ বত্রিশ বছর কি ছিল? কি ছিল এসব? আমার সাথে তুমি বত্রিশটা বছর শুধু নাটক করেছো আমজাদ? ”
” কিশোরী বয়সের প্রথম প্রেম ছিলে তুমি আমজাদ। প্রথম ভালোবাসা, প্রথম অনুভূতি ছিলে। সেই যুবকটিকে দেখলেই আমার হৃদয়ে তরতাজা এক অনুভূতি ঝাপিয়ে উঠত। বোকা আমি সে যুবকটি বলতে এতোটাই পাগল ছিলাম যে আব্বাকে অব্দি পরোয়া করিনি। যে আব্বার ভয়ে আমি কাঁপতাম, একটু ধমকালেই কেঁদে দিতাম সে আব্বাকে অব্দি ভয় পাইনি। আব্বা, আম্মা, ভাইয়া সবাইকে ঠকিয়ে আমি তোমার হাত ধরে চলে এসেছিলাম আমজাদ। তোমাকে এতোটা বিশ্বাস করেছিলাম আমজাদ। অথচ সেই তুমি..
কি করলে আমজাদ? কেন করলে? ”
আদ্রর আম্মু এবারে কেঁদে ফেলল। জানালার ধারে মাথা ঠেকিয়ে শুধাল,

“ জানো আমজাদ? আমরা বাঙ্গালী নারী রা যায় হোক স্বামীকে ত্যাগ করতে ভয় পাই। একটা সংসার! একটা ঘর,একটা মানুষ! এসব ছেড়ে যেতে মায়া হয় আমজাদ। কতশত বাঙ্গালি নারী আছে যারা দিনের পর দিন স্বামীকে ভালোবেসে সংসার করে যাচ্ছে, স্বামীর সংসারে নিজের সর্বোস্ব দিয়ে বেড়াচ্ছে।অথচ সেই স্বামীদে মনে তাদের নামের একটা অক্ষর অব্দিও নেই। এমন কতশত স্বামী আছে যারা নিজের স্ত্রীকে কখনোই ভালোবাসেনি অথচ সংসার করে যাচ্ছে কত কত কাল! ঐ যে নারীদের সংসারের প্রতি মায়া? সন্তানের প্রতি মায়া? স্বামীর প্রতি মায়া? এই মায়ার কারণেই তো নারীরা ভালোবাসা না পেয়েও দীর্ঘকাল পড়ে থাকে একই সংসারে..”
এইটুকু বলেই আদ্রর মা উঠে দাঁড়াল। কিয়ৎক্ষন স্তব্ধ হয়ে নীল আকাশটা দেখতে নিয়ে মনে হলো মিথির কথা। আচ্ছা, সে নাহয় দীর্ঘকাল সংসার করেছে।বুঝার বয়স হয়েছেে।কিন্তু মিথি? ঐটুকু মেয়েটা মেনে নিতে পেরেছিল স্বামীর প্রতারণা? কষ্ট হয়নি?আদ্র মা এবারেও বিড়বিড় করল,

“ মিথি? কোথাও গিয়ে কি আমার জীবনে তোর অভিশাপ লেগেছে আম্মু? কোথাও গিয়ে আমি তোর জীবনটা নষ্ট করার শাস্তি পাচ্ছি না তো আম্মু? আমি..আমিই তো তোর জীবনটা নষ্ট করলাম মা। তুই তো ফুলের মতোই বাঁচতি। আমি, আমি তোকে সুন্দর একটা জীবন দেওয়ার আশা দেখিয়ে তোকে নরকে ঠেলে দিয়েছিলাম সব জেনেবুঝেই। আমি তো জানতাম আমার ছেলে মুহুকে ভালোবাসে। আমি তো জানতাম আমার ছেলে অন্য একটা মেয়ের জন্য কতোটা পাগল ছিল। তবুও তোকে এনেছিলাম। তোর জীবনটা শেষ করে ফেললাম আম্মু। আমি চাইনি। সত্যিই চাইনি। আমি, আমি তো ভেবেছিলাম আমার ছেলেটা তোর মতো ফুলকে অবশ্যই ভালোবাসবে আম্মু। কিন্তু…”
ঢোক গিলে ফের আবার ও বলল সে আপনমনে,

