বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৩১
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
আদ্রর মায়ের সাথে মিথি দেখা করার পর আদ্রর মা মিথির কাছে ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি নিজ থেকেই আদ্র এবং মিথির বিবাহবিচ্ছেদের প্রসঙ্গ তুলল। মিথির দিকে চেয়ে নিজ থেকেই বলল,
“ মিথি, আমি তোর জীবনটা শেষ করলাম তাই না মা? একটা ভুল দিয়ে তোর জীবনটা পুরো তছনছ করে দিলাম। অথচ আমি চাইনি। সত্যি বলছি মিথি, আমি চাইনি তোর জীবনটা শেষ হয়ে যাক এভাবে। ”
এইটুকু বলেই থামলেন উনি। মিথির দিকে নিষ্পলক চেয়ে পরমুহুর্তেই ছোটশ্বাস ফেলে জানালেন,
“ মিথি, একটা সময় আমিই তোকে এই সংসারে থাকার জন্য অনুরোধ করেছিলাম না? একটা সময় আমিই তে তোকে বলেছিলাম মানিয়ে নে, সংসারে থেকে যা। কিন্তু, আজ আমিই বলছি। তোর এই সংসার থেকে মুক্ত হয়ে নিজের জন্য কিছু করা উচিত আম্মু। নিজের জীবন গুঁছিয়ে নেওয়া উচিত। যে ভুলটা আমি নিজেই করেছিলাম সে ভুলটা আমি নিজেই ভেঙ্গে ফেলতে চাই মিথি। তোর আর আদ্রর সম্পর্কটা এখানেই শেষ হোক।”
মিথি শুনল। ফুফির গলায় কথাগুলো শুনে সে অস্ফুট স্বরে বলল,
“ সম্পর্কটা শেষই ফুফি। কাগজপত্রে শেষ হলে আমি অমত করব না অবশ্যই। কারণ আমি নিজেও চাই, তোমার ছেলের সাথে আমার একটুও সম্পর্ক না থাকুক। ”
মিথির সাথে এই বিষয়ে আদ্রর মায়ের কথা এতটুকুই ছিল। ঠিক এর পরের মুহুর্তেই আদ্রর মা আদ্রকে ডেকে আনল নিজের ঘরে। মিথির মুখোমুখিই নিজের দম্ভ নিয়ে বসল আদ্র। যেন সে না পারতেই বসেছে এমন। অপরদিকে মিথি একনজরও তাকাল না আদ্রর দিকে। আদ্রর মা ছেলেকে ডেকে এনে ছেলের সামনে সরাসরিই প্রথমে বলল,
“ আদ্র, তুমি চেয়েছিলে না মিথিকে বিয়ে না করতে? তুমি চেয়েছিলে মিথিকে ছেড়ে দিয়ে মুহুকে বিয়ে করতে তাই না?আমি অবশেষে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তোমাদের ডিভোর্সের। তুমিও ভালো থাকে, মিথিও মুক্তি পাক। তুমি কি সম্মত?”