“ তোর সাথে আমার আর কখনো দেখা হবে আম্মু? আমার যে একবার ক্ষমা চাইতে হবে। একটাবার আমাকে তোর কাছে যেতে হবে। যে ভুলটা আমি করেছি তা নিজ হাতেই ভাঙ্গতে হবে যে আম্মু। ”
ঠিক শেষ মুহুর্তের কথাগুলোই আদ্র শুনতে পেল। আম্মু বলে সম্বোধনটা মিথির জন্যই এমনইটাই ধরে নিল আন্দাজ করে। এগিয়ে এল সে। কিন্তু মায়ের চোখে পানি দেখে এক মুহুর্তের জন্য থমকাল আদ্র। তার মা কাঁদছে?কেন? আব্বুর জন্য? আদ্র মাকে ভালোবাসে। তাই তো মায়ের চোখে পানি দেখে সঙ্গে সঙ্গেই জিজ্ঞেস করল,
“ আম্মু, কাঁদছো তুমি? কার জন্য কাঁদছো? আব্বুর জন্য? ”
আদ্রর মা অন্যমনস্ক স্বরেই শুধাল,
“ হু? ”
“ আব্বু এসেছে, দেখতে যাবে না? ”
এবার আদ্রর মা চোখ মুঁছলেন। দৃঢ় চাহনিতে চেয়ে জানালেন,
” না।”

আদ্র সবসময় দেখে এসেছে আব্বু আম্মুর নির্মল ভালোবাসা। সুন্দর সংসার৷ অথচ সেই আব্বু আম্মুর মাঝে কিছু হয়েছে তা সে স্পষ্টই বুঝতে পারে যেন। কিন্তু প্রশ্ন করে উঠতে পারে না। মাকে সবসময় দেখেছে তার জন্য, বাবার জন্য বিচলিত থাকতে। কিছু থেকে কিছু হলেই কি চিন্তা। অথচ সে মা আজ তার বাবাকে নিয়ে চিন্তা করছে না। সে দ্রুতই জিজ্ঞেস করল,
“ রাগ করেছো আম্মু? তোমাদের কি ঝগড়া হয়েছে? ”
উনি দৃঢ় স্বরে জানালেন,
“ না। আদ্র শোন? আমাকে একটা বার মিথির সাথে দেখা করিয়ে দিতে পারবে? যেভাবেই হোক একবার। আমি ওর কাছে ক্ষমা চাইতে চাই। আমার করা পাপের জন্য ক্ষমা চাওয়াটা জরুরী। যে আমি ওকে সংসারে থেকে যেতে বারবার অনুরোধ করেছি সে আমি সত্যিই আজ ওর কষ্টটা বুঝতে পারছি। আমার ওর কাছে ক্ষমা চাইতেই হবে আদ্র। ”
আদ্র ভ্রু কুঁচকাল। আমরা সম্ভবত জীবনে যাদের প্রতি প্রথমেই রাগ নিয়ে বসে থাকি তাদের প্রতি রাগটাই আজম্ম থাকে। নয়তো অনুতপ্ত হওয়ার আগ অব্দি।আদ্ররও তাই।ওর মনে মায়ের জন্য যেমন ভালোবাসা আছে, তেমন মিথির জন্য একদম প্রথমে জম্মানো ক্ষোভ অবহেলা গুলো এখনো আছে। কেন আছে তা বোধহয় সে নিজেও জানে না। আদ্র আজও মায়ের কথা শুনে রাগল। ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইল,

” তুমি ওর কাছে কেন ক্ষমা চাইবে? ”
” তোমার মতো অমানুষ, চরিত্রহীন একটা ছেলেকে জম্ম দিয়েছিলাম বলে। আচ্ছা আদ্র, তুমি কি কখনো নিজের ভুল বুঝতে পেরেছো বা পারবো? ”
“ কি ভুল?”
আদ্রর আম্মু হাসে। বলে,
“ পাগল কখনো নিজের পাগলামি বুঝে উঠতে পারে না। সে নিজেকে পাগল হিসেবে মানেই না। অপরাধীও কখনো নিজের অপরাধ স্বীকার করে না। ”
আদ্রর আবারও রাগ হলো। মায়ের উপর নয়, মিথির উপর। এই মেয়েটার জন্যই মা তাকে ভালোবাসে না আর।রেগেই বলল,
“তুমি জানো কি হয়েছে? সবসময় ওর জন্য আমায় দোষ দাও কেন আম্মু? কি হয়েছে জানো তুমি? তোমার মিথি অতোটাও সাধু না বুঝেছো? ”