আদ্রর ভাবভঙ্গি পাল্টাল যেন। মিথির দিকে মুহুর্তেই ভ্রু কুঁচকে তাকাল সে। মিথি এই প্রস্তাবটা রেখেছে? ওর যেন রাগ হলো। মিথিকে দেখলেই ওর রাগ হয়। সে প্রথমবার মিথিকে দেখে যেমন রাগ জম্মেছিল তার এই রাগের ভাবভঙ্গিটা আর বদলায়নি। বরং সময়ের সাথে সাথে আরো বেড়েছে।আদ্র প্রথমেই প্রশ্ন ছুড়ল,
“ তোমার ঐ মিথি বলেছে কথাটা? ও কি ভেবেছে আমি ওর সাথে সংসার করতে মরিয়া হয়ে বসে আছি নাকি? ওকে ডিভোর্স দেওয়ার প্রস্তাবটা আমিই প্রথমে ছুড়েছি বহু আগে। শুধু এতদিন সুযোগ হচ্ছিল না। নয়তে কত আগেই ওকে তালাক দিয়ে দিতাম। ”
আদ্র বোধহয় নিজের সংকট মেনে নিতে চাইল না। কোন মেয়ে আদ্রর মতো সুদর্শন পুরুষকে ছেড়ে দিতে চাইছে এটা তো আদ্রর জন্য লজ্জাজনক। বরং নিজে থেকেই ভাব দেখিয়ে ছেড়ে দেওয়ার যুক্তিটা আদ্রর কাছে বিজয়ী হওয়ার সমান মনে হলো। নিজের ভাব ধরে রাখতে হবে না?আদ্রর মা ছেলের দিকে চেয়েই শুধালেন,
“ আদ্র সবসময় উল্টো বুঝবে না। ও বলেনি এসব। আমিই বলেছি। আমি ওকে ডেকেছিই এই কারণে। কেন? তুমি কি চাও মিথিকে তোমার জীবনে রাখতে? তোমার ভাষ্যমতে ও তো চরিত্রহীন। জেনেশুনে তুমি চরিত্রহীন মেয়েকে সঙ্গে রাখবে না নিশ্চয়? তে ও ডিভোর্স দিতে বললেও তোমার তো খুশি হওয়া উচিত।”
আদ্রর গায়ে লাগল কথাটা। বলে উঠল,
“ ও ডিভোর্স দেওয়ার কে আম্মু?আমি নিজেই ডিভোর্স দিব। আর ওকে সংসারে রাখব কখন বলেছি আমি আম্মু? আমি ওর সাথে সংসার করব বলেছি তোমায়? তোমার কথার জন্য ওকে আনতে গিয়েছিলাম আমি। নয়তো যেতামই না।”
আদ্রর মা ছোটশ্বাস ফেললেন। বললেন,
“ সত্যিই বলছো? আমি ভেবেছি তুমি রাজি হবে না। ”
মিথি তাকাল এবারে। আদ্রর এসব সে বরাবরই দেখে এসেছে। নতুন নয়। বরাবরই এই উগ্র আচরণে অভ্যস্ত। আদ্র এবারও নিজের জায়গা আর ভাব ঠিক রাখতে তাচ্ছিল্য করে বলল,
” ও আমার লাইফে এমন কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তি নয় যে আমি রাজি হবো না আম্মু। সম্ভব হলে আমি ওরে এক্ষুনিই ডিভোর্স দিব আম্মু।প্রয়োজন হলে মুখেই তালাক দিব ওকে এক্ষুনি। ”
আদ্রর মা অস্ফুট স্বরেই বলল,
“ হু?
“ তুমি বারবার এভাবে জিজ্ঞেস করছো কেন? যেখানে মুহুকে এত করে চেয়ে ও ছেড়ে আসতে দুই সেকেন্ড লাগেনি সেখানে তোমার এই মিথিকে ছাড়তে আমার সময় লাগবে?”