” তুমি সাধু আদ্র?”
“ শোন আম্মু, তোমার মিথি তো আসলেই সে বাচ্চাটাকে রাখেনি আম্মু। সে দিব্যি সুখে শান্তিতে নিজের লাইফ নিয়ে পড়ে আছে। আর তুমি ওর জন্য আপসোস করো। আমায় দোষ দাও”
আদ্রর মা ভ্রু কুঁচকায়। শুধাল,
“ মানে? ”
“ মিথিকে দেখেছি আমি আম্মু। ও বাচ্চাটা এবরশন করিয়ে ফেলেছে সে কবেই।আর তুমি ওর জন্য দুঃখ করো।”
এইটুকু বলেই আদ্র হেঁটে চলে গেল বুক টানটান করে। যেন সে কোন অন্যায় করেনি, কোন দোষ করেনি। সব দোষ ঐ মিথিরই!

প্রায় মাসখানেক পর,
মিথিরা এর দুদিন পরই বাসায় ফিরেছিল। হিয়ার ভার্সিটির ক্লাস শুরু হওয়াতে ও ভার্সিটির দিকেই একটা মেসে শিফট হয়েছে। রিধিরও সামনেই পরীক্ষা হওয়াতে চলে যাবে সে। মিথি বুঝতে পারে তার জন্য রিধি ফিজার পড়ালেখার যে ক্ষতি হয়। এদিক থেকে রিধির জন্য ভালোই হবে চলে যাওয়াটা। হয়তো এই ভেবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মিথির মেয়েটা দিনভর ঘুমে থাকলেও রাত ধরে সে জেগেই থাকে। এদিকে রিধি, ফিজা ওরা মুখে কিছু না বললেও ওদের যে সমস্যা হচ্ছে তা বুঝা যায়।ওদের পড়ালেখা এই সেই মিলিয়ে এমন একটা পরিবেশে যে মানাতে পারবে না এটাই স্বাভাবিক। আবার মিথির ও কেউ নেই। এমন কোথাও তার আশ্রয় নেই যে সে এখান ছেড়ে একা সন্তানকে নিয়ে যেতে পারবে কোথাও হুট করে। মিথি অনেকদিন যাবৎ ভেবেই সিদ্ধান্ত নিল যে একা বাসা নেওয়াটা জরুরী। কোথাও একরুমে বাসা নিয়ে একা থাকলে আর কারোর তেমন বিরক্ত হবে না বলেই ধারণা।
মিথির মেয়েটা আজও রাতের বেলায় ঘুমোয়নি। একটু পর পরই নিজের কিন্নর স্বরের জানান দিয়ে আওয়াজ তুলে কেঁদে উঠছে। মিথি যদিও কোলে করে মেয়েকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে কিন্তু লাভ বিশেষ হলো না। তার মেয়ে শান্ত তো হলোই না উল্টো কান্না দ্বিগুণ হারে বাড়ছে। ফিজার বোধহয় এই কান্নাটা বিরক্ত লাগল। সুবিধা মতো ঘুমোতে না পারার কারণেই বোধহয়। সরাসরি না বুঝালেও মিথিকে বলল,

“ মিথি, ওকে দিনের বেলায় ঘুম পাড়াও কেন? দিনের বেলায় জেগে থাকলে তো রাতে ঠিকই ঘুমাত ও।”
মিথি ফ্যালফ্যাল করে তাকায়। মেয়েকে শান্ত করার চেষ্টা চালিয়ে বলে,
“ আসলে আজই বেশি কাঁদছে আপু। কেন এমন করছে বুঝছি না ঠিক। ”
“ ঘুম পাড়াও। চেষ্টা করো একটু। তাহলে হয়তো আর কান্না করবে না। ”
ফিজা এইটুকু বলেই ফের চোখ বুঝল বোধহয়। মিথি বিপাকে পড়ল।সে নিজেও চাইছে না কেউ বিরক্ত হোক। অথচ উপায়ও নেই। সে তো চেষ্টা করছে। মেয়ের কান্না না থামলে? মিথি উঠে দাঁড়ায়।মেয়েকে কোলে নিয়ে ও জানালার দিকে গেল। প্রতিরাতের মতো আজও কোলে তুলে হাঁটতে হাঁটতে মেয়েকে ঘুম নেওয়াল অনেকটা সময় নিয়ে। কিন্তু লাভ বিশেষ নেই। মিথি জানে, কোল থেকে রাখলেই তার মেয়ে কান্না জুড়বে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েই৷ তাই প্রতিদিনের মতো ওভাবেই মেয়েকে কোলে নিয়ে রাখল।