ঠিক এর পরের মুহুর্তটাতেই আদ্র কোন কিছু না ভেবেই, পরিস্থিতি বিচার না করেই নিজের ওষ্ঠদ্বয় দ্বারা “তালাক” শব্দটা উচ্চারণ করল। তিনবার এই শব্দটা উচ্চারণ করেই মিথির দিকে এমনভাবে চাইল যেন সে জিতে গেছে। মিথির থেকে প্রত্যাখান পাওয়ার আগেই সে প্রত্যাখান ছুড়ে দিতে পেরেছে এই দম্ভে তার বোধহয় পৈশাচিক আনন্দ হলো। অথচ বোকা আদ্র এটা জানেই না যে মিথি কবেই তার দিকে প্রত্যাখান ছুড়ে দিয়েছে। কবেই আদ্রকে সে মুঁছে দিয়েছে জীবন থেকে। মিথি হাসল মৃদু। আদ্র যে জায়গায় দাঁড়িয়ে ভাবছে মিথি হেরে গেছে, অথচ আদ্র জানেই না মিথি জিতে গেছে। ওর মতো কাপুরুষের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া কি জেতার সমান নয়? মিথি হাসল। আদ্রর দিকে চেয়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল,
“ আপনার তালাক আমি গ্রহণ করলাম আদ্র। ”
আদ্র যেন চেয়েছিল এক ভঙ্গুর মিথিকে দেখতে। এমন মিথি যার মুখে তালাক শব্দটা শোনার অন্ধকার নামবে। অথচ নামল না তো। মিথিকে আত্মবিশ্বাসী এক নারী দেখাল। আদ্র তাকিয়ে শুধু বলল,
“ তোর এতোটা ভাবের উপর আমার তালাক বলাটাই যথেষ্ট মিথি। তোর বুঝা উচিত যে, তোর দাম দেখানো কতোটা অযৌক্তিক! তোকে আমি দুই পয়সার মূল্যও দেই না বুঝেছিস? এবং সমাজেও তোর মূল্য থাকবে না। কারণ এই দেশের সমাজ ডিভোর্সী নারীদের মূল্য দেয় না। ”
.
মিথি আদ্রদের বাসা থেকে রওনা হলো বিকালেই। ফোন করে তিনবার ফিজার থেকে খোঁজ করেছিল তার মেয়ের, তার প্রাণের। অবশ্য আসার সময় তার ফুফিও জিজ্ঞেস করেছিল। মিথি এড়বয়ে গিয়েছিল। জবাব দেয়নি। কারণ যে পরিবারের সে নিজেই জড়িত নয় সে পরিবারে নিজের সন্তানের অস্তিত্ব প্রকাশ না করাই কি ভালো নয়? মিথি ফেরাে পথে লোকাল বাসে উঠল। জায়গা হলো না। যার দরুণ দাঁড়িয়েই যেতে হলো তাকে। মাঝরাস্তায় বাসে আরো কয়েকজন উঠাতে বাসে ভীড় একটু বেশিই হলো। মিথির পেছনেই কোন এক পুরুষের গা ঘেষে দাঁড়ানো দেখে মিথি মুহুর্তেই দু পা পিছিয়ে দাঁড়াল। ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে ফের আবারও ভদ্রলোকের গা ঘেষে দাঁড়ানো দেখে বিরক্ত হলো ও। ভদ্রলোকের উদ্দেশ্যও ভালো মনে হলো না। মুহুর্তেই কপাল কুঁচকে প্রশ্ন ছুড়ল,
“ কি সমস্যা ভাই? দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়াতে পারছেন না? ওদিকে তো জায়গা আছে। ”
লোকটা মুহুর্তেই সরে দাঁড়াল। মুখভঙ্গি চুপসে এল যেন। মিথি এবার ভালোভাবে দাঁড়িয়ে সামনে তাকাতেই বাস থামল। হুট করেই দেখা গেল আয়মান আর হিমেলকে উঠতে। দুইজনই সামনের দিকে দাঁড়িয়েছে।এবং দুইজনের দৃষ্টিই আচমকা তার দিকে ফিরল। হুট করেই দৃষ্টি মিলতেই মিথি নজর সরাল দ্রুত। হিমেল ছোটশ্বাস ফেলল। মনে মনে বলল,