মিথির মেয়েটা দিনের বেলায় ঘুমায়। আর এই ভরসাতেই মিথি ফিজার কাছে রেখে ফিজারই অফার করা দুটো টিউশন নিয়েছে। সাথে কাছাকাছি একটা মাদ্রাসায় জয়েন হওয়ার জন্য সিভিও জমা দিয়েছে। বাকিটা কি হয় দেখা যাক। ইন্টারের পরের সময়টুকুতে এর চেয়ে বেশি কিছু করার সামর্থ্যও নেই তার৷মিথি আজও মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে ঠিক পাশাপাশি বিল্ডিংটাতেই টিউশনি করতে গেছিল।কারণ ফিজা ছিল তখন৷ ঐ একই বিল্ডিং এ হিমেল আর আয়মানরাও থাকে। মিথি এক ঘন্টা শেষে টিউশনি করিয়ে ফের ফিরেও আসতে নিল। মাঝখানে বিল্ডিং এর সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল আদ্রকে। মিথি ভ্রু কুঁচকায়। আদ্রকে সে এখানে আশা করেনি৷ তবুও কেন? উত্তরটা খুঁজতেই ভ্রু কুঁচকে তাকাল। আদ্র ঠিক তখনই এগিয়ে এল রাস্তায়। বলল,
“ গাড়িতে উঠ মিথি। তোর জন্য অপেক্ষা করছি এতক্ষন যাবৎ। ”
মিথি ফের ভ্রু কুঁচকাল। আদেশ করছে আদ্র? কোন অধিকারে? আদ্র ফের মিথির হাতে টান দিয়ে বলল,
” কি হলো শুনিসনি? গাড়িতে উঠ। আম্মু নিয়ে যেতে বলেছে তোকে। ”,
মিথি রেগে চাইল৷ কপাল কুঁচকে বলল,

“ কি হচ্ছে আদ্র? হাত ধরেছেন কেন? ছাড়ুন। আপনি আমার ঠিকানা পেয়েছেন কি করে হুহ? ”
আদ্র এবার চাইল। বলল
“ তোর সাথে কথা আছে মিথি।”
মিথি ফের তীর্যক স্বরে শুধাল,
“ কি কথা? আপনার সাথে তো আমার কোন কথা নেই আদ্র। হাত ছাড়ুন। ”
“বললাম না কথা আছে? তোকে আমার সাথে যেতে হবে মিথি।”
মিথি বিরক্ত হলো। নাটক করছে আদ্র?হালকা চিৎকার দিয়েই বলল,
“ উহ!হাত ছাড়ুন আদ্র। রাস্তায় এভাবে হাত ধরে টানছেন কেন হুহ? ”
এইটুকু বলেই ঝাড়া দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিল মিথি। আদ্রর এই ভাব দেখানোটা সহ্য হলো না বোধহয়। বলল,
“ তুই, তুই তো সেই নাটকই করলি। বাচ্চাটাকে তো তখন শেষ করলেই হয়ে যেত তাই না? এমন তো না যে তুই বাচ্চাটাকে রেখেছিস। তখন ঐ নাটকটা কেন করেছিলি? ”

“ মানে? ”
আদ্র ভ্রু নাচিয়ে শুধাল,
“ মানে তোর গর্ভে যে ছিল তাকে সেই শেষই করলি তাই না? তো তখন অতো নাটক করেছিলি কেন?”
“ নাটক করিনি আমি।”
“ তোকে আমার সাথে যেতে হবে। আম্মু বলেছে। ”
মিথি দুয়েক পা পিছিয়ে দাঁড়াল। স্পষ্ট স্বরেই বলল,
“ কেন যেতে হবে আগে তা বলুন। আমাকে তো ফুফু বলে নি। বললে আমি নিজেই যাব। ”
আদ্র বিরক্ত হয়ে তাকাল। ফোন বের করে মাকে কল দিল। অতঃপর কল দিয়েই বলল,
“ আম্মু? কথা বলো। ’
ফোনটা এগিয়ে দিল সে। ভাবটা তার এমন যেন ওকে জোর করে পাঠিয়েছে কেউ। মিথি ফোনটা নিল। ওপাশ থেকে আদ্র মা ক্লান্ত গলায় বলল,
“ মিথি? আমার সাথে একটু দেখা করবি আম্মু? আমি, আমি তোর সাথে দেখা করতে চাই আম্মু। ”
মিথি শুনল। ফুফির ক্লান্ত স্বর শুনে প্রথমেই জিজ্ঞেস করল,