“ যদি আমার হতি তুই? যদি আমার অধিকার থাকত তোর উপর। কোনভাবেই এতোটা কষ্ট পোহাতে দিতাম না মিথিফুল। আগলে রাখতাম সর্বক্ষণ। এই লোকাল বাসের ভীড়েও তোকে আগলে নিতাম। ”
অতঃপর মিথির নির্দিষ্ট গন্তব্যে গাড়ি পৌঁছাতেই অল্প কয়েক যাত্রী নেমে গেল। আয়মানও নেমে গেল। অতঃপর মিথি নামার পরই হিমেল নামল। নামার পরপরই পেছন থেকে শুধাল,
“ এভাবে লোকাল বাসে ভীড়ের মধ্যে না উঠলেই তো হয়। পরের বাসের জন্য অপেক্ষা করা যেত না? ”
মিথি ফিরল। কথাটা তাকেই বলেছে বুঝে উঠে বলল,
“ বাসায় মেয়ে রেখে গিয়ে অন্য বাসের জন্য অপেক্ষা করার মতো সময় আমার হাতে ছিল না হিমেল ভাই। ”
হিমেল বুক টানটান করে দাঁড়াল। মিথির মুখের দিকে চাইল একবার। ঘামে ভেজা মায়া মায়া মুখটা সত্যিই বুকের কোথাও কেমন অনুভূতি যোগান দিল। যেন কত ক্লান্ত মিথিটা। হিমেল চেয়েই নজর সরাল। শুধাল,
“ বাচ্চা রেখে বের হতে হবে কেন তোকে? ”
মিথি স্পষ্ট গলাতেই শুধাল,
“ প্রয়োজন ছিল বলেই তো বের হলাম হিমেল ভাই।নয়তো বের হতাম না নিশ্চয়। ”
আয়মান হিমেলকে টেনে আনল। ওর কথা বলার ধরণ দেখে মিথি কষ্ট পাবে এই ভেবেই বলল,
“ বাদ দাও তো মিথি। ওর কথা আর কি। বাসায় তো যাবে তাই না? রিক্সা নিয়ে দিই? ”
মিথি হেসে বলল,
“ লাগবে না ভাইয়া, নিয়ে নিব। ”
তারপর মিথি ওখানে দাঁড়াল। পাশাপাশি আয়মানও দাঁড়াল রিক্সায় উঠিয়ে দিবে বলে। হিমেল কিছুটা এগিয়ে গেল হেঁটে। একটা খালি রিক্সা আসতে দেখে হাতের ইশারা ডেকে বলল,
“ মামা, ঐ যে পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটারে নিয়ে যান। ”
অতঃপর রিক্সা এগোল। মিথি ডাকার আগেই গিয়ে থামল। আয়মানও বলল,
“ মামা যাবেন? ”
লোকটা হ্যাঁ উত্তর দিতেই ফের বলল,
“ উঠে পড়ো। দেরি হবে তো নাহয়। ”
মিথি উঠতে নিয়ে বলল,
“ আচ্ছা। ”
অতঃপর বাসায় পৌঁছাল মিথি। তারপর বাসায় পৌঁছে প্রথমেই ফ্রেশ হয়ে মেয়েকে কোলে নিল সে। প্রায় আড়াই ঘন্টা মেয়েকে ছাড়া থেকেছে।এতোটা সময় মেয়েকে ছাড়া থেকে তার মেয়ের প্রতি আহ্লাদ জম্মায়। মুখ এগিয়ে চুমু দিল ও মেয়ের কপালে, গালে।তারপর একটু খেয়াল করতেই দেখা গেল মেয়ের কাঁথাটা ভিজে আছে। হয়তো ফিজা আপু আর খেয়াল করেনি। মিথি ছোটশ্বাস ফেলে কাঁথা পাল্টাল। মেয়েকে কোলে নিয়ে সময় নিয়ে খাওয়াল। অতঃপর উঠে ফিজাকে জিজ্ঞেন করল,
“ ও জ্বালিয়েছে তাই না আপু? ”
ফিজা তাকাল। বলল,
“ আরেহ নাহ। ও তো ঘুমেই ছিল। মাঝে শুধু দুইবার একটু ফ্যা ফ্যা করেছিল। দিনের বেলা তো একদম লক্ষী বাচ্চা ও। শুধু রাত হলেই কান্না করে। ”
মিথি হাসল। অতঃপর পা বাড়িয়ে ওয়াশরুমে গিয়ে মেয়ের ময়লা করা কাঁথা-কাপড় সব ডিটারজেন্ট দিয়ে ভিজাল। একটু পর সব ধুতে হবে। এখন রোদও নেই। শুকোতে দিতে হবে বেলকনিতে। যদিও কাল রোদেই দিবে। মিথি ওসব ভিজিয়ে মিনিট কয়েক বসে থেকে আবার রান্না করতে যেতে হলো। কারণ ফিজা ভালো রান্না পারে না। এখন হিয়াও নেই। রিধিও চলে যাবে। এখন বাসাতেই গিয়েছে। যার কারণে রান্নার দায়িত্বটাও মিথির উপরেই বেশিরভাগ সময় থাকে।মিথি রান্না করল। তারপর মেয়র কাঁথাকাপড় ধুতে গেল। তারপর ওসব আবার বেলকনিতে শুকোতেও দিল।
এর ঠিক দুদিন পরই মিথিকে ডিভোর্সের একটা লিখিত নোটিশ পাঠানো হলো আদ্রর হয়ে। মৌখিক তালাকের পর বিবাহবিচ্ছেদের লিখিত নোটিশ।যেটা পাঠানোর তিনমাসের মধ্যে সমঝোতা না হলে বিবাহবিচ্ছেদ বা তালাক কার্যকর হবে। মিথি পেল নোটিশটা সকালেই। অতঃপর ড্রয়ারের কোণে রেখে দিল।আর ঠিক বিকালের সময়ই আদ্রর মা কল দিল। জিজ্ঞেস করল,
“ তোর কাছে একটা নোটিশ গিয়েছে আম্মু? ”
মিথি হ্যাঁ জানাল। মিনিট কয়েক কথা হওয়ার পর যখন কথা শেষ পথে ঠিক তখনই তার মেয়েটা কেঁদে উঠল আওয়াজ তুলে। মিথি তৎক্ষনাৎ বলল,
“ ফুফি এখন রাখি? আমি পরে কথা বলব। ”
আদ্রর মা কান্নার আওয়াজ শুনল ওপাশ থেকেই। মিথি রেখে দিতে চাইলেও উনি দ্রুতই শুধাল,
“ কে কাঁদল মিথি? বাচ্চার কান্না। কে কাঁদল? এই মিথি… ”
মিথি উত্তরটা দিতে পারল না। ফোন রেখে দিল। আর অপর পাশে আদ্রর মা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে শুধাল,
“ আদ্র সেদিন সে কথাটক বললেও আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি যে তুই এই কাজটা করিসনি মিথি। নিশ্চয় আছে সে। ”
মিথির মেয়ের দেড়মাস বয়স এখন।টীকা দিতে হবে। মা হিসেবে একদম অনভিজ্ঞ মিথি আজ প্রথমবারের মতো মেয়েকে টীকা দেওয়াতে নিয়ে যাবে। রিধি তো চলেই গেছে। ভেবেছিল ফিজা থাকবে। কিন্তু ফিজারও ক্লাস আছে বলল একটু আগে। মিথি ঠিকানা জানে। একা যেতে পারবে অবশ্যই, কিন্তু একটু নড়বড়ে লাগছে কারণ মেয়েকে নিয়ে প্রথমবার যাবে। তার উপর সুঁই ফুটানোর সাথে সাথেই তো কান্না জুড়বে তার মেয়েটা। তবুও মেয়েকে নিয়ে একাই বের হলো ও। ভালো করে তোয়ালে জড়িয়ে কোলে নিয়ে নিচে নামতে নামতে দেখা হলো বাসার সে আন্টিটার সাথে। মেয়েকে দেখেই প্রথমে শুধালেন উনি,
“ মেয়ে তো তোমার মতোই হইছে, কিন্তু গায়ের রংটা তো তোমার নয়৷ ওর বাবার মতো নাকি গায়ের রং? ”
মিথি উত্তর কি দিবে বুঝল না। তবে ইতস্থত করে জানাল,
“ হ্যাঁ। ”
অতঃপর নামল। রিক্সার জন্য দাঁড়াল। হিমেল ঠিক একটু দূরত্বেই দাঁড়ানো আছে। খুব তাড়া ছিল। এক জায়গায় যেতে হতো খুব দরকারে। রিক্সা পাওয়া মাত্র উঠে বসতেই দেখতে পেল মিথিকে। একা ওভাবে বাচ্চাকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হিমেল ভ্রু কুঁচকাল। রিক্সাওয়লা মামাকে দ্রুতই বলল,
“ দাঁড়ান মামা। ”
অতঃপর ফের মিথির সামনে গিয়ে দাঁড়াতে বলল। ওখানে রিক্সা থামতেই হিমেল জিজ্ঞেস করল,
“ এভাবে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? কোথাও যাবি? ”
মিথি শুধু উত্তর করল,
“ হ্যাঁ যাব। ”
“ একা একা ওকে নিয়ে কোথায় যাবি?”