” তুমি ভালো আছো ফুফি? ”
“ ভালো আছি আম্মু। তুই আদ্রর সাথে না এলেও নিজে হলেও একা আয় একটু। আমার যে তোর সাথে কথা বলতে হবে আম্মু। ভীষণ প্রয়োজন। ”
মিথি ছোটশ্বাস ফেলে। ক্লান্ত গলায় বলে,
“ আসব ফুফু। আমি সময় করে আসব খুব শীঘ্রই। কিন্তু তোমার ছেলেকে চলে যেতে বলো। আমি তার সাথে যাব না। মোটেই যাব না। ”
অতঃপর ফোনটা আদ্রর হাতে দিল ফের আবারও। তারপর আদ্রকে আদ্রর মা কি বলল শোনা গেল না। তবে আদ্র শুধু এইটুকই বলল,
“ ভাব দেখাচ্ছিস তুই আমার সাথে হ্যাঁ?আমার সাথে যেতে অসুবিধা তোর?রিজেক্ট করছিস আমায়? আমার সাথেই যাবি তুই। ”
এইটুকু বলেই মিথির হাত আবারও টেনে ধরল আদ্র।হিমেল সবেই নেমেছিল। ওর ইন্টারভিউ আছে। রিক্সার জন্য দাঁড়াতেই এহেন দৃশ্য দেখে ওর মেজাজ খারাপ হলো। এগিয়ে এসে আদ্রকে শুধাল,

”এক্সিউজ মি, কে আপনি? ওর হাত ধরেছেন কেন? সমস্যা কি? ”
আদ্র তাকাল। বিরক্ত হয়ে বলল,
“ আপনি কে?ওর হাজব্যান্ড আমি। অধিকার আছে। ”
হিমেলের চোখমুখ শক্ত হলো। মিথির দিকে শক্ত চাহনিতে তাকিয়ে বলল,
“ মিথি, উনি কে? তোর হাজব্যান্ড? ”
মিথির কি উত্তর দেওয়া উচিত বুঝল না। কিয়ৎক্ষন থেমে তাচ্ছিল্য হাসি হেসে বলল,
“ কাগজে কলমে সে এখনো আমার হাজব্যান্ড। ”
হিমেল শুনল। আদ্রর দিকে হাত বাড়িয়ে এবার একটা হাসি উপহার দিল। অতঃপর হাত মিলিয়ে হেসে বলল,
“ ওহ। হাজব্যান্ড হয়েছেন, নিজের স্ত্রীর যথাযোগ্য সম্মান দিতে না পারলে তো হাজব্যান্ড হওয়ার স্বার্থকতা নেই ব্রো। এভাবে রাস্তাঘাটে নিজেদের সম্পর্কের তিক্ততার পরিচয় না দিলেই কি নয়? ”
“ আপনি কে ব্রো? কোথ থেকে উড়ে এসেছেন?আপনার থেকে জ্ঞান শুনতে চেয়েছি?”
হিমেল এবার ও হাসল। আদ্রর কাঁধ চাপড়ে হেসে শুধাল,

” আমি কে সেটা জরুরী নয়। জরুরী হলো একটা সম্পর্ক সুন্দর রাখা। আপনাকে অপরিচিত হিসেবেই একটা লেসন দেই হুহ? একজন মেয়েকে স্ত্রীরুপে বরণ করার পর তাকে অবশ্যই সম্মান, শ্রদ্ধা, যত্ন এবং ভালোবাসা দিতে হয় ব্রো। মেয়েটা তার পরিবার ছেড়ে আপনার এসেছেে।আপনি যদি সে ভরসাটাই হতে না পারেন তো আপনি স্বামী হিসেবে সফল হতে পারবেন না। নিজের স্ত্রীকে সম্মান করবেন হ্যাঁ? ঠিক যেমন আপনার মা-বোনকে যত্ন করেন, ভালোবাসেন, শ্রদ্ধা করেন। সেভাবেই। ”
এইটুকু বলেই হিমেল পা বাড়াল। স্বামী স্ত্রী সম্পর্কে সে তৃতীয় ব্যাক্তি হতে চায় না যেমন ঠিক তেমনই কিছু কথা না বললেও হতো না। যায় হোক তার মিথিফুল ঐ ছেরেটারই হয়েছে। তারই এখন।বলতে তো হতো।অন্যদিকে আদ্র হিমেলের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে শুধাল,
” কে এ ছেলে? তোর জন্য এত ভাবছে কেন?আমি কি সাধে তোর চরিত্রে দোষ দিয়েছিলাম। ”
মিথির এই মুহুর্তে ইচ্ছে হলো আদ্রর গালে একটা থাপ্পড় দিতে। আঙ্গুল উচুিয়ে বলে গেল,
” চলে যান আদ্র। নয়তো খুব খারাপ হবে।চলে যান এখান থেকে। দ্বিতীয়বার আর আসবেন না। ”

হিমেল তখন রিক্সায়। আয়মান ছাদ থেকেই দেখেছিল একটু আগের কাহিনীটা। হিমেলকে ফোন দিয়ে সর্বপ্রথম কৌতুহল দমাতে না পেরে শুধাল,
“ মিথির সাথে এই ছেলেটা কে ছিল রে?তুই হাত মিলালি।,”
” মিথির হাসব্যান্ড। ”
আয়মান চোখ গোল গোল করে বলে,
“ হাজব্যান্ড? ”
ফের আবারও বলে,
“ ও কি ফিরে যাবে ওর হাজব্যান্ডের সাথে?”
হিমেল উত্তর করল গম্ভীর স্বরে,
“ ওর পার্সোনার লাইফ, ওই জানবে।”
“ কষ্ট হবে না তোর? ”
হিমেল ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ কেন? ”
” মিথিকে ভালোবাসিস তো। ”
“ তো? ও সুখী হলেই হলো তো। ”
আয়মান ছোটশ্বাস ফেলে। কিছুটা সময় চুপ থেকে বলল,

“ তোর ও উচিত জীবনটা সাঁজিয়ে নেওয়া হিমেল। তোর জীবনেও বসন্ত আসুক। কেউ একজনকে সুযোগ দিয়ে দেখ।ওকে এভাবে নিরবে ভালোবেসে সুখ কি বল? ”
হিমেল হাসল। ফোন কানে নিয়েই বলল,
“সে আমার জীবনে যেমন বসন্ত হয়ে এসেছিল, ঠিক তেমনই এক জীবনের বিষাদ ও উপহার দিয়েছিল। আমার জীবনে বিষাদ এ বসন্ত উভয়ই ঐ একজন আয়মান। ঐ একজন যাকে আমি নিরবেই ভালোবাসব আজীবন।আর, বিষাদ না থাকলে বসন্তকে উপভোগই করা যায় না আয়মান।”
এইটুকু বলে কল রাখল সে। মনে মনে আওড়াল,

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ২৯

“ মিথিফুল, প্রথম যেদিন মুহিবকে চিরকুট দিলি? রাগ হলো খুব। তোকে সেবার বিনা কারণেই ধমক দিয়ে কাঁদিয়েছিলাম। আর মুহিবকে অকারণেই শাস্তি দিয়েছিলাম। বুঝতেই দিইনি কি কারণে আমি রেগে ছিলাম। অথচ এখন তুই অন্য কারো। সত্যিই অন্য কারোর। অন্যের নামে। কিন্তু যে মানুষটা তোর মূল্য দেয়নি তার কাছে তোর ফিরে যাওয়াটা আমার যৌক্তিক মনে হচ্ছে না কেন? আমি তো চেয়েছিলাম তুই সুখী হো।জানিস?এই কয়েকটা মাস তুই ফের আবার অভ্যাস হলি আমার। বুকের ভেতর সে পরিচিত অনুভূতির স্পষ্ট ছায়া হলি। হয়তো আবার চলে যাবি, আমার অভ্যাস বদলাতে হবে। তোকে দেখার অস্থিরতা কমাতে হবে। তবুও সবসময়ই তুই ই থাকবি মিথিফুল। শুধু তুই আমায় ভালোবাসিস নি এই জীবনে এটা আমার আপসোস থাকবে। ”

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৩১