“ একা কোথায়? ও আছে তো। ”
হিমেল কপাল কুঁচকে তাকাল। বলল,
“ ও আছে সেটা কি আমি দেখছি না? নাকি আমার চোখ অন্ধ মিথি? ”
মিথি এবারে ছোটশ্বাস ফেলল। বলল
“ ওকে টীকা দিতে হবে।তাই। ”
হিমেল ভ্রু কুঁচকে তাকায়। এই মেয়েকে দেখলে রাগও হয়। ছোট বাচ্চা নিয়ে ও একা একা চলে যাচ্ছে। বলল,
“ তো একা কেন যেতে হবে? কাউকে নিয়ে যাওয়া যেত না? ”
“ সবাই আমার জন্য ফ্রি বসে থাকবে না হিমেল ভাই। তাছাড়া তাদের থেকে এযাবৎ অনেক সাহায্য পেয়েছি আমি।”
হিমেল এবারে আর কথা বলর না।গম্ভীর স্বরে বলল,
“ওকে কোলে দে আমার।”
মিথি তাকাল কেমন করে। হিমেল বলল,
“ নিয়ে চলে যাব না আমি ওকে। এমনভাবে তাকাচ্ছিস যেন কোলে নিয়ে চলে যাব। নাকি কোলে নেওয়া যাবে না?”
মিথি ফ্যালফ্যাল করে তাকাল। পরমুহুর্তেই হিমেলের হাতে এগিয়ে দিল। হিমেল একদম অভিজ্ঞের ন্যায়ই কোলে নিয়ে বসল। অতঃপর বাচ্চা মেয়েটার গোল মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে আচমকা হেসে ফেলল। মনে মনে বলল,
“ মিথিফুল, এমন একটা বাচ্চা মিথিফুলের স্বপ্ন বোধহয় আমিও বুনেছিলাম। এই ছোট্ট মিথিফুলটাও কি তোর মতো বোকা হবে?”
অতঃপর মনে মনে এইটুকু বলেই নিজের দিকে চেপে বসে পাশের জায়গাটা খালি করে মিথিকে শুধাল,
“ উঠে পড় মিথি। ”
মিথি দ্রুতই শুধাল,
“ না, ওকে দিন। আমি একা যেতে পারব। ”
হিমেল গম্ভীর গলায় জানাল,
“ তোকে উঠতে বললাম তো। খারাপ উদ্দেশ্য নেই আমার অবশ্যই। ”
মিথিকে তবুও চুপ থাকতে দেখে হিমেল আবারও শুধাল,
বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৩০
“একই রিক্সায় যেতে অসুবিধা হবে তোর? কিন্তু আমি তোর জন্য যথেষ্ট জায়গা রেখেছি। নাকি আমাকে তোর খারাপ মানুষ মনে হচ্ছে?”
মিথি ছোটশ্বাস ফেলে এবারে উঠল। যতটুকু নিজের দিকে চেপে বসা যায় বসল দূরত্ব রেখে। অতঃপর মেয়েকে কোলে নিতে চাইল। হিমেল না দিয়ে ওভাবেই কোলে রাখল। বলল,
“ থাক ও আমার কাছে। তুই বস। ”
